বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

যে ফেরেনি

অমর মিত্র


ঘটনার বিবরণে প্রকাশ জনৈক বিনয় মন্ডল সাকিন বোয়ালঘাটা, থানা দেগঙ্গা জিলা চব্বিশ পরগণা, বিকেলবেলায় তার ছোট্ট মেয়েটিকে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসিয়ে ঘরে ফেরার পথে প্রথমে আক্রান্ত হয় নির্জন পথের উপর। পথ সেই সময় নির্জন ছিল অথবা ঘটনার মুহূর্তে জনশুন্য হয়েছিল কিনা তা এখন বলা যাবে না। বলা কষ্টকর কেননা আক্রান্ত বিনয় মন্ডল এখন বেঁচে নেই এবং আক্রমনকারীর দল গাঁ ছাড়া। চারপাশের সকলে মুখ বুজে। কেউ কিছু বলছে না, বলতে চাইছে না।


অথচ এটাও তো ঠিক, সেদিন ছিল শুক্রবার। শুক্রবার বিনয় মন্ডলের গ্রাম বোয়ালঘাটা থেকে মাইলখানেক দুরে শিমুলগাছি গাঁয়ের প্রান্তে হাট বসে। যে পথে বিনয় মন্ডল তার নরম তলপেটে তীক্ষ্ণ ভোজালিতে এফোড় ওফোড় হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল, সেই রাস্তাটি দক্ষিণে টাকিরোড উত্তরে দত্তপুকুর রেলস্টেশন, এই দুয়ের যোগাযোগের একমাত্র উপায়। শিমুলগাছি গ্রামটি টাকিরোড থেকে মাইলতিনেক এবং দত্তপুকুর রেলস্টেশন থেকে মাইল আটেক। বোয়ালঘাটা মূল রাস্তাটির গায়ে নয়, একটু ভিতরে ঢুকতে হয় কাঁচা রাস্তা দিয়ে। টাকিরোড এবং দত্তপুকুর রেলস্টেশনের সংযোগকারী এই রাস্তাটি গতবছর পঞ্চায়েতি কর্মযজ্ঞে মোরাম বিছানো এবং শিমুলগাছি হাটটি নেহাত ছোট নয়। ছোট নয় এই কারণে যে সেই হাটে গরুও কেনাবেচা হয়। আর লোক সমাগম হয় প্রচুর।

শিমুলগাছি হাটে পৌঁছানোর খুব বেশি উপায় নেই, অন্তত এই বর্ষায় প্রায়ান্ধকার দিনে। অন্য সময় থাকত, মাঘ ফাল্গুন বা বৈশাখে। তখন মাঠ শুকনো, ফসলশূন্য হয়ে আলে আলে পথ, মাঠের ভিতর দিয়ে পায়ে চলার ঘাসমরা পথ, কত পথ! কতগুলি অভিসারি রশ্মির মত মানুষ মাঠে মাঠে, শুকনো ক্ষেতের ভিতর দিয়ে শিমুলগাছিতে এসে মিলিত হয় যেন দলে দলে। অথচ এই ঘন মেঘের দিনে, যখন মাঠে মাঠে পাট কেটে ধান বোনার আয়োজন সম্পূর্ণ, তখন মাঠের আলের পথ সম্পূর্ণ উধাও। গত বছর খরায় ভাল চাষ হয়নি, এ বছর আকাশে ভালরকম মেঘের ঢাল। আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমেছে ক’দিন আগে। ফাল্গুন চৈত্রে বা অগ্রহায়ণ পৌষে যে পথগুলি নানাদিক দিয়ে মাঠে মাঠে শিমুলগাছিতে এসে পড়ত তারা এখন জলমগ্ন। সদ্য রোয়া ধানের চারা মেঘের নিচে জোলো বাতাসে দুলছে। সুতরাং বর্ষার দিনে হাটে আসতে হ’লে মানুষকে অনেকটা ঘুরে টাকিরোড দত্তপুকুর রেলস্টেশন, এই দুইয়ের সংযোগকারী মোরাম বিছানো রাস্তাটিই ধরতে হয়।

সুতরাং যে বিকেলটি ছিল বর্ষাস্নাত, স্নিগ্ধ, বেশ কয়েকদিনের মেঘ অন্ধকারের পর রৌদ্রময়; সেই রৌদ্রময় কালবেলায় এই মোরাম বিছানো রাস্তায় কেউ থাকবেনা এটাই আশ্চর্যের। নাকি সকলে জেনে গিয়েছিল সেদিন ওই পথের উপর কিছু ঘটতে যাচ্ছে। যাইহোক, এই ঘটনার কোন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি বিনয় মন্ডলের কন্যা পদ্মাবতী ব্যতীত।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ বোয়ালঘাটা গ্রামে চাপা উদ্বেগ শুরু হয়ে গেছে এবং বিনয় হত্যার পরের দিন তিন ব্যক্তি উধাও। কে বা কারা বিনয়ের তলপেট ভোজালি দিয়ে খুঁচিয়ে তাকে ফেলে উধাও হয়ে গিয়েছিল গাঁ থেকে তা তাদের উধাও হওয়া থেকে আবছা ধারণা করা যায়।

সামান্য বিবরণে প্রকাশ সাইকেলের ক্যারিয়ারে দুইদিকে দুই পা ঝুলিয়ে বসা তার বছর চারেকের মেয়ে পদ্মাবতীকে নিয়ে বিনয় ফিরছিল হাট থেকে বোয়ালঘাটা। পদ্মাবতী শিমুলগাছি হাট থেকে লাল রিবন কিনে মাথায় বেঁধেছিল, গায়ে তার নতুন ফ্রক। অনেকদিন পর বাবাকে চিনছিল সে এই নতুন ফ্রক আর রিবনের ভিতর দিয়ে। তার সাড়ে তিন বছর বয়সে বাবা বাড়িছাড়া হয়েছিল। ছ মাস বাবাকে না দেখায় কম বয়সের দুর্বল স্মৃতিতে বাবার মুখ অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল।

হ্যাঁ, একথা জানানো প্রয়োজন বিনয় মন্ডল গত ছ মাস পরে বাড়ি ফিরছিল দিন তিনেক। ফিরেছিল কেননা ভাল বর্ষা নামায় চাষের টানে টানে তাকে ফিরতে হয়েছিল। বিনয় মন্ডলের তিন বিঘের জমির ধান গত বছর খরায় সম্পূর্ণ পুড়ে গিয়েছিল। এ বছর আকাশে মেঘের অপরূপ ঘনঘটা তাকে দূরে রাখতে পারেনি। এক বছর খরা, এক বছর বর্ষা, এ-তো লেগেই আছে। সুতরাং এবার চাষে নামতে না পারলে তাকে আরো দুবছর অপেক্ষা করতে হত জমির ফসলের জন্য। জমি এবং মেঘ তাকে টেনে এনেছিল গাঁয়ে, তার সঙ্গে পদ্মাবতী তো ছিলই। জমি এবং মেঘের ভূমিকা এখানে বুঝি নিয়তির। এবছর খরা হলে বিনয় হয়ত বাঁচত কেননা তাহলে তাকে ফিরতে হতো না গ্রামে...ইত্যাদি ইত্যাদি।



দুই


বিবরণ প্রকাশ জনৈক সুবল গায়েন সাকিন বোয়ালঘাটা থানা দেগঙ্গা, অগ্রহায়ণ মাসের রাতে ঘন শীত আর কুয়াশার ভিতরে দত্তপুকুর-টাকিরোড এই দুয়ের সংযোগকারী মোরাম বিছানো পথের ধারের জনশূন্য খটখটে নয়ানজুলিতে ছিন্নমুন্ড নিয়ে সারারাত শিশিরে ভিজেছিল। সেদিন শীত খুব ঘন হয়ে পড়েছিল, আর এবছর তো এমনিতেই শীতের প্রকোপ খুব বেশি। ভাল বর্ষা হ’লে ভাল শীত পড়ে। আশ্বিন মাসের শেষাশেষি আরম্ভ হয়ে গেছে শীতের টান, অগ্রহায়ন মাসে তো জব্বর ঠান্ডা। ভাল বর্ষা হওয়ার দরুণ এ বছর ফলনও খুব বেশি। মাঠ প্রান্তর আবছা হলুদ পাকা ধানে ভরে আছে। শিশিরে মাখামাখি হয়ে ফসলের ভারে নুয়ে পড়া ক্ষেতের দিকে তাকালে চাষার বুক কেঁপে ওঠে। এমন ফলন তারা বহুদিন দ্যাখেনি। সুতরাং ফসলকাটার আগে ক্ষেত পাহারা দেওয়াও জরুরি নতুবা পাকা ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ মোতালেব মোল্লা নামের এক ব্যক্তি শীতের হাড়কাঁপানি ভোরে নয়ানজুলির ধারের খেজুর গাছ থেকে রসের কলসি পাড়ার জন্য গাছের মাথায় উঠে প্রথম আবিষ্কার করে ছিন্নমুন্ড সমেত সুবল গায়েন-এর মৃতদেহ। খেজুর গাছে উঠে ডানদিকে হঠাৎই চোখ গিয়েছিল মোতালেবের। তারপর সেই চোখ নেমেছিল মাটিতে। মৃত সুবল গায়েনের ভাগ্য ভাল সেদিন কুয়াশা ছিল না একটুও।

বিবরণ যা কানাঘুষো ঘুরে বেড়ায় শীতের হাওয়ার মত, তাতে প্রকাশ, আগের দিন রাতে সুবল গায়েন একটি নতুন কম্বল গায়ে জড়িয়ে মাথায় মাফলার বেঁধে দেশলাই আর বিড়ি সমেত রওয়ানা হয়েছিল ধান ক্ষেতে। সেখানে কাঠ কুটো জোগাড় ক’রে আগুন জ্বালিয়ে বসেছিল।ছোট্ট একটি ঝুপড়ি তৈরি করেছিল দু একদিন আগে। সুবল ঝুপড়ির ভিতরে তার পাকা ফসল পাহারা দিতে বসে ছিল।

সুবলের বিঘে তিনেকের মত জমি আছে। ওই জমিতেই এই বর্ষায় খুবই ভাল চাষ হয়েছিল। চাষ সুবল নিজ হাতে, নিজের গতরে করেছিল। গত বছর খরার দরুন চারপাশে তার ধার হয়েছিল বেশ, এই ফসল উঠলে সমস্ত ঋণ মুক্ত হয়ে হাতে কিছু জমত। বিবরণে প্রকাশ সুবল গায়েন আশঙ্কা করেছিল তার ধান লুট হয়ে যেতে পারে। ফসল কাটতে আরো দিন সাতেক দেরি। সেই লুটের আশঙ্কায় সে শীতের রাতে মাঠের ধারে গিয়ে বসেছিল।

তার ফসলের ক্ষেত থেকে একশো গজ দূরে নয়ানজুলির ভিতরে সে পড়ে ছির স্ফীত চক্ষু ছিন্নমুন্ড নিয়ে। পড়ে থাকার ভঙ্গিটি কেমন যেন অবহেলার। মানুষের দেহ নয়, মাটির পুতুল যেভাবে ভেঙে চুরে প’ড়ে থাকে হেথা হোথা তেমনি প’ড়ে আছে সুবল। যেন বা সুবলই ভেঙে রেখে গেছে তার নিজের মূর্তি। ভাঙা পুতুল ফেলে সুবল ধানক্ষেত থেকে উঠে মোরাম বিছানো রাস্তা ধরে হয় দত্তপুকুর নতুবা টাকিরোডের দিকে হেঁটে গেছে।

তার ধান ক্ষেত তেমনই রয়েছে। লুট হয়নি ফসল। আধাপাকা ধান কেটে কেউ বয়ে নিয়ে যায়নি অন্যত্র। একটু তছনছ করেছে এলোমেলো ভাবে। যুথবদ্ধ কারা যেন কোনাকুনি পার হয়েছিল ওই জমি। তিন বিঘের এক বিরাট লপ্ত।

সুবল হত্যার সাক্ষী কেউ ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শী যারা হ’তে পারত তারা সকলেই রাতে ঘরের ভিতর ঘুমিয়েছে ব’লে আফশোস করতে করতে চুপ ক’রে যায়। সকলেই বলল, আহা সে রাতে যদি মাঠের ধারে যেতাম-।

কে বা কারা খুন করেছে সঠিক না জানা গেলেও এটা জানা যায় ওই রাত থেকে গাঁয়ের তিনজন উধাও। তারা যে সুবলের বিপক্ষে বিচরণ করত এটা বিদিত। সুবল হত্যার পর যারা উধাও হয়ে গেছে তাদের কেউই হয়ত, অথবা তারা সকলে মিলেই সুবলকে ছিন্নমুন্ড ক’রে ফেলে রেখে গিয়েছে শুকনো নয়ানজুলিতে। বিবরণে অস্পষ্ট প্রকাশ যে তারা, সেই তিনজন অনেকদিন ধ’রে অপেক্ষা করছিল সুবলের জন্য। সুবলের জন্য তারা অস্ত্র শানিয়ে বসেছিল। হ্যাঁ, সুবল গায়েন ছ’মাস বাদে ঘরে ফিরেছিল। এই দিন তিনেক। গত বর্ষার সময় থেকেই সে উধাও। উধাও হওয়ার আগে তার জমিতে ধান রোয়া শেষ করেছিল। জমিতে ধান রুয়ে সে উধাও হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। তারপর তো খোঁজ ছিল না। এল এই অঘ্রাণের মাঝামাঝি। আশ্বিন মাসের বড় পুজোতেও আসেনি।

সুবল গায়েন যেন নিজের দেহটি গাঁয়ে ফেলে রেখে যেতেই এসেছিল। নতুবা সে যেমন গত ছ’মাস ছিল না, তেমনি আগামী ছ’মাসগুলো, অনেক ছ’মাস থাকবে না। দুচার দিনের জন্য ফেরা তো আসলে একেবারে ফেরা নয়, নিজের ভাঙা চোরা মূর্তিটি, মাটির পুতুলটি ফেলে রেখে একেবারে চলে যাওয়ার জন্য আসা। সে ফিরেছিল প্রয়োজনে।

এ বছর সমস্ত পশ্চিমবাঙলায় উৎপাদন ভাল। সুবল অন্য প্রান্তে ব’সে সেই খবর পেয়ে টানে টানে ঘরে ফিরেছিল। তার জমিতে যে ফসল পেকে উঠছে, তা দু চোখে দেখার জন্য সে অস্থির হয়ে উঠেছিল, অস্থির হয়ে ছুটে এসেছিল গাঁয়ে। ভরা ফসলের ক্ষেত তাকে টেনে এনেছিল শক্তিশালী চৌম্বক লোহার মত। নতুবা সে হয়ত ফিরত না একেবারে চলে যাওয়ার জন্য। আবার অজ্ঞাতবাসে ফেরার জন্য তো সে গাঁয়ে আসেনি, এসেছিল ধান কেটে ফসল বেচে সংসারের হাল ফেরাতে, বুড়ি মা, বউ আর দুটো বাচ্চার ঘরে আর একবার পুত্র স্বামী আর পিতার ভূমিকায় দাঁড়াতে। বিবরণে প্রকাশ অনেক কিছু স্পষ্ট অস্পষ্ট ইত্যাদি ইত্যাদি—


তিন

ঘটনার বিবরণে প্রকাশ জনৈক নিত্যপদ কর্মকার সাকিন বোয়ালঘাটা থানা দেগঙ্গা, বৈশাখ মাসের নিদারুণ এক তপ্ত দুপুরে আগুনে পুড়ে মারা যায়। বোয়ালঘাটায় প্রান্তে তার নিজস্ব কামারশালে ব’সে নিত্যপদ হাপর টেনে লোহা তাতাচ্ছিল, লোহা তাতিয়ে ছুরি কাঁচি দা কুড়োল লাঙলের ফলা ইত্যাদি তৈরি তার ব্যবসা। ব্যবসা আজকের নয়, নিত্যপদর পিতৃপুরুষের। কামারশোলটিও তার ঠাকুদার আমলের।

নিত্যপদর কামারশালাটি মস ছয় বাদে সদ্য চালু হয়েছিল। ছ মাস বাদে শোনা যাচ্ছিল তার ছোট কুটুরি ঘর থেকে হাপর টানার শব্দ, লোহার হাতুড়িতে আগুনের ফুলকি। রাতদুপুরেও হাতুড়ি নেহাইয়ের বিশ্রাম ছিল না। নিত্যপদ সকাল দুপুর রাত্রি অবিশ্রান্ত কাজ করছিল কেননা সামনে জষ্টি মাসে হরদেবপুরে বুড়োশিবের মেলা। এ বছর উৎপাদন ভাল হয়েছে সর্বত্র। তাই মানুষের হাতে পয়সাও আছে। যারা ফি বছর হাভাতে হয়ে ভিনগঞ্জে ছোটে তারাও এবার কম ছুটছে। এই সমস্ত কারণে বুড়োশিবের মেলা এবার খুব জমবে। বেচাকেনা হবে খুব। এসব খবর নিত্যপদ দূর থেকেই পেয়েছিল। তাই গুটি গুটি ফিরে এসে শূন্য কামারশালা খোলে নিরীহের মত। হাপরে আগুন দেয়, আগুনে প্রবেশ করায় লোহা। অনেক রাত অবধি কামারশালা চলতে লাগল।

বিবরণে ফলাফল প্রকাশিত কিন্তু ঘটনার পূর্ণ চেহারা অপ্রকাশিত। নিত্যপদর কামারশালে এক দুপুরে আগুন লাগে এবং সেই আগুনে হাপর লোহার সঙ্গে সেও ভস্ম হয়। কামারশালের আগুনের উৎস তার হাপর বা অন্য কিছু সে সম্পর্কে বিবরণ কোন তথ্য দেয় না এবং কামারশালে আগুন লাগার পর কেন নিত্যপদ কর্মকার বাইরে আত্মরক্ষার্থে বেরিয়ে এল না তাও অস্পষ্ট।

জলন্ত কুটিরটির ভিতরে নিত্যপদর আর্তনাদ শোনা গেছে কিনা তাও বিবরণে অপ্রকাশিত। কেউ সাহস করে এগোয়নি। যে এগোতে গিয়েছিল তাকে যেন কেউ শাসিয়ে ছিল, সেই শাসানির ভিতরেও একজন ছুটে যায়। অসংখ্য গ্রামবাসী সেই সময় আগুনকে বৃত্তাকারে ঘিরে। তখন আগুন ভয়ঙ্কর উর্দ্ধমুখী।

নিত্যপদ কামারের মৃত্যু কি নেহাতই দুর্ঘটনা বা অন্য কিছু? গত ছ’মাস যে ব্যক্তি গাঁয়ে ছিলনা সে গাঁয়ে ফিরে পেশায় ফিরতেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায়। এখন ওই প্রান্তে শুধু ছাই আর কিছু লোহার টুকরো ছড়িয়ে ছিটিয়ে, অর্ধসমাপ্ত ছুরি কাঁচি কাস্তে দা কাটারি এখানে ওখানে প’ড়ে আছে।

সাতদিন বাদে গ্রাম যেমন ছিল তেমন হয়ে গেল। তেমনি শব্দহীন, নীরব। কামারশালাটি বহু পুরোন, গ্রামের মানুষ অনেক রাত অবধি অন্ধকারে হাপরের গাঢ় নিঃশ্বাস, হাতুড়ির ঠোকাঠুকির শব্দ শুনতে অভ্যস্ত ছিল। এই শব্দের ছন্দের সঙ্গে মানুষের কান শিশুকাল থেকে পরিচিত, অভ্যস্ত ছিল। গত ছ’মাস এই শব্দ থেমে গিয়েছিল, তারপর সহসা একরাতে ঘুমের ঘোরে মানুষ শুনতে পেয়েছিল দূর থেকে হাপরের গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। হাতুড়ির ঠকঠক শোনা যাচ্ছে। তারা জানত না নিত্যপদ গাঁয়ে ফিরেছে। জানতে পারল কামারশালের শব্দে। দুচারজন উত্তেজনায় উঠে বসেছিল বিছানায়।

বৃদ্ধেরা যুবকদের জিজ্ঞেস করেছিল, নাড়ু কামারের ছেলে ফিরল?

যুবকরা মাথা দুলিয়ে বলেছিল মনে তো হয়!

এক বৃদ্ধ দুঃখিত হয়ে বলেছিল কেন ফিরল?


নিত্যপদ কামার তার কামারশালা ফেলে গত অঘ্রানের শেষে গাঁ ছেড়ে উধাও হয়েছিল। তার ফসলের জমি কম, যা ছিল তার ধান কেটে বাড়িতে বোঝাই করা হয়ে গিয়েছিল। ধান কেটে সে যেন পলায়নের জন্য তৈরি হয়েছিল।

কামারশালা গত ছ’মাস যেমন থেমেছিল তেমনিই থেমে থাকল। যেন বা নিত্যপদ কর্মকার যেমন ছ’মাস আগে ঘর ছাড়া হয়েছে তেমনই ঘর ছাড়া হয়ে আছে। মাঝখানের কয়েকটা দিন যেন উড়ে আসা! নিত্যপদ গাঁয়ে না থেকে দূরে অজ্ঞাতবাসে থাকলে রাতের অন্ধকার যেমন নীরব নিস্তব্ধ ছিল, গাঁয়ে ফিরে আগুনে কামারশালা সমেত ভস্ম হওয়ার পরও রাত তেমনি নিস্তব্ধ। শুধু কয়েকটা দিন রাতের অন্ধকার রাত কেমন পাথর চাপা নৈঃশব্দ্যে ডোবা, প্রাণহীন ধ্বংসস্তূপ যেমন ঠিক সেইরকম, রাত দুপুরে সকলে অনুভব করে মানুষের অস্তিত্ব কেমন শব্দময়, নৈঃশব্দ্য হরণকারী ছন্দময় এবং তা অনস্তিত্বেই প্রতীয়মান হয় সবচেয়ে বেশী।

নিত্যপদ কর্মকারের মৃত্যু কি নেহাতই দুর্ঘটনা অথবা অন্য কোনো কারণে তার স্পষ্ট কোন প্রমাণ না থাকলেও আগুনের পরদিন থেকে যে তিনজন ব্যক্তি গাঁ ছাড়া হয়েছে এটা সকলের কাছে অজানা নয়। উড়ো কথায় প্রকাশ নিত্যপদ কামারকে কামারশালের ভিতরের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে দরজায় শিকল তুলে দিয়ে ঘরের চালে আগুন দিয়ে দেয়া হয়েছিল।


চার


বিবরণে অপ্রকাশিত-

বিনয় মন্ডল খুন হওয়ার পর সুবল গায়েন, সুবল গায়েনের খুনের বদলা নেয় নিত্য কামার, নিত্য কামার আগুনে পুড়ে মারা যায়। বোয়ালঘাটার দুই প্রান্তে দুই রাজনৈতিক দলের পতাকা সকাল দুপুর আকাশে ওড়ে, রাত্তিরেও ও পতাকা কেউ নামায় না। বাঁশের ডগায় জীর্ণ কাপড় বাতাসে শুধুই ধাক্কা খায়। পুলিশ মাসে একবার ক’রে বোয়ালঘাটায় ঢোকে। নিয়মমাফিক তদন্ত করে ফিরে যায়। এ এলাকার এম.এল.এ কম্যুনিস্ট পার্টির আর এম.পি যিনি, তিনি প্রধানমন্ত্রীর দক্ষিণহস্ত, কেন্দ্রের মন্ত্রী। কেন্দ্রের মন্ত্রীমশায় জোর খুঁটি গেড়ে বসবাস করছেন এলাকায়। আর এম.এল.এ সায়েবও ব’সে নেই। জেলার এস.পি সায়েব মন্ত্রী মশায়ের অনুগত আর থানা পুলিশের ছোটখাট ইন্সপেক্টার, সাব ইন্সপেক্টার এম.এল.এ সায়েবের কথা ফেলতে সাহস করে না।

বোয়ালঘাটার চার বিধবা অন্ধকারে পথের ধারে ব’সে কথা বলছিল চারটি কোণে ব’সে পরস্পরের দিকে চেয়ে।

একজন বলল, নলিনী পাল ফিরছে।

আর একজনের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে মাথা নামিয়ে নিল নিচে।

অন্য একজন বলল, কী হ’লো তুই মাথা নামাস যে, কী হলো?


অন্ধকারে ফুঁপিয়ে উঠল সে, নিত্যপদ কর্মকারের বিধবা বউ সীতারানি। ছ’মাস কেটেছে। এখন বর্ষার সময়। আগের বছর এই সময় বিনয় মরেছিল। আর নিত্যপদ তো সেদিন মরল। নলিনী পাল, এ তল্লাটে নাম করা কুমোর নরেন পালের ছেলে তারপর থেকে উধাও। নলিনী পাল নাকি ঘরে চিঠি দিয়েছে, ঘরে ফিরে ধানটা রুয়ে দিয়েই উধাও হয়ে যাবে। কোন ভয় নেই তার। কংগ্রেস পার্টির লোক আশ্বাস দিয়েছে সব প্রোটেকশন দেওয়া হবে। আর সে তো থাকতে যাচ্ছে না। নিজে হাতে ধান রুয়ে চলে আসবে। চাষবাস অন্যের হাত দিয়ে চলে না।

এক বিধবা বলল, নলিনী পাল এবার মরবে।

না মরতেও পারে।

সে মাথা ঝাঁকাল, উঁহু নলিনীর বউ এবার স্বামী খাবে, যেমন খেয়েছি আমরা।


তিন বিধবা, বিনয় সুবল আর নিত্যপদর বউ, এবং আর এক বিধবা, অন্য একজনের সে বিধবা হয়েছিল বিনয়ের বউ এর আগে। তখন ভোট। সেই ঘটনার রেশ চলছে এখনো।


চার বিধবা অন্ধকারে পথের দিকে চেয়েছিল। ওই পথে নলিনী পাল ফিরবে মরার জন্য। দুই পার্টির, বলা যায় এম.এলএ., এম.পি., দুই প্রভাবশালী ব্যক্তির দ্বন্দ এখনো শেষ হয়নি। এলাকা দখলেই তাঁদের জীবন সার্থক, জীবন কর্মময়। সুতরাং নলিনী পাল ফিরে মরলে দীর্ঘস্থায়ী লড়াই আবার প্রাণ পাবে। যেন বা এই কারণে মরতেই ফিরছে নলিনী। সামান্য কুমোর সামান্য কামার চাষা মরছে বোয়ালঘাটায় পা রাখলেই। একটি মৃত্যু অন্য একটি মৃত্যুর সূচনা করছে।


চারজনে বসেছিল মেঘের নিচে খুব চুপচাপ হয়ে, কপালের ভার হাতে রেখে। এই সময় এল নলিনীর বউ। সে এসে দাঁড়াল ওদের পিছনে। তারপর হঠাৎ নিত্য কামারের বউ-এর হাত ধ’রে ফেলল। নিত্যপদর বউ যদি বলে তো বেঁচে যাবে নলিনী। অন্ধকারে নিত্যপদর বিধবার চোখ জ্বলে উঠল। সকলে খুব চুপচাপ।

অনেকক্ষণ পরে নিত্যপদর বউই নৈঃশব্দ্য ভাঙল, ফিসফিস ক’রে বলল, কেউ কারোর কথা শুনবেনা, ছ মাস ঘুরে যেন মরার জন্য পুরুষগুলো ফেরে।

আকাশ মেঘে ভারি। মেঘ নেমে এসেছে মাটির পৃথিবীর কাছাকাছি। যখন তখন বৃষ্টি নামতে পারে। চার বিধবা এবং নলিনী পালের সধবা বউ উপরে তাকাল মেঘেরে অন্ধকারে। তারপর তাকাল আদিগন্ত অন্ধকার মাঠের দিকে। ধানরোয়া শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছে বলেই নলিনী পাল ফিরছে। ওই জমিই ডাকছে নলিনীকে। পাঁচজনে বিস্তৃত জমির অন্ধকারে তাকিয়ে যেন ভয় পেল। নলিনী ফিরে ওই অন্ধকারে নেমে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। ওই অন্ধকারই যেন তার নিয়তি। আস্তে আস্তে গাঁ ঘর আবৃত করছে।

নলিনীর বউ আগে ফিরছিল। ফিছনে চারজন। যেন নলিনী পারের বউকে অনুসরণ ক’রে গাঁয়ে ফিরছে। নলিনীর বউ-এর শাঁখা সিঁদুর শাড়ির পিছনে চার বিধবা। পুরুষগুলোর ভিতরে মুখ দেখাদেখি বন্ধ। এ ওকে মারার জন্য সর্বক্ষণ অস্ত্র শানাচ্ছে।

আর পুরুষগুলো মরলে তাদের বউগুলো শাঁখা সিঁদুর খুইয়ে, সধবার অহঙ্কার খুইয়ে সব হারিয়ে এক হয়ে গেছে।

নিত্যপদর বউ ডাকল, ও বউ দাঁড়া, শাঁখা সিঁদুর হাতে কাঁদিসনে, অকল্যাণ হবে।

সুবলের বউ ডাকল, ও বউ দাঁড়া, শাঁখা সিঁদুর হাতে কাঁদিসনে, অকল্যাণ হবে, যেমন কেঁদেছিল কামারের বউ।

বিনয়ের বউ বলল…….।

নলিনীর বউ অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল।


নলিনী পাল, যে নিত্য কামারের মৃত্যুর পর চিরদিনের জন্য কামারশালের হাতুড়ির শব্দ থামিয়ে হাপরের নিঃশ্বাস বন্ধ করিয়ে উধাও হয়েছিল সে গাঁয়ে ফিরবে তা রটে গিয়েছিল ফিসফিসানিতে ফিসফিসানিতে। এসব কথা যে কীভাবে রটে! তাই নলিনীর বউ এর বুক কাঁপছিল। বছর দুয়েক বিয়ে হয়েছে। তার পেটে মাস সাতেকের বাচ্চা। সন্তান প্রসবের আগে বিধবা হ’তে ভয় পাচ্ছিল নলিনীর বউ। গাঁয়ে পোস্টার পড়ে ছিল আঁকাবাঁকা অক্ষরে অশুদ্ধ বানানে, নিত্য হত্যার বদলা চাই।

কিন্তু আশ্চর্য! পোস্টার একদিন খ’সে পড়ল। নলিনী পাল ফেরে না। এক মাস দু’মাস কেন ছমাস গিয়ে শীতও এল, তবু নলিনী ফেরেনা। তার কোন খবর নেই। নলিনীর বিরোধীরা আস্তে আস্তে ঝিমিয়ে পড়ল।

কিন্তু যা হয় তা রটে। খবর হয় গোপনে কানে কানে। খবর আসে বাতাসে বাতাসে, মানুষের মুখে মুখে, পাখিদের ঠোঁটের ডগায় যেভাবে বীজ ওড়ে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। সে খবর এমন যে নলিনী হয়ত আর ফিরবে না, কেননা যে চাষা কামার সামান্য ফসলের লোভে মেলায় ভাল সওদার আশায় প্রাণ হাতে করে বোয়ালঘাটায় ফিরে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের একজন হয়ে নলিনী চাষের সময় মেঘের ডাকে ফেরে না, শীতের আরম্ভে তার ঘরের শিশুর কান্নায় ফেরে না। এমনটি তো হয় না।

নলিনী পাল যখন ফেরেনি, ফিরতে ফিরতে ঘুরে চলে গেছে অজ্ঞাতবাসে, তখন হয়ত ফিরবে না। ফিরবে না শুধু তার বউ এর শাঁখা সিঁদুর অক্ষয় রাখতে। এ গাঁয়ে ফিরে মরার কথা ছিল তার, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম আরও দীর্ঘস্থায়ী হত, কর্মসূচীশূন্য পার্টি ক্যাডারদের সামনে নেতৃত্ব নতুন কর্মসূচী তুলে ধরতে পারতেন নেতৃত্ব। নলিনী হয়ত মরেছে, অন্য কোথাও, পথে ঘাটে। কুকুর বিড়ালের মত হয়েছিল মানুষের নিয়তি। কিন্তু কোথায় কবে কখন মরেছিল তা কেউ জানে না।

চার বিধবা পথের উপর ব’সে থাকে সন্ধ্যায়। ব’সে পথের দিকে চেয়ে থাকে। চারজনে ভাল রকম জানে তাদের কেউ আর ওই পথে ফিরবে না। ফিরছিল বলেই ফিরবে না। না ফিরলে হয়ত ফিরত যে আশায় তাদের পিছনে এসে দাঁড়ায় নলিনী পালের বউ, কোলে বাচ্চা নিয়ে অন্ধকারে।

এই নলিনীর বউ যেমন থাকে নলিনীর অপেক্ষায়, যে নলিনী ফেরার হ’লে এতদিন ফিরত, তবু ফেরেনি এবং হয়ত কোনদিনই ফিরবে না মনে মনে গোপনে তা জেনেও মাথার সিঁদুর অক্ষয় রেখে তার জন্য পথের দিকে চেয়ে যেভাবে অপেক্ষা করে, তেমনিই যেন অপেক্ষা করে চার বিধবা।


চার বিধবা কেন নলিনীর বউও গোপনে ভাবে নলিনী ফিরলেও যেন না ফেরে। নলিনী ফিরবে তার বউয়ের শাঁখা ভাঙতে, সিঁদুর তুলতে…..। বরং নলিনীর বউ-এর শাঁখা সিঁদুর আরো অনেকের জীবনের রক্ষক হয়ে অক্ষয় থাকুক, যেমন আছে।

1 টি মন্তব্য:

  1. খবরে প্রকাশ যতটুকু তারচে অপ্রকাশিত বেশি...জীবনে বাহিরে যেমন ভেতরে তারচে কঠিন!

    উত্তরমুছুন