বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

আলোচনা-- দয়াময়ীর কথা : সুনন্দা সিকদার

মৌসুমী কাদের

বোধের দৃষ্টি দিয়ে কেউ যখন লেখে তখন তার ভাষার কারুকাজ প্রয়োজন হয়না, আকাশটা যেন এমনিই খুলে যায়। সময়ের দূরত্বগুলো তখন গভীরে ভাষার কলোরব হয়ে বাজে.... ‘ঝিক ঝিক ঝিক ময়েংসি, ঢাকা যাইতে কতদিন, এক মাস তেরো দিন...কু...উ...উ’... শৈশবের ১০ টি বছর এতটাই স্পষ্ট করে আগলে রেখেছিলেন দয়া। যে আস্তরটি চোখে পড়েছে, সেটি কেবলমাত্র সময়ের প্রলেপ। পরবর্তী জীবনে চল্লিশ বছর পশ্চিমবঙ্গে কাটিয়েও এই গভীর মর্মস্পর্শী স্মৃতিগুলোতে এতটুকু চির ধরেনি। আর এইসব স্মৃতিকথার চমৎকার গ্রন্থন এই ‘দয়াময়ীর কথা’ ।


কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৮ সালের লীলা পুরষ্কার এবং ২০১০ সালে আনন্দ পুরস্কার পাওয়া বই ‘দয়াময়ীর কথা’। লেখক সুনন্দা সিকদার। জন্মেছেন ১৯৫১ সালে। শৈশবের দশটি বছর কেটেছে নিঃসন্তান পিসিমার কাছে পুর্ব বাংলার এক প্রত্যন্ত গ্রামে। ১৯৩০-১৯৬০ সালের পূর্ববাংলার ময়মনসিংহ জেলার হিন্দু-মুসলমানদের সমাজ চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি এই বইয়ে। পরবর্তীতে ১৯৬১-তে পশিমবঙ্গ ফিরে যান তিনি। আর তখন থেকে শুরু হয় তার শহুরে জীবন। কিন্তু শেকড়ের সাথে মিশে বেঁচে থাকে যারা, তারা কোনদিন পরবাসী হয়না। তিনি ছিলেন মিলে মিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিনিধি ।

ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ময়মনসিংহের মানুষের টানটাই বোধহয় এমন। দূর সম্পর্ককেও আপন করে নেবার অদ্ভুত এক ক্ষমতা আছে এদের । হয়ত একারনেই সুনন্দার মতন অনেক মাসী, কাকীমা অথবা দিদি, দিঘপাইত গ্রামে দয়াময়ী হয়ে বেঁচে আছেন। সুনন্দার লেখায় যখনই জামালপুর, সরিষাবাড়ীর গল্প এসেছে...ছবির মতন সেই সব দৃশ্যপট আত্মীয়তার সূত্রে বেঁধে ফেলেছে। নান্দাইল, কেন্দুয়া, জামালপুর, সরিষাবাড়ী, গফরগাঁও...কত পরিচিত নাম। হেটে হেটে মফঃস্বল শহর গুলো সেইযে দেখা, আজো যেন চোখ বুজলেই স্মৃতির ভার নুয়ে পড়ে । স্মৃতিগুলো এমনি প্রখর যে, এর ইতিহাস যারা খুলে নেড়েচেড়ে বলেন, তাদের ভক্ত হয়ে যাই । সুনন্দা’র লেখাটি তেমনই একটি লেখা, যা কেবল ওর একার স্মৃতিকথা নয়; এ অনেকের কথা, একটি অসাধারন অসাম্প্রদায়িক খন্ডচিত্রের প্রতিনিধি । সামগ্রিকভাবে দেশভাগ, বিভাজন, - বিষয় হিসেবে অনেক বড় প্রেক্ষাপট । কিন্তু তার চেয়ের প্রখর সত্য খন্ডিত হয়ে পড়া বাংলার মানুষ, লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া অনেকগুলো পরিবার, উপচে পড়া ক্ষত। আর এইসব ছিন্নমূল মানুষের রক্ত দিয়ে লেখা হয়েছে এই অবিস্মরনীয় সাহিত্যটি ।

১৯৫১ থেকে ১৯৬১ সালের পুর্ববাংলার শৈশবস্মৃতি- এই মেয়েটির । নিঃসন্তান পালক মা (পিসিমা) এবং মুসলমান চাকর মাজম দাদার কাছে বেড়ে উঠেছেন দয়াময়ী দিঘপাইত গ্রামে । পরবর্তীতে আগেই পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়া গর্ভধারিনী মা ও বাবার কাছে ফিরে যান তিনি। কিন্তু শৈশবের স্মৃতির তীব্রতা ভাসিয়ে রেখেছে তাকে বাকি জীবন। আজমদাদা, মাজমদাদা, সমসেরচাচা, রাধিয়াদি, ঝুমিয়াদি, ভুলিপিসিমা, এরা সবাই সেই স্মৃতির মানুষজন…

প্রগাঢ় স্নেহ দিয়ে যিনি লতার মতন বেড়ে তুলেছিলেন দয়াকে, সেই পালিকা মা, সেই পিসিমা’র নাম ছিল স্নেহলতা। শেয়ালের মুখ থেকে বেঁচে এসেছিলেন ১ মাসের স্নেহলতা। সেই বেঁচে যাওয়া ভাগ্যবতীই আবার শিশু বয়েসে বিধবা হন। কোনো শুন্যতার বোধ স্নেহলতার ছিলনা। কেবল বহুযুগ আগে দেখা এক বলিষ্ঠ তরতাজা অথচ মৃত যুবক সারাজীবন তাকে নিয়ন্ত্রন করে গেছে। উর্বর জমিতে তর তর করে সবুজ বৃক্ষরাশিকে বেড়ে তোলা ছাড়া আর কোন সত্য ছিলনা তার জীবনে । হিন্দুস্থান পাকিস্থান যখন আলাদা হোল, দয়ার বাবা অন্নদা আর মা সুপ্রভার হিন্দুস্থানে চাকরী হয়ে গেলে, ওরা তখন দেশ ছাড়ল। আর নিয়তী দয়াকে দিয়ে গেল স্নেহলতার কাছে। ঠিক সেই সময়টিতেই দিঘপাইত গ্রামে হিন্দু মুসলমান আর চাষাভুষোদের উপচে পড়া মায়ার বাঁধলেন ‘দয়া’। ষাট বছর বয়েসী প্রৌঢ় স্নেহলতা ৮ মাস বয়েসী এই দয়াকে পেয়ে নাওয়ানো, খাওয়ানো, ঘুম পাড়ানো, অসুখ-বিসুখের দায় নিতে নিতে গোপন স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে রইলেন। জীবনের দশটা বছর দয়া যা কিছু শিখেছেন, ধারন করেছেন তার অনেকটা জুড়েই ছিলেন এই স্নেহলতা। নামের সংগে মায়ামমতার সখ্যতা ছিলতো বটেই। চোখের ভেতর অন্য চোখটি দিয়ে স্বপ্ন বুনতে চাইতেন তিনি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিয়তীর কাছে হার মানতে হোত তাকে।

দয়াময়ীর জীবনে আরেকজন নারীর স্থায়ী প্রভাব পড়েছিল। তিনি হলেন ভুলিপিসিমা । তার পালিকা মায়ের ননদ, যিনি ছিলেন দশ বছরের বিধবা । এই বিধবা শিশুটি নিজের চেষ্টায় অনেক প্রতিকূলতার মধ্যে লিখতে পড়তে শিখেছিলেন। আজন্ম একটা শিক্ষিত মন নিয়ে জন্মেছিলেন তিনি । কোথা থেকে এইরকম মুক্ত অন্তঃকরণ একটা মন পেয়েছিলেন সেটা ছিল দয়ার কাছে একটা পরম বিস্ময়। নিজের জীবনে কিছু না পেয়েও তার এতটুকুন দৈন্যতা ছিলনা। আশ্রমে আশ্রমে আর স্টেশনে স্টেশনে জীবন কাটানো এই নারী ছিলেন দয়ার চিন্তার চিরকালীন সংগী।

হিন্দু মুসলমান বা দেশভাগের গল্প নতুন কিছু নয়। তবু কেন সুনন্দা তার লেখায় অসাধারন হয়ে উঠলেন? কারন তিনি প্রকৃতিকে ঘিরে এক অনন্য ইতিহাস এঁকেছেন। সময়কে দেখেছেন চোখ মেলে ভীষন কাছ থেকে, অনুভূতিটা ছিল আরো আরো গভীরে । মা-বাবা, ভাই বোন বা পালিকা মায়ের সাথে দূরত্ব ছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা । তার চেয়েও বড় এবং অনেক বলিষ্ঠ ছিল ‘স্নেহলতা-দয়া-ভুলি’ এই তিন নারীর সংগ্রামী অথচ বোধসম্পন্ন জীবন। একে অন্যের কাছে শিখেছেন, দিয়েছেন তার চেয়ে বেশী। সুনন্দা তাদেরকেই যূথবদ্ধ করেছেন সহজ ভাষায়, কাঁচের মতন, স্বচ্ছ এবং প্রানবন্ত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র দয়ার পাশে ছায়া হয়ে ভেসে ছিল। মাজমদাদা। হিন্দু মুসলমানের তখন পার্থক্য ছিল, বেদনা ছিল, অসমতা ছিল। আবার অন্যদিকে মাজমদাদার মতন তীব্র ভালোবাসাও ছিল। সেইযে মাজম দাদার কাঁধে চড়ে বংশ নদীর ধারে বেড়াতে যাওয়া, চিনতে শেখা দন্ডকলসের ঝাড়, নানারকম ঘাসফুল, চুলের মুঠি ধরে ঝুলে ঝুলে শরীরটাকে দেখতে পাওয়া, সেইযে বুকে পিঠে গায়ে কোথায় জড়ুল আর তিল, বুক ভরা লোম, সেগুলো কি সহজে ভোলা যায়? দাদাই শিখিয়েছিলেন; আল্লাহর সঙ্গে দূর্গা–লক্ষীর কোন ঝগড়া নেই। বেহেশতে সকলের মধ্যেই ভালোবাসা। কাইজা করে মানুষ। মাজমের এই ভালোবাসার ধর্মবোধ দয়াকে প্রভাবিত করেছিলতো বটেই। ‘সুনন্দা সিকদার’ হয়ে উঠবার প্রথম তাগাদা বোধকরি এই মাজমদাদার মৃত্যু থেকেই । সেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের পর যখন মাজমদাদার মৃত্যুর খবর এলো, বুকের মধ্যে যা কিছু বেদনার পাহাড় লুকানো ছিল, তা তর তর করে যেন বেড়িয়ে এলো। মৃত্যু্র খবরটা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে তিরিশ বছরের স্মৃতিকথাগুলো গলে গলে কান্নার স্রোত হয়ে বেড়িয়ে এলো সুনন্দার লেখায়।

মাজম দাদার মতন আরো রয়েছে আজম দাদা, কালাজিরা চাল, হাঁসখোলের ভাত… সোনটিয়া, হরিদ্রাটা, বংশনদী অথবা দিঘপাইত জুনিয়ার হাই ইসকুল । এই সকল ভিটেমাটির কথা, গরুবলদের কথা মনে হলে পূর্বজন্মেরা প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরে। অস্তিত্বেরা গোগ্রাসে গিলে খেতে থাকে পরিচয়। মনে হয়, আবার ফিরে যাই সেই পরিত্যক্ত ভিটেয়। দয়ার যেন ঠিক তেমনটাই ঘটেছিল। মানুষকে তিনি ছিড়ে খূঁড়ে দেখেছেন; কখনও হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান কিছু হতে পারেননি বা চাননি। বিবেক যখন সীমাহীন আকাশকে ছূঁতে পায় তখনই বোধহয় ধর্ম পরিচয়টি বিলুপ্ত হতে শুরু করে। দয়াময়ী সেইরকম একজন অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ।

দয়ার জন্মের কয়েক বছর আগে নোয়াখালীতে যে দাঙ্গা হয় ওখানে হিন্দুদের উপর মুসলমানেরা ভীষন অত্যাচার আর জুলুম করেছিল। মুসলমানদের উপর হিন্দুরা অপঘিন্না করেছে দীর্ঘকাল। হিন্দুরা মুসলমানদের ঘরে ঢুকতে দিতনা, তাতে জাত যাবে বলে; দাওয়ার বাইরে বসিয়ে খেতে দেয়া, আলাদা হুকো, আলাদা বাসন...এই চর্চা চলেছে অনেকদিন। তারই প্রতিশোধ ছিল কি এই দাঙ্গা? এইসব বড় বড় চিন্তার বিষয় গুলো মাথায় ধারন করে দয়া বেড়ে উঠেছিল। আর সেকারনেই নানা রকম গোপন অপরাধ করতে ওর দ্বিধা হয়নি। গল্পের বর্ননায় একবার তিনি বলেছেন; ‘আমি রাধিয়াদির রান্না অনেক কিছু খেতাম। ওদের চালের খুব অভাব, সেই জন্যে ওরা পেঁয়াজ দিয়ে কচুরলতি চচ্চড়ি করত ঝাল করে। …প্রথম যেদিন আমি ওদের বাড়ি কচুরলতি চচ্চড়ি খাই, সে দিন ওই অপরাধ করে এসেই স্লেটে সে কথা লিখেছিলাম।… স্লেটে লিখলে পাপটা বোধহয় কমে যেত, আর লিখতে পেরে খুব আনন্দও হত।… ঝুমিয়াদি আমায় বলল,… ‘তুমি খাও, দয়া। এখনও তর আট বছর বয়স হয় নাই, তর কুন পাপ হবে না। আর একশো আটবার নারায়ণ লিখবি সেলেটে, সব পাপ ধুইয়া যাইব গা।’

১৯৪৭ সালে আরো তীব্রভাবে শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ। কেবলমাত্র অর্থনৈতিক নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয়। বড্ড অস্থির ছিল ঐ সময়টা। চারপাশের দৃশ্যপট পালটে যাচ্ছিল দ্রুত, পুর্ববঙ্গ ছেড়ে হিন্দুরা তখন চলে যাচ্ছে হিন্দুস্থানে । আবার উত্তরবঙ্গ থেকে বাড়িজমি বদল করে পুর্ববঙ্গে আসছে যে মুসলমান– ভূমিপুত্রদের সঙ্গে তাঁদের এক করে দেখছেন না কেউই। এই সময়টাতে মৈমনসিংহ বা জামালপুর শহর থেকে ইত্তেফাক কাগজ আসতো। জওহরলাল নেহরু আর আইয়ুব খানের সম্পর্ক কেমন দাঁড়াচ্ছে তার উপর নির্ভর করে বেঁচে থাকতেন পিসিমা। এদের ভাব ভালোবাসা কোনদিন ভাল হোলনা আর পিসিমারও পাসপোর্ট ভিসাহীন দেশ দেখা হোলনা। জমিদারবাবুরা তখন মানুষের অন্ন নিয়ে রাজনীতি করতেন। অন্যায় শাসন করে নিয়ন্ত্রন করতেন সাধারন মানুষের জীবন। কিন্তু বিদ্যাচর্চা নিয়ে তাদের মাথাব্যাথা ছিলনা। দিঘপাইত গ্রামটা যে একটা মুসলমান রাষ্ট্র, এই বোধটা গ্রামের কেউ জানতনা তীব্র করে। দিঘপাইত গ্রামে ধর্ম, জাত, এইসব বিষয় গুলো ছিল জোরালো । ইস্কুলের ধর্ম পরীক্ষায় পুরোহিতের ছেলে কানু আর মৌলভীসাহেবের ছেলে জমিরুদ্দিনকে হারিয়ে দয়া’র ফার্স্ট হয়ে যাওয়ার রহস্যটি আর কিছুই নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে ইয়াদালীকাকা আর সুবহানদাদার কাছে ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানচর্চা এবং কোন ধর্মকে যে ছোট করে দেখতে নেই সেইটি বোধের মধ্যে ধারন করতে শেখা তখনি। ইয়াদালীকাকার কাছেই বুদ্ধদেব সম্পর্কে জানা, ‘সব মানুষই সমান, জাতপাত মানুষের তৈরী’ এই বোধ ধারন করতে করতেই দয়া বড় হয়েছে। যীশুখৃষ্ট কিভাবে মানুষকে ভালোবাসার কথা বলেছেন সুবহানদাদা সেই বর্ননাও করেছেন। তারপরও কি কারনে হিন্দুস্থান-পাকিস্থানের এই সব জাত এবং ধর্মের বিভেদ ছিল, সেই সব কঠিন সংকট এবং মনোবৈকল্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী হয়ে রইলেন দয়াময়ী।

নানা ঘটনার ধারাবাহিকতায় দিঘপাইত গ্রাম থেকে বিশ্বাসবাড়ির ঠাকুমা, ঘোষবাড়ির খুকিপিসিমা, চোদ্দগন্ডার জেঠিমা সকলে কাঁদতে কাঁদতে হিন্দুস্থানে চলে গেলেন। গরু গাড়ীতে করে চলে গেল থালাবাসন, কাঁঠালকাঠের পিড়ি, পোটলা ভর্তি চিড়ে-মুড়ি, ট্রাঙ্ক, শতরঞ্জি; সেই সব বদলে যাওয়া দৃশ্যপট আঁকড়ে ধরেছিলেন দয়া। আজমদাদা, মাজমদাদারা ছিলেন বর্গা চাষী । কমুঠো লাল হাঁসখোলের ভাতের জন্যে এরা কায়েতদের পায়ে পড়ছিল তখন । মুসলমানেরা নিজেদের জমি চাষ করলেও হিন্দুরা তা করেনি, কারন তাতে করে তাদের জাত যেত। আর সেই সময়ে হিন্দু জমিদাররা বর্গা দিতে চাইলে গরুর সংখ্যা গুনে গুনেই তবে বর্গাচাষী বাছাই করা হোত। এইরকম এক অস্থির সময়ে মুসলমান চাষী আজমদাদার কষ্ট নিজের চোখে দেখেছেন দয়া। উপলব্ধি করেছেন ইতিহাসের করুন উপহাস। পিসিমা খুব চেয়েছিলেন দয়া লেখাপড়া করুক। কিন্তু দিঘপাইত গ্রামে মেয়েদের ইস্কুল নেই বলে তার আর পড়া হোলনা। গ্রামের ছেলেরা চিৎকার করে পড়ত আর সেই শুনে শুনে দয়ার পড়া মুখস্ত হয়ে যেত। দুই থেকে উনিশের নামতা, হাজি মোহাম্মদ মহসিন, কায়েদে আজম জিন্না, বেগম রোকেয়া সব ছিল খুব পরিচিত নাম। জসীমউদ্দিনের ‘রুপাই’ কবিতা মুখস্ত ছিল তার। হয়ত সেই থেকেই লেখার বোধটা তৈরী হতে শুরু করে দয়া’র। আর প্রতিটি দৃশ্যকল্প গোপনে মালা গাঁথতে থাকে। বাংলা সাহিত্যে দেশভাগের সময়ের এইরকম মায়াময়ী স্বচিত্র বর্ননা একটি অনন্য দৃষ্টান্তই বটে।

দীঘপাইত গ্রামে যখন গোল্লাছুট খেলা হোত, অথবা জাম্বুরা বা বাতাবিলেবু দিয়ে বল খেলা হোত তখন জাতপাত আলাদা করা যেতোনা। যখন একটা বড় গাছের তলায় বসে কিতাব বা পুথিপাঠ হত, তখনও গল্পের টানে অথবা গল্পের জাদুতে জাতপাত, ছোঁয়াছুঁয়ির কথা ভুল হয়ে যেতে দেখেছে দয়া। গর্ভধারিনী মা, বাবা, বা ভাই-বোনকে কখনো তার সুখ বা দুঃখের অংশ করতে পারেনি সে। তার পুরো জীবনটাই ঘিরে রেখেছিল এই ‘দিঘপাইত গ্রাম’। দশটি বছর ধরে গড়ে উঠেছে এই স্মৃতি, যেটা কেবল তার একার, কাউকে সেকথা বলা যায়না। নিজের দেশ নিয়ে পরবর্তীতে বাকিটা সময় এটি অনুচ্চারিতই থেকে যায়। পালিকা মায়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দয়া সেকথা উচ্চারন করেননি।

পুরষ্কার পাবার পর ‘দয়াময়ী’ অর্থাৎ আমাদের ‘সুনন্দা সিকদার’ ২০০৯ সালে ফিরে গিয়েছিলেন সেই দিঘপাইত গ্রামে। কতযে বদলে গেছে গ্রামটি। স্কুলে এখন টিনের চাল। চাষীরা বছরান্তরে ভাল ধান পায়, এখন আর আগের মতন চাল কিনে খেতে হয়না। গ্রামবাসীদের জীবনযাত্রাও বদলে গেছে। সবচেয়ে আশ্চর্য হোল হিন্দু মুসলমানদের সেই পার্থক্য অনেকটাই যেন মিইয়ে গেছে। অনেকেই তাকে বলেছে যে ১৯৭১ বদলে দিয়েছে অনেককিছু। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারতে যে ১ কোটি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল তাদের বেশিরভাগই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। দেশ স্বাধীন হবার পর যার একটা বড় অংশই আর স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেনি। একই সংগে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বা যুদ্ধের আগে-পরে যে পরিমাণ হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছিল তার থেকে অনেক বেশি হিন্দু দেশ ত্যাগ করেছে যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে। কিন্তু কেন? দীঘপাইতের সেই সন্ধ্যায় কীর্তন আসরে বসে সেকথাই দয়াময়ী ভেবেছিল স্তব্ধ হয়ে । হিন্দুদের সংগে সেদিন অনেক মুসলমানও সেখানে কীর্তন শুনতে এসেছিল। খিচুরী, লাবরা, পায়েস রান্না করেছিল উভয় ধর্মের মানুষ। দয়া এই দৃশ্য দেখে আশ্চর্য্য হয়ে চোখ বুজে রেখেছেন অনেকক্ষন।

অদ্ভুত মায়ার এক লেখা, যারা পড়বেন মায়ায় ভাসবেন। যেমনটা ভেসেছি আমি।


মৌসুমী কাদের- ১১/১২/২০১৪
টরন্টো, কানাডা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন