বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৪

রঞ্জন রায়ের ধারাবাহিক নভেলেট : বাঙালবাড়ির কিস্যা

পাকিস্তান ছাড়ল শেষ রেলগাড়ি

১৯৪৯এর কোলকাতা। ফাগুনমাসের শেষ। পশ্চিম আকাশে লজ্জা-লজ্জা গোলাপী আভা তখনও মিলিয়ে যায়নি। মনুমেন্ট ময়দানের পাশ দিয়ে কোণাকুণি হাঁটছেন সলিলকুমার। রোজ ফোর্ট উইলিয়মের ডিউটি সেরে এই পথেই কিছুটা এগিয়ে পার্কসার্কাস লেখা বোর্ড টাঙানো ২০নং ট্রাম ধরে বাড়ি ফেরেন। ময়দানের গাছের ডালে ডালে ঘরে ফেরা পাখিদের ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ---সলিলকুমার শুনতে পাচ্ছেন না। সামনে দিয়ে একটা ২০নং ট্রাম টিং টিং অলস ঘন্টি বাজাতে বাজাতে চলে গেল,--সলিল দেখতে পেলেন না। নিজের ভাবনায় ডুবে থাকা সলিল রাস্তা পেরিয়ে ফুটপাথ ধরে হাঁটতে লাগলেন।


অন্যদিন উনি লাফিয়ে চলতি ট্রামের পা-দানিতে চড়ে শেষ স্টপ ট্রামডিপোতে নেমে ঝাউতলা রোড ধরে খানিক পায়ে হেঁটে ধাঙড়বাজারের সামনের গলিতে দোতলার ফ্ল্যাটে ঢুকে চায়ের জন্যে দিদির কাছে চেঁচামিচি লাগিয়ে দেন। আজকে নিজের সঙ্গে একটা বোঝাপড়া বাকি। তার জন্যে চাই একটু সময়। কাজেই চৌরঙ্গী ধরে পার্ক স্ট্রীট হয়ে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরার প্ল্যান। এতক্ষণে রাস্তায় রাস্তায় সবজেটে কাঁচে ঢাকা গ্যাসবাতি জ্বলে উঠেছে। কিন্তু কুলপি-মালাই বা "চাই বেলফুল" এখনও বেরয় নি।

সদর স্ট্রীটের গলির মুখে খাটো স্কার্ট পরা দু'জন রঙ্‌মাখা মেয়ে নিজেদের মধ্যে হেসে ঢলে পড়ল। একজন ফৌজি পোষাকপরা সলিলকুমারকে দেখে আওয়াজ দিল---"" হে ম্যান, কাম অন''! সলিল শুনতে পেলেন না। পরের গলি থেকে একজন রিকশাওয়ালা ওনার পেছন ধরল। চলতে চলতে ঘ্যানঘ্যানে গলায় বলতে লাগলো---"" চলিয়ে না মেজর সাহাব, মেরে রিকশ' মেঁ বইঠ জাইয়ে। আংরেজ, বর্মিজ, নেপালী, বিহারী -সব কিসম কা মাল তৈয়ার হ্যায়। পসন্দ নহী হোগা তো ম্যঁয় আপকো ওয়াপস লে আউগাঁ। আরে দেখ তো লীজিয়ে। দেখনে কে লিয়ে পৈসা থোড়া হী লগেগা। বলিয়ে মেজর সাহাব!'' বিরক্ত সলিল খিঁচিয়ে উঠলেন,--"" গেট লÙট, সোয়াইন!'' হতভাগা বলে কি? মেজর সাহাব! আরে ও কি জানবে? হুঁ:, কার নাম দুন্দুভি, কাকে বলে অরণি! মাত্র দু'মাস আগে প্রোমোশন পেয়ে ল্যান্স নায়েক হয়েছেন। আসলে উনি হিন্দুপুর আর্মি স্কুল থেকে পাশ করা অ্যাক-অ্যাক গান মেকানিক। এখনও কানে বাজে ডায়রেক্টর মেজর ফ্রান্সিসের কথাগুলি -"" বয়! ডোন্ট কন্সিডার ইয়োরসেল্ফ আ বাজার মেকানিক। '' আর নারীশরীরের রহস্য? তার ভূগোল? বছর দুই বিবাহিত সাতাশ বছরের সলিলের কাছে তার ধোঁয়াশা অনেকটাই উপে গেছে। বিশ্বযুদ্ধের সময় ইংরেজ ফৌজের টেকনিশিয়ান হয়ে আসাম-বার্মা-মালয়- ইন্দোনেশিয়া সবই ঘুরেছেন। দেখেছেন আর ভেবেছেন, নিজেকে অনেকটা আবিষ্কার করেছেন। জেনে গেছেন তাঁর মধ্যে এক কট্টর পিউরিটান বোধ ঘাঁটি গেড়ে আছে। ফলে সাথীদের অনেক অ্যাড্‌ভেঞ্চার থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন, এতে অনেক সময় অন্যদের হাসির খোরাক হতে হয়েছে, কিন্তু সলিল বদলান নি। খালি রেঙ্গুন থেকে মৌলমিন যাবার সময় একটা ঘটনা , একটা মুহুর্তের ভুল আজো তাঁকে পীড়া দেয়। সেদিন সলিল নিজের কাছে নিজে হেরে গেছিলেন।

কিন্তু আজকের চিন্তার কারণ কোন অতীতের স্মৃতি নয়, একবারে ঘটমান বর্তমান, আসলে অফিসে পাওয়া একটি চিঠি। দেশের বাড়ি থেকে আসা একটা পোস্টকার্ড, বাবার হাতের লেখা। কিন্তু তারিখ? তারিখটাই যে গোলমেলে! মাত্র একমাস আগের। চিঠির বয়ান মোটামুটি এ'রকম:
"" আমরা নিজেদের ঘরবাড়ি ছাড়িয়া আমাদের প্রজা ছন্দু মিঞার বাড়িতে আশ্রয় লইয়াছি। তোমার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা। তোমার মাতা ও ঠাকুরমার শরীর -মন ভাল নহে। ছোট ছেলে সমীরকান্তি বালক মাত্র, তাহার উপর ভরসা করা উচিৎ নহে। তুমি সত্বর আসিয়া আমাদের কলিকাতায় লইয়া যাও। আর কোন বিকল্প নাই। এ'দেশ এখন আর আমাদের দেশ নহে।''
সলিলকুমার বিড়বিড় করতে করতে পা ফেলছেন। --- কি কইর‌্যা যাই? আমি এখন ইন্ডিয়ার আর্মিম্যান। --এ'দেশ আর আমাদের নহে?---- হক কথা। হেই ধেনু নদী, ম্যাঘনা নদী-- হেই আঠারবাড়িয়া--বাজিতপুর---হেই মধুপুরের জঙ্গল- হেই সরার চর-- কিছুই আর আমার না।

সলিল পৌঁছে গেলেন সার্কাস মার্কেট্‌ প্লেসের গলিতে। সামনের সার্কাস হোটেলের খোলা উনুনে গোমাংসের শিককাবাব সেঁকার গন্ধ আজ আর নাকে লাগলো না। সিঁড়িতে ফৌজিবুট জোড়ার ধুপধাপ আওয়াজ শুনতে বাড়ির সবাই অভ্যস্ত। কিন্তু সলিল পোষাক পাল্টে সোজা বাথরুমে ঢুকে মাথায় কয় মগ ঠান্ডা জল ঢেলে যখন রান্নাঘরে এলেন তখন মুখের দিকে তাকিয়ে সবাই বুঝলো আজ কিছু একটা আছে। ওনার কথামত পাঁচভাই ছাদে গিয়ে মাদুর পাতল, তারপর ঘেঁষাঘেঁষি করে চুপচাপ বসে পড়ল।

সলিল জয়েন্ট হিন্দু ফ্যামিলির ""কর্তা''র বড়ছেলে হিসেবে নিজের রোলের ব্যাপারে খুব সচেতন। প্রথমে আজ অফিসে পাওয়া বাবার পোস্টকার্ডটি উনি সবাইকে পড়ে শোনালেন। বলল্লেন --আমাকেই যেতে হবে। কিন্তু আমি লুঙ্গি পড়ে মানিকখালি রেল স্টেশনে থাকব। গাঁয়ে যদি কেউ চিনে ফেলে ধরিয়ে দেয় তবে বিদেশি অনুপ্রবেশকারী সৈনিক হিসেবে জেলে পচে মরতে হবে। তাই একজনকে দিনের বেলায় গাঁয়ে পৌছে সবাইকে সঙ্গে করে রেল্‌স্টেশন অব্দি নিয়ে আসতে হবে। চার ক্রোশ পথ। সময় খারাপ। এ'কাজে রিস্ক আছে। তাই আমি কাউকে বলবো না। ওয়ান হ্যাজ টু ভলান্টিয়র হিম্‌সেল্ফ। সলিলের চোখ ঘুরছে সবার চেহারায়। প্রথমজন যাদব্‌পুর থেকে সদ্য পাশ করে ফিলিপ্স কোম্পানিতে ঢুকেছে। পরের জন একটূ আলসে, থালা ভরে ভাত খেতে আর ঘুমোতে ভালবাসে। ধরাকরা করে পুলিশের চাকরিতে ঢ ¤কিয়ে ছিলেন, কিন্তু শ্রীমান ক'দিন বাদেই সেই যে বাড়ি এসে ভাত খেয়ে চিলেকোঠায় কম্বল মুড়ি দিয়ে শুলেন আর চাকরিতে ফেরৎ গেলেন না। বাকি তিনজনের দুজন কলেজে মাত্র ঢুকেছে, একজন ক্লাস এইটে। সবাই চুপ।


সলিল উঠে কোমর থেকে বিড়ির বাণ্ডিল খুলে একটা ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে পয়চারি করতে লাগলেন। বিড়ি শেষ করে কারো দিকে না তাকিয়ে বললেন---কাউকেই দোষ দেব না। এতে জান খোয়াবার ভয় আছে আগেই বলেছি। আমাকেই কিছু ভেবে বার করতে হবে। ঠিক আছে , তোমরা এবার খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়। রাত অনেক হয়েছে। কাল সকালে আবার কথা হবে। পেছন থেকে আওয়াজ ভেসে এল,--""সোনাদা, আমি যাইয়াম তুমার লগে।'' সলিল পেছনে তাকিয়ে অবাক,--সবচেয়ে আলসে গাব্দা -গোব্দা ভাইটা ! এই ভাইয়ের প্রতি মাছের মুড়ো,দুধের সর-- এসব নিয়ে মার খোলাখুলি পক্ষপাত বরাবরই সলিলের অপচ্ছন্দ ।
----তুই!!!
-----হ্যাঁ, সোনাদা, আমি। কুন চিন্তা নাই। আমারে ধরাইয়া দিব ক্যাডা? মুসলমানপাড়াতে অনেকেই ত আমার চাচি লাগে। বইন লাগে।
----ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি খাইয়া -লইয়া শুইয়া পড়। রাত্রেই জামাকাপড় গুছাইয়া ল'। সক্কাল-সক্কাল রওয়ানা দিয়াম।

সবাইকে শুতে পাঠিয়ে সলিল রইলেন জেগে। ছাতে লম্প জ্বালিয়ে একটি পোস্‌ট্‌কার্ড নিয়ে লিখতে বসলেন এক ছুটির দরখাস্ত। সলিল জানতেন এই চিঠি তাঁকে লিখতে হবে। লিখতে হবে ফোর্ট উইলিয়মের কম্যান্ডারকে।
----"""রিভিয়র্ড স্যার, আমার বাবা-মা-স্ত্রী-ছোটভাই-বোন কারো কোন খোঁজ পাচ্ছিনা। ওদের খুঁজ্‌তে চল্লাম। আমি জানি আমার এই কাজ মিলিটারি নিয়মমাফিক দন্ডনীয় অপরাধ। ওদের খুঁজে পেলে ফিরে এসে রিপোর্ট করবো। কোর্ট মার্শালে যা শাস্তি হবে তা' মাথাপেতে নেব। আর যদি ওদের না পাই তাহলে আর কোন দিন ফিরে আসবো না। তখন আমাকে ডেজার্টার ধরে নেবেন।
উইথ ডীপ রিগ্রেট,---''।
সলিল সারারাত জেগে রইলেন---সক্কালে প্রথম কাজ হবে মোড়ের লাল ডাক বাক্সে চিঠিটা ফেলে দেয়া।

দুইদিবস গত হইলে নতুন চাকুরি পাওয়া ইঞ্জিনিয়র সেজভাই এয়রফোর্সে টেলিফোন অপারেটর মধ্যমভ্রাতাকে নিম্নরূপ পত্রাঘাত করিলেন---" মা-বাবা-ঠাকুরদুদু-বৌঠাকুরাইন তো গিয়াছেন, আরও দুইজনকে খরচের খাতায় লিখিয়া রাখ''।

বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা

স্মৃতিকণা চিন্তায় পড়েছেন। মাত্র ক'মাস হল শ্বাশুড়ির শরীর খারাপ শুনে আগ বাড়িয়ে কোলকাতা থেকে ময়মনসিংহের বাজিতপুর শহরে এসেছেন। কিন্তু এর মধ্যেই ওনার মনে খুঁতখুতুনি বেড়ে গেছে। বেশতো কাটছিল আসামের চেঙ্কুড়ির চা'বাগানে দাদার বাড়িতে ক'বোন মিলে। হঠাৎ কোথ্‌থেকে যে কারা কথা চালাচালি করলো- হঠাৎ বড়দা ডেকে বললেন-"" খুকি, তুমার বিয়া ঠিক হইছে। বাজিতপুরের উকিল সতীশচন্দ্র রায় মশাইয়ের বড় পুত্র। ভাল পরিবার, রাধামাধবের কৃপায় সব ভালয় ভালয় উৎরাইয়া যাইবো। তুমি সুখি হইবা।'' চেনা পরিবারের মধ্যে বিয়ে। বর ফৌজি আদমি।

কিন্তু এর মধ্যে একবছর আগে দেশভাগ হয়েছে। এর মানে তখন খুকি ভাল বোঝেন নি। খালি দেখলেন যে চা'বাগানের গোরাচামড়ার ম্যানেজার বিলেত চলে গেল। আর সুপারভাইজার বড়দা হলেন ম্যানেজার। ফলে এরা উঠে এলেন পাহাড়ি টিলার ওপর বড় কটেজ ধরনের কোয়ার্টারে। আর কি মজা! চানের পর ছাড়া শাড়ি ধুতে হয় না। তার জন্যে আছে মালিবুড়ি, অন্য ফুটফরমাস খাটার জন্য লোক ঠিক করা আছে। আছে বিশাল লন। টেনিস কোর্ট। কি আনন্দ! কিন্তু মা খালি বলেন-- ওরে,বছরখানেকের মধ্যে বিয়ে হয়ে কোনদেশে যাবি, সেখানে কি আর এসব জুটবে? একটু গা-হাত পা নড়া। নইলে কপালে দু:খ্যু আছে। ছোটবোন শান্তি বই নিয়ে পড়তে বসে গেছে। ম্যাট্রিক দেবে। অগত্যা স্মৃতি গেলেন দুম-দুম করে পা ফেলে হেঁসেল সামলাতে। সেখানেও মুশকিল। রাঁধুনি চোখ কপালে তুলে বললে-- খুকিদিদি! শিগ্গির সরে যান, সাহেব টের পেলে রাগ করবেন। খুকি জানেন কথাটা সত্যি। দাদা বলেন-- ক'দিন পরে নিজের সংসারে গিয়ে তো হেঁসেল ঠেলতেই হবে। এখন দাদার সংসারে একটু আরাম ্‌করুক। কাজের লোক তো আছেই। খুকি বাইরে বেরিয়ে এলেন। গেট খুলেছেন কি খানসামা "" লেইমবার বাপ'' পেছন পেছন হাজির। --কই যাও খুকি, একা কুথ্‌থাও যাইও না। সাহাবের মানা আছে। বাজারে যাইবা? চল, আমি লগে যাই''। খুকি রাগ করতে পারেন না। মাত্র ছ'মাস বয়সে পিতৃহীন খুকি বড় দুই দাদা আর সাতবোনের মধ্যে ছ'নম্বর বোন। এই অশিক্ষিত মুসলমান খানসামার কাছে পান প্রশ্রয়, খানিকটে যেন বাবার মত ব্যবহার। অন্যসময় উনি আবদার করলে লেইমবার বাপ হার মেনে যায়। বলে --"" আচ্ছা , যাও , একটূ ঘুইর‌্যা আসো। বেশিদুর না। আর কুলিপাড়ায় না, সায়েব পছন্দ করেন না। '' কিন্তু এখনতো বিয়্যা ঠিক হইছে। খুকি হইয়া উঠবো স্মৃতিকণা। কাজেই খানসামাও নরম হয় না। আর খুকি কিন্তু ঐ লেইমবার বাপ্‌কে ভয়ও পান। ওর কিছু অলৌকিক শক্তি টের পেয়েছেন যে। সেবার রথের মেলার দিন লেইমবার বাপ পরেছিলো একটি নতুন চেক লুঙ্গি আর ফতুয়া, চোখে সুর্মা মাথায় একটা রুমাল। চারদিকে ভীড় জমিয়ে ও দেখাচ্ছিলো বাণমারার খেলা। জ্বলজ্বলে চোখে আগুনছিটিয়ে হাতের বদনার থেকে মন্ত্রপুত জল নিয়ে পাশের বাড়ির গোবিন্দ'র গায়ে ছিটিয়ে যেই বল্লো --"" বান্দর হ''', ওমনি গোবিন্দ হুপ্‌হাপ্‌ শব্দ করতে করতে লাফাতে লাগলো। একবার তো লাফ দিয়ে পাশের বাড়ির টিনের চালে উঠলো। তক্ষুণি ওর গয়ে জল্‌ছিটিয়ে বল্লো-- "" বান্দরের লাহান উবে ফাল পিটস কি রে? তুই তো হালায় কুত্তা!'' ব্যস, গোবিন্দ কেঁউ কেঁউ করে বড়দা দত্তরায় সাহেবের দুপায়ের ফাঁকে প্রায় ঢুকে পড়ে আর কি। শুদ্ধ বৈষঞব আচারে বিশ্বাসী বড়দা আঁতকে ওঠেন --আরে, আরে ! এইডারে সরা।লেইমবার বাপের চোখ জ্বলে,-- "" কুমর হ'!'' আর কি কান্ড! গোবিন্দ ছুটে সামনের পুকুরের পাড়ে গিয়ে বুকে হেঁচড়ে কুমির হয়ে জলে নেমে যায়। তলিয়ে যায় অতলে। সবার প্রায় শ্বাস আটকে যাওয়ার জোগাড়। অনেক্‌দুর গিয়ে গোবিন্দ কুমীরের মত ভেসে ওঠে, ভুস করে মুখদিয়ে জল ছাড়ে। সবাই হাঁপ্‌ ছাড়ে। তারপর দর্শকদের সম্মিলিত অনুরোধে গুণীন চেঁচিয়ে ওঠে --"" মাইনসের মত হ'''। আর কয়েক মিনিট পরে শ্রান্তক্লান্ত গোবিন্দ পুকুরপাড়ে উঠে ঘাটের পাশে অচেতনের মত শুয়ে থাকে। বড়দা বকশিস দেন। ভিড় পাতলা হয় আর চাবাগানের খানসামা লেইমবার বাপের জন্যে মনে একরাশ ভয়-মিশ্রিত শ্রদ্ধার বোধ নিয়ে বাড়ি ফেরে।

বিয়ে হল নমো-নমো করে। বরপক্ষের লোক আসতে পারলো সামান্যকজন। অশান্তি চারদিকে। তাই কোলকাতা বাড়িতে যে কজন ছিলো এলো তারও এক ভগ্নাংশ । কিন্তু বাপের বাড়ির দিকে সবাই - একান্নবর্তি পরিবারের যত ভাই-বোন, মামা-মামি,মাসি-মেশো সবাই মিলে চেষ্টা করলো যাতে এই অস্বাভাবিক সময়কে ভুলে থাকা যায়। গোল বাঁধলো পরদিন সকালে, বাসিবিয়ের পর নতুন জামাইকে ছোট শালী শান্তি জিজ্ঞেস করে বসলো--- আপনার বাপ-ঠাকুর্দা সবাই অ্যাড্‌ভোকেট, সবাই শিক্ষিত-- আর আপনি মাত্র ম্যাট্রিক পাশ। কেন? লেখাপড়া করেন নি কেন? জামাই জেনে গেছে শালীটি ম্যাট্রিকে জলপানি পেয়েছে তায় সুন্দরী ও একটু অহংকারী। তবে এ অহংকার ওকে মানায়। ফৌজি জামাই একটু হাসে, বলে---- সবার সব কিছু হয় না। আমার ও হয় নি।
---- কেন?
---- কোন কেন নেই। আমি বাড়ির ব্যাড বয়, তাই।
ঘোমটার আড়ালে স্মৃতিকণা বিরক্ত হয়। শান্তিটা যেন কি? স্মৃতি নিজে ওর মায়ের পরিচালিত গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল থেকে ক্লাস ফোর পাস। কাজেই ওর জন্যে ম্যাট্রিক স্বামী যথেষ্ট। মনে পড়ে ক'বছর আগে পৈতৃক গ্রাম উয়ারায় পাশের বাড়ির মহানন্দ রায়ের মেয়ের বিয়ের কথা। মেয়েটি তো রীতিমত পূজোকরে খুকির সঙ্গে সই পাতিয়েছিল। দ্বিরাগমনে বাপের বাড়ি এসে সব সখিদের ডেকে পাঠালো। খুকি শুনেছিলো সইয়ের বর মস্ত পণ্ডিত, সরকারি কলেজে পড়ান, বই লেখেন- থাকেন দিল্লি। কিন্তু দেখা গেল ভদ্রলোক ভারি আমুদে, মিশুকে আর একটুকু হামবড়াই ভাব নেই। আড্ডার ঝোঁকে উনি জিজ্ঞেস করে বসলেন---- আমি একটি কবিতার দুটো লাইন বলছি, দেখুন , আপনারা কেউ পরের দুটো মেলাতে পারেন কি না?
"" দিনে দিনে দিন যায়, দিন যায় চলি,
মাসে মাসে বর্ষ যায় বর্ষ গেল চলি।''
এর পরের দু'লাইন কেউ জানেন? নামকরা কবিতা। দেখুন না চেষ্টা করে। হালকা একটা হাসির ভাব মুখে ধরে রেখে উনি একে একে সবার দিকে তাকান।

খুকি উসখুস করে, কবিতাটা চেনাচেনা লাগছে। এবার মি: সরকারের দৃষ্টি এসে থামে খুকির ওপরে। ছটফটানি বাড়তে থাকে। -কিছু বলবেন? বলুন না।
-- না মানে চার নম্বর লাইনটা মনে পড়ছে।
---- বেশ তো, তাই বলুন না।
--- " কবে আসিবেন তিনি রাম রঘুমণি''।
---চমৎকার! আপনার জেলা স্কুলে যাওয়া উচিৎ। পড়াশুনো ছাড়বেন না।
খুকি চমকে ওঠেন। সমস্ত রক্ত এসে মুখে জমেছে। এ কার মুখে নিজের গোপন ইচ্ছের প্রতিধ্বনি? যে ইচ্ছে এজীবনে পূর্ণ হবার নয়! গাঁয়ে মিডল্‌স্কুল নেই, আছে জেলা সদরে। বড়দা স্পষ্ট না করে দিয়েছেন। মেয়েদের আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রেখে পড়ানো ওনার পছন্দ নয়। কিন্তু সইয়ের বর যে ওনার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। খুকি আঁচল সামলান। তারপর উঠে পরেন। পরের দিন যখন সই পাল্কি করে বরের সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি ফেরার জন্যে রওনা দিচ্ছে খুকি একটা চাদর মুড়ি দিয়ে বিছানায় শুয়ে রইলেন।

বিয়ের পর স্মৃতিকণা এসে উঠলেন কোলকাতায় পার্কসার্কাসের ভাড়াবাড়িতে। স্বামিদেবতাটি মানুষ মন্দ নয়। কিন্তু ক'দিন বাদেই বুঝতে পারলেন যে মানুষটি কখন যে কোন কথায় রেগে উঠবেন বলা মুশকিল। তবে রাগটি যেন হাউয়ের মত -- যেমন ফস করে জ্বলে ওঠে তেমনি ফুস করে নেভে। আর ওনার ভাবনার কেন্দ্রে রয়েছে সংযুক্ত পরিবার। কড়া নজর খবরদারি সবকটা ভাইয়ের ওপর। এক এক করে গাঁ থেকে স্কুল পাশ করে আসবে, কোলকাতায় এসে কলেজে ভর্তি হবে। তারপর চাকরি করে কাঁধ মিলিয়ে পরিবারের জগদ্দল পাথরটিকে পাহাড়ের ওপর ঠেলে তুলবে। ততদিন প্রথম তিনভাই ঘানি টানবেন। কোন খরচাই আলাদা করে করা যাবে না। যা হবে তা' সব কটা মেম্বারের জন্যে -- তা, সে পূজোর জামাকাপড় বা মেয়েদের শাড়ি যাই হোক না কেন। সেজভাই একদিন একছড়া কলা সামনের বাজার থেকে এনে একা একা ছাদে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিল, তা' সে কি বকুনি--- এইভাবেই পরিবার ভাঙ্গে, বুঝলি? কলেজে পড়া ছোটভাইরা হাসে, বলে --"" দাদা তো না, এক্কেরে তারাস-বুলবা!'' বৌদি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে দেখে আবার ব্যাখ্যা করে---আপনে বুঝবেন না, গোগল কইর‌্যা এক রাশিয়ান লেখকের লেখা চরিত্র, কসাককুলের গোষ্ঠীপতি। আচ্ছা , আপনেরে বাংলা লাইব্রেরি থেইক্যা আইন্যা দিয়াম। পইর‌্যা দ্যাখেন, ভালা লাগবো।

কিন্তু বাড়িতে সাতজন পুরুষমানুষ ছাড়া আছেন আরো দুই নারী। বড় ননদ ও তার ম্যাট্রিকপাঠরত মেয়ে। দেখতে দেখতে স্মৃতিক্‌ণা, শিশিরকণা ও গৌরী মিলে নিজেদের মধ্যে গড়ে তুললেন এক পারিবারিক সেল্ফ -হেল্প গ্রুপ। তবু মন কাঁদে। মন কাঁদে উয়ারার গ্রামের খোলা মাঠ, ক্ষেতের আল আর নদীর জন্যে, চেঙ্কুড়ির চা-বাগান আর পাহাড়ের সারির জন্যে। এখানে দোতলায় তিনটে মাত্র ঘর। তাতে দশজন লোক। সামনের টানা বারান্দা জুড়ে পুরনো শাড়ির পর্দা টাঙানো,--- সামনে যে ধাঙরবাজারের সার্কাস হোটেল, তাতে তৈরি হয় নিষিদ্ধমাংসের শিককাবাব। স্মৃতিকণার ঘেন্নাপিত্তি বড় বেশি। পায়খানা-বাথরুম একটু অপরিস্কার হলেই ওনার ওয়াক ওঠে। কাজেই যখন এক দুপুরে খাওয়ার সময় ওনার ওয়াক উঠলো তখন বড়ননদ খেয়াল করলেন না। কিন্তু যেই ব্যাপারটা নিয়মিত চেহারা নিল বড়ননদ বললেন -- শংকর, ফণিবাবুরে কল দিয়া বাড়িতে আন। পারিবারিক ডাক্তার এসে পরীক্ষা করে বল্লেন - মিস্টি খাওয়ান। সুখবর।

বাড়িতে একটা আনন্দের আবহাওয়া- কিন্তু স্মৃতিকণা লজ্জায় মরে গেলেন। এমনসময় দেশের বাড়ি থেকে খবর এল যে শ্বাশুড়ির শরীর খারাপ। ঠিক হল বৌমা যাবেন বাজিতপুর,-- শ্বশুর-শাশুড়ির সেবাও হবে , ওনার নিজেরও এই অবস্থায় খাটা-খাটনি কম হবে। ঐ বাড়িতো আর কোলকাতা নয়, কাজের লোক প্রচুর।

নান্‌কার প্রজারা আছে যারা পেশায় নাপিত-ধোবা-কামার-কুমোর বা ফাই-ফরমাস খাটা ইতরজন। তাদের আছে নিষ্কর জমি।অর্থাৎ তারা কোন খাজনা দেবে না, ঐ জমির ফসলে জীবনধারণ করবে, কিন্তু বদলে তালুকদারবাড়িতে নি:শুল্ক সেবা বা বেগার দেবে। এছাড়া আছে আসামের চা-বাগানের কোন মদেশিয় পরিবারের পালিয়ে আসা মেয়ে ভেলি যাকে কেনা হয়েছিলো কোন আড়তদারের কাছ থেকে। স্বামী গেছে পালিয়ে, ছেড়ে গেছে ভেলিকে কোলের একটি বাচ্চা শুদ্ধু। কিন্তু বাজিতপুর এসে স্মৃতিকণা একটু যেন হতাশ হলেন। মাটির ভিৎ,টিন-দরমার দেয়াল আর শন-খাপরায় ছাওয়া চাল। বেশ বড় বড় ঘর, কিন্তু নিজের বাপের বাড়ির তুলনায় একটু যেন অগোছালো। ঘর জুড়ে বড় বড় তক্তপোষ। শ্বশুরমশায় সকালবেলা বাইরের দালানে বসেন, প্রজারা আসে খাজনার হিসেব হয়। মুহুরী সুরেন্দ্র সাহা কাগজপত্র দেখেন, তারপর মাছের ঝোল ভাত খেয়ে দুজনে মহকুমা আদালতে যান। শ্বশুরের প্র্যাকটিস তেমন নয়, কিন্তু বার লাইব্রেরির সেক্রেটারি হয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। আর আছেন দিদিশ্বাশুড়ি সুখময়ী। সারাদিন গান গেয়ে গল্প শুনিয়ে প্রথম নাতবৌয়ের মন ভরিয়ে রাখেন। তবে কয়েক বছর আগে কোমরের একটি ফোঁড়া অপারেশনের সময় কোন একটি শিরা কেটে যায়। প্রাণে বাঁচলেও কোমর পড়ে গেল। বাকিজীবন বসে বসে গড়িয়ে গড়িয়েই চলতে হবে।

মাসদুই কাটার পর কথা হল সাধভক্ষণের আগে বৌমাক্লে একবার বাপের বাড়ি ঘুরিয়ে আনা হোক। বিয়ের পর দ্বিরাগমনেও যাওয়া হয় নি যে। তারপর ঠিক হবে কোলকাতায় পাঠানোর দিনক্ষণ। কারণ বড়ছেলে সলিল চান না যে ডেলিভারি বাপের বাড়িতে হোক। ওনার ভরসা কোলকাতার ডাক্তারদের ওপর। সেইমত চিঠিগেল চেঙ্কুরিতে চাবাগানে। স্মৃতিকণা তোরঙ্গ গুছিয়ে ফেলে দিন গুণছেন-কবে ওনার ছোড়দা ( সংযুক্ত পরিবারের গুনতিতে সেজদা) এসে তাঁকে নিয়ে যাবেন। আর মাত্র পাঁচদিন বাকি। সামনের বেস্পতিবার। কিন্তু মঙ্গলবার আসতেই সমস্ত হিসেব ওলট-পালট হয়ে গেল। বিকেলের দিকে শ্বশুর সতীশবাবু তাড়াতাড়ি কোর্ট থেকে ফিরলেন। ছোটছেলে সমীরকেও স্কুল থেকে ডাকিয়ে আনা হল। বারান্দায় লোক বাড়তে লাগলো। পড়শী উকিল উমানাথবাবু এলেন। রান্নাঘর থেকে চা সাপ্লাইয়ের ওপর চাপ বাড়তে লাগলো। কানাঘুষোয় স্মৃতি জানতে পারলেন যে ব্যাপক দাঙ্গা শুরু হয়েছে। খুলনায় মাছের ঝুড়িতে নরমুন্ড পাওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কোলকাতায় কিছু বিক্ষিপ্ত ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু গত্‌কাল ভৈরববাজারের পুলের ওপর ট্রেন থামিয়ে গুন্ডারা দুই কামরা যাত্রীদের কচুকাটা করেছে। ট্রেন যখন ফিরে এলো তাতে কামরার দেয়ালে আর পাটাতনে চাপ-চাপ রক্ত।

স্মৃতিকণার মাথা খারাপ হবার জোগাড়। বাপের বাড়ি যাবার কোন প্রশ্নই ওঠেনা। কিন্তু এখানে কি থাকা যাবে? জানতে পারলেন যে পড়শী উমানাথবাবুরাও দেশ ছাড়ছেন। সক্কালে শান্তি কমিটির মাথারা এসে বুঝিয়ে গেছেন। আমরা আছি, এখানেই থাকুন। এসব ক'দিনের গন্ডগোল, মিটে যাবে। কিন্তু বিকেল নাগাদ খবর এল দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছে, তার ঢেউ শিগ্গিরই এই ছোট শহরেও আছড়ে পড়লো বলে। মনে প্রশ্ন জাগে চারদিকে এই অবস্থা, সেই মানুষটা কি করছে?একটা পোস্টকার্ডও কি পাঠাতে পারে না? ভারি ফৌজি আদমি! শুক্কুরবার । সন্ধেবেলা ক'জন মুসলমান প্রজা এসে জানিয়ে গেলো রাত্তিরে আক্রমণ হতে পারে। আপনারা বাড়ি ছেড়ে থাকুন। সকালে চলে আসবেন। রাত আটটা নাগাদ সতীশচন্দ্র বাড়ির সবাইকে একজায়্‌গায় করে বল্লেন---""সবইতো শুনতে আছ। আইজ রাত্তিরটা কাটলে হয়। বাড়ির মহিলারা মন দিয়া শুন। এইসব দাঙ্গাতে মাইয়ালোকের উপরই আসল আক্রমণডা হয়। জানের আগে সম্মান যায়। আইজ আমার শক্তি নাই যে তুমাদের রক্ষা করি। তাই কামারবাড়ি থেইক্যা গোটাদুই ধারাল ছুরি বানাইয়া আনছি, শ্যাকের হাতে চরম অসম্মানের আগে তুমরা গলায় ছুরি দিবা''। স্মৃতিকণার গলা কাঁপে, কিন্তু এই প্রথম সাহস করে শ্বশুরের সঙ্গে সরাসরি কথা বল্লেন
---"" আমি পারবো না। আমার সাহস নাই''।
---"" সেকি! তুমি আইজকালের মাইয়া, তুমার সাহস নাই?''
----"" না বাবা! আমি পার্তাম না। এতে আমার লগে যে আর একটা প্রাণ যাইবো!''
---"" তাইলে আর কি করা?''
----"" বাবা, যদি তেমুন সময় আসে ত' আমি অজ্ঞান হইয়া যাইয়াম। তারপর আমার লগে কি হইবো তা জানিনা।''
--- "" বেশ, থাক তবে এই বাড়িতে, যা হওয়ার হইবো। আইজ আমরা রাইত জাগবাম। বাকি রাধামাধব জানেন''।
এমনসময় মুখ খুল্লেন শ্বাশুড়ি সরযূবালা।
---"" আপনে আমার কথা শুনেন। আপনার প্রজা ছন্দু মিঞা যে কইসিলো রাইতটা ওদের বাড়িতে কাটাইতে, তাই করেন।''
--" আমি এখানেই থাকবাম। পিতৃপিতামহের ভিটা ছাইড়া যাইয়াম? তুমরা যাও।''
শেষে তাই হলো । মাঘশেষের শীতের রাতে অন্ধকারে ক্ষেতের ওপর আলের ওপর হোঁচট খেতে খেতে ওরা পৌঁছে গেলেন ছন্দুর বাড়ি, প্রায় আধমাইল পেরিয়ে। ওরা মানে স্মৃতি ও তার শ্বাশুড়ি, ভেলি ও তার ছেলে, ছোট দেওর সমীর আর প্রায় হেঁচড়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া দিদিশ্বাশুড়ি- যাঁর দাঁড়াবার ক্ষমতা নেই।

খালি বাড়িতে প্রেতের মত সারারাত্তির ঘুরে বেড়ালেন সতীশচন্দ্র। মনে অনেক প্রশ্ন। তার একটা হল লাউয়া মিঞাকে নিয়ে। লাউয়া-বুইদ্ধ্যা দুই ভাই ওদের পরিবারের আজন্ম সুপারভাইজার। অশিক্ষিত এই দুই কৃষক রায়েদের ক্ষেতখামার, চাষের দেখাশুনো,ঘর-গেরস্তি, বাড়ির খাইখরচ--সবকিছুই দেখাশুনো করে আসছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা লাউয়া-বুইদ্ধ্যার কোলেপিঠে, দরকারমত কানমলা খেয়ে বড় হয়েছে। মাসকয়েক হল ওরা আঠারবাড়িয়ার বাড়িতে থেকে রবিফসলের দেখাশুনো আর পাটবিক্রির বন্দোবস্ত করছে। খবর পঠিয়েছে যে একপক্ষ পরে পাটবিক্রির টাকাকড়ি নিয়ে আসবে বড়বৌয়ের মুখ দেখতে। লাউয়ারা যে মুসলমান এটা নিয়ে সতীশচন্দ্র খুব একটা সচেতন ছিলেন না। এখন মনের কোন গোপন কুঠরি থেকে এই সত্য জেগে উঠেছে। আজ এই কৃষ্ণপক্ষের মধ্যরাতে একা একা পায়চারি করতে করতে ভাবতে লাগলেন এখন এই অর্থহীন মাথামুন্ডু -নেই সময়ে লাউয়া মিঞার বাজিতপুর আসাটা শুভ হবে কি না?

একটা বড় ঘর। মাটির মেজে। শণের ছাওয়া ছাদ। একটা তক্তপোষের ওপর শালমুড়ি দিয়ে শ্বাশুড়ি আর নতুন বৌ। মাটিতে ধানের খালি বস্তা বিছিয়ে কোমরভাঙা দিদিশ্বাশুড়ি, ভেলিদি ও তার ছেলে। আরেক কোণায় গুটিশুটি মেরে সমীর। কোনরকমে রাত কাটানো আর কি। কিন্তু মাঘশেষের দীর্ঘরাত কাটতে চায়না যে। স্মৃতি গর্বিত ছিলেন তাঁর দীঘলকালো চুল নিয়ে। শ্বাশুড়ির পরামর্শে বিয়েতে পাওয়া কিছু গয়না বিশালখোঁপার মধ্যে লুকিয়ে ঘোমটা দিয়ে বসে রয়েছেন। বাকি সব নিজেদের পেটিকোটের ভেতরে চোরপকেট বানিয়ে সেলাই করে রাখা।
ছন্দুমিঞার বৌ এসে গল্প জুড়লো। ---"' তা' ঠাউকরাইন! নতুন বৌ ঘরে আনছেন , বাপের বাড়ির থেইক্যা গয়নাগাঁটি কেমুন দিছে? '' সরযুবালা সতর্ক হন। নীচু গলায় বলেন--"" না:, কি আর দিবো? বাপমরা মাইয়া, তাও পাঁচ বইনের পরে। নমো-নমো কইর‌্যা সারছে।'' কিন্তু কোমরপড়া বুড়ি সুখময়ী হার মানার পাত্র ন'ন। গলা তুলে বলেন--"" না-না, দিছে, দিছে। বাপ না থাকলে কি হইবো সম্পত্তি মেলা। তায় বড়ভাই চা'বাগানের ম্যানেজার। '' ছন্দুবিবি, সরযুবালা ও স্মৃতি মুখচাওয়াচাওয়ি করেন। বুড়ি বুঝতে পারলেন ভুল হয়ে গেছে। তাই চেষ্টা করতে লাগলেন প্রসঙ্গান্তরে যেতে।
----"" বুঝলি আমিনের মা! আমার নাতিবৌ কিন্তু বড় গুণের। ভাল রান্না করে, গুরুজনের সেবা করে। আইজকালকার মাইয়াদের মত না। আচ্ছা, তুই ভালো বৌয়ের ছড়াটা জানস? জানস না? শুন,তরে কই।
'" হাত-অ-তালি, হাত-অ-তালি মদনের মা,
পুত বিয়া করাইলি বৌ ভালা না।
বৌ বড় যুকতি, রৌ মাছ কাটে,
কড়াইতে ত্যাল নাই চ্যারচ্যারাইয়া মুতে''।
সবার খিক-খিক হাসি মাত্র শুরু হয়েছে এমন সময় শোনা গেল পাশের ঘরে ছন্দুর মেয়েজামাই বলছে---"" আল্লা-গো-আল্লা, কইলকাতার যে কি অবস্থা!হেইখানে আর মুসলমান বাঁইচ্যা ফিরবো না। ঘরে ঘরে হিন্দুগুন্ডারা সমানে মুসলমান দেইখ্যা কাটতে আছে। পুলাপান- মাইয়ালোক- বুড়ামানুষ কাউরেই ছাড়ে না। খিদিরপুর-মেটিয়াবুরুজ --সব জায়গায় একই কিস্‌সা। হায় আল্লা, কি দিনকাল পড়লো?- --। এঘরে কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেলো। ছন্দুর বৌ উঠে নিজের ঘরে গেলো। পাশের ঘরের বিলাপ মাঝে মাঝে উচ্চগ্রামে উঠতে লাগলো। হঠাৎ মোরগ ডেকে উঠলো। সেই ডাক শুনে দিদিশ্বাশুড়ি জেগে উঠলেন আর নিত্যদিনের অভ্যেসে শুরু করলেন কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম।
- "" শ্রীনন্দ রাখিল নাম নন্দের নন্দন, যশোদা ডাকিল বলি যাদুবাছাধন।
উপানন্দ নাম রাখে সুন্দর গোপাল, যদুবালক রাখে নাম ঠাকুররাখাল।''
এবার সরযুবালা নীছুগলায় খেঁকিয়ে ওঠেন--"" আপনের কি কোন উলব-তলব নাই? এইতা কি শুরু করছেন? চলেন, অন্ধকার থাকতে থাকতে বাড়িতে ফির‌্যা যাই। তারপর আপনে শালগ্রাম শিলারে সান করাইয়েন আর নামকীর্তন কইরেন। দ্যাখেন মুর্গায় বাঙ দিছে। চল গো, সবাই তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিই।''


কালোরাতি গেল ঘুচে

দিন কাটে নানান গুজব শুনে, রাত কাটে আধোঘুমে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে। স্মৃতিকণার পেটের মধ্যে বাচ্চাটা নড়াচড়া শুরু করেছে। মহকুমা শহরের ডাক্তারও দেশ ছেড়েছেন, কাজেই পাড়ার দাইবুড়ি ভরসা। শ্বাশুড়ি ভরসা দেন আর দিদিশ্বাশুড়ি তুলসীমালা জপেন- সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কোলকাতা থেকে অনেকদিন কোন খবর আসে না যে। স্মৃতির অভিমান হয় সেই মানুষটার ওপর। কোন ভাবনাচিন্তা নেই, মায়াদয়া ও নেই নাকি? বৌয়ের কথা থাক, আরেকজন যে আসছে তার জন্যে কোন ভাবনা নেই।কোলকাতা ছাড়ার আগে খুব তো বলেছিলো--- যেই আসুক, ছেলে বা মেয়ে আমাদের জন্যে একই ব্যাপার। তাকে ভালো করে পড়াব। আমি স্কুলের আগে পড়তে পারিনি। ম্যাট্রিক না দিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছিলাম। বাবা ক্ষমা করেন নি। পড়াতে রাজি হন নি। পরে নিজের চেষ্টায় প্রাইভেটে পাশ করলাম। ইচ্ছে ছিল-- ল' পড়ব, বাপ-ঠাকুর্দার মত উকিল হব। রাজি হলেন না। দু' দু বার ঘরপালানো ছেলের কথার ওপর ভরসা করতে পারেন নি। দরজায় দরজায় ঘুরলাম, পেয়িংগেস্ট হয়ে থাকবো, সিলেটের নামি কলেজে পড়বো, টিউশন করে খরচা চালাবো--- কেউ হাত বাড়ালো না। আমার পরে যারা আসবে সবাইকে পড়াবো। যদ্দূর পড়তে চায়।

শীত যাই-যাই করেও যাচ্ছে না। বিশেষ করে মাঝরাত্তিরে যেন জাঁকিয়ে বসে। হ্যারিকেনের আলো নিভু-নিভু। সবাই ঘুমুচ্ছে নয়তো ঝিমুচ্ছে। সরযূবালার মনে হলো বাড়ির চারপাশে যেন লোকের আনাগোনা, কিছু ফিস্‌ফিসানি। খুলে বলতেই সতীশচন্দ্র বল্লেন--- তুমার যে কথা। এইতা কিছুনা, ইন্দুরে লাফালাফি করে। স্মৃতিকণা চোখ খুলে দেখলেন সত্যিই তো! একটা মস্ত মেঠো ইঁদুর জমি থেকে লাফিয়ে চৌকির ওপর দিয়ে পালিয়ে গেল। কিন্তু কাছেই বিয়ের শাড়ি,গয়নাগাটি রাখা চামড়ার সুটকেস--তারপাশ দিয়েও ইঁদুর দৌড়ে যাচ্ছে কেন? শেষে কি নতুন শাড়িটারি কেটেকুটে একসা করবে? হঠাৎ ভেলিদির আর্তনাদ শোনা গেল---"" ও মাইয়া-মাইয়া গো? এইডা কি দ্যাখতাছি? একটা হাত বৌয়ের শাড়ির সুটকেসের উপর! আরে, এইডা তো মাইনষের মাথাডা! '' সরযূবালা আর্তনাদ করে উঠলেন-- "" আরে, এত প্রায় ঢুইক্যা পড়ছে? বৌমা সক্কাল সইর‌্যা যাও। অ,সমীর! দ্যাখ, দ্যাখ!'' স্মৃতিকণা দেখলেন সুটকেসের কাছেই সিঁদ কেটে ভিৎ খুঁড়ে একটা দু'হাত চওড়া গর্তের আবির্ভাব হয়েছে। তা'দিয়ে হাতে ভর করে একটা কাল্‌চে মানুষের মাথা ক্রমেই এগিয়ে আসছে। কিছু বোঝার আগেই উনি "" মাইগ্গো'' বলে এক চিৎকার ছেড়ে একলাফে শ্বশুরের তক্তপোশের ওপর। ভুলে গিয়েছিলেন পেটের বাচ্চাটার কথা। মাটিমাখা কালচে মাথা ইতিমধ্যে অদৃশ্য হয়েছে। স্মৃতি থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে এলিয়ে পড়লেন।

আর এক প্রস্থ চিৎকার শুরু হল---আরে ধর ধর। ভালো কইর‌্যা শোয়াইয়া দেও। চৌখ্যে-মুখে জলের ছিটা দেও। বৌমা,তুমার কোন কান্ডজ্ঞান নাই? শরীরের এই অবস্থায় এমুন লাফালাফি করে? এমন সময় টিনের চালে ধড়াম ধড়াম করে মাটির ঢ্যালা পড়ার আওয়াজ। একের পর এক পড়ছেই। আর দুর থেকে শোনা যাচ্ছে খল্‌খল্‌ হাসির আওয়াজ।
--- বাইর্‌অ, বাইরইয়া আয় হিঁদুর বাচ্চারা।
সতীশচন্দ্র আর ক্লাস সিক্সে পড়া ছোটছেলে সমীর --- কেডা রে? বলে চিৎকার করে দুই লাঠিগাছা নিয়ে বেরুলেন। ছায়ামূর্তিগুলো ভয় পেলো না, ঠিক পালালো না। কেবল হাসতে হাসতে কাছের বাঁশঝাড়ের নিরাপদ দুরত্বে সরে গেল। ভোর হয়ে আস্‌ছে। দেখা গেল সিঁদ কাটা হয়েছে একটা নয়, দুটো। বৌয়ের শাড়ি-গয়নার পুঁটলি বেঁচেছে ঠিকই, গেছে দিদিশাশুড়ির গরমকাপড়ের পুঁটলি। আর একটা সুন্দর কাশ্মিরি কাজ করা কাঠের বাক্স। সকাল হলে বাঁশবনের কাছে কিছু ফেলে যাওয়া জিনিস ভাঙা বাক্সটি পাওয়া গেল। পাড়ার শান্তিমিছিলের কর্তাব্যক্তিরা এলেন ঘুরে ঘুরে দেখলেন। ছিঁচকে চোরের কান্ড বলে সান্ত্বনা দিয়ে গেলেন। এবার সতীশচন্দ্র ভাঙলেন। ঠিক হল কোলকাতায় বড় ছেলেকে চিঠি লেখা হবে। সে মিলিটারির লোক। একটা ব্যবস্থা হবেই। সেদিনই পোস্টকার্ড আনিয়ে লিখলেন---"" ইহা আর আমাদের দেশ নহে।''

চিঠি গ্যাছে প্রায় মাসখানেক হল। কোন খবর নেই, কোন জবাবও আসেনি। সরযূবালা লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদেন। চারদিকে সবাই ভিটেমাটি ছেড়ে যাচ্ছে। সবারই একটা ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। তাদের কেন এতদিন লাগছে? লোকবল তো কম নেই কোলকাতায়। আপন কাকা শৈলা গ্রামের মহেন্দ্রমাস্টারমশাইয়ের ছেলে নীহাররঞ্জন রায়ের তো আজকাল কোলকাতায় খুব নামডাক। আর এক নীহার -- নীহারেন্দু দত্তমজুমদার । ময়মনসিংহে প্রতিবেশি--শুনি নাকি কোলকাতায় মন্ত্রী হয়েছে? আমাদের কোন গতি হবে রাধামাধবই জানেন। কিন্তু এত চিন্তার কি আছে? কোলকাতায় বড়জামাইয়ের সঙ্গে একই বাড়িতে মিলেমিশে আছে বড় আর সেজ ছেলে। অন্য ছেলেরা একের পর এক ইস্কুলের বেড়া পার করে ওখানেই যাচ্ছে। ঠাঁই তো একটা আছেই। রিফিউজি ক্যাম্পে তো উঠতে হবে না। মা গো! যে সব কান্ড শুনতে পাই। এক সকালে স্মৃতি বেগুন পোড়াতে দিয়ে মাছ কুটছিলেন--- রুই আর কালবাউসের ভাজা আর ঝোল হবে। কিন্তু ট্যাংরা মাছের একটা ঝাল হবে তা' মাছ কই? মাছের সাইজ দেখে মনটা তেতো হয়ে গেল। শাশুড়ি ও বিড়বিড় করতে লাগলেন----"" এইতা কি জালঝাড়া- হুড়াহাবডা লইয়া আইছে?''
এমনসময় ভেলিদি দাঁতে মিশি ঘষতে ঘষতে রান্নাঘরে ঢুকে বল্লে--ও নতুন বৌ, চা' বানাও। কইলকাতা থেইক্যা তোমার সেজ দ্যাওর আইছে। বাইরের ঘরে বাবার লগে কথা কইতাছে।
স্মৃতিকণার মুখে রক্ত ছলকে উঠলো। ভেলিদি হাসলো --চিন্তা কইরো না। কইল্কাতাবাসায় হগ্গলে ভালা আছে।

রান্নাঘরে খেতে বসে সেজ দ্যাওর বল্লো -- মা, বাইরের ঘরে কেউ ডাকতাছে। দ্যাখ গিয়া।
মা সরে যেতেই বল্লো--বউদি, একটা কথা কই। কিন্তু কাউরে কইতে পারবেন না। সোনাদা ও আইছে। স্টেশনে বইয়া আছে, লুঙ্গি পইর‌্যা। আমরা কিন্তু আইজই রওনা দিয়াম। চুপেচাপে বান্ধাছান্দা শুরু করেন। আর সময় নাই। সময় যে সত্যিই নেই। রাতের গাড়ি ধরতে হবে। সতীশচন্দ্র ছন্দু মিঞাকে ডেকে পাঠিয়ে বল্লেন--এই বাড়ি তুমারে দিলাম। এইবারের খাজনা দ্যাওন লাগতনা। ছন্দু আভূমি ছালাম করে বল্লে-- আমি দেখাশুনা করবাম। হাঙ্গামা মিট্যা গেলে আবার ফিরা আইবেন। আমি ছাইড়া দিয়াম। আর ফিরা আসা? সতীশচন্দ্র হাসতে গিয়ে মুখ বেঁকালেন। ধান ও পাট বিক্রীর টাকা প্রায় হাজারদশেক বাড়িতে রাখা ছিল। সেগুলো নিয়ে বাজার এলাকায় সাগরমল মাড়োয়ারির কাছে জমা দিলেন। সাগরশেঠ একটি ভারত ব্লেডের ভেতরের সেলোফেন পেপারের ওপর পেন্সিল দিয়ে কিছু লিখে দিল। তারপর বল্লো--
সামলাইয়া রাখবেন কর্তা। এইডা নিয়া কইলকাতার বড়াবাজারে মাঙ্গীলাল মাড়োয়ারির গদিতে দেখাইলেই কড়কড়া দশহাজার ট্যাহা গইন্যা দিব। মেয়েরা সায়ার ভেতরে সেলাই করে কিছু গয়্‌না আর টাকাপয়সা ভরে নিল। আর গৃহদেবতা গোবিন্দজীউ ও শালগ্রাম শিলা কে প্রণাম করে রাত দশটা নাগাদ চুপ্‌চাপ বেরিয়ে পড়ল। বড়রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে না। তাই মাঠঘাট, লোকের বাড়ির খাটাপায়খানার তলা, বাঁশঝাড়, আলপথ---- কোনকিছুই আজ আর অগম্য নয়। কোমরপড়া নিরুপায় দিদিশাশুড়িকে ভেলি আর সরযুবালা মিলে প্রায় ছ্যাঁচড়াতে ছ্যাঁচড়াতে নিয়ে যাচ্ছেন। অবশেষে স্টেশন এল। ছায়ামূর্তির মত কিছু লোকজন। কারো মুখে কোন কথা নেই। ট্রেন এল। ইতিমধ্যে একটি চাদরমুড়ি দেয়া ছায়ামূর্তি এগিয়ে এসেছে। কাছে এসে বল্লো- টিকিট কাটা হয়ে গেছে, ট্রেন আসছে। স্মৃতি দেখলেন সলিল একবারও তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন না।

ট্রেন চল্লো সারারাত। সকাল দশটা নাগাদ ময়মনসিং স্টেশন এল। না, রাস্তায় কেউ তাদের ট্রেন আক্রমণ করেনি। স্মৃতিকণা ভাবলেন হয়তো যা শুনছেন সবটা সত্যি নয়। কিছু হয়তো গুজব। স্টেশনে নেমে দেখা গেল মানুষের ভীড়ে ভারাক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম। বাতাসে এক দিশাহীন আতংক। সবাই মিলে খান দুই ট্যাক্সিতে ঠেসে ঠুসে পৌঁছলেন ছোটমামা ড: নীলমণি রায়ের বাড়ি। স্নান-খাওয়ার পর মেয়েরা শীতলপাটি পেতে একটু গড়িয়ে নিলেন। পুরুষেরা মেতে উঠলেন তর্কে। একটু পরেই এসে গেলেন ময়মনসিং কলেজের অধ্যাপক সুধেন্দু রায়-- ড:নীহাররন্‌জনের বড়দা। বেশ ভালমানুষ টাইপ। ভাগ্নে -বৌকে দেখে আশীর্বাদ করে আবার বাইরের ঘরে গিয়ে তর্কে মেতে ঊঠলেন। বিকেলের চা' করে বাইরে দিয়ে আসতে গিয়ে স্মৃতি টের পেলেন হাওয়া বেশ গরম হয়ে উঠেছে। প্রথম পক্ষ ছোটমামা ও সুধেন্দু রায়। এদের বক্তব্য এই দাঙ্গা তাৎকালিক, একটা aberration মাত্র। ময়মনসিং শহরে কোন দাঙ্গা নাই। কোথাও কোথাও গ্রামের দিকে হচ্ছে মাত্র। এই ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনাকে বেশি গুরুত্ব দেবার দরকার নেই। এর জন্যে বাপ-পিতামোর ভিটে ছেড়ে যাওয়া ? প্রায় নির্বুদ্ধিতার কাছাকাছি। কাজেই আপনারা এস্‌চেন, ভালো কথা,---খান-দান, তারপর দিন পনেরো পরে বাড়ি ফিরে গেলেই হবে। দ্বিতীয়পক্ষের মূল প্রবক্তা -বড়ছেলে সলিলকুমার। অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বল্লেন--- ময়মনসিং সারা পাকিস্তান নয়। আপনি বাইরের খবর কিছুই রাখেন না। আমাদের কোলকাতা যেতেই হবে। আপনিও চলুন। আপনার বুদ্ধিতে চললে ধনে-প্রাণে মারা পরতে হবে।

এই তর্ক চললো প্রায় দিন দশেক। এদিকে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ছে নতুন নতুন এলাকায়। ইতিমধ্যে হয়ে গেল নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি।সর্বত্র মিলিটারি নেমেছে। খবর পড়ে সলিল লাফিয়ে উঠলেন।--- আর দেরি নয়, এই সুযোগ। ক'দিন গন্ডগোল কম থাকবে। আজই আমাদের রওনা দিতে হবে। নীলমণি রায় আর আটকাতে সাহস করলেন না। বর্তমান সময়টা কেমন যেন ঝাপসা-ঝাপসা। এতদিনের চেনা মুখগুলো কেমন অচেনা লাগছে। কোন কিছুরই আজ গ্যারান্টি নেই। আটকাবেন কিসের ভরসায়?

নীলমণি আর সুধেন্দু স্টেশনে তুলে দিতে এসে সকাল থেকে রাত দশটা অব্দি স্টেশনে রইলেন। ওনার পরিচিত ক্লায়েন্ট পরিবারদের সহায়তায় টিকেট পেয়ে রাত দশটায় ট্রেনে ওঠা গেল। কিন্তু তার আগে? পাকিস্তান পুলিশ ও আন্সারবাহিনীর লোকেরা খানাতল্লাশি করলো সমস্ত যাত্রীকে--যারা পাকিস্তান ছেড়ে হিন্দুস্তান যাবে। প্রতিব্যক্তি পঞ্চাশটাকা আর মেয়েরা শরীরে সামান্য যা পরতে পারেন---একজোড়া চুড়ি, একগাছি হার, একজোড়া দুল ইত্যাদি।একজন মহিলা হাতভরে দশজোড়া চুড়ি, কানে দুই জোড়া দুল আর গলায় তিনটে নেকলেস পরেছিলেন। শেষরক্ষা করতে পারলেন না। মহিলা পুলিশ টান মেরে সমস্তটাই বাজেয়াপ্ত করলো। ওনার কান্নার আওয়াজে কারো সহানুভূতি দেখা গেলো না। মেয়েরা নীচু গলায় বলতে লাগলেন অতি লোভে তাঁতি নষ্ট। তবে হ্যাঁ, মেয়েদের শরীরের তল্লাসি মেয়ে পুলিশরাই করছিলো--অবশ্যি বাথরুমে নিয়ে গিয়ে। আর বেশি টাকা পেলে বাজেয়াপ্ত করে রসিদ দিচ্ছিলো, বলছিলো-- এ'দেশে ফিরে আসলে আবার এই রসিদ দেখিয়ে টাকাকড়ি বা গয়না ফেরত পেতে পারেন। স্মৃতিকনার আর সরযুবালার পেটিকোটের ভিতরে চোর পকেটে সেলাই করা ছিলো কিছু টাকা ও গয়না। কোমরে ঐ পঞ্চাশটাকা। ওদের যখন সার্চ করা হলো তখন মেয়ে পুলিশেরা সরদিনের ধকলে বেশ ক্লান্ত। স্মৃতি যখন পুলিশের হাতে টাকাটা দিয়ে বল্লেন--আপনি গুণে নিন, মেয়েটি ম্লান হেসে বললো---আপনি গুনেছেন তো? ঠিক আছে।স্মৃতির মনে হলো ছোটমামার সঙ্গে স্থানীয় কর্তাব্যক্তিদের যোগসাজশ থাকায় এঁদের অন্য পরিবারদের তুলনায় হয়রানি অনেক কম হয়েছে। কিন্তু পুরুষ সদস্যদের ভাগ্য অতটা ভালো ছিলো না। ওদের সার্চ হলো একেবারে রেগুলেশন মাফিক। চওড়া গোঁফের এক পাঠান সেপাই বারো বছরের সমীরের শরীর তল্লাশি করার সময় প্যান্টের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে চেপে ধরলো তার অন্ডকোষ। হাল্কা মোচড় দিয়ে ওর আতংকভরা চোখের দিকে তাকিয়ে বললো---"" অব ক্যায়্‌সা!!''

মেয়েরা রইলেন ওয়েটিং রুমে, চান-টান করবেন। পুরুষেরা বাইরে। মাঝেমাঝে খাবার নিয়ে আসতে যেতে কেউকেউ আসছিলেন, কথা বলে চলে যাচ্ছিলেন। এমন সময় নতুন বিপদ। এক মুসলমান পরিবারের মেয়েরাও ছিলেন ঐ রুমে। ওদের পরিবারের বয়স্ক পুরুষটি একই প্রয়োজনে ওখানে ঢুকতেই বেশ উঁচু গলায় নালিশ হলো যে ঐ হিন্দুদের পুরুষেরা বারবার এই জেনানা ওয়েটিং রুমে নানান অছিলায় ঢুকছে, এতে আমাদের আব্রু বিপন্ন হচ্ছে। ব্যস, সাদাদাড়ির ঐ প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি পবিত্র ক্রোধে জ্বলে উঠে মেজেতে হাতের লাঠি ঠুকতে ঠুকতে বল্লেন---"" আইয়া দেখুক আরেকবার! এই লাঠির বাড়িতে ঐ পুঙ্গির পুতদের মাথা ফাটাইয়া দিয়াম। '' এরপর ক্লাস সিক্সের সমীর ঢুকতে যেতেই স্মৃতি বাধা দিলেন। দরজায় এগিয়ে গিয়ে নতুন সমস্যা খুলে বলতেই ঠিক হল মেয়েপুরুষ সবাই মিলে সারাদিন প্ল্যাটফর্মের ওপর কাটাতে হবে। নোংরা আর ধুলোর ওপর চাদর পেতে গা ঢেকে মেয়েরা বসে শুয়ে রইলেন। সরযুবালা বললেন--এইবার আমরা সত্যসত্যই রিফিউজি হইলাম।

সারাদিন ট্রেন আসছে-যাচ্ছে। এক-একটা গাড়ি আসে যায়, কখনও কান্নার রোল ওঠে, কখনও শুধুই ফিস্‌ফিসানি। শোনা গেল আগের ট্রেনে হামলা হয়েছিলো। দু'টো কামরা কচুকাটা হয়েছে, তাই ট্রেনের রুট ঘুরিয়ে দেয়া হয়েছে, আসতে চারঘন্টা দেরি হবে। সবার দ্বিধা আর উদ্বেগ সীমা ছাড়াচ্ছে, কিন্তু সলিল নির্বিকার। আমরা পেছনের ব্রীজ বরাবরের মত পুড়িয়ে দিয়ে এসেছি, - এখন শুধু সামনে এগুতে হবে, ফলাফল যাই হোক। চারঘন্টা কাটানো বেশ কষ্টকর হয়ে উঠলো। প্ল্যাটফর্ম লোকে লোকারণ্য। সবাই যাচ্ছে ভিটেমাটি ছেড়ে।কিন্তু এত ঝড়-জল -ভূমিকম্প নয়। এখানে যে মানুষের ঘৃণা, হিংসা আর অবিশ্বাসের বিষে বাতাস ভারি। শ্বাস নেয়া কঠিন। দুই রায়মশায়কে বলা হল--- আপনেরা বাড়িত জাইন, খামাখা খাড়ইয়া খাড়ইয়া
কি করবেন? গাড়ি আইলে আমরা ঠিক চড়তে পারবাম। কিন্তু ওঁরাও বেশ নাছোড়বান্দা। ট্রেনে তুলে দিয়ে তবে বাড়ি যাবেন। ট্রেন ছাড়ার সময় সুধেন্দ রায়ের চোখের জল বাধা মানল না।-"" আপনেরা তো সিদ্ধান্ত নিয়া ফালাইছেন, চললেন দ্যাশ ছাইড়া। আমি যে কি করি? কোন দিকে যাই?''

সন্ধ্যের পরে ট্রেন ছাড়লো। কামরাভর্তি গাদাগাদি লোকজন। ট্রেনে মেয়েরা উঠেছেন জেনানা কামরায়। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি,-- কেবল গাড়ি সিটি বাজাতেই এক চেড়িসদৃশ মহিলা পুলিশ জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে এক মহিলার কানের ঝুমকো হ্যাঁচকা টানে ছিঁড়ে নিল। কানের লতি কেটে রক্ত বইতে লাগলো। স্মৃতিকণার শরীরের অবস্থা বলেকয়ে অনেক কষ্টে একটা লম্বাটে কাঠের হলদেটে রং করা সীটে শাশুড়ির পাশে তার ঠাঁই হল। সারাকামরা প্রায় নি:শব্দ। কেউ কেউ ফুঁপিয়ে উঠছে, বাকিরা চুপচাপ। বাথরুমের সামনেও ঠাসাঠাসি লোকজন। কামরার ভেতর একটু ঝাঁঝালো হাওয়ায় ভর করে ছড়িয়ে পড়ছে এক সর্বব্যাপী আকারহীন ভয়। হলদেটে বাতি থেকে মিটমিটে মিয়োনো আলো যেন সেই ভয়কে আরো বাড়িয়ে তুলছে। পেরিয়ে যাচ্ছে একের পর এক স্টেশন। নতুন নতুন লোকজন ওঠার চেষ্টা করে কিন্তু যারা আগে থেকে আছে তারা সমস্বরে চেঁচায়-- জায়গা নাই, অন্য কামরায় যাও। তারপর ট্রেন ছাড়তেই আবার সব চুপ্‌চাপ। স্টেশন থেকে কেউ চা বা তেলেভাজা কিনছে না। কিন্তু আস্তে আস্তে ফিসফাস কথা ছড়িয়ে পড়ছে-- আগের ট্রেনে সবাইরে কাইট্যা ফালাইছে। কোন মহিলার কথা-- আমার দ্যাওরে রেলে কাজ করে, শিয়াল্‌দা'য় দ্যাখছে, ফিরৎ ট্রেনে চাপ্‌চাপ রক্ত শুকাইয়া রইছে,আর ভাঙ্গা চুড়ির টুকরা---। তাই আইজকাইল হেইসব ট্রেন ঘুরাইয়া হাওড়ায় পাঠাইত্যাছে।

খাওয়াদাওয়ার কথা কেউ ভাবছে না। তবু একবার শাশুড়ি শুকনো চিঁড়ে-মুড়ি-গুড় বের করে সবাইকে দিলেন। স্মৃতি না করলে সরযুবালা বল্লেন- কি করবা বৌমা? খাইতে কার ইচ্ছা করে! কিন্তু তুমার প্যাটে যে এক শত্রু-- তারে তো উপাস দিলে চলবো না।

ট্রেন চলছে। থামছে, আবার চলছে। থামলেই সবার চেহারায় এক ব্যাকুলতা,-- থামছে ক্যারে? কতক্ষণে ছাড়বো? স্মৃতির খালি মাথায় ঘুরে ফিরে আসছে বিয়েতে পাওয়া ""সঞ্ছয়িতা''র একটি লাইন---"" আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা' জানে, অন্ধকারে দেখা যায়না ভালো''। ছোট দেওর সমীরের ফিসফাস থেকে জানতে পারলেন।গোয়ালন্দে রেলগাড়ি বদলে স্টীমারে করে সিরাজগঞ্জ, তারপর সেখান থেকে ট্রেনে দর্শনা পেরুলেই হিন্দুস্থান।

গোয়ালন্দ স্টীমারঘাটায় আর এক বার সার্চপর্ব। মেয়েদের স্নানঘরে ঢুকিয়ে উলঙ্গ করে তল্লাসি চালাচ্ছে মহিলা পুলিস। স্মৃতির বিশাল খোঁপা খুলিয়ে ওরা পেল একগাছি সোনার দুল।জব্দ করে রসিদ দিয়ে বল্লে - পাকিস্তান ফির‍্যা আইলে ফিরৎ পাইবা। স্মৃতি সায়া খুল্লেন না। আগেই কোমর থেকে পঞ্চাশটাকা বের করে ওদের হাতে দিয়ে বল্‌লেন-- গইণ্যা দ্যাখেন। মেয়েপুলিশেরাও খানা-তল্লাশির একঘেয়েমিতে বোধহয় ক্লান্ত, না গুনেই বল্লো- ঠিক আছে, আপনে যান।

কিন্তু সবার ভাগ্য সমান নয়। ফাল্গুনের গরমে একজন মহিলা কেন ফুলহাতা গরম ব্লাউজ পরে ঘামছেন? ব্লাউজ খোলাতেই বেরিয়ে পড়লো কব্জি থেকে কাঁধ অব্দি নানান মাপের সোনার চুড়ি- বাজুবন্দ- হার, সব দু'হাত ভরা। তারপর সেই মহিলার কান্নার রেশ হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়লো কাছের ভাতের হোটেল পর্য্যন্ত। ভীড় হেসে গড়িয়ে গেলো। সহানুভূতি বুঝি সবাই পদ্মার ওপারে ফেলে এসেছে। আবার হাসির হর্‌রা। এক মহিলা অদম্য সাহসে লড়ে যাচ্ছেন--নারীপুলিশ ও আন্সারবাহিনীর সংগে। ওনার পোঁটলা-পুঁটলিতে বেরিয়ে পড়েছে সের-দশেক মুগডাল। এরা আটকাবে---পাকিস্তানের ফসল সোনামুগের ডাল হিন্দুস্থানে কেন পাচার হবে? উনিও নাছোড়,-- আমার সঙ্গে বিধবা শাশুড়ি, জাননা হিন্দুবিধবা মুগডাল ছাড়া অন্য কোন ডাল খায় না! আর আমি তো বেড়াইতে যাইত্যাছি, ফির‌্যা আইয়াম।

সিরাজগঞ্জ থেকে নিরাপদে ট্রেন ছাড়লো। আস্তে আস্তে গাড়ির আবহাওয়া সহজ হচ্ছে, একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে ভয়ের গন্ধ। স্মৃতি ঘুমিয়ে পড়লেন। মাঝরাতে কার হাতের ঠ্যালায় ঘুম ভাঙ্গলো স্মৃতি জানেন না। গাড়িটা স্টেশনে না, অন্য কোথাও থেমে আছে। সমস্ত কামরা অন্ধকার। বাতিটা কেউ নিভিয়ে দিয়েছে। শাশুড়ির আওয়াজ শুনতে পেলেন--আমার হাত ধইর‌্যা থাকো। শব্দ কইরো না। পিছনের কামরাতে হামলা হইছে। স্মৃতি কাঁপতে লাগলেন।

বাইরে কাক জ্যোৎস্না। কাঁচ দিয়ে যা বোঝা গেল এটা কোন স্টেশন নয়। দুদিকে ধান্‌কাটা নেড়াক্ষেত। হঠাৎ শোনা গেল--'' আল্লাহ্‌ আকবর। নারা-এ-তকদীর্‌, আল্লাহ্‌ আকবর।'' জানলার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে বেশ কিছু লোক। এর পর কেউ যেন বল্লো--"" পিছনের কামরায় হামলা হইছে।সব্বাই বাতি নিভাইয়া দেন, ইষ্ট নাম জপ করেন।'' কামরার টিমটিমে বাতিটাও কেউ বুজিয়ে দিয়েছে। ঘুর্ঘুট্টি অন্ধকারে উঠলো সমবেত কান্নার রোল। কেউ কেউ দরজা খুলে লাফানোর চেষ্টা করতেই দশটা হাত বাধা দিলো---"" কেউ দরজা খুলবেন না। তোরঙ্গ দিয়া দরজার মুখে চাপা দ্যান।'' এমন সময় শোনা গেল গুলির আওয়াজ। পাহারাদার মিলিটারি গুলি চালাচ্ছে। নেহরু-লিয়াকৎ চুক্তি কাজ করছে। খানিকক্ষণ র‌্যাট-ট্যাট হওয়ার পরই বোঝা গেল হামলাকারীরা পালাচ্ছে। একঘন্টা পরে আবার গাড়ি চলতে শুরু করলো।

পরদিন একঘেয়ে যাত্রা। গাড়ি পাল্টে স্টীমারঘাটায় পদ্মানদী পেরিয়ে আবার ট্রেন। বিকেলের দিকে দর্শনা স্টেশন। পূর্ব পাকিস্তানের সীমান্তে শেষ স্টেশন "দর্শনা'। সেখানে আর এক দফা ব্যাপক খানাতল্লাসি। ---হিন্দুস্থানে কি লইয়া যাইতে আছ? কিন্তু সীমান্ত পৌঁছুতে পৌঁছুতে কখন বদলে গেছে রোদ্দুরের রং, কখন ফিকে হয়ে গেছে পুলিসের তেজ। তবু প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে বাক্স-প্যাঁটরা খোল, তোরঙ্গ খোল। একটি কমবয়েসি ছেলেমেয়ের দল যাচ্ছিল,সঙ্গে বয়স্ক কেউ নেই।ওরা একটু যেন বেহিসেবি, একটু বেপরোয়া। ওদের কাছে দেখা গেল একটা বড়সড় কাঠের বাক্স।--খোল, খোল, কি নিয়ে যাচ্ছ দেখবো? খুলে সবাই অবাক,-- এত বড় কাঠের বাক্সে রাখা আছে একটি মুড়ো ঝাঁটা! -সেকি? এত যত্ন করে একটা খ্যাংরা ঝাঁটা হিন্দুস্তানে নিয়ে যাবে? জোয়ান ছোকরাদের পাল্টা জবাব। --হ্যাঁগো, এটা যেমন-তেমন খ্যাংরা নয়, এইদিয়েই পাকিস্তান ঝেঁটিয়ে এসেচি। এক মুচ্‌কি হাসির দমকা হাওয়া কামরাজুড়ে বয়ে গেল। ওরা নেমে গেল। হিন্দুস্তান এগিয়ে আসছে।দর্শনা ছাড়তেই গাড়িতে জাগলো উল্লাস্‌ধ্বনি। হরিধ্বনি ছড়িয়ে পড়লো ট্রেনের এ'মুড়ো থেকে ও'মুড়ো। কোথাথেকে বেরিয়ে এল শ'খানেক শাঁখ। মূহুর্মূহু শঙখধ্বনিতে কাঁপছে হাওয়া। গাড়ি বর্ডার পেরিয়ে হিন্দুস্তানের প্রথম স্টেশনে থামতেই লোকে লাফিয়ে নামলো জমিতে। সবাই হাসছে, কাঁদছে, একে-তাকে বুকে জড়িয়ে ধরছে। মাটি থেকে ধুলো তুলে মাথায় মাখছে। এ মাটি আস্থার,আশ্বাসের, বিশ্বাসের। বেঁচে থাকার বিশ্বাস। আমি বেঁচে আছি, তোমরাও বাঁচো। যাকিছু ওপারে ফেলে এসেছি,সব আবার এপারে পাওয়া যাবে। হয়তো পাওয়া যাবে। হয়তো।

রাত বারোটার সময় শেয়ালদাতে ট্রেন থামলে কোন ট্যাক্সি পার্কসার্কাস এলাকায় যেতে রাজি হলো না। দাঙ্গা চলছে। শেষে ঢাকার দুই ভাই তাদের ট্যাক্সি নিয়ে বাইশটাকা ভাড়ার বিনিময়ে রায়েদের ধাঙড়বাজারের সামনে সার্কাস মার্কেট প্লেসের দোতলায় পৌঁছে দিয়ে গেল।

এদিকে আঠারবাড়িয়া গ্রাম থেকে ধান-পাট বিক্রির টাকা নিয়ে বাবুর বাড়ি হিসেব দিতে এক ভোরে বাজিতপুর স্টেশনে নামলো মোম আলি উরফে লাউয়া মিঞা। এবার ফসল ভালো হয়েছে। এখন বর্ষা নামা অব্দি লাউয়া বাজিতপুরেই থাকবে। ভালমন্দ খাবে। আর নৌকোবাইচের দিন আসছে। লাউয়া নইলে বাবুর বাড়ির নাওয়ের গলুইয়ে দাঁড়িয়ে করতাল বাজিয়ে গানের ধুয়ো কে ধরবে? --"" যাত্রা করিয়া মোরে বিদায় দে, ও মা যশোদা, মাগো যশোদারাণী, কালিদহে যাব আমি।'' তার আগে অনেক কাজ। নৌকোটাকে গাবগাছের আঠা খাইয়ে রোদে শুকোতে হবে। কিন্তু এবার যে একটা বিশেষ কাজ আছে। বাড়ির বড় বৌ ক'মাস হল বাজিতপুর এসেছে, তার মুখ দেখে আশীর্বাদ করতে হবে না? প্রথম বার এসেছে যে। লাউয়া কাজে ব্যস্ত ছিল, আসতে পারেনি। বড়,মেজ, সেজ সবকটাকেই তো কোলে কাঁখে করেছে। দরকার মত চাঁটি ও লাগিয়েছে। এবার ও লুকিয়ে একটি গিনি কিনে এনেছে। কাউকে বলেনি, ওর ইচ্ছে গিনি দিয়ে নতুন বৌমার মুখ দেখবে। ভাবতে ভাবতে কখন যে বাড়ির সামনে চলে এসেছে খেয়াল ছিলো না। চটকা ভাঙ্‌লো বাড়ির দরজায় মস্ত তালা দেখে। পুরো বাড়িটা একচক্কর লাগিয়ে লাউয়া বুঝলো যে সত্যিই বাড়িতে কেউ নেই। কি হলো? কোন অসুখ-বিসুখ? নতুন বৌমার কিছু হল? অবাক লাউয়া মিঞা পাশের বাড়িতে জিজ্ঞেস করে জানলো কত্তারা সপরিবারে বাজিতপুর ছেড়েছেন প্রায় দিন পনেরো হোল। মাঝবয়সি টেকো মোটাসোটা মনিরুদ্দি উর্ফ লাউয়া মিঞার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। আস্তে আস্তে দাওয়ায় বসে পড়ে বল্লো- - বাবু আমার কথা কিছু কইয়া গেছেন? নেতিবাচক উত্তর শোনার পর লাউয়া চোখে অন্ধকার দেখলো। এইডা কি কইরা হয়? বাবু আমার কথা কিছুই কন নাই? শঙ্কর, নারু, খোকা, সমীর কেউ কিছু কয় নাই? মা-ঠাকুরাইনরা? তারাও না? খোদাতাল্লার হিসাব-কিতাব কিছুই বুঝলাম না।

তারপর তামাশা দেখতে কিছু জমে যাওয়া ভীড়ের সামনে এক জান্তব আর্তনাদ করে লাউয়া ধূলোয় গড়াগড়ি খেতে লাগলো। ----বাবু, অ-বাবু, এইডা কি করলাইন বাবু? বরাবরের মত বাড়ি ছাইড়া গেলেন আর লাউয়া-বুইধ্যারে খবর দিলেন না? আমি যে সব হিসাব-কিতাব নিয়া আইছিলাম। আমি যে নতুন বউয়ের মুখ দেখার লেইগ্যা গিনি কিন্যা আনছিলাম! আপনে এইডা কি করলাইন? ভীড়ের থেকে কেউ সান্ত্বনা দিতে এলোনা। কান্নার শব্দে বাড়ির সামনের গাছ থেকে একটা মাছরাঙা উড়ে গেল---বোধহয় শিকার খুঁজতে।

(চলবে)



লেখক পরিচিতি
রঞ্জন রায়

জন্ম -- ১৯৫০; পারিবারিক আদি নিবাস তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশের) ময়মনসিংহ জেলার কিশোরগঞ্জ মহকুমার বাজিতপুরে দেশভাগের সময় প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসা মায়ের পেটে থাকা রঞ্জনকে  তাড়িয়ে বেড়ায় ছোটবেলায় বড়দের মুখে শোনা ফেলে আসা সেই স্বপ্নের দেশের কথা
 কোলকাতায়  বড় হলেও চাকরিসূত্রের ৩৫ বছর কেটেছে ছত্তিশগড়ের আদিবাসীবহুল গাঁয়ে গঞ্জে এগুলিই লেখার উপাদান
 বাংলা লেখা শুরু ৫৫ বছর বয়সেগল্প , অনুবাদ (হিন্দি থেকে), প্রবন্ধ
  বিভিন্ন ছোটখাটো পত্রিকায় মূলতঃ বাংলালাইভ, গুরুচন্ডালি জয়ঢাক (ছোটদের পরিকা) ইত্যাদি ওয়েব ম্যাগে প্রকাশিত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন