শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

গল্প নিয়ে আলাপ : শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প--পরী

সাজেদা হক

বিপিনবিহারী বিশ্বাস (রায়বাহাদুর)। বেহালা বাদক। গালে পাকা দাড়ি, সাদা ভ্রু। ইংরেজিতে অনার্স। চ্যালেঞ্জ ভালোবাসে। লেখকের ধারণা এখন বিপিন রিটায়ার্ড ও সংসারে বাতিল।

লেখক থাকেন একটা খালের পাড়ে। তিনি একদিন আমন্ত্রণ জানালেন বিপিনবাবুকে। বিপিনবাবু এলেন। সঙ্গে বেহালার বাক্স। লেখকের এক ছেলে, এক মেয়ে আর বউ। তার বউ এমন হুটহাট লোক নিয়ে আসা বিষেশ পছন্দ করেন না। কিন্তু বিপিনকে খেতে বসবার পর, বেশ এটা ওটা এগিয়ে দিলেন।


বিপিনবাবু লেখককে বললেন, ‘এই রাগিনী মাঘী পূর্নিমায় সারারাত দিঘির পাড়ে বসে বাজাতে পারলে পরী নামানো যায়। বিপিনবাবু একটু থমকে গেল, তারপর বেহালাটা কাধে তুলে নিল, খানিক্ষণ ছড় ঘষাঘষি করে একটা খুব ভারি রাগের মধ্যে ছড়সুদ্ধ জল হাত মাথা ডুবিয়ে দিল, ‘এই রাগটা বাজিয়েছিলাম’।

এক সময় লেখক বললেন, ‘পরী নেমে আসবে না তো’?
বাজনা না থামিয়েই বিপিনবাবু বললেন, ‘নামতেও পারে’।

বিপিনবাবু বাজাতে বাজাতে শুয়ে পড়েছেন প্রায়। নারকেল পাতাগুলো জোস্না ছিড়ে ছিড়ে দুলছে। পৃথিবীতে এখন কোনও অশান্তি নেই। বিপিনবাবু খুব জম্পেশ করে বাজাচ্ছিল।

‘ওই যে! নড়বেন না। এসেছে’- ছড় থামেনি বিপিনের।

বললাম, ‘কোথায়’?

‘বাগানে’-

‘দেখলেন’?

বললাম, ‘একদম স্পষ্ট’।

........

গল্পটিতে অনেক ছোট ছোট ঘটনার বর্ননা। বলা যায় লেখকের বউ, ছেলে-মেয়ের জীবন। তার উপর তার প্রভাব। লেখকের চাকুরী জীবনের কিছু স্মৃতিচারণ। প্রতিবেশী কিংবা অন্যান্য কিছু চিন্তাসহ বেশ কয়ৈকটি ঘটনার বর্নণা রয়েছে। কিন্তু মূল ঘটনা একটিই। বেহালা বাদকের পরী নামানোর ঘটনার বিশ্বাসটা। এই পরী নামানোটাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে গল্পটি। এটাই মূল ঘটনা কারণে এই পরী নামানোকে কেন্ত্র করে বিপিন বাবু অর্থাত বেহালা বাদক নিজের জীবিকা নির্বাহ করেন। পরী নামানোর এই ঘটনাটি তিনি নিজেও বিশ্বাস করেন এবং অন্যদেরকেও বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করেন্।

এই গল্পে চরিত্র মূলত ৪টি। একটি অশরীরী্। এছাড়া বিপিনবাবু, নিজে বেহালা বাদক। লেখক স্বয়ং, তার স্ত্রীসহ। এবং পরী, কল্পিত এক নারী চরিত্র। যাকে বিপিন দেখেছে একভাবে, লেখক দেখছেন একভাবে।

গল্পে বিপিন এর চরিত্রটি বেশ সরল আবার রাশভারীও বটে। সরল এই কারণে যে সে বাজনা বাজিয়ে পরী নামাতে পারে-এমন একটা বিশ্বাস লালন করে। যা কখনই সম্ভব নয়। অবাস্তবকে বাস্তব ভাবার এক অসাধারণ ক্ষমতা আছে বিপিন চরিত্রটির। সে কারণেও বিপিন একটি অনণ্য চরিত্র।

লেখক নিজে একজন উপকারী চরিত্র হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন। তিনি সৌখিন কিন্ত স্বচ্ছল না। সচেতন কিন্তু লোভী নন। একই সাথে তিনি বোঝেন কিন্তু কারো ভূল ভাঙ্গিয়ে দেন না। যেমন গল্পের শেষে যখন বিপিন পরী দেখতে পেল, তখন এটা যে পরী না, তা জেনেও বিপিনের ভুল ভাঙ্গিয়ে দেন নি তিনি।

লেখকের স্ত্রী। একাধারে সরল এবং সংসারী। তিনি নিজের সংসার ছাড়া, ছেলে-মেয়ে-স্বামীর মঙ্গল ছাড়া আর কিছুই চিন্তা করেন না।

পরী। একটি কাল্পনিক চরিত্র। চিন্তার আরামদায়ক একটি চরিত্র। পুরুষশাসিত সমাজ ব্যবস্থায় গতানুগতিক একটি উপশমের চারিত্রিক বর্ননা হলো পরী চরিত্রটি। শীতের জোস্না রাতে পরীর উপস্থিতি তাই পুরুষরুপী বিপিন ও লেখককেও আবেগী করে তোলে।

চরিত্রগুলোর মধ্যে প্রধান চরিত্রটি হল পরীর বলে মনে হয় আমার। কারণ পরীর অশরীরী উপস্থিতিও গল্পের প্রধান দুই পুরুষ চরিত্রকে আন্দোলিত করছে। অশরীরী হয়েও বেশ সরব উপস্থিতি পরী চরিত্রটির। তাই এটিই গল্পের প্রধান চরিত্র বলে আমার মনে হয়েছে।

এই গল্পটিতে চেতনাগত সংঘাত ছিল। বিশ্বাসের সংঘাত। লেখক বেশ আধুনিক চিন্তা-চেতনার মানুষ। কথাপিও বিপিনের ‌’পরী’ বিষয়ক ব্যাপারটিতে তার সায় চেতনাগত সংঘাতের কারণ বলে আমার মনে হয়ে। তাই লেখক হিসেবে গল্পে একটি মানসিক দ্বন্দ্ব বা সংঘাত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয়। তবে হ্যা, সংঘাত বা দ্বন্দ্ব মোচনে যে পরিমান টান টান উত্তেজনা অনুভব করার কথা, পাঠক হিসেবে সেটা আমি অনুভব করিনি। হতে পারে এটা আমার সীমাবদ্ধতা। তবে লেখকেরও আরো একটু সচেতন থাকা দরকার ছিল বলে আমি মনে করি।

গল্পটা শুরুর চেয়ে শেষটা ভালো হয়েছে। শেষ হতে হতে আকর্ষণ বেড়েছে। শুরুতে মনে হচ্ছিল, সমন্বয়হীনতায় ভুগছেন লেখক। মনে হচ্ছিলো অনেক ফুলে মালা গাথার চেষ্টা চলছে, কিন্তু হচ্ছে না। শেষের দিকে এসে সমন্বয়টা করতে পেরেছেন লেখক। এখানে উদাহরণ হিসেবে ছেলে-মেয়ের চরিত্র নিয়ে বিষয়টার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে।

এই গল্পটিতে সংলাপ অনেক কম। বর্ননানির্ভর গল্প, অনেকটা কাল্পনিক। তবুও অসামঞ্জস্য নয়।

গল্পের মূল ঘটনার চেয়ে প্রকৃতি, পরিবেশের বা ঘর-দোরের বর্ণনা বেশি মনে হয়েছে। মনে হয়েছে এই এতো বর্ণনা না হলেও চলতো? কিছুটা বোরিংও বটে।

গল্পটি সত্যি ঘটনা মনে হয়েছে। যারা গ্রাম-গঞ্জে গান-বাজনা করে বেড়ান, তারা আসলে স্বপ্ন ফেরি করে বেড়ান। গ্রামের সেই সারল্য এই গল্পটিতে ছিল। সেকারনেই এই গল্পটিকে সত্যি মনে হয়েছে।


শেষ পর্যন্ত এই গল্পটির কাহিনী, চরিত্র অনেকদিন মনে থাকবে আমার। লেখক হিসেবে অনেকটাই স্বার্থক। মানুষ কল্পকাহিনী বিশ্বাস করে, মুথে স্বীকার না করলেও মনে মনে সব ধরণের অশরীরী সবকিছুকেই বিশ্বাসও করে। মানুষের স্বভাবজাত এই বিশ্বাসটিকেই পুজি করেছেন লেখক, এবং তিনি স্বার্থকও হয়েছেন।

লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন