শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

কিভাবে গল্পেএকটি নারী চরিত্র আঁকবেন

সাজেদা হক

ভাবছেন, চরিত্রের আবার নারী, পুরুষ কি? চরিত্র তো চরিত্রই। অবশ্যই আপনার ভাবনা ঠিক আছে। তারপরও নারী চরিত্র তৈরিতে একটু বিশেষ নজর দিয়ে থাকেন বিশ্বের নামকরা সব কবি-সাহিত্যিকরা। কারণটাও যুতসই। মিলিয়ে দেখতে পারেন:


১) চরিত্রটি প্রথমত চরিত্র, তারপর নারী চরিত্র হবে।


২) পুরুষ চরিত্রের প্রকৃত চেহারা দেখানোর জন্য সব নারী চরিত্রকেই যৌনাবেদনময়ী করার দরকার নেই। সবগুলো চরিত্রের মধ্যে একটি সুন্দর অনুপাত থাকুক।


৩) নারীকে শুধুই সেক্স সিম্বল হিসেবে উপস্থাপন নয় বরং এজন মহিলার আকর্ষনীয় দিকগুলো নিয়েই আপনার নারী চরিত্রটি অঙ্কন করতে পারেন।


৪) নারীর চরিত্র চিত্রন আপনার পাঠকপ্রিয়তার পারদ যেমন উচুতে তুলতে পারে, তেমনি নামাতেও পারে-এটা আপনি মানুন আর না মানুন। কারণ এটাই সত্যি। সুতরাং চরিত্রটি নির্মানের ক্ষেত্রে আপনাকে বিশেষ মনোযোগ দিতেই হবে।


৫) অনেক গল্পকারই তার বইয়ের কাটতির জন্য নারী দেহের বিভিন্ন অংশের বর্ননা এমনভাবে দেন যেনো কোন গল্প বা সাহিত্য নয়, পড়ছি একটি পর্নো। এমন গল্পকারেরা ক্ষণস্থায়ী হন। এটা এড়িয়েও একটি বর্ননা তৈরি করা সম্ভব।

৬) ভালো নারী চরিত্র বুদ্ধিমান, লাবন্যময়ী, মমতাময়ী হতে পারেন। মন্দ মহিলা চরিত্র হতে পারে যৌনাবেদনময়ী কিংবা অলস চরিত্রের।

৭) অলস, বদ ও দুষ্টু মহিলা চরিত্র নির্মাণের সময় ভাবনায় থাকে কুশ্রী কেউ আবার ভালো চরিত্রগুলো হয় সুন্দর। যেমন: সিনডারেলা ।

৮) অনেকেই নারীকে গভীর বিবেচক হিসেবে ভাবতে চান না। তারা বিচারক বা কোনো সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে নারী চরিত্র নির্মাণ করেন না। কিন্তু এমনও করা যায়, ভেবে দেখবেন।

৯) মোটামুটি অনেকেই নারী চরিত্রকে পুরুষ চরিত্রের সহায়ক হিসেবে চিত্রিত করেন যা একেবারে গতবাধা। এর বাইরে এসে নারী চরিত্রকেও একজন দক্ষ, প্রশিক্ষিত কিংবা পেশাদার হিসেবে উপস্থাপন করা যেতে পারে।

১০) নারীকে কাব্যিক উপস্থাপনেও বিশ্বাসী কেউ কেউ। এর বাইরে কিভাবে উপস্থাপন করা যা, তা নিয়ে চিন্তা করার সময় বুঝি এখনই।

১১) অনেক সময় নারী চরিত্র দিয়েই নারী দেহের এমন বর্ননা দেয়া হয় যা অপমানকর। সম্মান দিয়ে কথা বলাতেও যেনো লজ্জা তাদের। এরও ব্যতিক্রমী উপস্থাপনা চিন্তা করতে হবে।

১২) বিশেষ করে ছায়া নারী চরিত্রগুলো দিয়ে এমন পরিবেশ তৈরি করা হয় যাতে করে প্রধান নারী চরিত্রকে এমনভাবেই নিন্দা কিংবা নিন্দিত করা হয়। যা সমীচিন নয়।

১৩) সব নারী কিংবা শিশুরই একমাত্র চাওয়া বিবাহ হতে পারে না। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান প্রধান হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠেন। কেউ আবার হতে চান শিক্ষক। কেউ কেউ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মতো কঠিন পেশাও বেছে নেয়ার স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠেন। আপনার গল্প হোক সেইসব নারী চরিত্রকে ঘিরে। কি হতে পারে না?


১৪) নারী চরিত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে করে মনে হয়, নারীরা কেবল পুরুষের মনোরঞ্জনের জন্যই বেড়ে উঠছেন। সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলছেন। তার চিন্তা-ভাবনায় কেবলই পুরুষের মনোবাসনা পুরণ করার আকাঙ্খা। আসলেই কি তাই। আমাদের চারপাশের সব নারীরাই কি অমন করে ভাবেন? যদি না ভাবেন, তাহলে আমরা লেখকরা কেন সেভাবেই ভাবি, ভেবেছেন কখনও? না ভাবলে এবার ভাবুন?

১৫) এক্ষেত্রে একটি প্রবাদ বাক্য ব্যবহার করা যেতে পারে......শব্দের চেয়ে জোরে কথা বলে কর্ম। কথা সাহিত্যে কেন কেবল পুরুষ চরিত্র দিয়ে প্রেরণামূলক ঘটনাগুলো ঘটবে, কেন নারীও প্রেরণার উতস হয়ে উঠবেন না? নতুন লেখক হিসেবে এই বৈষম্য দুর করার দায়িত্ব কেবল আপনারই।

১৬) নারীর ক্ষমতায়নকে সচেতনভাবেই এড়িয়ে চলুন। ক্ষমতায়ন মানেই পুরুষের উপর নারীর চড়াও হওয়া নয়। বরং ক্ষমতায়ন মানে হলো, নারী শুধুই পুরুষের ভোগের বস্তু নয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম চিন্তার অধিকারী। যেকোন বিষয়ে স্বাধীন সিদ্ধান্ত ও মতামত দেয়ার অধিকারের নাম নারীর ক্ষমতায়ন।


১৭) কথাসাহিত্যে নারীর সবচেয়ে খারাপ উপস্থাপন হলো..কামনা চরিতার্থ করতে একজন নারীর ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দিয়ে পুরুষের কায়িক শক্তিকে ব্যবহার করা। নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা।

১৮) কথাসাহিত্যে “উদ্ধত” মহিলা চরিত্র সত্যিই চমৎকার যখন তা একজন পুরুষ চরিত্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। উদাহরণ হিসেবে শহীদুল্লাহ কায়সারের ‌সংশপ্তক’- এর কথা বলা যেতে পারে। এখানে হুরমতি চরিত্রটি, নেতিবাচক চরিত্র রমজানের কান কেটে দিয়ে নিজেকে প্রতিবাদী নারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। উপন্যাসকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা।

১৯) প্রেমানুপ্যাখ্যানে হিরোকে ভালোবাসার জন্য দয়া করে নারীকে যৎসামান্য কারণ দিয়েন না। নারী চরিত্রটি যেনো পুরুষের কেবল বাবড়ি দোলানো ঝাকড়া চুল দেখেই প্রেমে না পড়েন। তারচেয়ে নারীটি যেনো পুরুষ চরিত্রটির বৈশিষ্ট্য দেখে মুগ্ধ হন। তেমনি মেয়েটির চিন্তা-চেতনা-নীতি-নৈতিকতা যেনো পুরুষটির বেশি ভালো লাগার কারণ হয়। এভাবেই তো দৃষ্টিভংঙ্গি বদলাবে, তাই না?

২০) ভিডিও গেম ও কমিক্স চরিত্রে যেভাবে উপস্থাপন হয়, সেটা খুবই অসম্মানজনক। এ ধরণের চরিত্র তৈরি থেকে বিরত থাকাই উত্তম।

লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 










কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন