শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

অলাত এহ্সানের গল্প : শুয়োরটা বলে কি!

অনধিক দুই ঘণ্টা, টান টান অপেক্ষা, তারপর একটা ডাবল ডেকার বাস। অবশ্য তাতে যাত্রী বেশি নেই। এদিকে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে শ’খানেক, মেইল ট্রেনের মতো দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। নজির দেখেই বুঝলাম, আমাকে আজ লড়তে হবে। বাসটি স্টেশনে ভেড়ার আগেই যথারীতি লাইন ভেঙে হুমড়ি খেয়ে পড়লো অপেক্ষমান যাত্রীরা।যেন গোল্ড-রাশ খুলে গেছে। বন্ধ গেটের সামনে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে সবাই। পেছনের ডাবল গেটটার সামনে টিকিটম্যান ছোকড়াটা দুই হাত ছড়িয়ে দাঁড়াল, যাত্রাদলের সাচ্চা অভিনেতাদের মতো। তাকে ঘিরে রীতিমতো হাটবারের ম্যাজিশিয়ানদের আড়ং জমে গেছে। তার মধ্যে দাঁড়িয়ে সে ঘোষণা দিচ্ছে, টিকিট ছাড়া কাউকেই উঠতে দিবে না। দৃশ্যত তা কোনো সরকারি অফিস ঘেরাওয়ের আগের তাৎক্ষণিক ব্রিফিংয়ের মতো। যাত্রীদের মাঝে হুড়োহুড়ির উদ্যোম থিতিয়ে আসতে আসতে সময় লেগে গেল।
একটু শৃঙ্খলা আসতে আরো কিছুটা সময়। ইতোমধ্যে গাড়ির ওপাশে গিয়ে ড্রাইভারে সঙ্গে ভাব জমাতে চেষ্টা করছে কেউ কেউ। অগত্যা ড্রাইভারের পাশের সিংগাল দরজাটা সাট্ করে খুলেগেল। সবাই তখন টিকিটের অপেক্ষা ছেড়ে ছোট্ট গেটটা দিকে দৌড়ালো। ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দিল। অনপেক্ষ নেতার মতো পিছন পিছন টিকিটম্যান এই গেটেও হাজির হলো। উঠতে থাকা যাত্রাদের গা, আসলে তা কাঁধ, হাত ও জামা টেনে টিকিট কেটে নিতে বাধ্য করছিল। কেউ কেউ টিকিটম্যানকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছিল না। মাথা বা শরীরের অর্ধেকটা সেঁধিয়ে থাকা কোনো কোনো যাত্রী এলোপাতাড়ি কনুই, ঘুষি, কখনো কখনো লাথি চালিয়ে দিচ্ছিল বেসুমার। এমন একটা হাতের ঘুষি আমার চোয়াল বাঁচিয়ে চোখের কোঠায় এসে পড়লো। মহুর্তেই হিরোসিমা-নাকাসাকির বোমা বিষ্ফোরণের দৃশ্য অবলোকন করলাম। লোকটার অর্ধেকটা তখন গাড়ির ভেতরে প্রবেশ করানো, শুধু পিঠের ব্যাগে বেঁধে আছে। আস্ত একটা ব্যাঙ খেয়ে গর্তের মুখে আটকে থাকা সাপের মতো। লোকটাকে তাই দেখতে পেলাম না। পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার আগে যা দেখলাম-তার গায়ে জলপাই রঙের একটা গেঞ্জি, হয়তো টি-শার্ট হবে, পড়নে একটা জিন্সপ্যান্ট আর কাঁধে একটা ট্যুর ব্যগ। রাগে আমার গায়ে আগুন ধরে গেল।

গাড়িতে ওঠার পর ওই নচ্ছারটাকে প্রথমে খুঁজলাম। নিচের ডেকে দেখতে না পেয়ে হরহর করে ওপরের ডেকে চলে গেলাম। ওপরের ডেক তখনও হুড়োহুড়ি চলছে। বসার সিটগুলো ফিল-আপ হয়ে গেছে আগেই, কেউ কেউ ঠিক হয়ে বসছে-এই যা। মাঝখানের প্যাসেজটুকুতেও তখন মানুষ দাঁড়িয়ে পড়ছে। এখানেও বজ্জাতটাকে দেখলাম না। জানোয়ারটা হাওয়া হয়ে গেল নাকি-আমি ভাবি। যাত্রীগুলো স্থির হতেই, একজন সিট থেকে দাঁড়িয়ে বিসাদৃশ মুখে বললো, সে নামতে চায়। লোকটার দেখাদেখি আরেক জন, তারপর আরো একজন, এভাবে কয়েকজন নামতে চাইলো। এতোক্ষণ নামেননি কেন?- দাঁড়িয়ে থাকা একজন যাত্রীরা ধমকে উঠতেই জানালো, তারা উঠতে থাকা যাত্রীদের ভিড়ে নামতেই পারেনি। একজন নিজের মতো বললো, ‘শালা। বসে থেকে আমাদের ওপর প্রতিশোধ নিলো।’ যাক কয়েকটা সিট অন্তত ফাঁকা হলো, এ-ই কম কি! আমরা সিট রক্ষা আর তাদের নেমে যেতে দেয়ার একটা ব্যালেন্স করে সামান্য পাশ দিলাম। হাঠৎ দেখি সেই লোকটা, যে এখনো আমার চেহারায় বইয়ের প্রচ্ছদের মতো এ্যামবুশ করে রেখেছে। এসিট-ওসিট করতে শেষে আমার পাশে এসে হাজির। দীর্ঘ দেহী, পেটানো শরীর, জিম করে থাকবে। কাঁধের ওপর খোদাই ষাঢ়ের মতো কিছুটা চোঁচ ধরেছে মনে হলো। কোথাও এই শরীরের ব্যবহার আছে বলে মনে হয় না, এই প্রদর্শনী ছাড়া। ঘন চুলগুলো ছোট ছোট করে ছাটা, মাঝে স্পাইক। বামপাশে কাঁচি দিয়ে দু’টি বড় বড় দাগ কাটা। জুলফিটা দুইপাশ থেকে চিকন হতে হতে থুতনির নিচে এসে সঙ্গম করেছে। তাতে ধর্ম আর সংস্কৃতি, কিছুরই ছোঁয়া বোঝা যায় না। কালো সানগ্লাসটা খুলে টি-শার্টের গলার ভেতরে ঢুককিয়ে একটা ডাট বের করে রাখলো। এক চোখর ভ্রুর ওপর ব্রঞ্জের রিং পড়ানো। ডান হাতে একগোছা ব্রেসলেট। বাম হাতের কব্জিতে প্রামাণিক সাইজের হাল ফ্যাশনের ঘড়ি। তাতে কখনো সময়-টময় দেখে বলে মনে হয় না। হাত ভর্তি লোম। শরীরেরও বোধ করি কম যাবে না। হাতের লোমগুলো ঘড়ির ফিতার একটা অংশ ঢেকে ফেলেছে। আস্ত একটা বাইসন কোথাকার-আমি মনে মনে গালি দেই। লোকটা আমার দিকে তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে তাকায়। আমার চোখের বেহাল অবস্থা দেখাতে চাই না ওকে, তাই মুখ ঘুরিয়ে নেই। ইচ্ছে করছিল ওর মুখের ওপর একটা ঘুষি চড়িয়ে দেই। যাতে কাউকে আর মুখ দেখাতে না চায়। তারপর মনে হলো, ওর চোখের রিং-টা ধরে টান দিয়ে ছিড়ে ফেলি। মুখ লুকিয়ে রাখে যেন। রাগে আমার কলিজাটা গলায় উঠে এসে দপদপ করছে। দাঁড়িয়ে থাকার হ্যাপা ওর প্রতি আমার ক্ষোভ কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই সব ছেলেদের নিয়ে একটাই সমস্যা, ইতর প্রাণীদের মতো জোট বেঁধে থাকে। কিছু বললে, একটা ফোন করে পরের স্টেশন আমাকে নামিয়ে নেবে।

আমি অপেক্ষা করি আসাদগেট পৌঁছানোর, ওটা আমাদের এলাকা। আর কিছু না হোক, বনের পশুদের মতো শহরেও অভিজাত-অনভিজাত এলাকা ভেদ মেনে চলতে হয়। এখনো নিশ্চয়ই আমার গোটাকয় বন্ধু আসাদগেটে আড্ডা দিবে। আমি ওর গায়ে ক্রুব্ধ নিঃশ্বাস ফেলতে থাকি। কিন্তু আমার নিঃশ্বাস ওকে বিব্রত করে না। বরঞ্চ নিঃশ্বসের সঙ্গে উঠে আসছে ওর শরীরের পারফিউমের উৎকট গন্ধ। যা আমার গায়ের ঘামের গন্ধ সম্বন্ধে সচেতন করে দিচ্ছে। কোমরে হাত রাখলে, ওর হাতের কুনইটা আমার মুখের সামনে ওঠে আসে, মাঝে ভেঙে মাটি ছোঁয়া একটা বাঁশের মতো। আরেকটু হলে আমার মুখে লাগে আরকি। বেসুমার খিস্তি করি ওকে। আর অপেক্ষা করি আসাদগেট পৌঁছানোর। মনের ভেতর গড় গড় করতে থাকে প্রতিশোধের নানান চিন্তা।

গাড়িটাও গড় গড় করে ওঠে, এতোক্ষণ দাঁড়িয়েই ছিল! বেমালুম খেয়াল করা হয়নি। চাকা এক-দুইবার ওলটাতেই না ওলটাতেই আমার সামনে সিটের জানালার পাশের যাত্রী দাঁড়িয়ে পড়েন। বিব্রত মুখে বললেন, ভাই একটু নামতে দেন। কেন?-একজন তাঁতিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করেন। লোকটা তার পকেটগুলো হাতিয়ে-পাতিয়ে বলেন, ভীড়ের মধ্যে তার মানিব্যাগ খোঁয়া গেছে। আগে দেখেন নাই-অনুকম্পাহীন বিরক্তির স্বরে বলেন কেউ একজন। ভীত ইঁদুরের মতো কাঁপছে তার চোখ। কিছু না বলে পা ঠেলে, সর সর করে বেরিয়ে যেতে থাকেন তিনি। আমার চোখের সামনে খালি হয় একটা সিট। লোকটা কোনো মতে বেরিয়ে গেলে আমি তার সামনের সিটের হেডবার ধরে প্রবেশের চেষ্টা করি। অসভ্য শয়তানটা এখানেও হাত বাড়ায়। সিটের হেডবারটা শক্ত করে ধরে ওর পথ আগলে রাখি। ফোঁপাতে থাকি।

‘কি, কি হয়েছে?’-হুঁকার দিয়ে ওঠে লোকটা। একবার তাকিয়ে ধমকের স্বরে বলে, ‘কি, বসবেন?’

‘হ্যাঁ’-উত্তর দেই গম্ভীর স্বরে। নিজের সমত্ততা প্রকাশ করে বলে, ‘আমি এটা আগে বসতে গেছি।’

‘যদি আমি বসতে না দেই?’-চোখ ঠেড়ে আমাকে জিজ্ঞেস করে সে।

শুয়োরটা বলেটা কি! যদি না দেই! ও ভেবেছেটা কি! আমি কি সেই সাইকেল হারানো লোক? যে বলবো-আগেরবার সাইকেল চুরি যাওয়ার পর কাঁদতে কাঁদকে বাড়ি চলে গিয়েছিলাম, এবারও তাই করবো। যুদ্ধের নির্দিষ্ট কোনো উপত্যকা নেই। সারা বিশ্বের যে কোনো জায়গায় যে কোনো মুহুর্তে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে, এরজন্য প্রস্তুত থাকাই হলো অভ্যতার অগ্রগতি। আসাদ গেট এখনো যথেষ্ট দূরে। তাতে কি, আমি ওর চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করলাম। বললাম-‘পেটাবো।’

লোকটা আমার দিকে তাকায়, একেবারে জরিপ করে নিলো। খর্বকায় আমি। জীম করি না বটে, কিন্তু পেটা শরীর। যেকোনো মহুর্তে জ্বলে উঠতে পারি, এমন একটা সম্ভবনাময় ভাব চেহারায় সব সময় লুকিয়ে থাকে। সে পথ ছেড়ে দিয়ে বলে-‘বসুন।’

আমি কিছু না বলে চটপট বসে পরি। নিজেকে প্রশংসা করি-সাহস করে ঠিক জায়গায় ঠিক কথাটাই বলতে পেরেছি। আজকের দিনে এলাকা ভেদ যাই হোক, শহরে কেউ বাপ-দাদার পরিচয় নিয়ে আসে না, কব্জির জোড়ই আসল। বসার পর এক নিঃশ্বাসে অনেকটা বাতাস বের হয়ে গেল ভেতর থেকে। কলিজাটা যেন আসতে আসতে নিচে নেমে যাচ্ছে।

মানুষের মধ্যে এখন কি আর সেই ঐক্য আসে, যে বিপদে পড়লে এগিয়ে আসবে? কথাটাতো ছেলেটার ক্ষেত্রেও সত্য। আধুনিক ছেলে-পুলেদের মধ্যে কে আছে, চকের ইট কাঁধে তুলে নিবে, নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে যাবে? এসব ভেবেই হয়তো ও সিট-টা ছেড়ে দিয়েছে। কিংবা ও আমার মতো কোনো স্টেশনের অপেক্ষা করছে না তো?

সিটে বসার পর আমি ওর কোমড় সমান হয়ে গেলাম। প্যান্টের বাম পকেটে হাত ঢুকিয়ে কি যেন নাড়ছে ও, খুব করে কচলে যাচ্ছে। প্যান্টের চেইন বরাবর কিছু একটা উছলে ওঠেছে বারবার। আমি আসাদ গেটের অপেক্ষা করি। সেখানে আমার বন্ধুরা না থাক, অনেক লোকজন থাকবে নিশ্চয়ই।

গাড়ির ছাদে রোড-ডিভাডারের লাগনো গাছে ডালের বাড়ি লাগে। ছাদের ওপর দিয়ে গড় গড় করতে করতে পেরিয়ে যায়। এক ঘেয়ে ভাবে গড় গড় করে-ভেতরে, বাইরে। ০


লেখক পরিচিতি
অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। পদ্মার পাড় ঘেঁষে গ্রামের অবস্থান। গহীন গ্রাম। এখানে প্রধানত কলু, কাহার, জেলে, মুচি নিম্নবর্গে মানুষেরা বসত করে। প্রতিবছর পদ্মায় ভাঙে। অজস্র মানুষ স্বপ্নভাঙ্গা স্মৃতি নিয়ে শহরমুখী হয়। অধিকাংশ তরুণ জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমায় বিদেশে। এটাই যেন নিয়তি। এসবের ভেতরেও থাকে ঘটনা, নানা ঘটনা। এইসব জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। গুলতির বোবা রেখা তাক করে জঙ্গলে জঙ্গলে কেটেছে শৈশব। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত।


alatehasan@yahoo.com
 +৮৮ ০১৭১৪ ৭৮৪ ৩৮৫

1 টি মন্তব্য:

  1. শুয়োরটা বলেটা কি! দারুন একটা গল্প , সত্যি কথা বলতে আপনার সব গল্পের মধ্যে একটা অন্য ধরনের সাধ থেকে , কখনও মিঠা ,কখন ও তিতা ।

    উত্তরমুছুন