শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

মেহেদী উল্লাহ'র গল্প : আমার আম্মার স্বামী

আমার আম্মার স্বামীকে আমি দিনে দুইবার গোসল করতে দেখতাম— রাতে শুতে যাওয়ার আগে একবার, ভোরে ঘুম থেকে উঠে একবার, তাই আমি গোসল করাই প্রায় ছেড়ে দিয়েছি। সাত কি আট দিন পর পর, অথবা যখন মনে হয় গাটা ভারি হয়ে আসছে সবদিক থেকে তখন আমি গোসল করি। লোকটার রাতের গোসলের সঙ্গে থাকতাম আমিও। আমাকে হারিকেন নিয়ে পুকুর ঘাটে বসে থাকতে হতো, আর সে আলো-আঁধারি একটা পরিবেশে রোমাঞ্চ নিয়ে আলিশানভাবে ডুবে ডুবে গোসল করত।


আট দিন পর আজ আমি, তাও আবার বিকেলে গোসল থেকে এসে গামছা দিয়ে ভালো করে শরীর মুছে আমার বিছানায় বসলাম। এবার গামছা জড়ো করে মাথার চুল বার কয় ঘষলাম। আমার মনে হলো চুলটা বড় হয়েছে। আর এ জন্য চিরুনি দেওয়া দরকার, আমার নিজের কোনো চিরুনি নাই। কারণ আমার আম্মার স্বামীর পারসোনাল একটা চিরুনি ছিল, যা সে বুক পকেটে অলটাইম ঢুকিয়ে রাখত, আর কিছুক্ষণ পর পর লম্বা চুলগুলোকে ঘাড়ের দিকে যেতে নির্দেশ দিত, সে জন্য আমি কোনো চিরুনি কিনি না। এখন যদি আমাকে চিরুনি করতেই হয় তবে আমার রুমমেটের চিরুনিটা বইয়ের আনাচ-কানাচ থেকে খুঁজে নিয়ে তবেই কাজটা সারতে হবে। আমি চিরুনি নিয়ে, এবার একই কায়দায় আয়নাটাও জোগাড়ের চেষ্টা করছি। আমার তিনজন রুমমেটের কেউই এখন নেই, বিকেলে আড্ডা দিতে বেরিয়ে গেছে ওরা, ফিরবে সন্ধ্যার আন্ধার হওয়ার অনেক পর। আমি ওদের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক তৈরি করিনি; আসলে হয়েই ওঠেনি। আমি আমার রুমেই কম থাকি, রাতে যার সঙ্গে সুবিধা বোধ করি চলে যাই সে বন্ধুর রুমে। তার ওখানে রাত পার করে আমি আমার হলে এসে সকালে মুখ ধুই। আমার আম্মার স্বামীও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত, হলে থাকত। নিশ্চয়ই নিজ কক্ষেই রোজ রোজ থাকত! তাই আমি নিজ হলের কক্ষে থাকা ছেড়ে দিয়েছি, আমি চাই তার মতো না হতে।

আমি কর্নারের ৬০ ওয়াটের বৈদ্যুতিক বাতিটা জ্বেলে দিয়ে, ওটার সামনে দাঁড়ালাম। বাইরে বিকেলের আলো ফুরিয়ে আসায় কোনাগুলোতে আগেই আন্ধার গুমোট বাঁধতে শুরু করেছে। আমি বাঁ হাতে আয়নাটা ধরে ডান হাতে চিরুনি নিয়ে চুলগুলোতে বসালাম, এবার আঁচড়াব... আমার লম্বা চুলগুলোকে আমি কিভাব বিন্যস্ত করলে ভালো দেখাবে আমি তা ভাবছি; সে অনুযায়ী অগোছালো চুলে অনেকটা আনমনে অগোছালোভাবেই চিরুনিটা চালাচ্ছি। আমি ভেবে নিচ্ছি, আসলে আমাকে কেমন দেখাবে, যদি পেছনের দিকে আঁচড়াই। আমি চিরুনির একপ্রান্ত ধরে, কপালের দিক থেকে চুলের গোঁড়ালির কাছে চিরুনির কাঁটা নিয়ে পেছনের দিকে দুই-একটা আঁচড় দিতেই আমার মনে পড়ল; না, এই ভাবে না... এইভাবে কেন? ওভাবে তো লোকটা, মানে আমার আম্মার স্বামী চুল আঁচড়ায়, আমি তার মতো করে আঁচড়াতে চাই না। তার চুলের স্টাইলের সঙ্গে আমারটা মিলে যাক, এ আমি কখনোই চাই না, আমি চাই না তাকে অনুসরণ করতে, তা ছাড়া আমাকে আগে থেকেই চেনে এমন ছেলেপেলে এখানে পড়তে এসেছে, দেখা হলে যদি বলে বসে, ‘বাহ! কি মিল! বাপ কা ব্যাটা!’ আমার আম্মার স্বামীর মতো, তার আচরণ-স্বভাবের সঙ্গে আমার মিল না ঘটুক, আমি সর্বদা চাই, তার সঙ্গে আমি অমিল খুঁজছি, প্রশ্নই ওঠে না এখন চুলটা তার মতো করে আঁচড়াই; আমি তো চিরুনিই কিনি নি- হাঃ হাঃ, অনেকেই অনেকের সঙ্গে অমিল রাখতে গিয়ে হয়তো যার সঙ্গে অমিল রাখবে তার মতো ‘লাল’ চিরুনি না কিনে ‘হলুদ’ বা ‘খয়েরি’ কিনবে। চিরুনি কিনবেই, তবে অপছন্দের লোকটার মতো একই রঙের কিনবে না, অথচ আমি তো চিরুনিই কিনি নি। বুঝতেই পারছেন, আমি যে শুধু অমিলই খুঁজছি তাই নয়, আমি পৃথিবীর অন্য ‘অমিল’ওলাদের সঙ্গেও একটা পার্থক্য রাখতে চাইছি।

আমার আম্মার স্বামীর চুলের স্টাইলের কথা ভাবতেই আমি আর পারি নি, চুলগুলো ঘাড়ের দিকে ঠেলে দিতে, আম বরং আয়নাটা ঠিকমতো ধরে চুলের মাঝ বরাবর একটা সিঁথি করতে লাগলাম, যাতে চুলগুলোকে কানের দিকে ঘুরিয়ে দিতে পারি, আমি করছিও তাই, বাতির আরো কাছে গিয়ে আমি স্পষ্ট সিঁথি করে দুই পাশে চড়িয়ে দিলাম চুলগুলোকে, মিলের প্রশ্নই ওঠে না।

চুলের কথা তো এই এখন উঠল, আরো কিছু ব্যাপার আছে, স্বভাব-চরিত্র আর ব্যক্তিত্বের, আমি আমার আম্মার স্বামীর ধারও ঘেঁষি না। লোকটার সঙ্গে আমার চরিত্র কিংবা স্বভাবের কিছুর মিল থাকুক তা আমি চাই না। আমি যে সারাদিন অমিল রচনার জন্য মেতে থাকি তাও না, যখন হঠাৎ কিছু করে ফেলেছি, আর মনে পড়ল, আরে! আমার আম্মার স্বামীও এমন— তখন আমি তা থেকে নিজেকে বিরত রাখি। এ জন্য কখনো কখনো আমাকে আÍবিশ্বাসও হারাতে হয়। আমার আম্মার স্বামী কারো সঙ্গে দেখা হলে সোল্লাসে ভেটকি হাসি দিয়ে বলে উঠবে— ‘আছেন ভালো?’ আমি এই বাক্যটার ধার দিয়েও হাঁটি না। এখানে পড়তে এসে প্রথম প্রথম আমি অবচেতন মনে বলে ফেলতাম, তবে যখন টের পেতাম আমি তো আমার আম্মার স্বামীর মতোই আচরণটা করলাম কারো সঙ্গে, সাথে সাথে আমি নিজেকে সংযত করে অমিল জাহির করার জন্য সাক্ষাতপ্রাপ্ত লোকটার সঙ্গে হাত না মিলিয়েই রওনা দিতাম। এতে লোকটা বিব্রত হতো, এত সুন্দর করে অভ্যর্থনা জানালো, অথচ হাত না মিলিয়েই চলে যাচ্ছি দেখে লোকটা অবাক হতো, অথচ আমার কিন্তু তাতে কিছু করার নেই, আমি তো আমার আম্মার স্বামীর মতো হতে পারব না। তাই ভুলে ‘আছেন ভালো’ বলে ফেললেও হাত মেলাবো না— এটাই তো স্বাভাবিক। আমার আম্মার স্বামী দুই হাত বাড়িয়ে দেয়, তাই আমি এক হাত বাড়িয়ে কারো সঙ্গে হাত মিলাই। হাত মেলাতে অসুবিধা নাই, কারণ সে যদি এক হাত মিলাতো, তবে আমি নিশ্চয় দুই হাত মিলাতাম। এর পর থেকে আমি সচেতনভাবেই কাউকে অভ্যর্থনার জন্য বেছে নিলাম— ‘কি খবর?’ ‘আছেন’ কিংবা ‘ভালো’ শব্দ দুটোর কাছেও ঘেঁষি না। আমার দেখাদেখি অনেক জুনিয়রও এখন কাউকে দেখলে বলে— ‘কি খবর?’ এটা বরং আমার ভালো অনুভূতি, অন্তত কমিউনিটির সম্ভাষণের অভিধান পরিবর্তন করতে পারছি।

আমার আম্মার স্বামী যেভাবে ভাত খায়, আমি সেভাবে খাই না, সে প্লেটের নিজের কিনারের এক ধার থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে কেন্দ্রের দিকে এগোয়। আমি বরং অন্যভাবে খাই, প্রথমে ভাতের সঙ্গে তরকারি আর ঝোল মিশিয়ে মেখে নিয়ে কেন্দ্র থেকে কিনারের দিকে আসি, অথবা অন্যত্র খাই, অর্থাৎ মিলে না গেলেই হলো।

কারো সঙ্গে কথা বলতে বলতে, এক পর্যায়ে যখন হাসির কোনো ব্যাপারে ঘটে তখন আমার আম্মার স্বামী খুব জোরে শব্দ করে হাঃ হাঃ করে ওঠে। ওটা তো আমার কাছে বিষের মতো! আমি পাঁচ-ছয় মাস আগে একবার হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমি তো কখনো কখনো অবচেতন মনে লোকটার মতোই হেসে উঠি, কিন্তু আমি যে ব্যক্তিত্ব গড়তে চাই, তার সঙ্গে এই হাসিটা বেমানান; আমি তার মতো হাসব কেন? এ জন্য আমি হাসি, কিন্তু বেঁধে বেঁধে, গলায় একটা ছাকনি বেঁধে হাসি শুধু নির্যাসটুকু ঠোঁটের কাছে পাঠাই, হাসি, যাকে বলে মুচকি হাসি। কখনো ভুলে জোরে তার মতো হেসে ফেললে আমি হঠাৎ কথাই ছেড়ে দিই, কারণ এতেও একটা অমিলের সম্ভাবনা আছে। লোকটা করে কি; বুক ভাঙা হাসি দিয়ে তারপর অনবরত কাউকে সুযোগ না দিয়ে নিজেই কথা বলে, আমি এ জন্য থামিয়ে দিই কথা, যাতে হাসি এবং কথার সংযোগ করলে একটা অমিল হয়, হাসি মিলুক ক্ষতি নেই, যেন হাসির পরের খণ্ডটাতে অমিল থাকে; হাসি এবং কথার এক্সপ্রেশনের যোগফল যাতে তার মতো অন্তত না হয়।

আমি গত চার বছর ধরে এমন একটা অভ্যাসের সঙ্গে যুদ্ধ করছি যা রপ্ত করলে, স্বাভাবিক রাখলে ততদিনে হয়তো আমার আম্মার স্বামীর সঙ্গে আমার একটা বড় ধরনের মিল ঘটে যেত। আমি অনেক সংযত থেকে ওটাকে বিদায় করেছি। আমার আম্মা, যার সূত্রে তার স্বামী আমার আম্মার স্বামী, প্রায়ই লোকটা আমার আম্মার সঙ্গে একবার যদি গোস্বা করত কিংবা খেপে যেত তবে বিশ-পঁচিশ মিনিটের আগে থামত না। আমার মা যতই বলুক একবার কইলা তো, শুনলাম, আর অমন ভুল হবে না। এতক্ষণ ধরে বকাবকি করতাছো কেন? লোকটার কি হুস জ্ঞান আছে? অবিরাম বকে যায়; এক বকা ঘুরিয়ে ফিরে বারবার বলে। সে ভাবে বেশি বকা মানে, নিষেধটাকে, তাৎপর্যময় করে তোলা হলো— সে বকেই যায়। কিন্তু; তাতে হয়েছে বিপর্যয়, আমার মা, এমন একটা সময় এলো, ঠিক যখন আমরা তিনভাই-একবোন বড় হয়ে উঠলাম, তখন এমন ননস্টপ বকাবকি করলে তিনি ‘শোনাউল্লা’ শুনে যেতেন, ‘বকাউল্লা’ বকে যেত।’ একসময় লোকটা থেমে যেত আপনা থেকেই। আমি ছোটকাল থেকে এই আচরণ দেখতে দেখতে কেমন যেন নীরবে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। বন্ধুদের সঙ্গে কোনো ব্যাপারে একবার মতের অমিল হচ্ছে তো, কারো প্রতি খেপছি তো, আমার আম্মার স্বামীর মতো একটানা বাক্যবর্ষণ শুরু। থামাথামি নেই। বন্ধুরা বিরক্ত হয়ে বলত, হইছে, এইবার থাম, আর বলিস না। অথচ আমি শুনতাম না কারো অনুরোধ। চেঁচিয়ে বকাবাদ্য করেই যেতাম। অথচ যখন থেকে বুঝতে পারলাম, এটা তো আমার মায়ের স্বামীর সেই স্বভাব, যা আমার মধ্যে ঢুকে গেছে, এর চারিত্র্য এখন নীরব ঘাতক। আমাকে কারো কিছু বলতে হলো না, আমি নিজেই বিরত হলাম, প্রথম প্রথম পারিনি, অথচ আমি চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি, আমাকে তাড়াতেই হবে একে। আমি এখন অনেকটাই পেরেছি। আমার আম্মার স্বামীর মতো কাউকে পেয়ে বসলে অনবরত বাক্য ব্যয় করি না, বরং আমি সংযত, একটা-দুটো কথা বলি, এই যেমন, ‘এমন আর করবা না।’ ‘ধুর, এটা তুই ক্যান বললি, ধ্যাৎ।’ অথবা সংক্ষেপে, ‘তোমার আচরণে আমি কষ্ট পেয়েছি। এমন আর করো না।’

আমি চাই না লোকটার স্বভাবের এক কানাকড়িও আমার মধ্যে ঢোকে। জীবনের পনের-ষোলো বছর আমি তার সংস্পর্শে থেকেছি, দেখেছি সংসারের অ্যাকটিভ চরিত্রের আধিপত্য। অথচ ঘরছাড়া সবে তিন-চার বছরে আমি তাকে কতটুকু এড়িয়ে যেতে পারি? কিন্তু আমি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি মোটামুটিই, এতে আমার আম্মার স্বামীর কোনো আচরণই এখন আর আমাকে স্পর্শ করে যায় না। আমি যা চাই না, যা অপছন্দ করি, যার সঙ্গে আমার মানসিক দন্দ্ব— যত বছর ধরেই আমি তাকে লালন করি না কেন, এক মুহূর্ত বেঁচে থাকার সুযোগ পেলেই আমি শেষনিঃশ্বাসটুকু অন্তত ওই লোকটার নিঃশ্বাসের মতো ত্যাগ করতে নারাজ। তাই সত্যটুকু ধরে আমি দিনের পর দিন বেঁচে থাকার স্বপ্ন নিয়ে আছি।

এমনকি তার গলাখাঁকারি, সে যখন বিকেলের দিকে কলেজের চাকরিটা করে বাড়ি ফিরত, সে গলা থেকে জোরে খাঁক, খাঁক শব্দ করে কফ বের করে দিত, আমার অজান্তেই আমি তা অর্জন করেছিলাম। আমি কোথাও পৌঁছে, সেখানে যাতায়াতের আগে দোরগোড়ায় খাঁক খাঁক শব্দে খাঁকারি দিয়ে পৌঁছতাম— একদিন আমি নিজেকে হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, আমার আম্মার স্বামীর সঙ্গে এটাও আমার চরম মিল। এখান থেকে না বেরোতে পারলে হবে না। আমি এখন আর গলাখাঁকারি দিই না, এমনকি গলায় শত কফ থাকলেও দিই না, প্রয়োজনে আমি অন্য সময়, মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে কফ বের করে পাশে ফেলি। লোকটা গন্তব্যে পৌঁছে খাঁকারি দেয়, আমি মাঝ পথে।

আমার আম্মার স্বামীর দাঁড়ি আছে, যাকে লোকে ছাগইল্যা দাঁড়ি বলে, আমি ভয়ে ঘন ঘন শেভ করি, যাতে দাঁড়ির একটা নতুন কুঁড়িও কারো চোখে না পড়ে। সে পাঞ্জাবি-পাজামা পরে, আমি শার্ট-প্যান্ট। সে পাঞ্জাবির ভেতর হাতাকাটা গেঞ্জি পরে বলে আমি ওটা কখনো ছুঁয়েও দেখিনি। আর তার শার্ট-প্যান্ট বা আণ্ডার ওয়ার সে দর্জি দিয়ে বানায়, এটা আমি ছোটবেলায় দেখিছি— নীল কাপড়ের দুটো হাফপ্যান্ট বানিয়ে এনেছে, এখনো হয়তো সে তাই পরে, শেষ বাড়ি ছাড়ার আগেও আমি উঠানে একটা সবুজ রঙের হাফপ্যান্ট ঝুলতে দেখেছি। আমি নিঃসন্দেহ ওটা তার। তাই আমার ঝামেলা নেই, ফার্মগেটের ফুটপাথ থেকে আন্ডারওয়ার কিনে নিলেই হয়।

এক কথায় আমি আমার আম্মার স্বামীর মতো হতে চাই না। তার মতো হয়ে পৃথিবীতে আমি বেঁচে থাকতে পারব না, একটি মুহূর্তের জন্যও না।

সে খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, ওযু করে নামাজ-কালাম পড়ে, আমি উঠি না... কখনো নয়টায় কখনো এগারোটায় ঘুম থেকে উঠি।

আসলে লোকটার সঙ্গে যে এখন আমার পুরোপুরি অমিল, তাতে আমার আর কোনো সন্দেহ নেই, যতই অমিল দেখাই না কেন, কত আর দেখাতে পারব? তবে আমি নিশ্চিতভাবেই জানি আমি যেহেতু চেষ্টা করছি তাই মরণ পর্যন্ত এই ষোলকলা অমিলটা বজায় থাকবে।

আমার আম্মার স্বামীর সঙ্গে অমিল রেখে চুল সাজানো হয়ে গেছে আমার। অনেক দিন পর গোসল করে বেশ আরাম লাগছে। কিছুক্ষণ পর ঘুরতে বেরোবো, আমি সাধারণত সন্ধ্যার পর ঘুরতে বেরোই। আমার আম্মার স্বামী আবার বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে সন্ধ্যার পর ইসলামিক বইপত্র পড়ে। কখনো ঢুলেঢুলে টেবিলের উপর রেহালে রেখে কোরআন পড়ে আয়েশ করে, তাই ভুলেও আমি সন্ধ্যায় পড়ার টেবিলে বসি না। এটা তার রোজকার অভ্যাস, তাই আমিও রোজ রোজ সন্ধ্যার পর হুদাই হেঁটে বেড়াই।

আমি যে আমার আম্মার স্বামীর সঙ্গে মিল খুঁজে বেড়িয়ে এড়িয়ে চলতে চাই তা অবশ্য আমার কাছের বন্ধুরা কখনো বুঝতে পারেনি, তবে আমি জানি, আমার মধ্যে এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ক্ষণেক্ষণেই উপস্থিত হয়, তবে আমার নিয়ন্ত্রণের উপায় কঠোর হওয়ার কারণে তা আমাকে পুরোদমে ছুঁয়ে যেতে পারে না। আমি আমার মতো করেও যে জীবন যাপন করতে পারছি তা কিন্তু নয়, আমি যদিও ভাবি, আমি আমার আম্মার স্বামীর অল্টার ইগো হয়ে উঠছি বড়জোর, এতেই আমার স্বস্তি, এতেই আমি শঙ্কা বোধ করি না, আমার আশঙ্কা হয় না যে আমার জীবনটা লোকটার মতো হয়ে উঠতে পারে। আমি চাই না, আমার জীবনটা একটা নির্বোধের জীবন হোক, সমাজে-পরিবারে যার দুই পয়সার দাম নাই।

মাসের শেষে তার পকেটে টাকা থাকত না। এমনকি কখনো কখনো মাসের পর মাস টাকা নাই। এমপিও ভুক্ত কলেজের শিক্ষক, মাসের শেষ আছে, কিন্তু বেতন প্রদানের শেষ তারিখ নাই কোনো। আমার স্পষ্ট মনে আছে, তখন আমি ফোর কি ফাইভে পড়ি। একদিন সকালে স্কুলে যাবার সময় দেখলাম, আমার আম্মার স্বামী কাঁথা মুড়িয়ে শুতে যাওয়ার আগে আমার আম্মাকে বলল— আমারে ডাইকো না, শরীরডা খুব খারাপ লাগতেছে। আম্মা কোনো কথাই বললেন না। তিনি জানতেন, পকেটে টাকা নাই, বাজার করতে হবে তাই ভেবে আগেই শরীর খারাপের নাটক। সকালে মুড়ি খেয়ে স্কুলে গিয়েছিলাম। দুপুরে স্কুল থেকে আসার পর আম্মা পাটের শাক ভাজি দিয়ে ভাত খেতে দিলেন। বাইরের কাজ থাকায় তিনি সারতে গেলেন। আমার ভাত খাওয়া অর্ধেক সময়ে, আমি আম্মাকে ডেকে বললাম, ‘আম্মা, কই আরেকটু শাক দিবেন?’ আম্মা এসে পাতে শাক তুলে দেওয়ার সময় হঠাৎ শব্দ করে, আমার আম্মার স্বামী বিছানা থেকে লাফ মেরে উঠে আমার পাশে বসে, আম্মাকে বলে— দাও না আমারেও একটু ভাত, আরে আরে দেহ, আমি তো আরো টেনশনে শেষ, বাড়ির পাশে পাটক্ষেত আছে— এই কথাটা মাথায় থাকলে, সকালে কি আর বাজার করার ভয়ে শরীর খারাপের উছিলা দিয়া শুইয়া থাকি।

লোকটা নিজেই একটা প্লেট নিয়ে বসে মাকে বলল— দাও দাও, কয়ডা খাইয়া, এইবার একটু আরাম কইরা সত্যি ঘুমামু।

লোকটা কেমন যেন! আমার খালি ভুল ধরে, কথায় কথায় রেগে গিয়ে আমারে বলে বেকুব। আম্মা ধরলেও কাজ হয় না, মারলে খালি মারতেই থাকে, আর বলে, বেকুব এডা এমনে করে নাকি। আমার খালি মন খারাপ হয়। আমার খালি মনে হয়, আমার আম্মার স্বামী আমারে আদর করে না ক্যান্?

আস্তে আস্তে বড় হই, বড় বড় ক্লাসে উঠি। পড়ার খরচটাও লোকটা চালাতে পারে না। আমার এক মামা আছে বনে চাকরি করে। মামা পড়ার খরচ চালায়। আম্মা কান্নাকাটি করে, বলে, ভাই আপনে না চাইলে, আমার পোলাপানগুলা অমানুষ হই যাইত। মামা এখনো টাকা পাঠান। যাতে আমি এবং আমরা মানুষ হই। আমরা মানুষ হতে চাই— সব ভাইবোন। কিন্তু আমি আমার আম্মার স্বামীর মতো অপদার্থ হয়ে থাকতে চাই না, এমনভাবে এক মুহূর্তেও পৃথিবীতে টিকে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। ছোটবেলায় বেশি জিদ পোহাতাম। লোকটাকে প্রচণ্ড ঘৃণা করে সুখ পেতাম, আস্ত অপদার্থ, সংসারের খরচ দিতে পারে না, বৌর শাড়ি-চুড়ি দিতে পারে না, নিজের ঠিকমতো চালচুলা নাই। কেমন একটা চাকরি করে। মাটি রঙের প্লাস্টিকের স্যান্ডেল, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে পায়ে হেঁটে কলেজ করে, আমিও যেতাম দুই-তিন মাইল হেঁটে হেঁটে স্কুলে।

আমারই কেমন অসহ্য, আর আমার আম্মারই বা লাগত কি রকম ভাবা যায়!

আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যৌন জীবনেও লোকটার সঙ্গে আমার অমিল থাকবে। সে কিভাবে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করে, কি অংশ তার দেখেছি, না দেখেছি তার অমিল হয়তা করতে পারব না, তবে তার মতো চার চারটা বাচ্চা নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। একটার পর যদি ভুলেও হয় তবে দুইটা হবে এর বেশি নয়। যৌন জীবনে আমার আম্মার স্বামীর সঙ্গে আমার এভাবেই অমিল থাকবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। একটা খাওয়ানোর মধ্যে নাই, চারটা...।

বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে বুঝেছি, এটা যে শুধু আমার আম্মার স্বামীর দোষ তাও নয়, এর সঙ্গে দেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোও জড়িত। ফলে একটু উদারভাবে দেখতে শিখলেও মিলের বেলায় ছাড় নেই। আমি লোকটার মতো হতেই চাই না, তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোনো স্বভাবও যদি আমার মধ্যে জায়মান থাকে, সজাগ থাকে তবে তা হয়তো আমাকে তার মতো অপদার্থ বানিয়েই ছেড়ে দেবে। ফলে আমার সমাজ-সংসারও তো তার মতোই হতে বাধ্য। আমি আমার আম্মার স্বামীর মতো হয়ে পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চাই না। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যা যা দরকার, মৌলিক অধিকার পর্যন্ত আদায় করে অন্তত বেঁচে থাকতে চাই। অথচ দেখুন, আমি আমার আম্মার স্বামীর মতো হলে তো, এই ন্যূনতম অধিকার থেকেই বঞ্চিত হয়ে যাই, ‘ঠাডা পড়ে যদি বগাও মরে’ তাহলেও একটা আশঙ্কা আমি টের পাই। কোনো আশঙ্কা আমি জীবনে জীবিত রাখতে চাই না। পড়াশোনা করছি, চাকরি করব, বিয়ে করব, সন্তান জন্ম দেব, একদিন মরে যাব, ব্যাস। একমাত্র লোকটার মতো না হলেই পাঁচটি অধিকার বজায় থাকবে। আমি দেখেছি, লোকটা কেমন সহজ-সরল, বোকাচোদা আর মেন্দামার্কা। এই স্বভাব-চরিত্র-ব্যক্তিত্ব নিয়ে কি এখন আর টিকে থাকা যায় সমাজে? তাহলে কেন হব তার মতো? সাদাসিধে জীবন নিয়ে কার কাছে দাম আছে বলুন? লোকটা তো নির্বিঘ্নে ও নিশ্চিতে কাটিয়ে দিল জীবনের আসল সময়। এখন আর কী করবে? কয়দিন পরে এসে বলবে, তুই যা খাস, তাই খাব, তুই যেখানে থাকতে দিবি সেখানে থাকব। আর আমার আম্মা? পেছনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করবে লোকটার পদধ্বনি শোনার জন্য। তারপর সে পথে সেও হাঁটবে।

আমার চুল আঁচড়ানো শেষ। আয়নাটা থেকে কেন যেন চোখ সরাতে পারছি না। অনেকদিন পর নিজেকে দেখছি... আলোর আরো কাছে গিয়ে দুচোখ উজাড় করে আমাকেই আমি দেখছি। দীর্ঘদিনের আয়না রহিত মুখটাকে কেমন অচেনা ঠেকছে। এটা কে? আমি? এমন হয়ে গেছি! কেন? কেমন যেন! কার মতো, নিজেকে চিনতে, মেলাতে কষ্ট হচ্ছে। অথচ কোথায় কবে দেখেছি মনে হয় এই মূর্তি। আরো ভালো করে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছি আয়নায়—

লোকটার মুখে লেগে আছে দীর্ঘদিনের ক্লান্তির ছাপ। অপ্রকাশিত বেদনা বদনের কানায় কানায়, চোখগুলো কেমন মায়াময়, ঠোঁট শুকিয়ে গেছে। কপালের মাঝখানে ঘন ভাঁজ, নাকটাই একমাত্র সাক্ষ্য দিচ্ছে, হ্যাঁ, আমিই সব কিছুর ঘ্রাণ নিয়ে দেখেছি— সবার, তোমার অসন্তুষ্ট জীবনের ভারের গন্ধ কেমন। নাকটা ঝুলে আছে, তেতো-বুনো-আদিম গন্ধ নিতে নিতে। নিঃশ্বাসের ভেতর বাহিত হয়ে দেহের কোথায় পাচার হয়ে গেছে জীবনের আঘ্রাণ। টের পেয়েও পায়নি কিছু। নাক ঘ্রাণ পেয়েছে, অথচ চোখ নড়েনি, মুখ প্রকাশ করেনি, জীবনের বিবর্ণ-বাসি দুঃখ-কষ্টের গন্ধ ঠিকই ধরা আছে পেটের ভেতর। আমি একে দেখেছি আগে। আমি এ কাকে দেখছি? আমি তো এমন ছিলাম না, এমন কি আমি স্বাভাবিক চেতনায় আমাকে যেমন দেখি, সে তো এই মানুষ না। এর সঙ্গে কার হুবহু মিল? তবে কি এ আমার সমগ্র অমিলেরই মিলের গড়? যে চেহারায় তীব্র আলোর রেখা পড়ে পড়ে তাকে নিয়ে যাচ্ছে স্বচ্ছ আয়নাতে— হে পৃথিবী এতো আমি নই। এ আমার আম্মার স্বামী। মুহূর্তেই প্রতিবিম্ব চোখ রাঙায় ‘তোমার আম্মার স্বামী তোমার কে হয়?’




লেখক পরিচিতি
মেহেদী উল্লাহ

তরুণ গল্পকার।
‘পোস্টমাস্টার ও অন্যান্য গল্পে’র পাণ্ডুলিপির জন্যে পেয়েছেন  জেমকন তরুণ কথাসাহিত্য-২০১৩ পুরস্কার।  

1 টি মন্তব্য: