শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

চরিত্র তৈরির ১৩ উপায়

সাজেদা হক

১. কিছু চরিত্র ব্যতিক্রমী করুন:

আপনার কথাসাহিত্যের কিছু চরিত্রকে ব্যতিক্রমী করুন। বিশেষ কোন গুন, ক্ষমতা বা অন্যকোন বিবরণ দিয়ে তাকে পাঠকের কাছে আকর্ষনীয় করে তুলুন। তা অতিভৌতিক কিছু হতে হবে এমন নয়, বরং খুব সাধারণ কেউ একজনও হতে পারে, যিনি রান্নায় সেরা, কিংবা গানে, নাচে, বিতর্কে সেরা। সাধারন কোন মানুষের অসাধারণ গুনকে তুলে ধরতে পারেন এক্ষেত্রে। বলা তো যায় না, এমন পাঠকও থাকতে পারেন, যিনি নিজেও খুব সাধারণে কিছুকেই পেশা হিসেবে বেছে নেয়ার কথা ভাবছেন, কিন্তু বলতে পারছেন না। আপনার চরিত্র তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারে।



২) অন্য চরিত্রগুলোকেও সম্মান দিন:

প্রধান যে চরিত্রটি আপনার কথাসাহিত্যকে প্রতিনিধিত্ব করছে তাকে গল্পের অন্যান্য চরিগুলোকে সম্মান দিতে দিন। এতে করে পাঠকের সাথে আপনার প্রধান চরিত্রের একটি সম্মানজনক সম্পর্ক প্রতিস্থাপিত হবে। প্রধান চরিত্র যদি সাহিত্যের অন্যান্য চরিত্রগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল হন, তাহলে লেখক হিসেবে আপনার মর্যাদাও বাড়ে। কথায় আছে না, সম্মান দিলে সম্মান বাড়ে।


৩) ভাল চরিত্রকে দিয়ে খারাপ, আর খারাপ চরিত্র দিয়ে ভালো কাজ করুন:

আপনার লেখন শৈলীতে কৌশল অবলম্বন করুন। পাঠক যেনো আপনার বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শুরু করে শেষ পাতা অব্দি পরার জন্য মুখিয়ে থাকেন। এর একটি ভালো কৌশল হলো, আপনার গল্পের বা উপন্যাসের ভালো চরিত্রগুলোকে দিয়ে খারাপ কিছু, এবং খারাপ চরিত্রগুলোকে দিয়ে ভালো কিছু কাজ করিয়ে নিন। এতে করে পাঠক একধরণের আবিস্কারের নেশায় বুদ হয়ে থাকবেন। গল্পের পরবর্তী অংশে কি আছে তা তিনি আগে থেকেই অনুমান করতে পারবেন না। সুতরাং তিনি আকর্ষিত হবেনই।



৪) চরিত্রগুলোর বাচন ভঙ্গি নির্দিষ্ট করুন:

আপনার প্রত্যেকটা চরিত্রের বাচন ভঙ্গি নির্দিষ্ট করুন। পাচটি ভিন্ন চরিত্রের পাচ ধরনের কথা বলার স্টাইল তৈরি করুন। চরিত্রগুলোর নিজস্বতা তৈরি করুন। যাতে আপনার পাঠক একবাক্যেই বলতে পারেন, এই ধরণের কথা আপনার কোন চরিত্রটি বলতে পারে।



৫) আপনার চরিত্রকে অনাদি করুন:

গল্পের চরিত্রগুলোর নির্মাণ এমনভাবে করুন যেনো পাঠক তাকে মনে রাখেন গল্প শেষ হওয়ার পরও। যে চরিত্রগুলো মরে গিয়েও পাঠকের হৃদয়ে বেচে থাকবে। সেটা শারিরিক বেচে থাকা নাও হতে পারে, হতে পারে পাঠকের বিশ্বাসে বেছে থাকবে আপনার অঙ্কিত চরিত্রটি। চরিত্রগুলোর কাজ, বিশ্বাস-চিন্তা-চেতনাকে এমন ভাবে মেলে ধুরন যেনো সেগুলো অমরত্ব পায়। উদাহরণ হিসেবে আবারো সংশপ্তকের কথা বলবো। কিংবা লালসালুর মজিদের কথা, চিলেকোঠার সেপাইয়ের কথা। সেইসব চরিত্রেকে কে ভুলতে পেরেছে বলেন?


৬) চরিত্রকে আবেগ দিন:

আবেগী মানুষই আকর্ষণীয়। যারা কেবল নিজেরই নয়, অন্যের দু:খ-কষ্ট, হাসি-কান্না-আনন্দ-বেদনাকে সমানভাবে অনুভব করেন, তাকে বা তাদেরকে ভালোবাসেন সবাই। সুতরাং পাঠকের এই দুর্বলতাটাকে কাজে লাগান। আপনার অঙ্কিত চরিত্রকেও আবেগ দিন। সেও যেনো আবেগী হয়ে পাঠকের অন্তরে ঢুকে পড়েন। যেখানে কেবল যাওয়া আছে-আসা নেই! কি হলো তো?


৭) চরিত্রকে শুধু আবেগ নয় আবেশও দিন:

চরিত্রে শুধু আবেগ দিলেই হবে না, চরিত্রকে একটি ঘোরের মধ্যে রাখুন। চরিত্রের মধ্যে ঘোর বা আবেশও পাঠকের কাছে বেশ আকর্ষণীয়। চিরিত্রটি ঠিক কি করতে যাচ্ছে এটা পাঠক বুঝে চরিত্রকে নেশাগ্রস্থ করে তুলুন। এজন্যই মনে হয় কবি নজরুল লিখেছিলেন,


‘মোর ঘুম ঘোরে এলে মনোহর
নমঃ নমঃ নমঃ
শ্রাবন মেঘে নাচে নটবর
রমঝম রমঝম রমঝম।
মোর ঘুম


শিয়রে বসি চুপি চুপি চুমিলে নয়ন

মোর বিকশিল আবেশে তনু
নীপসম, নিরুপম, মনোরম।
মোর ঘুম


মোর ফুল বনে ছিল যত ফুল,
ভরি ডালি দিনু ঢালি দেবতা মোর,
হায় নিলে না সে ফুল,
ছি ছি বেভুল,


নিলে তুলি খোপা খুলি কুসুম ডোর।
স্বপনে কি যে কয়েছি তাই গিয়াছো চলি
জাগিয়া কেঁদে ডাকি দেবতায়
প্রিয়তম প্রিয়তম প্রিয়তম’


৮) চরিত্রকে আধ্যাত্মিক গুনাবলী সম্পন্ন করুন:

অতীত সব সময়ই আমাদের পিছু নেয়। বলা চলে অতীতই আমাদের তাড়িত করে, চালিত করে। ধরেন ছোটবেলায় যদি আপনার কোন চরিত্র লজ্জাকর পরিস্থিতির শিকার হন, যববেলার কিন্তু তার প্রভাব পড়বেই। সুতরাং যত বেশী অতীত জানবেন চরিত্রের বর্তমান ততবেশি পরিস্কার থাকবে আপনার কাছে। এটা ব্যবহার করুন আপনার কথাসাহিত্যেও। দেখবেন কতটা আকর্ষক ও টানটান উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছেন পাঠক তো বটেই, আপনি নিজেও।


৯) আপনার চরিত্রকে অভিব্যক্তি দিন:

শুন্যে কারো স্থান নেই। কেউ শূণ্যে বসবাস করতে পারে না। সুতরাং আপনার চরিত্রকেও অভিব্যক্তি দিন। কেউ উতকৃষ্ট তো কেউ নিকৃষ্ট। কেউ মুক্তমনা তো কেউ অন্তর্মূখী। কেউ সাহসী তো কেউ ভীতু, কেউ শক্তিশালী তো কেউ দুর্বল কেউ ভীষণ আধ্যাত্মিক তো কেউ একদম নাস্তিক। এবার ভাবুন, আপনার চরিত্রে অন্যদের সম্পর্কে কি ভাবে? আর আপনার চরিত্রে সম্পকেই বা অন্যরা কি ভাবেন?


১০) চরিত্রের চাহিদা নির্নয় করুণ:

মনের ইচ্ছা-আকাঙ্খাই পরিচালিত করে মানুষকে। অর্থাত মন আমাদের নিয়ন্ত্রক। সুতরাং আপনার চরিত্রের ইচ্ছা কি তা নির্নয় করুন। নির্দিষ্ট করুন। কারন এই ইচ্ছেগুলোতেই গল্প লুকিয়ে থাকে। বলা চলে একেকটা ইচ্ছে, এক একটা গল্প।


১১) চরিত্র ভয় পায় যে জিনিসে, তা স্থির করুন:

চাওয়া-পাওয়ার মাঝে একটা ভয় থাকে। আপনার চরিত্রের সেই ‘ভয়’ টাকে নির্নয় করুন। সেই ‘ভয়’কে জয় করার গল্পটাই তুলে ধরুন পাঠকের সামনে। তারপর দ্যাখেন কি হয়!


১২) চরিত্রের প্রভাব পড়ুক জীবনে এবং ব্যক্তিত্বে :

চরিত্রের শারিকি বর্ননা কেবলই বিরক্তিকর। কিন্তু সেই বিরক্তিকর বর্ননাই যদি তার জীবনের সাথে, ব্যক্তিত্বের সাথে প্রত্যেক্ষ বা পরোক্ষভাবে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে সেটিই বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। যেমন: যেকোনো মুদ্র দোষ। কারো হয় দাত দিয়ে নখ কাটার অভ্যেস। এটা শুরুতেই পাঠকের কাছে তেমন আকর্ষনীয় কোন বিষয় নয়, বরংবিরক্তিকর কিছু। কিন্তু যদি এই অভ্যেস এর কারণেই খুবই বুদ্ধিমান কেউ খুনী হিসেবে প্রমাণিত হন? তখন? সাধারণ এই অভ্যাসই পাঠকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। অনেক রহস্য উপন্যাসে আমরা এমনটা দেখি, যে মূল হতাকারীকে ধরতে প্রধান চরিত্র তার বিভিন্ন অভ্যাসকে পর্যবেক্ষনে নেন। শুধু হত্যা রহস্যের বেলায় কেন, রোমান্টিক কোনো কাহিনীতেও চরিত্রের চেহারার বর্ননা, ব্যক্তিত্বের প্রভাব পরবর্তী সময়ে পড়েছে।


১৩) চরিত্রকে 'দাগী' করে তুলুন:

এখন পর্যন্ত আমরা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে জানি, এবং অন্যরাও তা জানে। আবার এমন অনেক বিষয় আছে যা আমরা জানি কিন্তু অন্যেরা জানেনা। আবার এমন অনেক বিষয় আছে আমাদের সম্পর্কে যা অন্যে জানে, কিন্তু আমরা নিজেরা জানি না। এটা মুলত স্ব উপলদ্ধি এবং অন্যদের উপলদ্ধি মধ্যেকার ফাকটাকে বোঝানো হচ্ছে। আর এই ফাক-ফোকরই নের্তৃত্ব দিতে পারে অসাধারণ ও মৌলিক একটি কথাসাহিত্যের।

লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন