বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

সেই স্মিতমুখ মানুষটি : তপন রায়চৌধুরী

স্মৃতিচারণ

মিহির সেনগুপ্ত

১.

তপন রায়চৌধুরির মতো একজন সদাহাস্যময়, রসিক এবং বাক্যে বাচস্পতিসদৃশ মানুষকে নিয়ে, তাঁকে যাঁরা ঘনিষ্ঠভাবে চেনেন, জানেন, তাঁদের কেউ, স্মৃতিতর্পণ করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না৷‌ অম্তত আমার পক্ষে তো তা সম্ভব কোনও মতেই হবে না৷‌ তাঁর বিষয়ে রোমম্হন করা যেতে পারে, স্মৃতি রোমম্হন৷‌
অথবা স্মৃতিই বা কেন আমরা তো তাঁর কাছ থেকেই ‘রোমম্হন’ শব্দটির একটি ‘অথবা’ সূচক শব্দও পেয়েছি, যেটিকে তিনি ‘পরচরিতচর্চা’ বলে উল্লেখ করে অমর করে রেখেছেন৷‌ অর্থাৎ, আমি বলতে চাইছি, তপনদা ‘স্মৃতি রোমম্হন’, ‘স্মৃতি তর্পণ’ ইত্যাদি ব্যাপারগুলোতে ঠিক বিশ্বাসী ছিলেন না৷‌ আড্ডায় বহুবার তিনি দাবি করেছেন, ‘আমি একজন অত্যম্ত নিষ্ঠাবান নাস্তিক৷‌ নাস্তিকতা ছাড়া অন্য কোনও ধর্মে আমি বিশ্বাসী নই৷‌’ মনে হয়, ‘স্মৃতি’ শব্দটার মধ্যে তিনি আস্তিক্যের গন্ধ পেতেন বলে, তার চর্চার নামকরণটা ওইভাবে করেছিলেন৷‌ অতএব, আমিও তাঁর বিষয়ে, এই লেখায় শুধুই কিছু আড্ডা, গল্পের কথাই বলব৷‌ নচেৎ তাঁর তীব্র অবিশ্বাস সত্ত্বেও, যদি পরলোক বলে কিছু থাকে, তা হলে নিশ্চিতই সেখানে বসে তিনি তাঁর স্বভাবসম্মত হাসিগুলো হাসবেন৷‌ খাস কথা এই, সব মানুষের স্মৃতিতর্পণ করা যায় না৷‌ উচিতও না৷‌

কয়েক বছর আগে, তাঁরই একটা ‘ছ্যাবলা রচনা’ তাঁর কেয়াতলার বাসায় বসে পড়তে দিয়েছিলেন৷‌ লেখাটা তখনও ছাপার অপেক্ষায়৷‌ হাসিদির লেখাটা খুব অপছন্দের ছিল৷‌ তিনি চাননি ওটা ছাপার জন্য যাক৷‌ এ নিয়ে তিনি কিছু কথাও বললেন৷‌ তথাপি লেখাটা নিয়ে আমরা খুব হাসি-মশকরা করছিলাম৷‌ হাসিদি বোধহয় একটু বিরক্ত হয়েই উঠে পাশের ঘরে চলে গেলেন৷‌ আমি বলেছিলাম, ‘ওটা না হয় নাই পাঠালেন৷‌ উনি যখন পছন্দ করছেন না৷‌ উনি বোধহয় একটু সিরিয়াস লেখা চাইছিলেন৷‌’ তপনদা বললেন, ‘কী জানো? আমি জীবনটাকে খুব একটা সিরিয়াসলি নিইনি৷‌’ আমি তর্ক তুলতে পারতাম এই কথাটার প্রেক্ষিতে৷‌ সেটা শোভন হত না বলে তুলিনি৷‌ মানুষটি যে অত্যম্ত সিরিয়াস হিউমারিস্ট, তাঁর সঙ্গে পরিচয় হওয়ার শুরুতেই তা বুঝেছিলাম৷‌ তবে তাঁর পরিচিত সবাই জানেন, তিনি ছিলেন সৈয়দ মুজতবা আলি সাহেবের ঘরানার হিউমারিস্ট৷‌

রঙ্গরসের আসরে সবরকম শব্দ ব্যবহারকে তিনি প্রশ্রয় দিতেন, কিন্তু সেই সব শব্দের প্রায়োগিক বিধি রসসৃষ্টি প্রকরণ ব্যতিরেকী হলে চলবে না৷‌ তপনদার দাবি ছিল, আমরা যদি ভাষা-শব্দের ব্যবহারে শ্রীরামকৃষ্ণের পম্হানুযায়ী সরল এবং অকপট হই তবে ‘বঙ্গসরস্বতী লজ্জারুণা হবেন না৷‌’ অত্যম্ত তথাকথিত অশ্লীল শব্দও ব্যবহার গুণে যে গভীর রসব্যঞ্জনার সৃষ্টি করতে পারে, তিনি নিজেই তার প্রমাণ৷‌

বরিশালের একটি প্রাচীন নাম আছে, চন্দ্রদীপ৷‌ সেই স্হাননামটি অনুসারে তথাকার ভাষার নামটি আমি একটু তৎসমায়িত করে রেখেছিলাম চান্দ্রদ্বীপি৷‌ নামটি তপনদার বেশ পছন্দ হয়েছিল৷‌ বলেছিলেন, ‘এ দিব্য হয়েছে৷‌ শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে– বাঙাল নামটি এতদিনে ঘুচে বেশ একটা ‘তৎসম’ কৌলীন্য পেল৷‌


কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কিনবেন৷‌ সময়টা ’৯৪-৯৫, কী ওইরকম কোনও একটা বছরে৷‌ কোন এক দালালের খপ্পরে পড়েছেন৷‌ বোধহয় কিছু টাকাপয়সা আগাম দিয়ে ফেলেছেন৷‌ তারপর যা হয়, লোকটা ল্যাজে খেলিয়ে যাচ্ছে৷‌ একদিন বললেন, ‘চল তো একটু আমাদের সঙ্গে৷‌ ও ব্যাটার তো মনে হয়, খোঁজে কোনও ফ্ল্যাটই নেই৷‌’ জায়গাটা যতদূর মনে পড়ছে, সাদার্ন অ্যাভিনিউর কোথাও৷‌ অকুস্হলে গিয়ে জানা গেল, সব ফ্ল্যাটই বুকড. দালাল অফিসের ম্যানেজার জানাল, লোকটি জালি৷‌ তাদের কাছে কিছুদিন কাজ করেছিল বটে, এখন বিতাড়িত৷‌ তপনদা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কী হল?’ আমি বললাম, ‘This is Indian modernity৷‌ এটাকে এ দেশের প্রবচনে বলে, ফাটা বাঁশে লেজ আটকে যাওয়া৷‌’ তপনদা তাঁর টাকার দুশ্চিম্তা তথা বিরক্তি মুহূর্তে ভুলে গিয়ে দুম করে প্রবচনটা ক্যাচ ধরে বললেন, ‘কথাটাকে তোমরা ‘ল্যাজ আটকে যাওয়া বলো? কুমার যেন বলেছিল–’৷‌ হাসিদি বললেন, ‘তুমি থামবে?’ যা হোক, অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে টাকাটা উদ্ধার হয়েছিল৷‌

তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় পত্রমাধ্যমে৷‌ ১৯৯২-এর একটি পত্রিকার শারদ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘রোমম্হন, অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিত চর্চা৷‌’ লেখাটি পশ্চিমবঙ্গ উপনিবেশী বরিশালি ‘বঙ্গালপুতদের’ ব্যাপকভাবে অস্মিতাস্ফীত করেছিল৷‌ কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় তখন তপনদার নামই হয়ে গিয়েছিল ‘ভীমরতি’৷‌ ততদিনে লেখাটি বই হিসেবে বেরিয়ে গেছে৷‌ বই-এর দোকানের কাউন্টারের কাছে দাঁড়ালেই শোনা যায়– ‘এই, ওনাকে এক কপি ভীমরতি দাও৷‌’ খুব উত্তেজক অবস্হা তখন৷‌ কফিহাউস, সংস্কৃত কলেজের সিঁড়ি, সর্বত্র আমাদের আড্ডার বিষয় ভীমরতি৷‌

সাবেক বরিশাল জেলার পাশাপাশি দুটি গ্রামে তপনদা এবং আমার পৈতৃক ভিটে৷‌ তাঁর ‘দ্যাশের বাড়ির হদ্দমুদ্দ, তাঁদের জমিদারির শান শৌকত-এর গল্প আমার ঠোটস্হ৷‌ এমনকি তপনদার বাপদাদা, তাঁদের বিষয়ের খুঁটিনাটি, তথা কোনও কোনও ‘কত্তার’, ‘ইদিক সিদিক’-এর স্বভাব, সবই আমার জানা৷‌ ফলে, আড্ডার বন্ধুদের কাছে আমি তখন হিরো৷‌ তখন বাগবাজারি খাঁটি ঘটি বন্ধুরাও আমা হেন নিপাট নৈকষ্য কুলীন বাঙালের কাছে বাঙালত্বে ব্যাপটাইজটÿ হওয়ার জন্য লাইন লাগাচ্ছে৷‌

লেখাটিকে সম্বল করে তপনবাবুর কাছে একটা পেল্লায় চিঠি লিখলাম তাঁর অ‘ফোর্ডের ঠিকানায়৷‌ চিঠিটাকে ‘রোমম্হন’-এর রি-জয়েন্ডার হিসেবে বন্ধুরা স্বীকৃতি দিল৷‌ এই বৃত্তাম্তটা অনেক বড়৷‌ সংক্ষেপে বলছি৷‌ এটির বদৌলতেই তপনদার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ-পরিচয় এবং সেই পরিচয়ের বয়স আজকের তাঁর ‘আড‍্ডা শরীর’ প্রাপ্তির দিন পর্যম্ত অনধিক বাইশ বছর৷‌ চিঠিটার উত্তরে জানিয়েছিলেন, ‘সামনের জুন মাসে কলকাতায় যাব, তখন সামনা-সামনি ব্যাটে-বলে হবে৷‌’ আমি কথাটাকে গুরুত্ব দিইনি৷‌ তাঁর মাপের একজন মানুষ, এক ডিসেম্বরে কথা দিয়ে, ছ মাস বাদে জুনে কলকাতা এসে, সেই কথা মনে রেখে আমার সঙ্গে দেখা করবেন, তাই কখনও হয় নাকি? কিন্তু সেই জুনেরই এক তপ্ত মধ্যাহ্নে সকন্যা তিনি হাজির হয়েছিলেন আমার লিন্ডসে স্ট্রিটের অফিস দপ্তরে৷‌ বেশ খানিকক্ষণ গল্প-গুজবের পর, পরামর্শ দিয়েছিলেন চিঠিটা যেমনটি আছে তেমনটিই একটা ছোট পত্রিকায় ছেপে দিতে৷‌ পরে বড় করে লিখে একটি ছোট বই করার পরামর্শও তখনই দিয়েছিলেন তিনি৷‌ বরিশালি সংলাপে বইটির একটি মুখবন্ধ লিখে, পশ্চিমবঙ্গবাসীদের জন্য তার একটি ‘পশ্চিমবঙ্গানুবাদও’ একই সঙ্গে দেওয়া হয়েছিল৷‌ এই বইটি বা তপনদার কাছে লেখা পত্রনিবন্ধটি থেকে আমার লেখালেখির জীবন শুরু হল৷‌ এর পর এই ধারাতেই আমার আরও কয়েকখানা বই লেখা হয় ছোট- বড়– যার সবগুলোর ওপরই তপনদার বিস্তারিত লেখা আছে, গুরুত্বপূর্ণ তথা উৎসাহব্যঞ্জক মতামত-সহ৷‌

৩.

এই সব খবর একজন অগ্রজের স্নেহ প্রকাশের বৃত্তাম্ত মাত্রই নয়, অথবা এমনও নয় যে এর দ্বারা আমি নিজের গৌরববৃদ্ধি করতে চাইছি৷‌ অনেকে হয়ত ঠাট্টা করে এও বলতে পারেন যে আমার অবস্হাটা ‘রাজেন্দ্র সঙ্গমে, দীন যথা যায় দূর তীর্থ দরশনে’– এরকম একটা ব্যাপার৷‌ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আমার সৌভাগ্যটা তার চাইতে একটুও কম নয়৷‌ আক্ষরিক অর্থেই, আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনের যে কটা দিন তাঁর চলন-দারিতে চলেছি রাজেন্দ্র সঙ্গমে দীনের তীর্থযাত্রাই হয়েছে৷‌ নানা কারণে গৌরব অর্জনও আমার অবশ্য হয়েছে৷‌ তার প্রথম ঘটনাটি ঘটেছিল ‘রোমম্হনের’ দ্বিতীয় সংস্করণটি প্রকাশ হওয়ার সময়৷‌ সেই সংস্করণে মূল রচনাটির সঙ্গে আরও কিছু লেখা যুক্ত হয়েছিল৷‌ তার মধ্যে একটি সুদীর্ঘ প্রবন্ধ– যার বিষয়বস্তু ছিল আমার একটি অন্যতম প্রধান গ্রম্হ ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’- এর পর্যালোচনা৷‌ লেখাটি প্রথমে ‘নন্দন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়৷‌ ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’ আমার প্রথম প্রমাণ মাপের বই৷‌ তপনদা প্রাণ খুলে বা বলা ভাল হাত খুলে বইটির প্রশংসা করেছিলেন৷‌ ফলে বেশি বয়সে লেখালেখির জগতে আসা আমার ব্যাপক খ্যাতিলাভ হয়েছিল৷‌ সেই সংস্করণেই তপনদার কাছে লেখা আমার সেই মেগা-চিঠি নিবন্ধটিও সঙ্কলিত হয়ে তাঁর প্রায় বুকের মধ্যে আমার স্হান অক্ষয় করে দিয়েছিল৷‌ এ যে কতখানি গৌরবের, এমনকি অহঙ্কারেরও, তা যে কোনও সংস্কৃতি-কর্মীই অনুমান করতে পারবেন৷‌

২০০৩ সালে সুবর্ণরেখা প্রকাশনায় আমার সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য বই ‘বিষাদবৃক্ষ’ প্রকাশিত হয়৷‌ ইচ্ছে ছিল, বইমেলা থেকে বই নিয়ে সোজা তাঁর কাছে গিয়ে হাতে-হাতে দিয়ে আসব৷‌ বইটি সেবার আমার নিজের খরচেই প্রকাশিত হয়েছিল৷‌ বেরোবার তারিখটা কথা প্রসঙ্গে তপনদাকে বলেছিলাম৷‌ সুবর্ণরেখার স্টলে পৌঁছতে সেদিন একটু দেরি-ই হয়ে গিয়েছিল৷‌ স্টলে পৌঁছতে, ইন্দ্রদা অর্থাৎ সুবর্ণরেখার মালিক ইন্দ্রনাথ মজুমদার জানালেন, ‘খানিক আগে তপনবাবু এসেছিলেন৷‌ বইটা হাতে নিয়ে দু-এক পৃষ্ঠা ওল্টালেন, তারপর বললেন, ‘ইন্দ্র, বইটা আমি নিয়ে গেলাম, মিহির এলে বোলো৷‌’ – ‘পয়সা দিলেন না, বুঝলি?’ জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘চেয়েছিলেন নাকি?’ ইন্দ্রদা আঁতকে উঠে বললেন, ‘খেপেছিস? তবে আখেরে লাভ হবে দেখিস৷‌’ লাভ হয়েছিল৷‌ তবে সেটা ইন্দ্রদার৷‌ অচিরে একটা রিভিউ বেরিয়েছিল ‘দেশ’-এ৷‌ অসামান্য প্রশংসা, সঙ্গে গৈরিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের প্রতি সতর্কতা– যাতে বইটি স্বার্থগতভাবে ব্যবহারের বৃথা চেষ্টা কেউ না করেন, যেহেতু বইয়ের মূল সুর মানবতাবাদের৷‌ সেদিন রাতেই বাসায় টেলিফোনে জানিয়েছিলেন, ‘পড়তে শুরু করেছি৷‌ বড় কাজ করেছ৷‌ এখন থেকে যা লিখবে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধেই লিখবে৷‌ হাবিজাবি লিখে লাভ নেই৷‌ সাম্প্রদায়িকতা আমাদের বড় শত্রু৷‌’ মানুষটি আদ্যম্ত অসাম্প্রদায়িক এবং ইহজাগতিকতা-মনষ্ক৷‌

বই বিষয়ক আর একটি কথা বলে এই প্রসঙ্গটা শেষ করব৷‌ একখানি বই লিখেছিলাম মহাভারত বিষয়ে৷‌ বইটি দু-দুবার চেষ্টা করেও মোটামুটিও শুদ্ধ বা সম্তোষজনক হয়নি৷‌ বইটির নাম ‘বিদুর’৷‌ অবশেষে তৃতীয়বারের প্রচেষ্টায় ব্যাপারটি পাতে দেওয়ার মতো হল৷‌ সাহিত্য সংসদ আগ্রহ ভরে বইটি প্রকাশ করল৷‌ বইটি পড়ে তপনদা বললেন, ‘বইটা ভাল লিখেছ৷‌ রিভিউটা আমি করব কি?’ বললাম, ‘সেটা অবশ্যই আমার সৌভাগ্য৷‌’ তপনদা বললেন, ‘অনেকদিন ধরে মনে একটা ইচ্ছে ছিল যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে একটা বই লিখব৷‌ ‘হিস্ট্রি অফ মেন্টালিটি’-টা শেষ করেই ওটা ধরব ভেবেছি৷‌ দেখি৷‌ তবে মহাভারতচর্চা নিয়মিতই করছি৷‌ তোমার বিদুর আমার লোভ বাড়িয়ে দিল৷‌ তুমি যেন আবার দুম করে যুধিষ্ঠিরকে নিয়ে আগেভাগে লিখে ফেলো না৷‌’ বললাম, ‘ওভাবে লজ্জা দেবেন না৷‌ আমি লিখলেও তার দৌড় কতটা হবে, তা আপনি বিলক্ষণ জানেন৷‌ তা ছাড়া আমার ক্ষমতা এবং পাঠদারিদ্র্য বিষয়ে আমি নিজেই যথেষ্ট অবহিত৷‌ সংস্কৃত মহাভারত পড়া দূরস্হান, সংগ্রহেও নেই৷‌’

কিন্তু তপনদা ‘বিদুর’ বইটা, ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও পর্যালোচনা করতে পারলেন না৷‌ কিছু নিহিত স্বার্থের কারিগর বিষয়টা কায়দা করে পণ্ড করে দিয়েছিল৷‌ সে সব কথা বিস্তারিত আলোচনা করলে, সমস্যা আছে বলে চেপে গেলাম৷‌ তপনদা পরে একদিন বলেছিলেন, ‘সারস্বত জগৎটা শুধু এ দেশে নয়, সর্বত্রই বড় মাৎসর্য আমন্ত্রণকারী৷‌’ তাঁর কথাটা স্বীকার করে নিয়েছিলাম কারণ তা সত্য৷‌ এই ঘটনা বেশি দিনের নয়, মাত্র গত বছরেই ঘটেছে৷‌ ইতিমধ্যে তাঁদের এ দেশে থাকার সময়কাল দ্রুত শেষ হয়ে আসছিল এবং দুজনেই খুব অসুস্হ হয়ে পড়েছিলেন৷‌ বাথরুমে পড়ে গিয়ে কোমর, পায়ের হাড় ভেঙেছিল হাসিদির৷‌

এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে ও দেশে চলে যেতে হয়েছিল হাসিদিকে নিয়ে৷‌ কয়েক মাস চিকিৎসার পর হাসিদি মোটামুটি সুস্হ হলে, তপনদা পড়লেন৷‌ তারপরে তো শুধু ক্রমাবনতির ইতিহাস৷‌ অনেকে বয়সের দোহাই দেয়৷‌ কিন্তু ওটা একটা বাজে কথা৷‌

৪.

তপনদা বরিশালকে কোনও দিন ভোলেননি৷‌ তাঁর ‘বাঙালনামা’ লিখতে গিয়ে লেখাটা দুনিয়ানামা বা বিশ্বনামা হয়ে গিয়েছিল৷‌ কারণ, গোটা পৃথিবীই এক সময় তাঁর কাছে বরিশাল হয়ে উঠেছিল৷‌ ২০০০ সালে কলকাতা এসে একদিন ফোনে বললেন, ‘তোমাদের হাসিদির এতদিনেও শ্বশুরবাড়ির ভিটে দেখা হয়ে ওঠেনি৷‌ কোনও ব্যবস্হা করতে পারো?’ বললাম, ‘আমি তো প্রতি বছরই একবার-দুবার যাই৷‌ এবার চলুন না ফেব্রুয়ারি মাসে যাই বরিশালে৷‌ আমি সঙ্গে থাকলে আপনাদের অসুবিধে হবে না আশা করি৷‌’ – ‘তাই ভাবছিলাম৷‌ তবে ভিসাটিসার ব্যবস্হা তোমাকেই করতে হবে৷‌ আমাদের কিন্তু আবার ব্রিটিশ পাসপোর্ট৷‌’ বললাম, ‘দালাল ধরে করিয়ে নেব৷‌ তবে খরচ একটু বেশি৷‌’

ঠিক হল, আমি কয়েকদিন আগেই তাঁদের একদার ‘নিজ মৌজা’ কীর্তিপাশা যাব৷‌ কাছেই আমার কুটুম্ববাড়ি৷‌ সেখানে উঠে তপনদার পৈতৃক প্রাসাদ দর্শন করানোর ব্যবস্হা করব৷‌ প্রাসাদের সামনের অংশের দোতলার হল ঘরে এখন একটা মেয়েদের ইস্কুল৷‌ নিচের অংশে ইস্কুলের অফিস, শিক্ষকদের বসার ঘর, এই সব৷‌ এ ছাড়া বাড়ির সামনের দিকে তপনদার মেজঠাকুর্দার পিতৃনামে প্রতিষ্ঠিত প্রসন্নকুমার উচ্চ বিদ্যালয়৷‌ ইস্কুলের সামনে প্রকাণ্ড ফুটবল মাঠ এবং একদিকে একটি বেশ বড় দিঘি৷‌ মাস্টার মশাই এবং ইস্কুল কর্তৃপক্ষের সবার সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই মাঠে এবং প্রাসাদের হলঘরে দুটি আলাদা সভার বন্দোবস্ত করা হল৷‌ মধ্যাহ্নভোজন আমার শ্বশুরালয়ে৷‌

তপনদার বাবার নাম কৌলীকভাবে অমিয় সেন৷‌ ডাকনাম স্হানীয় পরম্পরায় চাঁদবাবু৷‌ রায়চৌধুরি উপাধি নবাবি আমলের৷‌ কেউ ব্যবহার করেন, কেউ করেন না৷‌ তাঁদের জমিদারির দুটি ভাগ– বড় হিস্যা এবং ছোট হিস্যা৷‌ একদা একত্রিতই ছিল৷‌ পরবর্তীকালে বিভক্ত৷‌ প্রাসাদের মাঝখানের দেওয়ালটা তপনদার ভাষায় বর্ণনায় ‘বার্লিন ওয়াল’৷‌ দুটো অংশই এখন বেশির ভাগ খণ্ডহর বা ধ্বংসস্তূপ৷‌ শুধু বড়হিস্যার সামনের অংশটি অট্টালিকার প্রাসাদত্বের অহঙ্কার এখনও ঘোষণা করে চলেছে৷‌ এ প্রসঙ্গে খুঁটিনাটি অনেক কিছুই বর্ণনীয় থাকলেও নিষ্প্রয়োজনে রচনা প্রলম্বিত করছি না৷‌ তপনদার কাছে লেখা সেই সুদীর্ঘ পত্রনিবন্ধটি, যেটি তাঁর ‘রোমম্হনের’ দ্বিতীয় সংস্করণে অঙ্গীভূত হয়েছে, সেখানে পাওয়া যাবে৷‌ নামকরণ করা হয়েছিল ‘আহ্লাদে ফাউকানো অথবা ভাটিপুত্রর পত্র বাখোয়াজি’৷‌

তপনদা আমাকে বলে দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত ব্যারিস্টার এবং আওয়ামি লিগ নেতা কামরুল হাসান সাহেবকে ঢাকায় যোগাযোগ করে জলপথে বরিশাল আসার ব্যবস্হা করে রাখতে৷‌ তিনি এয়ারে হাসিদি-সহ ঢাকা গিয়ে তাঁর অতিথি হবেন৷‌ পরের দিন বরিশালে আমি তাঁদের রিসিভ করে গাড়িতে কীর্তিপাশা নিয়ে আসব৷‌ ফোন মারফত কামরুল হাসানকে যোগাযোগ করতে তিনি জানালেন, জলপথে ভাল ব্যবস্হা করা যায়নি৷‌ তপনদারা ঢাকা-বরিশাল প্লেনে আসবেন৷‌

আমি আমার কুটুম্বদের নিয়ে ঝালকাঠি শহরে তাঁদের নৈশাবাসের ব্যবস্হা করে তাঁদের আসার আগের দিন ঝালকাঠিতেই রাত কাটালাম৷‌ পরদিন ভোরে গাড়ি নিয়ে চলে গেলাম বরিশাল এয়ার স্টেশনে৷‌ তাঁরা এলেন৷‌ পথে বললেন, ‘কালকে ঢাকা ফেরার ব্যবস্হাটা কী করবে?’ জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার ইচ্ছে কী?’

-- ‘বহুকালের শখ, সেই ছোটবেলার ‘ইস্টিমার’, ওই যে ফ্লেমিঙ্গো কোম্পানি-টোম্পানির জাহাজে আর একবার অম্তত ভ্রমণ করা৷‌’ হায়রে বাঙালের নস্টালজিয়া! হায়রে হারানো-ফুরোনো দিনকে ফিরে দেখার বা পাওয়ার আকাঙ্খা৷‌ তা তো দেখছি কাউকেই ছাড়ে না! তবু ভাগ্য ভাল, যে তপনদা ‘জ্যোতি ঠাকুরের মিনিমাঙনা ইস্টিমার’-এ চাপার বায়না ধরেননি৷‌ বললাম, ‘স্টিমার সার্ভিসের চল এখন খুব একটা নেই৷‌ একটা স্টিমার অনিয়মিত ভাবে চলে৷‌ ব্যবস্হা একটা করেছি৷‌ কাল সন্ধেয়৷‌ তবে আমি সঙ্গে থাকব না৷‌ গ্রামে আর কয়েকটা দিন কাটিয়ে বাসে বর্ডার৷‌’

--কীভাবে ঠিক করলে?

--পুষ্প, মানে আমার এক বন্ধুর বোন বরিশালে থাকে৷‌ ওর বর খুব বড় উকিল এখানে৷‌ ওই পুষ্পর ঘাড়ে দায়িত্ব চাপিয়েছি৷‌ কোনও অসুবিধে হবে না৷‌ সে একেবারে ‘থাকিবার, খাইবার, শুইবার সুবন্দোবস্ত, সুন্দরী স্ত্রীর সহিত একত্র বন্দোবস্ত৷‌’ তবে শর্ত আছে৷‌ কাল, আমাদের সবার পুষ্পর বাসায় মধ্যাহ্নভোজ খেতে হবে৷‌ তবে আমার অভিজ্ঞতা, ব্যাপারটা ভয়াবহ৷‌ ওর বর যেমন খায়, তেমন খাওয়ায়৷‌ ‘সামান্য দশ পদ মাছ ছাড়া তার আয়োজন মোটামুটিও হয় না৷‌’ তপনদা বললেন, ‘খাইছে৷‌’ সুদীর্ঘ পরবাসেও বিশুদ্ধ ‘চান্দ্রদ্বীপি’ তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি৷‌

(পাঁচ)

পথঘাট তাঁর স্মৃতির ছবির অনুসারী ছিল না৷‌ তা থাকার কথাও এতদিনের পর থাকে না৷‌ বছর পঞ্চাশেক আগে নাকি একবার এসেছিলেন৷‌ তবে কীর্তিপাশার বাড়িতে যাননি৷‌ বরিশাল স্টিমার ঘাটের কাছে ‘নাবালক লজ’-টা তখনও দেখতে পেয়েছিলেন৷‌ কাল ফেরার পথে দুটো জায়গায় যাওয়ার ইচ্ছে৷‌ নাবালক লজ এবং জিলা ইস্কুলটা৷‌ তপনদার প্রপিতামহের শিশু বয়সে এক প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে তাঁর পিতা রাজকুমার বিষ প্রয়োগে নিহত হন৷‌ তাঁর স্ত্রী ‘সতী’ হয়েছিলেন৷‌ পরিবারে তখন মাৎস্যনায়ী অনাচার৷‌ তৎকালীন ব্রিটিশ জেলাশাসক নাবালক প্রসন্নকুমারের দায়দায়িত্ব এবং বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ স্বহস্তে গ্রহণ করে তাঁকে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলেন৷‌ জমিদারি এস্টেটটি তদবধি ‘নাবালকবাবুর এস্টেট’ এবং তাঁর বড় হয়ে ওঠার পরের বরিশালস্হ বাসস্হানটির নাম হয় নাবালক লজ৷‌

বরিশাল ঝালকাঠি রোড ধরে যাওয়ার সময় তপনদা সেদিন এই সব গল্প শোনাচ্ছিলেন৷‌ অবশ্য এ সব গল্প তাঁর মেজ ঠাকুর্দা রোহিণীকুমারের ‘বাকলা’ গ্রম্হে আমি আগেই পড়েছিলাম৷‌ গল্পের মধ্যে, মাঝে মাঝে তিনি এবং আমি ‘ফুট’ কেটে চলেছিলাম৷‌ হাসিদি হাসছিলেন৷‌ মজা করে বলেছিলাম, ‘হাসিদি আপনি ওই পরিবারে আসার পরেই কি তপনদারা সাবালক হলেন?’ হাসিদি বললেন, ‘কী জানি? পুরোটা বোধহয় এখনও হননি৷‌ দেখো না, কথাবার্তার শ্রী৷‌ যেমন কথায়, তেমন লেখায়৷‌’ তপনদা বললেন, ‘অনেক পুরুষের অভ্যেস তো, তা ছাড়া এস্টেটের অন্ন কিছুটা হলেও তো খেয়েছি, এস্টেটটা গেছে, কিন্তু নাবালকত্ব রয়েই গেছে৷‌ ওটা সামম্ত আভিজত্য৷‌’

গাড়ি আস্তে চলছিল৷‌ মাঝে মাঝে দাঁড় করিয়ে তপনদা হাসিদিকে নদী, পথঘাটের বিশেষ জায়গার স্মৃতি-ইতিহাস বলছিলেন৷‌ কোনটা কালিজিরা নদী, সেটাই প্রাচীন সুগন্ধার অবশেষ কি না, বর্তমান ঝালকাঠি নদীটাই শেষতক সুগন্ধার স্মৃতিবাহী নদী কি না– এই সব৷‌ ইস্কুল জীবনে, নাবালক লজ থেকে বাড়ি যেতেন সাইকেলে৷‌ সঙ্গে থাকতেন একজন ইংরেজ সাহেব পারিবারিকভাবে পরিচিত, কী যেন নাম ভুলে গেছি৷‌ বরিশালি ভাষায় দক্ষতা ছিল৷‌ তপনদা বললেন, ‘এইসব জায়গায় হঠাৎ সাইকেল থামিয়ে নেমে পড়ে সাহেব এক পাক নেচে, গেয়ে নিতেন– ‘আইজ ঠাকুমার রান্ধন খামু৷‌’ ঠাকুমা নাকি রন্ধনে দ্রৌপদী, তপনদা বলেছিলেন৷‌ হাসিদি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাকিটা?’ আমি বলেছিলাম, ‘পরিবারে কিন্তু প্রসন্নবাবুর মা এবং ঠাকুমা দুজন ‘সতী’ হয়েছিলেন, সামলে কথা বলবেন৷‌ গেলে, দু দুখানা সতীস্হান দেখতে পাবেন৷‌’

আমাদের রাস্তা গিয়ে তার অ্যাশফাল্টত্ব হারাল কীর্তিপাশার বাজারের বিপরীত পারে এক ব্রিজের গোড়ায়৷‌ ব্রিজটা কংক্রিকেটর না হলেও তার ওপর দিয়ে গাড়ি যাবে৷‌ ওপার থেকে বাজারের শুরু৷‌ তার মাঝখান দিয়েই রাস্তা৷‌ কিন্তু এখন সঙ্কীর্ণ৷‌ গাড়ি আস্তে আস্তে চলল৷‌ এই বাজার, রাস্তা এবং এলাকা তপনদাদের ‘নিজ মৌজা’, একেবারে নিজস্বভূমি৷‌ কম করে আশপাশ দশ গ্রামের মানুষ হাজারে-হাজারে ভিড় করে রাস্তা প্রায় অবরুদ্ধ করে ফেলেছে৷‌ হাসিদির হাঁটুতে আর্থারাইটিস৷‌ হেঁটে যেতে পারবেন না৷‌ পুষ্পকে বললাম, তুই হাসিদির দায়িত্বে থাক৷‌ আমি তপনদাকে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি৷‌ সঙ্গে অবশ্য ঝালকাঠি থেকে আমার বড় শ্যালিকাও ছিলেন৷‌ ওঁরা গাড়িতেই ইস্কুলের মাঠ অবধি যাবেন৷‌ তপনদা বললেন, ‘এ বেশ হল৷‌ পথি নারী আবর্জনা৷‌’ অবশ্য নারীরা কথাটা শোনেননি৷‌

কিন্তু হাঁটার উপায় নেই৷‌ কীর্তিপাশা এখনও হিন্দু প্রধান গ্রাম৷‌ উত্তরের বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলের গ্রামগুলো নমঃশূদ্র সমাজ অধ্যুষিত৷‌ অন্যান্য গ্রাম সবই মুসলমান প্রধান৷‌ বাজার সংলগ্ন বসতির অধিকাংশ মানুষ কর্মকার সমাজের৷‌ এঁরা শিক্ষা সংস্কৃতিতে খুবই উন্নত, যদিও এখন আর আগের ব্যাপকতা নেই৷‌ তথাকথিত শিক্ষিত হিন্দু উচ্চবর্ণীয় ভদ্দরলোক প্রায় নেই এবং ভাগ্যিস৷‌ মানুষগুলো সব বয়েস, ধর্ম নির্বিশেষে রাস্তায় পড়ে সাষ্টাঙ্গ প্রণিপাত করছে তাদের একদার রাজপুত্রকে৷‌ তপনদার দুচোখে অঝোর ধারা৷‌ মানুষটিকে কোনও দিন আদৌ আবেগপ্রবণ দেখিনি৷‌ একজন একজন করে বুকে জড়িয়ে ধরে এখন কাঁদছেন৷‌ এই কান্নার অর্থ বা মাহাত্ম্য সবাই বুঝবেন না৷‌ এটা তিনি নিশ্চয় বোঝেন নিজে, কারণ তিনি ‘রোমম্হনের কবি’, আর বুঝি আমি, কারণ ওই সময়টায় আমি ‘বিষাদবৃক্ষ’ রচনার দুর্মর প্রহরগুলো কাটাচ্ছিলাম৷‌ এটা ২০০০ সাল, ২০০৩-এ ‘বিষাদবৃক্ষ’ তার পুস্তকশরীর পাবে৷‌ আমি বিষাদবৃক্ষের কবি হব৷‌

হঠাৎ একজন কাঁচা-পাকা দাড়িওলা প্রৌঢ়কে দেখে তপনদা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘আরে ভুডি, তুমি তো দেখি একরকমই আছো৷‌’ বুঝলাম, তপনদার ভুল হয়েছে৷‌ ‘ভুডি’ অর্থাৎ ভুডি গাজিকে আমিও চিনতাম৷‌ তিনি অম্তত বছর পঁয়তিরিশ, চল্লিশ আগে মারা গেছেন এবং বৃদ্ধ বয়সেই৷‌ যাঁকে তপনদা ভুডি বলে জড়িয়ে ধরেছেন, তিনি ওই ভুডি গাজির কনিষ্ঠ পুত্র, সিদ্দিক গাজি৷‌ ও আমার চাইতে বয়সে কিছু বড় হলেও আমাদের সঙ্গে ইস্কুলে পড়ত৷‌ কথাটা একটু ফাঁকায় এসে তপনদাকে বলতে, বললেন, ‘তাই তো, কিন্তু ও তো একদম ওর বাপের চেহারা অবিকল৷‌’ বললাম, ‘সকায় নিরুত্তিয়াতে বলুন, ‘একদম’ নয়, একছের৷‌’

ইস্কুলের মাঠে মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল, রাস্তায় প্রবেশ তোরণ করা হয়েছিল৷‌ ইস্কুলে ছেলেমেয়েরা পালা করে এসে প্রণাম করে গিয়েছিল তাঁকে৷‌ একটি কিশোরী মেয়ে গান গেয়ে বরণ করেছিল৷‌ ‘ঝরা ফুল দলে কে অতিথি, এলে সাঁঝের বেলায় কানন বীথি’৷‌ তপনদা বক্তৃতায় বললেন, ‘মিহির আমার এই তীর্থ দর্শন সম্ভব করেছে৷‌ আপনাদের সকলকে আমার প্রণাম, মিহিরকে আশীর্বাদ৷‌’

রাতটা ঝালকাঠিতে স্টিমার ঘাটের কাছে আমার ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’-এর অন্যতম এক প্রধান চরিত্রের ফ্ল্যাটে কাটানো হল৷‌ তাঁর নাম রাজা নাসির, সংক্ষেপে নসু৷‌ ‘সিদ্ধিগঞ্জের মোকাম’-এর পাঠকেরা হয়ত তাঁকে স্মরণ করতে পারেন৷‌ ওঁরা মহারাজ প্রতাপাদিত্যের বংশধর৷‌ ওঁদের সবার নামের আগেই রাজা বিশেষণটা এখনও ব্যবহূত হয়৷‌ তপনদা বললেন, ‘বইয়ের মানুষ জ্যাম্ত দেখা ভাগ্যের কথা৷‌ হাসি, একটা ছবি নাও৷‌’ হাসিদি ছবি নিলেন তপনদা, নসু এবং আমার একসঙ্গে৷‌ গতকালের প্রাসাদ দর্শনের বিবরণটা এবং তার প্রতিক্রিয়াটার বিষয় পাঠকদের অনুমানের ওপরই ছেড়ে দিলাম৷‌

পুষ্পর বাড়ির মধ্যাহ্নভোজ আর জনসমাবেশের কথাও এ যাত্রায় প্রায় অনুক্তই রাখলাম৷‌ সকালে প্রাতরাশ খাবার সময় তপনদাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপনি তো জাতে কালচারাল লেফটিস্ট৷‌ মানুষগুলোর অবস্হা দেখে কি আপনার মনে হল, সামম্ততন্ত্রের সবটাই খারাপ? যদি খারাপই হয়, আমার প্রশ্ন রইল, এই সম্পর্কটা এতকাল বেঁচে রইল কী করে? এরা কিন্তু ঐতিহাসিক ড. তপন রায়চৌধুরিকে চেনে না, নামও শোনেনি৷‌ চেনে কীর্তিপাশার জমিদার চাঁদবাবুর ছেলেকে এবং জানে একটা পরম্পরাগত সম্পর্কের বন্ধনকে৷‌ সেটা কী?’ তপনদা বললেন, ‘ভাবতে হবে৷‌ আগে কখনও ভাবিনি৷‌’

মধ্যাহ্নভোজের আগে জিলা ইস্কুল পরিদর্শন হল৷‌ সেদিন ছুটি ছিল৷‌ তথাপি খবর পেয়ে অনেকেই এসেছিলেন৷‌ পুষ্পদের অতিথি সৎকার সেদিন আরেকটু এদিক-ওদিক হলেই ভিন্ন অর্থেই শেষ সৎকার হত৷‌ তপনদা বলেছিলেন, ‘সত্যিই সামান্য দশপদ৷‌’ সবই হয়েছিল অতি মনোরম এবং স্পর্শমাধুর্যের মধ্যে৷‌ শুধু নাবালক লজটা দেখানো যায়নি৷‌ স্হানটিতে গিয়ে তপনদার স্মৃতিটা আধুনিকতার লোহা-লক্করের এবং কংক্রিটের প্রচণ্ড আঘাতে একেবারে লন্ডভন্ড হয়ে গেল৷‌ নাবালক লজের জায়গায় একটা বহুতল ফ্ল্যাট বাড়ি৷‌ তপনদা আর একবার কেঁদে ফেললেন৷‌

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন