শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

মোজাফ্ফর হোসেন-সাহিত্যের কাজ অকাজ


ক.
এই প্রবন্ধের শুরুতেই প্রয়োজন পড়ে সাহিত্য কি সেই বিষয়টা আবার একটু নতুন করে খোলসা করার। যদিও এক সিপি নীল জল দিয়ে সমুদ্র চেনানো আর সংজ্ঞা দিয়ে সাহিত্য বোঝানো একই ধরনের ব্যর্থ চেষ্টার নামান্তর। এতে বিষয়টি চেনাতে বা বোঝাতে গিয়ে আরো বিপদে ফেলে দেওয়া হয়। আর ‘না জ্ঞান’ যে ‘উল্টো জ্ঞান’র চেয়ে মঙ্গল সেটা কে না জানে! কাজেই সে পথে না এগিয়ে সাহিত্য নিয়ে একটু আড্ডা দেওয়া চলে। সাহিত্য বোঝার জন্য আমরা সাহিত্যবিদ্বেষী টমাস গ্রাডগ্রিন্ডের কাছে চলে যাবো। চার্লস ডিকেন্স-এর ‘হার্ড টাইম’ উপন্যাসের শুরুর অধ্যায়ে উপযোগবাদী রাজনীতিবিদ টমাস গ্রাডগ্রিন্ড তার আদর্শ স্কুলের শিক্ষকদের বলে দেন যেন, ছাত্ররা তাদের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করতে না শেখে। 'teach these boys and girls nothing but facts. Facts alone are wanted in life’. [‘Hard Time’] গ্রাডগ্রিন্ড সাহেব তার কথার কোথাও সাহিত্য শব্দটা উচ্চারণ না করলেও আমাদের বুঝে নিতে সমস্যা হয় না যে তিনি চরমভাবে সাহিত্য বিদ্বেষী, বিদ্বেষটা তার জীবন সম্পর্কে মাপাজোকা ধারণা থেকেই এসেছে।


গ্রাডগ্রিন্ড-এর ঠিক বিপরীত সত্যটা জানতে এবার আমরা হাজির হবো অন্য একটা স্কুলে। এই স্কুলের (‘ডেড পোয়েটস সোসাইটি’) শিক্ষক-এর ভূমিকায় থাকা রবিন উইলিয়ামস তার ছাত্রদের শোনালেন একেবারে ভিন্ন কথা। তিনি বললেন,

'We don’t read and write poetry because it’s cute. We read and write poetry, we are members of the human race. And the human race is filled with passion. Medicine, Law, Business, Engineering; these are Nobel parsuits and nessary to sustain life. But Poetry, Beauty, Romance, Love; these are what we stay alive for.’


এখন এই দুই বায়বীয় স্কুল থেকে আমরা জীবন সম্পর্কে দুটো ধারণা পেলাম, এখান থেকে আমরা অনায়াশে সাহিত্যের প্রাথমিক চরিত্রটা দাড় করাতে পারি। এই চরিত্রের কতগুলো উপাদান বা চারিত্রিক বৈশিষ্ট আছে। কল্পনাশক্তি তার মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে। এরপরেই আসে ভাষা। বায়বীয় গল্প বা কতগুলো বিমূর্ত জীবনকে মূর্ত করে তোলা হয় ভাষার সাহায্যে। ভাষা এখানে ইট-চুন-সুড়কির কাজ করে। কাজেই সাহিত্য হতে হলে তার একটি লিখিত রূপ থাকা অনিবার্য। সাহিত্যের ভাষাটা হতে হবে পাউ- যে রকম বলছেন, 'Literature is language charged with meaning.’, সে রকম। মানে শব্দগুলোর শরীর বলবে এক কথা, অন্তর আরেক; যাকে বলা হয় ‘মেটাফর অব লাঙ্গুয়েজ’। সাহিত্যে এর পরের কলকব্জা হল ফর্ম বা কাঠামো। এর সাথে জড়িয়ে আছে কিছু অনুসঙ্গ; যেমন: প্লট ও সেটিং। যেনতেন করে কোনকিছু প্রকাশ করাটা সাহিত্য না। সাহিত্যে কি প্রকাশ করা হল তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ন কিভাবে প্রকাশ করা হল। স্টপফোর্ড ব্রুক-এর বক্তব্যটা এখানে ধার নেওয়া যায়:

'writing is not literature unless it gives to the reader a pleasure which arises not only from the things said, but from the way in which they are said’.

এতক্ষণে কল্পনাশক্তি, ভাষা ও কাঠামো এই তিনটা উপাদানের সম্পর্ক স্থাপনকে আমরা সাহিত্য বলতে পারি। কিংবা অন্যভাবে বললে, এই তিনটা উপাদানের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ঠ তৃতীয় সত্তাকে সাহিত্য বলা চলে।


খ.
প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে--খুব চিরায়ত, চিরন্তন গল্প। মোটাদাগে সেই গল্পটা লিখে ফেলা সাহিত্যের কাজের মধ্যে পড়ে না। যে গল্পটা তৈরি, সেটা সাহিত্য না। মানে দশজন লিখলে যদি দশরকম সম্ভাবনা বের হয়ে না আসে তবে সেটা গল্প বটে কিন্তু সাহিত্য না। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রধান কাজ হল ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। ব্যক্তির সেই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে বিদ্যমান থাকতেও পারে, নাও পারে। মার্ক টোয়েন যথার্থই বলছেন -- 'Fiction is obliged to stick to possibilities, Truth isn’t.’ সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করার জন্যই রবার্ট ফ্রস্টকে হাঁটতে হয়েছে যে পথে মানুষ কম হেঁটেছে সেই পথে। ('Two Roads Diverged in the Wood and I’ I took one less Traveled by. And that has made all the Difference’.)


যদি সম্ভাবনা থেকেই সাহিত্য হয় তাহলে সাহিত্য জীবনের সরাসরি বা হুবহু দর্পণ না। এরিস্টটলের ‘আর্ট ইজ ইমিটেশন অব লাইফ’ এ ইমিটেশনের মাত্রা নিয়ে গ-গল দেখা দেয়। যদি অস্কার ওয়াইল্ড-এর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলি-- 'literature always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose’--তাহলে ইমিটেশনের অর্থটা এখানে বুঝে নিতে সমস্যা থাকে না। একটু ভেঙ্গে বললে, সাহিত্য হল অন্য এক বাস্তবতা যেখানে বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রদের পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। তাই ক্ষেত্রবিশেষ বাস্তবের চরিত্ররা হয়ে ওঠে বায়বীয় চরিত্রদের ছায়া বিশেষ। এই অর্থে দুইটা জগত আলাদা আবার অভিন্নও। সাহিত্য ও জীবনের সম্পর্কটা এমনই দ্বন্দ্বমুখর বা প্যারাডোক্সিক্যাল।

সাহিত্য অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্যের মাঝে যে অস্পষ্টতার প্রজ্ঞা তা থেকেই নিজের প্রজ্ঞাকে বের করে আনে। সাহিত্য প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করে চলে ব্যক্তির সম্ভাবনাকে। সত্য আবিষ্কার করা সাহিত্যের কাজ না, এখানেই বিজ্ঞানের সাথে সাহিত্যের বিরোধ। যে সাহিত্যে আবিষ্কার নেই তার প্রয়োজন মূল্য নিতান্তই কম। কুন্ডেরা তাকে বলছেন-- ‘অনৈতিক সাহিত্য’ (দি আর্ট অব নভেল)। অর্থাৎ নতুন কিছু আবিষ্কার করা সাহিত্যের নৈতিকতার মধ্যে পড়ে। রবার্ট ফ্রস্টও অক্টাভিও পাজকে একই কথা বলছেন-- ‘প্রত্যেক কবির জন্মই হয় নিজস্ব কিছু বলবার জন্যে। তার আদি কর্তব্য হল পূর্বজদের অস্বীকার করা...।’ (কবিকে দেখতে যাওয়া) এখন প্রশ্ন হল, সাহিত্যে বিদ্যমান জীবনকে কীভাবে ব্যবহার করতে হবে? হুবহু জীবন থাকবে নাকি গল্প হবে কল্পনাপ্রসূত? যে কোনো একটির একচেটিয়া আধিপত্য সাহিত্যের জন্যে স্বাস্থ্যকর নয়। দুটোর যথাযথ বা গাণিতিক বিক্রিয়া ঘটাতে হবে। সেই কথায় জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছিলেন, “পোস্টমাস্টারটি আমার বজরায় এসে বসে থাকত। ফটিককে দেখেছি পদ্মার ঘাটে। ছিদামদের দেখেছি আমাদের কাছারিতে। ওই যারা কাছে এসেছে তাদের কতকটা দেখেছি, কতকটা বানিয়ে নিয়েছি।” অন্যত্রে লিখেছিলেন, ‘আমার গল্পে বাস্তবের অভাব কখন ঘটে নি। যা কিছু লিখেছি, নিজে দেখেছি, মর্মে অনুভব করেছি, সে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।’ ফকনার একই কথা একটু ঘুরিয়ে বলছেন-- ‘গল্পটা (‘দ্য রোজ ফর এমিলি’) কল্পনা থেকে এসেছে। কিন্তু ঐ বাস্তবতা চারপাশে বিদ্যমান। গল্পটা নতুন কোনো বাস্তবতাকে আবিষ্কার করেনি। তরুণীরা কাউকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখে-- সংসার চায়, সন্তান চায়-- এটা আমার আবিষ্কার না। কিন্তু ঐ মেয়েটির (এমিলি) যে নির্দিষ্ট ট্রাজিক পরিণতি সেটা আমার তৈরি।’ (অনুবাদ: বর্তমান আলোচক)

ফকনার ১৯৫৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আমেরিকান ফিকশনের ওপর গ্রাজুয়েটদের ক্লাসে বলেছিলেন:

‘আমার মতে তুমি যাই অনুধাবন করতে পারো তাই অভিজ্ঞতা। এটা বই থেকেও আসতে পারে। এটা এমন বই, এমন গল্প এবং এতই জীবন্ত যা তোমাকে নাড়িয়ে দেয়। আমার মতে এটা তোমার অভিজ্ঞতা সমুহের একটি। এমন নয় যে ঐ বইয়ের চরিত্রগুলো যা করে তা করে অভিজ্ঞতা নিতে হবে। চরিত্রগুলোর কাজগুলো যদি বাস্তবসম্মত মনে হয়, এবং মনে হয় মানুষ এমনটিই করে তাহলে এটা অভিজ্ঞতার ভেতর পড়ে। তাই আমার কাছে অভিজ্ঞতার সংজ্ঞা এই, অভিজ্ঞতার বাইরে লেখা সম্ভব নয়। কারণ তুমি যা পড়, শুন, অনুভব কর, কল্পনা কর-- এ সবই অভিজ্ঞতার অংশ। [তর্জমা: সাবিদিন ইব্রাহিম]

এখানেই স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যে, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা এ-দুটোর বিক্রিয়া ঘটলেই সাহিত্য নামধারী তৃতীয় পক্ষ এসে হাজির হয়। কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক প্রায়ই বলেন যে তিনি দেখার বাইরে কিছু লেখেননি। এই কথা অনেকে বলেছেন। বলছেন। এই দেখা মানেই আক্ষরিক অর্থে সেই জীবনটা যাপন করা নয়। একজন লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি বলে অনেকগুলো জীবন যাপন করেন। কাজেই দেখা যায়--একজন রিকশাচালকের জীবন ঐ রিকশাচালকের চেয়ে ভাল বোঝেন একজন লেখক। এজন্যে দেখার অনেকগুলো দৃষ্টি না থাকলে যা লেখা হবে সেটা হবে খবরের কাগজের খোরাক, সাহিত্য না। আবার সব অভিজ্ঞতা আমাদের দৃষ্টি দিয়ে আসে না। যেমন: আমরা কোনোদিন শিকারে যাইনি, শিকার করা দেখিওনি। কিন্তু শিকার করা বিষয়টা ধরতে পারি। ছোটবেলায় মুরব্বীদের কাছে শিকারের গল্প শুনে খানিকটা আন্দাজ করেছি, খানিকটা জীবজগতের স্বাভাবিক প্রবণতা দেখে বুঝে নিয়েছি। কিংবা এক্ষেত্রে ডেকার্ত যেটা ‘our innate ideas form the basis of our experience of reality’ সেটাকেও সত্য বলে ধরে নিতে পারি। ঘটনা যায় হোক--সাহিত্যে প্রত্যক্ষণ অভিজ্ঞতা সবসময় না থাকলেও চলে কিন্তু জ্ঞানটা প্রয়োজন।


গ.
সাহিত্যের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তির ইন্দ্রিয় বা চেতনাকে জাগিয়ে তোলা। সাহিত্য সৃষ্টি মানেই একটা স্বাধীন সত্তার সৃষ্টি করা। সত্তা থেকেই উৎসারিত হবে অসীম সম্ভাবনাময় চেতনার। বলে রাখা ভাল নৈতিকতা আর চেতনা একজিনিস নয়। নৈতিকতার চর্চা করা নীতিশাস্ত্রের কাজ। সাহিত্য এখান থেকে যত দূরে থাকে ততই মঙ্গল। তার মানে কি সাহিত্যের নৈতিকতা বলে কিছু নেই? আছে, তবে সেটা ভিন্ন অর্থে। নৈতিকতা আপেক্ষিক। আপেক্ষিক সত্যকে সাহিত্য চরম সত্য বলে মান্য করে না। সাহিত্যর জন্মই অনেকগুলো আপেক্ষিক সত্য থেকে। নৈতিকতার সংজ্ঞা সবসময় নির্ধারিত হয় একটি শ্রেণির হাতে। সাহিত্য কোনো শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে না। নীতিশাস্ত্র করে। বস্তুত, সাদা বাংলায়, সাহিত্য কারোরই প্রতিনিধিত্ব করে না। উপন্যাসিক সুসান সোনটাগ তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলছেন, ‘একজন সিরিয়াস লেখক নিজের ছাড়া অন্য কারো মুখপাত্র নন। এখানেই সাহিত্যের মহত্ত্ব’। [অনুবাদ: বর্তমান আলোচক, সূত্র: প্যারিস রিভিউ] কুন্ডেরা বলছেন, ‘ঔপন্যাসিক কারই মুখপাত্র নন। এমনকি নিজের ভাবনারও মুখপাত্র নন।’ [অনুবাদ: দুলাল আল মনসুর, ‘দ্য আর্ট অব নভেল’, কাগজ প্রকাশন, ২০০৭] অবশ্য কিছুকাল আগের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। সাহিত্যিকরা তখন জাতির বিবেক বলে বিবেচিত হতো। ‘ডিকেন্স, দস্তয়ভস্কি এবং তলস্তয় লিখেছিলেন উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণিদের জন্যে। উনিশ শতকে গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের উপন্যাসগুলো জাতীয় দৈনিকগুলোর শিল্প ও সাহিত্য পাতায় প্রথম প্রকাশিত হতো কারণ মনে করা হতো তাঁরা সমগ্র জাতির উদ্দেশ্যে কিছু বলছেন।’ (ওরহান পামুক, তুমি কার জন্যে লেখো, অনুবাদ: বর্তমান আলোচক) কিন্তু বহুমুখী মিডিয়ার বিস্তারের সাথে সাথে লেখকদের দায়বদ্ধতা গেল কমে। এখন মানুষ মূল খবরটাই জানতে চায়। ঘরে বসে সমগ্র বিশ্ব দেখা যায়। তাই সাহিত্যিকরা আর সামাজিক মুখপাত্র থাকলেন না। সাহিত্যের কাজ গেল বদলে। সাহিত্যের এই কাজ বদলের মুহূর্তে সাময়িকভাবে সাহিত্যের মৃত্যু ঘোষণা করলেন কেউ কেউ। বিখ্যাত দার্শনিক-লেখক হোসে ওর্তেগা, জার্মান ভাবুক ভাল্টার বেনিয়ামিন, কথাসাহিত্যিক রোলাঁ বার্থ, গোর বিধাল, জন বার্থ--এইসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা উপন্যাসের সম্ভাব্য মৃত্যু নিয়ে শঙ্কায় পড়ে গেলেন। কিন্তু সাহিত্য নতুন মোড় নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। সাহিত্য আবির্ভাব হল সত্যকে চিনবার চেতনা হিসেবে। ফুয়েন্তেস যাকে বলছেন, ‘সর্বজনীন মানবিক বৈশিষ্ট্য’কে দাড় করানো। ব্যক্তি সত্যকে নিজ আলোয় চিনে নেবে, সাহিত্য সেই আলোর যোগানদাতা মাত্র। সাহিত্য ভাল-মন্দকে প্রচলিত মানদণ্ডে বিচার না করে শুধুমাত্র ভাল বা মন্দের এসেন্সকে বা ধারণাকে তুলে ধরবে। সৌন্দর্য ও কদর্যতার ক্ষেত্রেও বিষয়টি অভিন্ন।

নীতিশাস্ত্রের মতো দর্শনের সাথেও সাহিত্যের বিরোধ আছে। সাহিত্যের কাজ দার্শনিক সত্য প্রতিষ্ঠা করা নয়। সাহিত্য দর্শনের চেয়ে অনেক সরল ও জীবনমুখী একটা মাধ্যম। এখানে পণ্ডিত ও অপণ্ডিত দুজনেরই সমান অধিকার। দর্শনের ভিত্তি হল জ্ঞান ও যুক্তি। কুন্ডেরা উপন্যাসের ভিত্তি হিসেবে দাড় করিয়েছেন ‘চিন্তাপ্রবণ প্রশ্ন’কে। যে সকল দার্শনিক শিল্পকে দার্শনিক এবং তাত্ত্বিক ধারার পরবর্তী রূপ বলে মনে করেন তাদের সাথে দ্বিমত কুন্ডেরার। কেননা তিনি বলছেন: ‘উপন্যাস ফ্রয়েডের পূর্বেই অচেতনতা নিয়ে কথা বলেছে, মার্ক্সের পূর্বে শ্রেণিসংগ্রামের কথা বলেছে, ইন্দ্রিয়তাত্ত্বিকদের পূর্বে ইন্দ্রিয়তাত্ত্বিক বিষয়ে কথা বলেছে।’ [তর্জমা: দুলাল আন মনসুর, ঐ] বটেই। ফ্রয়েড তাঁর ‘ইডিপাস কমপ্লেক্স’-এর ধারণা পান সফোক্লিস পড়ে। সফোক্লিস একটা সম্ভাবনাকে দাড় করিয়েছেন, ফ্রয়েড সেখান থেকে তাঁর দর্শনের উপাদান খুঁজে পেয়েছেন। হেগেল-এর দর্শনের মূলমন্ত্র (‘the opposing poles of a dichotomy define each other, and thus constitutive of one another’s identity’) আমরা খুঁজে পাই শেকসপিয়ারের ডাইনীদের কাছ থেকে--‘সুশ্রীই হল কুশ্রী! কুশ্রীই হল সুশ্রী!’ [ম্যাকবেথ, তর্জমা: আলোচক] একইভাবে হেলমারকে নোরা যখন বলে---'I don't believe that any longer. I believe that before all else I am a reasonable human being, just as you are--or, at all events, that I must try and become one. I know quite well, Torvald, that most people would think you right, and that views of that kind are to be found in books; but I can no longer content myself with what most people say, or with what is found in books. I must think over things for myself and get to understand them.’ [A Doll’s House’] --তখন অস্তিত্ববাদী ও নারীবাদী দার্শনিকরা যে সত্য তুলে ধরতে চান সেই সত্য নোরার জীবন দিয়ে আমরা উপলব্ধি করতে পারি। এভাবেই সাহিত্যে দর্শনের নানান অনুষঙ্গ সচেতন কিংবা অবচেতনভাবেই জীবনের নানান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। জীবনের সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। প্রয়োগের দিক থেকে সাহিত্যের সাথে দর্শনের সম্পর্ককে বোঝার জন্য দুই জগত বিখ্যাত কবির কাছ থেকে ঘুরে আসা যায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থ তাঁর ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করে আক্ষেপ করছেন এই বলে:

'that there hath past away a glory from the earth…/

At lenth the Man perceives it die away,

And fade into the light of common day.’ [Ode: Intimations of Immortality]

কোলেরিজ উত্তরে বলছেন:

'I may not hope from outward froms to win

The passion and the life, whose fountains are within.

Oh Wordsworth! We receive but what we give,

And in our life alone does nature live [Dejection: An Ode]

দেখা যাচ্ছে, ওয়ার্ডসওয়ার্থ-এর বেদনা বস্তুর বিদায়কে ঘিরে। কোলেরিজ বস্তুর সত্তাকে অবলম্বন করার জন্য তাঁকে পরামর্শ দিচ্ছেন। অর্থাৎ এখানে একজন বস্তুবাদী তো অন্যজন ভাববাদী। তারা সেটা দর্শন নয় কবিতার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করছেন। এভাবে দর্শনে প্রাণ স্থাপন করেছেন সাহিত্যিকরা। আবার দার্শনিকরা সাহিত্য থেকে সলিড দর্শনকে আলাদা করেছেন।



ঘ.
এতো গেল বোধের জায়গা। নির্বোধের বা বিনোদনের উৎস হিসেবেও সাহিত্যের আলাদা একটা কদর আছে। অনেকে মনে করেন, সাহিত্যের আসল কাজই এটা। বিনোদন-সাহিত্যের বাজার দরও বেশি। জনপ্রিয় সাহিত্যের ধারা বলতে পপ-লিট্রেচার বা বিনোদন-সাহিত্যকেই বোঝানো হয়। এটা মনের ব্যায়ামস্বরূপ কাজ করে। অনেকে মনে করেন, চলচ্চিত্র কিংবা সঙ্গীতের মতো নির্ভেজাল বিনোদন দেওয়া সাহিত্যের কাজ না। সাথে একটু শিক্ষাও থাকা চায়। হেনরি ফিল্ডিং মেজাজ কড়া করে বলছেন-- ‘অসৎ সঙ্গ শুধুমাত্র ব্যবহার নষ্ট করে। আর বাজে বই ব্যবহারের পাশাপাশি রুচিও নষ্ট করে দেয়।’ [‘অন রিডিং ফর আমুউজমেন্ট’, তর্জমা: বর্তমান আলোচক] মনোরঞ্জন করতে গিয়ে লেখকদের হেংলামি তিনি পছন্দ করছেন না। কেননা এই ধাঁচের সাহিত্য পাঠক তৈরি যেমন করে তেমন তাদের রুচিও নষ্ট করে। আমাদের দেশে হুমায়ুন আহমেদ এই ধারার প্রধান লেখক। তাঁকে নিয়েও এ বিতর্ক চলমান। অনেকে বলেন তিনি পাঠক তৈরি করেছেন, অনেকে আবার কথাটা উল্টে বলেন, তিনি আমাদের ধ্রুপদি সাহিত্যের পাঠক নষ্ট করেছেন।


সাহিত্যের আনন্দের সাথে জড়িত আছে শিক্ষা। কেননা কল্পনাশক্তি থেকে যেমন জ্ঞানকে আলাদা করা যায় না তেমন আনন্দ থেকে নির্দেশনাকেও আলাদা করা যায় না। ব্যক্তির অভিজ্ঞতা থেকে এই সত্যটা জেনে নেওয়া যাক। মালকম এক্স জেলে বসে উপলব্ধি করলেন যে নেতা হতে হলে তাঁকে ভাষায় দক্ষ হতে হবে। তারপর তিনি একের পর এক বই গিলতে থাকলেন। নতিজা তিনি স্বীকার করলেন এই বলে:

'i had never been so truly free in my life…new world opened to me, of being able to read and understand it.’ [the autobiography of Malcolm x, 1964s]

বোধ ও বিনোদন বাদে সাহিত্যের অন্য একটি জায়গা এখানে উন্মোচিত হল, তা হল জীবন। মপাসাঁ বলছেন:

'The serious writer’s goal is not to tell us a story, to entertain or to move us, but to make us think and to make us understand the deep and hidden meaning of events.’ (‘The Writer’s Goal’)

অর্থাৎ সাহিত্যের কাজ হল আনন্দ দানের পাশাপাশি গভীর থেকে জীবনটাকে আগলে দেওয়া। সাহিত্য করেও তাই। সমগ্র সিরিয়াস সাহিত্যজুড়ে আছে মানুষের সামাজিক ও মনস্তাত্বিক বিকলাঙ্গতা। এ-ধাঁচের সাহিত্যের কাজ হল মানুষের রোগ নির্ণয় করা। চিকিৎসা প্রদান করা সাহিত্যশাস্ত্রের আওতায় পড়ে না। মানুষের শরীর যেমন জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ছোট-বড় নানান সমস্যার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়, মনও তেমন ছোটবড় অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে কাল অতিক্রম করে। চিকিৎসা শাস্ত্র মানুষের শরীরের রোগ নির্ণয় করে, মনের করে সাহিত্য। গোটা বিশ্বসাহিত্য জুড়েই চলে আসছে এই প্রচেষ্টা। রবার্ট লুই স্টিফেনসন (‘ডক্টর জেকিল এন্ড মি. হাইড’-এ) দেখিয়ে দিলেন--মানুষের সত্তা মূলত দুই খণ্ডের--ভাল এবং মন্দ। একটা দুর্বল হলে অন্যটা সবল হয়ে ওঠে। কিংবা একটা সবল হলে অন্যটা দুর্বল হয়ে পড়ে। ‘মেটামরফোসিস’ ও ‘ডেথ অব ইভান ইলিচ’ দেখিয়ে দিল যে আধুনিক মানুষের সংকট শরীরে না মনে, মানে অস্তিত্বে। ‘সিস দ্য ডে’ ও ‘ডেথ অব এ সেলসম্যান’ ধরিয়ে দিল আধুনিক সমাজে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্কটা কোথায়। ‘থিংস ফল অ্যাপার্ট’, ‘হার্ট অব ডার্কনেস’, ‘এ প্যাসেস টু ইন্ডিয়া’ তুলে ধরলো মানুষের আধিপত্যবাদের প্রকৃতি। মানিক ও লরেন্স তুলে আনলেন যৌন ক্ষুধায় কাতর মানুষকে। ‘লিসিসট্রাটা’, ‘মাদার কারেজ’, ‘ডলস হাউস’, ‘জেন আয়ার’ ‘টেস..’, ‘হ্যান্ডসমেড’স টেল’, ‘ওয়াইভস এন্ড কুকুবাইন’ এসমস্ত নাটক ও উপন্যাসে তুলে আনা হল ভ- পুরুষক্রেন্দ্রিক সভ্যতার অসুস্থ জায়গাটাকে। ‘আউটসাইডার’, ‘দ্য ডাম্প ওয়েটার’ ও ‘ওয়েটিং ফর গোডুট’ আধুনিক জীবনের নিরর্থকতার প্রতি আঙুল উঠাল। বালজাক, ফ্লবেয়ার, রিচার্ডসন, মান, দস্তয়ভস্কি, হেমিংওয়ে, হুগো, গোর্কি প্রভৃতি লেখকের সাহিত্যে মানুষ তাদের অসহায়ত্ব নিয়ে হাজির হল। এমনি করে পৃথিবীর তাবৎ মহান সাহিত্যকর্মগুলো মানুষের ভেতরের বিকল অবস্থাকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখিয়ে যেতে লাগলো। সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কাজই হল এটা। এই কাজটি না করতে পারলে সাহিত্য তার গুরুত্ব হারাবে। অন্যান্য শিল্পমাধ্যমের মতোই সাহিত্য হয়ে উঠবে বিমূর্ত। ভাষাহীন।


.
ইতিহাসের পুনঃলেখন বা অনুলেখন সাহিত্যের কাজ না। ঐতিহাসিক ঘটনার নতুন নতুন মাত্রা আবিষ্কার করা আর প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস রচনা করা আলাদা কথা। প্রথমটা সাহিত্যিকের কাজ, দ্বিতীয়টা ঐতিহাসিকের। সাহিত্য ইতিহাসকে অনুসরণ করতে পারে, কিন্তু তার দাস হয়ে নয়। এখানেই ইতিহাসবিদ আর সাহিত্যিকের পার্থক্য। আচেবে তাঁর একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন-- ‘আমি বুঝতে পারলাম আমাকে লেখক হতে হবে। আমাকে ঐতিহাসিক হতে হবে।’ [তর্জমা: বিদ্যুত খোশনবীশ, সূত্র: দৈনিক অর্থনীতি প্রতিদিন] অর্থাৎ তিনি নিজেকে তাঁর জাতির মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করছেন। তিনি লিখেছেন তাঁর জনগোষ্ঠীর প্রকৃত ইতিহাস লিখতে। আচেবের ব্যাপারটা ধরতে হলে তাঁর কনটেক্সকে বুঝবে হবে। আচেবে এমন এক জনগোষ্ঠীর লেখক যাদের ইতিহাস লেখা হয়েছে ইউরোপীয়দের দৃষ্টি দিয়ে। অর্থাৎ শোষকশ্রেণির হাত দিয়ে তা রচিত। কাজেই ইগবু জাতির প্রকৃত ইতিহাস সেখানে নেই। থাকবার কথাও না, সেই কথায় বলছেন চিপিউয়া-- 'when other people tell your story, it always comes out crooked.’ এখানে ইতিহাস মানে শুধু রাজনৈতিক ব্যাপার না, সাথে শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি জড়িত। আচেবে সাবল্টার্ন-এর পক্ষ থেকে সাহিত্য রচনার কথা বলছেন। তিনি সেই কাজটিই করেছেন ‘থিংস ফল আপার্ট’ এ। এই উপন্যাসটি পড়ে ইগবু জাতিকে যেভাবে জানা যাবে অনেক ইতিহাসের আঁকড় গ্রন্থ পড়েও হয়ত সেইভাবে জানা যাবে না। এখানে ইতিহাস ও রাজনীতি যেভাবে এসেছে, সেটা এসেছে গল্পের প্রয়োজনেই। একই কথা বলা যায় ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’ এর বেলায়। এই উপন্যাসটি বিশ্বে এন্টি স্লেভারিকে যেভাবে নিরুৎসাহিত করেছে ইতিহাসের অনেক গ্রন্থও তা পারেনি। সাহিত্যে এই রাজনীতি চলে আসার বিষয়টি পরিষ্কার করে দিয়েছেন রুশদি, তিনি বলছেন:

‘পৃথিবীর একটা ব্যাপক অংশ গল্পে চলে আসে। এর কারণ এই না যে আমি রাজনীতি নিয়ে লিখতে চায়। এর কারণ হল আমি জনগণ নিয়ে লিখতে চাই। (অনুবাদ: বর্তমান আলোচক, প্যারিস রিভিউ)

অস্তিত্ব নির্ভর উপন্যাসের সামাজিক-ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে কথা বলতে গিয়ে কুন্ডেরা বলছেন যে তিনিও হেইদেগারের মতো বিশ্বাস করেন যে মানুষের সাথে পৃথিবীর যে সম্পর্ক সেটা অভিনেতার সাথে মঞ্চের যেমন সম্পর্ক তেমন নয়। সম্পর্কটা কাছিমের সাথে তার খোলসের মতো। মানে বিশ্ব হলো মানুষেরই অংশ বিশেষ। এজন্যে বিশ্ব বদলালে মানুষের অস্তিত্ব বদলাবে। তবে ঐতিহাসিক দিক পর্যবেক্ষণ করা আর ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের বিশদ বয়ান এক কথা নয়। কুন্ডেরা ইতিহাসের যতটা সম্ভব কম উপাদান নিয়ে উপন্যাস নির্মাণ করার পক্ষপাতী। ইতিহাস উপন্যাসে এসে মানুষকে তাদের ভুলগুলো শুদ্রে দেয়। ঘটনাগুলো আবার জীবন্ত করে-- জায়গা বদলে দেখতে চায় সম্ভাবনাগুলো। তখন আর ইতিহাস শুধু ইতিহাস থাকে না, হয়ে ওঠে ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও। তাই তো বিংশ এবং একবিংশ শতককে জানতে হলে কাফকা পাঠ অনিবার্য হয়ে ওঠে। মারগারেট আটুড যখন বলছেন--‘যখন কানাডার সাহিত্যকে উপেক্ষা করা হল, তখন দেখা গেল কানাডা তার অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।’ [প্যারিস রিভিউ, অনুবাদক: ঐ]--তখন সাহিত্য আর ইতিহাস আলাদা থাকছে না।



আমাদের শিক্ষকেরা প্রায়ই বলে থাকেন, অমুক জাতিকে জানতে হলে অমুক উপন্যাসটি পড়ো। একটি পার্টিকুলার উপন্যাস কখনই একটি জাতির সার্বিক চিত্র উঠিয়ে আনতে পারে না। ইনফ্যাক্ট, খুব সামান্যই পারে। একজন ইনডিভিজুয়াল লেখকের পক্ষেও খুব সামান্যের বেশি উঠিয়ে আনা সম্ভব নয়। আমি পূর্বেই বলেছি সাহিত্যের কাজ কারো প্রতিনিধিত্ব করা না। সাহিত্য খুব সচেতনভাবেই সেটা এড়িয়ে যায়। এ-পর্যায়ে এসে অ্যামি টানকে স্মরণ করছি:

'...i don’t write to dig a hole and fill it with symbols. I don’t write stories as ethnic themes. I don’t write to represent life in general. And I certainly don’t write because I have answers. If I knew everything…I wouldn’t have any stories left to imagine. If I had to write about only possitive role models, I wouldn’t have enough imagination left to finish the first story.’ [In the Canon, for ALL the Wrong Reasons.]

লেখালেখিটা একজন লেখকের কাছে বিশ্বাসের মতো। লিখতে লিখতে একজন লেখক তার ‘সত্য’কে আবিষ্কার করেন। পড়তে পড়তে একজন পাঠকও তাই করেন। এক্ষেত্রে লেখক ও পাঠকের সত্য আলাদা হতে পারে। আবার দুজনের সত্য মিলেও যেতে পারে। তাই একটা বই পড়া মানে ঐ জাতির সমগ্র ইতিহাস পড়া নয়। কেউ যদি কোনো জাতির ইতিহাস জানার জন্যে সাহিত্য পড়তে চায়, তাহলে আমি তাকে নিরুৎসাহিত করবো। আবার কেউ যদি ইতিহাস পড়ে কোনো জাতির জীবন ও সংস্কৃতি জানতে চায় তাকেও আমি সমানভাবে নিরুৎসাহিত করবো। প্রমথ চৌধুরী যে কারণে লাইব্রেরিকে হাসপাতালের ওপরে রেখেছেন সেই একই কারণে আমি, ব্যক্তিগত পাঠের ক্ষেত্রে, সাহিত্যকে ইতিহাসেরও ওপরে রাখি। কারণ আরও একটা আছেÍইতিহাসের প্রতিটি পাতা একটি শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে, সাহিত্য করে না। সাহিত্য দুটো প্রপোজিশনকে দাড় করিয়ে দেয়, সিদ্ধান্ত নেয় ব্যক্তি। আর ইতিহাস সিদ্ধান্ত ধরে এগুতে থাকে।



চ.
আচেবে বলেছেন, ‘প্রত্যেকে গল্প বোনে তার নিজের জন্যেÍনিজের বেঁচে থাকাকে উপভোগ্য করে তুলতে। গল্পগুলো সত্য হোক মিথ্যা হোক, ভাল হোক মন্দ হোক--তার চোখ দিয়ে জগতকে দেখবার অসম্ভব এক শক্তি নিয়ে হাজির হয়।’ [‘দি ট্রুথ অব ফিকশন’ অনুবাদক: ঐ] তার মানে সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কাজ হল গল্পটাকে নির্মাণ করা। তারপর আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে ভাবতে হয়। গল্পটা কেউ কেউ আবার লেখবার আগেই নির্মাণ করে ফেলেন। অর্থাৎ তারা গল্পটাকে জেনে তারপর লেখেন। যেমন ফুয়েন্তেস বলছেন, ‘আমি কেবল কাঠামোর কঙ্কালটার কথা ভাবতে পারি। কীভাবে এগুবো জানি না।’ [প্যারিস রিভিউ, আন্দালিব রাশদী] রবীন্দ্রনাথ ও তলস্তয়ের সাহিত্য এই শ্রেণির। তাঁরা গল্পগুলো জানতেন। কাঠামোটা হয়ত লিখতে লিখতে ঠিক করে নিতেন। আবার অনেকে আছেন যারা গল্পগুলো জানেন না। যেমন মুরাকামি। তিনি বলছেন, ‘আমি অতো ভেবেচিন্তে লিখি না। আমি গল্পটার জন্যে অপেক্ষা করি। আমি জানতে চাই তাই লিখি।’ (তর্জমা: ঐ, প্যারিস রিভিউ) সাহিত্যের কাজ হলো বায়বীয় একটা জগত তৈরি করা। সেই জগতের বাসিন্দারা বাস্তবের বাসিন্দাদের মতোই অমিত সম্ভাবনাময়ী। লেখক যখন লেখেন, পাঠক যখন পড়েন তখন তিনি ওই জগতেরই একজনÍনিজেই যেমন সৃষ্টিকর্তা, আবার নিজেই তেমন সৃষ্টিকর্ম (চরিত্র)। তারা চাইলে গল্প থেকে বের হয়ে যেতে পারেন, আবার চাইলে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু গল্পটা বদলাতে পারেন না। কেননা ওটাও তখন অন্য এক বাস্তব। আধুনিক সাহিত্যে এসে পাঠকরাও লেখকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন। কাফকার মতো লেখকরা শুধু পরিস্থিতি বর্ণনা করে ছেড়ে দিচ্ছেন। বাকীটা নির্মাণ করে নিচ্ছে পাঠকরা। বর্তমান সাহিত্যের কাজ হলো পাঠকদের সেই সুযোগটা করে দেওয়া।



ছ.
স্থান ও কাল পরিবর্তনের সাথে সাথে সাহিত্যের কাজ বদলায়। ইউরোপে বসে যারা লেখেন, তাদের গোটা বিশ্বের পাঠকদের কথা ভেবেই লিখতে হচ্ছে। কেননা, তাদের বই এখন সমস্ত বিশ্বে পঠিত হচ্ছে। অনেকের ক্ষেত্রে তো আবার স্বদেশী পাঠকের চেয়ে ভিনদেশি পাঠকদের সংখ্যা অনেক বেশি। কাজেই তাদের কাজের সাথে তৃতীয় বিশ্বের লেখকদের কাজ মেলালে চলবে না। ইউরোপীয় সাহিত্যের বর্তমান যে অবস্থা সেই অবস্থায় আমরা এখনও পৌঁছাতে পারিনি। তার প্রয়োজন পড়েনি। এর কারণ আমাদের জীবনযাত্রা আর ওদের জীবনযাত্রা এক নয়। আমরা প্রতিনিয়ত নানান সমস্যার মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছি। ইউরোপের সেই মধ্যযুগীয় সমস্যাগুলো আমাদের এখানে এখনও চলমান। যেমন কাফকা যে জগতটা চিহ্নিত করছেন তার সেই জগতটা অফিস আদালত ও আমলা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশে প্রায় আশি হাজার গ্রাম আছে। কাজেই কাফকার জগতটা এখানে একটা বৃহৎ শ্রেণির কাছে অচেনা। ইউরোপীয় আধুনিক উপন্যাস নিজস্ব ধারায় অস্তিত্বের নানান দিক উন্মোচন করেছে। বালজাক মানুষের ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে আবিষ্কার করেছেন, ফ্লবেয়ার মানুষের দৃষ্টির সামনের অদেখা জগতকে উঠিয়ে এনেছেন। তলস্তয় মানুষের আচরণগত দিক ফুটিয়ে তুলেছেন, প্রুস্তের মাধ্যমে খয়ে যাওয়া অতীত আর জয়েসের মাধ্যমে অন্তর্মুখী বর্তমানে প্রবেশ করেছে উপন্যাস। টমাস মানের মাধ্যমে উপন্যাস অতীত-পুরাণকে বর্তমানের চালিকাশক্তি হিসেবে গণ্য করেছে। কাজেই ইউরোপে বা উন্নত রাষ্ট্রে বর্তমান সাহিত্যের কাজ হল মানুষের আত্মপরিচয় বা আত্মসত্তাকে খুঁজে বের করা। সাহিত্য ওখানে সমাজ থেকে ব্যক্তিমুখী। মানে ব্যক্তির চোখ দিয়ে সমাজকে দেখা হয়, সমাজের চোখ দিয়ে ব্যক্তিকে নয়। ইউরোপে পুঁজির বিকাশের সাথে সাথে ব্যক্তির যে বিকাশ বা একাকীত্ব তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে তা এখনও হয়ে ওঠেনি। আমাদের এখানে একটা বৃহৎ অংশের কাছে ব্যক্তির চেয়ে সমাজ বড়। মানুষজন আধুনিক দর্শন, ধ্যান ধারণায় পুরোপুরি ধাতস্থ নয়। মানুষ তাদের পরিণতির জন্যে অদৃষ্টের দিকে তাকিয়ে থাকে। ঈশ্বরের শক্তিই এখানে পরম শক্তি। ব্যক্তির বিকাশ বিশ্বাস দিয়ে দাড় করানো হয়। এখানে এখনও মানুষের মুক্তি সম্ভব হয়নি। প্রমথ চৌধুরীর সেই মেটাফরিক দোতলা ঘরের নীচ তলায় এখনো আমাদের বাস। কাজেই এখানে এখন সাহিত্যের প্রধান কাজ হল মানুষের মুক্তির পথ বাতলে দেওয়া। মানে পাঠককে প্রস্তুত করে তোলা। সমাজ ও রাষ্ট্র এখানে বন্দি--একটা বায়বীয় অচল অবস্থার কাছে। আমাদের অস্তিত্বের সংকট আর ইউরোপীয়দের অস্তিত্বের সংকট মোটেও এক নয়। আমাদের সাহিত্য এখনও জনগণ বা সমাজের কাছে কমিটেড বা দায়বদ্ধ। মানে সামাজিক গুরুত্বটাকে হালকা করে দেখবার সময় এখনও আসেনি। ইউরোপ একসময় সমস্ত বিশ্বকে শাসন ও শোষণ করেছে। এখনও তারা চলমান আমেরিকার আধিপত্যবাদের অংশীদার। কাজেই আমেরিকান-ইউরোপীয় সাহিত্যের এই আধিপত্যবাদে বিরক্ত হবার কোনো কারণ ঘটেনি। আমরা শুধু ব্রিটিশ না--পাকিস্তান রাষ্ট্রেরও ঔপনিবেশিক ছিলাম। কাজেই আমাদের সাহিত্যের কাজ আর ঐ আধিপত্যবাদের সাহিত্যের কাজ এক হবার নয়। যদিও নীতিগতভাবে সাহিত্যের কাজ গোটা বিশ্বেই একই হবার কথা। কিন্তু অন্য এক রাজনৈতিক সত্যের মুখোমুখি আমরা।

আমাদের সাহিত্যিকরা বরাবরই সঠিক কাজটিই করে এসেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমস্ত সাহিত্য বাঙালীকে বাঙালী হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তিনি অনুজ সাহিত্যিকদের জন্যে বাংলা ভাষাকে আধুনিক সাহিত্য উপযোগী করতে সাহায্য করেছেন। রবীন্দ্রনাথ যদি ভাষা দিয়ে থাকেন, মাইকেল মধুসূধন দিয়েছেন ঢং বা কাঠামো। তারাশঙ্কর ও মানিক দিয়েছেন বিষয়বস্তু। তাঁরা ছাড়া আমরা আমাদের সত্তাটাকে ধরতে পারতাম না। বিভূতিভূষণ আমাদের বোধকে আরও গভীর করেছেন। ব্যক্তিকে চিনিয়েছেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শহীদুল জহির, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত। মহামুদুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ও শওকত আলী আমাদেরকে ইতিহাসে ফিরিয়েছেন। হাসান আজিজুল হক গভীর থেকে আমাদের জীবনের প্রতিটা বাঁককে স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছেন। সেলিনা হোসেন আপন অনুভূতি দিয়ে আমাদের সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে এনেছেন। অন্যরাও একইভাবে আমাদের জাতিগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত দেওয়ার পাশাপাশি আমাদের ঐতিহ্যমুখী করেছেনে।

একবিংশ শতকে এসে আমাদের সাহিত্যের কাজও খানিকটা বদলেছে। এখন সাহিত্যকে আরো ক্রিটিক্যাল হতে হচ্ছে। সেই সহজ-সরল জীবনটা আর নেই যে! একদিকে টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে যাচ্ছে বিশ্বাস, অন্যদিকে তীব্র শক্তি নিয়ে ধেয়ে আসছে ধর্মীয় মৌলবাদ। গ্রাম ভেঙ্গে ভেঙ্গে নগর হচ্ছে। আবার গ্রামের সংখ্যাও বাড়ছে। বহুল কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা অপশক্তিতে রূপ ধারণ করছে। নিজের শত্রু এখন নিজেই। সংস্কৃতি ও প্রগতি টিকিয়ে রাখার পক্ষে বিপক্ষে সমান দাবি। এক শ্রেণির ধারণা জাতির ক্ষয় হচ্ছে, অন্য শ্রেণির বিশ্বাস জাতির বিকাশ ঘটছে। সবক্ষেত্রে এখন এমনই বিবাদ। সাহিত্যকে এখন সেই বিবাদের জায়গা ধরে এগুতে হবে। জাতির ভেতর একটা ঐক্য গড়ে তোলার জন্যে সাহিত্যের কার্যকর ভূমিকা থাকা দরকার।

                                     পরিচিতি 
মোজাফফর হোসেন

জন্ম : ১৯৮৬ জন্মস্থান : মেহেরপুর, বাংলাদেশ।
পড়াশুনা : ইংরেজী বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
কবি ও গল্পকার, প্রবন্ধকার, অনুবাদক। 
সম্পাদক : শাশ্বতিকী।
নির্বাহী সম্পাদক: পাক্ষিক অনন্যা



৩টি মন্তব্য:

  1. মাহমুদ হাসান পারভেজ১৪ জানুয়ারী, ২০১৫ ১০:১৪ PM

    প্রিয় প্রবন্ধকার গল্পকার), আপনার এই প্রবন্ধটি নিঃসন্দেহে পাঠক- লেখক থেকে ইতিহাস দর্শন বা সাহিত্যের ছাত্র থেকে শুরু করে যারাই সাহিত্যমগ্ন তাদের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নিতে রাস্তা দেখাবে। বিশ্ব সাহিত্য বা সাহিত্যের কাজ বা অকাজ নিয়ে আপনার লেখা বেশ তথ্য সমৃদ্ধ। খুব উপকারি। তবে যে জায়গাটায় আমার খটকা সেটা এখানে উল্লেখ করতে উৎসাহ বোধ করছি এই ভেবে যে এর সরাসরি প্রতিক্রিয়াটা জানতে পারব। খটকা আসলে প্রবন্ধের শেষ পরিচ্ছেদ (ছ) তে। খটকাটা হচ্ছে--আমাদের সাহিত্য আর ইউরোপীয় সাহিত্যের অমিলকে আপনি যে দৃষ্টিতে আবদ্ধ করছেন সেটা নিয়ে। আগের পরিচ্ছদগুলো থেকে সাহিত্য উন্মোচনের যে ধারণা বা সিদ্ধান্ত নিয়ে এই প্যারায় এসে ঢুকছি -তাতে করে প্রশ্ন জাগছে যে -তাহলে আমাদের এখানকার সাহিত্য কি আমাদের অস্তিত্বের সংকটের কাছে নতি স্বীকার করে বসে আছে? নাকি তার উন্মেষ পর্ব চলছে? ইউরোপীয় সাহিত্যের উন্মেষপর্ব থেকে আমাদের সাহিত্যের এই সময়টা নিশ্চয়ই অনেক দুরের। কিনতু এখানে যে অস্তিত্বের সংকটটা বা বিবাদটা জড়িয়ে যাচ্ছে সেটা এখানকার ব্যক্তি আর ইউরোপের ব্যক্তি কিন্তু একই সাথে দেখতে পারছে। এর সাথে আপনি এখনকার সাহিত্যকে পথ দেখাচ্ছেন বাঙালী জাতির ক্ষয়ে যাওয়া বা বিকাশের যে বিবাদ সেটাকে ধরেই এগিয়ে যেতে। আসলে সাহিত্যের কাজ কি কোন জাতিকে একত্রিত বা বিভাজিত করা? সেখানে কি সাহিত্য কার্যকর ভুমিকা রাখতে পারে? যদি সেটা পারে সেটা কি আসলে সাহিত্য না অন্য কিছু?

    উত্তরমুছুন
  2. ধন্যবাদ। ভালো লাগলো পড়ে।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব উপযোগী একটি লেখা। মনে হচ্ছিল আমি অনেকদিন ধরে এমন একটি লেখা পড়তে চাইছিলাম। অনেক অবিন্যস্ত ভাবনার একটি বিন্যস্ত রূপ খুঁজে পেলাম এখানে। লেখকের পরিশ্রমকে শ্রদ্ধা।

    উত্তরমুছুন