বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার: অমর মুদি


যেকোন মহান সাহিত্যকর্ম বিষয়কে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে’


সাক্ষাৎকার গ্রহণ: অলাত এহ্সান

অমর মুদির অনুবাদরে খ্যাতি সীমান পেরিয়ে অনেক আগেই। পাঠকের কাছে তার অনুবাদ সমাদৃত, নন্দিত। দীর্ঘদিনের অনুবাদের কর্মে চমৎকার সব অনুবাদের ভরিয়ে তুলেছেন নিজের সৃষ্টির প্রাঙ্গণ। অনুবাদে তার যত্ন প্রশংসনীয়। ইংরেজি থেকে বাংলা তো বটে, বিপরীতটাও তার যত্নের হাত আছে। তাই বাংলা সাহিত্যকে তিনি সমৃদ্ধ করেছেন, আবার সমাদৃত করেছেন অন্যভাষী পাঠকের কাছে। অনুবাদক হিসেবে তার আবিষ্কার যথেষ্ট। তিনি কলকাতার মানুষ। গল্পপাঠের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি উন্মোচন করেছেন তার অনুবাদক চিন্তার নানা দিক। স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন অলাত এহ্সান।



অলাত এহ্সান: অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ। আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কি রকম?

অমর মুদি: আমার ‘অনুবাদ’ শুরু করার পেছনে একটা ঘটনা আছে। মনোহর শ্যাম জশির হিন্দি উপন্যাস ‘ক্যাপ’ আকাদেমি পুরস্কার পাওয়ার পর বইটা পরলাম। অদ্ভুত উপন্যাস। পঞ্চাশ দশকের কম্যুনিস্ট আন্দোলন নিয়ে গভীর বিস্লেসন।আমার মনে হল এ বই বাংলার মানুষ র পড়া দরকার। তাই সুরু করলাম। এক একটা কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়ার পর মনে হয় এটার অনুবাদ করতেই হবে, তখন সেটা শেষ করে তবে শান্তি। অনুবাদ করতে গেলে যা যা দরকার সেগুলো তখন জুটিয়ে নিই। ঠিক তাই হল অরহান পামুকের উপন্যাস ‘আমার নাম লাল’ পড়ে। পাগলের মত পাবলিশার খুঁজছি। কলকাতা বই মেলায় দেখা লুতফুর ভাই(সন্দেশ) র সঙ্গে। তাঁর উৎসাহে হাত দিলাম অনুবাদে। তারপর, দেখলাম অনুবাদ করতে গেলে তুর্কী ইতিহাস জানতে হবে। ইসলাম ধর্ম নিয়ে যত টুকু সম্ভব পড়লাম। তার ফসল ওই উপন্যাসের বাংলা রুপান্তর, জা আমাকে অনেক সম্মান এনে দিএছে।

আমার ধারনা প্রত্যেক অনুবাদের আলাদা প্রস্তুতি দরকার। তবে সেটা নিজের তাগিদে। বানিজ্যিক নয়।


অলাত এহ্সান: অনুবাদ তো শুধু ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবের অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ তো একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?

অমর মুদি: মুল লেখাটা বার বার পড়া ছাড়া অন্য কোন পথ নেই। যে কোন মহান সাহিত্য কর্ম বিষয় কে গভীর ভাবে বিশ্লেষণ করে। সেখানে পৌঁছনো চাই। তবেই সঠিক অনুবাদ সম্ভব।


এহ্সান: লেখার সঙ্গে, বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদির গভীর ভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য লেখকের দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি।

অমর মুদি: এতে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না। কোন লেখা পড়ে মুগ্ধ হই যখন তা হৃদয় কে স্পর্শ করে। আর সেটা একেবারে অজানা অচেনা কোন বিষয় নিয়ে হতে পারে না। তাই অনুবাদক সেই লেখা নির্বাচন করেন যার সঙ্গে তিনি একাত্ম বোধ করেন, যে বিষয় সম্বন্ধে তিনি অন্তত কিছুটা জানেন। আমি রকেট সায়েন্স নিয়ে কোন অনুবাদে হাত দেব না কারন আমি তার কিছুই জানি না।


এহ্সান: অনুবাদের দক্ষতা অর্জনের জন্য কোনো একটা দেশ বা মহাদেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেয়া উত্তম। তাই না?

অমর মুদি: ভাষা বেছে নেওয়া টা বাধ্যতা মুলক। যে ভাষা জানিনা তার থেকে অনুবাদ করা যায় না। তবে ইংরেজি অনুবাদ থেকে বাংলা অনুবাদ তো আকছার হছে। আমি আল্বানিয়ার লেখক ইস্মাইল কাদার র উপন্যাস ‘উত্তরাধিকারি’ অনুবাদ করেছি। কালজয়ী উপন্যাস। আমাদের দেশে কজন আল্বানিয়ান জানেন? তাহলে কি বাংলায় তার অনুবাদ হবে না? আমি যখন বই টা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কে দিয়েছিলাম উনি বলেছিলেন, ‘এই দুঃসাহস টা দরকার। তা না হলে ভাষা মরে যায়’। আর বিশেষ দেশ মহাদেশের মধ্যে অনুবাদকে সিমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা; বিশেষ করে সাহিত্যের ক্ষেত্রে তো কোন ভাবেই না।


এহ্সান: একজন লেখক তো লেখায় মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ-ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। এজন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক, নয় কি?

অমর মুদি: যে কোন অনুবাদক সেই প্রস্তুতি নিয়ে তবেই অনুবাদে হাত দেন। তাই এক জন অনুবাদক কে এক জন লেখক বেছে নিতে বলা টা অবিচার হয় না কি?


এহ্সান: একজন অনুবাদকের তৃপ্তি কোথায়, একটি অনুবাদ করায়, না একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে গভীরভাবে জানায়?

অমর মুদি: দুটোই। তবে আর একটা আনন্দ ও আছে, যেটা আমার জন্য বেশি জরুরী। আমি অরহান পামুকের ‘আমার নাম লাল’ পাঠক হিসেবে পড়েছিলাম, পরে অনুবাদ করতে গিয়ে যখন প্রতিটি শব্দ, বাক্য বার বার পরলাম তখন বুঝলাম এটা কেন বিশ্বের সর্বকালীন শ্রেষ্ঠ উপন্যাসের একটা। এক জন পাঠক এবং একজন অনুবাদক, দুজনের মধ্যে অনুবাদক ই গভিরতর ভাবে লেখা টা পড়ে এবং বোঝে।


এহ্সান: প্রায়ই শোনা যায়, অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়। অনুবাদকে সাহিত্য হয়ে ওঠায় অন্তরায়টা কোথায়? অনুবাদ কি ভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠতে পারে?

অমর মুদি: আজ বিশ্ব সাহিত্যে শুধু মৌলিক লেখা নয় অনুবাদের জন্যও অতোটাই সম্মান ও পুরস্কার দেওয়া হয়। কিছু কূপমণ্ডূক এটা স্বিকার করেন না। সেটা ওঁদের দুরভাগ্য। সাহিত্যের অনুবাদ translation নয় transcreation। একজন অনুবাদক মৌলিক লেখাটিকে নিজের ভাষায় পুনর্নির্মাণ করেন। শঙ্কর র উপন্যাস ‘চৌরঙ্গী’ ইংরেজি তে অনুদিত হয়েছে প্রায় তিরিশ বছর পরে। আজ সেটা বিশ্বের একটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। কারন, তা ইংরেজি ভাষাভাষী মানুষদের হৃদয় স্পর্শ করতে পেরেছে। তাই, অনুবাদও যে সাহিত্য এতে কোন দ্বিমত থাকতে পারে না।


এহ্সান: অনেক সময় দেখা যায়, কোনো লেখক বা দেশের কিছু গল্প অনুবাদ করেই তাকে ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ বলে দিচ্ছে। বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু থাকে না যে, এগুলো কেন শ্রেষ্ঠ গল্প। কিভাবে বাছাই করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?

অমর মুদি: এ নিয়ে কিছু বলতে চাই না। এটা অনুবাদক এবং প্রকাশক নিজেরাই ঠিক করবেন যে পাঠকের প্রতি তাঁদের উত্তরদায়িত্ব কতটা থাকা উচিত।


এহ্সান: আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা, বিশেষত ইংরেজি থেকে। তাহলে আমরা ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?

অমর মুদি: এ সম্বন্ধে আমার জা বলার আগেই বলেছি। শুধু এ টুকু যোগ করতে চাই মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করার যোগ্য লোক পাওয়া গেলে দ্বিতীয় ভাষা থেকে অনুবাদ করার দরকার পড়ে না। কিন্তু স্পানিশ বা ফ্রেঞ্চ র অধ্যাপক যে ভাল বাংলা ও জানবেন এবং ভাল অনুবাদক ও হবেন এমন কোন কথা নেই। আমার কাছে অনুবাদের সততা এবং সাহিত্য গুণ তার অনুবাদকের ডিগ্রীর থেকে বেশি জরুরি।


এহ্সান: অধিকাংশ অনুবাদই বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত, মানে ‘বেস্ট সেলার’ বইগুলো হয়ে থাকে। এই অনুবাদ দ্বারা একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?

অমর মুদি: বই র বাজারও অন্যান্য জিনিসের মত চাহিদা এবং যোগান এর উপর নির্ভরশীল। প্রকাশক কে ও বই বিক্রি করতে হবে যদি টিকে থাকতে হয়। অনুবাদক তখন ই অনুবাদ করবে যখন কেউ সে বই ছাপবে। তাই বাজার অর্থনীতির উপর নির্ভর করা ছাড়া কোন গতি নেই, যদি না সরকার এই ক্ষেত্রে সক্রিয় ভুমিকা নেন।


এহ্সান: বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যে গুলো ভাল, কিন্তু বহুল আলোচিত নয়। যেখানে প্রকাশকরাও বিনিয়োগ করতে চায় না। সেক্ষেত্রে মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?

অমর মুদি: কিছু ব্যাতিক্রমি প্রকাশক ও আছেন, বিশেষত বাংলাদেশে, যারা ভাল বিদেশি বই অনুবাদ করেন । তাঁদের কে উৎসাহিত করতে হবে রুচিশীল পাঠকদের। এক্ষেত্রে সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলিও বড় ভুমিকা নিতে পারে। মূল কথা হল কোন বইটা ভাল, কোনটার অনুবাদ হওয়া বেশি দরকার কে বলবে? আর আজকে এক একটা বিদেশি বইএর অনুবাদ স্বত্ব কিনতে জা খরচ করতে হয় তা দেবার ক্ষমতা অনেক প্রকাশকের ই নেই। অতএব, রাষ্ট্র যদি অনুবাদ কোষ র মত কোন ব্যাবস্থা নেন তাহলে কিছু সুরাহা হতে পারে।


এহ্সান: একটি দেশ উপনিবেশ মুক্ত হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তাশীল বইগুলো ব্যাপক ভাবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই, দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। আমাদের দেশে তা হয়নি। এটা কি আমাদের দেশের সাহিত্যের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে মনে করেন?

অমর মুদি: আমি ব্যাক্তিগত ভাবে মনে করি রাষ্ট্র অনুঘটক র দায়িত্ব নিতে পারে। তার বেশি কিছু করা সম্ভব নয়, উচিত ও নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিদেশি ভাষা থেকে নিজের ভাষায় এবং দেশীয় ভাষা থেকে অন্যান্য ভাষায় অনুবাদে প্রোৎসাহন দেওয়ার জন্য আর্থিক সাহায্যের ব্যবস্থা আছে। তবে তার নীতি নির্ধারণ এবং প্রয়োগ করেন সাহিত্য সংস্থা। আমাদের দেশেও এই ধরনের সংস্থা আছে। তবে এতটা সক্রিয় নয়, জার কারন আর্থিক এবং মানসিকতার দৈন্য, দুটোই। এই অবস্থা বদলাতে হবে। আশা রাখি, নিকট ভবিষ্যতে ভাল দিন আসবে। আবারো বলছি, একটা দেশের সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি অঙ্গাঙ্গী জড়িত। একটা কে বাদ দিয়ে অন্যটা চলতে পারে না।


এহ্সান: ট্যাকনিক্যাল শব্দগুলো ছাড়াও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সংকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরির তেমন কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কি করনীয়?

অমর মুদি: সব ই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ র জন্য ছেড়ে দেওয়া কি ঠিক? বাংলা ভাষা আজকে যেখানে পৌঁছেছে তার পেছনে এমন মানুষ ও আছেন যিনি বাংলা অভিধান লিখতে নিজের সব সুখ, পরিবারের সুখ বিসর্জন দিয়েছিলেন। এই ব্যাক্তিগত ত্যাগ ছাড়া কোন ভাষা শীর্ষে পৌঁছয় নি।


এহ্সান: অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি স্থাপন করা দরকার। আপনার কি মনে হয়? আমরা কিভাবে মানসম্মত অনুবাদ পেতে পারি?

অমর মুদি: যারা বই পরে, বই কেনে তারাই সব থেকে বড় রেগুলেটর। বাইরে থেকে কোন রকম হস্তখেপের সমর্থন আমি করিনা।


এহ্সান: অনেকেই পাঠের জন্য মূলগ্রন্থ পাঠকেই গুরুত্ব দেন। লেখক প্রস্তুতি হিসেবে অনুবাদ সাহিত্য পাঠকে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

অমর মুদি: লেখক লেখে নিজের তাগিদে। তার জন্য তার কতটা প্রস্তুতি দরকার সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে। বিশ্ব সাহিত্যে র গতি প্রক্রিতি জানতে হলে অনুবাদ পড়া ছাড়া গতি নেই। এটা এক ধরনের কষ্টি পাথর, যেখানে লেখক নিজের লেখার গুনাগুন বিশ্ব সাহিত্যের মানদণ্ডে জাচাই করে নিতে পারেন। আর মূল গ্রন্থ পাঠ তো লেখকের রসদ। সেটা পড়তে পারলে অনুবাদ পড়ার দরকার হয় না।


এহ্সান: প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হয়। তার সবই জনপ্রিয় ও বহুলালোচিত গ্রন্থ। অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক বা বই, অনুবাদকের তেমন কোনো আবিষ্কার নেই। এটা কি অনুবাদকের দূর্বলতা, না অন্যকিছু?

অমর মুদি: এর উত্তর আগেই দিএছি।


এহ্সান: রবার্ট ফ্রস্ট, টি এস এলিয়ট, শার্ল বোদলেয়ার, শাহানামা অনেক অনুবাদ করেছেন; কিন্তু শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কেউ করতে পারেননি মনে করা হয়। কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলে সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনি কি মনে করেন?

অমর মুদি: কবি এবং গল্পকার দুজনের ই ভাষার ওপর সমান দখল থাকে। তাই এরকম কোন ফরমুলা আছে বলে আমি মনে করিনা। যাদের নাম উল্লেখ করেছেন তাঁরা ছাড়াও সুভাষ মুখপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ ইত্যাদি্র গদ্যে এবং পদ্যে সমান দখল। এঁদের ছোঁয়া যেখানে লাগে সেখানেই ফুল ফুটে ওঠে। অনুবাদকের প্রতিভা, নিষ্ঠা ই অনুবাদ কে সফল করে। সেখানে কোন রেখা টানা অসম্ভব।


এহ্সান: অনুবাদ তো দুইভাবেই হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশি ভাষায়, দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায়। আমরা কিন্তু তা দেখছি না। এর কারণ কি? এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় কি বলে মনে করেন?

অমর মুদি: দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করব আমরা, যেমন বিদেশি সাহিত্য করছি। তার জন্য আমাদের কে বিদেশি ভাষা জানতে হবে। যোগ্য লেখা বাছতে হবে। বাজার খুঁজতে হবে। এগুলো করবে কে? রবিন্দ্রনাথ তাঁর গিতাঞ্জলি র অনুবাদ নিজেই করেছিলেন। বিশ্বের দরবারে রেখেছিলেন অসীম আত্মবিশ্বাস নিয়ে। আজকে বাংলার অনুবাদক, সাহিত্যিকদের লেখার মান বিশ্ব সাহিত্যে স্বীকৃত। নিজেদের কে ছড়িয়ে দেওয়ার স্পর্ধা রাখতে হবে।


এহ্সান: এবার বই মেলায় আপনার একাধিক অনুবাদ গ্রন্থ বের হচ্ছে। সে সম্পর্কে বলুন।

অমর মুদি: আমার অনুবাদে ‘Selected Bangla One Act Plays’ (Publisher: Sahitya Akademi, New Delhi) এবং ‘বড়দের ছোটবেলা’ (ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট) থাকবে। তা ছাড়াও আমার ইংরেজি উপন্যাস Curse of Badam Pahar: Savages of the East(Lifi Publishers, New Delhi) কোলকাতা বই মেলা তে প্রকাশিত হছে।


এহ্সান: অনুবাদের জন্য ওই লেখদের/গল্পগুলো বেছে নিলেন কেন?

অমর মুদি: বাংলা নাটক, বিশেষ করে একাঙ্ক নাটক অত্যন্ত সমৃদ্ধ। অথছ, বাংলার বাইরে তার কন পরিচয়ই নেই। ওই যে আপনার কথাঃ দেশি ভাষা থেকে বিদেশী তে- সেই উদ্দেশ্যে আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। ওতে বাংলার শ্রেষ্ঠ ন জন নাট্যকারের ন টি নাটক আছে। আর আমার উপন্যাস আমার জেলা মেদিনীপুরের কৃষক আন্দোলন নিয়ে। এটিও আমার অনেক প্রিয় একটি বিষয়, যা নিয়ে কয়েকটি ছোট গল্প আগেও লিখেছি।


এহ্সান: (এখানের কোনো গল্প যদি আগেও কেউ অনুবাদ করে থাকেন)এখানে অনেক গল্প তো আগেও অনুবাদ হয়েছে। আপনিও করলেন। ব্যাপারটা মনোটোনাস হয়ে গেল না? কিংবা আপনার বিশেষত্ব কোথায়?

অমর মুদি: এগুলো আগে অনুদিত হয় নি।


এহ্সান: অনেকে মূল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে মানে আক্ষরিক বা মূলানুগ অনুবাদ, কেউ ভাবগত বা মূলবক্তব্যকের দিক খেয়াল রেখে অনুবাদ করেন। কোন ধরনের অনুবাদে প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বলে আপনি মনে করেন? কেন?

অমর মুদি: এই তিনটি বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা দরকার।


এহ্সান: অন্যান্য অনুবাদক থেকে নিজেকে কিভাবে আলাদা করেন?

অমর মুদি: আমি নিজেকে আলাদা ভাবি না।


এহ্সান: অনুবাদকের স্বাধীনতা, শব্দ তৈরি ইত্যাদি দিক অনেকে সামনে আনেন। এটাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? তা ছাড়া অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীনতা আছে কি?

অমর মুদি: এর অনেক দিক আছে জা এখানে আলোচনা করা যাবে না। অনুবাদাকের স্বাধীনতা আছে কয়েকটি ক্ষেত্রে, আবার নেই ও অন্য জাইগায়।


এহ্সান: অনুবাদ আমাদের সাহিত্যে কী অবদান রাখছে?

অমর মুদি: আগেই বলেছি।


এহ্সান: অন্য একটি ভাষায় লেখা অনুবাদ হচ্ছে। অথচ লেখক জানছেন না, রয়েলটি পাচ্ছেন না। মূলানুগ অনুবাদের জন্যও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে না। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?

অমর মুদি: এটা বে আইনি।


এহ্সান: লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের কথা প্রায়ই শোনা যায়। আমাদের দেশে অনুবাদের তেমন পেশাদারিত্ব দেখছি না। অনুবাদের মানোন্নয়নের জন্য পেশাদারিত্বের ভূমিকা কী মনে করেন আপনি?

অমর মুদি: আমাদের দেশে যা নেই তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। তবে এর প্রয়োজন অনস্বীকার্য।


এহ্সান: নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। আজকের দিনে অনেকের মধ্যে অনুবাদক হওয়ার চিন্তাও দেখা যায়। অনুবাদক তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমটি আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? আদৌ কি তেমন কোনো মাধ্যম আছে?

অমর মুদি: আজকাল অনুবাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। যে কন প্রথাগত শিক্ষা মৌলিক বিষয় গুলো জানিয়ে দেয়। কিন্তু, আসল জিনিস টি হল দুটি ভাষায় দখল এবং অনুবাদের কাজটিকে ভালবাসা। লিটল মাগ এ যারা যুক্ত তাঁদের সাহিত্যের প্রতি ভালবাসার কোন তুলনা নেই। তাই, ওখানেই লেখক, কবি তৈরি হয়, অনুবাদক ও।


এহ্সান: অনুবাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে পদকও দেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের দেশে মানসম্মত অনুবাদের ক্ষেত্রে কি কোনো ভূমিকা রাখছে?

অমর মুদি: যে কোন পুরস্কার, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার মানুষ কে অনুপ্রানিত করে। তাই এর এক্তা বিশেষ ভুমিকা আছে বইকি।


এহ্সান: এই মুহুর্তে দেশে যে অনুবাদ হচ্ছে, তার মান নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?

অমর মুদি: সন্তুষ্টি কথাটা গোলমেলে। সব কিছুর ই আরো ভাল হয়। তাই শব্দ তা আপেক্ষিক।


এহ্সান: আমাদের দেশে অনেক অনুবাদক আছেন। বাজারে তাদের অনেক বইও আছে। আপনি কাদেরকে আদর্শ অনুবাদক বলে মনে করেন?

অমর মুদি: এ নিয়ে কিছু বলতে পারবো না।

এহসান : আপনাকে ধন্যবাদ।
অমর মুদি : আপনাকেও ধন্যবাদ।





সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান 

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। 




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন