বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

রমাপদ চৌধুরীর গল্প ‘পোস্টমর্টেম’ নিয়ে আলোচনা-অলাত এহ্সান


‘ফাঁসের দড়িতে আটকে থাকা সময় ও জীবনের ব্যবচ্ছেদ’

শোনা গেলো লাশকাটা ঘরে
নিয়ে গেছে তারে
কাল রাতে-ফাল্গুনের রাতের আঁধারেগ
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ
মরিবার হ’লো তার সাধ
বধূ শুয়ে ছিলো পাশে-শিশুটিও ছিলো

প্রেম ছিলো, আশা ছিলো-জ্যোৎস্নায়,-তবু সে দেখিল
কোন ভূত? ঘুম কেন ভেঙে গেলো তার?
অথবা হয়নি ঘুম বহুকাল-লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার।
-----------------(আটবছর আগের একদিন/জীবনানন্দ দাশ)


ধনঞ্জয়বাবু মারাগেছেন। গত রাতেই মারাগেছেন। ধনঞ্জয়বাবুর মাঝ বয়সী স্ত্রী আছে, সন্তান আছে-এক ছেলে, এক মেয়ে আছে। আর আছেন বুড়ি মা। ধনঞ্জয়বাবুর পাড়ারই মানুষ সতীশবাবু। তিনি ধনঞ্জয়ের মৃত্যু কথা তখন অব্দি জানেন না। সতীশবাবুর স্ত্রীও জানেন না। বেশ জোরে জোরে, কাছে কোথাও দরজার ধাক্কার শব্দের সকালের ‘উপাদেয় বিলাস’ ঘুম ভেঙে যায় তার। বাসন মাজার ঝি’র কাছে জানতে পারেন লালবাড়ির একতলার বাবু ‘গলায় দড়ি দিয়েছে’। মৃত্যু তো বটেই, আত্মহত্যা। রীতিমতো গলায় দড়ি! গতকালই ধনঞ্জয়বাবুর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। বিশ্বাস হচ্ছিল না কিছুতে। তিনি বেড়িরে পড়লেন মৃতর বাড়ির উদ্দেশ্যে। ঘটনা স্থলের দিকে। তার আগে রমাপদ চৌধুরী আপাত পরিবেশের যে বর্ণনা দেন, তাতে সতীশবাবুর ‘উপাদেয় বিলাস’কেই আরো উপভোগ্য মনে হয়। সতীশবাবু তার স্ত্রী নিয়ে সুখেই আছেন। এই সুখ নির্বিঘ্ন-অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আশেপাশের অনেক বিষয়েই তারা নির্লিপ্ত থাকেন, থাকতে চান। তারপরও সমাজে বা চারপাশের কোনো কোনো ঘটনা তাদের সুখে বিঘ্ন ঘটায়। ‘আজকের দিনটা ব্যতিক্রম’-এই বাক্য; সেই সঙ্গে দিনটা কেন ব্যতিক্রম, কিভাবে ব্যতিক্রম-এই প্রশ্নের নিয়ে আমরা গল্পে প্রবেশ করি। এই হলো গল্পের শুরু। খুব সাধারণ। কিন্তু উচ্চগ্রাম। বোঝা যায়, আমাদের মনে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়ার মধ্যদিয়ে গল্প এগুবে, অথবা গল্পে এইসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে। আপাত সুন্দর সকালের বর্ণনা ও ‘আজকের দিনটা ব্যতিক্রম’ ঘোষণার মধ্যে তৈরি হওয়া বৈপরিত্য ও প্রশ্ন গল্পের নাকের ডগায় ঝুলিয়ে গল্প তৈরি বহু পুরনো একটি পদ্ধতি। রমাপদ চৌধুরি এই ফর্ম ব্যবহার খুব সচেতন। তিরি এর মাধ্যমে আমাদের তার গল্পের বিষয় বক্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তখন আমাদের কাছে বারবার ফিরে আসে জীবনানন্দ দাশের ‘আটবছর আগের একদিন’ কবিতার ওই সব লাইন। রমাপদ চৌধুরীর অগ্রজ জীবনানন্দ দাশের জীবনও আমাদের জন্য একটি টেক্স হিসেবে মনে পড়ে। সে এক ট্রাজেডি।

একটা ট্রাজেডি নিয়ে ‘পোস্টমর্টেম’ গল্প। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা কোনো ট্রাজেডিক গল্প নয়। অনেক বেশি মনোস্তাত্তিক গল্প। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চাপা কৌতুক ও ব্যঙ্গ। ১৯৮১ সালে লেখা এই গল্পটি তার ‘পোস্টমর্টেম’ গল্পগ্রন্থের নাম গল্প। বোঝাই যাচ্ছে, গল্পটা রমাপদ চৌধুরীর প্রতিনিধিত্ব করে। তাই গল্পের নাম হয়ে ওঠছে গ্রন্থের নাম। কাকতালীয় হলেও সত্য, রমাপদ চৌধুরীর প্রথম গল্পের নাম ‘ট্রাজেডি’। ১৯৪০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র। বয়স আঠারো বছর। কলেজ পালানো এক দুপুরে কলেজ স্ট্রিটের ওয়াইএমসিএ-র নীচের রেস্তরাঁয় বসে লেখেন গল্পটি। দুই হবু-সাহিত্যিক বন্ধু পাল্লায় পড়ে লেখা। গল্পটি ছাপা হয় ‘আজকাল’ সাপ্তাহিকে। সেই শুরু। তারপর সঞ্জয় ভট্টাচার্যের ‘পূর্বাশা’ ও হুমায়ুন কবীরের ‘চতুরঙ্গ’ ত্রৈমাসিকের নিয়মিত লেখক তিনি। পঁচিশ বছর বয়স থেকেই তিনি সাপ্তাহিক ‘দেশ’ ও শারদীয় আনন্দবাজারের স্থায়ী লেখক হয়ে যান। সময়টা তখন চল্লিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ, ১৯৪৭-’৫০। এটাই গল্পকার রমাপদ চৌধুরীর উন্মেষ কাল। তখন নিজেই ‘ইদানিং’ ও পরে ‘রমাপদ চৌধুরীর পত্রিকা’ নামে পত্রিকার সম্পাদনা করছেন। এ সময়ের মধ্যেই লিখে ফেলেছেন বেশ কিছু স্বার্থক গল্প।

ইতোমধ্যে তিনি দেখছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের করুন কঠিন দৃশ্য, যুদ্ধের পরের দাঙ্গা, দেশ বিভাগের ফলে বসতভিটা ফেলে অশ্রুসজল চোখে মানুষের চলে যাওয়া, চোখের জলে তাদের বিদায় দিতে দিতে চোখের সীমানায় উদ্বাস্তু, বাস্তুত্যাগী মানুষের আগমন। ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। কলকাতার বুকে মন্বন্তরের বিভৎষ্যতা। স্বাধীনতার প্রাপ্তির উচ্ছ্বাস আর অসারতা। এর মধ্যেদিয়ে লতিয়ে উঠছেন গণবিক্ষোভ, বামপন্থী রাজনীতির উত্থান। ঘটছে মধ্যবিত্তের বিকাশ। সমাজে মধ্যবিত্তের মানসিকতার প্রভাব-দোলাচল, অনিশ্চয়তা, হতাশা, প্রতারণা ইত্যাদি দেখা যায়। এসব কিছু গল্পকার রমাপদ চৌধুরীর মানষ ভূমে সাহিত্যের ভাষা ও বিষয়বস্তু তৈরি করছিল নিশ্চয়ই। তার গল্প-উপন্যাসে এসব এসেছে বিভিন্ন ভাবে। কখনো সরাসরি, কখনো প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তবে তার গল্পে একটি যুগযন্ত্রণা প্রকাশ পায়। যে কারণে তিনি বিভিন্ন ভাবে সমাজের কপটতাতে আঘাত করেন। বিষয়বস্তু নির্বাচন করেন সে-ভাবেই। গল্প দিয়েই রমাপদ চৌধুরীর সাহিত্য যাত্রা শুরু। পরবর্তীতে তিনি স্বার্থক উপন্যাসও রচনা করেছেন একাধিক। তবে উপন্যাস ও গল্পের বিষয়বস্তু আলাদা। তিনি খুব সচেতন হিসেবে এর প্রকরণ করে থাকেন। ঔপন্যাসিকের কাছে গল্পকারের দৃষ্টিভঙ্গির কৃতিত্ব কোথায় তাও তিনি নির্ণয় করেছেন। তিনি একটি মহাযুদ্ধের দৃশ্যকল্প সামনে এনে বুঝিয়ে দেন সেই কৃতিত্ব। যুদ্ধের বিশাল-বিরাট আয়োজন, পুঙ্খানুপুঙ্খু বর্ণনা, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা ঔপন্যাসিকের কাজ। এখানে গল্পকারের কৃতিত্ব কোথায়? রমাপদ চৌধুরী লিখেন-

‘হঠাৎ তিনি ছোটগল্প-লেখককে দেখতে পাবেন বনের ধারে, একটি গাছের ছায়ায় বসে আছেন উদাস দৃষ্টি মেলে। এ কোন্ উন্নাসিক লেখক?-মনে মনে ভাবলেন ঔপন্যাসিক। কোনো মিনারের চূড়ায় উঠলো না দেখলো না যুদ্ধের ইতিবৃত্ত, শোভাযাত্রার সঙ্গ নিলো না, এ কেমন ধারা সাহিত্যিক! হয়তো এমন কথা বলবেনও তিনি ছোটগল্প-লেখককে। আর তখন, অত্যন্ত দীর্ঘ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ চেয়ে তাকাবেন ছোটগল্পের লেখক, বলবেন হয়তো, না বন্ধু, এসব কিছুই আমি দেখিনি। কিছুই আমার দেখার নেই। শুধু একটি দৃশ্যই আমি দেখেছি। বনের ওপারে কোনো গবাক্ষের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করবেন তিনি, সেখানে একটি নারীর শঙ্কাকাতর চোখ সমগ্র শোভাযাত্রা তন্ন তন্ন করে খুঁজে ব্যর্থ হয়েছে, চোখের কোণে যার হতাশার বিন্দু ফুটে উঠেছে-কে যেন ফেরেনি, কে একজন ফেরেনি। ছোটগল্পের লেখক সেই ব্যথাবিন্দুর, চোখের টলোমলো অশ্রুর ভেতর সমগ্র যুদ্ধের ছবি দেখতে পাবেন, বলবন হয়তো, বন্ধু হে, ঐ অশ্রুবিন্দুর মধ্যেই আমার অনন্ত সিন্ধু।’(ভূমিকা/রমাপদ চৌধুরী-গল্পসমগ্র)



২.

বিন্দুতে ‘অনন্ত সিন্ধু’ খোঁজার প্রয়াস রমাপদ চৌধুরীর প্রায় সব গল্পেই দেখা যায়। এটা তার গল্প সম্পর্কিত ভাবনা, আত্মগত বিশ্লেষণ। ‘পোস্টমর্টেম’ গল্পেও আমরা একই প্রকরণ দেখতে পাই। পোস্টমর্টেম একটি প্রতীক। তিনি এর প্রতীকি ব্যবহার করেছেন। যে কারণে গল্পকার একটি শবদেহকে ব্যবচ্ছেদের দিকে যাননি। অর্থাৎ লাশকাটা ঘরে কিংবা অপারেশন থিয়েটারের জমাট বাঁধা নিরাবতার মাঝে, লেজার লাইটের নিচে, নিথর শরীরকে ঘিরে নিরাপত্তা বজায় রেখে, নিরাবেগ থেকে, মাস্ক আঁটা মুক মুখে ডাক্তাররা যেভাবে তীক্ষ্ণ ব্লেড চালিয়ে দেয় মৃতের শরীরে। পেট চিড়েন, বুক চিড়েন। ক্ষত দেখে, হৃদপিণ্ড-যকৃত দেখে দেখে বোঝার চেষ্টা করেন কোন রোগে, কোন আঘাতে মানুষটার মৃত্যু হয়েছে। গল্পকার এখানে অতিগোপন, অতিসাবধানী কিছু করেননি। মৃত্যুর প্রকরণ সামনে আনতে চাননি। চাননি বলে বেছে নিয়েছেন আত্মহত্যার মতো গভীর-গূঢ় রহস্যময় একটা বিষয়কে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, সমাজের-মনের গভীর যে অসুখ বিরাজ করছে, তাকে। তাই তার অপরেশন থিয়েটার এই সমাজ। পিনপত্তমনময় নিরবতার ভেতর নয়, জীবনের কোলোকলে এই ব্যবচ্ছেদ। মৃত্যুকে ব্যবচ্ছেদকারী মানুষের মুখ খোলা, মৃত্যুর কাছাকাছি তাদেরও অবস্থান, তারা ব্যবচ্ছেদ করেন, গন্ধ দ্বারা-কারণ দ্বারা আকীর্ণ হন, আত্কে ওঠেন। আবিষ্কার করেন সময়ের হল্লার মাঝে সমাজ কতটা অসুস্থ। আত্মহত্যা এখনে একটা পথ, নিরব ও কঠিন। এইসব পঁচাগলা সমাজ ও সংকট থেকে তাই গলায় তুলেনেয় ফাঁসে দড়ি, ঠোঁটে তুলে নেয় বিষ। এই পথ কেমন সর্পিল, এঁকে-বেঁকে, সবার উঠনে এসে ঠেকেছে। একজনের মৃত্যু আর সবার উঠনে মৃত্যুর নিশানা চোখে ধরিয়ে দিচ্ছে। তাই ধনঞ্জয়বাবুর ফাঁসের দড়িতে আটকে থাকে সময় ও মানুষ। তাই গল্পে আত্মহত্যার ‘পোস্টমর্টেম’ তথা ব্যবচ্ছেদ হয়েছে দুই ভাবে- ১. সমাজের প্রতিক্রিয়ায় মানুষ কি ভাবে আত্মহত্যা করে ও করতে পারেন এবং ২. কেউ আত্মহত্যা করলে সামাজের মানুষ কিভাবে ক্রিয়া করে।



৩.

‘শেষপর্যন্ত ধনঞ্জয়বাবু’-আকস্মিক ও হতভম্ব এই উচ্চারণ সতীশবাবুর। যাকে ব্যক্তিজীবনে অসুখি বলা যাবে। ব্যানার্জিবাবু’র নিকট সতীশবাবু দুঃখ প্রকাশ থেকে বোঝা যায়, আসলে একটা গভীর অসুখ সমাজের ভেতরে বাসা বেঁধেছে। শারীরিক অসুখের জন্য ফার্মাসির স্মরণাপন্ন হলে চলে, কিন্তু সমাজের গভীর অসুখের কোনো চিকিৎসা নেই। কে কখন সমাজ দেহ, সময় প্রবাহের প্রতি বিতশ্রদ্ধ হয়ে নিজেকে গুটিয়ে নিবে, তা কেউ বলতে পারে না। রমাপদ চৌধুরীর যাত্রা এই দুইয়ের দিকে। তিনি যেমন সমজের গভীরে অনুসন্ধান করেন ‘গলায় দড়ি’ দেয়ার কারণ। আবার দেখান, এই নিয়ে সমাজ দেহে কি ক্ষত তৈরি হয়। আসলে এই ক্ষতদর্শনই তাকে তাড়িত করে এর কারণ অনুসন্ধানেরর। এর মধ্যদিয়ে যে আয়না তৈরি হয়, সেখানে ধরা পড়ে আপাত সুখি মানুষগুলোর ভেতরেও লুকিয়ে থাকা অজস্র ক্ষত। যা সাধারণত চোখে পড়ে না। কিংবা সযত্নে আড়াল করে রাখেন তারা। তিনি এই আড়াল উন্মোচন করেন মানব মনের গলি-রন্ধ্র অনুসন্ধানের মধ্যদিয়ে।

গল্পের ঘটনাগুলো মুটোমুটি চারটি পর্বে ঘটছে। প্রথম পর্বে দেখা যায় আত্মরক্ষার আকরে জনবিচ্ছিন্ন মানুষ ঘটনার স্থলে জড় হচ্ছে। দ্বিতীয় পর্বে, ধনঞ্জয়বাবু আত্মহত্যা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দায়হীন বিশ্লেষণ করছে। তৃতীয় পর্বে আমরা উপস্থিত হচ্ছি গল্পের চরম মুহূর্তে। চরম মুহূর্তে সবার বুদ্বুদ ফেটে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে একটা গুমোট অবস্থা। এবং চতুর্থ পর্বে আমরা উপনিত হচ্ছে সমাপ্তির দিকে। একটা দৃশ্য দর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সবাই যে যার কাজে ফিরে যাচ্ছে। পরে থাকছে সমস্যা সঙ্কুল ধনঞ্জয়বাবুর পরিবার।

প্রথম পর্বে চরিত্রগুলোর ঘটনাস্থালে আগমনগুলো লক্ষ্যণীয়। সতীশবাবুর ‘সঙ্কোচের পায়ে এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে’; ব্যানার্জিবাবু দোতলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন পরিচিত কাউকে পাওয়া যায় কি না; দত্তকে দেখতে পেয়ে সেদিকেই সবাই এগিয়ে গেলেন, পৌঁছলেন জটলার কাছে। একটা নামী প্রাইভেট ফার্মে বড় অফিসার সুমন্তবাবু ফুটফুটে সাদা পায়জামা, পায়ে দামী নকশা-প্যাঁচ কোলাপুরি চটি গলি হাতে সিগারেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জটলার কাছেই। এই সব চরিত্র ঘটনার খুব কাছে থাকলেও একধরণের দূরত্ব রয়েগেছে, বোঝা যায়। আমরা প্রথমেই লক্ষ্য করি, সতীশবাবু জানতেনই না, লোকটা মারা গেছে কি না। বুঝতে পারি, তার এই অজ্ঞতা সমাজ বাস্তবতা, জনবিচ্ছিন্নতা থেকে উৎসারিত।



৪.

আত্মহত্যা যেমন অস্তিত্ববাদী প্রয়াস, তেমনি এটি কার্যকারণিক ব্যাপারও বটে। মানুষ যখন আত্মহত্যার দার্শনিদিক উন্মোচন করতে না পারেন, তখন তাকে কার্যকারণিক বলে নির্দেশ করেন। আপাত ধরে নেয়া হচ্ছে, সুখের অভাবেই মানুষ আত্মহত্যা করছে। এক্ষেত্রে রাহাদের ছেলে সঞ্জয়ের বক্তব্য আরো স্পষ্ট, ‘কে কতখানি আনহ্যাপি তার থার্মোমিটার তো আমাদের হাতে নেই।’ ‘সুইসাইড করলেই ঘর-সংসারের কথা ভাবতে যাওয়া বোকামি’-ব্যানার্জিবাবু বলছেন এ কথা। সতীশবাবু বলে দিলেন-‘আত্মহত্যা করার হাজারটা কারণ থাকে’। এর মধ্যদিয়েটা বিশাল স্পেস পেয়ে যায়। পাঠক মাত্রই তার নিজস্ব অভিজ্ঞতা, জানাশোনাকে মেলাতে থাকেন। তাদের বিশ্লেষণে কিংবা সন্দেহে ধনঞ্জয়বাবুর মৃত্যুর যেসব কারণ উঠে আসে তাহলো-১. পারিবারিক অশান্তি, ২. অফিসের ওপরওয়ালার ইনসাল্ট, ৩. টু মেক ইট সামথিং ড্রামা; ৪. একজনকে অথবা একধিক ব্যক্তিকে অ্যাকিউজ(দোষারোপ), ৫. জীবনের বীতস্পৃহ হওয়া, ৬. একধরনের প্রতিবাদ, ৭. আত্মসম্মান বোধ থেকে, ৮. অভিমান বা রাগ, ৯. ধার-দেনা, ১০. টেম্পোটারারি ইনস্যানিটি, ১১. পরকীয়া, ১২. এসকেপিস্ট মেন্টালিটি, কিংবা ১৩. জীবনের কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে তিনি গলায় দড়ি দিয়েছেন। মৃত্যু বা আত্মহত্যার চিন্তার মধ্যদিয়ে ব্যক্তি নিজের সম্পর্কে সচতেন হয়ে ওঠে। যদিও কখনো তা এড়াতে পারেন না। মৃত্যুকে অস্বীকার বা আপত্তি করার উপায় না থাকলেও সতীশবাবুদের কাছে মনে অমানবিক মনে হয়। মৃত্যু যত বিভৎস হোক না কেন, তাকে মানবিক করার প্রয়াস তাদের মধ্যে কাজ করে। তাই ‘গলায় দড়ি’ আপত্তিকর ঠেকে। বরং তারা নির্দেশ করে অন্য কোনো পথ। যেমন- স্লিপিং পিল। তার মানে সমাজের মানুষ মৃত্যুর নানা পদ্ধতি সম্পর্কে জানে। অর্থাৎ আত্মহত্যা সমাজের একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। আবার একজন কোনো পথ না পেয়ে মন্তব্য করেন ‘আজকালের দিনে দিনে শিক্ষিত মানুষ...’।



৫.

ও সি আসে যথারীতি মরদেহ নিয়ে যেতে। এজন্য স্থানীয় দুইজন লোকের স্বাক্ষ তার প্রয়োজন। তিনি যখন বলেন, আপানের মধ্য থেকে দু’জন ভেতরে আসেন। তখন একে একে সবাই কোনো না-কোনো অযুহাত দেখিয়ে সরে পড়তে চাইছিলেন। এই দুইজনের মধ্যে তারা কেউ নিজেকে দেখতে চান না। মৃত্যুর চেয়ে মৃত্যুর ভয়ই তাদের কাছে ভয়ংকর। অথচ তারাই কিন্তু ধনঞ্জয়বাবুর মৃত্যুর বিষয়ে সবচেয়ে আগ্রহী দর্শক। মৃত্যু বিষয়ে সব চেয়ে গূঢ় বিশ্লেষণ করছেন। কিন্তু কেউ পুলিশের কাজে সাহায্য করতে যাবেন না। এর মধ্য দিয়ে সমাজে মধ্যবিত্তদের দায়হীন উদ্বেগকে চিহ্নিত করেছেন লেখক। ধনঞ্জয়বাবুর কাজের মেয়ের ভাষায় লেখক উপহাস করেন,‘বাবুদের মতন হুজুগে দেখতে এয়েছেন’। এরমধ্য দিয়ে আমরা গল্পের চমর মুহূর্তে উপনিত হচ্ছি। অথচ সতীশবাবু যখন প্রত্যুৎপন্নমতিত্যের অভাবে বা হতবুদ্ধিতার জন্য ভেতরে যেতে বাধ্য হচ্ছে, তখন সবাই আবার ভীর করছে, বিষয়টা শেষ পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করার জন্য।



মৃত্যু একটি ফোবিয়া: সমাজে অনেক ধরনের ফোবিয়া তথা ভয়-আতঙ্ক থাকে। যেমন-কুকুর, তেলাপোকা, টিকটিকি, বিছাপোকা, বেড়াল বা অতিপ্রাকৃত বস্তুতে ফোবিয়া। ফোবিয়া মনঃসমীক্ষিয় ব্যাপার। মানুষ ওই সব বস্তু দেখে যেমন ভয় পেয়ে শিউড়ে ওঠেন, আবার কোথাও তা আছে-জানলে দেখার চেষ্টা করেন, ভয় বা ভয়ের নিরাপদ অনুভূতি পেতে চান। যে কারণে সমাজে হরর বা ভৌতিক সিনেমার কাটতি দেখা যায়। রমাপদ চৌধুরী তার গল্পে এই ফোবিয়ার ব্যবহার করেছেন। তার ফোবিয়া শবদেহের বিভৎসতা ও নিজেদের ফেঁসে যাওয়ায়। যে কারণে সুমন্তবাবু এক-পা এগিয়ে ও সি-কে প্রশ্ন করেন,‘কোনো চিঠি-ফিটি রেখে গেছেন?’ ব্যানার্জিবাবু বলেন, ‘কিছু জানতে পারলেন?’ আত্মহত্যার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততা যদি খুঁজে পায়, সে ভয় তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। রাহাদের ছেলে সঞ্জয় এই সুযোগটা নিয়ে বলে-‘আমি কিন্তু শুনলাম, পাড়ার লোকদের বিরুদ্ধে কি-সব লিখে রেখে গেছেন...’-তখন বিষয়টা আরো পরিষ্কার হয়ে যায়। তাছাড়া বারো তলা থেকে একজন লাফিয়ে পড়ার ঘটনায় ব্যানার্জিবাবু বলে উঠেন, ইস্। লেখকের ভাষায়, ‘যেন বারো তলা থেকে লাফিয়ে পড়া লোকটার থেৎলেনো চেহারার রক্তমাংস চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছেন।’ ও সি আর সতীশবাবু ঘরের ভেতরে প্রবেশ করলে আরো দু’জন তাঁদের পিছনে পিছনে ঢুকে পড়ে। ‘নিজের চোখে লাশটা দেখার লোভে।’ আবার ডেডবডি যখন বের করে আনা হলো। চাদের মুখ ঢাকা তার। ‘তবু সবাই ঘাড় উঁচিয়ে এমনভাবে তাকালো, যেমন মুখটা দেখা যাচ্ছে।’ তাছাড়া আগেই দেখেছি, সমাজের মানুষ মৃত্যুর নানা পদ্ধতি সম্পর্কে জানে। যে কারণে তারা আত্মহত্যার বিকল্প পথও নির্দেশ করতে পারেন। এটা যেমন আত্মহত্যা সমাজের একটা সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে বোঝায়; তেমনি মানুষ যে মৃত্যু বা মৃত্যুর দায়ে জাড়িয়ে যাওয়ার ফোবিয়া দ্বারা আক্রান্ত তাও বোঝায়। গল্পকার আত্মঘাতীর হাতের না লেখা তৈরি করে প্রচ্ছন্নভাবে পুরো সমাজকে দায়ি করেছেন। জীবনে বীতস্পৃহ হওয়াটা তারই একটা প্রেক্ষাপট তৈরি করে মাত্র। তাছাড়া মৃত্যুটা একধরনের প্রতিবাদ হিসেবেই চিহ্নিত করতে চেয়েছেন তিনি। এই প্রতিবাদ কখনো আইনের বিরুদ্ধে, সমাজের বিরুদ্ধে, আবার ভগবানের বিরুদ্ধেও।



পুরুষতন্ত্র: রমাপদ চৌধুরী সমাজের চিত্র আঁকেন সুনিপুনভাবে। কখনো একটা ছোট্ট কথার মধ্যদিয়ে পুরো পরিস্থিতিও তুলে ধরেন। আমরা লক্ষ্য করি, ডেডবডি বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গল্পের অবতরনের দিকে যাচ্ছে। লেখক এখানে আরো কয়েকটি বিষয়ে দিকে আমাদের পুনর্বার দৃষ্টি আর্কষণ করেন। তা হলো ধনঞ্জয়বাবুর মাঝ বয়সী স্ত্রী ও সম্পদের প্রতি উপস্থিতদের দৃষ্টি ভঙ্গি। যেমন-‘সে-রকম কিছু কান্নাকাটি কিন্তু শুনছি না’ বাক্যটির কথা ধরা যাক। এখানে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী কান্নার থাকা না-থাকার মধ্যদিয়ে তার ‘সতীত্বে’র প্রশ্ন যেমন তোলা হচ্ছে, তেমনি তার দিকে দোষারোপের আঙ্গুল তোলা হচ্ছে। সমাজে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা যে কতগভীর, তা এই বক্য দিয়েই উন্মোচন করেন। এই কান্না শুনতে চাওয়া বা নারী সম্পর্কে অতি কৌতুহল সিগমুন ফ্রয়েডের মনোসমিক্ষণ তত্ত্বের সঙ্গে মিলে যায়। এ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষের কথা, আচার-আচরণের মধ্যদিয়ে তার অবচেতনের মধ্যে অভিলাস বেরিয়ে আসে। আমরা সমাজে দিকে তাকালের দেখতে পাই, স্বামী মৃত্যু সময় স্ত্রীর অবস্থা পর্যবেক্ষণের মধ্যদিয়ে ওই নারীর প্রতি পুরুষের লিপ্সা বেরিয়ে আসে। গল্পে রমাপদ চৌধুরী তারই ব্যবহার করেছেন। পরের বাক্যেই দেখতে পাই দত্তবাবু হেসে বলেন,‘তাছাড়া স্ত্রী তো কান্নাকাটির পার্টি নয়। সিল্পভলেস ব্লাউজ পরেন, একটা ফ্যাশনদুরস্ত...’। অর্থাৎ সিল্পভসেল ব্লাউজে নারী বাহুতে যে জৌলুস-যৌনতা উছলে ওঠে। তাতে নারী কোনো ভাবেই স্বামী ভক্ত হতে পারেন না। প্রকারান্তে এখানে তার বহুগামীতেও ইঙ্গিত করা হয়। মানুষের অমানবিকতা এতোটাই বৃদ্ধি পেয়েছে ধনঞ্জয়বাবুর মৃত্যুর পর তার স্ত্রী শোকে ‘পাথর হয়ে গেছেন’ তা বিশ্বাসই করতে পারেন না। যে কারণে কথাটা শোনার পর দত্ত চোখাচোখি করে চোখ টিপেন, কথায় টিপ্পনী কাটেন। স্থুল ও পুরুষতান্ত্রিকতা আক্রান্ত দত্তবাবু। স্বামী-স্ত্রীর রাত্রি যাপন রতিক্রিয়ার উর্ধ্বে উঠতে পারেনি। যে কারণে তিনি বললেন, কাপড় ‘রাতে পরে শুলে তো কুঁচকে থাকার কথা...’। ‘সকলেই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলো ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িটার দিকে’। ধনঞ্জয়ের স্ত্রী ও সম্পদের উপর এক জীঘাংসা কাজ করে সবার ভেতর।



৬.

‘এস আই ভদ্রলোক ভিতরে চলে গেলেন। তাঁর পিছনে পিছনে ওরাও।

বাইরে সকলেই উদগ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইলো ধনঞ্জয়বাবুর বাড়িটার দিকে। কেউ কোনো কথা বললো না। চুপচাপ।’ গল্পের শেষ হতে পারতো এখানেই। মনে হয়, পাঠকে ভাববার সুযোগ দিয়ে গল্প শেষ করলে গল্পে শিল্পের বাঁধন আঁটসাট হতো। কিন্তু গল্পকার এগিয়ে যান। তিনি একটি হৃদয় বিদারক অবস্থা সৃষ্টি করেন। যা ঘটতে থাকে যে কোনো আত্মহত্যা পরবর্তী পারিবারিক দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যায়। কিন্তু ধনঞ্জয়বাবুর সন্তানের পোস্টমর্টেম ঠেকানোর আভাষ পাওয়া যায়। এখান থেকে আরেকটি গল্প শুরুর আভাষ পাওয়া যায়। গল্পকার এখানে পাঠকে ভাবার সুযোগ করে দেন। বার্ড ভিউতে দেখলে, আমরা অপেক্ষা করি, বাড়ির কর্তার মৃত্যুর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরিবারটি কি করে টিকে থাকে। এরপর হয়তো বিধবা নারীর বিরুদ্ধে সমাজে কুৎসা উঠবে হবে, সন্তানের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ঘনিভূত হতে থাকবে, মৃতের বৃদ্ধা মা সন্তানের শোক একদিন কাটিয়ে উঠবে। কিংবা শোকে, দুঃখে একদিন হয়তো মারাই যাবে। বৌ-শ্বাশুরির মধ্যে তৈরি হবে মনোস্তাত্তিক দ্বন্দ্ব। পরিবারের বাইরে থেকে ধনঞ্জয়বাবুর স্ত্রী ও সম্পত্তির দিকে হাত বাড়াবে কেউ কেউ। এই সব ঘাত-প্রতিঘাতে পরিবার যেমন ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারে। আবার পারে টিমে আলোয় জ্বলে থাকতে।



৭.

ভয়েস এন্ড কাউন্টার ভয়েস: রমাপদ চৌধুরী সব গল্পেই প্রশ্নের ব্যবহার করেন। এর মধ্যদিয়ে তিনি সমাজ ও সময়কে প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন করেন এর মধ্যে বেড়ে ওঠা মানুষকে। এই প্রশ্ন আসে কখনো কথার ছলে, কখনো সরাসরি প্রশ্ন আকারে। পোস্টমর্টেম গল্পে জুড়ে ছড়িয়ে আছে অজস্র প্রশ্ন। কোনো কোনোটির তিনি উত্তর দিয়েছেন। যেমন সুমন্তবাবু বলছেন,‘মরেই যখন যাচ্ছে তখন আবার লজ্জা বা অপমানের কথা কি কেউ ভাবে নাকি!’ এ কথার প্রেক্ষিতে ব্যানার্জিবাবু আপত্তি করলেন, ‘সে কি কথা বলছেন! মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সব কি শেষ হয়ে যায়? তার পরের কথাও মানুষ ভাবে।’ এরমধ্য দিয়ে গল্পকার আত্মহত্যাকে যেমন মানুষের মনোস্তত্ত্বের উচ্চকটির ব্যাপার বলে চিহ্নিত করছে, একই সঙ্গে তিনি তার বিপরীত ভাষাও তৈরি করেন। অর্থাৎ ভয়েস এন্ড কাউন্টার ভয়েস তৈরি হচ্ছে। কখনোবা গল্পে আত্মহত্যা নিজেই একটা কাউন্টার ভয়েস হিসেবে উপস্থিত হয়েছে। এটা রমাপদ চৌধুরীর গল্পর একটা স্টাইল। যেমন ব্যানার্জিবাবু বলেন, ‘নো ওয়ান ইজ হ্যাপি। তা হলে কি সবাই সুইসাইড করে বসবে?’ একই প্রশ্ন করছেন সুমন্তবাবুও ‘ইনসাল্টেড হলেই সুইসাইড করতে হবে?’ গল্পের সব প্রশ্নের মধ্যে এই প্রশ্ন দু’টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কখনো মনে হয় তা, আত্মসম্মান বোধহীন বা আদর্শবোধহীন সমাজ চিন্তা। এই বক্তব্যে মধ্যদিয়ে আবার মানুষের মনের দোলাচল ফুটে ওঠে। ফুটে ওঠে সমাজদর্শনও। তাছাড়া ওই সব কারণে আত্মহত্যা সমীচিন কি না? গল্পের মাঝামাঝি এসে গল্পকার এমন নীতিগত ও দার্শনিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। আমাদের তিনি এই প্রশ্নের সম্মুখিন করে দেন। এর উত্তর সমাজ ও রাষ্ট্র দর্শনের মধ্য থেকেই খুঁজেছেন তিনি।

তাছাড়া এ গল্পে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রায় দুই ডজন অসমাপ্ত বাক্য। এর মাধ্যমে রমাপদ চৌধুরী পাঠকে ভাবনাবার-কল্পপনার জায়গা করে দেন। বাক্যের অসমাপ্ত অবস্থা বিষয়ের দীর্ঘায়িতাকেও নির্দেশ করে। যেমন-সতীশবাবুর বলছেন,‘মারা গেছেন, না কি...’, ‘কোন্ ব্যাপারটা কত অসহ্য হয়ে ওঠে...’ ইত্যাদি।



অস্তিত্ববাদ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে জার্মানি ও ফ্রান্সে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উদ্ভবিত অস্তিবাদের মূল কথা হলো, জগৎ আর ব্যক্তি পরস্পর-বিরুদ্ধ শক্তি। এ জগতে সে বহিরাগত ব্যক্তিমাত্র। সংকটের মোকাবেলাতাই ব্যক্তি তার অস্তিত্বের পরিচয় দিতে পারে এবং তাকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। তখন হয় সে পরিবশকে গ্রহণ করে নিজের অস্তিত্বকে লুপ্ত করে দেবে, জীবনের ভোগে-দুর্ভোগে, আনন্দ-কষ্টে নিমজ্জিত হবে; নয় তো সে পরিবেশকে উপেক্ষা করে ‘অদৃষ্টের’ কাছে আত্মসমর্পন করে সেই উপেক্ষার শক্তিতে আর আত্মসমর্পণের স্বাধীনতায় নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করবে। আমরা খেয়াল করি গল্পের দত্ত, ব্যানার্জিবাবু, সুমন্তবাবু, রাহাদের ছেলে কিংবা সতীশবাবু নিজের অস্তিত্বকে লুপ্ত করে দিয়ে, জীবনের ভোগে-দুর্ভোগে, আনন্দ-কষ্টে নিমজ্জিত হচ্ছেন। অন্যদিকে ধনঞ্জয়বাবু ‘গলায় দড়ি’ দিয়ে, তথা আত্মসমর্পন করে উপেক্ষার শক্তিতে আর আত্মসমর্পণের স্বাধীনতায় নিজের অস্তিত্বকে উপলব্ধি করছেন। আবার, কি সতীশবাবু কি তার স্ত্রী, মৃত্যুর খবর শোনার সঙ্গে সঙ্গে তার কারণ জানতে চায়। মৃত্যুর কারণ জানতে চাওয়া ও লাশ দেখার মধ্যেদিয়ে মানুষ আসলে মৃত্যুর বাস্তবতায় অবস্থান করতে চায়। নিজের অস্তিত্বের সম্মুখিন হতে চায়। একই সঙ্গে নিজেদের ভেতরকার আত্মহত্যার প্রবণতা ও সম্ভাবনার মুখোমুখি হতে চায়, এড়াতে চায়। অন্যদিকে ব্যানার্জিবাবু আত্মহত্যাকে পাগলামি বলে বিষয়টা হালকা করার চেষ্টা করলে। এটা নিজেদের ভেতরেও লুকিয়ে থাকা প্রবণতাকে আড়ালেরও একটি চেষ্টা। যা তার অস্তিত্বের সঙ্গেই যুক্ত।



ব্যাজস্তুতি: গল্পের বেশ কয়েক জায়গায় ‘ও-সব’ এবং ‘এ-সব’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। যেমন-‘সতীশবাবু ও দত্ত ‘এক সঙ্গে তাস খেলতেন, এখন আর ও-সব পাঠ উঠে গেছে লোড শেডিংয়ের উৎপাতে।’ এর দ্বারা গল্পকার তার চরিত্রের ব্যাজস্তুতি করেন। অর্থাৎ সেগুলোয় স্তুতি বা প্রশংসার ছলে নিন্দা বা সমালোচনা করছেন কিংবা নিন্দা বা সমালোচনার ছলে প্রশংসা করছেন। ব্যাজস্তুতি ব্যবহারে সাহিত্যের বিষয়বস্তুতে একধরণের আভাষ বা কূটাভাষ লুকায়িত থাকে। চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের উত্তর আমেরিকার-‘নতুন সমালোচনা’ (New Criticism) তাত্ত্বিকদের মতে, ব্যাজস্তুতি হলো একটি জ্ঞানগত নীতি, যা কূটাভাষের মাধ্যমে অলংকারের সাধারণনীতির মধ্যে মিলিয়ে যায়। রামপদ চৌধুরী বরাবরই গল্পে ব্যাজস্তুতির ব্যবহার করেছেন, এবং তা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গেই করেছেন। ‘পোস্টমর্টেম’ গল্পেও আমরা তা দেখতে পাই। আর কূটাভাষ সমাজ-রূপান্তরের স্বপ্নের মধ্যে নিহিত। ব্যাজস্তুতি ব্যবহারের ফলে, পাঠক গল্পের চরিত্র সম্পর্কে স্বক্রিয় বা সচেতন হন। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘যতক্ষণ না একটা মানুষ মরছে, সে মৃতপ্রায় হয়ে আছে কিনা কেউ জানতে চায় না। গলায় দড়ি দিয়ে মরলেই হাজারটা প্রশ্ন। কেন? কেন? কেন?’



অসংজ্ঞান: রমাপদ চৌধুরী চরিত্র আঁকেন, তাকে অক্ষুণ্ন রাখার ব্যাপারেও যত্নবান। যে কারণে তার গল্পের গূঢ় কথাটা বলান অজ্ঞাত একজনের মধ্যদিয়ে। কেউ, পাশের লোক, পাশ থেকে একজন, কে একজন, কেউ একজন, আরেকজন-ইত্যাদি সব সর্বনাম মূলক শব্দ। এই ‘কেউ একজন’ সারা গল্পজুড়ে পনেরবারের অধিক ব্যবহার করেছেন তিনি। ‘কেউ একজনে’র মধ্যদিয়ে গল্পে একাধিক মানুষের সমাবেশ করেছেন। আবার ‘কেউ একজন’ উচ্চাকিত ব্যবহারের মাধ্যমে গল্পকার পুরো ব্যাপারটাকে যেন, অজ্ঞেয় করে রাখছেন। ফলে গল্প শেষ করেও ধনঞ্জয়ের মৃত্যুর একটি মাত্র কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি না। তার মৃত্যুর একাধিক কারণ অনুসন্ধানের দায়িত্ব আমাদের সামনে ঝুলে থাকছে।

সাহিত্যের মনঃসমীক্ষণাত্মক সামালোচক জ্যাক লাকা’র ধারণা অনুযায়ি এটা অসংজ্ঞান। অসংজ্ঞান বিনিময় প্রক্রিয়ায় দ্যোতকের রূপান্তর-এর প্রভাব। ফলে কেউ জানতে পারছে না লোকটি আসলে কে? এবং এটা জানা আমাদের একটা আকাঙ্ক্ষিত বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু আমরা বুঝতে পারি, এগুলো চরিত্রের এক একটা সারগাম, অন্তঃস্বর। যা ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয়। ফলে এটা গল্পের কাঠামোর মধ্যে অবস্থান করেই গল্পকে শিল্পগুণে সমৃদ্ধ করে। আবার সামাজিকভাবে এই অনির্দিষ্টতা সমাজের জন্য ভয়ংকরও বটে। জন্ম দেয় চোরাবালির। এই চোরাবালিতে ডুবে যায় সামাজিক প্রকরণ। এই ফাঁক গলিয়ে জন্ম হতে পারে যে কোনো রিউমার। এ কারণে রাহা ছেলে সঞ্জয় বলতে পারছে, ‘আমি কিন্তু শুনলাম, পাড়ার লোকদের বিরুদ্ধে কি-সব লিখে রেখে গেছেন...’।



৮.

পোস্টমর্টে গল্পটি যখন লেখা, সেই সময় মানুষজন চিড়েচ্যাপটা জীবনে স্বেচ্ছা মরণ বা আত্মহত্যা সামাজিক ও আইনি স্বীকৃতি পায়নি। বরং যতই চিড়ে চ্যাপটা হোক না কেন, সময় ও জীবনের ঘানি বইয়ে চলাই তার নিয়তি বলে ধরে নিয়েছে সবাই। যে কারণে সতীশবাবু, তার স্ত্রী চমকে উঠলেন, খবরটা শুনে। কিন্তু কি গলায় দড়ি কি অন্যকিছু-বিশ্বে আত্মহত্যা তথা স্বেচ্ছা মরণের ‘অধিকার’ চাওয়া হচ্ছে। পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮১ সালে ভারতে আত্মহত্যার পরিমাণ হঠাৎ করেই বেরেগিয়েছিল। আত্মহত্যা যেখানে, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা, কখনো কখনো সম্মানের ও স্বীকৃত সেই জাপানেও সেসময় আত্মহত্যার হারও অনেক, আজকের তুললনায়। আমরা বুঝতে পারি এই ঘটনাকেই সমাজের রন্ধ্র উন্মোচনে বেছে নিয়েছেন। বলতে গলে সচেতন ও সহজলভ্য কারণে নিয়েছেন।

‘দেখে তো মনে হ’তো খুব সুখী পরিবার’ এই কথার মধ্যদিয়ে গল্পের গূঢ় রহস্য ঘনিভূত হয়েছে। অর্থাৎ আমরা কেউ জানি না আসলে কার ভেতরে কি আছে। আমার একধরনের অভিনয় করে চলেছি। ব্যানার্জিবাবুর ভাষায়, ‘নো ওয়ান ইজ হ্যাপি’। শেষ বাক্যে এসে রমাপদ চৌধুরী গল্পে তার প্রচেষ্টার কথা ফাঁস করে দিচ্ছেন। আত্মহত্যা একটি আইন বিরুদ্ধ ব্যাপার। পুলিশ এই লাশ পোস্টমর্টেম করবে, কি করবে না-এটা আইনি সিদ্ধান্তের ব্যাপার। মৃতের পরিবারের সদস্যরা ডাক্তারি কাটা-ছেঁড়া থেকে মৃতদেহ রক্ষা করতে পারবে কি পারবে না সে প্রশ্নও এখানে মূখ্য নয়। মানুষের কথায় ফাঁসের দড়িতে আটকে থাকা সময় ও সমাজের ব্যবচ্ছেদ হবে, এটাই সত্য। ‘রাহা ছোকরা হাসতে হাসতে বললে, আমরা ছাড়বো কেন? অ্যাঁ? পোস্ট-মর্টেমের কথা বলছি।’ ০


লেখক পরিচিতি
অলাত এহসান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। পদ্মার পাড় ঘেঁষে গ্রামের অবস্থান। গহীন গ্রাম। এখানে প্রধানত কলু, কাহার, জেলে, মুচি, তাঁতী, নিম্নবর্গে মানুষেরা বসত করে। প্রতিবছর পদ্মায় ভাঙে। অজস্র মানুষ স্বপ্নভাঙ্গা স্মৃতি নিয়ে শহরমুখী হয়। অধিকাংশ তরুণ জীবিকার প্রয়োজনে পাড়ি জমায় বিদেশে। এটাই যেন নিয়তি। এসবের ভেতরেও থাকে ঘটনা, নানা ঘটনা। এইসব জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। গুলতির বোবা রেখা তাক করে জঙ্গলে জঙ্গলে কেটেছে শৈশব। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন ঢাকা কলেজ থেকে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন