বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

আলবেয়ার কামু’র নোটবুক : পর্ব ২

ধারাবাহিক

অনুবাদ- এমদাদ রহমান

[আলবেয়ার কামু জন্ম নিয়েছেন ১৯১৩ সালে, আলজেরিয়ায়। দি আউটসাইডার, দ্য প্লেগ, দ্য ফল তাঁর উপন্যাস। লিখেছেন সিসিফাসের মিথ। পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের একজন। জীবন আসলেই কী, এই ব্যাপারে তিনিই সবচেয়ে বেশি কথা বলেছেন। নিরর্থকতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন।
তাঁর সাহিত্যকৃতির অনন্য দলিল ‘নোটবুকস’, এগুলো ফরাসি থেকে ইংরেজি অনুবাদ করেছেন ফিলিপ থোডি। কামু’র নোটবুকের ১ম খণ্ডে ১৯৩৫ থেকে ১৯৪২, ২য় খণ্ডে ১৯৪২ থেকে ১৯৫১ এবং ৩য় খণ্ডে ১৯৫১ থেকে ১৯৫৯ পর্যন্ত সময়কালের বিভিন্ন চিন্তা ও উপলব্ধি লিপিবদ্ধ করেছেন। এই সময়কালের মধ্যেই তিনি লেখন ‘দি আউটসাইডার’, ‘দ্য প্লেগ’, ‘দ্য ফল’ —এই উপন্যাসগুলি; ভাবনাবিস্তারি প্রবন্ধ ‘দ্য রিবেল’, ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’; ‘ক্যালিগুলা’, ‘ক্রস পারপাস’, ‘দ্য পজেজসড’ এই তিনখানি নাটক। ১৯৫৭ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৬০-এ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। গল্পপাঠের পাঠকদের জন্য, কামু’র নোটবুকের ধারাবাহিক প্রকাশের অংশ হিসেবে আজ দ্বিতীয় কিস্তি ছাপা হল।]


নভেম্বর, ’৪২।

এবারের হেমন্তে, বর্ণিল পাতায় পাতায় চারপাশ ছেয়ে গেছে—চেরি গাছগুলি হয়েছে লাল, ম্যাপল হয়েছে হলদে আর বিচ গাছগুলি যেন ব্রোঞ্জের পোশাকে সজ্জিত। সমস্ত মালভূমি, দ্বিতীয় বসন্তের সহস্র সৌন্দর্যশিখায় ছেয়ে গেছে পুরোপুরি।

যৌবন চলে যাচ্ছে। এ তবে আমি নই যে কি না মানুষ আর অন্যান্য সব কিছু থেকেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে (আমি কখনই তা করতে পারব না), কিন্তু মানুষ আর অন্যান্য সব কিছুই আমাকে ছেড়ে যাচ্ছে। আমার যৌবন আমার কাছ থেকে উড়ে চলে যাচ্ছে আর এটাই হল নিজেকে অসুস্থ ভাববার মোক্ষম উপায়।

একজন লেখকের জন্য একেবারে প্রাথমিক শর্ত হল স্বর পরিবর্তন কিংবা বিভিন্নমাত্রিক ভাবনার স্থানবিন্যাস করার শিল্পকৌশলকে আয়ত্ত করে ফেলা। অন্যারা ঠিক কী অনুভব করতে চাইছে সে সম্পর্কে তার নিজের অনুভূতিটাকে বুঝতে শেখা। তবে, হঠাৎ প্রথমবারেই লেখক হয়ত সফল হবেন। কিন্তু পরবর্তীতে, অবশ্যই প্রজ্ঞার প্রশ্নটি চলে আসবে এবং ভাবনার সমস্ত স্থান দখল করে নেবে। আর এইভাবে আমাদের প্রজ্ঞা বা প্রতিভা একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়ে বিরাজ করতে থাকবে।


সেন্ট স্তেফান চার্চ।

আমি জানি খেটে খাওয়া একজন দরিদ্র মানুষের কাছে রবিবার ব্যাপারটা কী। আবার, রবিবার সন্ধ্যার মানে কী তার অর্থও আমি জানি। আর আমি যদি এখন কী কী জানি তার সব অর্থ বয়লে দিই আর তাদের অর্থের এক একটি মূর্তি গড়ে তুলি, তাহলে আমি এক দরিদ্র ব্যক্তির রবিবারকে মানবজাতির জন্য কাজ করবার দিন হিসাবেই গড়ে তুলব।

হয়ত লিখিতই আছে, তবু আমার জন্য ব্যাপারটা ভয়ানকরকম বিস্ময়করঃ দুনিয়াটা যদি একেবারে সহজ, সরল হত, তাহলে আমাদের কাছে শিল্প বলে কিছুই আর থাকত না, -- তবে, আমি যদি খুঁজে বের করি যে এই বিশ্বের কোনও একটি তাৎপর্যময় অর্থ আছে, তাহলে আমার পক্ষে আর কিছুই লেখা সম্ভব নয়।


এখানে এমন কিছু বিশেষ পরিস্থিতি রয়েছে যেখানে বিনয় কিংবা নিরভিমান দাবি করে যে সে থাকবে একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে। এই ধারণাটিকে একটি বিশেষ সূত্রের সঙ্গে যুক্ত করলে, খুব সতর্কতার সঙ্গে আমার মনে কিছু ভাবনার জন্ম হবে আর শেষ পর্যন্ত এটা দাঁড়াবে যে আমি কোনোভাবেই জটিলতাটাকে লিখে উঠতে পারব না।

লাগামহীম যৌনতা পৃথিবীর এক অনর্থক দর্শনকে প্রধানরূপে তুলে ধরে। তার বিপরীতে, কৌমার্য পৃথিবীকে অর্থময়তার দিকে নিয়ে যায়।


কিয়ের্কেগারদ। বিবাহের এক সৌন্দর্যতাত্ত্বিক মূল্যবোধ। চূড়ান্ত বা সুচিন্তিত ধারণাগুলো কিন্তু অতিমাত্রায় শব্দের বাহুল্য।


কখন, ঠিক কখন আমাদের এই জীবন নিয়তি দ্বারা পরিবর্তিত হয়? যখন আমরা মারা যাই? কিন্তু এটা হল অন্য মানুষের নিয়তি, ইতিহাসের কিংবা একটি পরিবারের। কিন্তু আমাদের সচেতনতা কোথায়? এ হল আমাদের মনের একটি অবস্থা যা নিয়তি হিসেবে আমাদের জীবনের এক ছবি তৈরি করে ফেলে আর এই ছবি তৈরি করে এক ধরণের সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থা, যেখানে আর কারও অস্তিত্ব থাকে না। দুইক্ষেত্রেই আমরা কুহক কিংবা অলীকতা নিয়েই জীবনের মুখোমুখিতে দাঁড়াই। উপসংহার? এখানে কি নিয়তি বলে কিছু আছে?


এই দেশে, শীত অন্যান্য সব রঙ এমনভাবে মুছে দিয়েছে যে মনেই হবে না সাদা ছাড়া আর কিছু আছে, ক্ষীণ শব্দগুলি যেন শুরু থেকেই প্রবল তুষারপাতে শ্বাসরুদ্ধ হয়েছিল, সব সুগন্ধ যেন আদিকাল থেকেই প্রচণ্ড হিমে জমে গিয়েছিল। বসন্তের প্রথম উন্মাদ হাওয়ায় ঘাসফুলগুলিকে মনে হচ্ছে যেন আনন্দের হল্লা, যেন সংবেদনের ট্রাম্পেট উল্লাসে ফেটে পড়ছে।


আলজেরিয়ায় রাতের বেলা কুকুরের ঘেউ ঘেউ ডাক ইউরোপের তুলনায় দশগুণ বেশি শোনা যায়। আর এই তীব্র ডাক আমাদের স্মৃতিকাতর করে তুলে। আমাদের আবদ্ধ, স্থবির দেশে আমরা একটি ঘরের জন্য হাহাকার করতে থাকি। এই ব্যাপারটা আমার ভিতর ভাষার আকার নিচ্ছে, আজ আমি আমার স্মৃতির ভিতর একা একা শব্দগুলিকে শুনছি।


একটা প্রশ্ন করিঃ আপনি কি এই ধারণাগুলিকে ভালবাসেন আপনার তীব্র অনুভূতি দিয়ে, রক্ত দিয়ে? এইসব চিন্তা বা ধারণাগুলি কি আপনাকে জাগাতেও পারে? আপনি এই অনুভবটুকু কখনও করতে পেরেছেন যে চিন্তাগুলি দিয়ে আপনি আপনার জীবনটাকে একটা শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করাতে পেরেছেন? কতজন গভীর চিন্তাশীল মানুষ একসময় পিছিয়ে পড়েছেন!


আমার নাটকগুলির প্রকাশনার জন্যঃ ক্যালিগুলা- ট্র্যাজেডি, নির্বাসন (অথবা, বুদযোভিখ)- কমেডি।

সেই মুহূর্তে, যখন তুষারে ঢাকা পড়েছে সবকিছু, আমি তখন দেখছিলাম দরজা জানালাগুলি নীল হয়ে গেছে!


দারিদ্রতায় বিপন্ন এক ছেলেবেলা। রেইনকোট শরীরের মাপের চেয়েও বড়— সিয়েস্তা। ভিঙ্গা বিয়ারের বোতল— ফুফুর ঘরে, রবিবার। অজস্র বই—দ্য টাউন লাইব্রেরি। ক্রিসমাসের রাতে নিজের ঘরে ফিরছিলাম। রেস্টুরেন্টের সামনে মৃতদেহ। পড়ে আছে। সেলারে, খেলা চলছে— জিনে, জোসেফ আর ম্যাক্স।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন