শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

কি করে একটি চরিত্রকে স্মরণীয় করে তুলবেন

নতুন গল্প শুরু করার আগে, নতুন চরিত্র তৈরি করতে একটু সময় নেয়া দরকার। ভালো করে দেখে নেয়া দরকার বিখ্যাত সব চরিত্রগুলো কেন এতো পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে? তাহলে কি জনপ্রিয় সেইসব চরিত্র তৈরিতে বিশেষ কোনো ফর্মুলা বা কৌশল ব্যবহার করেছেন লেখকরা? করলে, সেই কৌশলটা কি? সেটা জানা জরুরি বর্তমান সময়ের লেখকদের। যে কৌশলের উপর ভর করেই হয়তো তারাও তৈরি করতে পারেন কালজয়ী সব চরিত্র।


তাহলে আসুন, নিজেকে মহাপরিকল্পনাকারী হিসেবে ভেবে বিষয়ের আঙ্গিকগুলো নিয়ে বিশ্লেষন করি। একজন লেখক হিসেবে নিজের তৈরি চরিত্রগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ করি। বিশ্লেষন আর ব্যবচ্ছেদের সমন্বয়ে অঙ্কণ করি অনন্য বৈশিষ্ট সম্পন্ন সব চরিত্র। এমন কিছু কৌশল সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হলো:

১) নাম দিয়ে শুরু করা :

উপন্যাস, গল্প বা সাহিত্যের প্রধান চরিত্রের একটি নাম দিন। যে নাম আপনার কাছে অনন্য বা আপনি কমফোর্ট ফিল করেন, তেমন নাম পছন্দ করুন। কারণ নামের কারণেই অনেক সাহিত্য আপন স্থানে আসীন রয়েছে। যেমন, নবাব সিরাজুদ্দৌলা, দেবদাস, নয়নমনি, এ্যানটনী ফিরিঙ্গি, ফেলুদা, জেমস বন্ড। অনেক সময় শুধুমাত্র নামেই প্রকাশ পায় একটি গল্প বা উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। সুতরাং প্রধান চরিত্রের ভালো একটি নামকরণ করা লেখক হিসেবে আপনার প্রথম কাজ।


২) সংক্ষিপ্ত জীবনী তৈরি করুন:

নতুন এই যে একটি চরিত্রের নাম ঠিক করলেন, এবার এ চরিত্রটির সংক্ষিপ্ত বর্ননা তৈরি করুন। দেখতে কেমন, বয়স কত, উচ্চতা কত, মাথার চুল কেমন, চোখের রং কেমন, ওজন কত এই সব লিখে ফেলুন। পাশাপাশি চরিত্রটির ব্যক্তিত্বে সীমারেখা তৈরি করতে বিবেচনায় রাখুন এইসব বিষয়:-


• মেজাজ
• নৈতিক/ধর্মীয় বিশ্বাস
• রাজনৈতিক অবস্থান
• শখ
• অভ্যাস
• ছিট
• পছন্দ/অপছন্দ
• ভয়

• স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য
• আশা এবং স্বপ্নের দিকে নজর দিন। এগুলোর ছোট ছোট বর্ননাও যোগ করতে পারেন।


৩) সম্ভব হলে ছবি যোগ করুন:

যে চরিত্রটির নাম দিলেন, চরিত্রের বর্ননা করলেন, তার সাথে মিলিয়ে সম্ভব হলে একটি ছবি যোগ করুন। ইন্টারনেট, সংবাদপত্র, কিংবা ম্যাগাজিনের সাহায্য নিতে পারেন।

এখন আপনার চরিত্রের কথা ভাবুন। চরিত্রের একটি নাম পেয়েছেন, বৈশিষ্ট্য যোগ করেছেন, যুক্ত করেছেন একটি ইমেজও। তাহলেই কি আপনি গল্পের ভেতরে যেতে পারবেন এখনই? কি মনে হয়?

এখন আপনার প্রয়োজন ভালো একটি স্বতন্ত্র গল্প তৈরির। সেজন্য আপনাকে আরো কয়েকটি বিষয় খেয়াল করতে হবে। যেমন ধরেন আপনি আপনার চরিত্রটিকে মহাশক্তিধর হিসেবে অংকিত করলেন। একইসাথে তার একটি দুর্বল দিকও তুলে ধরুন গুরুত্বের সাথে। দুর্বলতাকে জয় করার গল্পটাই হতে পারে আপনার উপন্যাস।


৪) দৃষ্টিকোণ স্থির রাখার চেষ্টা রাখুন:

যতটা সম্ভব বৃত্তের ভেতরেই থাকুক প্রধান চরিত্র। শেকড়ের টানে লড়াই, নীতি-নৈতিকতার লড়াইয়ে পাঠকের সহানূভূতি পায় এমন করে চরিত্রটিকে সাজান। নতুন কিছু দেয়ার নামে, এমন কান্ড লিখে বসবেন না যাতে আপনার পাঠকেরা আশাহত হন। সবদিক বিবেচনা করে শুরুতেই একটি দৃষ্টিভঙ্গি স্থির করে নিন এবং সে মতে গল্প বা সাহিত্যটির চরিত্রগুলোকে এগুতে দিন।


৫) সমস্যাগুলোকে জটিল থেকে জটিলতর করুন:

প্লটের চরিত্রগুলোর সমস্যাগুলোকে জটিল থেকে জটিলতর করুন। এতে করে পাঠক আপনার চরিত্রের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠবেন। প্রত্যেকটা চরিত্রের গভীরতা উপলব্ধি করুন এবং সেমতে সমস্যা তৈরি ও সমাধানের পথ অবমুক্ত করুন।


৬) মূল দ্বন্দ্বগুলো চিহ্নিত করুন:

আপনার চরিত্র কিসের জন্য লড়ছে, সেই দ্বন্দ্বগুলো স্পষ্ট করুন। নায়ককে দিয়ে মর্মান্তিক একটি বা একাধিক দ্বন্দ্ব তৈরি করুন। সে দ্বন্দ্বের অবসান কি কি ভাবে হতে পারে তার সম্ভাব্য একটি তালিকা তৈরি করুন। তৈরি করুন দ্বন্দ্বের তালিকাও। যেমন ধরুন, আপনার প্রধান চরিত্র একটি সাফল্য পেতে চায়, কিন্তু সেই সাফল্যের জন্য তাকে চরম মূল্য দিতে হবে। হতে পারে তাকে তার আত্মার স্বাধীনতা হারাতে হবে এজন্য। হতে পারে তাকে সফল হবার জন্য সমাজচ্যুত হয় এমন একটি কাজ করতে হবে। এই সফলতা আর বিনিময় মূল্য নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তা নিয়েই পাঠকের অন্তর ছুয়ে যেতে পারেন অনায়াসেই। নীতি-নৈতিকতা ঠিক রেখে, আধুনিক সমাধান যোগ করতে পারেন। আত্মা, বিবেব, বোধ, সমাজ, সামাজিকতা এসবকে মাথায় রেখে সমাধানের কথা ভাবলেও খারাপ হবে না নিশ্চিত।


আর এসবই আপনার চরিত্রটিকে একটি মৌলিক চরিত্র হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেবে, প্রতিষ্ঠিত করে দেবে। টুকরো আলোচনাগুলোকে এবার এক সুতোয় গাথার পালা আপনার। সুতরাং বসে পড়ুন, আর মালা গাথা শুরু করুন।

লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন