বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

নতুন বই : মেহেদী উল্লাহর রিশতা

পুরস্কারকে আমি সবসময়ই সন্দেহ করি। যারা পুরস্কার দেন আর  যারা পুরস্কার নেন--দুপক্ষেরই ঝামেলা আছে। মনে হয়--এদের কোনো সম্ভাবনা নেই। থাকলেও সেটা শেষ হয়ে গেল। শেষ করে দেওয়া হল। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো  ষড়যন্ত্রের অংশ এরা। মনে হয়-- বেশ একটা রাজা রাজা খেল শুরু হয়ে গেল। এ বলে আমায় দ্যাখ--ও বলে আমায় দ্যাখ। বেশ একটা দেখাদেখির ব্যাপার। সাজাসাজির ব্যাপার। হয়ে ওঠার ব্যাপার নয়। তখনই আশঙ্কা হয় ভিড় থেকে কোনো শিশু হেসে বলে উঠবে-- 'ও রাজা, তোমার পোষাক কোথায়'? 

ঈশ্বর যেন এই পুরস্কার আজাব থেকে আমাদেরকে রক্ষা করেন। এ বড় পাপ হে।
ফলে বাংলা একাডেমী, প্রথমালো, জেমকন এটসেটরা এটসেটরা পুরস্কার-ব্যাপারীরা সদা-সর্বদা পরিত্যাজ্য।
আমাদের মেহেদী উল্লাহও  জেমকম সাহিত্য পুরস্কার'২০১৪ পেয়েছেন। পুরস্কারটি পেয়েছিলেন তার প্রথম গল্পের বইটির জন্য। নাম ‘তিরোধানের মুসাবিদা’। পরে আমি মেহেদী উল্লাহ'র গল্প পড়ে দেখি--প্রবন্ধ পড়ে দেখি--কথা বলে দেখি,  বুঝতে পারি-- মেহেদী উল্লাহর পুরস্কারের দরকার নেই। তিনি লিখতে জানেন। পুরস্কার নিলে তাঁর নিজের নয়--দাতাদেরই মাংশ বৃদ্ধি ঘটে। তাঁর হাতে লেখা আছে। লিখতে জানেন। লিখতে পারেন। লিখছেন। এটাই তাঁর দ্বায়িত্ব। পুরস্কারের  টুপি বা টোপর তাঁর জন্য ফালতু ঝামেলা।
এ বছর বইমেলায় মেহেদী উল্লাহর দুটি বই বের হবে। একটি হল গল্পের বই--রিশতা। প্রকাশক শুদ্ধস্বর। মেহেদী আমাকে মাস কয়েক আগে গল্পগুলো পড়তে দিয়েছিলেন। আমি পড়েছিলাম। তাঁর গদ্য, আখ্যান নির্মাণ, লেখন ভঙ্গিমার মধ্যে শক্তি আছে। তিনি জানেন-- তিনি কি লিখবেন। কিভাবে লিখবেন। কখন লেখাটি হয়ে উঠবে। একজন প্রকৃত গল্পকারের জন্য এই জানাটা খুব দরকারী।

মেহেদী উল্লাহর একটি বেদনার অতীত আছে। এক মহা জলোচ্ছ্বাসে তার পরিবারের প্রিয়জনরা ভেসে গিয়েছিলেন। সেই বেদনার ভারটি তাঁকে লেখার রিশতায় বেঁধে রেখেছে। ফলে  তিনি ভেতর থেকেই লিখবেন--এটা আশা করা অন্যায় নয়। তিনি বলেন, তার যে দাদী সমুদ্রে ভেসে গিয়েছিল--তাঁর ছোট বোনটির মুখ  দাদীর মুখের মত । এই কথাটি তিনি বলেন--নিরাসক্তভাবে। পড়তে গিয়ে আমাদের চোখে জল নেমে আসে। এখানেই তাঁর সাফল্য।
তিনি বলেন,  'রিশতা' নাগরিক মধ্যবিত্তের বদলে যাওয়া রিশতা। কিন্তু প্রাচ্যের নাগরতা নিয়েই আমার যথেষ্ট প্রশ্ন আছে। এখানে ঠিক রাষ্ট্রও নেই--নাগরত্বও নেই। কোনো বদলের প্রশ্নই আসে না। এ দুটো শব্দই প্রতারণার বহুরূপতা মাত্র। সোজা কথায়-- শব্দের ধাঁধাঁ। ফলে, আমার ধারণা এগুলো নাগরিক মধ্যবিত্ত নয়--মধ্যবিত্তের গল্প। এরা এক সময় বাবু ছিলেন--সায়েব হয়ে উঠেছিলেন। লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান বলে গলা ফাটিয়েছেন। আবার একাত্তরে সেই পাকিস্তানকেই বিদায় করে দিয়েছেন। আর পেট্রোল বোমায় কারো সন্তান পুড়ে গেলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের সন্তানকে চোখে চোখে রাখেন। এ ছেলেটি বড় হলে তাকে খাইয়ে-পরে বাঁচিয়ে রাখবে।  আর মোনাজাতে বসেন--'হে পরওয়ার দিগার, তুমি আমাদের রক্ষা করো। তুমি ছাড়া আমাদের কেউ নাই'। আমি বা মেহেদী এই মধ্যেবিত্তের মানুষ। রাষ্ট্রের ভিকটিম।

মেহেদী উল্লাহ ত্রিশের অধিক গল্প লিখেছেন ইতিমধ্যে। লেখার সংখ্যা থেকে তাঁর মনে হয়েছে--লেখার জন্যই তাঁর জন্ম হয়েছে। এ বলাটা খুব আন্তরিক। ভান নেই। এ ধরনের ভান তাঁর ভেতরে থাকার দরকারও নেই। তিনিতো লেখকই। শক্তিশালী গল্পকার। জন্ম-গল্পকার।
মেহেদী উল্লাহ'র আরেকটি প্রকাশিতব্য বইও গল্পবিষয়ক। নাম ‘বাংলাদেশের ছোটগল্প: জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। এই নামে শহীদুল জহিরের একটা উপন্যাস আছে। তবে মেহেদী উল্লাহর এই বইটি প্রবন্ধের। প্রবন্ধগুলোতে রয়েছে-- পঞ্চাশ থেকে আশির দশক পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গল্পকারদের জীবন ও রাজনৈতিকধর্মী গল্পগুলোর বিশ্লেষণ। একজন গল্পকারের হয়ে ওঠার জন্য তার পূর্বসূরীদের বারবার তন্ন তন করে খুঁজে দেখাটা খুব  জরুরী । দরকার তাকে নানা কোণ থেকে প্রশ্ন করা-- উত্তর বের করা। সে কাজটিই মেহেদী উল্লাহ করেছেন। ফলে বইটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে সন্দেহ নেই। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন