শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৫

ছুটির লেখা : আমার ছোট্ট মা

দাইফ মোঃ সম্রাট

গত পরশু বিকেলেই তোমার আগমন। যেন হুট করেই আকাশ হতে নেমে গেলে এই ধরণীতে। আরও ক'দিন পর ছিলো তোমার আসবার কথা। আমাদের যেন আর অপেক্ষা না করতে হয় এজন্যই বোধহয় তোমার চলে আসা। গত দু'টো দিন প্রচন্ড ব্যস্ততার কারণে পারিনি কিছু লিখতে। আগে হতেই ইচ্ছে ছিলো তোমায় নিয়ে কিছু লিখবার। ইচ্ছে ছিলো লিখে ড্রাফট করে রাখবো। যখন তুমি বড় হবে তখন হয়তো দেবো পড়তে। কিন্তু মানুষের জীবন নিয়ে তো কিছু বলা যায় না, তাই আগেই প্রকাশ করে দিলাম।



যেদিন খবর পেলাম আমার হারিয়ে যাওয়া মা আবারও ফিরে আসবে পৃথিবীতে সেদিন হতেই আমার কাছে প্রতিটি দিনই ছিলো এক একটি বছর। আর জানো তো, তোমার এই ছোট্টবাবা দূর পাহাড়ে থাকে শহুরের চাকচিক্য ছেড়ে। তোমার বাবা-মা যে সহজে খবর দিতে চাইতো না আমি দু:চিন্তা করবো বলে। তোমার ছোট'মা (Farheen) তো গত ক'মাস ধরেই পরিকল্পনা করে কূল পাচ্ছেনা। আদালত হতে এসেই বসতো কাঁথা সেলাই নিয়ে। এই মূহুর্তে মনে হয় তুমি তোমার ছোট'মার কোলেই শুয়ে আছো হাসপাতালে। একটু আগেও তোমার ছোট'মা ভাইবারে (VIBER) তোমার নতুন ছবি দিলো। তোমার নি:শ্বাস যেন এখান হতেও পাই আমি মা।


কতো কতো গল্প আছে বলবার তোমাকে। একটা মজার কথা হলো, তোমার বাবার তো সব সময়ই গতানুগতিক জীবনে অভ্যস্ত। কিন্তু তোমার ছোট্টবাবার জীবনে অনেক অনেক বেশি রকমের মজার, অদ্ভুত, রহস্যজনক ঘটনা ঘটেছে। সেসব যখন তোমায় শোনাবো, তুমি যখন হাসবে, অবাক হয়ে চোখ বড় করবে সেগুলো দেখবার জন্য আমার যেন তর সইছেনা। তোমায় শোনাবো এক দুষ্ট ছেলের কথা, যার দুষ্টোমীতে পাড়ায় ডাক পরতো। এক বাড়ি পালানো কিশোরের কথা যে পালিয়ে যেতো সেই দূর পাহাড়ে, সেখানের মাটির মানুষগুলোর ডাকে, পাহাড়ের ভালবাসার ডাকে। আমি জানি, কখনও তুমি হাসতে হাসতে বিষম খাবে, আবার হয়তো বা কোনো কাহিনী শুনে চোখের জল মুছবে। কিন্তু আমি যে তোমার চোখে কখনও অশ্রু দেখতে পারবোনা সোনা।


তোমার ছোট্ট'মার সাথে পরিচয়ের গল্প শোনাবো। কতো কবিতাতে যে আমি আছি তোমার ছোট্ট'মায়ের। এখন তো মনে হয় তুমিও থাকবে। শোনাবো আরও তোমার ছোট্ট'মাকে নিয়ে প্রথম পুরোনো ঢাকায় যাওয়া, হেঁটে বেড়ানো, নূরাণীর শরবতের গল্প। তোমার ছোট্ট'মাটা আমাকে ছাড়া কোথাও থাকতে পারেনা কিন্তু দেখো, এখন ঠিকই তোমার কাছে রয়েছে আমাকে ছেড়ে। মায়ের দেখাশোনা করতে হবে যে! তোমার ছোট্ট'মাকে কি বলে ডাকতাম জানো? "ছোট্ট রাজকুমারী" বলে। আমাদের বৃষ্টিতে দৌঁড়ঝাঁপ, পাহাড়ে দূরে কোথাও চলে যাওয়া, দূর গাঁয়ে পাহাড়ের মেয়ে এবং ছেলের বউ হয়ে কতো গল্প বোনা যে আছে আমাদের জীবনে! সব স্মৃতির বোতলে জমা রেখেছি তোমার জন্য মামণি।


স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের গল্প তো ফুরোবেই না। হারিয়ে যাওয়া প্রিয় দুই বন্ধু রাজিব আর মির্জার গল্প শুনে তুমি বলবে, অনেক মিস করছো ওদের।


তোমায় আরও শোনাবো সাহদাবের কথা।

আমার প্রথম ভালবাসা ছিলো সে। অনেক অনেক মজার কাহিনী ছিলো আমাদের। দেয়াল টপকে ছিলাম মাঝরাতে শুধু তাঁকে এক পলক দেখবার। কতো পাগলই না ছিলাম। বয়স অল্প ছিলো যে। সাহদাবও অনেক ভালবাসতো আমাকে। সে তো পৃথিবীতে নেই তবে আমার মনে হয় তোমার কথা ঠিকই জানে।


আর শোনাবো সত্যিকার এক ভিনদেশী রাজকুমারীর গল্প।

তোমার বোন আর আমার আরেক বাচ্চা বুনোবান্টি মাঝে মাঝে আমাকে ধরে রাজকুমারীর গল্পের জন্য। কিন্তু আমি যে শুধু একটা রাজকুমারীর গল্পই জানি মা। ঠিক দেবদূতের মতো আগমন ছিলো আমার জীবনে, আর ঠিক সেভাবেই যেন জীবনের দেবালয় হতে হুট করে চলে যাওয়া। অনেক সুন্দর গল্প আছে তাঁকে নিয়ে। সব তোমাকে শোনাবো। তবে কথা দিতে হবে কিন্তু। মন খারাপ বা কান্না করা চলবেনা।


হয়তো ভাববে তোমার ছোট্ট'মা রাগ করবেনা তো? নারে পাগলী, তোমার ছোট্ট'মা সব জানে। কি দেখে যে এই খারাপ মানুষটাকে বিয়ে করলো তোমার ছোট্ট'মায়ের মতো এত চমৎকার একজন মানুষ সেটা তুমিই অবাক হয়ে যাবে নিশ্চয়ই। যখন জীবনের কোণে আঁধার নামছিলো ঠিক তখনই আলো নিয়ে এলো তোমার ছোট্ট'মাটা। অনেক অনেক বেশি রকমের আগলে রাখে আমাকে। আর এখন তো তুমি ভাগ নিয়ে বসে আছো, হা হা হা।


আমার ভালবাসার ছোট্ট কিছু পিচ্চিপাচ্চা আছে ফেসবুকে, কিছু কাছের বন্ধু আছে, সবার গল্প শোনাবো।


পাহাড়ের গল্প তো শেষ হবেনা।

তোমার জন্য আমার পাহাড়ের পরিবারের সবার কতো উৎকন্ঠা। পারলে তো এখনই তোমায় নিয়ে চলে। এইখানেই যে তোমার ছোট্টবাবার মন পড়ে থাকে। মানুষের জীবনে কখন কি ঘটে সেটা তো সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ জানেনা। যদি তুমি বড় হবার আগেই আমি চলে যাই পৃথিবী ছেড়ে, গল্পগুলো শুনে নিও তোমার ছোট্ট'মা হতে। আর পাহাড়ে এলে কোনো এক পাহাড়ের গাঁয়ে হাত বুলোলেই আমার পরশটা পাবে সোনামনি। অনেক অনেক ভালবাসি তোমাকে। যাকে বেশি ভালবাসি, তার হতেই দূরে থাকি আমি, শুধু তোমার ছোট্ট'মাকে ছাড়া। ভয় হয়, ভালবাসাটা না হারাই।


তোমার ছোট্টবাবা

০৫/১২/২০১৪

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন