শুক্রবার, ১০ অক্টোবর, ২০১৪

গল্পের দৃষ্টিকোণ : কথক বদলে গেলে আখ্যান বদলে যায়

সাজেদা হক

গল্প লেখার জন্য গল্পকারের তীক্ষ্ণ চোখ থাকতে হয়। একটি ঘটনাকে নানাজনে নানা চোখে দেখেন। নানাভাবে বোঝেন। নানা কোণ থেকে আলো ফেলে বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেন। একে ভিউ পয়েন্ট বলে। এই ভিউ পয়েন্টের কারণেই একটি পুরনো আখ্যানও নতুন হয়ে ওঠে। কেউ কেউ একে গল্পের পারসপেকটিভও বলে থাকেন। ধরা যাক-- একটি লোক রাস্তার পড়ে আছে। কেউ দেখেন--লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কারো চোখে হয়তো লোকটি গাড়ির আঘাত পেয়েছে-- এক্সিডেন্ট করেছে। কেউ হয়তো ধরে নেন কোনো দস্যু তাকে মেরে ফেলে গেছে। অন্য কারো চোখে হয়তো লোকটি নির্জন পথে শুয়ে পড়ে পথচারীদের ধোঁকা দিচ্ছে। তার কাছে কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে এলেই লাফিয়ে উঠে ছুরি ধরে ছিনতাই করতে চাইবে। অথবা লোকটি হয়তো রাস্তার ইঞ্জিনিয়ার। মেরামতি কাজের কোনো মেজারমেন্ট করে নিচ্ছে। কেউ বা ফান করছে। এই রকমভাবে একটি ঘটনা দৃষ্টি-কোণ ভেদে বদলে যায়। সত্যের নতুন উন্মোচন ঘটে। এই উন্মোচনই গল্পকারের শক্তি।
গল্পে কথকের মুখে এই দৃষ্টি-কোণ থেকে গল্পটির আখ্যান বর্ণিত হয়।

চার প্রকারের দৃষ্টি ভঙ্গী রয়েছে।

১. উত্তম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ
২. মধ্যম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ
৩. নাম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ
৪. ঈশ্বরিক দৃষ্টি-কোণ


১. উত্তম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ

সাধারণ আমরা যেসব গল্প পড়ি, তার অধিকাংশেরই বর্ণনায় ব্যবহার করা হয় আমি বা আমরা শব্দটি। তার মানে হলো গল্প বা উপন্যাসটি উত্তম পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হয়েছে। ব্যাকরণে পুরুষের সংগা এভাবে দেয়া আছে যে, বিশেষ্য, সর্বনাম ও ক্রিয়াপদের পুরুষভেদে ভিন্ন রূপ দেখা যায়। বিশেষণ ও অব্যয় পদের কোন পুরুষভেদ নেই। পুরুষ ৩ প্রকার। উত্তম পুরুষ, মধ্যম পুরুষ ও নামপুরুষ।

বাক্যের বক্তাই হলো উত্তম পুরুষ। অর্থাৎ, যেই ব্যক্তি বাক্যটি বলছে, সেই উত্তম পুরুষ।উত্তম পুরুষের সর্বনামের রূপ হলো- আমি, আমরা, আমাকে, আমাদের, ইত্যাদি।

উদাহরণ: তখনও খালি একটি কক্ষে আমি। মনে হচ্ছিলো গির্জার ঘণ্টা বাজাচ্ছে একটি দৈত্য। সেই শব্দ যেনো বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিলো মাথার মধ্যে। শব্দটা এতোটাই জোড়ালো যে আমার মাথা বনবন করে ঘুরছে। আমি বার বার চেষ্টা করছি। সেই শব্দে পেটও মোচড় দিয়ে উঠছে। ভয়ংকর এ শব্দ এড়াতে মাথায় বালিশ চেপে ধরছি আমি!

এমন গল্পের প্রত্যেকটি শব্দই হচ্ছে উত্তম পুরুষে। অর্থাত বাক্যের বক্তাই বর্ননা করছে সবকিছু। গল্প বর্ণনার এটাও একটি ধরণ। এভাবে বা এমন স্টাইলো পছন্দ করতে পারেন অনেকেই। হয়তো কাহিনীর প্রধান চরিত্রও হতে পারে এটি। আপনার প্রধান চরিত্র যতি বলতে, দেখতে, শুনতে, স্পর্শ করতে না পারে, গন্ধ, স্বাদ, চিন্তা, অনুভব করতে না পারে, তাহলে কিভাবে পাঠককে আপনার কাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত করবেন?

যদি আপনি পাঠকের সাথে অন্য একটি চরিত্রের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চান তাহলে অবশ্যই আপনাকে এমন শব্দ ব্যবহার করতে হবে বা এমন পর্যবেক্ষনের বর্ননা দিতে হবে যার মাধ্যমে আপনি আপনার পাঠককে কাঙ্খিত কথাটি বোঝাতে বা বলতে বা জানাতে পারবেন। শুধু মনে রাখতে হবে যে উত্তম পুরুষ কখনই যা বলা হয়নি তা জানবেন না। অন্যের চিন্তুা বা অন্য চরিত্রের অনুভূতি সম্পর্কেও কিছুই জানবেন না উত্তম পুরুষ।

উত্তম পুরুষে লেখাকেই সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেন পাঠকেরা। এতে অনেকটা ঘনিষ্ট হয়ে পড়েন পাঠক এবং কল্পিত চরিত্রটি। পাঠক এমন চরিত্রকে সবচেয়ে আপন ভাবতে শুরু করেন। বিশ্বাস করতে শুরু করে, এটি আসলে তার নিজেরই গল্প। পাঠক তখন নিজেই গল্পের একটি চরিত্র হয়ে উঠেন। উত্তম পুরুষই পাঠক ও লেখকের সেতুবন্ধনটা তৈরি করে দেন শুরুতেই।

শুধু কি তাই! উত্তম পুরুষে লেখা শুরু করে পাঠক গল্পের প্রধান চরিত্রকেও নির্মাণ করতে পারেন। তবে হ্যা, নতুন লেখকদের জন্য এটি অবশ্যই একটি চ্যালেঞ্জ। কারণ একই সাথে লেখককে গল্পের চরিত্র এবং তার নিজের চাওয়াকে নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। তিনি আসলে পাঠককে কি দিতে চান, আর তার চরিত্রই বা কি করবেন? সবই তাকে একসাথে চিন্তা করে লিখতে হয়। সুতরাং তা একটি চ্যালেঞ্জ ই বটে!

কিন্তু উত্তম পুরুষ ব্যবহারের প্রধান সমস্যা হলো যে চরিত্রটি নিজেই সব করতে বা বলতে বা বর্ণনা করতে চায়। আর চরিত্রের এমন আকাঙ্খাকে দমন করা খুবই জটিল একটি সমস্যা। এটা ৫০ হাজারের বেশি শব্দে লেখা কাহিনী বা উপন্যাসের জন্য সত্যিই একটি ভীতিকর, হতাশাজনক পরিস্থিতি। শুরুতেই এ থেকে বের হয়ে আসতে না পারলে কাহিনীর অন্য প্রান্তে বড় ধরণের সমস্যায় পড়তে পাড়েন লেখকও, পাঠকও। পড়তে বসে একঘেয়েমিতে ভূগতে পারে পাঠক। সুতরাং, সময় থাকতে সাধু সাবধান।

তবে, যতই চ্যালেঞ্জিং হোক না কেন, একজন লেখক হিসাবে আপনার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক এবং আপনার গল্পের জন্য সবচেয়ে কার্যকর হচ্ছে উত্তম পুরুষে লেখার চেষ্টা করা। আসুন কিভাবে তা সম্ভব তা নিয়ে কিছুটা আলাপ করা যাক:

বিবেচ্য বিষয়:
উত্তম পুরুষে লেখার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো যে চরিত্রটির ভাবনার একটি সীমাবদ্ধতা আছে। পাঠকের উপর এর প্রভাবও প্রমাণিত।

মনে রাখতে হবে:
উত্তম পুরুষে লেখা কথাসাহিত্যই সবচেয়ে সহজপাঠ্য। আসুন কিছু নিয়ম জানি:

= সাধারণত নতুন আর ভিন্নকিছু পছন্দ করেন তরুণ পাঠকরা। তারা লেখার ধরণেও ভিন্নতা করেন। বিশেষ করে ১২ বছর বয়স্ক কিংবা তদুর্ধো পাঠকরাই ব্যতিক্রমী গল্প, নতুন গল্প বা উপন্যাস পাঠের সবচেয়ে বড় বাজার। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, তারা বেশ উদার। যেকোনো কিছু সহজেই গ্রহণ করার মানসিকতা রাখেন তারা। সেটা হতে পারে ছোটগল্প, সাহিত্যপোন্যাস, মুলধারার গল্প কিংবা যেকোনো কিছুই সহজেই গ্রহণ করার মানসিকতা রাখেন এইসব তরুণ পাঠক। সুতরাং একজন লেখক হিসেবে পাঠকের এ উদারতা কিংবা দুর্বলতার সুযোগ নিতেই পারেন!

যা মনে রাখতে হবে:
উত্তম পুরুষে গল্প লেখা শুরু করলে তা উত্তম পুরুষেই শেষ করতে হবে। মনে রাখবেন, সেই গল্পের বা উপন্যাসের বর্ণনা করছে, লেখক নয়। অর্থাত লেখক যখন উত্তম পুরুষে লেখা শুরু করলেন, তো সেই চরিত্রটি যা করবেন তার বাইরে লেখকও কিছু বলতে পারবেন না। যেমন ধরেন : আপনি একটি একটি চরিত্র তৈরি করলেন, যিনি গোটা ঘটনার বর্ননা করছেন। কিন্তু হঠাত করেই আপনার গল্পেরই অন্য একটি চরিত্র গল্পের বর্ননা করতে শুরু করলো!! এমনটা করা পাঠকের জন্য স্বাস্থ্যকর হবে না।

= উক্তি এমন হওয়া উচিত, যা চরিত্রের মধ্যেই থাকবে এবং সাংস্কৃতিক, সামাজিক, শিক্ষা ও আঞ্চলিক পটভূমি সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

= অনন্য এবং বিরক্তিকর’এর মধ্যে সুক্ষ একটি লাইন আছে। যা শুদ্ধতার সংগে বর্তমান আবেশকেও যুক্ত করে। একটি সম্পূর্ণ উপন্যাস একই ধাচে লেখার চেষ্টা করা যেতে পারে।

= সঠিক শব্দ পছন্দ করা একজন লেখকের সবচেয়ে বড় গুণ।একজন সৃজনশীল লেখকের জন্য শব্দ পচন্দ করাটাও একটি বড় সুযোগ।

= চরিত্র কেবল উক্তি বা সংলাপেই বিকশিত হয় না। কখনও কখনও চরিত্রের বর্ণনাও চরিত্র গঠন করে। আবেগী পরিস্থিতি বর্ননার সময় খুব সতর্কতার সাথে দৃষ্টিভংগি ব্যবহার করতে হবে। প্রতিক্রিয়া আর দৃষ্টিভংগি যেনো কোনমতেই এক না হয়ে যায়।

= বলেবন না, দেখাবেন। বর্ননা এমনভাবে করুন, যেন পাঠক পড়তে পড়তে দেখতে পান। যেন কোনভাবেই পাঠক মনে না করেন যে আপনি গল্পটি বলছেন।

ফলাফল:
কেউ উত্তম পুরুষে কাহিনীর প্রধান চরিত্র নির্মাণের কারণ কি ভেবে দেখেছেন কখনও?

উত্তম পুরুষে তৈরি যেকোন চরিত্র শুরুতেই পাঠকের সাথে ঘনিষ্টতা তৈরি করে।চরিত্রের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যের কারনেই পাঠক নিজেই ওই চরিত্রের সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। তরুণ পাঠকদের ক্ষেত্রে এটা আরো বেশি কমিউনিকেটিভ। তার আসলে গল্পের ভিতরেই ঢুকে যান। নিজেকে ওই চরিত্র মনে করতে শুরু করেন। অনেক সময় ভীষণ আকর্ষনীয় প্লটের চরিত্র নির্মাণ করার সম্ভাববনাও তৈরি হয় এভাবে।

এটা পাঠককে গল্প, কাহিনী বা উপন্যাস‌কে ’সরাসরি’ উপভোগ করতে সাহায্য করে।

শৈলী ও প্রকারভেদ:
তাই আপনি কি এখন উত্তম পুরুষে গল্পটি লিখতে আগ্রহী? আপনি এটি দিয়ে অনেক মজা করতে পারেন। এমন লেখার ক্ষেত্রে এমন অনেক তারতম্য আছে, যা আপনি ব্যবহার করে আপনি আপনার গল্প,কাহিনী বা উপন্যাসকে স্বতন্ত্র এবং অনন্য করে তুলতে পারেন।

= কিছু কিছু উপন্যাসে খেয়াল করবেন (বিশেষ করে গোয়েন্দা উপন্যাস) ঘটনা বা চরিত্রের বর্ননা আছে উত্তম পুরুষে কিন্তু উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের বাইরেও কোন কোন দৃশ্য, বা দৃশ্যের বর্ননা দেয়া হয়েছে নাম পুরুষে। এমন পদ্ধতিও আপনি আপনার উপন্যাসে যোগ করতে পারেন। এটি আপনার পাঠককে আরো আগ্রহী করে তুলতে পারে।

= জাপানিজ ছবি ‘রশোমন’-এর কথা মনে আছে কারো? না মনে থাকলে আবারো মনে করিয়ে দেই...মিলিয়ে নেবেন। ছবির কাহিনী গড়ে উঠেছে একই ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনাকে কেন্দ্র করে। ছবিতে চারটি চরিত্র, নিজ নিজ দৃষ্টিকোণ থেকে একই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন বর্ননা দিয়েছেন। শুধু মনে রাখতে হবে, প্রতিবারই আপনি পাঠককে নতুন তথ্য দিচ্ছেন। পুনরাবৃত্তি বিরক্তিকর হতে পারে পাঠকের জন্য। এটা বাস্তবতা ভিন্ন দৃষ্টিকোণের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেখতে পারেন। আর আপনার এ চেষ্টায় পুলক বোধ করতে পারেন পাঠক ও লেখক। সম্প্রতি এমন আরো একটি ছবি নির্মিত হয়েছে ‌’রেড ভায়োলিন’। এছবিটিও দেখার তালিকায় রাখতে পারেন।

= অনুক্রমিক একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে গল্প লেখাটাই সাধারণ শৈলী বা নিয়ম। আপনি এটিকে পাঠের সুবিধার্থে আরো চরিত্রের মাধ্যমে, ঘটনার বর্ণনার মাধ্যমে আপনার উপন্যাসটিকে বিস্তৃত করতে পারেন। ফকনার সাধারণত এই শৈলী ব্যবহার করতেন। তার উদাহল হতে পারে ফকনারের অনবদ্য সৃষ্টি ‌’অ্যাজ আই লে ডায়িং’ উপন্যাসটি। ১৫টি চরিত্রের মাধ্যমে যেভাবে একজন মৃত ব্যক্তির জবানিতে উপন্যাসটিকে উপস্থাপন করেছেন, তা সত্যিই অন্যবদ্য। সংগ্রহে থাকলে এমন উপন্যাস আরো পড়ুন। আর সংগ্রহে না থাকলে সেটি জোগাড় করে পড়ুন। দেখবেন আপনার চিন্তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে।

= পৃথক একাধিক মত তৈরি করুণ উপন্যাসে। উপন্যাসে একের সাথে অন্যের কোনো সারসরি কোনো মিল থাকবে না কিন্তু পরোক্ষভাবে আপনার উপন্যাসের উপসংহারকে সমৃদ্ধ করবে। এর উদাহরণ হিসেবে উইলিয়াম ফকনারের আরো একটি অনন্য সৃষ্টি ‌’দ্য সাউন্ড এন্ড দ্য ফিউরি’-এর কথা বলতেই হয়। পড়েছেন বইটি, না পড়লে এখনি পড়া শুরু করুন!

= উত্তম পুরুষে লেখার আরো একটি মজাদার দিক হলো যে আপনি চরিত্রটিকে নিয়ে খেলতে পারেন। কখনও চরিত্রটি খেয়ালী, কখনওবা বায়ৃগ্রস্ত, কখনওবা বিরক্তিকর আবার কখনওবা ভীষণ আনন্দদায়ক কিছু। সুতরাং, কি ভাবছেন, লিখতে বসে পড়ুন।

২. মধ্যম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ

আপনি মধ্যম পুরুষ ব্যবহার করেও একটি গল্প লিখতে পারেন। এই দৃষ্টিকোণ ব্যবহার করে, আপনি পাঠকের কাছে সব তথ্য উপস্থাপন করতে পারেন এবং তাকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারেন।

উদাহরণ: 
"আপনি আপনার চোখ খুলুন এবং দেখুন মধ্যগগণে জ্বলজ্বল করছে সূর্য। আপনি পুরো সকাল জুড়েই ঘুমিয়ে আছেন, হাটু জুড়ে ভরে আছে গরম বালুতে। তপ্ত বালু, উত্তাপ ছড়ানো সূর্য জানান দিচ্ছে রাতও ঘনিয়ে এলো বলে!!

কথাসাহিত্যে মধ্যম পুরুষের ব্যবহার খুব সামান্য। ‌ছিু দিক নির্দেশনামূলক বই যেমন ‌খুজে নিন নিজের দু:সাহসিকতা’ কিংবা বিকারগ্রস্থ মনকে শান্ত করার উপায়’- টাইপের বইয়ে মধ্যম পুরুষের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু এটা আত্মজীবনীমূলক কিংবা ভ্রমণ বিষয়ক লেখার জন্য একটি উপযুক্ত মাধ্যম।

এটা প্রায়ই শোনা যায় যে, কথাসাহিত্যে মধ্যম পুরুষের ব্যবহার ঠিক ততটা জনপ্রিয় নয়, যতটা উত্তম পুরুষে জনপ্রিয়। কারণ মধ্যম পুরুষের ব্যবহারে কখনও কখনও আপনার পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারে। বার বার যদি বলা হয় যে, আপনি মনে রাখবেন....তাহলে একধরণের বিরক্তির সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করেন অনেক গুণীজনেরা।

বিবেচ্য বিষয়:
মধ্যম পুরুষে লেখা সাহিত্যের সংখ্যা অনেক কম। এটা করতে পারাটা আসলেই কঠিন এবং ব্যতিক্রমী তো বটেই। কিন্তু কথা সাহিত্যে এমন অনেক স্থান আছে যেখানে আপনি মধ্যম পুরুষের ব্যবহার করতে পারেন অনায়াসেই।

যেমন:

= মধ্যমপুরুষে লিখুন রহস্য বা রোমাঞ্চকর অনূভূতিমূলক বই।

= ভিডিও গেম বর্ননা করুন মধ্যম পুরুষের ব্যবহার করে।

= মধ্যম পুরুষের ব্যবহার করে লিখতে পারেন স্ব-সহায়তামূলক বই।

= লিখতে পারেন ভ্রমণ নিবন্ধ বা কাহিনী।


মনে রাখবেন:
প্রায়ই লেখক গল্পের মাঝখানে অপ্রত্যাশিতভাবে শ্রোতা বা পাঠকের সাথে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করেন। এর মাধ্যম হিসেবে মধ্যম পুরুষকে ব্যবহার করেন। এমনটা করা উপন্যাসের জন্য মোটেও স্বাস্থ্যকর নয়, বরং ঝুকিপূর্ণ। যদি পাঠককে কোনো কিছু মনে করিয়ে দিতে হয়, কেবল তখনি এটি ব্যবহার করতে পারেন। তাও অতি সতর্কতার নাথে, নচেত নয়।

আপনি পাঠকের মনে একটি ধারণা তৈরি করতে চান, সেটি আপনাকে করতে হবে অনেক সতর্কথার সাথে। সম্প্রতি একজন শিক্ষার্থী, তার ‘ওয়ান্ডার র্ইয়ারস’ বইয়ের প্রথম অধ্যায়েই একটি প্রাগৌতিহাসিব জুতা দেখার জন্য বাধ্য করেছে। এবং শুনে অবাক হবেন যে, শিক্ষার্থীটি সফল হয়েছেন। তার এই কশল কাজে লেগেছে। পাঠকরা বিরক্ত তো হনই নি...বরং বইটি পেয়েছে অনন্য হওয়ার বিরল পুরস্কার। তাই সব কিছুর হিসেব আগে থেকেই মেলানো ভীষন কঠিন। কখন কি হয়ে যায়, তা কি কেউ আগে থেকে বলতে পারে?



৩. নাম পুরুষের দৃষ্টি-কোণ

গল্প, উপন্যাস কিংবা কল্পকাহিনীতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ও পাঠকপ্রিয় মাধ্যম হলো ‌’নাম পুরুষ’। ‌‌’সে করেছে বা তিনি করেছেন’ সর্বনাম ব্যবহার করে লেখা হয়েছে বহু উপন্যাস।

উদাহরণ: 
তারা চার্লিকে এমন একটি পরিস্থিতে ফেলে দিলো, তাতে এক ধরণের উত্তেজনা কাজ করছে জেকের ভিতরে-নাকি ভয়? চার্লি সোফি’র একটি হাত ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু সে খুব জোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। তিনি তার দাদুকে দেখাশোনা করবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন খানিকটা অপরাধবোধ তাকে আকড়ে ধরলো। সে মনে করলো দাদু’র জন্য অন্তত একটা নোট ছেড়ে যাওয়া উচিত? এটা তাকে আরো বেশি চিন্তিত করার জন্য নয় বরং তাকে জানান দেয়া যে, তিনি ভালো আছেন। সবাই যখন জগাখিচুড়ি চিন্তায় আচ্ছন্ন, জেক তখন অপেক্ষা করছিল। কারণ জেক নিজেই নিজেকে কথা দিয়েছিলো, জীবদ্দশাতে সে তার দাদুকে হারাতে দেবে না। সোফিকে নিরাপদে বাড়িতে পৌছে দেয়াও তারই দায়িত্ব।

থার্ড পার্সনে যে কোনো চরিত্র দেখার বা লেখার অনেক তারতম্য আছে।

বিবেচ্য বিষয়:
নাম পুরুষে লেখা কথাসাহিত্য পছন্দ করেন সবাই। হোক সে তরুণ, যুবা বা বয়োবৃদ্ধ। কারণ যোগাযোগের জন্য আমাদের সবচেয়ে প্রিয় মাধ্যম এটা। আমরা সাধারণত একে অন্যের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও একই পুরুষ ব্যভহার করে থাকি, হয়তো সে কারণে এটি সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মাধ্যম। পাঠক-লেখকের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনকারী সবচেয়ে সহজ ও গ্রহণযোগ্য এবং বহুল ব্যবহৃত উপায়।

উপকারিতা :
আপনি আপনার গল্প বলতে দুই বা তার বেশি চরিত্রকে নির্বাচন করতে পারেন। তাতে আপনি এবঙ আপনার দুজনেই একটু সুযোগ পারেন বিভিন্ন ধরনের তথ্য যোগ করার। যোগ করতে পারবেন ভিন্ন ভিন্ন অনুভূতি আর অভিজ্ঞতা। কিংবা স্বপ্ন দেখতে পারবেন আপনার ইচ্ছামতো, যা আপনি আপনার চরিত্রকে ব্যভহার করে তুলে ধরতে পারবেন পাঠকের সামনে।

এটাই সাহিত্যে সবচেয়ে সাধারণভাবে স্বীকৃত দৃষ্টিকোণ। যদিও আপনার লেখা বিক্রি করত, আপনার লেখন শৈলীকে জনপ্রিয় করতে আপনার কথাসাহিত্যকে অনেক বেশি সহজ করে তোলে তাতে ‘‌নাম পুরুষের’ ব্যবহার। সত্যিই তাই, আমি, তুমি, সে বিবেচনাকে মাথায় রেখে যদি আপনি আপনার কথাসাহিত্যকে পাঠক উপযোগী করতে চান, তাহলে আপনি লেখক হিসেবে সঠিক পথেই এগুচ্ছেন।



৪. ঈশ্বরিক দৃষ্টি-কোণ

মূলত, সর্বজ্ঞ দৃষ্টি বলতে এখানে ঈশ্বরীয় দৃষ্টিকোন বা সর্বশক্তিমানের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা বা লেখা সাহিত্যিক বিবরনকে বোঝানো হয়েছে। আরো পরিস্কার করে বোঝাতে গেলে বলতে হয় যে, আপনি একটি চরিত্রের ভবিষ্যত বলতে চান ঈশ্বরিক একটি বানী দিয়ে। যেমন: রহিম রুপবান.কথা সাহিত্যে আমরা দেখতে পাই, রহিমের বাবাকে এক দরবেশ বলছেন, ‌’তুই যদি তোর ১২ দিনের পুত্রকে ১২ বছর বয়সী কোন কন্যার সাথে বিবাহ না দিস, তাহলে তুইতোর সন্তানকে হারাবি।‘

বহুবছর এটাই ছিলো কথাসাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখন পদ্ধতি। কিন্তু যতই দিন বদলেছে, ততই বদলেছে লেখকের চিন্তা-ধারা, বদলেছে পাঠকের রুচিও। এভাবে গল্প বলার পদ্ধতির জনপ্রিয়তা এখন কমেছে বলা যায়। তারপরও কোনো লেখক যে এভাবে লেখেন না, তা নয়। উদাহরণ হিসেবে সাহিত্যিক জোসেফ কনরার্ড এর নাম নেয়া যেতে পারে। এখনও বেশ দাপটের সাথে সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোন ব্যবহার করেন তার কথাসাহিত্যে এবং সেগুলি এখনও সমান জনপ্রিয়তা পায়। বর্তমানে সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণের মাস্টার বলা হয় জোসেফ কনরাডকে।

সমস্যা হলো প্রত্যেকটা চরিত্রের একটা লক্ষ্য থাকবে। যেনো পাঠক মিলিয়ে নিতে পারে, কোনটার পরিণতি কোনদিকে গড়াচ্ছে। এটাই একটা আদর্শ সাহিত্যের সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক, স্বতন্ত্র দিক। আসলে ভুল তথ্য দিয়ে পাঠককে আগ্রহী করে তোলা তো কঠিন। তাই তথ্য অবশ্যই যোগ করতে হবে। তাও লেখকের ইচ্ছামতোই। সেজন্য কৌশল অবলম্বন করতে হবে, যাতে পাঠক অতি আগ্রহের সাথে লেখকের তথ্যের সাথে মিশে যেতে পারে।লেখক হিসেবে পাঠককে চমক দেয়ার অধিকারতো আপনার আছেই। সেটাই না হয় ব্যবহার করেন!





লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন