শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

আলোচনা, বুদ্ধদেব বসুর গল্প ‘আবছায়া’

অলাত এহ্সা্‌ন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে এক মধ্যবিত্ত যুবক। বিশ্ববিদ্যায়লে বিশাল আয়তন, বিপুল আয়োজন, ইংরেজি বলিয়ে শিক্ষকদের ভাড়িক্কি চালচলনে সে নিজেকে ভদ্র গোছের মানুষ ভাবতে শুরু করে। নিজের পোশাক-চেহারা সম্পর্কে অতিমাত্রায় সজায় হয়। অনেকের মতো অপর্ণা দত্ত নামক সহপাঠীকে তার ভাল লাগে, তাকে অনুসরণ করে। তার জন্য মনে আবেগ-আকাক্সক্ষা তৈরি হয়। কিন্তু সে এসবের স্বীকৃতি দিতে চায় না। এড়িয়ে যায়। নিজেকে অযোগ্য ভাবে। স্বপ্ন দেখে শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমেই জীবনের প্রসিদ্ধি অর্জন করবে। অপর্ণাও কথককে পছন্দ করে। কিন্তু সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে বলতে পারে না। তাই বিভিন্ন ভাবে অযুহাত খুঁজে। তাকে মনের কথা জানাতে চায়। কথকের আরেক সহপাঠী ও বন্ধু অশোক। সেও অপর্ণাকে পছন্দ করে। সে অপর্ণার কাছাকাছি থাকতে চায়। অপর্ণা তাকে ভিত্তি করে কথকের সঙ্গে যোগাযোগ করে। অশোকের মুখে অপর্ণার গল্প শুনতে শুনতে নিজেও স্বীকার করে যে, সেও অপর্ণাকে পছন্দ করে। কিন্তু কথক এসব তার মনের ভুল মনে করে দূরে থাকে।


এম এ ক্লাসে দর্শন বিভাগে ভর্তি হয় কথক ও অপর্ণা। তখন তাদের আলাপ করার অবারিত সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু যেচে গিয়ে কারো সঙ্গে আলাপ করতে তার বাধে। বিদ্যা থেকে তৈরি হওয়া আত্মগড়িমার দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ভুগে। অপর্ণা বিভিন্ন ভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। কথক তাকেও নিজের মনের ভুল বলে দাবী করে।

অশোকের সঙ্গে অপর্ণার বিয়ে দিন তারিখ ঠিক হয়। সেই প্রথম ‘কন্যার আশীর্বাদ’ উপলক্ষ্যে অপর্ণাদের বাড়ি যায় কথক। অপর্ণা মুখোমুখি হয়। আবেগ তাড়িত হয়। অপর্ণা বলে, ‘থাক, এখন আর ভদ্রতার কথা ব’লে কী লাভ—এখন তো আর সময় নেই।’ নিজের ভুল বুঝতে পারে সে। তার মনে হয়, অপর্ণা তাকেই চেয়েছিল। কিন্তু দেরি হয়েছে গেছে। তবু তার মনে সে সব তার মনের ভুল। নিজের বোকামি উপলব্ধি করে স্তম্ভিত হয়।

অপর্ণার বিয়ের পর দশর বছর পেরিয়েগেলেও বিয়ে করেনি কথক। সে শিক্ষক। পরিবারের প্রতি কর্তব্য বোধ থেকেই সে বিয়ে করেনি। তার মনে পড়ে অশোক আর অপর্ণার বর্তমান অবস্থার কথা, তাদের দাম্পত্যর কথা। মনে হয় অন্ধকারের কার যেন আবছায়া। আবছায়া চুপি-চুপি বলে—‘এত দেরি ক’রে এলেন—আর তো সময় নেই।’

অপর্ণা, কথক ও অশোক—এই তিন চরিত্রের প্রেম-অন্তর্বাস্তবতা আর দ্বন্দ্ব নিয়ে গল্প ‘আবছায়া’। গল্পটি ১৯২৭—’৪৬ সময়ে লেখা বুদ্ধদেব বসু গল্প নিয়ে জগদীশ ভট্টাচার্য সম্পাদিত ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ নামক গল্পসংকলন ভুক্তছিল।


২.

গল্পের প্রধান চরিত্র অপর্ণা। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সমস্ত ঘটনা। অপর্ণা, কথক ও অশোক—এই ত্রিভুজ প্রেমের দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের কাহিনী এটি। কথক এখানে মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি। ধরা যায় অপর্ণা নিজেও মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়ে। অশোধ ধর্নাঢ্য ঘরের সন্তান। গল্পর বয়ানে ও বিভিন্ন পর্যায় এই সব চরিত্রের নানাভাবে উন্মোচিত হয়েছে। যেহেতু গল্পের কথা মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি, তাই গল্পের তার চরিত্রেরই ছাপ পাওয়া যায়। তাই বলে কোনো চরিত্রের প্রতি অবজ্ঞা করা হয়েছে, এমনটা বলা যায় না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়ে এটা একটা সাধারণ ঘটনা হিসেবে ধরা যায়। সাধারণ ঘটনাকেই বেছে নিয়েছেন গল্পকার। সে সময়ের গদ্য শৈলির দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মানুষের বাহ্যিক-পারিপার্শিক অনুপুক্সখ বর্ণনার চেয়ে অন্তর্জীবনের গভীরতর বাস্ততার রূপায়ন, চরিত্র চিত্রণের পরিবর্তে তার ভেতরকার স্বরূপ অšে^ষণ, অবচেতন মনের আন্তঃসংলাপ, অবদমিত মনের প্রকাশ ভঙ্গি খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। ‘আবছায়া’ গল্পেও আমরা তার প্রয়োগ দেখি। সাধারণ একটি ঘটনা বর্ণনা আর উপস্থাপনের মধ্যদিয়ে গল্পটি অসাধারণ হয়ে ওঠেছে। গল্পের প্রধান বিষয় ব্যক্তির ভেতরকার দ্বন্দ্ব। প্রথম থেকেই আমরা এই দ্বন্দ্ব টের পাই। অপর্ণার কাছে কথকের যাওয়া না-যাওয়া, যে ছুঁই-ছুঁই-ছুঁই না ধরনের সম্পর্ক—অবস্থা—অবস্থান। যা আমাদের মনে ক্লাইমেক্সের জন্মদেয়। আমরা অপর্ণার সঙ্গে কথকের ভাললাগা ‘হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোকে, মন বাড়িয়ে ছুঁই/ দুইকে আমি এক করি না, এককে করি দুই’ ধরনের। ফলে সম্পর্কের পরিণতি কি হয়, তা দেখতে চাই। দেখতে চাই অপর্ণা সঙ্গে কথক কখন মুখোমুখি হয়, কিংবা আদৌ কি হয় না। হলে তাদের মধ্যে আবেগের সঞ্চার কেমন হয়, তারা কিভাবে তাকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রকাশ করে। তাদের মানাসিক, শারীরিক অবস্থা কি হয়। তাদের ভাষা, বক্তব্যই বা কি হয়—ইত্যাদি।

গল্পকার গল্পবলতে দিয়ে কয়েকটি ঘাত সৃষ্টি করেছেন। আমরা একে বলতে পারি, তুড়িবাজির আশ্রয় নিয়েছেন। কয়েকটি ক্লাইমেক্সের ভেতর দিয়ে আমাদের অনুভূতি অত্যুঙ্গে ওঠে, তখন তিনি তুড়ি বাজিয়ে দেন। এই তুড়িবাজি দিয়ে লেখক গল্পের পর্বও বিন্যাস করেন।

প্রথম আমরা এ অনুভূতির মুখোমুখি তৃতীয় মনে অনুচ্ছেদের শেষে। বিএ ক্লাসে দুইশত ছাত্রের কালো কালো মাথা ডিঙিয়ে যখন অপর্ণা কথকের দিকে দৃষ্টি দিচ্ছে। ‘লক্ষ্য করতুম, অপর্ণা আগাগোড়া বইয়ের উপরেই চোখ রাখে, যেন অত্যন্ত সংকুচিত হ’য়ে নিজেকে দিয়েই নিজেকে আড়াল ক’রে রাখতে চায়। শুধু মাঝে-মাঝে অতগুলো কালো মাথা ভেদ ক’রে ওর চোখের দৃষ্টি আমারই মুখের উপর যেন এসে পড়তো।’ এখানে এসে আমাদের অনুভূতি যখন পূর্ণতা পায়, ঠিক তখনই গল্পকার আমাদের চোখে সামনে তুড়ি বাজিয়ে দেন ‘তবে এটা খুব সম্ভব আমার কল্পনা।’ আমরা গল্পের বিষয় বস্তু সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠি। মৃদু উঁচুনিচু পেরিয়ে গল্পের ক্লাইমেক্স তখন উর্ধ্বগামী হতে শুরু করেছে।

দ্বিতীয় বারের মতো এই অভিজ্ঞতার মুখো হই, যখন গল্পকার এম এ ক্লাসের ছাত্র। ‘অতএব দর্শনের ছোটো ক্লাসে দুটো বেঞ্চির ওপারে অপর্ণার দিকে তাকিয়ে-তাকিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বছরটা কাটলো। আমার মনে হ’তো, অপর্ণা আমার দিকে ঘন-ঘনই তাকাচ্ছে’। তখন মনে হয় গল্প বুঝি পরিণতি পেতে যাচ্ছে। পরোক্ষণে বলেন, ‘কিন্তু এই নিশ্চয়ই আমার মনে ভুল।’ তাতে মনে হয়, জ্যোৎ¯œায় ভূত দেখার মতো, কথক নিজেকে শান্তনা দেয়। ক্লাইমেক্স তখন মধ্য গগনে অবস্থান করছে।

শেষবারের একই অনুভূতির পুনরাবৃত্তি দেখি অপর্ণার বাড়িতে, কন্যা আশির্বাদের অনুষ্ঠানে। “তারপর একটু চুপ ক’রে থেকে ঈষৎ মাথা নেড়ে খুব নিচু গলায় বললে, ‘কিচ্ছু বোঝেন না আপনি!’ সঙ্গে—সঙ্গে শুনতে পেলুম অপর্ণার দীর্ঘশ্বাস, কিন্তু সেটাও বোধ হয় আমার কল্পনা।” ক্লাইমেক্স বা চরম মুহূর্ত শেষে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা বুঝতে পারি, আমরা গল্পের শেষের যাত্রায় সামিল হচ্ছি।

গল্প এখানে শেষ হতে পারতো। হলে গল্পের গাথুনির তেমন বিশেষ ক্ষতি হতো বলে মনে হয় না। বরং পাঠক একটা ট্রাজেডিক অতৃপ্তি নিয়ে পাঠ শেষ করতে পাতেন। তার ভাববার সুযোগ থাকতো। কিন্তু গল্পকার আরো এগিয়ে যান। তিনি কথকের মনের ভাব পুরোপুরি তুলে ধরেন। অপর্ণার বিয়ের কয়েকদিন পরেই কথক কলকাতায় চলে আসে, চাকরির চেষ্টায়। সে দশ বছর যাবত দর্শনের শিক্ষক। ‘আমি এখনো বিয়ে করিনি, তার কারণ আমার ক্ষীণ আয়ের উপর মা-বাবা-ভাই-বোনের নির্ভর, আমি বিয়ে করলেই তাদের ভাগে কম পড়বে, অতএব সে-বিষয়ে আমার উদাসীন থাকাই কর্তব্য।’ বলার অপেক্ষা রাখে না, এর মধ্যদিয়ে গল্পকার একে একটি সাধারণ রূপদানের চেষ্টা করেছেন।

তবে কথকের এই বক্তব্য মোটেই সমালোচনার উর্ধ্বে নয়। গল্পকার এখানে, পাঠকের কাছ থেকে একধরনের সস্তা সহমর্মিতা আদায়ের চেষ্টা করেছেন। যে সময়ে গল্প সে সময় তার চেয়েও নিম্ন আয়ের মানুষ পরিবারের ভরণ-পোষণ করে বিয়ে করার মতো সামাজিক, মানসিক সক্ষমতা দেখিয়েছে। আসলে গল্প কথা কোনো ভাবেই তার মধ্যবিত্তিয় মানসিকতাকে অতিক্রম করতে পারিনি। বলা যায়, গল্পের নায়ক চূড়ান্তার্থে একজন অসৎ।

নায়ক তার মানসিক, জৈবিক চাহিদার সঙ্গে প্রতারণা করে যাচ্ছে। ভাল মানসি দেখাতে চাচ্ছে। ‘দর্শন পড়ি ও পড়াই, নিছক বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাকেই জীবনের একমাত্র সুখ ব’লে মেনে নিয়েছি। ভালোই আছি।’ এই ভাল থাকার বিষয়টি মোটেই ভাল থাকার অর্থবহন করে না। গ্রামসী যাকে বলেন খাঁচা; খাঁতা তো বটেই, তবে চিন্তা ও বিশ্বাস দিয়ে একটু বড়। কথক সেই খাঁচাকেই বড় করতে চেয়েছেন। কিন্তু কখনো মুক্ত হতে চাননি। যে কারণে তাকে তার বর্তমান অবস্থার স্তুতি গাঁথা গাইতে হয়। এটা একধরণের অবদমন। গল্পে মধ্যবিত্তের অবদমিত মনের অবস্থা সশব্দে বেরিয়ে পরে। ফলে ‘মাঝে-মাঝে অনেক রাত্রে সেই একটি তরণ শ্যামলা মুখ আমার মনে পড়ে, সরু হাতে একটিমাত্র চুড়ি, নীল শাড়ির পাড় মাথাটিকে ঘিরেছে। অন্ধকারের কে যেন চুপি-চুপি কথা বলে—‘এত দেরি ক’রে এলেন—আর তো সময় নেই।’

একটা খেয়াল করলে দেখা যায়, নারীর জন্য সে সময় সমাজে যেমন কঠিন বিধিনিষেধ ছিল, কিন্তু একজন মধ্যবিত্তের বিধিনিষেদ ছিল তার ভেতরে। নিজেই নিজেকে আরোপ করা। তাই তা কখনো সে অতিক্রম করতে পারে না। বুদ্ধদেব বসু এই দিক দিয়ে গল্পের ভেতরে নিজের বিশ্বাসকে স্থাপন বা প্রস্ফোটিত করতে চেয়েছেন। তাতে যে গল্পের সুষমা নষ্ট হয়েছে, এই অভিযোগ পুরোপুরি সত্য হবে না। কিন্তু নিজের বিশ্বাসের প্রভাব পড়েছে, তাও অস্বীকার করা যাবে না।


৩.

নোবেল জয়ি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদ্যামান সময়ে বুদ্ধদেব বসু তার প্রভাব বলয়ের বাইরে দাঁড়াতে পেরেছিলেন। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথে হাতে যদি বাংলা সার্থক ছোটগল্পের গোড়াপত্তন ধরা হয়, বুদ্ধদেব বসু তাকে বিকশিত ও পত্রপল্লবে বিকশিত করেছেন। তার ছোটগল্পের প্রধানগুণ হলো ভাষা। তার ভাষা গতিময় ও ঘনিষ্ট। গল্পের প্রয়োজনে তার শব্দ ব্যবহারে হেরফের করেন। বুদ্ধদেব বসু বাংলা সাহিত্যের একজন আধুনিক কবি। তাই তার গল্পের ভাষায় একধরণের গীতিময়তা লক্ষ্য করা যায়। গল্পের কাহিনীর গতির সঙ্গে তার ভাষাও গতি ও ছন্দ পায়। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনিই প্রথম যিনি কবিতা ও কথাসাহিত্যের যোগসূত্র স্থাপনে সফল হয়েছেন। ‘আবছায়া’ গল্পেও আমরা সেই অবস্থা দেখতে পাই।

‘আই এ পাশ ক’রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যেদিন ভর্তি হলাম সেদিন মনে ভারি ফুর্তি হ’লো।’ বুদ্ধদেব বসু তার ‘আবছায়া’ গল্প শুরু করেন এই ভাবে। কেন ফুর্তি হলো? শুধু কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, না আরো কিছু? উত্তর আসে দ্বিতীয় লাইনে, ‘কত বড়ো বাড়ি!’ আমাদের মনে পড়ে—কি অর্থনৈতিক, কি রাজনৈতিক কারণে—ক্রমেই উন্মূল হয়ে আসা মানুষের মুখ। গল্পের লেখার সময়ের দিকে তাকালে বুঝতে পারি, সময়টা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি। ইতিহাসে বঙ্গভঙ্গ হয়েছে, আবার রদ হয়েছে। কিন্তু সমাজে তার চিড় রয়েগেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফলে বদলে গেছে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, ক্ষমতার সমীকরণ। তৈরি হচ্ছে আরো, ভয়ানক আরেক বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপট। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি ইতিহাসে খ্যাত ‘পঞ্চাশের মনন্বতর’ আর দেশ ভাগের দিকে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই সময়ই ভারতবর্ষে মধ্যবিত্তের চরম বিকাশের সময়। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে তাদের অংশগ্রহণ দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এই ভূমিকার মানে হলো, একজন মধ্যবিত্ত যুবক, যার সংকট আছে, উত্তোরণের প্রতিশ্রুতি আছে। সেই সঙ্গে আছে তার কঠিন কঠোর বৃত্ত। সে এই বৃত্তে ঘোরপাক খাচ্ছে। অর্থাৎ বুদ্ধদেব বসু প্রথম বাক্যেই একজন মধ্যবিত্তের চোখে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেখার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করছেন। আর মধ্যবিত্তই এই গল্পের কথক। গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদ কথকে দেখা ও গল্পকারের দেখানোর মধ্যদিয়েই শেষ হচ্ছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুমরম্য অট্টালিকা, বিস্তৃত আয়তন, ইংরেজি বলিয়ে শিক্ষকের ভাবগাম্ভীর্য ও কেতাদুস্থর ভাব কথককে অস্তিত্বের সম্মুখিন করেছে। বুদ্ধদেব বসু তার বর্ণনার মাধ্যমে একটা অপর-বাস্তব অবস্থার তৈরি করে বাস্তবতাকে ধরতে চেয়েছেন। কথক চিন্তায় ও ভূমিতে এতটাই উন্মূল যে, এসবে তার আত্মসম্মান বাড়ছে মনে করছে, নিজের সম্পর্কে ‘অতিমাত্রায় সচেতন’ করছে। তার মনে হচ্ছে, ‘এতদিনে মানুষ হলুম, ভদ্রলোক হলুম।’ ফলে কথক তার পোশাক, চেহায় বদাল আনার চেষ্টা করছে। শেষ লাইনে এসে গল্পকার বলছেন, ‘তখন অবশ্য ভবিষ্যতের ভাবনা মনে ছিলো না, বালকত্বের খোলশ ছেড়ে খুব চটপট যুবাবয়সের মূর্তি ধারণ করাই ছিলো প্রধান লক্ষ্য।’ অর্থাৎ অনুচ্ছেদটির পূর্ণতা পাচ্ছে। একটি দীর্ঘ অনুচ্ছেদ শেষ হয়। এর মধ্যদিয়ে গল্প কোন দিকে যাবে তার একটা ইশারাও পেয়ে যাচ্ছি আমরা। এবং গল্পের শেষে পর্যন্ত আমরা সেই আশানুরূপ পরিণতি আশা করি।

গল্পের প্রথম অনুচ্ছেদের কথকের এতোসব আয়োজনের কারণ দেখতে পাই দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে গিয়ে। ‘এর অবশ্য আরো একটু কারণ ছিলো।’ কি সে কারণ? মনে এই প্রশ্ন নিয়ে আমরা গল্পে প্রবেশ করি। পরের বাক্যে লেখক উত্তর দেন ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি ছাত্রীও ছিলেন।’ গল্পটা রোমান্টিক মুড পায়। অনুচ্ছেদের শেষে বলে দেন কারণটুকু। সেখানে দুইশত ছেলের মাঝে মাত্র ছয়জন ছাত্রী ছিল। তার মধ্যে অপর্ণা দত্ত নামে এক তরুণী ভর্তি হয়েছিল। সে এই গল্পের নায়িকা। তাকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে সমস্ত ঘটনা। কিন্তু গল্প কোনো মাত্রায় নারী প্রধান হয়েছে উঠতে দেননি লেখক।


তৃতীয় অনুচ্ছেদে শুরুতে অপর্ণা দত্তের সামান্য বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে কথকের মনের বিভিন্ন মিথস্ক্রিয়াও দেখতে পাই। অপর্ণার উপস্থিতি যখন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে, বিশ্ববিদ্যায় দেখার ফলে তৈরি হওয়া ‘অতিমাত্রায়-সচেতনতা’ বিলিয় হয়ে যায় তখন এই আহŸান উপেক্ষা করেন। নিজেকে সচেতন দেখতে চান। ঘুম কাতর চোখে, আসলে ঘুমের মধ্যেই আছে সে, মাঝে মধ্যে শরীরের পশম ধরে টান দিয়ে নিজেকে সচেতন রাখার চেষ্টা। নিজের ভেতরের প্রবণতা, আগ্রহকে অবদমন করেন। মনের উপর তুড়ি বাজান। ‘এটা খুব সম্ভব আমার কল্পনা।’ কথক আকাক্সক্ষা-সুপ্ত বাসনা-বিশ্বাসকে ‘কল্পনা’ বলে গল্পকার আমাদের গল্প সম্পর্কে সচেতন করেদেন। এটা শুধু কথক নয়, গল্পকার হিসেবে বুদ্ধদেব বসুরও তুড়িবাজি। যা এক হেঁচকা টানে আমাদের গল্পের ভেতরে নিয়ে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই গল্পের অশোককের উপস্থিতিও কথকে অস্তিত্বের সম্মুখিন করে দেয়। অশোকের পোশাক, খরচের হাত, খেলাধুলা ও সাংকৃতিক কর্মকাণ্ডের পারদর্শিতা, সাহস সবই কথকের অস্তিত্বের জন্য একপ্রকার হুমকি। ‘সত্যি বলতে, ওর প্রতিদ্ব›দ্বী হবার মতো ছেলে আর ছিলো না।’ নিজের বিচ্ছিন্নতা থেকে তৈরি হওয়া জিঘাংসা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। দূর থেকে কারো উন্মেষ দেখে অবদমিত মনবাসনা চাগড় দিয়ে ওঠে। এই জিঘাংসা তাকে স্বস্থি দেয় না। তার চোখ হিরো তৈরি করে অন্যকে। যে শেষ পর্যন্ত অপ্রতিদ্ব›দ্বী হয়ে ওঠে সবার।

গল্পের অশোককের এই উপস্থিতি অনেক সময় মনে হয় একটি এন্টি-হিরো। অর্থাৎ অপর্ণার জন্য কথকের মনে অস্ফুট রসায়ন ও মিলনের মধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু গল্পের বয়ানে অশোককে আর এন্টি-হিরো হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। টোটাল কন্টেক্স দাঁড়ায় অশোক না হলেও কথক হয়তো অপর্ণাকে গ্রহণ করতে সচেষ্ট হতো না। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই অশোকের উপস্থিতির মাধ্যমে অপরবাস্তবতা তৈরি করে গল্পকার কথকের মনের বাস্তবতাকে ধরতে চেয়েছেন।

গল্পের চতুর্থ অনুচ্ছেদের শেষে ‘কতদিন আমাকে নিয়ে ক্লাশ পালিয়েছে, শীতের সুন্দর দুপুরবেলায় ঘাসে উপর ব’সে আমাকে শুনিয়েছে অফুরন্ত অপর্ণা-চরিত। এ ধরনের গল্প সাধারণত ক্লান্তিকরই হয়, কিন্তু আমি স্বীকার করবো যে, আর কিছু না হোক, বার-বার ঐ অপর্ণা নামটি শুনতেই আমার ভালো লাগতো।’ এখানে এসে গল্পের কথক, অপর্ণার সম্পর্কে খোলাখুলি হয়ে পড়ে, আগের মতো ঢাক গুড়-গুড়, ঢাক গুড়-গুড় মনোভাব আর রাখছে না। পরবর্তীতে আমারা খেয়াল করি এই ভাব বজায় থাকছে। অপর্ণার প্রতি তার দূর্দমনীয়টা স্বীকার করে নিয়েই বিষয় উপস্থাপন করছেন। গল্পে অশোক কথককে অপর্ণার কথা বলে। অশোক এ আচরণে যেমন যুব মনে প্রেমস্পর্ষী উত্তেজনা আছে। আবার গল্পকথকে প্রচ্ছন্ন প্রতিদ্ব›দ্বী ভাবছে। যে কারণে একধরণের আপ্যায়ন, আতিথিয়তা দিয়ে আসছে। গল্পকথাকে সঙ্গে না রাখতে পারলে অপর্ণার কাছে তার কদর থাকে না। অপর্ণার সাঙ্গ-সাহচার্য পাওয়ার জন্য প্রয়োজনে সে কথকে সঙ্গে নিতে বাধ্য হচ্ছে।

কন্যা আশির্বাদের দিন অপর্ণাই জিজ্ঞেস করে ‘এতদিন আসেননি কেন?’ নারীকে বন্দিরাখার দিনেও অপর্ণা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে তার অন্তর্হিত শক্তিরই পরিচয়ই দেয়। অপর্ণার প্রশ্নের জবাবে সে কেবল উত্তরই দিতে পারে। কোনো প্রকার আলাপ পাততে পারে না। তার সেই শক্তি সে সময় নেই। কথক বলে,‘অবিশ্বাস করিনি, তবে—’। তখন ধরা পরে তার মানসিক অবস্থা। অবিশ্বাস করেনি, তবে—তবে কি? বিশ্বাসও করতে পারেনি। বিশ্বাসের দায়-ভার তার মধ্যবিত্তিয় দোলাচলে থেকে সে বহনও করতে পারে না। তাই সে বিশ্বাস করেনি।

গল্পে বর্ণনায় তেমন আতিশয্য নেই। আছে গতি আর গীতিময়তা। সেদিকে দিয়ে গল্পে সংলাপও কম। শেষে অপর্ণা ও কথকের মধ্যকার কথা গল্পের দীর্ঘ সংলাপ। কিন্তু গল্পজুড়ে মন ও পরিস্থিত, ব্যক্তি ও বাস্তবতার যে দ্বন্দ্ব তা গল্পকে দাঁড় করে দিয়েছে।

প্রশ্ন হতে পারে, গল্পটাকে আমরা ট্রাজেডিক, না নিপাট প্রেমের গল্প বলবো। বদ্ধুদেব বসুর ছোটগল্পের দিকে খেয়ার করলে দেয়া যায়, তাঁর প্রথম দিকের প্রেমের গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে প্রসন্নতা ও সার্থকতা, দ্বিতীয় পর্বে এসে বিচ্ছেদ ও ব্যর্থতার দিকগুলো। এটি তার মধ্য সময়ের গল্প। গল্পটি নিঃসন্দেহে প্রেমের। এতে প্রেমের প্রগালভের চেয়ে এখানে প্রাধান্য পেয়েছে অ-প্রেমের যন্ত্রণা। গল্পে পাত্র-পাত্রীদের মানসিক সম্পর্কের মধ্যে বইয়ে দিয়েছেন সাহিত্যের ঘাত ‘ঠাণ্ডা আগুন’। এ আগুন আপাত দৃষ্টে দেখা যায় না, কিন্তু পোড়ায়। আবার প্রচলিত অর্থে যে ভাবে ট্রাজেডিকে বোঝানো হয়, তা না হলেও তিনি গল্পের ট্রাজেডিকে চাপাচ্ছেন বাস্তবতা তৈরি বা বর্ণনার মাধ্যম হিসেব। ফলে ট্রাজেডি ও রোমান্সে মিশেলে একটা চমৎকার গল্প পাই। তাছাড়া সাহিত্যে ‘ট্রাজেডিক এরর’ বলতে যা বোঝায় তা এখানে আছে। শেক্সপিয়রের নাটকে ওথেলোর ট্রাজেডিক এরর যেমন ছিল প্রবল ঈর্ষা, তেমনি এইগল্পের কথকের মধ্যে আছে ঔচিত্ত্য, অবদমন আর ভুলানুবাদের প্রবণতা।

‘আবছায়া’ শব্দের অর্থ ছায়ামূর্তি, অস্পষ্ট আকার। আবছায়া হলেও তাকে অস্বীকার করা যায় না। গল্পে কথকের কাছে অপর্ণার উপস্থিতি আবছায়া হয়েই আছে। গল্পের নামকরণের সার্থকথাও এখানে। কিন্তু পরাবাস্তববাদ বলে কথক কখনো স্বপ্ন ও বাস্তবের ভেদরেখা অতিক্রম করে যায়। যার মধ্যদিয়ে বেরিয়ে আসে মধ্যবিত্তের অবদমিত মনের সুস্পষ্ট ছবি। যা এই গল্পকে বাংলাসাহিত্যের অন্যতম সার্থক গল্পের পরিণত করেছে। ০


লেখক পরিচিতি:

অলাত এহ্সান
জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিকে কর্মরত। alatehasan@yahoo.com, ০১৭১৪ ৭৮৪ ৮৩৫

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন