বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

শকুন

হাসান আজিজুল হক

কয়েকটি ছেলে বসে ছিল সন্ধ্যার পর। তেঁতুলগাছটার দিকে পিছন ফিরে। খালি গায়ে ময়লা হাফশার্টকে আসন করে। গোল হয়ে পা ছড়িয়ে গল্প করছিল। একটা আর্তনাদের মতো শব্দে সবাই ফিরে তাকাল। তেঁতুলগাছের একটা শুকনো ডাল নাড়িয়ে, পাতা ঝরিয়ে, শোঁ-শোঁ শব্দে একটা বিরাট কিছু উড়ে এল ওদের মাথার ওপর। ফিকে অন্ধকারের মধ্যে গভীর নিকষ একতাল সজীব অন্ধকারের মতো প্রায় ওদের মাথা ছুঁয়ে সামনের পোড়ো ভিটেটায় নামল সেটা।

হৈচৈ করে উঠল ছেলেরা, ছুটে এল ভিটেটার কাছে। আবছা অন্ধকারে খানিকটা উঁচু মাটি আর অন্ধকার একটা ঝোপ ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না তাদের। কিন্তু ওদের সর্দার-ছেলেটি বুঝতে পারল হামেশা দেখা যায় এমন পাখিদের মধ্যে শকুনই তীব্রবেগে মাটিতে নেমে তাল সামলানোর জন্য খানিকটা দৌড়ে যায়। তাই তার চোখেই প্রথম পড়ল অন্ধকারের তালটা দৌড়তে দৌড়তে খানিকটা এগিয়ে বিব্রত, হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে গেল।

অপেক্ষাকৃত ছোট ছেলেটি বলল, ভয়চকিতস্বরে, কীরে ওটো? আর একজন জবাব দিল, মুটেই বুঝতে পারচি না।

পাখি ওটো।

পাখি-টাখি হবে।

ক্যা জানে, সঞ্জেব্যালায় ক্যার মনে কী আচে? সে বুকে থুতু দিল।

অনড় হয়ে রয়েছে অন্ধকারের দলাটা। লুকিয়ে যাওয়ার একটা ভাব, পারলে কোনো বহু পুরনো বটের কোটরে, কোনো নোংরা পুরীষ-গন্ধে বিকট আবাসে, কোনো নদীর তীরে বেনাঝোপের নিচে শেয়ালের তৈরি গর্তে লুকিয়ে যাওয়ার মতলব।

শ্যালা! ক্যার মনে কী আচে, ক্যা কী চায়, ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে। চ’ বাড়ি যাই।

দলের মধ্যে গোরু-চরানো রাখাল আছে, স্কুলের ছাত্র আছে, স্কুলের ছাত্র অথচ সুযোগ পেলেই গোরু চরায়, ঘাস কাটে, বীজ বোনে এমন ছেলেও আছে।

তু তো ভীতু, দ্যাখলোম একটো জিনিশ, শ্যাষ পর্যন্ত দেখি দাঁড়া।

না, আমি চলে যাব।

তু যা গা তবে, আমরা যাব না।

ক্যারে বাড়ি যেচিস, তেঁতুলতলাটা পার হয়ে দ্যাখগা। স্কুলে পড়ে সেই ছেলেটি বলল, জিনিশটো দেখতে হবে।

প্রায় সবাই দাঁড়িয়ে গেল। তারপর বড় ছেলেটা এগিয়ে গেল। অতি সন্তর্পণে পা টিপে টিপে।

এক জায়গায় নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমস্ত সুন্দর জিনিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মতো সেই কুৎসিত জীবটা।

সর্দার-ছেলেটি জানত, সেটা একটা বুড়ো শকুন। নির্বাক, নিরুদ্যম, নিরুৎসাহ।

একেবারে কাছে এগিয়ে গেল সে। এত কাছে যে হাত বাড়ালে ধরা যায়।

শ্যালা, ক্যার মনে কী আচে, ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে—রাখালটা তখনও বিড়বিড় করছে।

একটা দমকা বাতাসে অজস্র শুকনো পাতা ঝরে পড়ল। পুকুরের পানিতে প্রথমে মৃদু কম্পন, তারপর ছোট ছোট ঢেউ উঠল—কার হাত থেকে কোথায় ধাতব কিছু পড়ে বিশ্রী অস্বস্তিদায়ক একটা শব্দ হলো।

ছেলেটা খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল, দেখল সত্যিকারেই সেটা একটা শকুন—আলো থাকতে থাকতে বাসায় ফিরতে পারেনি। এখন রাতকানা। উগ্র একটা দুর্গন্ধ ওর নাকে এল—ভাগাড়ের আঁশটে গন্ধ। গলিত শবদেহের পচা পাঁকে সে যেন এইমাত্র স্নান করে এসেছে। শকুন কুকুরে লড়াইয়ের শেষ চিহ্ন এখনও একটা ছিটকে বেরিয়ে-আসা মোটা খসখসে, নোংরা পালক থেকে টের পাওয়া যায়।

মারামারি করেছে শালা ঠিক সারা দোপরবেলা। এখনও ধুঁকচে।

পলটু এগিয়ে এল। পিছু পিছু জামু, এদাই। আরও অনেকে যারা ছিল।

পলটু বলল, শিকুনি লয়?

হ্যাঁ, দেখতে পেচিস না?

মোল্লা-শিকুনি লয় তো?

বোধহয় মোড়ল-শিকুনি।

রাখাল জামু বলল, মেদি না মদা বলতে পারলে বলি হ্যাঁ!

সর্দার রফিক বলল, তু তো গোরু, তাই গোরুর মতন কথা বলিস।

শকুনটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। বোধহয় সে পছন্দ করছে না এই বিরক্তিকর অবস্থাটা। রফিক হাঁক দিল, আয় খানিক মজা করি—আয় লাচাই খানিকটো ওটোকে।

হৈহৈ করে উঠল ছেলের দল। বাড়ি যাবার ইচ্ছা অথচ ভয়ে তেঁতুলতলাটা পার হতে পারছে না সেই যে ছেলেটি, সেও চেঁচিয়ে উঠল।

রফিক এগিয়ে শকুনটার ডানা ধরে ফেলল। এতক্ষণে চেতে উঠল কুৎসিত পাখিটা, অত সহজে সে ধরা দিতে চায় না। নোংরা বিরাট দুটো পাখা মেলে বিচ্ছিরি নখওয়ালা পা-দুটো ক্ষিপ্রতার সঙ্গে চালিয়ে দৌড়তে শুরু করল সে গাঁয়ের সরু গলিটার মধ্য দিয়ে।

এইভাবেই ওরা ওড়বার প্রস্তুতি নেয়, ভারমুক্ত করবার শুরু করে নিজেকে। বোধহয় সে শেষ পর্যন্ত উড়তে পারত— অন্তত মুক্তি পেত এই অসহনীয় কিশোরদের হাত থেকে— তাদের হিংস্র কৌতূহল আর প্রাণান্ত খেলার খপ্পর থেকে। কিন্তু তার চোখে দৃষ্টি নেই—চলার কোনো সুপরিকল্পিত উদ্দেশ্য নেই। শকুনটার মাথা ঠুকে গেল দেয়ালে। পেছনে পেছনে একদল খুদে শয়তানের মতো প্রতিহিংসাপরায়ণ ছেলের দল নিষ্ঠুর আনন্দে ধাওয়া করছে।

কিন্তু পাখিটা পার হতে পেরেছে অন্ধকার গলিটা। কারণ গলিটা কানাগলি নয়। গলির দুপাশের দেয়ালের ফুটোয় যে-সাপগুলি গ্রীষ্মের গরমে গলা বের করে থাকে ও প্রতীক্ষা করে—যদি তারা সেই অবস্থায় থাকত তা হলে নিশ্চয়ই মাথা আবার গুটিয়ে নিয়েছে।

কুলতলার পাশ দিয়ে, আরও দুটো পোড়ো ভিটের ওপর দিয়ে, হাড়গোড় জড়ো-হওয়া টুকরো জমিটার নীরস আর্তনাদ উপেক্ষা করে জীবটা অনবরত ডানা মেলে ওড়বার চেষ্টা করছে, আরও দ্রুত দৌড়চ্ছে, আরও শক্তি ব্যয় করছে, আরও পরিষ্কারভাবে পথ চিনতে চাচ্ছে—পালাতে চাচ্ছে। কিন্তু সে নিস্তেজ, উপায়হীন। আক্রমণ করতে জানে না। দারুণ রোষে ছেলেদের দলের মধ্যে পড়ে তীক্ষ্ণ-ঠোঁটে এদের খেলার আয়োজন বন্ধ করে দিতে পারছে না। তাই সে পালাচ্ছে। আর একটা দমকা জীবন তার পিছে পিছে তাকে তাড়া করছে।

চিৎকার করে সে আর্তনাদ করে উঠল। তার পায়ে শুকনো হাড়ের সূক্ষ্মদিক ফুটে গিয়েছে।

আচ্ছা, উ বসে থাকুক, শিকুনিটোকে ধরবুই। চেঁচিয়ে বলে উঠল রফিক।

হ্যাঁ, তু বোস, আমরা ওটোকে ধরবুই।

নাইলে তু বাড়ি যা।

এঃ, লউ পড়ছে যি!

যাকে লেগেছে সে বলল, পড়ুক গা। বলে খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার ছুটল। সামনেই একটা এঁদো ডোবা। মোড় ফিরেই মাটি ছাড়ল – উড়ল সে। কিন্তু বড় ইতস্তত, বড় বিব্রত ও অনিশ্চয় তার পক্ষসঞ্চালন। হয়তো হাঁফ ধরে গিয়েছে, হয়তো ক্লান্ত হয়েছে সে। হয়তো দিঙনির্ণয় করতে পারেনি। সে পড়ল ডোবাতে। পানি ছিটকে, নোংরা মোটা পানির ঢেউ তুলে—যেগুলো আঁধারে চকচকে চোখে চেয়ে রইল—প্রায় শোনা যায় না এমনিভাবে আঘাত করল তীরে।

অজান্তে আরও কিছু মাটি মিশল পানিতে।

একটি কদর্য-কিন্ন জীব হিঁচড়ে উঠল ওপাড়ে।

পরিবর্তিত, ভিজে, ধূলিকীর্ণ।

ছেলেরা দৌড়ে এসেছে এপারে।

গ্রামের ঘনবসতি পাতলা হতে হতে এখানে ছিটিয়ে গিয়েছে। কালো কালো স্তূপের মতো হঠাৎ হঠাৎ গজিয়ে উঠেছে। সহজবুদ্ধিতে ফাঁকফোকর দিয়ে জন্তুটা পড়ল মাঠে।

প্রাণভরে শক্তির শেষ সীমানা পর্যন্ত দৌড়োবার বিস্তারে।

ছেলেরা পরস্পর পরস্পরের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। তারাও হাঁফিয়ে উঠেছে।

শলা কত দড়বি দড়— যিখানে যাবি চ’।

আর লয় মানিক, আর লয়।

তুমার ইবার হয়ে আলচে।

অকে ধরবুই আজ।

হ্যাঁ, ধরবুই।

এবার আল টপকে উঁচুনিচু এবড়োখেবড়ো জমি পেরিয়ে পগার আর শিশুশস্যের ওপর দিয়ে—শেয়াকুলের কাঁটায় জামা ছিঁড়ে ছিঁড়ে মরণ-প্রতিজ্ঞায় খেপে উঠল ছেলের দল।

এদাই জিগগেস করল রফিককে, কী করবি উটোকে ধরে?

কিছু করব না, শুধু ধরব।

তা’পর? হুঁ ক্যানে, তা’পর কী করবি?

এগু ধরে তা’পর অন্য কাজ।

কেউ আর কথা বলছে না। বলতে পারছে না। সব ভূতের মতো অন্ধকারে চলন্ত চঞ্চল বিভীষিকার মতো ছুটছে।

দক্ষিণদিকের বাতাস গায়ে লাগছে না। দূরে বাবলাবনের পাশে আমের পাতা ভাঙার মড়মড় মসমস শব্দ কানে আসছে না। কিংবা শেয়াল ডেকে উঠল, কি ঝিঁঝিঁ সিমেন্টের মেঝেতে পাথর ঘষার মতো একটানা শব্দ করছে, কি প্রতি পদক্ষেপে পায়ের নিচের নাড়া গুঁড়িয়ে যাচ্ছে—অন্ধকার ঘনতর হয়েছে, এসব কিছুই না।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সবাই ধরে ফেলল ওকে। আঁকড়ে, জাপটে, দুমরে ধরে ফেলল শকুনটাকে। তারা বুক দিয়ে অনুভব করল হাঁপরের মতো ফ্যাসফেসে শূন্য শব্দ উঠছে ঐ শকুনটার ভিতর থেকে। দীর্ঘশ্বাসের মতো—ফাপা, শূন্য, ধরা-পড়ার, ক্লান্তির, ক্ষোভের।

ছেলেগুলোর কৌতূহল—আধিক্যের, নিষ্ঠুর তুষ্টির, তৃপ্ত ক্লান্তির, সম্ভাব্য পীড়ন দেওয়ার উত্তেজনাকর বক্ষস্পন্দন পাখিটা অনুভব করতে পারল কি?

সেই, সেটোই বটে তো?

যেটোর পেচু পেচু অ্যালোম এটো সেই শিকুনিটোই বটে তো?

ক্যানে, পেত্য হচে না তোর?

কী জানি ক্যামন পারা লাগচে।

যেটা দৌড়ে আসছিল, যেটা পালিয়ে আসছিল সেটা এখন থেমে গিয়েছে, দাঁড়িয়ে গিয়েছে, যেন নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে।

ক্যামন ভকভক করে বই বেরুইচে দেখচিস?

বই কী র‍্যা, বল দুর্গন্ধ।

তাতে বই কমচে কি?

অর্থাৎ দুর্গন্ধ কমছে কি?

ভিজে গিয়ে চিমসে গন্ধ ছাড়ছিল শকুনটা। জমাট গন্ধ তরল হয়ে এসেছে। গলা-গলা দম-আটকানো গন্ধ।

রফিক বলল, লে অ্যাখন ধর এটোকে—ঠোঁটটো ধরতে হবে না—দোম বন্ধ হয়ে যাবে।

রাখালটা এগিয়ে এল, শালাকে আমি ধরব। পীরিত ক্যাকে বলে দেখবি শালো!

একদিকে জানু আর একদিকে রফিক ছড়িয়ে মেলে ধরল শকুনটার বিশাল শক্তিহীন পাখাদুটো।

কী পেল্লাই ডানা র‍্যা—আট-ল হাত হবে।

গোটানো ঘনবুনুনির পালক মেলে গেল। বুনট যেন পাতলা হয়ে এল। স্তরে স্তরে সাজানো পালক পাশাপাশি চওড়া হয়ে কারকিত-করা গালিচার মতো বিছিয়ে যাওয়ার কথা—কিন্তু শকুনটা ভিজে গিয়েছে, ধুলো লেগে লেগে গুটিয়ে গিয়েছে তার পালক। এখন তাই অনেক ফাঁক—পাশাপাশি পাখনা অনেক ছিটোনো ছিটোনো। দুই ডানা অসহায়ভাবে ছড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণ করল শকুনটা।

এবার দ্বিতীয় দফা দৌড়। প্রত্যাশার পিছু পিছু নয়। প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে। অকারণ নিষ্ঠুরতার সঙ্গে। আত্মতৃপ্তির নিষ্ঠুরতা।

দড় দড়—লেঙ্গুড় তুলে দড়।

শকুনের পা পারে না অত জোরে তাল দিতে। কিন্তু তাতে কীই-বা এসে যায়! পা না হয় মাটিতে পড়ছে না। ছেলেদের দৌড়ের গতিই টানছে তাকে—হিঁচড়ে নিয়ে যাবে।

এদা, মুখটো ঠুকে গেল। কী টেনে লিয়ে যেচিস দ্যাক। মরে গেল লিকিন দ্যাক এগু।

ক্যার গরজ কেঁদেছে দ্যাখবার! মরাটোকেই টানব।

ভয়ানক হুল্লোড় করে ওরা দৌড়চ্ছে এই টানার পিছু পিছু। চেঁচাতে চেঁচাতে। ভারি মজা পেয়ে। অদ্ভুতরকমের খেলা পেয়ে। কী লাভ?

লাভ?

লাভ তোকে দেখে লোব—তু তো শিকুনি, তোর গায়ে গন্ধ, তু ভাগাড়ে মরা গোরু খাস, কুকুরের সাথে ছেঁড়াছিঁড়ি করিস—তোকে দেখে রাগ লাগে ক্যানে?

ছেলেদের কথায় শকুনটাকে দেখে তাদের রাগ লাগে—মনে হয় তাদের খাদ্য যেন শকুনের খাদ্য—তাদের পোশাক যেন ওর গায়ের বিকৃত গন্ধভরা নোংরা পালকের মতো—সুদখোর মহাজনের চেহারার কথা মনে হয় ওকে দেখলেই। নইলে মহাজনকে লোকে শকুন বলে কেন!

আর এই কিচ্ছুক্ষণ আগে সে যে শূন্য নিশ্বাস ফেলল, কেন তা তাদের বাপমায়ের দীর্ঘশ্বাসের মতো শোনাল? কেন মনে হয় শকুনটার বদহজম হয়েছে! যে-ধূসর রঙটা দেখলেই মনটা দমে যায় তার সঙ্গেই এর রঙের এত মিল থাকবে কেন? প্রায়-জীবন্ত, অপরাধ করে ফেলে দেওয়া যে-শিশুগুলোকে গর্তে, খানা-ডোবায়, তেঁতুলতলায় ছেলেরা দেখে, না-বোঝার যন্ত্রণায় মন যখন করুণ হয়ে ওঠে, তখন তাদের কচিমাংস খেতে এর এত মজা লাগে কিসের!

কে বলল, ভোক লেগেছে।

কিছু খাস নাই?

দোপরবেলায়, গোস্ত দিয়ে ভাত।

আমিও—আমার ভোক লেগেছে।

তোর জামার রঙটো দেখে রাগ লাগে।

জ্যামন মোটা, তেমনি খসখসে।

ঠিক শ্যালা শিকুনিটোর মতুন।

আমাদের সবার তা-ই—রফিক বলল।

হামদুর বাপটো দু-একদিনের ভিতরেই মরবে। আজ সারা বৈকালি কী করেচে জানিস?

জানি—খালি হাঁফিয়েচে—এই শালোর মতুন।

জামু বলল, সাব শালার হাঁফানির ব্যায়রাম। ওরে শালা, পালাইতে চাও, শালা শিকুনি, শালা সুদখোর অঘোর বোষ্টম।

অঘোর বোষ্টমের চেহারার কথা মনে করে হা-হা করে হেসে উঠল সবাই।

মাতামাতি চলে, আল টপকে টপকে, উঁচুনিচু জমির উপর দিয়ে, ক্ষতবিক্ষত মনে আর দাগরা দাগরা ঘায়ে, শেয়াকুল আর সাঁইবাবলার বনে, লম্বা শুকনো ঘাসে, পগারে, সাপের নিশ্বাসের মতো উষ্ণ ফাটা মাটির ভ্যাপসা হাওয়ায়, আখ আর অড়হর-কাটা জমির বল্লমের মতো সূক্ষ্মাগ্র সরল গুঁড়ির আক্রমণে ও আর্তনাদে।

একটা মাটির ঢেলার মতো গড়িয়ে গড়িয়ে, নিঃশেষে শক্তির বেদনাবোধের অতীত অবস্থায়, আচ্ছন্ন চেতনহীন তন্দ্রার মধ্যে শকুনটা শুধুই চলেছে। তখন ছেলেরা বিশ্রাম নিচ্ছে, কথা বলছে নিজেদের মধ্যে—ক্ষতের রস মুছছে প্যান্টে, শকুনটা তখনও দাঁড়িয়ে আছে। অসম্ভব চেষ্টা করছে না সে।

কত তারা উঠেচে দ্যাক।

কিন্তুক আলো তো হচে না।

চাঁদ নাইকো যি।

বাতাস দিচে লয়রে?

দিচে। তা শালার গরম বাতাস।

আমার কিন্তুক জার লাগচে।

তোর ভয় লেগেছে।

কতদূরে অ্যালোম র‍্যা?

উরে সব্বনাশ, মাঝমাঠে এসে পড়িচি, মানুষমারীর মাঠ যে র‍্যা! উইটো নিচ্চয় কেলেনের পাড়।

চ’ কেলেনের পাড়ে যাই, আর একবার গা ধোয়াই গা শিকুনিটোকে।

পথটা ঠাহর করা যায় না। চারিদিকের গাঁ ঝাপসা। দিশেহারা মনে হয়—এতবড় আকাশ, এত অন্ধকার।

জামু বয়লে, শুনিচিস, রাত–দোপরে কীসব হয়?

হেই ভাই পায়ে পড়ি, বলিস না।

যিখানে-সিখানে তেঁতুলগাছ দেখা যায়। ঘরের খিল খুলে মেয়ে হোক আর মরদ হোক ঘুমের ঘোরে ঘোরে মাঝমাঠে চলে আসে। দ্যাখে, খালি শালা তেঁতুলগাছ আর মিশমিশে কালো বিলুই। যিদিকে তাকাও খালি বিলুই আর বিলুই। ক্যার ভ্যাকে ক্যা আসে—শকুনটাকে হঠাৎ কালো বিড়াল বলে মনে হয়।

ছেলেদের আর কারও গায়ে হাত দেবার সাহস নেই। নিজের নিজের বুকে হাত দিয়ে অনুভব করে।

একটা বেপার তো হতে পারে, ধর সবাই ভূত আর সবাই মানুষের ভ্যাকে এয়েছে।

না, না, আমি ভূত নই, অ্যাদা আমি মানুষ।

তাইলে আমাকে ছুঁয়ে দ্যাখ, আমি যদি মানুষ না হই, আমি উড়ে মিলিয়ে যাব। ছোঁ আমাকে।

আমি তোকে ছুঁতে পারব না।

সবাই সবাইয়ের থেকে সাবধান হয়ে ক্যানেলের পাড়ে বসল। একে অপরের দিকে তীব্র চোখে তাকাচ্ছে। তারপর নিজের হাতে চিমটি কাটছে। শকুনটাকে ছেড়ে দিয়েছে ওরা। সে দুটো ডানা ঝেঁপে, পা দুমড়ে মাটিতে গোঁজ হয়ে পড়ে আছে।

রাত-দোপর ঘুরে গেয়েচে লয়?

অ্যাকন সাঁজও লাগতে পারে, আবার দোপর-রাতও হতে পারে।

বোধহয় তাই। তাদের হিশেব নেই। এ-সময়টুকু ঠিক সময় নয়। এ-খেলাটা তাদের সময়ের বাইরে ঘটেছে যেন।

তবু কে বলল, তিনবার শেয়াল ডেকেছে।

তাইলে পেরায় শ্যাষরাত।

চ’ ভাই, পানিতে নামি।

পাগলের মতো ছুটে ক্যানেলে নামল ছেলেরা।

একটা বাতাসও সঙ্গে সঙ্গে অগভীর পানির ওপর দিয়ে সরসর করে এসে ওদের চোখেমুখে লাগল; কী একটা যেন সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল।

আর একবার স্নান করল শকুনটা।

শালা কিছু খাবে না?

কী খাবে—মরা আচে এখানে যে খাবে!

জামু বলল, ভুঁইয়ের লাড়া ছিঁড়ে লিয়ে আয়, ঐ খাক শালা।

তা-ই নিয়ে এল কে। রফিক বলল, গোরু তো লয় যে খ্যাড় খাবে। কিন্তুক এখন ঐ শালোকে তা-ই গিলতে হবে।

হ্যাঁ, লাও গেলাও।

দেখি র‍্যা, তোর ছড়িটা দে।

হ্যাঁ, ঠিক অমনি করে অর ঠোঁটটো চিরে ধর।

খ্যাকখ্যাক করে শব্দ করে উঠল শকুনটা। তার ঘাড় মুচড়ে, ঠোঁট ফাঁক করে অতি সাবধানে ছেলেরা তাকে খড়ের টুকরো খাওয়াচ্ছে।

খা শালা, মর শালা।

আমি একটো পাখনা লোব। কলম করব।

আমিও লোব, মুকুট করব।

রফিক সবথেকে বড় পালকটা ছিঁড়ে নিল। মাংসের ভিতর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে এল পালকটা। শিউড়ে উঠল যেন শকুনটা। তারপর সবাই ছিঁড়ল।

কদাকার বড় মুরগির মতো দেখতে লাগল তাকে।

তারা সবাই ফিরছে। টলতে টলতে। বসে দাঁড়িয়ে। হোঁচট খেতে খেতে। ছেঁড়া শার্ট দেখতে দেখতে। আগামীকালের কথা ভাবতে ভাবতে। গাঁয়ে ঢুকতেই এপাশে তালগাছ ওপাশে ন্যাড়া বেলগাছের যে-ছোট তোরণটি আছে তারই আবছা ছায়ায় শাদামতো কী দেখা যাচ্ছে।

জামু বলল, উদিকে যাস না—চ’ ঘুরে যাই।

তোর বাড়ি তো উদিকেই—চ’ দেখি–না উ দুটো কী।

বাড়ি কাছে বলেই জানি উ শালা-শালী ক্যা।

ক্যা র‍্যা?

দরকার কী তোর শুনে?

বল ক্যানে!

উ হচে জমিরদ্দি আর কাদু শ্যাখের রাঁড় বুন।

কী করচে উখানে?

আমড়ার আঁটি। চ’ বাড়ি যাই।

পুবদিকে রঙ ধরবার ঠিক আগেই যখন গভীর অন্ধকার নেমে আসে তখন ছেলেরা ছেঁড়া মাদুরে, সোঁদা মাটিতে অচৈতন্য হয়ে ঘুমোয়—ক্লান্তি একদম মুছে যায় যখন তখন অসুবিধের মধ্যে, অশান্তির মধ্যে না খেয়ে খালিপেটে ছেলেগুলো বেঘোরে ঘুমোয়। যখন সূর্য উঠল, রোদ উঠল, গাছপাতা ঝকঝক করে উঠল, তখন এবং তারপর যখন রোদ চড়া হয়, বাতাস গরম হয়, মাঠে ছেড়ে-দেওয়া গোরুগুলো মাটি শুঁকে শুঁকে শুকনো ঘাস খেয়ে ফেরে তখনও ছেলেদের ঘুম শেষ হয় না।

ন্যাড়া বেলতলা থেকে একটু দূরে প্রায় সকলের চোখের সামনেই গতরাতের শকুনটা মরে পড়ে আছে। মরার আগে সে কিছু গলা মাংস বমি করেছে। কত বড় লাগছে তাকে। কত শূন্য কত ফাঁপা—ঠোঁটের পাশ দিয়ে খড়ের টুকরো বেরিয়ে আছে। ডানা কামড়ে, চিত হয়ে, পা-দুটো ওপরের দিকে গুটিয়ে সে পড়ে আছে। দলে দলে আরও শকুন নামছে তার পাশেই। কিন্তু শকুন শকুনের মাংস খায় না। মরা শকুনটার পাশে পড়ে রয়েছে অর্ধস্ফুট একটি মানুষের শিশু। তারই লোভে আসছে শকুনের দল। চিৎকার করতে করতে। উন্মত্তের মতো। কিন্তু শিশুটার পেটে প্রথম দুর্বল ঠোঁটের আঘাত বোধহয় মরা শকুনটারই।

আশেপাশের বাড়িগুলি থেকে মানুষ ডেকে নিয়ে আসছে মৃত শিশুটি।

ই কাজটো ক্যা করল গা?—মেয়ে-পুরুষের ভিড় জমে গেল আস্তে আস্তে। এল না শুধু কাদু শেখের বিধবা বোন। সে অসুস্থ। দিনের চড়া আলোয় তাকে অদ্ভুত ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে মরা শকুনটার মতোই।







1 টি মন্তব্য:

  1. কী বীভতস ... বাস্তব ! সোজা করে বসিয়ে দেয়...
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন