বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎকার : নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে

(অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম বাংলা ১৩৩৭ সালে, ঢাকা জেলার রাইনাদি গ্রামে। যৌথ পরিবারে কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশর। দেশভাগের পর হয়েছেন ছিন্নমূল। কলকাতায় যাযাবরের মতন কাটিয়েছেন পুরোটা যৌবন। যখন যে কাজ পেয়েছেন করেছেন। কখনও নাবিক, কখনো ট্রাক-ক্লিনার, স্কুল শিক্ষক, কখনও কারখানার ম্যানেজার, সবশেষে সাংবাদিকতা। দেশভাগ নিয়ে অতীনের সেরা লেখার একটি ‘‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’, যার মধ্যে তার পুরো স্বত্তা ডুবে আছে। একই সিরিজের আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস গুলো হোল, ‘মানুষের ঘরবাড়ী’, ‘অলৌকিক জলযান’ এবং ‘ইশ্বরের বাগান’। দেশভাগ নিয়ে অতীন উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে নিয়ে লিখেছেন, জন্ম দিয়েছেন নানা অভিনব চরিত্র। বাংলা সাহিত্যে তিনি একজন তাজা তেজস্বী খাঁটি লেখক।)



গত বছরের গোড়াতে (২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সকাল ৮.৩৫ নিউ ইয়র্ক সময়ে ) কুলদা রায়ের সাথে দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যে বিশ্বাসী এই মানুষটির ফোনে আলাপ হয়। তিনি তখন বাসায় ছিলেন। বিকেলের ভ্রমণ সেরে ফিরেছেন কিছু আগে। এখন তার বয়স ৮৩ বছর। কথা শুনতে একটু সমস্যা হয়। তবে শুনতে পারলে আবার দৃঢ় কণ্ঠেই কথা বলেন। ঘরে টেলিভিশন চলছে। স্ত্রী অসুস্থ। তবু তিনি কথা বললেন সপ্রতিভ কন্ঠে। কথা হয়েছে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটি নিয়ে।  এই উপন্যাসের বিষয় দেশভাগ। এই দেশভাগ, দেশভাগের রাজনীতি, সেকালের মানুষ, ধর্মবোধ, উপন্যাসের চরিত্রগুলো--ঈশম, জালালী, মুশকিল আশান পীর, সোনা, দাঙ্গা, মুক্তিযুদ্ধ, লটকন ফলের মায়ায়ময় জগত, আর এই উপন্যাস নির্মাণ নিয়ে আলাপ রয়েছে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটিতে। ফলে শেষ পর্যন্ত এটা সাক্ষাৎকারের বদলে নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের গল্প হয়ে উঠেছে। 


কুলদা রায় : আপনি লটকন ফলের কথা লিখেছেন আপনার কিংবদন্তীতুল্য উপন্যাস ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : লটকন ফল তো আমাদের দেশে আছে। কেনো, লটকন ফল আপনি চেনেন না?


কুলদা রায় : আমি চিনি। আপনার লটকন ফল তো মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী এলাকার ফল। পূর্ব বঙ্গের ফল। বাংলাদেশে ফল। আপনি যখন লটকন ফলের কথা লিখলেন সেই ফলের আখ্যানের মধ্যে দিয়ে দেশভাগের একটা মহাকাব্যিক চিত্র পাওয়া গেল। সেই জালালী, ঈশম,পীর সাহেবের মত অসাধারণ কিছু মানুষদের দেখা পাওয়া গেল। তার মধ্যে পাগলা জ্যাঠামশাইকেও পেলাম,সোনাকেও পেলাম। প্রশ্ন হল যে এই নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসটি কখন লিখতে শুরু করলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা অনেকদিন আগে। চল্লিশ বছর আগে। ১৯৭১ এ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছে।

কুলদা রায় : সেই সময়টা মুক্তিযুদ্ধ চলছে পূর্ব ভূখণ্ডে। পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বাংলাদেশের মানুষ। হিন্দু-মুসলমান বলে ব্যাপার নেই। ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতা বলে কোনো ভেদ নেই। অর্থাৎ আপনারা যে দেশভাগের সময়টা নিয়ে লিখলেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা যে দেশাভাগের কথা লিখেছি সেটা ১৯৪৭ এর।


কুলদা রায়: আপনারা যখন নরসিংদী এলাকায় ছিলেন তখন আপনাদের পরিবার অর্থাৎ নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজের সোনাদের পরিবার কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতার শিকার হননি, ক্ষতির সম্মুখিন হয় নি। তবুও আপনারা দেশ ছেড়ে কেনো গেলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা দেশ ছেড়ে গেলাম সত্যিই। এর মধ্যে একটা অভিমান কাজ করেছিল। এদেশে এতোদিন আমরা একসঙ্গে ছিলাম অথচ হঠাৎ করেই মুসলমান প্রতিবেশীরা আমাদের বাদ দিয়ে নিজেদের জন্য আলাদা একটি দেশ চেয়েছিল। আলাদা ভোট, আলাদা জমি। এগুলো হিন্দু জনমানসে খুব আঘাত দিয়েছিল। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্পর্কটা খুব মধুর ছিল। সেখানে মুসলমানরা বলতে শুরু করল-মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ। অর্থাৎ মুসলমানরা পূর্ব বঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ। দেশ শাসনের অধিকার তাদেরই একমাত্র। এই থেকেই একটা বেদনা সৃষ্টি হয়েছিল হিন্দুদের মনে। সেই অভিমানটাও কাজ করেছে দেশত্যাগের পিছনে। শুধু যে দাঙ্গা গেছে তাও নয়, দাঙ্গা না হলেও অনেক হিন্দুরা চলে গেছে দেশ ছেড়ে। দেশত্যাগের মূল কারণ হচ্ছে সেই অভিমান। মুসলমানদের উপর অভিমান।


কুলদা রায়: আপনি কি মনে করেন মুসলমানরা যে দেশভাগটা চাইল, আসলে এই চাওয়াটা তাদের প্রাপ্য ছিল।
অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না, ওদের চাওয়াটা অত্যন্ত সঙ্গত ছিল। মুসলমানরা আর্থিক দিক থেকে হিন্দুদের চেয়ে অনেক কম সম্পন্ন ছিল। এইজন্য তারা আর্থিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছে। এছাড়া মুসলমানদের একটা ইগোও কাজ করেছিল । পূর্ব বঙ্গে জমিজমার অধিকাংশই ছিল হিন্দু মালিক, ওরা সম গ্রাজুয়েট, এম.এ পাশ। তখন তো মুসলমানদের ভেতরে সেভাবে শিক্ষার বিস্তারটা ছিল না, এটা হয়েছে বাংলাদেশ হওয়ার পর। আগে তো মুসলমানদের স্কুলে যাওয়াই বারণ ছিল। ছেলেবেলাতে দেখেছি, আমাদের পানাম হাইস্কুলে আমরা ক্লাশ টেনে পড়তাম ৪২ জন ছাত্র। তার মধ্যে মুসলিম ছিল মাত্র ৮ কি ৯জন। কিন্তু মেজরিটি থাকার কথা ওদের। ইংরেজী শিক্ষার প্রতি ওদের একটা বাঁধা ছিল। ইংরেজী শিক্ষাকে ওরা বধর্মী শিক্ষা মনে করত।


কুলদা রায়: ওরা এখন কেউ কেউ বলেন যে তৎকালে বা ১৯৪৭ সালের আগে থেকে মুসলমানদের ঠকিয়ে আসছে হিন্দুরা। লেখাপড়ার দিক থেকে, আরো অন্যান্য দিক থেকে...।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ঠকিয়ে আসছে, সেটাও ঠিক। ধরুণ যারা জমিদার, তাদের অধিকাংশ তো হিন্দুই ছিল। এবং তারা প্রজাদের ঠকিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে মুসলমান প্রজারা বেশি ঠকেছে। আবার যারা লোয়ার কাস্ট হিন্দু, তারাও জমিদারদের কাছ থেকে রেহাই পায়নি। তারাও ঠকেছে। এটা তো একটা লাভ-লোকসানের ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে কি একটা দেশভাগ চাইতে হবে? সেটা তো কথা হতে পারেনা।


কুলদা রায় : জমিদারদের দিয়ে যারা ক্ষতিগ্রস্থ হল, তারা হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোকই ছিল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : দেখুন, মুসলিমদের একটা আত্মপ্রকাশ দরকার ছিল। সেটা দেশভাগের ফলে ঘটার সুযোগ পেয়েছে। নানা প্রকার কুসংস্কারে তারা আবদ্ধ ছিল। আমি দেখেছি আমাদের সময়ে কোনো মুসলমান ছেলে স্কুলে আসত না। পড়াশুনা করত না। তারা আরবী পড়ত, মাদ্রাসায় ধর্মীয় বিদ্যা শেখার দিকে ঝুঁকে যেত। এটা আমার অঞ্চলের কথা বলছি।


কুলদা রায় : এইযে আপনি বললেন, মুসলমানেরা সেই সময়ে আধুনিক শিক্ষার পাঠ নিতো না। সেকারনে, সমাজের প্রধান হর্তাকর্তা ব্যক্তি যারা হিন্দু ছিল, তারা কি কোনো উদ্যোগ নেননি মুসলমানদের স্কুলে ফেরত আনার?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেই সময়তো জিন্নাপন্থী সুরাবর্দী সাহেবরা ভীষণভাবে সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াচ্ছিলেন । তারা বলছিলেন, এই পূর্ব বঙ্গে হিন্দুরা যতদিন থাকবে ততদিন মুসলমানদের কোন উন্নতি হবে না। এধরনের অনেক প্রচার হয়েছে। আপনারা সে সময়টা তো দেখেননি। সে সময় আমার বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। দেখেননি বলেই কিছু বুঝতে পারছেন না।


কুলদা রায়: কিন্তু আপনার ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাসে যে চরিত্রগুলো আমরা পাচ্ছি; মনে করেন ‘ঈশম’ যে চরিত্রটি, ‘জালালী’ যে চরিত্র;-এরা তো কোনো ধরনের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না, কখনোই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলোনা তারা। কিন্তু মুসলমানদের একটা ঐক্য বোধ ছিল। ভোটের ব্যাপারে একটা ঐক্য ছিল। কোনো মুসলমান সম্প্রদায়ের লোক যদি বলতেন যে ভোটে যে হিন্দু লোকটি দাঁড়িয়েছে, আমরা তার বিরুদ্ধে ভোট দেব, তবে তার বিরুদ্ধেই ভোট পড়ত। তারা একাট্টা হয়ে যেত। তাছাড়া আরো হয়েছে কারন হিন্দু পরিবারের লোকজনের বহিঃপ্রকাশটা একটু বেশি ছিল। মেয়েরা রাস্তাঘাটে চলাফেরা করত। কিছু মেয়েরা আধুনিকা ছিল। এটা হয় হিন্দুদের পরিবারে। সেটাও অনেক সময় মুসলমান যুবকদের তাড়না করেছে। তারা নানা রকম বিভ্রাট ঘটিয়েছে। সেটাও একধনের সমস্যা সৃষ্টি করেছে। হিন্দুদের কোন মেয়ে একটু বড় হলেই তাকে হিন্দুস্থানে পাঠিয়ে দেওয়া হত। এই বিষয়গুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।


কুলদা রায় : আপনার কথায় বোঝা যাচ্ছে, আগে থেকেই হিন্দুদের মধ্যে দেশত্যাগের একটা মনোভাব ছিল। যাই যাই ভাবনা ছিল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : মনোভাব নয়। সবকিছু ছেড়েছুড়ে অন্য একটা দেশে চলে যাওয়া, সে রকম পূর্ণ ভাবনাটা ছিল না। আমাদের তো ছিলোই না। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে দেশভাগ হল। আমার বাবা-জ্যাঠা মশাইরা প্রবাস থেকে বাড়ি ফিরলেন। দেশভাগের পরে এসে আমার ঠাকুরদাকে যেখানে পুকুরপাড়ে দাহ করা হয়েছিল, সেখানে শুয়ে থাকলেন। কারন ভোটে মুসলমানরা মেজরিটি পেয়ে গেছে। সুতরাং এই দেশে আর থাকা যাবে না। বাকী ১৫ দিনের মধ্যে সব জমি-জমা ঘরবাড়ি বিক্রি করে দেওয়া হল। বিক্রি করে দেওয়া হল খুব অল্প দামে। তবু মুসলমান প্রতিবেশিরা আমাদের বাড়িতে এসে বাবা-জ্যাঠাদের বলেছেন, আপনারা কেনো দেশ ছেড়ে যাচ্ছে? ওখানে গিয়ে খাবেন কি? টাকা-পয়সা নেই। সব জলের দরে বিক্রি করে যাচ্ছেন। একটা অভিমানও কাজ করেছে।


কুলদা রায় : দেশত্যাগ করে তো আপনারা সুখে ছিলেন না। প্রবল কষ্টের মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : কিন্তু এখন তো আমাদের সবাই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত। আমরা এখানে এসে প্রতিষ্ঠিত হয়েছি। আজকে আমার যে পজিশন, যে বড় জায়গা হয়েছে, এদেশে না এলে হত না। বাংলাদেশের কবি শামসুর রাহমান একবার একটা কথা আমাকে বলেছিলেন। সেটা দেশ স্বাধীনের পরেই। মুজিব আমাদেরকে পশ্চিম বঙ্গ থেকে বাংলাদেশে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমরা দশজন গিয়েছিলাম। আমি সব দেখে শুনে বললাম, কেনো যে এদেশ ছেড়ে গেলাম! সেটা শুনে কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ওই দেশ ছেড়ে না গেলে তুমি লেখক হতে পারতে না। তুমি এখন আমন্ত্রিত হয়ে আসতে পেরেছো সেজন্যই।


কুলদা রায় : অর্থাৎ বেদনার মধ্যে দিয়ে না গেলে লেখক হওয়া যাবে না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বেদনা না পেলে বেদনাকে বোঝা যাবে না। না বুঝলে বেদনা লিখবেন কী করে!



কুলদা রায় : আপনি ‘নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজে’ যে উপন্যাসটি লিখলেন...

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বইটার চারটে পর্ব কিন্তু। নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজের পরের পর্বটি হল মানুষের ঘরবাড়ি। এরপরে অলৌকিক জলযান। শেষের পর্বটির নাম ঈশ্বরের বাগান। সবগুলো পর্ব পড়লে এই বেদনাগুলো আরো পরিস্কার হবে।


কুলদা রায় : এতো বড় একটা উপন্যাস, যেখানে একটি দেশভাগ হয়ে গেল, মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হল। আপনারাও প্রবল কষ্টের মধ্যে দিয়ে গেলেন। কিন্তু কোথাও একটা প্রতিহিংসা কাজ করল না। একটা দেশ যাদের কারণে ছাড়লেন, যাদের ভয়ে ছাড়লেন, তাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বললেন না। কোনো চরিত্রের মধ্যে দিয়েও কোনো ক্ষোভ বা প্রতিরোধের কথাও বললেন না। কোনো অভিশাপ এলো না কারো প্রতি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বলিনি আমি। শুনুন, হিন্দুদের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি বিরোধীতা, বা মুসলমানদের মধ্যে হিন্দুদের প্রতি বিরোধীতা এটা কিন্তু আসলে ছিল না। একটা জায়গায় একটা পার্থক্য ছিল। সেটা হচ্ছে ধর্মের পার্থক্য। মুসলমানরা কোরবানী দিতেন। এই কোরবানী দেওয়া হত গরুকে। গরুতো হিন্দুদের অনেক শ্রদ্ধার। এই গরু কোরবানীতে হিন্দুরা একটু আঘাত পেতো। অনেক সময় দেখা গেছে রাস্তার উপর কোরবানী দিচ্ছে। সেজন্য অনেক কারণ আছে। হিন্দুদের ধর্মীয় পবিত্র ব্যাপার। তাকে রাস্তায় কোরবানী না দিয়ে আগে আড়ালে কোরবানী দেওয়া হত। পরে যখন হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে একটা বিরোধিতার বীজ বপন করা হল, তখন গাঁয়ের মধ্যে বটতলায় গরু কোরবানী দেওয়া হতে লাগল। সেটা হিন্দুদের মধ্যে খুব আঘাত লাগল। আমি কোথাও মুসলিম বা হিন্দু বিদ্বেষ দেখাইনি। এটা তো সাহিত্য। এই বিদ্বেষটা আরো বাড়ুক, এটা তো ঠিক নয়।


কুলদা রায় : কিন্তু বাস্তবতা কি এরকম ছিল?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হিন্দু কিংবা মুসলমান এরা কেউই কিন্তু ক্রিমিনাল নয়। সবাই সব সমান ছিল। নানা রকমের উপাদান ছিল। এখন যারা হিন্দু আছে বাংলাদেশে তাদের তো এই পশ্চিম বঙ্গে আস্থানা করে রেখেছে। অসুবিধা হলেই চলে আসবে। এটা তো হয়েছে। এটা তো বাস্তব সত্য। আপনি তাকে অস্বীকার করবেন কীভাবে!


কুলদা রায় : যেটা বলা হয়—

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনার নাম কী?


কুলদা রায় : আমার নাম কুলদা রায়।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনি হিন্দু। তাই হিন্দুর চোখে ব্যাপারটাকে দেখার চেষ্টা করছেন; তা নয় কিন্তু। একজন লেখক তার সম্প্রদায়ের হয়ে লিখতে পারেন না। তাকে সবার হয়ে লিখতে হবে।


কুলদা রায় : ১৯০৫ সালের আগে, সাম্পদায়িকতাটা সেভাবে ছিল না বলে মনে করা হয়। এটা ইংরেজরা নিয়ে এলো।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ইংরেজরা এনেছে সত্যি। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতার প্রচারটা মুসলিম লীগই বেশি করেছে। মুসলিমদের পক্ষ হয়ে ইংরেজরা কাজটা করল। কিন্তু এই সাম্প্রদায়িকতা যখন সমাজে বা রাষ্ট্রে ছড়াল, মানুষকে আঘাত করল, তখন কিন্তু হিন্দু-মুসলমান উভয়েই ক্ষতিগ্রস্থ হল।


কুলদা রায় : কিন্তু দুপক্ষেরই একটা ফাঁক ছিল। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির আড়ালে এক ধরনের গুপ্ত বিরোধীতা তো ছিলই। একটা অবিশ্বাসের দর্শন ও ছিল। এদের এই অবিশ্বাসের দর্শনটাই উভয়ের মধ্যে গোপনে গোপনে ফাঁক তৈরি করে ফেলেছিল। সেই ফাঁকেই ইংরেজরা সহজে ঢুকে পড়েছিল। যদি এই ফাঁকটা না থাকত তাহলে ইংরেজরা এই সম্পর্কের মধ্যে বিষ ঢালার সুযোগ পেতো না। এ দায় একা ইংরেজকে দিলে চলবে না। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়কেই সমানভাবে নিতে হবে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা তো ছিলোই। ভেতরে ভেতরে ছিল। ইংরেজ আমলে যখন সরকার গঠন হত—তখন মুসলমানরাই সরকার গঠন করত। একে ফজলুল হক ছিলেন এক সময়ের মুখ্যমন্ত্রী। তারপর সুরাবর্দী এলেন মুখ্য মন্ত্রী হয়ে। ভোটে তো তারাই জিততো। যখন ভোট হত, তখন তাদের মধ্যে মুসলিম প্রীতিটা জেগে উঠত। আমাদের জাত ভাই দাঁড়িয়েছে। এগুলো তো বলা যায় না। সবাই বোঝে, জানে।


কুলদা রায় : হিন্দুরা কি সে সময়ে হিন্দু কমিউনিটিকে ভোট দিত না?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যা, দিতো। কিন্তু মুসলমানরা ছিল সংখ্যা গরিষ্ঠ। ৬০% বা তারও বেশি ছিল মুসলমান সম্প্রদায়। হিন্দু ছিল কম। একেকটা অঞ্চলে একটা গ্রাম হিন্দুদের থাকলে তিনটে গ্রাম ছিল মুসলমান প্রধান। আপনি কী করে ভোটে জিতবেন?


কুলদা রায় : যারা জনগোষ্ঠির প্রধান—যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী তারা সমাজের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবেন এটাই তো প্রচলিত রাজনীতির রীতি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ধর্ম বিষয়টি বেশি কাজ করেছে দেশভাগের ব্যাপারে।


কুলদা রায় : এই দেশভাগের ভয়াবহতায় মুসলমান জনগোষ্ঠী কি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যা, মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তারা এখন বুঝতে পারে সব। এখন তো মারামারি আরো বেশি হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশভাগ হয়েছে বলে কি ওখানে অপার শান্তি বিরাজ করছে? এখন কত রকমের রাজনীতি তৈরি হয়েছে। কট্টরপন্থী যারা, তারা এখনো লড়ে যাচ্ছে। আবার শাহবাগ আন্দোলন হচ্ছে। তারা আবার ধর্ম নিরপেক্ষ দেশ দেখতে চাচ্ছে। কাজেই ধর্মের ভেতর দিয়ে মুসলমানদের জন্য আলাদা দেশ সৃষ্টি হলেও তারা তো মুক্তি পায়নি। বরং মুক্তি চেয়েছিল হিন্দুদের কাছ থেকে। কিন্তু তারা ১৯৪৭ এর পরে নিজেদের ভেতরেই শৃংখলিত হয়ে পড়েছে। তারা বেশি গাড্ডায় পড়ে গেছে।

কুলদা রায় : সাতচল্লিশে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে এলেন। এখন আছেন দূরে। তবুও দূর থেকে এখনো বাংলাদেশের ভেতরের ব্যাপারগুলো আরো গভীরভাবে দেখেন—এই গভীরভাবে এখনো দেখেন কেনো? ওই দেশ তো আপনি ছেড়েই এসেছেন। তাকে এতো মনে রাখার দরকার কী?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ওটা তো আমার জন্মভূমি। ভুলে যাই কী করে। ওখানে আমি সাড়ে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত থেকেছি। আমার নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ঐ দেশটা ছিল। আমি বড় হয়েছি ওখানে। আমার পুকুর, গাছপালা, আমার ঠাকুরদার শ্মশান—তারপর আমাদের বাড়ির চারপাশের লোকজন, আমার স্কুল—সবটা নিয়েইতো আমি। মা বাবা ভাই বোন—এদেরকে ভুলে যাই কীভাবে? আমি যতটা অনুভব করেছি—ততটা আমি লিখেছি।

কুলদা রায় : আপনার মধ্যে, হাসান আজিজুল হকের লেখার মধ্যে একটা অহিংস এবং একটা সম্প্রীতির পরশ আছে। সাধারণ মানুষের মধ্যেকার অহিংস-সম্প্রীতির বোধটাকে,ভালোবাসাটাকে, সম্প্রদায়ের গন্ডীতে আটকে রাখেননি। মানবিক বোধেই সেগুলো বিকাশ করেছেন। মানবিক বিচার বিবেচনা বোধটাই সামনে তুলে আনার একটা প্রচেষ্টা আপনাদের মধ্যে আছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সাম্প্রদায়িকতার দিকে আমরা যাই-ইনি। সাম্প্রদায়িক ব্যাপারটা খুবই একটা লোকালাইজড ব্যাপার ছিল। ১৯৪৭ সালের পরে কি কোনো হিন্দু বাংলাদেশে থাকত? থেকেছে। এখনো অনেক হিন্দু আছে। বাহাত্তুর সালে আমি গিয়েছিলাম দেশে—মুক্তিযুদ্ধের পরে, মুজিব আমাদের নিয়েছিলেন। ১০-১২ জন লেখক। অন্নদাশঙ্কর, মনোজ বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, আমি; সেখানে অনুষ্ঠানে আমি চলে এসেছি—এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা গল্প করার সময় হয়তো এটা করি। কিন্তু ফর্মালী এটা আলোচনা হয়নি। এগারো দিনে প্রায় এগারোটা বড় বড় মিটিং হয়েছে বাংলা একাডেমিতে। মাঠের মধ্যে। হাজার হাজার লোক এসেছে শুনতে। আমরা কিন্তু কখনোই বলিনি যে হিন্দুরা চলে গেছে মুসলমানদের অত্যাচারে-- এধরনের কথা আমরা আলোচনাই করিনি।


কুলদা রায় : আমি বাংলাদেশের মানুষ। একদম সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধরনের সাম্প্রদায়িক ভেদদুদ্ধিটা সেভাবে নেই, আমি দেখিনি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটাই তো আমি বলছি আপনাকে। সেটার দিকে তাকিয়েই আমি করেছি।


কুলদা রায় : এবং এখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে এটা নেই। কিন্তু যেটা আছে সেটা হল হিন্দুদের জমি সম্পত্তি যেকোনোভাবেই হোক না কেনো দখল করে নেওয়া হোক—এই ধরনের একটা লিখিত অলিখিত নিয়ম-কানুন পাকিস্তান আমল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে জারি আছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : মুশকিল হচ্ছে—নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসে যে জমিটা ছেড়ে এলো ঠাকুরবাড়ির লোকজন—সেটা তো একজন মুসলমান জোদ্দারই অধিকার করলেন। তরমুজ ক্ষেত যেটা ছিল সেই জমি সম্পত্তিটা দখল করে নেওয়া হয়েছিল। ধারণা দেওয়া হয়েছিল হিন্দুরা দেশ থেকে চলে গেলেই গরীব মুসলমানরা বড় লোক হয়ে যাবে। সেখানে কিন্তু সেটা হয়নি। যাদের টাকা ছিল তারা কিনে ফেলেছে। যাদের ক্ষমতা ছিল তারা দখল করেছে। গরীব মানুষের কিছুই হয়নি।


কুলদা রায় : দেশভাগের ফলে লাভটা হল উচ্চবিত্ত মুসলমানদের। গরীব মুসলমানদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : উচ্চবিত্তদেরই লাভ হয়েছে। হিন্দু ভুস্বামীদের জায়গাটার মালিক হয়েছে উচ্ছবিত্ত মুসলমানরা দেশভাগের ফলে। সাধারণ মানুষের কিছু হয়নি।


কুলদা রায় : যে কারণেই ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজন হয়ে পড়ল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : মুক্তিযুদ্ধ দরকার হয়েছিল। আমার তো মনে বাংলাদেশে আরো নানা রকমের বিপ্লব তৈরী হওয়ার আশঙ্কা আছে।


কুলদা রায় : সেটা ঠিক আছে। নানাধরনের আন্দোলন-সংগ্রাম প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একদিকে মৌলবাদী জঙ্গীদের উত্থান ঘটছে, সেক্যুলার একটা ঘরাণা আছে প্রবলভাবেই বহমান। এর মাঝামাঝি একটা স্রোত আছে। ধর্মের দিকে হেলে যাওয়ার একটা প্রবণতা প্রবলভাবেই কাজ করছে। এটা আসলে রাজনীতিরই খেলা। রাজনীতির মধ্যে দিয়ে যারা ক্ষমতায় যায় তারা খেলে, খেলায়।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : নানারকম ব্যাপার ছাড়াও ধর্মীয় ব্যাপারটা আছে। এ নিয়ে ভেবে আর লাভ নেই। আবার শাহবাগের তরুণরা ধর্মীয় নিরপেক্ষতার জন্য আন্দোলন করছে, হিন্দুদের উপর অত্যাচার হবে কেনো, ওরাই বলছে। ১৯৪৭ এর আগে ছিল ‘মুসলমানরা কেনো হিন্দুদের দ্বারা শোষিত হবে’-এখন তাদেরই এক প্রজন্ম বলছে ‘হিন্দুরা কেনো নির্যাতিত হবে’—এইসব নিয়ে একটা না একটা লেগেই থাকবে। দেশটা ভাগ না হলে এই ঝামেলাগুলো হত না। দেশ ভাগ হওয়ার ফলে ইন্ডিয়ার সেভাবে কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষতি হয়েছে।


কুলদা রায় : কিন্তু একটা প্রশ্ন—যদি দেশ ভাগটা না হত—তাহলে কি এধরনের সাম্প্রদায়িক—মানবিক বিপর্যয়ের মত ঘটনা কি বেশি হত না?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেগুলোও হত। কিন্তু ধীরে ধীরে সবাই বুঝতে পারত। সরকার যদি শক্ত হত, শক্ত থাকত, তাহলে কিছুই হত না।


কুলদা রায় : তার মানে সমস্যাটা আসলে ক্ষমতাসীন মানুষদেরই। তারাই সমস্যাটির সমাধান করেনি—করতে চায়নি। জীঁইয়ে রেখেছে। তারাই এই সাম্প্রদায়িক বিভেদটাকে নানাভাবে কাজে লাগিয়েছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যা। এটা বলে এখন লাভ নেই।


কুলদা রায় : দাদা, আপনারা দেশভাগের পরে চলে এলেন পশ্চিমবঙ্গে এক ধরনের আতঙ্ক থেকে, অভিমান থেকে, একটা ক্ষোভ থেকেও চলে আসলেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমাদের গ্রামে তো কোনো কিছুই হয়নি। আমাদের গ্রাম থেকে কুড়ি মাইল দূরে একটা গ্রাম মুসলমানরা একরাতে পুড়িয়ে দিল। এই একটা ঘটনাই ঘটেছে সে সময়েই আমাদের এলাকার কাছাকাছি। যারা আছে তারা যেন ভয় পেয়ে দেশ ছেড়ে চলে যায়।

কুলদা রায় : এই পুড়িয়ে দেওয়ার কারণ হিসেবে হিন্দুদের কোনো উস্কানী ছিল বলে আপনি মনে করেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হিন্দুদের উস্কানীর চেয়ে মুসলমানরা চাইত যে হিন্দুরা চলে গেলে আমরা তাদের জমি-জমা নিয়ে নেবো। এ বোধও মুসলমানদের মধ্যে কাজ করেছে।


কুলদা রায় : আপনারা যখন ইণ্ডিয়াতে চলে আসলেন, তখন তো পশ্চিম বঙ্গে অনেক মুসলমান জনগোষ্টী ছিল। তারপর কি এই ক্ষোভ বেদনা থকে কোনো প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা সেই মুসলমানদের উপর নেওয়ার বাসনা করেছিলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা হয়নি। আমরা দেখিনি। পশ্চিম বঙ্গের মুসলমানরা আমাদেরকে গ্রহণ করেছে। পশ্চিম বঙ্গের লোকজন আমাদের গ্রহণ করেছে। তারা যদি আমাদের গ্রহণ না করত তাহলেও সেখানে একটা মারদাঙ্গা হতে পারত। পশ্চিম বঙ্গের লোকজন বলতে পারতো—পূর্ব বঙ্গের লোকদের আমরা জায়গা দেব না।


কুলদা রায় : দেশভাগের পরে পুরো পূর্ব বঙ্গেই নানা ধরনের হানাহানি ছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-ফ্যাসাদ আরও বেড়ে গেল। ১৯৪৭ এর পরে পশ্চিম বঙ্গে এ ধরনের কর্মকাণ্ড আর দেখা যায়নি। এ বিষয়টা নেই।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। নেই। দেশে কোনো হিন্দুরা মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেনি। মুসলমানরাও হিন্দুদের উপর কোনো আঘাত করেনি। আসলে গোড়ায় হচ্ছে শাসন ব্যবস্থা। এটা যদি ঠিক না থাকে তাহলে তো রাষ্ট্রীয় দূর্যোগ দুর্বিপাক তো হবেই।

কুলদা রায় : যে হারে পূর্ববঙ্গ থেকে হিন্দুরা পশ্চিম বঙ্গে চলে এসেছে, সেই হারে কি পশ্চিম বঙ্গ থেকে মুসলমানরা চলে এসেছেন পূর্ব বঙ্গে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেই হারে যায়নি। কিন্তু গেছে। কিছু মুসলমান পরিবার পূর্ব বঙ্গে গেছে। হাসান আজিজুল হক আগুন পাখি নামে একটা উপন্যাস লিখেছেন। সেখানে আছে; ‘পশ্চিম বঙ্গ থেকে একটি মুসলমান পরিবারের সবাই চলে যাচ্ছে পূর্ব বঙ্গে, কিন্তু মা যাচ্ছেন না, থেকে যাচ্ছেন তার জন্মভূমি পশ্চিম বঙ্গে’। তিনি বলছেন, না, আমি দেশ ছেড়ে যামু না, এটা আমার দেশ।


কুলদা রায় : হাসানের এটা অসাধারণ উপন্যাস। খুব হৃদয়গ্রাহী।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এটা তো হয়েছে। এখান থেকে যেসব মুসলমান গেছে পূর্ব বঙ্গে তারা জমিজমা বিক্রি করেছেন। বদল করেছেন হিন্দুদের সঙ্গে। কিন্তু কোনো দাঙ্গা হাঙ্গামার খবর এখানে ঘটেনি। কোনো মুসলমানের জমি সম্পত্তি দখলের ঘটনা পাওয়া যায়নি।


কুলদা রায় : পুর্ব বঙ্গ থেকে যারা পশ্চিম বঙ্গে গিয়েছে তারা এক ধরনের ভীতি থেকে চাপ থেকে অভিমান থেকে, সমষ্টিগত আতঙ্ক থেকে পশ্চিম বঙ্গে চলে গিয়েছে । পশ্চিম বঙ্গে তাদের আসার কারণের মধ্যে এক ধরনের রাজনীতিও ছিল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : রাজনীতিও ছিল। আবার যারা শেয়ালদা থেকে আন্দামানে গেল—কমিউনিস্ট আন্দোলনকারীরা বললেন; না,তারা আন্দামানে যাবে না। এই নিয়ে একটা বিরূপ হাঙ্গামা হল। এসব তো হয়েছেই। এখন যারা আন্দামানে আছে—এখন, যদি তাদেরকে বলা হয়, তুমি বাংলাদেশে ফেরত যাও, অথবা পশ্চিম বঙ্গে আসো, তারা বাংলাদেশেও যাবে না। পশ্চিম বঙ্গেও আসবে না। আমি এখানে জমি পেয়েছি। ফসল পাচ্ছি। আমি এসব ছেড়ে যাব কেনো?


কুলদা রায় : ওখানে তাদের শেকড় গেড়ে গেছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : শেকড় গেড়ে গেছে। আমরা যারা পূর্ব বঙ্গে থেকে এসেছি তাদেরও পশ্চিম বঙ্গে শেকড় গেড়ে গেছে। আমার বাবা জ্যাঠা মশাইরা মুর্শিদাবাদের বাড়ি ঘর করলেন। আমি কোলকাতায় বাড়ি করে আছি। এখানে একটা শেকড় তৈরি হয়েছে। এখন এতোদিন পরে দেশভাগের বিষয়ে আর হাহাকারটা সেভাবে দৃশ্যমান নেই।


কুলদা রায়: এখন আর সে বেদনাটা সেভাবে আর নেই। পশ্চিম বঙ্গ থেকে যারা পূর্ব বঙ্গে গিয়েছেন তাদের যাওয়ার পেছনে তেমন কোনো দৃশ্যমান রাজনীতি বা আতঙ্ক ছিল না। ঠেলে দেওয়া ছিল না। নিরাপত্তার অভাব তারা বোধ করেনি?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না, ছিল না। যারা গিয়েছেন তাদের দুএকটা পরিবার গিয়েছে। নিজের উদ্যোগেই গিয়েছে। কিন্তু পূর্ব বঙ্গের মত গ্রামকে গ্রাম উজাড় করে চলে যাওয়ার ঘটনা মুসলমানদের ক্ষেত্রে হয়নি।


কুলদা রায় : তার মানে আপনি পশ্চিম বঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে সে ধরনের আতঙ্ক ছিল না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। ছিল না।


কুলদা রায় : একটা অপশন ছিল—তুমি পূর্ব বঙ্গে যেতে পারো, আবার নাও যেতে পারো। তোমার ইচ্ছে তুমি কোথায় থাকবে। তোমাকে কেঊ ঠেলে দেবে না। এটাও তোমার দেশ। এই দেশে থাকার পূর্ণ অধিকার তোমার আছে। তোমাকে কেউ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখবে না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ইচ্ছে করলে তুমি যেতে পারো। কেউ তোমাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করবে না। শাসন ব্যবস্থাটা সবার জন্য সমান। হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান বৌদ্ধ, সবার জন্য রাষ্ট্রে সমান নাগরিক-অধিকার আছে।


কুলদা রায় : আপনি পশ্চিম বঙ্গে যাওয়ার কারণে লেখালেখির ক্ষেত্রে কি আপনাকে কোনো লড়াই করতে হয়েছে আদি পশ্চিম বঙ্গের লেখকদের সঙ্গে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : লেখালেখি করতে পশ্চিম বঙ্গে আসিনি। আমি যখন আসি তখন আমার বয়স সতেরো বছর। সতেরো প্লাস। আমি তখন সাবালকও হয়নি। তখন জীবনই বিবর্ণ। কোথায় পড়বো, কোথায় থাকব, কোথায় যাব, বাবা রিফুজি হয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরা কোনো ক্যাম্পে যাইনি। আমার বাবা জ্যাঠা মশাই কাকারা এখানে কুড়ি বিঘে কি পঁচিশ বিঘে জমি কিনে নিয়েছিলেন।


কুলদা রায় : আপনার লেখায় পাওয়া যায়--তারা গাছ লাগাচ্ছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : দেশ থেকে গাছ এনে সেগুলো নতুন ভূমিতে লাগিয়ে যাচ্ছেন। নানা সময়ে পূর্ব বঙ্গে গেছেন মাতৃভূমিতে। আসার সময়ে সেখানকার জন্ম ভিটে থেকে গাছের চারা নিয়ে এসেছেন। একটা জলপাই, কী আমলকি, কি জামের চারা নিয়ে এসেছেন। এনে লাগিয়ে দিচ্ছেন। একটা হয়তো শিমুল গাছের চারা নিয়ে এসেছেন। লিচু গাছে চারা দেশ থেকে নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে একটু মাটি এনেছেন। সেই মাটি পরম মমতায় রেখে দিছেন নতুন মাটির গায়ে।


কুলদা রায় : দেশভাগের কারণে দেশ ত্যাগ করে চলে গেছেন। তারপরেই সেই ছেড়ে আসা দেশটারই একটা প্রতিমূর্তি খাড়া করতে চেষ্টা করছেন নতুন দেশে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : পশ্চিম বঙ্গে যেটা হয়েছে আর কি—ধীরে ধীরে বহু বছর কাটিয়ে দেবার পরে সেই মোহটা আমাদের কেটে গেছে। আমাদের যে বসত ভিটা বাড়ি ঘর জমি সম্পত্তি—সেইগুলো তো আর নেই। পাওয়ার উপায়ও নেই। পেলেও যাওয়ার ইচ্ছে হবে না।। এখন যদি কেউ বলেন যে আপনাদের সবই ফিরিয়ে দেওয়া হবে-ফিরে গেলে সরকার থেকে টাকা দেওয়া হবে , খাওয়া দাওয়ার সমস্ত খরচা দেওয়া হবে –তবুও আমরা রাজী না। আমরা যাবো না।


কুলদা রায় : সেটা তো হয়ই। যখন আপনি অধিকতর নিরাপত্তা নিশ্চিত আছে এমন কোন জায়গায় চলে যান, সেখান ছেড়ে আপনি কেনো চলে যাবেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : তাছাড়া আমি ছেড়ে আসা দেশটাতে এখন আর বাস করতে চাইনা দাবী করলেও আমি জানি—দেশটা কিন্তু আমার অন্তরে রয়ে গেছে। সেটা ছেড়ে আসিনি। ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গাটির উপরে আর বিশ্বাস নেই। সেখানে নতুন করে বাড়ি-ঘর করা আমাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়। তাছাড়া সেধরনের মোহও নেই। ইচ্ছেও নেই। থাকেও না। যারা সেটেল হয়ে গেছেন তারা চাননা।


কুলদা রায় : কোলকাতায় বা পশ্চিম বঙ্গে আপনি যখন সাহিত্য বা লেখালেখি করতে শুরু করলেন তখন পশ্চিম বঙ্গের আদি বাসিন্দা বা তাদের লেখার সঙ্গে কোন বিরোধ হয়েছিল কি?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : তারা আমাকে খুব ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। আবার আপনি এও জানবেন—আমি যা কিছু লিখেছি অধিকাংশ লেখাই আমার দেশভাগের উপর। দেশভাগ না হলে আমি লেখকও হতাম না।


কুলদা রায় : তার মানে আপনি আপনার বেদনাটাকে লেখালেখির সৃষ্টিশীলতার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করেছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ধরে রেঝেছি।


কুলদা রায় : পশ্চিম বঙ্গের আদি বাসিন্দাদের সঙ্গে আখ্যানগত বা ভাষাগত পার্থক্য তো ছিল আপনাদের। আপনাদের সাহিত্য, আপনাদের জীবনের সঙ্গে...

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা যে ভাষায় কথা বলতাম, এদেশে এসে আমরা সেই ভাষাতেই কথা বলেছি। সেই আখ্যান নিয়েই লিখেছি। তার জন্য কেউ বিদ্রোহ করেনি।


কুলদা রায় : আপনাদের লেখা পশ্চিম বঙ্গেও সমাদৃত হল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রচুর বিক্রি হয়। এই নীল কন্ঠ পাখির খোঁজে নিয়ে গবেষণা হচ্ছে এখন। নানাভাবে দিল্লী থেকে।


কুলদা রায় : কেউ কি কখনো আপনাদের বলেছে যে পূর্ব বঙ্গের ভাষা তোমরা এখানে চালু করতে পারবে না। এখানে পূর্ব বঙ্গের ভাষায় সাহিত্য লিখতে পারবে না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। না। কেউ বলেনি। সে প্রশ্নই ওঠেনি।


কুলদা রায় : যেমন আমরা যেটা দেখতে পাই বাংলাদেশে একটা কথা উঠেছে যে বাংলাদেশ একটা মুসলমান প্রধান দেশ। এখানকার ভাষা পশ্চিম বঙ্গের চেয়ে আলাদা হতে হবে। হতে হবে মুসলমানদের ভাষায়।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। এটা হয়নি। এমনিতে মুসলমানরা আলাদা ভাষায় কথা বলে। ডায়লগের মধ্যে অনেক উর্দু কথা বার্তা আছে, হিন্দুদের মধ্যে সেটা নেই।


কুলদা রায় : সে ভাষায় কিন্তু প্রান্তিক জনগোষ্ঠী কথা বলে না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : গরীব মানুষও ধর্মের ভিত্তিতে অনেক কথা বলে। ডায়লগে রাখে।

কুলদা রায় : সেটা তো ধর্ম-সংস্কার সংস্কৃতি--

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হিন্দু মুসলমানের কথা-বার্তার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন মুসলমান কথা বললে বোঝা যায় যে তিনি মুসলমান। একজন হিন্দু কথা বললে বুঝতে পারবেন তিনি হিন্দু। বলে না দিলেও আপনি বুঝতে পারবেন।


কুলদা রায় : তার মধ্যে একটা সার্বজনীন ভাষা প্রচেষ্টা ছিল। সেটা নিয়ে দুপক্ষেরই কোনো অসুবিধা হয়নি। সেভাষায় উভয়েই সদাহত্য করেছেন

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। কোনো অসুবিধেই হয়নি। দেশভাগটা নিতান্তই কিছু লোকের চক্রান্ত। এটার দরকার ছিল না।


২২ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ রাত ১১.০০ টায় ফোন করেছি। তিনি তখন ভোরের চা খাচ্ছিলেন। কিছু কথা হল। কিন্তু ফোন দূরে রেখেছেন বলে কথা ভেঙ্গে ভেঙ্গে আসছিল। একটু পরে ফোন করতে বললেন। তখন দেখি রেকর্ড হয়নি। কথা হচ্ছিল নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাস নিয়ে। বলছিলেন জ্যাঠা মশাইয়ের কথা। তার সেই দেবপম রূপের কথা। রাত ১১.৩৫ আবার ফোন করেছি। তিনি কথা বলতে আরম্ভ করলেন।


কুলদা রায় : আপনার বই পড়তে শুরু করেছি ছেলেবেলায়। ওখানে আমাদের একটি পুরনো লাইব্রেরী ছিল। তার পুব দিকের দরজার পাশের আলমারীতে ‘মানুষের ঘরবাড়ি’ উপন্যাসটি পাই। সেটা বোধ হয় ১৯৭৭-১৯৭৮ সাল হবে হয়তো।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : কোথায় আপনার বাড়ি?


কুলদা রায় : গোপালগঞ্জ। শেখ মুজিবের বাড়ি।

আপনার নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসের চারটি পর্ব আছে। আবার প্রতিটি পর্বেরই ছোটো ছোটো খণ্ড আছে। এইরকম এটি অতিকায় উপন্যাস কখন লিখবেন বলে ঠিক করলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এই লেখাগুলোর ব্যাপারে পাবলিশারদেরও চাপ ছিল। কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল। অবশ্য দেশ পত্রিকায় এই ব্যাপারে আমি কিছু লিখিনি। অন্যান্য পত্রিকা, ধরেন অমৃত পত্রিকা বলে একটা পত্রিকা বের হত কোলকাতা থেকে। যুগান্তর হাউজের পত্রিকা। তারাই আমাকে ধারাবাহিক লিখিয়েছিল নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজের উপরে।


কুলদা রায় : সাল হিসেবে ধরলে, কোন সালে লিখতে শুরু করলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বইটা ১৯৭১ সালে বেরিয়েছিল যদ্দুর মনে পড়ে।


কুলদা রায় : সেটা আমি জানি। আপনি উৎসর্গ করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ওখানে যে ধর্ম নিরপেক্ষ সমাজ তৈরী হল আর কি—সেই সমাজের মানুষদের কথা ভেবেই আমি মুজিবকে উৎসর্গ করি। তার আগে বোধ হয় আমাদেরকে মুজিব সাহেব বাংলাদেশে নিয়েও গিয়েছিলেন। সেই জন্য আমি বইটা ওঁকে উৎসর্গ করি। এবং আমার মাকে।


কুলদা রায় : কিন্তু লেখাটা কখন শুরু করলেন? নিশ্চয়ই একাত্তরের আগে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়: যখন অমৃত আমাকে বারবার চাপ দিচ্ছে—আপনি একটা ধারাবাহিক শুরু করুন। এটাই আমার প্রথম ধারাবাহিক। অমৃত পত্রিকাটি এখন আর নেই। তাদের যুগান্তর হাউসটিও উঠে গেছে। এখন শুধু আনন্দবাজার হাউসটি আছে। ওখানে নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে লিখেছিলাম। অলৌকিক জলযানও ওখানে লিখেছি।


কুলদা রায় : ১৯৭১ সালের দুই তিন বছর আগে থেকে লিখতে শুরু করলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। তা নয়। আমি আগে গল্পের ফর্মে দেশভাগের উপরে অনেকগুলো লেখা লিখেছিলাম। সেগুলো এক, দু্ই, তি্‌ন, করে ছাপা হল পরিচ্ছদ হিসেবে। গল্পের নাম থাকল না। কিন্তু ওটা উপন্যাস হিসেবে ধারাবাহিক লেখাতে চলে গেল। এর আগে আমি বলেওছিলাম সম্পাদক মনীন্দ্র রায়কে, যে, আমার কিছু লেখা আছে। এগুলো আপনাদের রিপ্রিন্ট করতে হবে। ওরা তখন তাতেই রাজী হয়েছিলেন। আমি যা লিখব তাই ছাপা হবে। সেই আরম্ভ হল আর কি...


কুলদা রায় : যখন আপনি ধারাবাহিকটি শুরু করেছিলেন ছোটো ছোটো গল্পের আকারে তখন শুরুতেই কি পরিকল্পনা করেছিলেন এই রকম অসংখ্য খণ্ড নিয়ে-চারটি পর্ব নিয়ে অতিকায় একটা মহাকাব্যিক উপন্যাস লিখবেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা আমার অভিরুচি ছিল না। লিখতে লিখতে লিখছি। লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে আরো লেখা দরকার। কারন এতো বড় একটা দেশ-এতো বড় জাতি—বাঙালি জাতি, তার কথাতো অল্পতে শেষ করা যায়না। ফলে আমি আরো লিখেছি। নীল কন্ঠ পাখির খোঁজে, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান—তিনটি আমি অমৃত পত্রিকায় লিখেছি। ধারাবাহিক।


কুলদা রায় : পরে আপনি এগুলোকে উপন্যাসে জুড়ে দিলেন। তাই না?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি ওটা উপন্যাস হিসেবেই লিখেছি। তখন নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে বছর খানেক কি দুবছর ধরে বেরিয়েছিল অমৃত পত্রিকায়। এটা এতো মনে নেই। তবে খুব চলেছিল। সাপ্তাহিক কাগজ তো—কাজেই চলেছিল। তারপরে শেষ হয়ে যাওয়ার পরে ওরা আমাকে আবার বললেন যে তুমি আবার লেখো। আমি আবার লিখলাম। সেটা নীলকণ্ঠ পাখির পরের পর্ব অলৌকিক জলযান নাম দিয়েই লিখলাম।


কুলদা রায় : নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসে বিশেষ একটি চরিত্র ঈশমকে আমরা পাচ্ছি। ঈশম সোনা বাবুকে সব সময় কাছে কাছে রাখত। তরমুজ খেত করত। এই ঈশম কি আপনার পরিচিত লোক ছিলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : পরিচিত। আমাদের বাড়িতে কাজ করত ঈশম। তার নাম ঈশম ছিল না। তার নাম ছিল রণা। আমরা ডাকতাম রণাদা বলে। আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। কাজ করতেন। বাড়ির নানারকমের কাজ। আমাদের জমিজমাও ছিল—ওগুলোও দেখতেন। হয়তো আমার মা মামার বাড়ি যাবে। তাঁকে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হত। এই রকম ছিল আর কি। যখন মামাবাড়ি যাওয়া হত—তখন আমার মায়ের বয়স তিরিশ বছরের মত। আমরা বালক-সাত আট বছরের। হাত ধরে যেতাম। ঈশমদা লাটবহর নিয়ে, বাক্স পেট্রা নিয়ে আমাদের পিছু পিছু আসতেন। তার যে নাম ছিল রণা—সেটা আমার কাকা জেঠা রাখলেন। ওরা দুই ভাই। রনা আর ধনা। দুজনেই কাজ করতেন আমাদের বাড়িতে। আমাদের বাড়ির সংলগ্ন যে গ্রামটি ছিল –সেটার নাম ছিল তোনার বাগ। ওরা ওই গ্রামে থাকত।


কুলদা রায় : উনি তো সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমান ছিলেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : মুসলমান ছিলেন। আমাদের একান্নবর্তী পরিবার। ওরাই আমাদের দেখাশুনা করতেন। বাবা জেঠারা প্রবাসে থাকতেন।


কুলদা রায় : সেটা বোধ হয় নারায়ণগঞ্জে কোনো এক জমিদারি স্টেটে কাজ করতেন আপনার বাবা?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা মূলাপাড়ার জমিদারী স্টেটে কাজ করতেন। সেখান দীনেশবাবু ছিলেন—জগদীশবাবু, গোপালবাবু, নবকুমার চট্টোপাধ্যয় ছিলেন। এরা বড় বড় জমিদার ছিলেন। এদের মধ্যে জগদীশবাবুই ছিলেন সবচেয়ে বড় জমিদার। ওদের তখনকার বার্ষিক আয় ছিল বারো লক্ষ টাকা।


কুলদা রায় : এটা কি নারায়ণগঞ্জে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : শীতলক্ষ্মার পাড়ে। ঠিক নারায়ণগঞ্জে নয়। নারায়ণগঞ্জ থেকে শীতলক্ষ্মা নদী গেছে আর কি-নারায়ণগঞ্জ থেকে মাইল ৬-৭ হবে। রূপগঞ্জ থানা আছে—

কুলদা রায় : নারায়ণগঞ্জের মধ্যে পড়েছে রূপগঞ্জ। কাঁচপুর নামে একটা জায়গা আছে ওখানে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ঠিক মনে নেই। তবে রূপগঞ্জ থানাটি হচ্ছে মূলাপাড়ার অপজিটে ডানদিকে—নদীর ওপারে। নদীর এপারে হচ্ছে মূলাপাড়া গ্রামটা।


কুলদা রায় : ওখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে—আপনি পূজার সময়ে যাচ্ছেন। জ‍্যাঠামশাই সেখানে হাজির হয়ে গেলেন। সেখানে হাতিটা এলো।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ওখানে একটা হাতি ছিল। পালকবাবুর একটা বড় হাতি ছিল। এগুলো ঐতিহাসিক সত্য। বানানো কথা নয়।


কুলদা রায় : সেটা তো বটেই এবং দেখতে পাচ্ছি ওই সময় জ‍্যাঠামশাই খুব শান্ত-শিষ্ট হয়ে আপনাদের সঙ্গে ঘুরছেন হাতির পিঠে চড়ে। ওখানে একটা বিলও দেখতে পাচ্ছি। এতো অপরূপ আপনার বর্ণনা—এতো চিত্ররূপময় যে এটাকে উপন্যাস হিসেবে –আখ্যান হিসেবেও পড়ার থেকেও কাব্যপাঠের আনন্দ পাওয়া যায়।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : মহাকাব্য।


কুলদা রায় : রাইট। মহাকাব্যের মত বিশাল একটা ব্যাপার। সেখানে দেখতে পাচ্ছি ওইবাড়িতে সোনার খুব আদর যত্ন। দেবশিশুর মত তাকে দেখা হচ্ছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : দেখতে সুন্দর ছিল। এখন তো আমার ছবিতে সেরকম নেই। আগেকার ছবিতে ছিল। এমনিতে আমি হ্যান্ডসাম ছিলাম। ভালোই ছিলাম দেখতে। ছেলেবেলায় আরো সুন্দর ছিলাম। ফলে আদর যত্ন একটু বেশি পেয়েছি আর কি।


কুলদা রায় : পুরো উপন্যাসটিতেই সোনাবাবু সবারই আদরের পাত্র। এবং স্নেহের পাত্র। এই যে রণা ধনা—যাদের মধ্যে রণাকে ঈশম নামে ডাকতেন আপনি। তিনি মুসলমান। এখনো তাকে সম্মান করে কথা বলছেন শুনতে পাচ্ছি। বলছেন যে তারা কাজ করতেন। সম্মানসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : তাদেরকে কাজের লোকের মত দেখা হত না। নিজের বাড়ির লোক ওরা। এরা নিজের বাড়ির মত থাকতো। আমাদের যে দক্ষিণের ঘর ছিল—সেই ঘরে ওরা থাকতেন। একজন না একজন সব সময় থাকতেনই। হয় ধনাদা—না হয়, রণাদা। ওই বৈঠকখানায় থাকতেন। অনেকটা পাহারাদার গোছের আরকি। আমাদের বাড়িতেই খাওয়া-দাওয়া করতেন। আমাদের কোনো কাজে কর্মে সর্বত্র খবর নিয়ে যেতেন ওরা। আমার ঠাকুরদার মৃত্যুর সময় দেখেছি এরা দূর দূর গাঁয়ে চলে গেছেন চিঠি দিতে। ঠাকুরদার যে শ্রাদ্ধ হয়েছিল খুব সমারোহ করে। সেখানে এরাই মূল কাজের মানুষ ছিলেন। এবং ওদেরকে আমরা অভিভাবক হিসেবে দেখতাম। আমাদের গার্জিয়ান হিসেবে ছিলেন ওরা।


কুলদা রায় : তার মানে কখনোই আপনাদের মধ্যে বা ওদের মধ্যে কোনো ভেদ রেখা দেখা যায়নি। কোনো পার্থক্য দেখা যায়নি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : ভেদ চিহ্ণ বলতে ওই-ধর্মে ওরা মুসলমান আর আমরা হিন্দু। আমি দেখেছি ওরা বৈঠকখানায় থাকতেন। ওদের সেখানে খাবার দেওয়া হত না। ওরা বাইরে বসে খেতেন। রান্নাঘরে ওরা ঢুকতে পারতো না। বাইরে চাঁতালে ওরা খেতেন।


কুলদা রায় : এই যে ওরা চাঁতালে বসে খেতেন, আপনি বলছেন যে ওরা পরিবারের মত ছিলেন, গার্জিয়েনের মত ছিলেন, আপনাদের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র যেতেন, কিন্তু এই যে চাঁতালে খাচ্ছেন-ঘরে খাবার দেওয়া হচ্ছে না-এটা নিয়ে কি ওদের মনে কোনো বেদনা ছিল?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এইটা নিয়ে ওদের মনে কোনো ক্ষোভ ছিল না। ওরা ভাবতো যে এটা হিন্দু ধর্মের ব্যাপার। ওরা জানতো যে ওরা যে জল ছুঁয়ে দেবে সে জল খাবে না কেউ। এই ধরনের কিছু ব্যাপার ছিল তো। এটা ওরা মেনেই নিয়েছিল। এটা ধর্মের ব্যাপার—ওদের কী করার আছে। এগুলি নিয়ে সেভাবে কোনো ক্ষোভ আমি দেখিনি ওদের মধ্যে। আমারই বয়সে যা দেখেছি তাতে আমাদের প্রতি তাদের অনুরাগ—ভালোবাসা বিন্দুমাত্র ক্ষুণ্ন হয়নি।


কুলদা রায় : কিন্তু এই যে বাইরে খেতে দিচ্ছেন, জল স্পর্শ করতে পারছেন না, রান্না ঘিরে ঢুকতে বারণ—আপনার কি মনে হয় এটা একধরনের ঘৃণাসূচক ব্যাপার ছিল। এক ধরনের সাম্প্রদায়িকতা ছিল? না কি এটা একটা সংস্কার হিসেবে ছিল?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমাদের যা মনে হয়েছে এটা সংস্কারই ছিল। সংস্কার ছিল আর এরাও কিছু মনে করতেন না। যেমন ধরেন আমার মনে আছে—হাশেমের মা ছিলেন আমার ঠাকুরমার বয়েসী। তিনি আমার ঠাকুরমাকে সপ্তাহখানেক না দেখলেই উন্মাদের মতো হয়ে যেতেন। তিনি ছুটে আসতেন। এসে বলতেন ঠাইরেণকে দেখবার লাইগা আইছি। ঠাইরেণ মা মানে আমার ঠাকুরমা। আমরা দেখতাম হাশেমের মা আসতেন তাঁর এক নাতনী প্রতিমাকে নিয়ে। এসেই বলতেন ঠাকুরমাকে—আমার পিড়িখানে বাইর কইরা দ্যান। মানে উনি যে পিড়িখানায় বসেন সেই পিড়িটা চেয়ে নিতেন বসার জন্য। অন্য পিড়িতে উনি বসবেন না। তিনি মনে করতেন অন্য পিড়িতে বসলে সেটা আবার অশুচি হয়ে যাবে বলে একটা ব্যাপার আছে। এগুলো তো দেশভাগের সময়ের সম্পদ ছিল মুসলিম লীগের কাছে। ওরাইতো এই ব্যাপারগুলি নিয়ে তাদের দেশভাগের আন্দোলনে কাজে লাগালো। মুসলমানদের মধ্যে প্রচার করতে থাকলো এই দ্যাখো এভাবে হিন্দুরা মুসলমানদের ঘৃণা করে। ওদের সঙ্গে আমাদের একত্রে থাকা ঠিক নয়। ফলে এভাবে ব্যাপারটা ঘোলা হতে থাকল। এইতো দেখেছি আমি জীবনে। অথচ মুসলিম লীগ না বলার আগে কেউ কিছু মনে করতো না।

আমাদের কাজকর্মে এই রণাদা-ধনাদারাই ছিলেন সববেশি বিশ্বাসীমানুষ। আমরা পুকুরে চান করেছি। ওরা আমাদের কান ধরে পুকুর থেকে তুলে এনেছেন। খুব ডুব দিয়ে সাঁতার কাটছি। অনেক দেরী করছি। হয়তো বাড়ির কেউ বলছেন যে দ্যাখো তো ওদের। আমরা পুকুরে ঝাপিয়েছি। রণাদা ধনাদা আমাদেরকে পুকুর থেকে কান ধরে তুলে নিয়েছেন। এটাই ছিল আমাদের বাড়িতে ছোটোদের প্রতি প্রকৃত শাসন। এটা রণাদা-ধনাদা করতেন। তাদের সেই অধিকার ছিল। ওদের অধীনেই আমরা বড় হয়েছি।


কুলদা রায় : স্নেহ-প্রীতি ভালোবাসা সম্ভ্রম শ্রদ্ধা সবই ছিল আপোনাদের পরস্পরের প্রতি। আমরা দেখছি—আপনারা যখন নৌকায় করে দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন –পেছনে পেছনে ঈশম ছুটে যাচ্ছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : নদীর পারে পারে যাচ্ছেন। এতোদিনকার একটা সম্পর্ক সেটা তো অতো সহজে ভেঙ্গে যায় না। দেশভাগের পরে আমরা যখন পশ্চিম বঙ্গে চলে এলাম সেই ঈশমদা ওরফে রণাদা উনিও আমাদের কাছে চলে এলেন। বললেন, আমিও এইখানে আপনাদের কাছে থাকবো। দেশে যামুনা। তারপর বাবা জেঠারা অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ওকে আবার পূর্ব বঙ্গের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন।


কুলদা রায় : আপনাদের সঙ্গে রণাদা মুরশিদাবাদ চলে এসেছিলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমাদের সঙ্গে আসেননি। পরে এসেছিলেন। তখন তো বর্ডার ফর্ডারের এতো ব্যাপার ছিল না। পাসপোর্টও ছিল না। দেশভাগ হয়েছে। যে যার খুশি মতো আসছে—যাচ্ছে। একদিন রোনাদাও তার ঝোলাঝুলি নিয়ে বর্ডার পার হয়ে মুর্শিদাবাদের হাজির। সঙ্গে কী একটা গাছে ফল—তার বীজ, কোনো গাছের চারা—এই সব নিয়ে আমাদের বাড়িতে হাজির। ঠাকুরমা বললেন, তুই আইলি কী কইরা? রণাদা বললেন, ঠাইরেন, আপনারে দেখনের লাইগা আইছি।

আসার পরে আর যেতে চায় না। বাবা বললেন, তা হয় নাকি। তুই এসেছিস। থাক কিছুদিন। বেড়িয়ে যা। তোর বউ আছে দেশে। ওর বু আবার একটু পঙ্গু ছিল। তুই এখানে থেকে গেলে তাকে দেখবে কে? তুই এরকম পাগলামি করছিস। রণাদা বললেন। না, আমার ভাইরা আছেন। ওরাই তাকে দেখবে। তারপর অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে পাঠানো হয়েছিল।


কুলদা রায় : অর্থাৎ এই যে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ভেদ রেখার রাজনীতি সে সময়ে ছড়ানো হচ্ছে সারা দেশে... দেশভাগের তোড় জোড় হচ্ছে। দেশটা ভাগও হয়ে যাচ্ছে হিন্দু-মুসলমানের ধর্মের ভিত্তিতে। কিন্তু ইশম বা রণাদারা এসব বিষয়ে কিছুই জানেন না। জানার চেষ্টাও করছেন না। তাদের কাছে জানানোর ব্যবস্থা হলেও তারা পাত্তাই দিচ্ছেন না। তারা এসবের উর্দ্ধে। এই দেশভাগের রাজনীতির কোনো প্রভাবই পড়েনি এইসব সাধারণ মানুষদের মধ্যে। বরঞ্চ এরা এই দেশভাগকে মেনে নিতে পারেননি। সেজন্য আপনারা দেশ ছেড়ে চলে এলেন—আপনাদের পিছু পিছু মুসলমান রণাদাও দেশ ছেড়ে চলে এলেন। কখনো আপনাদের মনে হয়েছে যে এরা এই দেশভাগের রাজনীতি—মুসলিম লীগের রাজনীতি বা কংগ্রেসের রাজনীতি নিয়ে কোনো চিন্তা করতেন এই সব সাধারণ মানুষ?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার তখন বয়স অল্প। সতেরো প্লাস। স্কুলে পড়ি। কাজেই তখন এসব বিষয় নিয়ে আমি কখনো ভেবে দেখিনি। বিষয়টা যে খারাপ বা ঠিক নয়—এ ধরনের চিন্তাই আমার মনে আসেনি। আমার পাগল জ্যাঠামশায়—জেঠি মা, তিনি একটু পিউরিটান ছিলেন। নানারকম এরকম হতো—তিনি বলতেন, এই তুই এখানে ঢুকবি না। আমার আবার চান করতে হইবো। সে সময় ঝোটন বলে একটা মেয়ে ছিল। ঝোটনের আসল নাম হচ্ছে কেটি। সে বাড়ি বাড়ি ধান সিদ্ধ করে বেড়াতো—ধান ভেনে দিত। ধান ভেনে চিড়া করে দিত। নিজে খেতো। এগুলো জীবন্ত চরিত্র।

ঝোটন আমার জেঠিমাকে বলল যে, দুইটা গুয়া দেবেন? কটা পান দেবেন?

আমাদের বাড়িতে পানের বরজ এবং মেলা সুপারিরর গাছ ছিল। ঝোটনের কথা শুনে জেঠিমা বললেন, যা, নি গে যা। ঝোটন তখন পান শুপারি নিয়ে যেতো। কিন্তু যদি কখনো ছোয়াছুয়ি হয়ে যেতো তখনই আবার চান টান করার ব্যাপার থাকতো।


কুলদা রায় : নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাসে ঝোটনকে দেখতে পাচ্ছি মুশকিল আসান পীর সাহেবের সঙ্গে চলে গেল। পীর সাহেবের সঙ্গে একটা মিল মহব্বত হল। তারা নিকে করল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়: এরা কিন্তু আমার দেখা মানুষ। মুশকিল আসানের দরগা আছে এখনো। আমি জানি না আছে কিনা। ষাট সত্তর বছর আগেকার বিষয় সেগুলো। আমাদের সম্মদিতে যা বাড়ি ছিল তার পাশে একটা জঙ্গল ছিল। সেখানে মুশকিল আসানের দরগা বলে একটা দরগা ছিল। এগুলো ঐতিহাসিক সত্যি। সেগুলো এখনো আছে কিনা আমি জানি না। বিশাল এলাকা নিয়ে একটা মাজার ছিল। সেখানে অনেকে একটা বিশেষ দিনে মোম বাতি জ্বালাতো। এও দেখেছি।


কুলদা রায় : এইখানে আমরা দেখতে পাচ্ছি-মালতি নামে একটি মেয়েকে দূর্বৃত্তরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল। মুশকিল আসানের পীর সাহেব এবং জোটন এরা উদ্ধার করে এনেছিল। তারা তাকে বয়ে নৌকায় বয়ে নিয়ে এসেছিল তাদের বাড়িতে। কাকপক্ষিটি জানার আগেই তারা মালতিকে তাদের বাড়িতে ফেরত দিয়ে এসেছিল। তার সম্ভ্রম রক্ষা করেছিল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এটা মনে হয় যেন অলৌকিক ব্যাপারের মত কিছু।


কুলদা রায় : মুশকিল আসানের পীর সাহেব এক ধরনের অলৌকিকত্বের গল্প তৈরি করতেন। লোকে তাকে বিশ্বাস করতেন। ভক্তি করতেন। সে রাতের বেলা প্রদীপ বা লম্ফ নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রদীপ মানে আপনারা দেখেছেন কিনা জানিনা—আমাদের সময়ে তখন দেখতাম এই মুশকিল আসান আমাদের বাড়িতে আসতেন গভীর রাতে। মুশকিল আসান আসান করে বলে ধ্বনি দিতেন। তিনি কিন্তু একজনই। পরনে কালো জোব্বা। গলায় ছিল কাঁচের বল দেওয়া মালা। ভর্তি একেবারে। অনেক লম্বা দাড়ি। আর চোখের নিচে সুরমা টানা। চুল বড় বড়। তারা আসতেন আমাদের গ্রামে—আমাদের বাড়িতে। এরা কোন সম্প্রদায়ের ছিল আমরা জানিনা। এটা জানারও কোনো কৌতুহলও ছিল না সেই বয়সে। আমাদের পরিবারে বলা হত যে, মুশকিল আসান সাহেব এলে গাঁয়ের মঙ্গল হয়। আমাদের গাঁটা হিন্দু গ্রাম। ওখানে এসেই আল্লাহ হো আকবর বলে ধ্বনি দিতেন। হাতে মাটির তৈরি কুপির মত একটা জিনিস থাকত। তার চার পাঁচটা মুখ। কোনটায় কাজল, কোনোটায় আলো, কোনটায় তেল। গভীর রাতে আমাদের উঠোনে দাঁড়িয়ে-রাত দশটা কি এগারোটা, তখন এটা ছিল আমাদের গভীর রাত—আমাদের উঠোনে দাঁড়িয়েই ধ্বনি দিতেন—মুশকিল আসান করে । এই ধ্বনি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠে ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসতো। তারা সবাই সামনে এগিয়ে এসে মুশকিল আসানকে ঘিরে দাঁড়াত। তখন মুশকিল আসান নামে যিনি আসতেন তিনি তার মাটির কুপি থেকে কাজল নিয়ে সবার কপালে একটা করে টিপ দিতেন। তার বিনিময়ে তাঁকে একটা পঁয়সা—আধা পয়সা দেওয়া হত। বাচ্চারা দিত আধা পয়সা। তখন আধা পয়সাও পাওয়া যেত। কুপিটার মধ্যে একটা ফুটো থাকত তার মধ্যে পয়সাটা ছেড়ে দেওয়া হত। আসলে ওটা তো প্রফেশনাল ব্যাপার—এখন বুঝি এগুলো। গরীব মানুষ—একটা আয়ের উপায় বের করে নিয়েছিলেন। এইসব আমরা দেখেছি। কিন্তু আমরা ঐ মুশকিল আসানকে ভয় পেতাম সে বয়সে। তার সেই বিশাল চেহারা—বিশাল চুল—চুল কাটতেন না। চুলগুলো বড় বড়। ওই কালো পোষাক—এটা আমাদের খুব ভয়ের উদ্রেক করত। কিন্তু আমাদের যে গেরস্থ কাকা জ্যাঠারা বলতেন—ভয় নেই। তোমাদের মঙ্গল হবে। সবার মঙ্গলের জন্য উনি এসেছেন। আমার কাকা্ জ্যাঠারা সবাই এই ফোঁটা নিতেন। সেখানে কিন্তু মুসলিম-হিন্দু এই ব্যাপারটা থাকতো না। সেখানে কিন্তু চান করার ব্যাপারটাও থাকতো না। তিনি তো মুসলিম—কিন্তু তিনি যখন রাত্রিবেলা এসে আমাদের বাড়ির হিন্দুদের কপালে ফোঁটা দিতেন তখন আর মুসলিমদের যে সংস্কার বা কুসংস্কার—যে মুসলমানদের ছোঁয়া লাগলে স্নান করতে হবে—এই সব কিছু সেটা থাকতো না। সেটাই পবিত্র হয়ে যেতো। মুশলিক আসান ফোঁটা দিয়েছেন। সুতরাং আপদ বিপদ আর কাছে আসবে না। এটাই ছিল বিশ্বাস।


কুলদা রায় : অর্থাৎ এই যে ধর্মীয় কুসংস্কার বা ভেদবুদ্ধি—সেটা এখানে কাজই করতো না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। সেটা কাজ করতো না। সেখানে এই মুসলমান মুশকিল আসানকে আপনজনের মতো দেখতাম আমরা। আমরা ছোটোরাও তাকে ভয় পেতাম-ভক্তি ভরে কপালে ফোঁটা নিতাম। এই সম্প্রদায়টা এখন আর আছে কিনা আমি জানিনা। মুশকিল আসান নামে এই মানুষ চার পাঁচটা লম্ফ জ্বেলে যেতেন—মুশকিল আসানের ধ্বনি দিতেন, এটাই তো ছিল আমাদের ভক্তি বিশ্বাস আর ভরসার জায়গা। তাদের লম্ফে ব্যবহার করতেন রেড়ির তেল।


কুলদা রায় : রেড়ির তেল আমি চিনি। আমাদের বাড়িতে রেড়িগাছ ছিল। সেখান থেকে প্রদীপের তেল সংগ্রহ করা হত।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : রেড়ি এক ধরনের বীজ। এই বীজ থেকে তেল বের করা হয়। এটা ঘরোয়াভাবেই তৈরী হয়। বীজগুলো ছেপে মাটির জালায় জলের মধ্যে ভিজিয়ে রাখা হত। জলের উপর তেল ভেসে উঠত। সেই তেলটিকেই রেড়ির তেল বলা হত। তা দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হত। মুশকিল আসানের লম্ফতে এই তেল ব্যবহার করা হত।


কুলদা রায় : এই মুশকিল আসান চরিত্রের মধ্যেও কোনো সাম্প্রদায়িকতার কোনো চিহ্ন আমরা দেখতে পাইনা। উদার চরিত্র তিনি। যিনি মঙ্গল করতে চান—মঙ্গল নিয়ে আসেন—মঙ্গলের প্রতীক হিসেবে আসেন, তিনি তখন আর কোনো ধর্মের প্রতীক থাকেন না। সব মানুষের হয়ে উঠেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এইসব এখনো আছে কিনা আমি জানিই না।


কুলদা রায় : সেটাও এখনো আছে। এই যে পীর ফকির দরবেশ দেশে এখনো আছে মানুষের ভক্তি আর বিশ্বাস নিয়ে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা থাকবে। কিন্তু ওই যে মুশকিল আসান রাত্রে গাঁইয়ে গাঁইয়ে ঘুরতো—সেই ব্যাপারটি আছে কিনা এখনো টিকে।আমি তো আর যাইনি দেশে। একবার গিয়েছিলাম ১৯৭২ বা ১৯৭৩ সালে। তখন মুজিব নিয়ে গিয়েছিলেন। পূর্বানী হোটেলে ছিলাম। ওই সবাই যখন বের হতেন—সে সময় আমিও বের হতাম। আবার আমাদের হাই কমিশনাররা বলে দিলেন যে, আপনারা ইন্টেরিয়রে যাবেন না। এখনো কিন্তু হিন্দু বিদ্বষটা আছে। ওটা তো চিরদিনই থাকবে। এটা তো মনের অসুখ। হিন্দুদেরও থাকবে। মুসলমানদেরও থাকবে। কিছু করার নেই। কে রিফর্ম করবে?


কুলদা রায় : সেই ভ্রমণের সময় কি আপনার জন্মভিটায় কি আপনি গিয়েছিলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। না। যাই নি। মানে সুভাষ মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন-ভেতরে ভেতরে কিন্তু একটা ক্ষোভ আছে কিন্তু। কোথায় কি ঘটে যাবে, তাতে সরকার বেকায়দায় পড়বে, তুমিও বিপন্ন হবে—এটা ঠিক হবে না। সে সময়ে স্বাধীনভাবে কোথাও যাওয়া আসা হয়নি। আমার সঙ্গে বরেণ গঙ্গোপাধ্যায় বলে একজন লেখকও গিয়েছিলেন। তার বাড়ি ছিল ফরিদপুর। তিনি বলতেন, আমি আজকে ফরিদপুর চলে যাব। সুভাষদা তাঁকে থামিয়ে রাখতেন। মুজিবের এই অসাম্প্রদায়িক মনোভাবটি ক্ষুন্ন হবে। যার জন্য মুজিবকে মেরে ফেলা হল। সেটা পছন্দ করতেন না দেশের মুসলমানদের একটি অংশ। এটা তো একটা অসুখ। এই অসুখ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া বড় কঠিন।


কুলদা রায় : জালালী চরিত্রটিকে আপনি কোথায় পেলেন? সেই যে জলালী জলের মধ্যে ডুবিয়ে ডুবিয়ে শালুক তুলত। হাঁস চুরি করে খেত। পরে শাপলার লতায় জড়িয়ে মারা গেল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমাদের দেশের মুসলিম পরিবারগুলো একটু দীন-দরিদ্র ছিল। আমার সময়ে এটা দেখেছি। কাজেই ওরা তো এভাবেই জীবন যাপন করত। সম্পন্ন হিন্দু বাড়িতে তারা কাজকাম করে চলত। খুব ইজ্জতের সঙ্গেই কাজকাম করত। এটা আমি দেখেছি। কেউ তাদেরকে অবমূল্যায়ন করেনি। এটা লজ্জারও কিছু নয়। বৃটিশ আমলে হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গেলো। মুসলমানরা সে শিক্ষাকে সেভাবে গ্রহণ করলো না। ফলে ওদের একটু দেরী হয়েছিল। পরে বুঝেছে যে এটা ভুল হয়েছে। ইংরেজী শিক্ষা ওদের কাছে বিধর্মী ব্যাপার ছিল। এখন তো কেটেই গেছে সেসব। আমাদের সময়ে ছিল এসব। আপনাকে তো বলেছিই—আমরা তখন পানাম হাই স্কুলে পড়তাম। আমাদের ক্লাশ টেনে ছাত্র সংখ্যা ছিল ৩০-৩২ জন। তাদের মধ্যে দুজন বা তিনজন মাত্র মুসলমান ছাত্র ছিল। আমার সেভাবে মনে নেই। কিন্তু মনে আছে তাদের সংখ্যাটি ছিল খুবই নগণ্য। তার মানে এই ইংরেজি শিক্ষা মুসলিম সমাজে সেভাবে বিস্তার করেনি।


কুলদা রায় : একটা কথা শোনা যায়-তখন যে শিক্ষিত হিন্দু সমাজ, ধনী সম্প্রদায়; তারাই স্কুল কলেজ তৈরি করতেন। এবং সেখানে কেবল হিন্দুদেরই লেখাপড়ার অধিকারটি ছিল। বিশেষ করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের। মুসলমান ও নিম্ন বর্ণের হিন্দুদের স্কুলে যাওয়ার কোনো অধিকারই ছিল না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : এগুলো মিথ্যে কথা। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যে কথা। এগুলো তারাই বলেন যারা দেশভাগ চেয়েছিলেন। যত স্কুল হয়েছে; হয় হিন্দু, নয় মুসলমানদের সাহায্যেই গড়ে উঠেছে। হিন্দুরাও জমি দিয়েছেন। মুসলমানরাও জমি দিয়েছেন। কিন্তু এটা ঠিক নয় যে ওই স্কুলে মুসলমানদের কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল। কখনোই না। বরং ওরাই এভয়েড করত। মুসলিম পরিবারগুলো এধরনের মানবিক উন্নয়ন গ্রহণের ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধি-বিধানটাই অনুসরণ করত। তারা মনে করত—এই আধুনিক শিক্ষা বা উন্নয়ন আমাদের ধর্মকেই বিপন্ন করবে। এরা অবিশ্বাসী হয়ে যাবে। এখানে কিন্তু একটা বড় ব্যাপার আছে। কাজেই ওরা ইংরেজি শিক্ষা দীক্ষা বিশেষ চাইতোনা। ফলে আর্থিক দিক থেকেও ওরা পিছিয়ে থাকত। পরে ভুল ভেঙ্গেছে। আমার ক্লাশে যে ফার্স্ট বয় ছিল—সে একজন মুসলিম ছেলে। যারা এসে গেছে—তারাই পরে সবার ভুল ভাঙ্গিয়েছে বলেই আমার মনে হয়।


কুলদা রায় : এটাও তাহলে একটা অপপ্রচার।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : হ্যা। অপপ্রচার। অনেক অপপ্রচার তখন হয়েছে। জমিদার জোদ্দার সবই তো বেশির ভাগ হিন্দুই ছিল। তারাই স্কুল কলেজ গড়ার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছেন। যেহেতু হিন্দুরা করেছে তাই ওটার উপরেও একটা অপপ্রচার চালানো হত।


কুলদা রায় : এই যে বললেন অসংখ্য হিন্দু জমিদার-জোদ্দার পূর্ব বঙ্গে ছিল; ওদের অধীনে যে প্রজা ছিলেন তারাও তো হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই ছিলেন। এই হিন্দু জমিদাররা কি হিন্দু প্রজাদেরকে মুসলমান প্রজাদের চেয়ে বেশি সুযোগ সুবিধা দিতেন বলে মনে হয়?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেটা আমি জানিনা। কেননা আমি যে মাইনর স্কুলে পরেছি-সেটা ছিল কলাগাইছা স্কুল-আড়াইহাজারে অবস্থিত। তারই দক্ষিণে ব্রাহ্মণদি গ্রাম। ব্রাহ্মণদির দক্ষিণ-পশ্চিমে ফাউশিয়া গ্রাম। সোজা দক্ষিণে কলাগাইছা গ্রাম। সেখানে আমাদের একটা মাইনর স্কুল ছিল। ওই স্কুলেই আমি প্রথম প্রথম পড়েছি। সেখানে ৭-৮জন শিক্ষক ছিলেন। তার মধ্যে ৪-৫ জনই ছিলেন মুসলিম। আমাদের অঙ্কের টিচার ছিলেন মুসলিম। স্কুলে হিন্দু-মুসলিম বলে কিছু গণ্য হয়নি। আমি যখন হাই স্কুলে পড়তে গেলাম, সম্মান্দিতে সেখানেও মুসলিম শিক্ষক ছিলেন। তবে সংখ্যায় অপেক্ষাকৃত কম ছিল। তখন মুসলমান শিক্ষক পাওয়া যেত না। তারা তো সেভাবে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেয়নি। তবে শিক্ষায় যারা এসেছেন তারা উন্নতি করেছেন। কেউ তাদের বাঁধা দেয়নি। তবে স্কুল কলেজে যাওয়ার সংখ্যা ছিল খুবই কম। আসবে কি করে তারা স্কুলে। স্কুলে গেলে মুসলমান ছেলেরা স্কুল বিমুখ হয়ে যাবে। আর তাদের পাহারাদার ছিলেন মাউলানারা। তারা যেতে দিতেন না।


কুলদা রায় : কিন্তু সমাজে এই জমিদাররা-অবস্থাপন্ন লোকেরা হিন্দু প্রজাদের থেকে মুসলমান প্রজাদেরকে কি আলাদা চোখে দেখতেন? বেশি সুবিধা দিতেন হিন্দুদেরকে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। না। বরং মুসলমান প্রজাদেরকে বেশি সুযোগ সুবিধা দেওয়া হত। তারা মুসলমানদের উপর নির্ভর করতেন। এগুলো ভুল ধারণা মানুষের। জমিদার বাড়িতে দেখেছি; মুড়া পাড়ার জমিদার বাড়ি। সেখানে যেমন হিন্দুরা কাজ করত, মুসলমানরাও কাজ করত। পাইক খেলে বলে একটা খেলা ছিল। লাঠি খেলা হত। লাঠিওয়ালারা ছিলেন এই মুসলমানরা। জমিদার বাড়িতে এদের আলমারী ছিল। এগুলো মুসলমানরাই করত।


কুলদা রায় : কিন্ত এই চাকরিগুলো-পাইক, বরকন্দাজ-লাঠিয়াল, এইগুলো তো ছোটো চাকরি। কিন্তু সেচ্ছায় যেমন আপনার বাবা চাকরি করতেন, বা এই ধরনের সম্মানজনক চাকরি তো আর মুসলমানরা পেতেন না।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়: পেতেন না মানে কি? এই সব চাকরি পেতে হলে তো আপনাকে উপযুক্ত হতে হবে। হিন্দু সমাজে এদেরকে পাওয়া যেতো। কিন্তু মুসলমান সমাজে কি ছিল? মুসলমান সমাজে ধর্ম, মসজিদ-মসজিদের বারান্দায় কোরান শরীফ পাঠ-এমনি আরবিতে আলিফ, বে, তে, সে, এইগুলিই কেবল পড়ত। ওরা তো ইংরেজি স্কুলে যেতেন না তখন। আমাদের গ্রাম-হিন্দু গ্রাম। সেখান থেকে বেরোতাম-আমি বলছি আমার সম্মাওদ্দিতে যখন ছিলাম, সেই সময়ের কথা। আমাদের গ্রাম থেকে ১২-১৪ জন ছেলে পানাম হাই স্কুলে যেত। তার মধ্যে একজন ছিল মুসলমান। আমাদের পশ্চিম পাড়াতে মুসলমান গ্রাম ছিল। ওরা পড়তে যেতো না। ওরা নিজেরাই এই ত্রুটি তৈরি করে রেখেছিল। অনেকদিন পরে এই ভুলটা ভাঙল। মুসলমানরাও পড়াশুনা করতে শুরু করল। আমার মনে হয়—ওরা ইংরেজি শিক্ষায় দেরিতে গিয়েছিল। এটুকু আমার ধারণা।

ধর্মের নামে অনেক সর্বনাশ হয়েছে। ধর্মকে সম্পত্তি করে সাম্প্রদায়িক হিংসাকে উস্কে দিয়ে গোটা ভারত-বর্ষকে লণ্ড-ভণ্ড করে দেওয়া হয়েছে। এটার দরকার ছিল না।


কুলদা রায় : সেটা তো বলা হয় যে এই কাজটি কংগ্রেসও করেছে।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : কংগ্রেসও দায়ী। আমি তো বলিনা কংগ্রেস দায়ী না। জহরলাল নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হবেন, এই রকম নানা রকম ব্যাপার ছিল। সেখানে এ কে ফজলুল হক সাহেব বারবার বলেছিলেন—কৃষক প্রজা পার্টি আমরা করছি। সেখানে হিন্দু-মুসলমান সবাই সমান। কিন্তু তাদের কোনো প্রভাব ছিল না-জনভিত্তি ছিল না। কিছু লোক এইসব বিভেদ তোরী করেছে। এসব বলতে খারাপ লাগে। এসব আলোচনায় যেতে চাইনা। মুসলমানরা যতটা দায়ী-হিন্দুরাও ততটাই দায়ী দেশভাগের জন্য। এই সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টির জন্য। বলা যায় হিন্দুরা মুসলমানদের চেয়ে বেশি দায়ী।


কুলদা রায় : ১৯৪৭ সালের পরে আপনি সর্বশেষ কবে বাংলাদেশে আপনার জন্মভিটায় গেছেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : না। আর কখনো যাইনি।


কুলদা রায় : কিন্তু ওখানে বাবা মাঝে মাঝে গেছেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বাবাও যাননি। কেউই আর যায় নি। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের ঘটনায় আমাদের পরিবার এতো বেদনা পেয়েছিল যে আর কেউ যায়নি সেখানে।


কুলদা রায় : সেখানে তো আপনার ঠাকুরদা, আপনার পূর্বপুরুষরা ঘুমিয়ে আছেন। তাদেরকে কখনো দেখতেও ইচ্ছে করেনি?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : দেখব কি? আমরা যখন চলে আসি-তখন আমাদের ঘরগুলো সব বিক্রি করে দেওয়া হল। বড় বড় চৌচালা, টিন-কাঠের ঘর এইসব ছিল। দালাল ছিল না। চোখের সামনেই দেখলাম সব বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। নিয়ে যাচ্ছে ঘরের চাল খুলে খুলে। যখন আসি তখন দুদিনের জন্য দেওয়ান বাড়ি বলে একটা বাড়ি ছিল ওখানে ছিলাম। সব তো দেখেই এসেছি-চোখের সামনে সব শেষ হয়ে গেলো। সম্পূর্ণ বাড়িটা শ্মশানের মতো দাউ দাউ করছে। খুব অল্প দামে ঘর টর বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে একদিনের মাথাতেই সব বিক্রি হয়ে গেল। জলের দামে সব হাত ছাড়া হয়ে গেল।


কুলদা রায় : এবং কেনার পরপরই ক্রেতারা সব দখল করে নিয়ে গেল।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : কিন্তু আমি শুনেছি আমাদের গ্রামসূত্রে এক জ্যাঠা মশাইরা সেখানে ছিলেন। তারা দেশ ছাড়েননি। এদের একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। কালু মাঝি বলে একজন স্কুল শিক্ষক একবার আমাদের এখানে এসেছিলেন। তিনি বলেছিলেন; তোমাদের বাড়িতে যেখানে তোমাদের ঠাকুরদাকে রাখা হয়েছে সেটা আমিই কিনে রেখেছি। তিনি ওখানে থাকবে বলেই কিনেছিলেন। তিনি হিন্দু। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সময়ে তো তোমাদের ঠাকুর ঘরের কিছু হয়নি। ঠাকুর ছিল না, না—ভিটে-মাটি পড়েছিল। তোমাদের যে ঠাকুরদার শ্মশান সেটাও সেই আগের মতই আছে। গাছগুলো বড় হয়েছে। কিছু কিছু গাছ আমি বিক্রি করে দিয়েছি। আমরা এমনভাবে আঘাত পেয়েছিলাম দেশভাগের ফলে ঘরবাড়ি কিছুই আর আমাদের হাতে রইল না-সেটাই আমাদের মন ভেঙ্গে গেল। আর সেখানে গিয়ে হবে। আমরা তো আর সেই প্রান্ময় ঠাকুরবাড়িটি পাব না।


কুলদা রায় : আমরা দেখছি যে আপনারা বাংলাদেশে জন্মভিটায় গেলেন না। কিন্তু বাংলাদেশের সব সংগ্রাম আন্দোলন সম্পর্কে-সেই ১৯৪৭ এর পর থেকে এখন পর্যন্ত খোঁজ খবর রাখছেন। এবং ১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ হল আপনারা কোলকাতায় লেখক শিল্পী সংস্কৃতি কর্মীরা সবাই একত্রিত হলেন।বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করলেন।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি তো কোনদিন কোনো রাজনীতি করিনি। কিন্তু এতে সমর্থন দিয়েছি। সমর্থন দিতেই হবে। যদি ধর্ম সাম্প্রদায়িকতাকে উৎখাত করে, একটি নিরপেক্ষ আন্দোলন হয়-মানুষের মধ্যে হিংসার বদলে সম্প্রীতির জন্য মানুষ রুখে দাঁড়ায়, সেই আন্দোলনকে সমর্থন জানাতেই হবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে আমরা উৎসাহ দিয়েছি। এখানে উনুষ্ঠান হয়েছে।


কুলদা রায় : তখন আপনারা কি ধরনের সহযোগিতা করেছেন? বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে কি কি ধরনের কর্মশুচি আপনারা করতেন? মনে পড়ে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমার এখন মনে নেই। কতকাল আগের কথা। তখন আমরা কে কি অনুষ্ঠান করব। আমাদের অনুষ্ঠান করার কোনো জায়গাই ছিল না। তখন তো পশ্চিম বাংলায় বাংলাদেশের রিফিউজিরা ভরে গেছে। আমাদের দেখে ওরা ভয় পায়। এইদেশে যারা সম্পন্ন হিন্দু তারা দেখলেই বলবে—এই ওদেরকে ঠাই দিস না। ওরা কিন্তু সব দখল করে নেবে। তখন তো দখলের পালা চলছে। যত রিফিউজি গিয়ে যার তার মাটিতে-জমিতে বসে গেছে। চালা তুলেছে। আইনকে কোণ পাত্তা দেয়নি।


কুলদা রায় : আমি বলছি যে একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আপনারা যে সব কার্যক্রম করতেন –বিশেষ করে যারা শরণার্থী--পশ্চিম বঙ্গে যারা গেল সব হারিয়ে, প্রাণ ভয়ে, প্রাণ বাঁচাতে—

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমরা তো তাদের জন্য অনেক কিছু করার চেষ্টা করেছি। আমি এসবের মধ্যে সেভাবে যুক্ত ছিলাম না। আমি কাগজে পড়েছি শুধু। বর্ডার থেকে লোকজন আসছে-সবার খাওয়া দাওয়ার ব্যাবস্থা হচ্ছে, থাকার ব্যবস্থা হচ্ছে, এটা তো নীতিগত প্রশ্ন। একটা দেশ স্বাধীন হতে চাইছে। আর বাংলাদেশের সঙ্গেই তো পাকিস্তানের কোনো মিল ছিল না শুধু ধর্ম ছাড়া। না ভাষার ক্ষেত্র্-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, কোনো মিল ছিল না। বাঙালিরা ছোটোখাটো মানুষ। এতো লম্বা হয় না। আর পাকিস্তানীরা অনেক লম্বা চওড়া। ওরা আমাদের তুলনায় দেখতে সুন্দর। এই ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ওদের মনে কাজ করেছে। বাংলাদেশের যারা মুসলমান তাদেরকে পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলমানরা শুদ্ধ মুসলমান মনে করত না। তাদেরকে নিজের মনে করত না। শুধু ধর্ম ছাড়া অন্য সব দিক থেকেই বাংলাদেশের মুসলমানরা পিছিয়ে ছিল কিনা। শোনা যায় যে এরা অন্তজ হিন্দু সম্প্রদায় থেকেই এসেছে। কাজেই পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের কোনো মিলই নেই। পশ্চিম পাকিস্তান একটা উষর মরুভূমি। আর পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে-প্লাবিত এলাকা। ওখানে ছমাসই বর্ষাকাল। ছমাস না হোক পাঁচ মাস তো বটেই। আমরা দেখতাম জ্যৈষ্ঠ মাসে সেই যে জল উঠতে আরম্ভ করল, জোয়ার আছে—জোয়ার আসছেই, আর কার্তিক মাসে সেই জলটা নামে। কাজেই পাকিস্তানের সঙ্গে কি কোনো ব্যাপারেই বাংলাদেশের মিল হতে পারে? পারে না।


কুলদা রায় : একাত্তরের ঐ সময়ে আপনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশ নিতেন না। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে কি লেখালেখি করতেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে লেখালেখিই করেছি। আমি লেখালেখি জানি। আমি ওইটাই করতাম। সে সময় নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে উপন্যাস লিখেছি। দেশভাগের ভয়াবহতা তুলে এনেছি আমার লেখায়। দেশভাগের আগে মানুষের মধ্যে যে সম্প্রীতির যৌথ জীবন ছিল—যে ভালোবাসা ছিল, সেটাকে আমার লেখার মধ্যে দিয়ে সবার সামনে তুলে এনেছি। এটাই তো আমার কাজ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে মানুষের মধ্যে সেই দেশভাগের বেদনাটা জানানো। সম্প্রীতির মহৎ সৌন্দর্যটা মানুষের ভেতরে জাগিয়ে তোলা। মানুষকে মানবিক মানুষ হিসেবেই তুলে ধরা। এগুলোই তো মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমার কাজ।


কুলদা রায় : আমার একটু জানতে ইচ্ছে করে—এই যে আপনার গল্প বলার অসাধারণ স্টাইলটা, চিত্ররূপময় কাব্যিক আকর্ষণীয় ভাষাটা, চরিত্র চিত্রণ-এই লেখালেখির কৌশলটা আপনি আয়ত্ত করলেন কিভাবে? এই লেখালেখির মধ্যে এলেন কিভাবে?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : সেতো বিশাল কথা। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ আমার বন্ধু। আমরা থাকতাম মুর্শিদাবাদের বরহমপুরে। সিরাজ থাকতো গঙ্গার ওপারে। আমি থাকতাম গঙ্গার এপারে। ওই ছেলেবেলা থেকেই—যখন ওর বয়স তিরিশ বত্রিশ হবে—আমারও বয়স ওইরকম কাছাকাছি। তখন আমাদের মধ্যে আলাপ হয়। আজীবন আমাদের বন্ধুত্ব ছিল। লেখালেখির বিষয়ে ও-ই এই সব প্রশ্ন করেছে আমাকে। ও-ই বলেছিল—তুই এই গদ্যটা কোথায় পেলি। আসলে আমি কোথায়ও পাইনি। পাইনি এই জন্য বলছি—আসলে কি জানেন, ভেতরে একটা ছন্দ কাজ করে সব সময়। আমার ভূমি, মানুষ, গাছপালা, পশুপাখি, নদী সমুদ্র, হাওয়া—সব কিছুর মধ্যেই ছন্দ আছে। সেটার মধ্যে দিয়ে বেড়ে উঠতে উঠতে সেই ছন্দটাই আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছে। জীবন-যাপনের ছন্দ, সৌন্দর্যবোধের ছন্দ—এগুলো আমার মধ্যে আছে। সেজন্যই হয়তো করেছি। এর মধ্যে কখন লেখক হয়ে গেছি সেটা জানিনা। সবাই জোরজার করে বলেছে—লেখা দাও। আমি খুব কুঁড়ে লোক। কোনো বিষয়েই আমার উৎসাহ থাকে না। বন্ধুরা বললেন—তুই লেখ। তুই লেখ। আমি লিখলাম। পরে জনপ্রিয়তা পেলো। বই বিক্রি হতে লাগলো। বই প্রচুর বিক্রি হয়। সবাই বলছে নাকি—আমার বই সব সময়েই বিক্রি হবে।


কুলদা রায় : আপনার বই শুধু কলকাতায়ই নয়—বাংলাদেশেও পাঠকপ্রিয়।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বাংলাদেশ। আপনি কি বাংলাদেশেই থাকেন, না, আমেরিকায় থাকেন?


কুলদা রায় : আমি তো বাংলাদেশের মানুষ। দেশ ছেড়ে অনেকদিন আমেরিকাতে চলে এসেছি।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : আপনার বয়স কত?


কুলদা রায় : আট-চল্লিশ। আপনি বললেন যে আপনার মধ্যে ছন্দ ছিল। লেখালেখিটা নিজের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এসেছে। আপনার পরিবারের কেউ কি লেখালেখিতে ছিলেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : কেউ ছিল না। আমাদের পরিবারে কেউ কিছু লেখেননি।


কুলদা রায় : কিন্তু আপনি প্রথম—একদম প্রথম থেকেই এতো পরিণত লেখাটা লিখলেন কিভাবে? আপনার বন্ধুরা যে জানল যে আপনি লিখতে পারেন?

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় : বন্ধু বান্ধবরা টের পেয়েছে। কলেজ ম্যাগাজিনে একটা লেখা লিখেছিলাম। তখন বরহমপুরে আমরা থাকি। সিরাজের বাড়ি ওখানেই। এগুলো সব ইন্টারনেটেই পাবেন। আমাকে নিয়ে নানারকম লেখালেখি হয়েছে—ইন্টারনেটে আছে—শুনেছি। আমি জানিনা।


কথাবার্তার এই পর্যায়ে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে কয়েকজন লোক এসেছে বলে জানালেন। বললেন--পরে আবারও কথা বলে নেবেন। তখনকার মতন আলাপ এখানেই শেষ হয়। তিনি কথা বলার জন্য তাঁর কোলকাতার বাসায়ও যেতে বলছিলেন বারবার।

1 টি মন্তব্য: