বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার: আলী আহমদ

‘দায়িত্বশীল অনুবাদক ভাষা, ভাব আর মূল বক্তব্য আলাদা আলাদা ভাবে অনুসরণ করেন না, করতে পারেন না’
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান

আলী আহমদ একজন অনুবাদক। ইংরেজি থেকে বাংলা, বাংলা থেকে ইংরেজি-দুই-ই করেন সমান দক্ষতায়। বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্যে নাগিব মাহফুজ, কেনযাবুরোর ওয়ে-সহ অনেক জগৎখ্যাত সাহিত্যিকের নিবিড় পাঠ সংযোজন তাঁর হাতে। অনুবাদরে ঈর্ষণীয় দক্ষতার পরও তিনি খুব অল্প অনুবাদই করেছেন। সাহিত্য রুচি, অনুবাদের যত্নই হয়তো তাকে এখানে দাঁড় করিয়েছে। সাহিত্য পাঠক ও নবীন অনুবাদকদের কাছে তিনি কাঙ্ক্ষিত অনুবাদক।
কথা হয়েছে তার সঙ্গে।  অনুবাদের মত স্বল্পভাষে উত্তর দিয়েছেন যদিও, তবু তার গভীরতা ও ইঙ্গিতময়তা, বিপুল। স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ। আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কি রকম?

আলী আহমদ : ‘পরিণত কাজ’ বলতে ঠিক কি বুঝাতে চেয়েছেন তা’ আমার কাছে সুস্পষ্ট নয়। তবে এটা নিঃসন্দেহে একটা দায়িত্বপূর্ণ এবং গুরুত্ববহ কাজ। সাহিত্য—নগিব মাহফুজের ‘চোর ও সারমেয় সমাচার’—একক অনুবাদে হাত দেয়ার আগে আমার পুরোপুরি একটি মানসিক প্রস্তুতি তৈরি হয়েছিল। মূল উপন্যাসটি আরবিতে লেখা হলেও, আমি অনুবাদ করেছি ইংরেজি থেকে। আমার বিশ্বাস, ইংরেজি ও বাংলা দু’টো ভাষাই আমি ভালোভাবে জানি। আর আরবি ও মিশরীয় এবং বাংলাদেশের সংস্কৃতিও আমার কাছে পরিচিত। তাই ইংরেজি অনুবাদে যেখানে লেখা ‘মর্নিং প্রেয়ার্স’ সেখানে অতি সহজেই আমি ‘ফজরের নামাজ’ কথা ক’টি বসিয়ে দিতে পেরেছি। এটি হচ্ছে কথার সাথে সংস্কৃতিরও অনুবাদ। এই ব্যাপারটি ভালোভাবে না-বুঝে অনুবাদে হাত দেয়া উচিৎ নয় বলে আমি মনে করি।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো শুধু ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবেরও। অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ তো একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?

আলী আহমদ : আপনার বক্তব্য অত্যন্ত সঠিক। ভাবের অনুবাদ সন্দেহাতীতভাবে অত্যন্ত কঠিন একটি সমস্যা। আর সাহিত্য—তা’ কাব্য কিংবা মাণোত্তীর্ণ গদ্য যা-ই হোক—মূলত ভাবেরই আধার। তাই সাহিত্যের অনুবাদ সহজ কোনো কাজ নয়। যিনি সাহিত্য অনুবাদের কাজ করবেন, তাঁকে সংশ্লিষ্ট দু’টো ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল তো হতে হবেই, আরো একটি অপরিহার্য বৈশিষ্ট তাঁর থাকাতেই হবে; আর তা’ হলো—কাব্যিক এক মনোজগৎ। যে-ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয়, সে-ভাষার বর্ণনায় যে ভাব ও চিত্রকল্প তৈরি হয় তা’ যেমন অনুবাদকের নিজের মনোজগতে নিখুঁতভাবে ধারণ করতে হবে, তেমনি যে-ভাষায় অনুবাদ করা হবে সে ভাষাতে তার সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন ও রসোত্তীর্ণ বর্ণনা তৈরির মতো দক্ষতাও থাকতে হবে। তা’ না-হলে সাহিত্যের অনুবাদ হবে না। আমি নিজে এই বিষয়টি মনে রেখেই সাহিত্য অনুবাদের কাজে নামি।


এহ্সান : একজন লেখক তো লেখায় মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ-ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। এজন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক, নয় কি?

আলী আহমদ : একজন সফল অভিনেতা অভিজাতশ্রেণির কারো চরিত্র যেমন দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তুলতে পারেন, তেমনি পারেন কোনো দেহাতি মানুষের, কিংবা অন্য যে-কোনো রকমের চরিত্রের। যে-দক্ষতা তাঁর থাকা দরকার, তা হচ্ছে চরত্রটির একেবারে অন্তর্জগতে প্রবেশ করে নিজের কথাবার্তা ও হাবভাবে ঐ চরিত্রটিকে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতা। সে কারণে অভিনয় জগতে যেমন প্রতিটি নাটকে কিংবা চলচ্চিত্রে আলাদা আলাদা একেকজন লোকের দরকার নেই, অনুবাদের জগতেও তেমনি । পূর্বোল্লিখিত বৈশিষ্টসম্পন্ন একজন অনুবাদক একাধিক লেখকের সাহিত্যকর্মের সফল অনুবাদক হতে পারেন।


এহ্সান : লেখার সঙ্গে, বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদি গভীর ভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য লেখকের দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। তাই অনুবাদের দক্ষতা অর্জনের জন্য কোনো একটা দেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেয়া উত্তম, এমনটা বলা হয়। আপনি কি মনে করনে?

আলী আহমদ : ঠিক উপরের প্রশ্নের উত্তরেই এটির উত্তর পাওয়া যায়। আপনার ধারণা অনুযায়ী অবশ্যই বেছে নেয়া যেতে পারে, কিন্তু সফল অনুবাদের জন্য তা নিতেই হবে এমন কোনো কারণ নেই। এক অভিন্ন অনুবাদক একাধিক ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে খুব ভালোভাবে অবহিত থাকতে পারেন, এবং সফল অনুবাদও করতে পারেন।


এহ্সান : একজন অনুবাদকের তৃপ্তি কোথায়, একটি অনুবাদ করায়, না একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে গভীরভাবে জানায়?

আলী আহমদ : অবশ্যই সফল একটি অনুবাদ করায়; কিন্তু ‘একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে গভীরভাবে’ না-জেনে তা’ তো করা সম্ভব নয়! কাজেই, এ’দুটোই অনুবাদকের চাই।


এহ্সান : প্রায়ই শোনা যায়, অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়। অনুবাদকে সাহিত্য হয়ে ওঠায় অন্তরায়টা কোথায়? অনুবাদ কি ভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠতে পারে?

আলী আহমদ : ‘অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়’ এ-কথা কা’রা বলেন আমার জানা নেই। তবে একথা তো বলাই বাহুল্য যে অনুবাদ অনুবাদই, কোনো মৌলিক সাহিত্যকর্ম নয়। তবে সফল অনুবাদ অবশ্যই সফল সাহিত্যকর্ম।


এহ্সান : অনেক সময় দেখা যায়, কোনো লেখক বা দেশের কিছু গল্প অনুবাদ করেই তাকে ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ বলে দিচ্ছে। বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু থাকে না যে, এগুলো কেন শ্রেষ্ঠ গল্প। কিভাবে বাছাই করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?

আলী আহমদ : এগুলো হচ্ছে একধরনের বিপণন-কৌশল। বইয়ের পাঠক কেন, অন্যান্য অনেক ভোগ্যপণ্যের ভোক্তারাও নানান রকমের বিপণন-কৌশলের শিকার হয়ে হর-হামেশাই প্রতারিত হচ্ছেন।


এহ্সান : আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা, বিশেষত ইংরেজি থেকে। তাহলে আমরা ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?

আলী আহমদ : তা’ একরকম বলতে পারেন। তবে ভূমিস্তরে আসা সূর্য-রশ্মি যেমন শক্তিশালী কাচের ওপর ফেলে প্রতিসরিত আলোতে অধিকতর শক্তিশালী করা সম্ভব, দক্ষ অনুবাদকের হাত ধরে ভালো সাহিত্যকর্ম তেমনি ভাষান্তরি হয়েও মূলের মতো মানসম্পন্ন ও তেজি থাকতে পারে।


এহ্সান : অধিকাংশ অনুবাদই বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত, মানে ‘বেস্ট সেলার’ বইগুলো হয়ে থাকে। এই অনুবাদ দ্বারা একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?

আলী আহমদ : পৃথিবীর সব অনুবাদের ক্ষেত্রেই একথা খাটে না। ইংরেজির মতো ভাষায় অ-জনপ্রিয় বইও দেদারসে অনূদিত হয়। বিদেশি সাহিত্যের একটি বইয়েরও সফল অনুবাদ যে-ভাষায় তা’ অনূদিত হয়, সে-ভাষাকে ঋদ্ধ করে—একটির ক্ষেত্রে সামান্য, আর বেশি হলে বেশি।


এহ্সান : বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যে গুলো ভাল, কিন্তু বহুল আলোচিত নয়। যেখানে প্রকাশকরাও বিনিয়োগ করতে চায় না। সেক্ষেত্রে মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?

আলী আহমদ : ইংরেজির মতো ভাষায় এটি মারাত্মক কোনো সমস্যা নয়। ঐ জাতীয় বইয়ের পাঠক পৃথিবীতেই কম। তবে উন্নত ভাষায় কম হলেও যা হয়, বইয়ের মলাটমূল্য তুলনামূলকভাবে একটু বেশি ধরে প্রকাশক তা প্রকাশ করে। কিন্তু আমাদের এখানে, ঐ জাতীয় বইয়ের পাঠক এতই কম যে প্রকাশক সঙ্গত কারণেই তা অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ করতে সাহস পান না। আমাদের সাহিত্য তাই ক্ষুদ্রতার ফাঁদ থেকে বেরোতেও পারছে না। বাংলা একাডেমির মতো সংস্থা এ-ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে।


এহ্সান : একটি দেশ উপনিবেশ মুক্ত হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তাশীল বইগুলো ব্যাপক ভাবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই, দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। আমাদের দেশে তা হয়নি। এটা কি আমাদের দেশের সাহিত্যের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে মনে করেন?

আলী আহমদ : প্রভাব অবশ্যই ফেলেছে, এবং তা কু-প্রভাব। আমরা সর্বস্তরে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রচলনের ঘোষণাই কেবল দেইনি, তা ‘বাস্তবায়ন(?)’ ও করছি। কিন্তু উচ্চশিক্ষার জন্য অপরিহার্য যে-সকল বই ইংরেজিতে আছে তা-ও অনুবাদ করাইনি; আর এই প্রজন্মের উচ্চশিক্ষার্থীরা যথেষ্ট ইংরেজি জানেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতম ডিগ্রিধারীরাও শিক্ষার মানে আন্তর্জাতিক স্তরের ধারে-কাছেও নেই। পরীক্ষা পাশের হার প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থায় বাড়ছে বলে আমরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে আত্মতৃপ্তিতে ভুগছি। অবস্থা দেখে মনে হয়, কর্তাব্যক্তিরা ব্যাপারটি যেন ভবিষ্যতের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। উচ্চশ্রেণির প্রায় সকলের ছেলেপুলেরা অবশ্য দেশি-বিদেশি মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই পড়াশুনা করছে!


এহ্সান : ট্যাকনিক্যাল শব্দগুলো ছাড়াও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সংকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরির তেমন কোনো রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কি করনীয়?

আলী আহমদ : সাহিত্য অনুবাদে পরিভাষা কোনো সমস্যাই নয়। এক সংস্কৃতির বিষয়বস্তু কিংবা মিথ অন্য সংস্কৃতিতে প্রথম প্রথম নতুনই লাগে। কিন্তু ক্রমাগতভাবে দেখার পর তা পরিচিত ও আত্মস্থ হয়ে যায়। যে-ভাষায় অনুবাদ হয়, সে-ভাষা ঋদ্ধতর হয়। এর বহু নজির বাংলা থেকেই দেয়া সম্ভব।


এহ্সান : অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি স্থাপন করা দরকার। আপনার কি মনে হয়, আমরা কিভাবে মানসম্মত অনুবাদ পেতে পারি?

আলী আহমদ : নিয়ন্ত্রক সংস্থা স্থাপনের প্রস্তাব অবাস্তব। অধিকতর মানসম্পন্ন অনুবাদই আগাছাগুলোকে দূর করে দেবে। তবে সেজন্য ভালো অনুবাদ উৎসাহিত করা দরকার। পাঠকরা তা উৎসাহিত করতে পারেন অনূদিত ভালো বই কিনে, আর যেটা আসল কথা, তা হলো প্রকাশকরা সততার সাথে ওরূপ অনুবাদকের প্রাপ্যটি বুঝিয়ে দিয়ে তাঁকে উৎসাহিত করতে পারেন।


এহ্সান : পাঠের জন্য অনেকেই মূলগ্রন্থকে গুরুত্ব দেন। লেখক প্রস্তুতি হিসেবে অনুবাদ সাহিত্য পাঠকে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?

আলী আহমদ : পুরোপুরি আত্মস্থ করতে পারার দক্ষতা অর্জন করে মূল বই পড়তে পারার কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু মানোত্তীর্ন ও কালোত্তীর্ণ সাহিত্যকর্ম ধ্রুপদী ভাষাসমূহে যেমন অনেক আছে, সমস্ত পৃথিবীর আধুনিক ভাষাসমূহেও তেমনি অনেক হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কার পক্ষে এর ক’টি ভাষা ভালো করে শেখা সম্ভব? তা’হলে? মুল ভাষায় যা পড়তে পারবো না, তা কি এড়িয়ে যাবো? সস্তা দামের তথাকথিত জনপ্রিয় ধারার লেখকদের কথা আলাদা। তাঁদের অনেকেই বিদেশের কোনো বই কখনো পড়েন না কিংবা পড়তে পারেন না। কিন্তু সত্যিকারের লেখক হতে চাইলে, পৃথিবীর প্রধান সাহিত্যকর্মের সাথে নিবিড় যোগাযোগ চাই। আর সেজন্য অনুবাদই একমাত্র মাধ্যম, শুধু আমাদের সাহিত্যেই নয়, পৃথিবীর সব সাহিত্যে। প্রকৃতপক্ষে, যে-ভাষা যতো বড় ও বিখ্যাত, সে-ভাষাতে অনুবাদও ততো বেশি। আমরা ইংরেজির মাধ্যমেই মূলত বিদেশি প্রধান সাহিত্যকর্মগুলোর সাথে যোগাযোগ রাখি। সেগুলোর সবই তো অনুবাদ! তা’হলে?


এহ্সান : প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হয়। তার সবই জনপ্রিয় ও বহুলালোচিত গ্রন্থ। অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক বা বই, অনুবাদকের তেমন কোনো আবিষ্কার নেই। এটা কি অনুবাদকের দূর্বলতা, না অন্যকিছু?

আলী আহমদ : প্রচুর অনুবাদ হচ্ছে—একথার সাথে আমি একমত নই। বাংলার মতো এতবড় একটা সাহিত্যে এবং এতো বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত দেশে যে-সংখ্যক বই অনূদিত হয়, তা লজ্জাজনক রকমের অপ্রতুল। আমাদের অনুবাদের অনেক দুর্বলতা আছে; আপনি এখানে যেটা উল্লেখ করলেন, সেটা একটি মাত্র। এবং আমার মতে, সেটি প্রধান দুর্বলতাগুলোরও একটি নয়।


এহ্সান : রবার্ট ফ্রস্ট, টি এস এলিয়ট, শার্ল বোদলেয়ার, শাহানামা অনেক অনুবাদ করেছেন; কিন্তু শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কেউ করতে পারেননি মনে করা হয়। কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলে সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনি কি মনে করেন?

আলী আহমদ : কথাটা অনেকাংশেই সত্য। তবে এই বিষয়টি নিয়ে আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে আমি আলোচনা করেছি। অনুবাদক নিজে যদি কবি কিংবা গল্পলেখক হন এবং, যথাক্রমে, কবিতা এবং গল্পের অনুবাদ করেন, তাহলে সে অনুবাদ ভালো হওয়ার কথা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দু’টো ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর দখলের যে-কথা আগে বলেছি, তাঁদের বেলায়ও সে-কথা প্রযোজ্য। কিন্তু পৃথিবীর প্রধান সব অনুবাদকদের বিপুল অধিকাংশই বিখ্যাত কোনো কবি কিংবা গল্পকার নন। আগেই যেমন বলেছি, অনুবাদকের একটি সংবেদনশীল, কাব্যিক মন থাকতে হবে। আর থাকতে হবে কল্পনার বিশাল ব্যাপ্তি। মূল লেখকের রচনার স্থানে কল্পনা দিয়ে পৌঁছে নিজের ভাষায় যদি মানোত্তীর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারেন, তাহলেই তিনি সফলকাম অনুবাদক।


এহ্সান : অনুবাদ তো দুইভাবেই হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশি ভাষায়, দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায়। আমরা কিন্তু তা দেখছি না। এর কারণ কি? এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় কি বলে মনে করেন?

আলী আহমদ : দু’ভাবে শুধু হতে পারে না, হওয়া অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তা যে দেখছি না, তার কারণ একাধিক। প্রথমত, বিদেশে আমাদের সাহিত্যের কোনো চাহিদা আপাত নেই বলে, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো আমাদের বইয়ের অনুবাদ বিদেশি ভাষায় অনুবাদ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আর স্থানীয় বাজারে বিদেশি ভাষায় অনূদিত দেশি বইয়ের বাজার নেই বললেই চলে। স্থানীয় প্রকাশকরাও তাই এক্ষেত্রে বিনিয়োগে অনাগ্রহী। আর যোগ্যতাসম্পন্ন অনুবাদকের সংখ্যাও খুবই কম।

কিন্তু এ অবস্থা থেকে আশু উত্তরণ জরুরি। আন্তর্জাতিক মানের গল্প-উপন্যাস-কবিতা আমদের যথেষ্ট আছে। স্থানীয় দু-একজন প্রকাশক ইতোমধ্যে কিছু কিছু সাহিত্যের অনুবাদ ইংরেজিতে প্রকাশ করেছেন। তাঁদেরকে আরও সাহসী হয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এভাবে অনূদিত দু-চারটি বই নিশ্চয়ই বাইরের জগতে পরিচিতি পাবে। তারপর আমাদের সাহিত্যের জন্য বাইরের জগতের দুয়ার হয়তো খুলে যাবে।


এহ্সান : দীর্ঘদিন যাবত অনুবাদ করছেন, আবার অনেক দিন যাবত তেমন অনুবাদ করছেন না। এবারের বই মেলায় আপনার অনুদিত কোনো গ্রন্থ বের হচ্ছে কি?

আলী আহমদ : না, এবারের বইমেলায় আমার নতুন অনূদিত কোনো গল্পের বই বেরোচ্ছে না। এখন প্রকাশের অপেক্ষায় আছে বিদেশি লেখকদের সাহিত্য সমালোচনা-পরিচিতিমূলক একটি প্রবন্ধসংগ্রহ আর একটি গল্পসংগ্রহ।

এছাড়া, বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনূদিত আমার দুটো বই বাংলাদেশ শিশু একাডেমি আগেই প্রকাশ করেছে। এবারের বইমেলায় তারা স্টল খুললে, সেখানে প্রথমবারের মতো তা পাওয়া যেতে পারে। এর একটি বই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমাদের দেশের খ্যাতনামা সব লেখক-সাহিত্যিক-কবিদের লেখা প্রবন্ধ-কবিতা-স্মৃতিচারণমূলক রচনা ইত্যাদি নিয়ে। শিশু একাডেমি প্রকাশিত একটি বাংলা বইয়ের নির্বাচিত কতিপয় রচনার ইংরেজি অনুবাদ। আরেকটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে পৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের কথার নির্বাচিত অংশের ইংরেজি অনুবাদ। এটি মুনতাসির মামুনের সম্পাদনায় তাঁর ও আমার অনুবাদে বেরিয়েছে।


এহ্সান : অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকে ভাষা, অনেকে ভাব, অনেকে মূলবক্তব্য অনুসরণ করেন। এতে কি একটি সাহিত্যের প্রকৃতাবস্থার হেরফের ঘটে যায় না?

 অনুবাদ, বিশেষত সাহিত্যের অনুবাদ, আপনিই কিছুক্ষণ আগে যেমন বলেছেন, শুধু তো ভাষান্তর নয়, ভাবান্তরও বটে। তাই অনুবাদের ধরন-ধারণ, রূপ-রস নিয়ে অনেকেই অনেক কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে মার্কিন কবি রবার্ট ফ্রস্টের একটি কথা সংশ্লিষ্ট প্রায় সবাই জানেন। কথাটি তিনি বলেছিলেন যদিও কাব্য অনুবাদের ব্যাপারে, তবুও সাহিত্যের সব রকমের অনুবাদের ক্ষেত্রেই কথাটি খাটে বলে এখানে তা উদ্ধৃত করছি, ‘Poetry is what is lost in translation….’. অর্থাৎ সেটুকুই হলো কবিতা, যা অনুবাদে হারিয়ে যায়। কবিতার পাঠকমাত্রই জানেন কথাটি কতোখানি খাঁটি। গদ্যসাহিত্যেও কথাটি কমবেশি প্রযোজ্য। দায়িত্বশীল অনুবাদক ভাষা, ভাব আর মূল বক্তব্য আলাদা আলাদা ভাবে অনুসরণ করেন না, করতে পারেন না। ঐ সবগুলো একসঙ্গেই তাঁকে অনুবাদ করতে হয়। কিন্তু অনুবাদ নিষ্প্রাণ কোনো ভাষান্তর নয়; তা হচ্ছে জীবন্ত একটি সাহিত্যকর্মের রূপান্তর মাত্র। অনুবাদ বা ট্রান্সলেশনকে তাই আজকাল Transcreation বা নবসৃজন বলা হয়ে থাকে। সার্থক অনুবাদে তাই স্থানবিশেষে কখনো কখনো সামান্য হেরফের হলেও, নতুন রূপে তা নবতর এক সাহিত্য সৃষ্টিরই মতো। কিন্তু তাই বলে এই সৃজনে স্বেচ্ছাচারিতার কোনো স্থান নেই। দায়িত্বশীল অনুবাদককে মূলের প্রতি বিশ্বস্ত থেকে এবং সাহিত্যিক মূল্য অক্ষুণ্ণ রেখে অনুবাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।


এহ্সান : অনেকে মূল বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে মানে আক্ষরিক বা মূলানুগ অনুবাদ, কেউ ভাবগত বা মূলবক্তব্যকের দিক খেয়াল রেখে অনুবাদ করেন। কোন ধরনের অনুবাদে প্রকৃত সৌন্দর্য ফুটে ওঠে বলে আপনি মনে করেন? কেন?

আলী আহমদ : ভাবানুবাদ বলতে যা বুঝায় তার আরেকটি নাম ‘ছায়া অবলম্বনে’ লেখা; তা অনুবাদ হিসেবে বিবেচ্য হতে পারে না। অনুবাদ মূলের সাথে মিলিয়েই করতে হবে। একজন কবি বা লেখকের লেখা অনুবাদের সময় তার মধ্যে নিজের সুবিধামত কথা বসিয়ে দেবার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু মূলানুগ ভাষান্তর সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবার যোগ্যতা তখনই অর্জন করতে সমর্থ হবে যখন তা ওপরের অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্তগুলো পূরণ করতে পারবে।


এহ্সান : অন্যান্য অনুবাদক থেকে নিজেকে কিভাবে আলাদা করেন?

আলী আহমদ : আপনি এখানে কি ‘অনন্য’ অনুবাদক বলতে চেয়েছেন, নাকি ‘অন্যান্য অনুবাদক থেকে কিভাবে নিজেকে আলাদা করি’ সে কথা বলতে চেয়েছেন? যদি প্রথমটি হয়, তা’হলে উত্তর, আমি অনন্য কোনো অনুবাদক নই। আর যদি দ্বিতীয়টি হয়, তাহলে উত্তর—প্রত্যেক লেখক ও কবির মতো প্রত্যেক অনুবাদকও নিজস্ব বৈশিষ্ট্যে আলাদা। তীক্ষ্ণদৃষ্টি পাঠকই তা আবিষ্কার করেন; লেখক বা অনুবাদক সে সম্পর্কে সচেতন না-ও থাকতে পারেন।


এহসান : অনুবাদকের স্বাধীনতা, শব্দ তৈরি ইত্যাদি দিক অনেকে সামনে আনেন। এটাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? তা ছাড়া অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীনতা আছে কি?

আলী আহমদ : কথাগুলো যারা বলেন, তাঁরা যথার্থই তা বলেন। যে-ভাষায় সাহিত্যকর্মটি অনূদিত হচ্ছে, সে-ভাষার নিজস্ব একটি গতি-প্রকৃতি আছে, তার বাক্যগঠন-প্রণালী আলাদা হতে পারে, অনুবাদনীয় ভাষার, কিংবা তার প্রকাশভঙ্গির বিশেষ বিশেষ শব্দ সে ভাষাতে অনেক সময়-ই পাওয়া যায় না। সুতরাং অনুবাদককে শব্দ তৈরি করতে হতে পারে; আবার কখনো কখনো বা মূল ভাষার শব্দটিই পরিবর্তিত অথবা অপরিবর্তিত রূপে নিয়ে আসার প্রয়োজন হতে পারে যে-ভাষায় অনুবাদ করা হচ্ছে সে-ভাষাতে। সুতরাং দেখাই যাচ্ছে মানোত্তীর্ণ অনুবাদের জন্য অনুবাদকের স্বাধীনতার প্রয়োজন যেমন রয়েছে তেমনি প্রয়োজন রয়েছে কখনো কখনো নতুন শব্দ গঠনের কিংবা ধার করার।

অনুবাদকের স্বাধীনতা আছেও, আবার নেইও। সে-স্বাধীনতা মূলের কাঠামোতে ঘেরা, কিন্তু তার মধ্যে চলার ধরনে তার স্বাধীনতা এবং স্বকীয়তা ও সৃজনশীলতা। আগের আলোচনাসমূহ থেকে আশা করি, এতক্ষণে তা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।


এহ্সান : অনুবাদ আমাদের সাহিত্যে কী অবদান রাখছে?

আলী আহমদ : সাহিত্য-মানসম্পন্ন সৃজনশীল অনুবাদ যে-কোনো সাহিত্যে অসাধারণ অবদান রাখে। অনেকগুলো অসাধারণ অনুবাদকর্ম বাংলা সাহিত্যকেও অনেক ঋদ্ধ করেছে, এবং আগামীদিনে আরো করবে।


এহ্সান : অন্য একটি ভাষায় লেখা অনুবাদ হচ্ছে। অথচ লেখক জানছেন না, রয়েলটি পাচ্ছেন না। মূলানুগ অনুবাদের জন্যও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে না। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?

আলী আহমদ : এ বিষয়টি অনৈতিক, অন্যায় ও আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তবে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক এই আইনের আওতা থেকে এখনো পর্যন্ত আমরা মুক্ত।


এহ্সান : লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের কথা প্রায়ই শোনা যায়। আমাদের দেশে অনুবাদের তেমন পেশাদারিত্ব দেখছি না। অনুবাদের মানোন্নয়নের জন্য পেশাদারিত্বের ভূমিকা কী মনে করেন আপনি?

আলী আহমদ : পেশাদারিত্বের গুরুত্ব সম্পর্কে আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু আমাদের দেশে শ্রেষ্ঠ লেখক-কবিদের জন্যই যেখানে পেশাদারিত্ব নেই, সেখানে অনুবাদকের জন্য তা আশা করা, বোধ হয়, একটু বেশিই হয়ে যাবে। শুধু অনুবাদের কেন, সাহিত্যের উন্নতির জন্য এটি খুবই জরুরি।



এহ্সান : অনুবাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে পদকও দেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের দেশে মানসম্মত অনুবাদের ক্ষেত্রে কি কোনো ভূমিকা রাখছে?

আলী আহমদ : নিশ্চয়ই রাখবে বলে আশা করা যায়। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে বিষয়টিকে অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। তবে স্বীকৃতির বিষয়গুলো নৈর্ব্যক্তিক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে অবদানভিত্তিক হওয়া বাঞ্চছনীয়।


এহ্সান : এই মুহুর্তে দেশে যে অনুবাদ হচ্ছে, তার মান নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট?

আলী আহমদ : এই ‘মুহূর্তে’ না-বলে আজকাল বলাই, বোধ হয়, অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। অনুবাদ কিংবা মৌলিক লেখা চিত্রাঙ্কন, সঙ্গীত, নৃত্য, অভিনয় ইত্যাদির মতো একটি সুকুমার শিল্প। যে-কোনো দেশে, যে-কোনো একটি কালে, অনেকেই সেসব ক্ষেত্রে নিয়োজিত হন বা থাকেন। এর বিপুল বা অধিকাংশই নিজের অন্তর্গত সৃজনশীলতার তাগিদেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে কাজ করেন বলে আমার ধারণা। তবুও তাঁদের সবার মধ্যে সৃজনশীলতার মান, দুর্ভাগ্যবশত, এমন স্তরের হয় না, যার কারণে তা কালজয়ী শিল্পকর্মের স্বীকৃতি পায়। এমনও নজির বিরল নয় যে জীবদ্দশায় যাকে নিয়ে মহান শিল্পী হিসেবে প্রচণ্ড হৈ-চৈ হয়, পরে সবাই তাকে ভুলে যায়, তার সৃষ্ট শিল্প অবহেলিত হতে হতে এক সময়ে কালের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। অনুবাদ কিংবা যে-কোনো শিল্পসৃষ্টি সম্পর্কে এই কথাগুলো মনে রেখে মন্তব্য করা উচিৎ। অন্যান্য যে-কোনো শিল্পসৃষ্টির মতো, অনুবাদের ক্ষেত্রেও স্বল্পসংখ্যকই মানোত্তীর্ণ; বাকিগুলো একদিন হয়তো হারিয়ে যাবে। এ বিষয়টি সম্পর্কে সন্তুষ্ট-অসন্তুষ্ট বলে রায় দেয়া যায় না। তবুও অনেকে যে চেষ্টা করছেন, সেটা একটা শুভ লক্ষণ। এঁদের মধ্য থেকেই বেরিয়ে আসবেন একদল সফল অনুবাদক। আর অনুবাদের সবচেয়ে যে-বিষয়টা ভালো তা’ হচ্ছে পাঠজগতের বিস্তৃতি ও পাঠক রুচির উন্নয়ন। যে-কোনো সাহিত্যের জন্য এটা আনন্দের বিষয়। তবে সঙ্গে সঙ্গে একথাটাও, বোধ হয়, বলে নেয়া ভালো যে, অসফল তরজমা অনুবাদের জনপ্রিয়তা হানি করে এবং, তাঁরও চেয়ে যেটা মারাত্মক তা হলো যে-লেখকের লেখা ও রকমের অনুবাদের শিকার হয়, সেই লেখক পাঠক সমাদর পাওয়ার পরিবর্তে পাঠকের অপসন্দই পান। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।


এহ্সান : আমাদের দেশে অনেক অনুবাদক আছেন। বাজারে তাদের বইও আছে। আপনি কাদেরকে আদর্শ অনুবাদক বলে মনে করেন?

আলী আহমদ : নাম ধরে ধরে শ্রেণীবিভাজন অশোভন বলে মনে হয়। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন কাদের অনুবাদকর্ম মানোত্তীর্ণ, আর কাদেরগুলো নয়।


এহ্সান : নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। আজকের দিনে অনেকের মধ্যে অনুবাদক হওয়ার চিন্তাও দেখা যায়। অনুবাদক তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমটি আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? আদৌ কি তেমন কোনো মাধ্যম আছে?


আলী আহমদ : অনুবাদকের প্রকাশের সুযোগ যতো বেশি হবে ততোই ভালো। সেজন্য সব রকমের মাধ্যমই ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে না-দেখে, প্রকাশের সুযোগকে সার্বিকভাবে দেখাই ভালো। 


এহ্সান : আপনাকে ধন্যবাদ।
আলী আহমদ : আপনাকেও ধন্যবাদ। 




সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান 

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন