বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

হাসান আজিজুল হকের গল্প : নামহীন গোত্রহীন


সেই লোক বিকেলে ট্রেন থেকে নামলো। এই প্রথম শীতে সে পড়েছে টুইডের খসখসে মোটা কোট। কোটের শেয়ালে রঙটা তার গায়ের তামাটে ময়লা রঙের সঙ্গে সুন্দর মানিয়ে গেছে। পুরনো কিন্তু দামি একটা টাই বেঁধেছে অগোছালেভাবে। প্যান্টের রঙ গেছে জ্বলে--উরুর কাছে দুটো তিনটে মোটা সেলাই আছে। সকালে নয়, বিকেলের ট্রেনেই সে নেমেছিল।

তবে বিকেল তখন দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। সে প্লাটফর্মের দক্ষিণ কোণের দিকে অন্যমনস্কভাবে চেয়ে আছে। ছায়া তারাতারি সরে যাচ্ছিল। পূবদিকের বড়ো-বড়ো বাড়ী ও উঁচু গাছগুলোর মাথা থেকে লালচে ঠান্ডা রোদ মিইয়ে আসা সন্ধের অন্ধকারও দ্রুত নেমে আসছিল।

লোকটা ষ্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমমুখো ধুলো ভর্তি রাস্তার দিকে চেয়ে রইলো। রাস্তার পিচ এবড়ো থেবড়ো হয়ে গেছে-সাদা ধুলোয় আগাগোড়া ঢেকে আছে। রাস্তার দুপাশে টিনের তৈরি ফাঁকা গুদোম তার চোখে পড়লো। এই বিশাল গুদোমগুলোর পাশ দিয়ে কালো কালো গলি চলে গেছে। অত বড় চওড়া রাস্তায় যতদ্র চোখ যায়, কোন লোকজন তার চোখে পড়ে না।

হিসহিস শব্দ কর ইঞ্জিন গুলো চলাচল করছিল। জনমানবশূন্য এই জায়গায় ইঞ্জিনগুলো নিজেরাই কি চলাচল করছে। সে লক্ষ্য করে কারো কোন ব্যস্ততা বা নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই যেন। রেল ষ্টেশনের পুবপাশে নিচু ছাদঅলা বাড়ীগুলো অন্ধকারে খুব তাড়াতাড়ি ডুবে যাচ্ছে-সেগুলোর ইট বঙের চিমনি অস্পষ্ট দেখা যায়।

খুবই আনমনে সে তার হাতের চামড়ার ফোলিও ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে ষ্টেশনের গেট পার হয়ে বাইরে চলে এলো। এই সময়ে সে প্লাটফর্মে বা আশেপাশে কাউকে দেখতে পেয়েছিল এমন মনে করতে পারে না কিন্তু বাইরে আসার সময় গেটের পাশে একটা ছোটঘরে ঠাসাঠাসি করে বসা কিছুসংখ্যক সৈন্য দেখতে পেল। তারা রাইফেল হাঁটুর উপর রেখে গল্পগুজব করছিল। তাদের টুপি ভুরুর উপর নামানো। খুব ঠান্ডা হিমচোখে তারা ওকে দেখলো কিন্তু কিছু বললো না। নিজেদের মধ্যে নীচু চোয়াড়ে গলায় কথাবার্তা বলতে লাগলো। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে গেট পার হবার সময় একজন সৈন্য রাইফেল তুললো। যে রাইফেল তুলেছিল, বড়োবড়ো দাঁত বের করে নিবর্োধের মতো হাসলো সেই সৈনিকটি। গেট পার হয়ে সে বাইরে এলো। এই জায়গাটা বৃত্তকার-মাঝখানে ফাঁকা সেখানে ধুলো ভর্ত্তি ঘাস রয়েছে। সে হাটতে লাগলো। বাঁধানো রাস্তায় তার জুতোর শব্দ উঠতে লাগলো। বৃত্তটাকে সে একবার ঘুরে এলো। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। সে দাঁড়িয়ে পরে অন্য রাস্তার দিকে চেয়ে দেখে। এইসব রাস্তা শহরের বিভিন্ন দিকে গেছে। কোনটা ভাঙ্গা পিচঢালা-কোনটা খোঁয়া বাঁধানো, সাদা ধুলোয় পূর্ণ। যে রাস্তাটা গ্রামের দিকে গেছে, মনে হয় সেটা মাটির। তার দুপাশে কোন বাড়ীঘর নেই অথচ সদাসাদা পড়ো ভিটে পরিস্কার দেখা যাচ্ছিল।

ষ্টেশনের বাইরের বৃত্তটিকে একবার ঘূরে এসে বাঁদিকের টিনের দেয়ালঅলা রেস্তোরাটি তার চোখে পড়লো। সে সোজা সেখানে ঢুকে গেল। তার খিদে পেয়েছিল। ঘরের ভিতরটা ভীষন ঠান্ডা আর যে বাল্বটি জ্বলছিল তা ধোঁয়ায় ঢাকা। সামান্য মরা আলোয় ঘরের নোংরা চেয়ার -টেবিলগুলো অস্পষ্ট দেখা যায় মাত্র। প্রথমে কোন মানুষ সে দেখতে পায় নি, পরে রেস্তোরার উনুনের লালচে আলো দেখতে পায় এবং দরজার পাশেই যে লোকটি টেবিলে ধুতনি রেখে বসেছিল তাকেও নজর করতে পারে। লোকটা যখন চোখ তুলে তারদিকে তাকায় তখন সে কাঁচুমাচু করে তার সোনালি খোঁচা খোঁচা দাড়িতে হাত বুলোতে থাকে, কিছু খেতে পাওয়া যাবে?

কুচ নেহি-বিরক্ত স্বরে টেবিলের ওপাশ থেকে লোকটা জবাব দেয়।
কোন খাবার নেই।
নেহি, কুচ নেহি-মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে লোকটা তহাত নাড়ে কিন্তু সে তার টুইডের কোটের বাঁদিকের বুকের ওপর যে ধ্যাবড়া অন্য রঙয়ের সেলাই ছিল, তার উপর ফ্যাটা আঙ্গুল চালাতে চালাতে বলে, চা পাওয়া যাবে কি এক কাপ?
কুছ নেহি মিলেগা-চলো চলো, আপনা রাস্তা দেখো।

যখন সে সেখান থেকে বেরিয়ে আসে, লোকটা একদৃষ্টে পিছন থেকে তার পিছন দিকে, তার চওড়া কাধের দিকে চেয়ে থাকে। সে বাইরে এসে দেখতে পায় ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে, রাস্তায় কোন আলো নেই। বড় চওড়া রাস্তাটা ধরে সে এগোয়। ধুলোর উপর তার জুতোর ধপধপ আওয়াজ ওঠে। যতদুর মনে পড়ে এই পথ এতো বৃক্ষহীন কোনদিন ছিল না। এইখানে রীস্তার দক্ষিনে একটা সাইনবোর্ডের দোকান ছিল। ওখানে একজন হোমিওপ্যাথ বসতেন। সন্ধ্যার পর ঝকমকে আলো জ্বলত-শুকিয়ে ওঠা চেহারার ডাক্তার বসতেন উত্তরদিকে মুখ করে। চেয়ারে বসে নাকের সামনে খবরের কাগজ তুলে পড়তো কজন বুড়ো। কেন এখানে এসেছে মনে করার চেষ্টা করে সে। কি যেন হিসেবপত্র বাকী রয়েছে, কেউ যেন তার কাছে টাকা পাবে বা সে কারো কাছ থেকে পেতে পারে এই রকম মনে হলো তার। ঝড়-বৃষ্টির কালো আকাশে যেমন এলোমেলো বিদ্যুৎ চমকায় তেমনি ছোটছোট স্মৃতি তার মাথার মধ্যে চিড় খেতে থাকে। যেমন সকালে উঠে দাড়ি কামানো বা কাগজ পড়া। প্যাট্রিস লুমুম্বা খুন হয়ে গেলে সে সেই খবর পড়ে কেঁদেছিল, কোন একদিন দুপুর বেলা হো চি মিনের কবিতা পড়েছিল- পাহাড়তলির দিক থেকে ডিং ডং করে ঘন্টা বাজে-স্বাস্থ্যবতী তরুণীরা ছোট ছোট পা ফেলে উপত্যকা থেকে নেমে আসে। ছোটবেলায় লম্বা লম্বা আঙ্গুল দিয়ে তাড়াতাড়ি মাটি সরিয়ে দেখতে পেয়েছিল বড় বড় গোল আলু ধরে আছে, মাঝখানে মুল বীজ আলুটা পচে শুকিয়ে গেছে।

কোনদিক থেকে কোন মানুষ এলো না। সে বাঁদিকের সরু গলি ধরে গুদোমগুলোর মাঝখান দিয়ে গভীর অন্ধকারে নেমে এলো। রাস্তার দুপাশে কখনও কখনও ঘন ঘাসে তার পা বসে যাচ্ছিল। সে গুদোমের টিনের দেয়ালে হাত দিয়ে দেখল শিশিরে ভিজে আছে আর ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। এইভাবে সে নদীর ধারে পৌঁছে গেল। জায়গাটা এখন চিনতে পারে। বাজরের দোকানপাঠ রাস্তার দুপাশ দিয়ে সরি বেঁধে রয়েছে।

সমস্ত দোকান সে বন্ধ দেখলো। নদীর বাঁধানো পারই হচ্ছে রাস্তা। এই রাস্তার দুদিকে দোকন ঘরগুলো। নদীর দিকে কোন দোকানেরই নিচে মাটি নেই, নদী এসে ক্ষয় করে দিয়ে গেছে। সেদিক সমস্ত ঘর মোটা মোটা বাঁশ বা গাছের গুড়ির উপর ভর দিয়ে শুন্যে ঝুলছে। দুবর কান পেতে সে পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ শুনলো অন্ধকারের মধ্যে। তার মনে হলো ঠিক পায়ের নীচে নদী এসে মাথা খুড়ছে। দোকানপাঠের ফাঁক দিয়ে াঁদিকে চেয়ে সে স্তব্ধ নদী দেখতে পেয়েছিল- আলোহীনতায় বাশাল হয়ে বয়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু অস্পষ্ট আলো দেখতে পেয়ে সে নদীর বুকে নৌকাগুলোর অস্তিত্ব টের পায় এবং বুঝতে পারে ঘন হয়ে কুয়াশা জমে আছে পানির উপর।

নদীর ভয়ে এককালে কারা এই রাস্তা কালো পাথর দিয়ে বাঁধিয়ে দিয়েছিল। পাথরগুলো এখন উঁচু-নিচু হয়ে গেছে, কোথাও কোথাও উঠে গেছে। সে হাঁটতে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল। কিন্তু এসব লোকটা গ্রাহ্য করে নি। সে শুধুই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছিল। কেউ তর সামনে আসছিল না বা তার সঙ্গে আলাপ করছিল না। কোথাও কোথাও আলো জ্বলছিল না। দুপাশের ঘরগুলোর বিরাট দরজা শক্ত করে বন্ধ করা। কোথায় যেন কার ভয়ে দাঁতকপাটি লেগেছে। লোহার তৈরি কিছু একটা দাঁতের ফাকে ঢুকিয়ে দাঁত ছাড়িয়ে দেওয়া দরকার এমনি মনে হলো তার আর ভীষন কৌতুহলে সে রাস্তা ছেড়ে নীচু বারান্দায় উঠে একটা বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে ভিতরে উঁকি দেবার চেষ্টা করলো। কিন্তু সে দেখতে পেল না। দুহাতে প্রাণপণে চাড় দিয়ে দরজা একটুও ফাঁক করতে পারলো না। শুধু ঝাল মসল্লার তীব্র গন্ধ তার নাকে এসে লাগলো। সে ফিরে আসবে, অন্ধকারে একটা কালো রঙের ছাগলের উপর পড়ে সে ছিটকে রাস্তয় চলে আসে। পাথরের রাস্তায় ভয়ানক শব্দ হয়।

এই সময় সে প্রথমবারের মতো ভারী বুটের শব্দ পায়। অনেকগুলো বুটের শব্দ। অন্ধকারের নৈঃশব্দ থেকে উঠে আসছিল খট খট খট এই শব্দ। তারপর বিজাতীয় কন্ঠে বিকট হাঁক উঠলো, কৌন হায় উধার। এই চিৎকারের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কড়াং শব্দে রাইফেলের গুলি ফাটে। সে একটুক্ষন দাড়িয়ে শুনলো-বুটের শব্দ অন্যদিকে যাচ্ছে। আবীর রাইফেলের গুলি ফাটলো। সে তার ফোলিও ব্যাগটা বগলে রেখে বুকে হাত বেঁধে একটু দাঁড়ালো, তারপর সাবধানে হাঁটতে লাগলো। এইভাবে বন্ধ সারি সারি দোকানপাটের ভিতর দিয়ে, ফাঁকা শুন্য রাস্তা ধরে, অসংখ্য গলিখুঁজি অতিক্রম করে-যেগুলো অন্ধকারের মধ্যে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে গোলক-ধাঁধার মতো শুধুই ঘুরছে, একটির পর একটি, জনশুন্য নিশ্চুপ- এইসব গলির ভিতর দিয়ে শতপদী কেন্নোর মতো সে পিলপিল করে এগিয়ে গেল।

কতক্ষন পরে সে শহরের বড় রাস্তায় এসে পড়েছে। একটির পর একটি রাজবর্ম সে অতিক্রম করে গেল। এসব রাস্তাও অন্ধকারে ডুবে রয়েছে দেখল। তারপর সে একটি ঘোরানো সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। কোথাও একটা আলো ঝোলানো রয়েছে। লাল আলোয় একবারের জন্য সে দঁড়িয়ে নোনাধরা পলেস্তরাখসা দেয়ালের দিকে চেয়ে রইলো। সোঁদা আর ভ্যাপসা একটা গন্ধে নিশ্বাস আটকে এলো তার। এই ঘোরানো সিড়ি সুড়ঙের মতো। কোন একটা দিক থেকে বুঝি বাতাস আসছিল। ভীষন হীমে সে কাঁপতে থাকলো। এবড়োথেবড়ো দেয়ালের গায়ে হাত রাখলে তার আঙ্গুল বেয়ে ঠান্ডা উঠে আসতে থাকে। নোংরা ভিজে দেয়ালের উপর পেন্সল দিয়ে মেয়ে মানুষের মুখ আঁকা রয়েছে। পাশেই লাল রঙের ইট দাত বের করে আছে। ঠিক কোনদিক থেকে আলো আসছে সে কিছুতেই ধরতে পারল না। আবার সে সিড়ি বেয়ে একতলা, দোতলা, তিনতলা, চারতলা উঠছে। একেবারে সিড়ির মাথায় এসে সে বন্ধ দরজায় ঘা মারলো, চিৎকার করে ডাকল, অসিত আছ? অসিত আছ নাকি? অসিত কি বাড়িতে আছ?

সেই কড়া নাড়ার শব্দে বড়ীটা কেঁপে উঠল। ভুমিকম্পে যেমন হয়, সমস্ত বাড়ীটার ভীত নড়ে গেলৌ। সে দরজায় হাতের মুঠো দিয়ে একনাগাড়ে অস্থিরভাবে আঘাত করতে করতে ডেকে চলল, অসিত কি বাড়ীতে আছ? অসিত কোথায়?

দরজার ওপাশে খুট করে আওয়াজ হলো। একটি ভীতু মেয়ের গলা শোনা গেল, কে? কে? বাইরে কে?

সে কোনদিকে কান না দিয়ে অসিত অসিত বলে ডেকে চলল। এই চৎকার সে থামালো যখন দরজার একটা পাট খুলে গেল। বন্ধ পাটির আড়াল থেকে একটা মুখ উঁকি দিল। স্ত্রী লোকটির ফ্যাকাশে শীর্ণ মুখের দিকে চেয়ে সে খুবই লজ্জিত হলো। দেখল তার বড়বড় চোখ বিস্স্ফারিত হয়ে রয়েছে। সরুসরু হত দিয়ে প্রাণপণে দরজা চেপে ধরে ভীষণ আতঙ্কভরা কন্ঠে মেয়েটি ফিসফিস করে বলল, কাকে চাই?
অসিত নেই? অসিত এই বাড়ীতে থাকে না?
না, অসিত নামে কাউকে আমরা চিনি না। আপনি কে?
অসিত বলে কেউ কি কোনদিন এই বাড়ীতে থাকতো?

জানি না, আমরা এখানে নতুন এসেছি-এই বলে মেয়েটি দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিল। যে লাল আলোটা আসছিল সেটাও যেন হঠাৎ উবে গেল। সিঁড়ির মাথায় ঠান্ডার মধ্যে সে দাঁড়িয়ে রইলো। সেখানে রেলিং-এ ভর দিয়ে গভীর অন্ধকারে পূর্ণ সিড়ির কুয়োর মতো গর্তটার দিকে চাইলো একবার। তারপর লাফ দেয়ার জন্য তৈরি হলো। তুলোর উপর বেড়াল যেমন লাফ দেয়, তেমনি করে শুন্য অন্ধকারের ভিতর লাফ দিয়ে তলিয়ে যেতে চাইলো কিন্তু একটু পরেই সিঁড়িতে ভারী পায়ের শব্দ তুলে সে নীচে নেমে যাচ্ছিল। অনেকক্ষন ধরে ঘুরতে ঘুরতে দেয়াল হাতড়ে হাতড়ে, শ্যাওলার ওপর আলতো করে নাক ঘষে , মারমুখো অশরীরীর মতো সে নীচে যেতে লাগল। বাইরে এসে রাস্তায় একটা নীচু কালভার্টের ঠান্ডা শানের উপর হাটুতে থুতনি রেখে বসে পড়ল।

অনেক দূরে রাইফেলের আওয়াজ সে পায় কিন্তু কান খাড়া করেও কোনো বাতাসের শব্দ সে পায় না। লোকটা একবার মুখ তুলে আকাশের দিকেও চেয়েছিল। কোনো তারা ছিল না এবং মেঘ দেখা যায়নি। সে কোনো বীভৎস শব্দের প্রতীক্ষায় ছিল। কিন্তু কিছুই না ঘটায় সে বিরক্ত হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করে। চৌকো চৌকো বাড়িগুলো রাস্তার দুধারে ছড়িয়ে রয়েছে। নিচু ছাদ আবছা অন্ধকারে চকচক করছে আর এইসব বাড়ির পাশ দিয়ে ছোট ছোট ধুলোভরতি পথ বা কালো পিচের রাস্তা এঁকেবেঁকে আতঙ্কের অন্তঃপুরের দিকে চলে গেছে।

তার পিছনদিকে কোনো অনির্দিষ্ট রাস্তা থেকে এখন সে ভারী গাড়ির আওয়াজ পায়। ইঞ্জিনের গম্ভীর গুড়গুড় শব্দে কিছুক্ষণের মধ্যে কানে তার তালা ধরে যায়। শব্দটা ওঠার পর থেকে আর কিছুতেই দূরে যেতে চায় না, অজস্র মোড়ওয়ালা প্যাঁচালো কোনো রাস্তা দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে বলে শব্দটা কখনও দূরে চলে যায়, শুধু রেশটা থাকে মাত্র। আবার ঘুরে এসে বুকের ভিতরে ঢোকে। আওয়াজটা কিছুতেই তাড়ানো যাচ্ছিল না। স্ক্রুর মত প্যাঁচ কেটে কেটে পাতালে নেমে আবার সেইভাবে ঘুরে ঘুরে উপরে উঠে আসছে যেন। এতে সে ভারি একঘেয়ে বোধ করল।

তার ঠাণ্ডা লাগছিল। কোটের কলার দুটো যতটা সম্ভব টেনে তুলে কান ঢাকা দেবার চেষ্টা করল। তারপর খুব জোরে জোরে দুহাত ঘষে নিল। দুপাশের বাড়িগুলো নিঃশব্দ— কোনো আলোর রশ্মি দেখা যাচ্ছিল না, কেউ কাউকে ডাকছিল না, কারও সঙ্গে কোনো আলাপ হয়নি, কেউ দরজায় ধাক্কা দেয়নি, প্রতিটা দরজা শক্ত করে বন্ধ করা ছিল।

যখন সে ডানদিকের রাস্তায় মোড় নিয়ে একটা বড় বাড়ির অন্ধকারের আড়ালে চলে গিয়েছিল, সেই সময় অতি দ্রুত একটি জিপ এসে ঘ্যাঁস করে ব্রেক কষে বড় রাস্তার উপরেই থেমে গেল। সে সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই স্ত্রীলোকের গোঙানি শুনতে পেল। লোকটা তখন তার বুকের ভিতর খুব একটা কষ্ট অনুভব করল। একবার সে মাটির দেয়াল-চাপা পড়েছিল, নাকের মধ্যে ঢুকে গিয়েছিল গুঁড়ো মাটি, কিছুতেই নিশ্বাস নিতে পারছিল না— সেইরকম। সে জিপটার কাছে যাবার জন্যে পা বাড়িয়েছিল, কোথায় কীভাবে সে ছিল এবং তার জীবন স্বপ্নের ভিতরে কোনো স্বপ্নের মত কি না বা বাস্তব— এসব প্রশ্ন হঠাৎ গুলিয়ে গেল বেচারির এবং ফস করে দেশলাই জ্বলে উঠলে একজন বিজাতীয় মানুষের নিষ্ঠুর মুখ এবং একটি মুখবাঁধা স্ত্রীলোকের অবয়ব হঠাৎ দেখে ফেলল। সে এগিয়েই যাচ্ছিল— তক্ষুনি কেউ লাফ দিয়ে জিপে উঠল এবং তীব্র গতিতে সেটা চলে গেল।

লোকটা মুখ ফিরিয়ে আশ্চর্য হয়ে দেখল চাঁদ উঠেছে। সে শহরের প্রশস্ততম রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। চাঁদ খুব তাড়াতাড়ি আকাশে উঠে গেল। সিধে চওড়া রাস্তার বহুদূর পর্যন্ত সে দেখতে পাচ্ছিল। মরুভূমির মাঝখানে অতি প্রাচীন ও জনমানবশূন্য অট্টালিকাশ্রেণীর মতো দেখাচ্ছে এই রাস্তার দুপাশের বাড়িঘর। বিকালের মরা আলোয় মাটি খুঁড়ে উন্মোচিত পুরনো ঘরবাড়ি ভাঙাচোরা, সব ছাদ সমান উঁচু নয়, চওড়া রাস্তা আর চমৎকার জলনিকাশের বন্দোবস্ত, সরু সরু পথ—সব রয়েছে এইরকম দেখাচ্ছিল শহর। সাদা রঙ-করা বাড়িগুলো ধপধপ করছিল—এক-একটা বাড়ি অন্য বাড়ির উপর, রাস্তার উপর ঘনকালো ছায়া ফেলেছিল। কোনো কোনো বাড়ির সামনে দিয়ে লম্বা পাঁচিল চলে গেছে। পাঁচিলের ওপাশে ফুলের গাছ, অযত্নের কাঁটালতা, সাঁতলা-ধরা ইটের খোয়া, কোনো বাড়ির গেটের পাশে লেখা—সাবধান, কুকুর আছে। কিন্তু কুকুরের ঘেউঘেউ শোনা যায়নি। বাড়িগুলোর কোনটা উঁচু, কোনটা নিচু, কোনটা নতুন, রং-করা, কোনোটা পুরনো আর সোঁদা গন্ধওলা ভিজে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার; বাতাবিলেবুর গাছ, ঘন পাতাবাহার। কিছু-কিছু পোড়ো জায়গা আশেপাশে। এই রাস্তা দিয়ে, এইসব গলিঘুঁজি অতিক্রম করে, কখনও ছায়ার ভিতর দিয়ে, কখনও-বা জ্যোৎস্নায়, মাথা উঁচু করে, সে, অনেক লম্বা, সোজা, মোটা কোট গায়ে, ধুলভরতি বুটজুতো ঘষতে ঘষতে হাঁটতে লাগল। ঠিক যন্ত্রের মতো, তার গতি দ্রুত নয়, ধীর নয়, ঘড়ির কাঁটার মতো অবিচ্ছিন্ন, ক্রমাগত—এইরকম। এইভাবে কখনও হয়তো তার খারাপ লেগে থাকবে, মাটির উপর সে বসে পড়ে পা থেকে জুতোজোড়া খুলে ফেলে। টান দিয়ে মোজা থেকে পা দুটো মুক্ত করে আঃ শব্দ করে আরাম জানায়। পটাপট শব্দে মোজা ঝাড়ে, জুতোজোড়া পিচের রাস্তায় ঠোকে, তারপর হাতে জুত-মোজা নিয়ে খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা অন্ধকার গলিতে ঢুকে পড়ে।

গলিটার আধাআধি যখন পার হয়ে গেছে, তখন বড় রাস্তার দিক থেকে জুতোর আওয়াজ আর কথাবার্তা শুনতে পেল সে। সে শুনতে পায়, শালা বোলো, তুমলোগ জয়বাংলা হো?

নেহি—কেউ উত্তর দিল।

জরুর জয়বাংলা হো—এই কথার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভোঁতা আওয়াজ তার কানে এল। তখন এক বিচিত্র বোধে জুতো হাতে নিয়ে, বগলে ফোলিও ব্যাগ পুরে সে হামাগুড়ি দিয়ে রাস্তার দিকে এগোয়। জ্যোৎস্নায় সে কিছু মানুষ দেখতে পেল।

তুম হিন্দু হো?

নেহি—আবার কেউ বলল।

জরুর তুম হিন্দু হো।

জ্যোৎস্নায় সে দেখল আট-দশজন একজনকে গোল হয়ে ঘিরে রেখেছে। মাঝখানের লোকটার খালি গা, পরনে কালো হাফপ্যান্ট।

তুমারা ঘর কাঁহা?

সে চুপ করে আছে।

জয়বাংলা কাঁহা হ্যায়?

লোকটা কোনো কথা বলছে না। একজন তার মুখে প্রকাণ্ড একটা ঘুষি বসাল। কালো প্যান্ট-পরা লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেল।

শালা, তুমকো গুলি করেগা।

আভি করো—উঠে বসে মুখ মুছতে মুছতে সে বলে।

তুম মুক্তিফৌজ নেহি হো শালা, বাঙালি কুত্তা? শালা, মুজিবকা পুজারি।

নেহি।

তুম হিন্দু নেহি হো?

নেহি।

লো ভাই, গুলি কর দো।

নেহি, নেহি, গুলি নেহি করেগা—দেখো হাম কেয়া করে।

কয়েক মিনিট পরে গলি থেকে সে দেখতে পেল সামনের একতলা বাড়ির ছাদের দিকে কালো প্যান্ট-পরা লোকটা উঠে যাচ্ছে। তার মাথা মাটির দিকে। পা দুটো একসঙ্গে বেঁধে একতলার ছাদের লোহার রডে দড়ি আটকে কপিকলের মতো দড়িতে টান দিচ্ছে কয়েকজন সৈন্য। কালো প্যান্ট-পরা লোকটার মাথা মাটি থেকে ফুট-পাঁচেক উঠে গেলে একটি কণ্ঠ বলে, ব্যাস রোখো। কেয়া, তুম জয়বাংলা নেহি হো?

নেহি।

সেই কণ্ঠ বলল, দো ভাই, দড়ি ছোড় দো।

পাঁচ ফুট উপর থেকে প্যান্ট-পরা লোকটার মাথা শরীরের সমস্ত ওজনসহ বাঁধানো মেঝেয় এসে ঠুকে পড়ল। ঠাস করে একটা শব্দ উঠল-- প্যান্ট-পরা লোকটা তার বুকের ভিতর থেকে বলল, আ!

আবার তার মাথা মাটিছাড়া হয়ে যাচ্ছে।

তুম জয়বাংলা হ্যায় কি নেহি?

কালো প্যান্ট-পরা লোকটার গলা থেকে ঘড়ঘড় আওয়াজ বের হয়। সেই আওয়াজটাকেই কথায় পরিণত করে সে বলে, বাঙালি তুমলোগোকো খতম করেগা—আভি ভাগ যাও বাঙাল মুল্লুকসে—কথা শেষ হবার আগেই আবার সেই মাটিতে কাঁচা মাংস থ্যাঁতলানোর আওয়াজ।

গলি থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবার টলতে লাগল সে। মাতালের মতো দুলতে দুলতে অন্ধকার ঠেলে গলি ধরে রাস্তার ধার দিয়ে গলি গলি গলি পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি একতলা বাড়ির ছোট মাঠে সে এসে দাঁড়ায়। নিচু একটি পাঁচিল দিয়ে মাঠটুকু ঘেরা, এককোণে একটি স্থলপদ্মের গাছ। সে লালা চওড়া বারান্দায় চুপিচুপি উঠে বসে বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোলায়েম গলায় ডাকল, মমতা আছ? মমতা?

কেউ সাড়া দিল না। অনেকবার ডাকল সে। শেসে দরজায় হাত দিতেই দরজা খুলে গেল। ঘরের ভিতর অন্ধকার। সে ঘরে ঢুকে ডাকল, মমতা আছ? মমতা? ছোট ছেলে শোভনকেও ডাকল দু-একবার। ঘর থেকে বেরিয়ে ভিতরের বারান্দায় গেল—কেউ নেই। ওপাশের ঘর দুটোয় ঢুকল; রান্নাঘর, বাথরুমে গেল। এমনভাবে তন্ময় হয়ে সে মমতাকে ডাকছিল যে মনে হলো সে তক্তপোশের উপর হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে জিজ্ঞেস করল, মমতা কই? টেবিলের কোণে হাত বুলিয়ে আলমারির কাছ দিয়ে যেতে যেতে একই প্রশ্ন সে মনে-মনে করেছিল।

তারপর ভিতরের উঠোনে নেমে এসে বাড়িটাকে সে দেখছিল। চারদিকে বড় বড় উঁচু বাড়ির চাপে এই বাড়িটাকে কুয়োর মতো মনে হচ্ছিল। অনেক বাড়ির কালো ছায়া বাড়ির উপর পড়েছিল। উঠোনের প্রায় চারভাগের তিনভাগ ঘন অন্ধকারে ঢাকা ছিল। আর শুকনো পাতায় উঠোন পূর্ণ ছিল। সে মড়মড় শব্দ তুলে পায়চারি করছিল। শুকনো পাতায় গোড়ালি পর্যন্ত ডুবিয়ে সে মরা গাছটার কাছে গেল, বুজে-যাওয়া কুয়োটার ভিতর একবার উঁকি দিল। শেষে পুরনো জং-ধরা একটি কোদালে তার হাঁটুতে জোর আঘাত লাগে।

লোকটা জুতোজোড়া খুলে ফেলে দিল একদিকে, ছুঁড়ে ফেলল ফোলিও ব্যাগ। কোট, টাই আর শার্ট খুলে ফেলল একে একে। গেঞ্জির ভিতর দিয়ে তার লোমশ বুক ফুলে ফুলে উঠছিল। তার সামান্য পাগলাটে চোখের দৃষ্টি আরও গোলমেলে হয়ে উঠল। সে তার শিরাবহুল পেশল হাতে কোদাল তুলে নিল। দুবার তিনবার নাক আর মুখ থেকে হ্যাঁক হ্যাঁক করে আওয়াজ বের করে উঠোনে কোপ দিল সে। তারপর হেঁট হয়ে একটি পাঁজরের হাড় তুলে নিল হাতে। হাড়টা তলোয়ারের মতো বাঁকা। সেটা তুলে নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকলো, হাত বুলিয়ে বুলিয়ে দেখল। তারপর আবার চলল উঠোন কোপানো। একে একে উঠে আসছে হাতের অস্থি, হাঁটুর লম্বা নলি, শুকনো শাদা খটখটে পায়ের পাতা।

সে প্রচণ্ড তেজে কোদাল চালাচ্ছে। কখনও কোদাল রেখে জন্তুর মতো নখ দিয়ে আঁচড়ে যাচ্ছে মাটি। দরদর করে ঘাম ছুটছে তার সমস্ত দেহ থেকে—ঠোঁট চেটে নোনা স্বাদ নিচ্ছে সে। খুঁজতে খুঁজতে একটি ছোট্ট হাত পেয়ে গেল, সেটাকে তুলে আপনমনেই লোকটা বলল, শোভন, শাবাশ। তারপর উঠে এল দীর্ঘ চুলের রাশ, কোমল কণ্ঠাস্থি, ছোট ছোট পাঁজরের হাড়, প্রশস্ত নিতম্বের হাড়— তারপর একটি করোটি। খুলিটা হাতে নিয়ে সে ওঠার চোখের শূন্য গহ্বরের দিকে চেয়ে রইল। তার নিজের চোখ নিয়ে গেল করোটির চোখের গর্তের খুব কাছে, একদৃষ্টে চেয়ে রইল সারি সারি দাঁতের দিকে। ফাঁকা মুখগহ্বরের ভিতরে নিঃশব্দে বিকট হাসি হাসল করোটি।


মমতা— লোকটা বলল। বলে সেটা পাশে নামিয়ে রেখে আবার দ্বিগুণ উৎসাহে মাটি খুঁড়তে লেগে গেল। পৃথিবীর ভিতরটা নাড়িভুঁড়িসুদ্ধ সে বাইরে বের করে আনবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন