বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

উপন্যাসে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নৃতাত্ত্বিক কাহিনী : শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী

অনুপম হাসান

শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী উপন্যাসের ঘটনা-প্রবাহের উপস্থাপন কৌশল পাঠকবৃন্দ কতটা গ্রহণ করবেন কিংবা বর্জন করবেন তা ভবিষ্যতের বিষয়। তবে উপন্যাসের বিষয় বর্ণনা ও ঘটনার বিবৃতি প্রদানে ঔপন্যাসিক শিমুল মাহমুদ নতুনত্বের পরিচয় দিয়েছেন।

উপন্যাসটির সূচনায় ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন, বিলুপ্ত-প্রায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শীলদের প্রতিনিধি অশোক শীলের প্রচলিত রাষ্ট্রীয় নিয়মের অধীনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। তার মৃত্যুদণ্ড এ উপন্যাসের মূল পরিণতি। অথচ ঔপন্যাসিক কাহিনীর শুরু করলেন শেষ থেকে। অশোক শীলের নির্মম মৃত্যুদণ্ডের কাহিনী ফ্ল্যাশ-ব্যাক পদ্ধতিতে নানান ঘটনা, উপ-ঘটনা, সূক্ষ্ম জীবন-বিশ্লেষণের বিষয়াদি তুলে ধরেছেন। তাঁর এই পশ্চাৎ-দৃশ্যপট কৌশলে শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী-তে ধরা পড়ো  ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শীলদের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় এবং ভৌগোলিক অবস্থানের বিষয়টি। তারা যখন বঙ্গভূমিতে বসতি স্থাপন করেছিল, সে-সময় থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত একটি জাতিগোষ্ঠীর উত্থান-পতন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং সর্বোপরি একুশ শতকে ধর্মের যূপকাষ্ঠে তাদেরকে কিভাবে বলী দেয়া হচ্ছে, ঔপন্যাসিক তা দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রযন্ত্র-কর্তৃক অশোক শীলের অন্যায় ফাঁসি কার্যকর করণ সেই রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি মানুষের আনুগত্যের মধ্য দিয়ে মানব-দাসত্ব বিষয়কে পাঠকের সামনে তিনি স্পষ্ট করে তুলেছেন। 

শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী-তে লেখক যে জীবন-সমীা করেছেন তা আমাদেরকে যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়, তা হচ্ছে এই যে, একুশ শতকের বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক, উগ্র-মৌলবাদী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে। জনগণের প্রতিনিধি হয়ে পার্লামেন্ট মেম্বর (এমপি) সাহেবের পরামর্শে মসজিদের ইমাম সাহেব ঘোষণা করেন, ‘...কাফেরের লাশের দায়িত্ব রাষ্ট্রের অথবা ধর্মের নয়, ওটা মর্গে পাঠিয়ে দিন।’ 

অশোক শীল ‘কাফের’, কখনো তিনি মানুষের মর্যাদায় উন্নীত হতে পারেন নি। কলেজ- শিক্ষক অশোক বাবু একুশ শতকের বাংলাদেশে এখনো একটি জাতি-ধর্মের পরিচয়ে পরিচিত হন ‘কাফের’ হিসেবে। অশোক বাবুকে অন্যপরিচয়ে অর্থাৎ মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে নি সমকালের বাংলাদেশ। এজন্যই আমাদের জাতীয়  সংসদের সম্মানিত সাংসদের কুমন্ত্রণায় অশোক শীলের মৃতদেহ সৎকারে সরকারের কোনো দায়িত্ব না-থাকার কথা মসজিদের ইমাম সাহেব ঘোষণা করেন। ঔপন্যাসিক শিমুল মাহমুদ বলতে চান, বাংলাদেশ কাগজে-কলমে ও সাংবিধানিকভাবে অসামপ্রদায়িক রাষ্ট্র হলেও একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, অথবা মৌলবাদী মুসলিম সম্প্রদায়ের হাতের ক্রীড়নক হয়েছে।
অশোক শীল ও শীলগোষ্ঠীর মূল অপরাধ ছিল তাদের ধর্ম, উপরন্তু তারা আক্রান্ত হয়েছে ধর্ম-কেন্দ্রীক ভোটের রাজনৈতিক কূট-ষড়যন্ত্রে। কূট-ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হয়ে শীল গোষ্ঠীর যোগ্য প্রতিনিধি অশোক শীলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষগুলো তাদের অস্তিত্ব রার সংকটে পড়েছে। যে ভূমিতে শীলরা হাজার বছর পূর্বে বসতি স্থাপন করেছিল সেখানে তারা আজ তাদের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমপ্রদায়ের কতিপয় বিবেকবর্জিত মানুষ তাদের জায়গা-জমির সাথে সাথে নারীদেরকেও হরণ করছে। ঔপন্যাসিক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই সংঘাত এবং এর দ্বন্দ্বকে চিত্রিত করেছেন।

আমাদের মাথার ভেতরের বাসনা পূর্ণ হবার নয়। আমরা বাসনার দাস। অথচ, সময় গেলে হবে না সাধন। অথচ, নেতৃত্বের বাসনা। সম্পদের বাসনা। পরমায়ুর বাসনা। যৌবনের বাসনা। (পৃ ৯৪)

শীল জাতিগোষ্ঠীর ক্ষয়িষ্ণুতা বা ক্ষয়রোগের যে প্রতীকী কারণ নির্দেশ করেছেন ঔপন্যাসিক তা সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর ‘লিবিডো’ তত্ত্ব-প্রভাবিত। কেননা এই ‘বাসনা’ শুধু শীল জাতির মধ্যে নয়, পৃথিবীর সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যেই রয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে আমরা মানুষের অন্তহীন অভাববোধের তত্ত্ব দিয়ে বুঝে নিতে পারি। অর্থাৎ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই, অন্তহীন ‘বাসনা’ পূরণের পরিক্রমায় আমরা কখন যে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে যাই তাও জানি না। এ ধরনের একটি প্রতীকের মাধ্যমে শিমুল মাহমুদ শীলগোষ্ঠীর বিলুপ্তির যথার্থ উৎস নিরূপণ করতে পেরেছেন বলে মনে হয়।

যুবতীর শরীর কেঁপে ওঠে। বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যেতে চায়। পদযুগল শক্তি পায় না। নিমিষেই নৃত্যের তী্ক্ষ্ণ শক্তি যা শতধা বিচ্ছূরণে পুরুষের শরীর ক্ষতবিক্ষত করে তোলে, সেই শরবিলুপ্তা রমণী কমলা ভারি চোখ তুলে ভীনদেশীর চোখে চোখ রাখে। তাকে বিনীত আকুলতায় নিমন্ত্রণ জানায় রাতে তার অতিথি হবার জন্য। (পৃ ৭৫)

এই উপন্যাসে আধুনিক জীবনকেও লেখক দেখার চেষ্টা করেছেন প্রাচীন-বাংলার জীবনব্যবস্থার প্রতিবিম্বে। কিন্তু সেই দেখার মধ্য দিয়ে ঔপন্যাসিক প্রাচীন বাংলার জীবনযাপনের নৃতাত্ত্বিক উৎসও খুঁজে বেড়িয়েছেন। তিনি ঐতিহাসিক কিংবা পৌরাণিক কাহিনী-ঘটনা উপন্যাসের কাহিনীতে অভিনব কৌশলে ব্যবহার করেছেন। একইভাবে দিগ্বিজয়ী কলম্বাসের ভারত অভিমুখে যাত্রা, এবং শেষ পর্যন্ত ভারতে পৌঁছতে না-পারার মতো ঐতিহাসিক ঘটনাকেও কৌশলে এবং ফ্রয়েডীয় ‘লিবিডো তত্ত্ব’র মোড়কে ব্যক্ত করেছেন। এখানে তিনি কলম্বাসকে চিত্রিত করেছেন এক কামকাতর উচ্চাকাঙী দুঃসাহসী পুরুষরূপে। 

আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ নামক একটি নামসর্বস্ব গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় মানবমুক্তির অচরিতার্থতার চরম দৃষ্টান্ত ঔপন্যাসিক দেখিয়েছেন শীলগোষ্ঠীর প্রতিনিধি অশোক শীলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ ঔপন্যাসিক উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে প্রতীয়মান করেছেন আজকের পৃথিবীতে মানুষ এখন আর মানুষের দাস নয়, বরং সে রাষ্ট্রের দাস। অর্থাৎ সভ্য-পৃথিবীর মানুষ রাষ্ট্র নামক প্রতিষ্ঠানযন্ত্রের দাসে পরিণত হয়েছে। অশোক শীলের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী শীল’রা তাদের বিপন্নতার সমূহ আভাস পেয়েছে, তেমনি মানুষ হিসেবে রাষ্ট্রের কাঠামোকে ভাঙতে না-পারা মানুষের দাসত্বকে বড় করে দেখিয়েছেন ঔপন্যাসিক। 

শিমুল মাহমুদ উপন্যাসে মানবসত্তার রাষ্ট্রীয় দাসত্বের মুক্তি চেয়েছেন। তিনি প্রশ্ন তুলতে চেয়েছেন, মানবজাতি কি রাষ্ট্রের দাসত্ব মেনে নেবে, নাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামো পরিবর্তনের কথা ভাববে? ঔপন্যাসিক মূলত একটি রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের আকাঙায় শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী উপন্যাসে অশোক শীলের মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে মানবতা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সংস্কৃতি সংরক্ষণের প্রশ্নটিকে সামনে নিয়ে এসেছেন।


শিমুল মাহমুদ, 
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী, ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ, ঢাকা, ১২০ টাকা 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন