বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০১৪

অলাত এহ্সানের গল্প ও গল্প লেখার গল্প : কান্নার শব্দ শোনা যায়, যায় না

প্রথমে গল্পটি পড়ুন। তার নিচে পড়ুন গল্পটি লেখার গল্প।

রাত সাড়ে এগারটায় বাস থেকে নামার পরও কামালের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। সে জিজ্ঞেস করে, ‘কি রে মাঙ্গের পো, এ্যাত্ দিন পর বাড়ি আইলি নি?’ কামাল আমাকে ‘মাঙ্গের পো’ বললো, মা-বাবা তুলে গালি দিল, আমি বুঝি। কেউ কারো মা-বাবা তুলে গালি দেয় কেন? তারা তো শ্রদ্ধার, ভালোবাসার। এসবের সাতে নেই পাঁচেও নেই। তাহলে? আসলে বাবা-মা সবারই আপনজন। তাদের গালি দিলে আঘাত খুব বেশি লাগে। মানুষ সেই ভালোবাসা, সেই অনুভূতিতে আঘাত করতে চায়। তাই মা-বাবা তুলে গালি দেয়। গালি বিষয়ে এ বিদ্যে আমার আছে। কিন্তু এখানে, গালির একটা অদ্ভুত সমাদর আছে। আন্তরিকতা বসত গালি দেয়। সম্পর্কে জেরে বা রিশতায় যত ঘনিষ্ট, গালির জোস তত বেশি। কামালের সঙ্গে আমার যে রিশতা-আন্তরিকতা, সে মাত্রায় বলি না। আমার বর্তমান অবস্থার কারণেই একটু শালীন ভাবে বলি, ‘কি রে শালার ব্যাটা, এ্যাহন তুরি ইস্ট্যানে কি করস?’

কামাল আমাদের গ্রামেই ছেলে। গ্রামের পশ্চিমে, রাস্তা লাগোয়া ওদের বাড়ি। বাড়ির সঙ্গে মস্তবড় পুকুর, দীঘিও বলা যায়। একসময় সেখানে পাকা সেতু ছিল। তার উপর আমরা খেলাধুলা করতাম। বর্ষায় তার নীচ দিয়ে স্রোত যেত। পদ্মা থেকে আসা পানি আমাদের চকে যাওয়ার সেটা একমাত্র পথ। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্রোতও বাড়তো। পুলের নিচে হুঙ্কার দিয়ে পানি ছুটতো। পানিতে পানিতে সে কি হুড়োহুড়ি! ঠিক যেন স্কুলে ছুটির ঘন্টা পড়েছে। তখন ব্রিজের ওপর দাঁড়াতেই ভয় হতো। বড় বড় ঢেউ উঠতো। পানিতে ঘূর্ণি হতো। এক ছোপা কচুরিপানা সেই ঘূর্ণি জলে পড়লে তলকরে নিয়ে যেত, অনেকক্ষণ পর ভোঁস করে ভেসে উঠতো, ক্ষত-বিক্ষত। এক সকালে সবাই দেখে, সেতুটা নেই। রাস্তার অনেকটা নিয়ে আগের রাতে ভেঙে পড়েছে। বিশাল একটা দীঘি তৈরি হয়েছে সেখানে। গ্রীষ্মকালেও সেখানে এক লগি পানি থাকে। আমরা তাকে বলি কুম। পনের-ষোল বছর হবে, কুমের কাছে বাড়ি করেছে কামালরা। রিস্তায় মামা। তবে রক্তের নয়। ওর বাবা ইয়াকুব বুড়ো খুব রসিক মানুষ। কুমে গোসল করতে গিয়ে দাওয়ায় বসে তার সঙ্গে অনেক কথা হতো। তার কাছে শুনেছি, আমার নানার বিস্তর জমিজমা ছিল। তিনি আমার নানা বাড়িতে কাজ করতেন। সেটা পদ্মার ভাঙ্গনে পশ্চিমের পর পর পাঁচটা ইউনিয়ন বিলিন হওয়ার আগের কথা। ইয়াকুব বুড়ো আমার নানাকে মিয়া ভাই বলতেন। আমার মাকে বলতেন-ভাতিজী। সেই হিসেবে তাকে আমরা নানা বলি। কামাল তাই মামা হয়। তবে কোনোদিন ওকে মামা বলিনি। বয়সে একটু বড় হলেও কামাল বলেছি। রিশতা যা, ওই বকাবজ্জিতেই টের পাওয়া যায়। বিশেষ লেখাপড়া করেনি ও। বিয়ে করে বাস স্ট্যান্ডে হালিম-চটপটি বিক্রি করে। আজ হাটবার ছিল। তাই দোকান গোছাতে গোছাতে দেরি হয়েগেছে। আমি লেখাপড়া শেষ করে ঢাকায় একটা চাকুরি করি। এ তো সত্যি, ইদানিং খুব বেশি বাড়ি আসা হয় না। ‘কি রে’ আমি পুনরায় কামালের দৃষ্টি আকর্ষণ করি, ‘বাড়ি যাবি ন্যা? তর মায় কানব্যা লাগছে, পুলা আসে না ক্যা, এই জোন্যে।’

‘না’-পাম্প চুলার ওপর থেকে হালিমের খালি ডেগচিটা নামাতে নামাতে উত্তর দেয় কামাল-‘আইজক্যা বাড়ি যামু না, তর মাইর কাছে থাকুম। পুলা আসপো হুইন্যা আমারে দ্যা মাছ কিনায়ছে, এ্যাহোন খাওন লাগবো না?’

-‘তাইলে এ্যাহোন তুরি বাজারে রইছা ক্যা? আয় বাড়ি যাই। মায় তরে নিয়্যা যাইব্যার কইছে।’ কাঁধে ব্যাগটা ঠিক করতে করতে আমি বলি।

-‘তুই যা, দুকান গুছাইতে দেরি ওইবো। কাম না করলে পুলারে খাওয়ামু কি?’ তখন পর্যন্ত ধিক ধিক করে জ্বলতে থাকা চুলার আগুন নেভাতে নেভাতে বলে কামাল। আমি এ কথার অপেক্ষায় ছিলাম না। পা বাড়িয়েছি ইতোমধ্যে। কামাল আবার ডাকে-‘এ্যাকলা যাইব্যার পারবি নি? আবার ডরাবি ন্যা তো? তাইলে খাড়া, এই-গুন্যা খালি গুছাইয়্যা, বাদশা’র দুকানে আইজক্যার ট্যাকাডা বুঝাই দিমু। তারপর এক সাতে যামানি?’

এমনিতে ভুত-প্রেতে বিশ্বাস নেই আমার। তাছাড়া কিছুদিন আগেও, দিন নেই-রাত নেই, বাজারে পড়ে থেকেছি। অনেক রাত শুধু আড্ডা দিয়ে কাটিয়েছি। গরুর হাটে স্তুপ করে রাখা স’ মিলের গাছ, শহীদের মুদি দোকানের ফেলে রাখা বেঞ্চ, কুমপাড়ের ডুমুর গাছের ছায়াময় অন্ধকারে-শুকতারা বিলিন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত আড্ডা দিয়েছি। তাহলে ভয় কিসের? কামালের কথায় আন্তরিকতা থাকলেও আমার কোথায় যেন একটু বাধে। গলার স্বর একটু চড়িয়ে বলি-‘ব্যাটা দুই দিনকর বৈরাগী ভাতেরে কও অন্ন। তরে বাজার চিনাইলামই আমরা, আর আমারেই কস...। জুসনা রাইত আছে। সমস্যা ওইবো না, যাই গ্যা।’ কথাগুলো বলতে বলতে বিশ্বজিতের দোকানের আড়ালে চলে গেছি। তাই শেষের কথাটা একটু জোড়ের সঙ্গে বলি, যেন ও শুনতে পায়।

রাস্তাটা পিচ ঢালাই হবে। রাস্তা খুঁড়ে বালু ফেলা হয়েছে। দুই পাশের গাছের সারি। চাঁদের আলোয় মাঝখানে পথটা মনে হয় একটা চীনা-মাটির থালার কান্দা। বাজার থেকে মাত্র ৫-৭ মিনিটের পথ আমার বাড়ি। আমি হাঁটি। শরতের পরিষ্কার আকাশ। পুয়াতি মহিলাদের পেটের মতো ভরে ওঠেছে চাঁদ। এই চাঁদের দিকে তাকিয়ে যে কোনো বিস্মৃত মুখের কথা কল্পনা করা যায়। দেখতে দেখতে আমার যেন নেশা পেয়ে বসেছে। এক পসলা বৃষ্টির শীতলতায় বাসে খানিকটা খুমিয়ে ছিলাম হয়তোবা। জানালা দিয়ে আসা সিরসিরে বাতাস মাথায় লেগেছে। রাত ভর কুয়াশা ভেজা মাথার মতো ভার হয়ে আছে। সাদা বালুর ওপর ড্রেজারের লোহার পাইপ, মনে হচ্ছে অজগরের কালচে পিঠ। কোথাও বালুর স্তুপের পাশে, খানিকটা গর্ত খুঁড়ে, মটকা মেরে শুয়ে আছে নেড়ি কুকুর। কুতকুতে চোখে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে। কিছুই বলছে না আজ। সঙ্গম নিরত কুকুর-কুকুরি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে আস্ত বেকুবের মতো। এপাশ-ওপাশ মুখ ঘুরাচ্ছে। আর কখনো কখনো পায়ু সন্ধির দিকে মুখ ঘুরিয়ে দাঁত খিচুনি দিচ্ছে। এই জ্যোৎস্নায় রাস্তার পাড়ের ঢোল-কলমি, বাঁশঝাড়, সোনালু গাছের পাতায় কত কীট-পতঙ্গ সঙ্গমে মেতেছে তার গুণা-গাঁথা নাই। এমনি সোনালী উৎসবে কত ঘর ঝলমল করছে কে জানে। চারপাশের নিরবতা কেঁটে আমি হেঁটে যাই।

একটু সামনে, ফাঁকা জায়গায় মাটির ঢেলার মতো কি যেন একটা চোখে পড়লো হঠাৎ। পুয়াতি চাঁদের নেশা যেন কিছুতেই কাটছে না আমার। বাতাসে সর সর শব্দ, রাস্তার কোথাও জমে থাকা পানিতে চাঁদের প্রতিচ্ছবি, আর পেছন থেকে সঙ্গমে ফেঁসে যাওয়া কুকুর-কুকুরির কোঁ কোঁ শব্দ মাদকতা বাড়িয়েই যাচ্ছে। দূরে, কোথায় যেন মাইকে গায়ে হলুদের গান বাজছে-‘হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মউ, বিয়ের সাজে সাজবে কন্যা, নরম সরম বউ রে...।’ গানটা আমার খুব পরিচিত। দূর থেকে গানের কথা সবটা বোঝা যাচ্ছে না। মনের ভেতর নিজে থেকেই কথা বুনে যাচ্ছিলাম। আমি কিছু মনে না করে এগিয়ে যাই। মাটির ঢেলাটা পাশ কেটে যাওয়া মুহূর্তে খেয়াল হয়-একটা মানুষ। কাঁদা-বালি মেখে ঘাড় ভাঙা মূর্তির মতো মাথা মুড়ে বসে আছে। যেন সমুদ্র তীরের বালির ভাস্কর্য-একটু ছোঁয়া লাগলেই ঝড় ঝড় করে ভেঙে পড়বে। একটু সামনে যেতেই বুঝলাম-মাথা মুড়ে বসে থাকা মানুষটা একজন নারী। পাগলি এবং উলঙ্গ। ডান হাতের আঙ্গুলগুলো লাঙ্গলের মতো করে বালিতে আঁচড় টানছেন, ধীরে, এক মনে। জোড় বাঁধা কুকুর-কুকুরি পা ঠেলাঠেলি করতে করতে পাগলীর গায়ে পড়ার উপক্রম হয়। তিনি আঙ্গুলে চষা বালি থেকে একমুঠো বালি ছুড়ে দিয়ে শব্দ করেন-হইত্, যাহ্, যা এনথ্যা যাহ্। তারপর একদম চুপ, আবার আঙ্গুলে মাটি চষেন। কুকুর দু’টো আবার পা ঠেলাঠেলি করে সরে যায়। এ পাগলীকে আগে কখনো দেখিনি। কিছু জিজ্ঞেসের ইচ্ছে হয়-মানে নাম কি, কোথায় থেকে এসেছে, থাকে-খায় কোথায়, জামা নিবে কি না ইত্যাদি। জিজ্ঞেস করি না। একে তো অনেক রাত, তার ওপর উলঙ্গ পাগালী-ঠিক হবে না ভেবে বাড়ির দিকে পা চালাতে থাকি। রাতে ‘মৃত্যু সঞ্জীবনী’ সুধা পান করে, শেষ পর্যন্ত বাজারের পাগলী দাবড়ানোর অনেক ঘটনাই আমার জানা আছে। আমার কানে আসছে গাঁয়ে হলুদের গান-হলুদ বাটো, মেন্দি বাটো...। কোথাও বিদুৎ নেই। চাঁদের আলোয় পথ দেখে বাড়ি পৌঁছি। চারদিক শুনশান। মা-ভাবি নিশ্চয় ঘুমিয়ে গেছেন।



২.

বাড়িতে ওঠার রাস্তা পাশে তালগাছ। ঝন্ ঝন্ করে তালপাতা বাজছে। রাস্তার একপাশে স্তুপ করে রাখা শুকনো পাতা। কদম গাছের ছায়া পড়েছে অনেকটা জুড়ে। আমার লাগানো কৃষ্ণচূড়া গাছের ঢাল ছাটা হয় না অনেক দিন। ডালগুলো ঝুঁকে পড়তে পড়তে মায়ের ঘরের চাল ছুঁয়েছে। ভাবি থাকেন ওপাশের ঘরটাতে। আমি তার পাশেরটায়। বাড়িতে মানুষ মোটে তিনজন- মা-বাবা আর ভাবি। অথচ, বাড়িতে একুশে বন্ধের ঘরই তিনটা। আমার বড় তিন ভাই। সবাই বিদেশ থাকেন। সবার বড়জন মাত্র বিয়ে করেছেন। নিয়মিত টাকা-পয়সা পাঠান তারা। বিয়ে বাকি দুইজনের ভবিষ্যৎ সংসারের কথা ভেবেই বাবা এতোগুলো ঘর দিয়ে রেখেছেন। উঠনে দাঁড়িয়ে ‘মা’ বলে ডাক দিতেই মা দরজা খুলে দাঁড়ান। আমি বাড়ি আসার কথা তিন-চারদিন আগে বলেছিলাম। মা ঠিক মনে রেখেছেন। কিন্তু এমন তো মাকে কতবারই জানিয়েছি, তারপর আসিনি। অফিসে ব্যাস্ততা ছিল, সময় করে ওঠতে পারিনি-বলে কাটিয়ে দিয়েছি। মা তখনো কি এমন অপেক্ষায় ছিলেন? মা বলেন-‘রাস্তা থিক্যা বাইর বাড়ির উঠার শব্দেই বুঝছি-তুই আইছা। মুক-আত ধুইয়্যা আয়, আগে খাইয়্যা নু। ভাতের চাইল দিয়্যাই রাখছি।’ আমি না এলে ভাত কি হতো-এমন শহুরে প্রশ্ন মাকে করার সাহস হয় না। ঢাকায় একবেলার খাবার না খেলে ফেলে দিয়ে হয়। খাবার বেলা পার করে গেস্ট এলে, নতুন করে রান্না করতে হয়। মায়ের হাতের হেরিকেনটা দুলছে পেণ্ডুলামের মতো। আমি টিউবওয়েল চেপে হাত-মুখ ধুয়ে আসি। ঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে হেরিকেনের আলোয় খেতে বসি। মা তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস করেন। যেন বছর ত্রিশ আগের কোনো দৃশ্য দেখছি। আমার কথা ভেবে ছোট মাছ ও শাক আনিয়েছেন। পুঁইশাক আর চিংড়ি মাছের ঝোল। আর গুলশা-গুমত মাছের সঙ্গে সরু করে কাটা আলু দিয়ে কষিয়ে ঝোল। সঙ্গে কয়েকটি গুলশা ভাজা।

-‘আমার রুমে বিছনা কোর ছাও?’ খাওয়া শেষ করে মাকে জিজ্ঞেস করি। আমি না থাকায় পাশের ঘরটা তালা পড়ে থাকে।

পাখাটা নামিয়ে মা পুনরায় জলের গ্লাস ভরেন। গ্লাস এগিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘পরিষ্কার কোরছি। অবেলায় বিছনা চাইদ্দোর ধুইছি তো, এ্যাহন তুরি শুকায় নাই দেইখ্যা বিছাই নাই।’ মা পরক্ষণেই আমার মুখে দিকে তাকান, বলেন, ‘ক্যা, আমাগো এনেই থাক। বিছন্যা ক্যাতা-ট্যাতা সব আছে এনে। কারেন নাই, আমি বাতাস দিমানি।’-একটা হাফ ছেড়ে-‘কত্ দিন থাকস না।’ মায়ের ভাষা ভেজা ভেজা। নিঃশ্বাস ছাড়েন বড় করে। আমি রাজি হয়ে যাই।

মা-বাবা’র মাঝখানে আমার বালিশ। বাবা এমনিতেই আগে আগেই ঘুমিয়ে যান। মা ডান-পাশ ফিরে হাতপাখা চালাচ্ছেন। তিনি আমার বাড়ি আসার কথা শুনতে চান-আগের বারগুলোতে আসনি কেন, আজ আসতে এতো দেরি হলো কেন, বন্ধ-ছন্ধ পাই কি না ইত্যাদি। রাস্তায় হঠাৎ দেখা পাগলির কথা বলি মা’কে। মা চমকে ওঠেন। উদ্বিগ্ন স্বরে বলেন, যেন শাসন করছেন-‘ডারাস নাই তো?’

‘না।’-আমি বলি-‘তয় আগে তো দেখি নাই। কন্ থ্যা আইছে?’

মা আমার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়েই তার কথা পুনরায় বলেন-‘না, কইছিলাম ক্যা, রাইত-বিরাইত ওমনে রাস্তার মইদে শয়তানের মতো বইস্যা থাকলে মাইনসে ডরাইবো না ক্যা!’-মা কণ্ঠ নরম আর উদাস করেন-‘মানুষ দেইখ্যা ডরাইলে মানুষ বাঁচে না বাপ।’

মা পাগলিটাকে ‘শয়তান’ বললেন, আমি খেয়াল করি। মা’র কাছে মানুষ দেখে ভয় পাওয়ার একটা ‘গল্প’ আছে, মা বলেন ‘ঘটনা’। অনেক শুনিয়েছেন, বিভিন্ন উপলক্ষ্যে। ভূতের গল্প হিসেবে নিজেও মাকে বলে শুনেছি বহুবার।

আমাদের পুরনো গ্রামের ছেলে আইয়োব খাঁ। ঢাকায় ভাল চাকুরি করতেন। একবার রাতে ঢাকা থেকে বাড়ি আসার সময় সাহার ভিটার ওখানে... আক্কাস ডাক্তার সঙ্গে দেখা। আক্কাস একজন হাতুড়ে ডাক্তার। একই গ্রামে বাড়ি তাদের। ডাক্তার দূরের কোন গ্রামে নাকি রোগী দেখতে গিয়েছিল। আইয়োব খান খুশিই হয়েছিলেন-দুইজন এক সঙ্গে কথায় কথায় যাওয়া যাবে। ডাক্তার বলেন, তুমি হাঁটতে থাকো আমি একটু প্রশ্রাব করে নিই। আইয়োব খাঁ কিছু দূর গিয়ে পেছন ফিরে দেখে ডাক্তার নাই। নাই তো নাই। কোথাও নাই। চিহ্ন মাত্রও নাই। সে কি নাই হয়ে গেলেনে, নাকি পাশের রাস্তা দিয়ে বাড়ি চলে গেলেন, আইয়োব খাঁ তার কিছুই বলতে পারেন না। তখন অবশ্য কিছু মনে হয় নাই। সেখান থেকে বাড়ি পৌঁছানোর পর আইয়োব খাঁ’র শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভয় পেয়েছিলেন। সেই ভয় থেকেই অসুখ। অনেক কিছু করা হলো, কিছুই হলো না। তার কিছুদিন পরই তিনি মারা গেলেন।

মা এখনো এই গল্পটা বলে দিতে পারতেন। কিন্তু বললেন না। শুধু কাতর কণ্ঠে আবার জিজ্ঞেস করলেন-‘হাছাই ক, ডরাস নাই তো। তাইলে কাইলক্যা, শনিবাইর‌্যা দিন আছে, সকালে জোলুর মাইরে কইয়্যা আসলে বিক্যালে আসপ্যানে।’

আমি প্রসঙ্গটা এড়াতেই-‘জানলাডা লাগায় রাখছাও ক্যা। খারাও পাল্লাডা খুইল্যা দেই, বাতাস আপসপ্যানে। তুমার বাতাস দিওন লাগবো না।’-বলে জানালা খুলে দেই। দক্ষিণা বাসাত মশারিটা প্রায় উঁচু করে ফেলে। তোশকের চারপাশ দিয়ে মশারি গুঁজে দেন মা। চাঁদের আলো এসে পড়ে আমার চোখে-মুখে। মশারির ভেতর অঢেল আলো। ‘এই আলোর মইদ্যে ঘুমাবি কেমনে?’-মা বলেন। আমি এক লহমায় মায়ের হাতটা আমার মাথায় রেখে বলি-‘তুমি ইট্টু মাথা আইতিয়্যা দ্যাও, ঘুম ধইর‌্যা যাইবো।’ তিনি হাসেন আর আমার চুল এলোমেলো করেদেন। বলেন, ‘চোখ বন্দ কর, তাড়তাড়ি ঘুমা।’ আমি চোখ বন্ধ করি। শেষ যে দৃশ্য দেখি-মা আমার দিকে তাকিয়ে আছেন, বাতাসে থিরথিরিয়ে কাঁপছে মশারির ছাদ। আর সারা ঘরের আঁধার বেঁধে রাখা মায়ের চুলগুলো একপাশে ঢলে পড়েছে। চকের মাঝ থেকে ভেসে গাঁয়ে হলুদের গান-হলুদ বাটো মেন্দি বাটো, বাটো ফুলের মউ...

কি মনে করে যেন মা হঠাৎ বলেন-‘রাস্তার ওই পাগলনীরে আমরাও চিনি ন্যা, কনথ্যা জানি আইছে, দুই মাস ধইর‌্যা। যেকালে আইছে হেইকালেই দেকছি, প্যাটে পুলাপান। কনথ্যা, কিরা কি করছে, প্যাট বাজছে। যে বাড়ি যায়, অবস্থা দেইখ্যা তাড়াতাড়ি বিদায় করে। আমাগ্ বাড়িও আইছিলো। চাইর-পাঁচ দিন খাইছে। তারপর ওই তালগাছ তলা বইস্যা থাকছে, আর উঁ উঁ করছে। হায় হায় মোরবো নি!’-মা’র কণ্ঠে উদ্বেগ-‘বউ কয়রাইতে ছালা-ছিড়া ক্যাতা নিয়্যা দিয়া আয়ছে। পোশোদিন সকালে হুনি পাগোলনীর পুলাপান ওইছে। পাইমারি স্কুলের ওনে পাগলনীর একটা পুলা ওইছে। এ্যাকলা এ্যাকলা।’-হাফছাড়েন মা।

‘তারপর’-আমি বলি, চোখ বন্ধ রেখেই।

‘এ্যাকলা এ্যাকলা পুলাপান হওয়া কি চাট্টেখানি কথা।’-তার কণ্ঠে করুনা ও বিস্ময়-‘খোদার ইশারা ছাড়া এই সব হয় না।’ তারপর একটু সময় নেন, পরের কথাগুলো বলতে। ‘সারা রাইত কিষ্ট্যা (কেষ্ট) ফকিরের খ্যারের পালায় গড়াগড়ি পারছে। খুব ভোরে-(মা হয়তো সুবাহ্-সাদিকে কথা বোঝাতে চান)-বাইচ্চাডা অওয়ার পর পাগলনি ওই ভাবেই পইর‌্যা রইছে। দেখছে কিরা?’

জানি, উত্তরের জন্য নয়, মা এভাবেই বলবেন, ঠিক গল্প কথকের মতো-‘ওই যে দড়িকান্দির ছামেদ দেওয়ান আছে না?’

লোক আমার মোটেই পরিচিত নয়। মা এমন ভাবে বলেন যেন আমার কতদিনের পরিচিত। আমি শুধু বলার জন্য শব্দ করি-‘হুম’। ‘সেই ছামেদ দেওয়ান হেন্ দ্যা যাইব্যা লাগছিল। হে-ই পুলাপান ওইতে দেখছে। তারপর সে পাগলনীরে ওমনে ফালাইথুয়্যা পুলাডা নিয়্যা গ্যাছে। এইড্যা আবার দেখছে কিরা?’

মা আবারো প্রশ্ন করেন। তারপর মা-ই উত্তর দেন-‘কিষ্ট্যার মাইজ্যা পুলার বউ আছেন না? আমাগ বাড়ি আগে আগে আইতো জৈত পাতা নিব্যার লিগ্যা, হে দেখছে। খবর পাইয়্যা আমার না সবাই গেছিলাম। দেখপ্যার।’ এবার তার সুর ভিন্ন-‘পাগল ওইলে কি ওইবো, পুলাপানের দরদ বুঝে। এর-ওর পাও ধরে, কান্দাকাটি করে পুলাডা আইন্যা দিওয়ার লিগ্যা। আমার গেছি পরে আমাগো চিনলো! আমাগোর পাও ধরলো।’ আমি অপেক্ষা করি, মা এখন কি করেন। ‘এরমধ্যে কে যানি পাগলনীরে একটা পুতুল দিছিলো। পাগলনী রাগে রাগে হেইড্যারে টাইন্যা ছিড়্যা ফালাইলো! পাগলনীর কাগা-বগা দেইখ্যা, মাইসেও উপস্থিত মতো মাতবরগো কইলো, পুলাডা আইন্যা দিব্যার লিগ্যা। তারা কইলো, হুদ্যাহুদি আইন্যা দিয়া কি ওইবো, দেখলেন না, মাইর‌্যা ফালাইবো। তার থ্যা ছামাদের বউ’রও পুলাপান অয় না। তার কাছেই থাক।’ মা যেন হাত ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান।

‘তারপর আমরা যেকালে আসুম, পাগলনী হে কি কান্দাকাটি। আসার সুম তর ভাবির কাপুড় টাইন্যা ধোরছিলো। ও কি করবো?’ কি করলো-আমি হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারতাম। আগ্রহের বিষয়। বিয়ের এগার বছরেও ভাবির কোনো সন্তান হয়নি। ভাই বিদেশ গেছেন নয় বছর। এর মধ্যে তিনবার সফর দিয়েছেন। ভাই চলে গেলে ভাবি বিষণ্ন হয়ে যান। অনেক চেষ্টা-তদবির চলছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। মাঝে মাঝে ভাবিকে বেশ বিমর্ষ হতে দেখেছি। অনেকে আড়ে-ঠারে বলেন, ভাবি একজন বাজা মহিলা। আমার ভেতর কৌতুহল জাগে, একজন সন্তান পিয়াসী নারী কি করে একজন পাগলীর সন্তান হারানোর সন্তনা দেন। কিন্তু পরিস্থিতি সে দিকে যায় না। মা বলেন-‘মুন্নির মায় আত ধইর‌্যা টানদ্যা নিয়্যা আয়ছে।’ মা যেন বলেই বাঁচেন। আমি শুনছি, কি শুনছি না-তিনি আর জিজ্ঞেস করেন না। আমার মাথায় লাগছে দখিণা বাতাস। জানালার অদূরের কামিনী ফুলের ঘ্রাণ আসছে নাকে। চকের মাঝে আনত শব্দে বাজছে গায়ে হলুদের গান। শেয়ালের ডাক শোনা যায়। মনটা তখন খোলস বদলানো সাপের মতো নরম হয়ে আসে। এর মাঝেও কোথায় থেকে যেন একটা মিহি সুর ভেসে আসে। কান্নার সুর-উঁউঁউঁউঁউঁ...

বুকের ভেতর মোচর দিয়ে ওঠে। মনে মনে ভাবি, সকালে মাকে জিজ্ঞেস করবো-কে কাঁদে ওভাবে? ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে যায়ই।



৩.

সকালে মা আর ডাকেননি। চোখ খুলতেই দেরি হয়ে গেল। আধো ঘুমে-আধো জেগে মটকা মেরে শুয়ে আছি। আমাদের ঘরের সঙ্গেই অস্থায়ী চুলাপাড়, উন্মুক্ত। একটা রান্না ঘরও আছে, বাড়ির পূর্বপাশে। খাটে শুয়ে শুয়েই উন্মুক্ত চুলাপাড় দেখা যায়। চুলাপাড় থেকে বিভিন্ন ভাজা পোড়ার শব্দ আসে। মাঝে মাঝে মা-ভাবির মধ্যে টুপ-টাপ কথার শব্দ পাই। ভাবি এতোক্ষণে ঠিক জেনে গেছেন, গতরাতে আমি বাড়ি এসেছি। নতুন কার যেন কথা শুনতে পাই, নাকে বাঁধানো স্বর। কণ্ঠটা আমার অপরিচিত নয়। পাড়ারই মেয়ে, মিনু। আধ-পাগলী। খুব পরিশ্রমী। চার-পাঁচটা ছাগল পালন করে। চকে গোবর খুঁটে, ঘুটে বিক্রি করে। মাঠে ফসল উঠে গেলে ফসল-কুড়ায়, ধানের সময় ধান। আমার বলি, ধান-নুড়ে। ফসল কুড়ানিতে মিনুর সঙ্গে পেরে উঠে, এমন সাদ্দি কারো নাই। একবার সোয়া মন ধান নুড়েছিল মিনু। কথা বলা সময় ওর নাকে বাঁধে। এনিয়ে ওর সঙ্গে রসিকতা করি।

কিঁ রেঁ মিঁনুঁ, কিঁমুঁন আঁছাঁ?-ব্রাশে পেস্ট মাখিয়ে টিউবওয়েল পাড়ে যেতে যেতে একবার মিনুকে চটিয়ে যাই। মিনু ঝাকিয়ে ওঠে-যাঁ এঁন থ্যাঁ, ফাঁতড়া কুঁহান কাঁর। আরো কিছু বলতো। ভাবি সামলে নেন-ওর কথা বাদ দে, মিনু আমার কথা শুন, সকাল সকাল কনে গেছিলি?

‘চকে বোরকি দিব্যার গেছিলাম’-কিছুটা সামলে নিয়ে মিনু বলে। একটু উচ্ছ্বাস এনে বলে-‘চকের বাড়ির মনির বিয়্যা কোরব্যা লাগছে।’ একটু থেমে, চুলাপাড়ের বাঁশের খুঁটিতে নখ খুঁটতে খুঁটতে বলে-‘এই বাড়ির পুলাগো বিয়্যা করাইবো না?’

আমার বড় যে দুই ভাই আছেন, বিদেশ থাকেন, মিনু তাদের ইঙ্গিত করে।

মিনুরা তিনবোন। বাবা নেই। কবে মারা গেছে তা গ্রামের কেউ বলতে পারে না। মিনুই সবার বড়। খাটো আর মিসনে। মাথা আর থুতনি ধরে চাপ দেয়ার মতো, মুখটা দুমড়ে আছে। পাগলী বলে এখনো বিয়ে হয়নি। ছোট বোন বিষুকা, তার বয়সও প্রায় ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ হবে, কালসে আর একহারা। শীর্ণ শরীর, মনে হয়ে যেকোনো মুহূর্তে বাতাসে পড়ে গিয়ে কয়েক টুকরো হয়ে যাবে। যৌতুকের অভাবে তারও বিয়ে হয়নি। কিছু দিন হয় বিদেশ গেছে। একেবারে যে ছোট, নাম ময়না। বেশ সুন্দরী। আমাদের সঙ্গে পড়তো। একে তো বড় দুই বোনের বিয়ে হয়নি, তার মধ্যে একজন পাগলী, এদেশে ময়নাকে বিয়ে দেয়া সহজ কথা নয়। ময়নাকে তাই ভারতে নিয়ে বিয়ে দিয়েছে। মিনু ইদানিং খুব বিয়ের কথা বলে। বিয়ে নিয়ে মিনুর সঙ্গে আমরা প্রায়ই রসিকতা করি।

আমি ইতোমধ্যে পেছনের দরজা দিয়ে এসে খাটে বসেছি। ভাবি আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে হাসেন।-‘ক্যা তুই বিয়া বোসপি নি?’

মিনু গুঁই গুঁই করে। ঘড়ের কাপড়ে নাক ঘসটাতে ঘসটাতে বলে-‘আমারে বিয়্যা করবো ক্যারা?’

‘ক্যা, আমার ছোট দেওর আছে না! এট্টু আগে তরে না-কিমুন আছা-জিজ্ঞ্যাস করলো।’-ভাবি একই ভাবে নাকে বাঁধিয়ে বলেন, ঠোঁট মিটমিট করতে করতে।

মিনু ক্ষেপে যায়। বিরক্তির স্বরে বলে, ‘হুরু’।



৪.

মাত্র একদিনের ছুটিতে বাড়িতে এসেছি। তাই বলে, প্রতিদিনের রুটির ওয়ার্ক নষ্ট করা যাবে না। প্রথমের মুখ ধোয়া, টয়লেটে যাওয়া-আমি বলি ‘আগে-পিছে পানি দেয়া’, তারপর গোসল করে সকালের নাস্তা। তাতে সকাল গড়িয়ে গেলেও, না। চাকুরির প্রথম দিন থেকেই একদম ফিক্সড হয়ে গেছে।

লুঙ্গিটা কাঁধে ঝুলাতে দেখেই মা বলেন, ‘গোসলে যাওয়ার আগে খাইয়্যা যা। আইতে আইতে তো সব ঠাণ্ডা হইয়্যা যাই বো।’

‘তাড়াতাড়ি আইসেন। পারেন তো যাইয়্যা আবার মিনুর সাথে আলাপ জুইড়া দিয়েন’-ভাবি বলেন, চাপা হাসি জিইয়ে রেখেই।



মিনুদের বাড়ি লাগোয়া কামালদের বাড়ি। তার পরই কুম। আমাদের বাড়ি থেকে দুই-তিন মিনিটের পথ। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ভাবি, কালরাতে কোথায় যেন কান্নার শব্দ শুনেছি। বিয়ের গানের সঙ্গে সঙ্গে বুঝে ওঠতে পারিনি। তা আসলে কোথায়?

এখন দুই-তিনমাস পর পর বাড়ি আসি। এসেই শুনি, এর মধ্যে গ্রামে কেউ না কেউ মারা গেছেন। সন্ধ্যা রাতে তুলসি তলা বা বাড়ির উঠোনে কারো কান্না শব্দ শুনেছি বটে, কিন্তু থিতিয়ে আসা কণ্ঠে রাতভর কারো কান্না আমি শুনিনি। সবচেয়ে আশ্চর্য হয়েছি গতবার বাড়ি এসে। নিমাই দা’র বড় মেয়ে মধু, ওর একটা খবর শুনে।

মধু আমাদের সমবয়সী। এক-আধ বছরের বড় হবে। কিন্তু কোনদিন বুঝিনি ও বড় হয়েগেছে। হাই স্কুলে তিন ক্লাস মাড়িয়েও মধুর সাথে-দাঁড়িয়া বাঁধা, গোল্লা ছুট, বউ ছি, কাঠ পুতুল খেলেছি। একদিন কুরমান আলীর সদ্যকাটা শুষ্ক পুকুরে কুমির-কুমির খেলতে গিয়ে মনে হলো, মধু বড় হয়েগেছে। ওর সদ্য ওঠা বুক দৌড়ার সঙ্গে সঙ্গে থিকথিকিয়ে কাঁপে, দোলখায়। কখনো ও নিজের অজান্তেই তাকে সামাল দিয়ে চলে। আমি তন্ময় হয়ে রই। সেদিন ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, কালকেও মধু সঙ্গে কুমির কুমির খেলবো। কুমির হব। পুকুরে একটু পা নামিয়েছে কি, হর হর মাঝ পুকুরে তল করে নিয়ে যাবো।

পরদিন হাটবার। তাই কেউ খেলতে আসিনি। সন্ধ্যায় হাট থেকে ফিরে শুনি, বরপক্ষ নাকি মধুকে আশির্বাদ করে গেছে। আমি আশ্চর্য হই-কালকেই না কুরমান আলীর পুকুরে আমরা কুমির কুমির খেললাম, ছুঁয়োন্তি খেললাম! ভাবি বলেন, ‘মেয়েরা এমনই, কলাগাছের মতো, একদিন হুঁস করে বড় হয়ে যায়। তারপর কলা ধরতে না ধরতেই কলার-কাইন কাটো, তার সাথে কলাগাছটারেও কাটো।’ তারপর থেকে আর মধুকে দেখিনি। দশ বছর। এরমধ্যে মধুর একটা মেয়ে আর একটা ছেলে হয়েছে। ওর মেয়েকে দেখেছি, আমাদের বাড়ি এসেছিল। তখন সে গুড়গুড়িয়ে হাঁটে। খুব লাজুক, কিছু বললে বাড়ি যাওয়ার পথ খুঁজে। ছেলেটা ছোট, বছর দু-এক হবে। ভাবতে অবাকই লাগে, আমি মনে করি, এখনো আমার বিয়ের বয়স হয়নি। অথচ মধু, এখন দুই সন্তানের জননী, দস্তুর গৃহিণী।

তিনমাস আগে বাড়ি ফিরে যখন মধু’র স্বামী মারা যাওয়ার খবর শুনি, খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম। গতরাতে কান্নার শব্দ শুনে একবার মধু’র কথা মনে হয়েছিল। কুমপাড়ে যাওয়ার পথেই মধুদের বাড়ি। হালুটপেড়ে বাড়ি ওদের। আমি বাড়িটার দিকে তাকাই। হয়তো সাদা শাড়ী পড়া একজন যুববতীকে দেখবো বলে ভেবে ছিলাম। হয়তো তার চোখে-মুখে থাকবে সংসার আর দগ্ধতার দীর্ঘ বলিরেখা, একই সঙ্গে আমাকে আবিষ্কারের আনন্দ। সেকেলে বিধবা ছাড়া আজকাল কেউ যে আর সাদা শাড়ী পড়ে না, তা ভালো করেই জানি। দেখি বাড়ির পাড় ঘেঁষে বেড়া দিয়েছেন নিমাই দা’। তাতে আড়াল পড়েছে সংসারের সব কিছু। শুধু বাইরে অনাথ পড়ে আছে ঝুনকি জবার গাছ। লাল টুকটুকে ফুল ফুটেছে তাতে। পাপড়ির মাঝখান থেকে, কালীদেবীর জিভের মতো ঝুঁকে আছে এক-একটা ঝুনকি। আমি একটা ফুল বৃন্ত থেকে ছিড়ে জিভে ছোঁয়াই। জবার গোড়ায় মধু থাকে, বৃন্তছিড়ে জিভে ছোঁয়ালেই স্বাদ পাওয়া যায়-মধুই প্রথম আমাকে দেখিয়েছিল এই বুদ্ধি। একবার মনে হয় ডাকি, কতদিন ওর সঙ্গে দেখা নেই। পরক্ষণেই মনে হয়, বিবাহিত মধু, তার ওপর বিধবা, যুবতী। না, থাক। আমি ডাকি না। কুমের দিকে পা বাড়াই।



মিনুদের বাড়ির ওপর দিয়ে কুমে যেতে হয়। বাড়ির বাইরে থেকেই মিনুর গলা শোনা যায়। বাড়িতে একটা মাত্র থাকার ঘর। তার ছোট্ট বারান্দায় বসে মিনু মায়ের সঙ্গে ঝগড়ায় মেতেছে। ‘তুমি আমারে সন্নের জিনিস বানায় দ্যাও না ক্যা! গবর খুটি আমি, বোরকি পালি আমি, ধান-নুড়ি আমি’-কান্না করতে করতে বলে সে-‘আর ঘসি, বোরককি বেইচ্যা তুমার মাইজ্যাডা আর ছুটুডারে জিনিস বানাইয়্যা দ্যাও।’

‘সন্নের জিনিস দ্যা তুই কি করবি?’-ঘরের ভেতর থেকে কথা বলেন মিনুর মা।

‘ক্যা, আমার বুঝি স্বাদ-আল্লাদ নাই’-মিনু দুঃখ ভারাক্রান্ত স্বরে জবাব দেয়। তারপর যা বলে, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ‘হ, আমার ব্যালা তুমার কিছুই ওইবো না। সব বেইচ্যা বেইচ্যা তুমি মাইজ্যা ম্যায়ারে বিদ্যাশ পাটাইব্যার পারো; ছুটু ম্যায়ারে ইন্ডিয়্যা নিয়্যা বিয়্যা দিব্যার পারো, খালি আমারে সেন বিয়্যা দিব্যার পারো না।’

আমি শুধু শুনি, স্তম্ভিত হই। জীবন সম্পর্কে আমার অধিত বিদ্যা এর থেকে যোজন যোজন দূরে। এতো নিবিড় পাঠ আমার কখনোই নেয়া হয়নি।

‘তুরে বিয়্যা করবো কির‌্যা?’-মিনুর মা উত্তর দেন, খনিকটা উপেক্ষা আর হাসির শ্লেষ মাথা স্বরে।

‘হাতে বালা, গলায় সুনার মালা আর ট্যাহা দিলে বুজি বিয়্যা করে না, ন্যা? তুমরা আমারে বুঝাও?’-গম্ভীর আর কাঁদু কাঁদু কণ্ঠে বলে মিনু।

মিনুর মা বিরক্ত হন, ‘পাগল ম্যায়ারে নিয়্যা তো বাহারে বিপদে পড়ছি...’

‘পাগল কইব্যা না, পাগল কইব্যা না’-মিনু একদম ক্ষেপে ওঠে-‘আমি বুজি কিছু বুঝি না, ন্যা?’

মিনুর মা কি যেন বলার জন্য ঘরের বাইরে একটু উঁকি দিয়ে ছিলেন, হয়তো দুয়ারের ওপর দিয়ে আমাকে যেতে দেখেন, তিনি রাগত স্বরে বলেন, ‘তুই যা এনথ্যা। জ্বালাইস ন্যা, আমারে। তুরে খালি কইছি ইট্টু দুয়্যারডা সুড়াদে। তুই এ্যাহন কান্দুন উঠাইছা।’

‘বিয়্যা না দিলে আমি কুনু কামই করুম না’-বলেই হাতের মোথা সলা দুয়ারে ছুড়ে দেয় মিনু। তারপর ধাই ধাই করে বাড়ির পথ ধরে সড়কের দিকে যায়।

আমি কুমের ঘাটে গিয়ে দাঁড়াই। মিনুর আজকের আচরণের কথা চিন্তা করি। ভাবতে ভাবতে সমত্ত পুকুরে সাঁতার কাটি। কিন্তু কোনো কুলকিনারা খুঁজে পাই না। শুধু মনে পড়ে, সাত বছর আগের একদিনের কথা। তখন আমি কলেজ ছাত্র। দেখতাম মানিকগঞ্জের দুধ বাজারের এক পাগলী প্রতিরাতে দরদ দিয়ে গাইত-

‘একবিন্দু ভালবাসা দাও

আমি এক সিন্ধু হৃদয় দিব

মনে প্রাণে আছো তুমি

চিরদিনই আমি তোমার হবো ।

একবিন্দু ভালবাসা দাও

আমি একসিন্ধু হৃদয় দিব....’

পাগলী পুন: পুন: এইটুকুই গাইত, চলতি সময়ে সিনেমার গানটি। তারপর স্বর করে কাঁদতো, তা ঠিক কুকুরের কান্না মতো শুনাতো। তারপর আবার গাইতো। এভাবে সারারাত। আমাদের মেসের ব্যালকোনিতে দাঁড়িয়ে এইসব শুনেছি বহুদিন। আর ভেবেছি, জীবনের সবগুলো অনুভূতি আমি বুঝি না। মিনুর কথায়ও তার সাদৃশ্যতা খুঁজে পাই মাত্র। তার বেশি আমি বুঝতে পারি না।

বাড়ি আসতে আসতে আমার মাথায় কেবল সেই কথা ঘোরপাক খায়। মধুদের বাড়ির পাশদিয়ে আসার সময় আরেক বার তাকাই। বাড়ির ঢালে ফুটে আছে ঝুনকি জবা, লাল, রক্তাক্ত। মনে পড়ে গত রাতে কান্নার কথা।



৫.

বেলা পড়ে এলে মিনু যথারীতি মাঠে যায়, ছাগল আনতে। পাঁচ-সাতটা ছাগল মিনুর ফিনফিনে দেহটাকে উপহাস করে এপাশ-ওপাশ টান দেয়। নিজেদের মধ্যে ধস্তাধস্তি করে মিনুকে একদম বেসামাল করে দেয়। মিনু খিস্তি করে। যা ইচ্ছে তা-ই খিস্তি করে। ছাগলগুলো টানতে টানতে যখন সে গ্রামের প্রান্ত ছোঁয়, তখন বেলা ঢলে পড়েছে। এ সময় মনিরের বিয়ের বরযাত্রীরা বউ নিয়ে ফিরে। চার বেহারার একটা ‘মাপা’র ভেতর নতুন বউ। মনির দরিদ্র ভ্যান চালক। পালকি ভাড়া করার সামার্থ তার নাই। তাই মাপা ভাড়া করেছে। একসময় জমিদাররা কন্যার সঙ্গে মাপায় করে দাসি পাঠাতো, মেয়ে শ্বশুর বাড়ি। তাতে একজনে বেশি ওঠা যায় না। বইরে, মাপার পাশে পাশে হেঁটে আসে মনির। হালুট পাড়ের বাড়ির মহিলা, শিশুরা বউ দেখার জন্য ঘিরে ধরে। বেহারাদের হাঁটা অবস্থায়ই খুশোখুশি করে বউ দেখেন তারা। তাদের দেখাদেখি আরো লোকজন জড়ো হয়। খানিকটা ভীড় পড়ে যায়। মিনু একহাতে ছাগলের রশিগুলো ধরে বউ দেখার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষের ভীড়ে মাপার কাছে চাপতে পারে না সে। এপাশ-ওপাশ আঁতিবাতি করে মিনু। ছাগলগুলো ছুটাছুটি শুরু করে, মানুষ দেখে। বউ দেখা মিনুর জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সে একজনকে তার ছাগলগুলো ধরার জন্য বলে। তার কথায় কেউ পাত্তা দেয় না। বেলা ডুবে যাচ্ছে দেখে বেহারা-রা জোরে জোরের পা ফেলে। ধাই ধাই করে হেঁটে যায় চকের মাঝের একলা বাড়িটার দিকে। মিনুর ছাগলগুলো বাড়ির দিকে টান ধরেছে, তাকে টেনে নিয়ে যায়। মিনুর আর বউ দেখা হয় না। সে রাগে-দুঃখে খুনখুনিয়ে কেঁদে ওঠে। হালুটপাড়ের ঢোলকলমি ভেঙে ছাগলগুলোকে পেটায়। বাতাসে মিনুর ছাগল পেটানো লাঠির সাঁই সাঁই শব্দের সন্ধ্যা নেমে পড়ে।



৬.

মা এই রাতেও পড়ার রুমে বিছানা করে দেন না। জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘রাইত থাকতেই তো উইট্যা যাবি গ্যা। আইজক্যা রাইটাও আমাগো কাছেই থাক। কদ্দিন পরপর বাড়ি আসোস, আমার ভাল্লাগে না। বাড়িডা খালি ভা ভা করে। বই তো ঢাকায় গিয়্যাও পোড়ব্যার পাড়বি।’ একটু কাতর কণ্ঠেই কথাগুলো বলেন তিনি। হঠাৎ তার কথায় দার্শনিকতা খেলে যায়। অথচ মা কোনো দিন স্কুলে ভর্তি হননি। তিনি কি সারাদিন আমার ভাবনাগুলো অনুসরণ করেছেন? বলেন, ‘এ্যাতো পইড়্যা অইবো কি? দুনিয়ার সব কিছুই কি বই পইড়্যা বুঝা যায়? মানুষরে বুঝতে পারলে তবেই বিদ্যা-সাধন পূর্ণ হয়।’ মায়ের এই দার্শনিতার, এই সুফি ঘরাণার চিন্তার জন্য মোটেই তৈরি ছিলাম না। মা কখনো সুফিবাদ বা দার্শনিক দ্বন্দ্ব নিয়ে চিন্তা করে থাকবেন, তা ভাবনাতীত বিষয়।

আমার ভেতর দ্বন্দ্ব বাড়ে। দুইজন পাগলী কেন প্রায় একই ধরনের আচরণ করছে? একেবারে ফ্রয়েডিয় ব্যাপার-স্যাপার? সব যদি ফ্রয়েডিয় ব্যাপার হয়, তাহলে মধু কিরে দিন কাটাচ্ছে? কিংবা আমার ভাবি? তাছাড়া রাতে অমন করে কাঁদে কে? মা কিছু সুশৃঙ্খল দার্শনিক বাণী না দিক, আমার জট লাগা মাথায় অন্তত হাত বুলিয়ে দিবেন, এই ভরসায় মায়ের কাছে রইলাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন। আমি জানালা খুলে দেই। জ্যোৎস্না আর বাতাস আসে। মা সংসারের কথা বলেন। ভাবি যেন থাকেন থাকেন, কেমন যেন খিট-মিটে হয়ে যান; ভাল লাগলো না, হঠাৎ করে বাবার বাড়ি চলে যান-এসব কথা বলেন। এ ক্ষেত্রের মায়ের বুঝতে না পারা আর অসহায়তা-দুই ফুটে ওঠে। ঢাকায় আমি কেমন থাকি, কি খাই সে সবও জিজ্ঞেস করেন। চকের মাঝখানে মনিরের বাড়িতে বাজছে বিয়ের গান-‘মনু মিয়ার দ্যাশে রে/ বিয়ার বাদ্য আমরা বাজি রে/ আইছে মনু মিয়া, আইছে মনু মিয়া/ পাগড়ি মাথায় দিয়া রে/ মনু মিয়ার দ্যাশে রে....।’ হঠাৎ ক্যাসেট প্লেয়ার বন্ধ হয়। কয়েকজন মহিলা গান ধরেন, বেসুর গলায়। তারা নিজেদের মধ্যে হাস্য-রস করেন, মাইকে তাও শোনা যায়। তাদের গান আর হাস্য-রসের সঙ্গে কানে ক্ষীণ থেকে স্পষ্ট হতে থাকে শেয়ালের করুন ডাক। দূরে-কাছে কুকুরও ডাকে একই সুরে। এরমধ্যে হঠাৎ কোথায় যেন কান্নার সুর শুনতে পাই। সেই মিহি কান্নার সুর। আমি সজাগ হয়ে ওঠি। মা’কে বলি-‘মা, কেউ মনে হয় কাঁদছে!’ মা প্রথমে ঘাড় উঁচিয়ে সজাগ হন, তারপর নিশ্চল ভাবে মাথা এলিয়ে দেন-‘কে আবার, মিনু।’ আমার সন্ধিগ্ধতা কাটে না, জীবনের এই পাঠ বই পড়া দিয়ে শেষ হবে না। ‘কেন’-স্বাগ্রহে জিজ্ঞেস করি আমি।

‘কেন আবার!’-মা বলেন-‘কতদিন ধইর‌্যাই তো হুনব্যা লাগছি ওই উপরি ভাব ধরছে, রাত একটু অইলেই, মুরাইয়্যা-মুরাইয়্যা কানব্যার শুরু করে।’ আমি আবার জিজ্ঞেস করি-‘কিন্তু কান্দে ক্যা?’

‘ওই তো’-মা বিষয়টা যেন আমলে নেন না-‘সন্নের গয়না-গাটি বানাই দেও তারে। সাজুনি-কাজুনি কিন্যা দেও।’-নির্দ্বন্দ্বে বলে যান তিনি-‘কও, এ্যাহন নিকি ও বিয়্যা বোসপো।’

মা সাবধান এনে বলেন,‘নে, এ্যাহন চোপ কইর‌্যা ঘুমা। ভোরে আবার তর উটুন লাগবো।’ আমি চুপ মেরে যাই। তারপর শুনি মা নিজেই থেকেই বলছেন,‘এরুম সবাইর হয়। সবাইর তো স্বাদ-আল্লাদ আছে, কদ্দিন আর। গণ্ডগোল তো অর মাতায়, আরতো কিছু না।’ একটা হাঁফ ছাড়েন তিনি, কণ্ঠে অনুযোগের সুর-‘বাড়ির মানুষগুন্যাও! ম্যায়াডারে বিয়া দিলেই পারতো। কতপাগলে সংসার কইর‌্যা খাইব্যা লাগছে না। আর’-একটা দীর্ঘ শ্বাস ছাড়েন মা-‘কার কতা কোবি, নিমাই’র ম্যায়াডার জামাই মরছে। জোয়ন ম্যায়া, কেমনে ঘরের তলে থাকে! বিয়া না ওইলে এক কতা, বিয়ার পর স্বামী না থাকলে কষ্ট আরো বেশি।’

মা যেন আপন মনেই বলেন কথাগুলো। মাকে আমি বলি না, কান্নার শব্দ শুধু বাইরে থেকে আসছে না। বাড়ির ভেতরেও কোথায় যেন গুমড়ে গুমড়ে কান্নার সুর বাজছে। মনে হয় ভাবি। কিন্তু আমি বলি না। তবে তা বাইরের শব্দের চেয়ে ক্ষীণ। হোঁস হোঁস, ফোঁস ফোঁস, সুক্ষ্ণ, চিকন, উঁ উঁ সুর, নাকটানা আর হাপড়ের মতো বড় বড় শ্বাস।

অনেকদিন দেখেছি, ভাবি জায়নামাজে বসে নতসুরে কাঁদছেন। বিশেষত মাগরিব, এশা আর ফজরের ওয়াক্তে। আমার প্রশ্ন জেগেছে, এ কান্না কার জন্য? সন্তান, নাকি স্বামীর জন্য? মেলাতে চেষ্টা করি-ভাবির বিয়ে হয়েছে কিন্তু স্বামী দেশে নেই নয়-দশবছর, মধু দশ বছরের সংসারের পর এখন তার স্বামী নেই। আর মিনু, দারিদ্র আর মানসিক সমস্যার কারণে বিয়ে হয়নি। বিষুকা শেষ পর্যন্ত বিদেশে গেল। দেশে বিয়ে দিতে কষ্ট হবে ভেবে ভারতে নিয়ে মিনুর ছোট বোন ময়নাকে বিয়ে দিয়েছে। মিনুর মা বিধবা হয়েছেন কত বছর, কারোর জানা নেই। রাস্তার পাড়ের সেই পাগলী, যে একদিন গর্ভধারণ করেছিল, কোথায় তার কষ্টের সন্তান। সেও কি কাঁদছে না এই রাতে? আমি চলে যাবো বলে মাও তো কাঁদছেন, মনে মনে। কখনো কখনো মাকেই মনে হয়েছে অচেনা কেউ। বাবা প্রতি তার অনুযোগ কি কমছিল? তারপর মনে হয়, কে-ই না রাতে কাঁদেন? ভেতরে ভেতরে কার কান্নার বেগ বেশি? আমি মেলাতে পারি না। শুধু মিনুর কান্নার স্বরই শোনা যায়।

আমি নতুন করে আর কিছু জিজ্ঞেস করি না। চুপ মেরে পড়ে থাকে। শব্দগুলো শুনি। কানে আসে-দূরে শেয়ালের বিহ্বল ডাক। কুকুরের করুন আর্তি। মাইকে মোটা-ভাঙা বেসুরো গলার গীত, আর দূরের-কাছের কান্না। কখনো মনে হয়, পোয়াতি চাঁদের এইরাত, রূপকথারই রাত। নাগিনীর মতো, পূর্ণিমা রাতে বিষে নীল হয়ে যেতে যেতে করুন কান্না কিংবা আতৃপ্ত কোনো আত্মার নিনাদে কেঁপে কেঁপে উঠছে এই নগরী, গ্রাম।০



গল্প লেখার গল্প : কান্নার শব্দ শোনা যায়, যায় না
অলাত এহ্সান

অদ্ভুত সব দেব-দেবীদের কথা শুনেছি স্কুল বেলায়। মায়ের মুখে শুনেছি বোরাকে কথা। শুনে শুনে মনে হয়েছে, এ-একটা আজব প্রাণী। মুখাবয় রূপসী নারী মতো। শরীরটা ঘোড়ার। দু’টো ডানা আছে। মস্ত শরীর নিয়ে পাখীর মতো উড়ে যায়। হাঁটার চেয়ে বরং উড়ে যাওয়াতেই তার খ্যাতি। ইসলাম ধর্ম মতে, হযরত মুহাম্মদ এই বোরাকের পিঠে সওয়ার হয়েই সপ্তম আসমানে আরোহণ করেছিলেন। সেটা ছিল মে’রাজের রাত। কিন্তু বোরাক একাধিক আছে, এমনটা কখনো শুনিনি। দেখার খুব ইচ্ছে হতো। তখন মেঘের ভেতরে তাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করতাম। প্রশ্ন জাগতো, একেবারে আচানক কিছু তৈরি হতে পারে কি, যার সঙ্গে জগৎ-সংসারের সামান্যতম মিল থাকবে না? পরে মনে হয়েছে, আদৌতে এমন প্রাণী নেই। মানুষ তার কল্পনা দিয়ে তৈরি করেছে এমনটা। অনেকটা গ্রিক দেব-দেবীদের মতো। মনের ইচ্ছা দ্বারা, আকাঙ্ক্ষা দ্বারা, অনাপ্রাপ্তিকে চরিতার্থ করার জন্য তৈরি হয়েছে এসব। শুধু শুধু আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বে ফেলে দিয়েছে। দেখা প্রাণীদের একটা কাছে থেকে এটা-আরেকটা থেকে ওটা ধার নিয়ে, কোলাস করে তৈরি হয়ে স্বপ্নের বাস্তবায়ন। গল্প লেখার উৎস তৈরি হয় এভাবেই। স্বযত্নে তুলে রাখা কতগুলোর স্মৃতির কোলাস এই গল্প। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবন বাস্তবতা, জীবন জিজ্ঞাসা। গল্প হয়ে ওঠার জন্য যা অত্যন্ত জরুরি।
গল্পে ওঠে আসা চরিত্রগুলো আমার খুব কাছ থেকে দেখা। এরা আমার চারপাশের মানুষ, কাছের মানুষ। ক্রিয়া করে নিজেদের মতো। বিভিন্ন সময় দেখেছি এদের-কখনো ভেতর থেকে, কখনো বাইরে থেকে। কোনো কোনো চরিত্র অবিকল উঠে এসেছে। কোনোটা বদল হয়েছে, অন্য নামে। এক সময়ের ঘটনা গেঁথে গেছে আরেক সময়ের শরীরে। হাত ধরাধরি করে এগিয়ে গেছে। এইসব আপাত দৃশ্যের গভীরে আরো কিছু নিহিত থাকে। দৃশ্যগুলো পরস্পর মিলিত হয়ে পরিষ্কার করে সেই গভীরতম দৃশ্য। যা খালি চোখে দেখা যায় না। রুশ-প্রকরণবাদ যাকে বলে অবিদিতকরণ-মানে- নাচে ভেতরে লুকিয়ে থাকে হাঁটা দৃশ্য, অনুভূত হয়া গভীর ভাবে-তেমন করে উঠে এসেছে সব। বলা যায়, আকর কাহিনী ও শিল্পিত কাহিনী। গল্পে ভেতরে লুকিয়ে আছে বাস্তবতা। কামাল, ইয়াকুব বুড়ো, মিনু, তার মা, বিষুকা, ময়না, মধু, মা, ভাবি সবই আছে-জীবন্ত, এখনো। রাস্তা, কুম, গ্রাম, চক সেখানেই আছে, যেখানে ছিল।
কামাল, ইয়াকুব বুড়ো বাস্তবে যা, গল্পে হুবহু তা-ই উঠে এসেছে। রাতে কামালের সঙ্গে বহুদিন দেখা হয়েছে স্ট্যান্ডে। তেমন কথা-বার্তাও হয়েছে তার সঙ্গে। গল্পে শুরুতে যে রাতের দৃশ্য তাও আমার অভিজ্ঞতার বর্ণনা। একটা পাগলীকেও দেখে ছিলাম, ওই ভাবে। কিন্তু পরে, মায়ের বর্ণনায় যে পাগলী, তার সন্তান জন্মদান ও শিশু চুরি যাওয়ার ঘটনা-তাও ঠিক আছে। কিন্তু ঘটনাটা অনেক আগের। আমার স্কুল বেলার। আর দর্শকও আমি, মা নয়। এ সময়, ভাবি বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সন্তান হচ্ছিল না। মানুষে নানা কথা বলতো তাকে। এমন নারী আমাদের গ্রামে অনেক ছিল। আমি তাদের কাঁদতে দেখেছি, বিমর্ষ দেখেছি। একদিকে পাগলী ‘অবৈধ’ সন্তান জন্মদিচ্ছে, অন্যদিকে ভদ্র-সমাজের অংশ হয়েও তাদের কোনো সন্তান হচ্ছে না। এটা একটা মানুষিক দ্বন্দ্বের জন্ম দেয়। ভদ্র সমাজের নারীর জন্য পাগলীর সন্তান চুরি করতে হচ্ছে। অথচ, পাগলীর কেউ নেই। এটাও আরেকটা দ্বন্দ্ব।
আমার যে গ্রামে জন্ম, সেখানে বিদেশ যাওয়া একটা অমোঘ নিয়তি। বছরের পর বছর বিদেশে থাকে। বিশেষ করে বিদেশ যাওয়ার আগে বিয়ে করারও একটা প্রবণতা আছে। তারা মনে করে টাকা পাঠালেই বুঝি সব দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। তারাও বিদেশে জৈবিক জীবনে ফেরারী হয়ে থাকে। আর গ্রামে, সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী একনিদারুণ কষ্ট নিয়ে দিনাতিপাত করে। সেই অতৃপ্ততা, যন্ত্রণা থেকে সংসারে নানা সংঘাত তৈরি। শ্বশুর বাড়ির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়ে। মানসিক যন্ত্রণাও বাড়ে। তাদের সেই মানসিক কষ্টের সঙ্গে বাস্তবতার এই দ্বন্দ্ব জুড়ে দিয়েছি।
মধু নামে আমার এক খেলার সাথী ছিল। আমাদের বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে। ওর সঙ্গে সদ্য কাটা পুকুরে বরফ-পানি, কুমির-কুমির, দাঁড়িয়া বাঁধা খেললাম আগের দিন। পরের দিনই শুনি ছেলেপক্ষ ওকে আশির্বাদ করেগেছে। আমি খুব আশ্চর্য হলাম। দুঃখ পেলাম। কেন, জানি না। তার পর থেকে ওর সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। ওর স্বামী আছে সংসার আছে। কিন্তু গল্পে মধুর স্বামী মারা গেছে, দু’টি সন্তানও আছে। যা ছেলেবেলার মধু’র সঙ্গে মিলে না। এমন দু’টি সন্তান সমেত একজন বিধবা আমাদের গ্রামে আছে। সেও আমার খেলার সঙ্গী ছিল, তবে বয়সে মধু’র চেয়ে বড়। তার সঙ্গে আমার স্মৃতি আছে। যখন তখন ওদের বাড়ি যেতাম। এক সঙ্গে স্কুলে যেতাম আমরা। পুজোয় নেমন্তন দিতো। সে  বিধবা হয়ে ফিরে আসার পর ওর বাবা সত্যি সত্যি বাড়ির চারপাশ বেড়া দিয়ে দেয়। বাইরে পড়ে ওদের ঝুনকি জবা গাছটা। গাছটা দেখে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে যেত। ছেলেবেলার মধুকে এনে মিলিয়ে দিলাম বিধবা মধু’র সঙ্গে। তাতে শৈশব স্মৃতির একচিলতে মধু, পূর্ণঙ্গ মধু হয়ে ওঠলো। শুধু বিধবা মধুর বাবার নামটা বদলে দিতে হয়েছে।
গল্পের মিনু আর বাস্তবের মিনু একই। একদিন মিনু আমাদের চুলাপাড়ে দাঁড়িয়ে বলে ছিল, আমারে বিয়ে করবে কে? সেটা অনেক আগের কথা। কিন্তু আমাদের চুলাপাড় তো শোবার ঘর থেকে খানিকটা দূরে। ঘটনা ঘনিষ্ট ভাবে উপস্থাপনের জন্য ঘরের কাছে নিয়ে এসেছি। ঘটনাটা বলার জন্য নিজের উপস্থিতি জরুরি ছিল। আশেপাশে কারো বিয়ে হলে মিনু সত্যি সত্যি পাগলামো জুড়ে দেয়। একদিন মিনুকে দেখেছি, মাঠে ছাগল আনতে গিয়ে ওরকম একটা বিয়ে বাড়ির দিয়ে বিহ্বল ভাবে তাকিয়ে আছে। মিনু ও তার মা’র ঝগড়ার মুখোমুখি হই একদিন, কুম-এ গোসল করতে গিয়ে। মিনু ওই কথাগুলোই বলেছিল। মিনুর মানসিক অবস্থা বোঝা জন্য ইন্টার মিডিয়েটে পড়াকালীন একটা অবিজ্ঞতাকে উপস্থিত করতে হয়েছে।
পালকিতে করে বউ আনার প্রচলন এখনো থাকলেও, মাপায় করে বউ আনা এখন কালেভাদ্রে দেখা যায়। মূলত যারা পালকি ভাড়া কতে পারেন না, তারা মাপায় করে বউ আনে। মাপা কাঠের তৈরি উন্মুক্ত বাক্স। কোনো ছাওনি নেই। নিচে নাইলনে বুনানো, একজন বসার উপযোগী। বউ আনার সময় চারপাশ রঙিন কাপড়ে ঘিড়ে নেয়া হয়। এটা গরীবের পালকি। গল্পের মনিরের পেশা ঠিক থাকলেও বিয়েটা আসলে তার ছোট ভাইয়ের। নববধুকে দেখার যে কৌতুহল তা গল্পের মতোই। রাস্তার জায়গায় জায়গায় ওই ভাবে বধু দেখে। মিনু যেদিন বিয়ে নিয়ে মায়ের সঙ্গে তর্ক করছিল, সেদিন মনিরের ছোট ভাই মাপায় করে বউ আনে। আমার বারবার মনে হয়েছে, এই সময় মিনু কাছে থাকলে কি করতো? গল্পে তারই চিত্রায়ণ দেয়া যায়।
গল্পে এক-একটি নতুন চরিত্র আসছে। আর আমি তার ছোট্ট বর্ণনা জুড়ে দিচ্ছি। যেন বিষয়টা বিশ্বস্ত থাকে। পাঠের সময় যেমন পাঠকের সক্ষমতা তৈরি হয়। নয় তো তিনি সটকে পড়বেন। এক-একটি দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে, আর পাঠক তা হৃদয়ঙ্গম করছেন। প্রতিটি দ্বন্দ্বের ইশারা আগেই দেয়া হয়েছে। সচেতন পাঠক মাত্রই তা বুঝতে পারবে। কখনো কখনো ঢুকে যাচ্ছে গল্প। কোনোটা বর্ণনায়, কোনোটা আবার চরিত্রের বক্তব্যে। তাতে বিষয় উপস্থাপনের বৈচিত্র্য রক্ষা হয়। গল্পটা যেহেতু আবেগ, স্মৃতি আর দৃশ্য দর্শনের মধ্যদিয়ে দ্বন্দ্বের দিকে যাচ্ছে, সেহেতু পাঠকের নাকের ডগায় উপদেশ বা সিদ্ধান্ত ঝুলিয়ে দেয়ার চেয়ে বিশ্বস্ত বয়ান তৈরি করে দেয়া ভাল। তাছাড়া একটা দ্বন্দ্বের দিকে এগিয়ে না গিয়ে, দ্বন্দ্বগুলো আমি গল্পজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছি।
     এটা একটা বিকাশমান গ্রামীণ বাস্তবতায় নারীর যন্ত্রণার চিত্র। গল্পের শুরুতে পাকা রাস্তা নির্মাণের বর্ণনা সেই বিকাশমানতাকে নির্দেশ করে। কিন্তু সমাজ বাস্তবতা যাই হোক- গ্রামীণ কি শহুরে; উচ্চ কি নিম্ন; অজ কি আধুনিক-নারীর যে অন্তঃদহন তা সবখানে, সবকালের বাস্তবতা। সেটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চারুলতা থেকে আমাদের মধু-মিনু-ভাবি, সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। পাশাপাশি, চারজন সন্তানের জননী হয়েও একজন মায়ের একাকিত্ব, আকুতি থেকেই যায়। সন্তানের জীবন-জীবিকার প্রয়োজনেই ছড়িয়ে পড়েছে। মায়ের যন্ত্রণা দেখতে গেলে তাদের জীবন চলতে না। কিন্তু এই যন্ত্রণা কোনো ভাবেই অস্বীকার করা যায় না। আবার একজন পাগলীর সন্তান চুরি যাওয়ার কারণে একাকীত্বে ভুগছে। হোক না তিনি পাগলী, কিন্তু সন্তান জন্মদানের সামর্থ তো তার। যন্ত্রণাটাও যে তার, সেটা সহজে অনুমেয়।
প্রশ্ন হতে পারে, আমি কি মানুষের ব্যাক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেছি? এর সঙ্গে আরো একটি প্রশ্ন তৈরি করা সম্ভব, শিল্পের স্বাধীনতা আসলে কি? তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, লেখক এখানে চরিত্রগুলো বিশ্বস্ত ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন কি না? শিল্প-সাহিত্য অনেক আগেই নারীর এই মনোস্তাত্তিক প্রকরণ উন্মোচনের জন্য হাড়িতে হাত দিয়েছে।
গল্পে স্থানের নাম উহ্য রাখার মধ্যদিয়ে চরিত্রগুলো চিরন্তন রূপ পেয়েছে। মধু-ভাবি-মা হয়ে ওঠেছে চিরায়ত যন্ত্রণা দগ্ধ নারীর প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে মিনু-পাগলী-দুধ বাজারের পাগলীর জীবনের মধ্যদিয়ে তৈরি হয়েছে মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা বহিঃপ্রকাশ। অথচ সমাজে আমরা এনিয়ে কথা বলতে চাই না। কোথায় যেন সাবধান আঁটা আছে। প্রতিনিয়ত, তাদের বিমর্ষ চেহারা দেখতে দেখতে আমাদের যেন গা-সহা হয়েগেছে। পরিবারের বাইরের কোনো নারীদের নিয়ে যতটা কথা হয়, নিজের কাছের নারী- মা-ভাবি-স্ত্রী-বোন- এদের তেমন কিছুই হয় না। সবাই এড়িয়ে যাই। মুখোমুখি হতে ভয় পাই। যদি কোনো বাস্তবতা, অপ্রিয় সত্য, বেরিয়ে আসে! ভয় সেখানেই।
মা-বাবা, স্ত্রী-বোন নিয়ে গালি আসলে মাটিরই একটা সংস্কৃতি। সংস্কৃতি যেমন পালকিতে করে বিয়ে করা। গালিগালাজও তেমনি। গালিগালাজের কোনো সরল ব্যাকরণ নেই। আন্তরিকতা, রিশতা, জীবনসংগ্রামেরই বহিঃপ্রকাশ। এই খিস্তি-খেউরের ভেতরে যে যৌনজীবনের গন্ধ মেলে, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে সেইসব পিছিয়ে পড়া অসহায় মানুষগুলোর স্বপ্নের প্রতিচ্ছিবি। ফলে এ গালি আর গালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আপাত তাদের ভাষা শুনলে একে ‘অশ্লীলতা’ও মনে হতে পারে। কিন্তু এটা শ্রম-ঘাম, কষ্ট ভুলে থাকার থাকার একটি বিনোদনও বটে। এটাই মাটি ঘেঁসা মানুষের গালি-গালাজের নৃ-তত্ত্ব। তাছাড়া মা-বাবাকে সম্বোধন করে গালি দেয়া মধ্যদিয়ে আসলে মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতিতে আঘাতেরই চেষ্টার করে। এটাই গালির মনোস্তত্ত্ব। মাটি ঘেঁষা মানুষের মতো সারল্য, গভীর আত্মীয়তা বোধ না থাকলে ওই সব গালি কেউ কাউকে দিতে পাড়বে না।
গভীর রাতে নারীর কান্না আমি বহুদিন শুনেছি। অনেক সময় একে প্রেতাত্মা বলেও অবিহিত করা হয়। এর মধ্যদিয়ে নারীর কান্দনকেই রহিত করণ করা হয়, উপেক্ষা করা হয়। কিন্তু এই যন্ত্রণাকে তো অস্বীকার বা উপেক্ষা করা যায় না। তাই মধু-ভাবি-মা-মিনু- সবাই কাঁদে। কিন্তু কোনো কান্নাই স্বীকৃতি পায় না। তাই কান্নার শব্দ শোনা যায়, যায় না।


অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। পদ্মার পাড় ঘেঁষে গ্রামের অবস্থান। গহীন গ্রাম। এখানে প্রধানত কলু, কাহার, জেলে, মুচি, তাঁতী, নিম্নবর্গে মানুষের বসত করে। প্রতিবছর পদ্মায় ভাঙে। অজস্র মানুষ স্বপ্নভাঙ্গা স্মৃতি নিয়ে শহরমুখী হয়। অধিকাংশ তরুণ জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমায় বিদেশে। এটাই যেন নিয়তি। এসবের ভেতরেও থাকে ঘটনা, নানা ঘটনা। এইসব জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। গুলতির বোবা রেখা তাক করে জঙ্গলে জঙ্গলে কেটেছে শৈশব। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজ থেকে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত।



1 টি মন্তব্য:

  1. আসলেই ভাই গালাগালি না দিলে বন্ধু মহলে শুধু গালি হজমই করতে হয় । আমি অর্ধেক মত গল্পটা পড়লাম । যা বুঝলাম, এইসব ঘটনা আমাদের আশেপাশের চৌহদ্দিতেই ঘটে যা নিয়ে আমরা কখনও ঘাটাই না । বুঝেও না বুঝার ভান করে বসে থাকি । আসলে সবাই এমনই । পাগলির বেপারটা পুরাটা না পড়লে বুঝা দুরহ । গল্পটা শেষ করার পর আবার কিছু বলার থাকলে বলব । email:humayunj80@yahoo.com

    উত্তরমুছুন