বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

লেখালেখির টিপস : কথাসাহিত্যে ‘কাল’ পরিবর্তন


প্রসঙ্গ: কথাসাহিত্যে কাল পরিবর্তন

কথাসাহিত্যে সাধারণত অতীতকাল ব্যবহার করা হয়। মূলত কালের এই ব্যবহারই লেখক হিসেবে আপনাকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। বলা চলে, কথাসাহিত্যে ‘কাল’ ব্যবহারের দক্ষতার উপর ভর করেই পাঠক তার প্রিয়’র তালিকাও তৈরি করেন। নবীন লেখককে খুব সহজেই পাঠক চিনে ফেলেন, গল্পে বা সাহিত্যে কাল-এর ব্যবহার দেখেই।


যদি গল্প বা সাহিত্যে যদি ক্রিয়াকাল দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ে তাহলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন যে, লেখক আগন্তুক, নবীন। কিন্তু একজন লেখক হিসেবে পুনরায় পড়ে কিংবা সতর্ক সম্পাদনার মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই এই বিড়ম্বনা এড়িয়ে যেতে পারেন। সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠযোগ্য সম্পাদনা এবং কাল বিষয়ক বিচক্ষণতা আপনার কথাসাহিত্যকে অনন্য করে তুলতে পারে।


কেন অতীত কাল ?

বাক্যটি খেয়াল করুন:

‘পরিণত বয়সী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে, তার হাত উম্মত্ততা পেয়ে বসল, থেকে থেকেই কেঁপে উঠছিলো, ভয়ে, আবেগে, আবেশে’।--এই একটি বাক্যকেই কি উত্তেজনাপূর্ণ এবং উত্কণ্ঠাময় মুহূর্ত মনে হচ্ছে না?

পাঠক মনে করতে পারে এটি একটি ধর্ষণের পূর্বমূহুর্ত কিংবা একটি হত্যাকান্ডের পূর্বের ধস্তাধস্তি। এই যে চরিত্রটির রাগের বহি:প্রকাশ-তা পাঠককে বোঝাতে ‘কাল’ এর উপর ভর করতে হয়, হবে। কথার প্রকাশই কাল, কখনও অতীত, কখনও বর্তমান কখনওবা ভবিষ্যত। সুতরাং একজন লেখক হিসেবে ‘কাল’ এর সঠিক ব্যবহার সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।


কেন বর্তমান কাল নয়:
আপনার পছন্দমতো কথাসাহিত্যের যেকোন একটি উৎকণ্ঠাময় মুহূর্ত বেছে নিন এবং এই মূহুর্তটিকে বর্তমান কালে লেখার চেষ্টা করুন। তারপর দেখুন তো, পাঠক হিসেবে লেখাটি আপনার মনে কি কোন আবেদন তৈরি করতে পারছে? আমি নিশ্চিত আপনার উত্তর, না হবে। কারণ বর্তমান কাল হলো, যা সামনেই ঘটছে, এই মাত্র ঘটছে-এমন কিছুকে বোঝায়। এই কাজটি খুব যে সহজ, তা কিন্তু নয়, তবুও সহজ কাজ তো আর আপনার জন্য নয়। কারণ আপনি লেখক, লেখা খুবই কঠিন একটি বিষয়। আর এই কঠিনেরেই ভালোবেসেছেন আপনি।


কেন ভবিষ্যত কালও নয়:

পাঠকপ্রিয় একটি কথা সাহিত্যে ভবিষ্যত ‘কাল’-এর ব্যবহারও যথোপোযুক্ত নয়। যেমন ধরেন, ‘সে তার দিকে ঘুরে তাকাবে, এমন তার মন-প্রাণ আবেশে-আবেগ আপ্লুত হবে’—এমন কোন এ্কটি ভবিষ্যত বানী হয়তো কোন ঘটনার ইঙ্গিত হিসেবে ভালো লাগবে...কিন্তু পুরো কাহিনীই তো আর ভবিষ্যত কাল এ- লেখা হলে ভালো লাগবে না। লাগবে কি? তবে হ্যা, কোন কোন ক্ষেত্রে যেমন, খুনের ইঙ্গিত দেয়া, কোন একজনের যাপিত জীবনের উপর বিশ্লেষণ শেষে ভবিষ্যত বানী করা যেতে পারে...


সামঞ্জস্যপূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ:
শুধুমাত্র খুব ছোট কথাসাহিত্যে বর্তমান কাল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন লেখক স্টিফেন কিং। তিনি বলেছেন, লেখায় ভবিষ্যতে কালের ব্যবহার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। কথাসাহিত্যে তাই ‘কাল পরিবর্তন’-এর সময় খুব ভালোভাবে মনোযোগ দিতে হবে। লেখায় অত্যন্ত সামঞ্জস্য ও সঙ্গতিপূর্ণ পরিবর্তন যোগ করতে হবে। তা না হলে পাঠক আপনার দুর্বলতা টের পেয়ে যেতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন লেখক হিসেবে আপনাকে বিচক্ষণ হতেই হবে। বিশেষ করে ভ্রমন কাহিনী লেখার সময় অতীতের কথা বলার লোভ সামলাতেই হবে।


কথাসাহিত্যে ‘ক্রিয়া কাল’:
গল্প বা উপন্যাসের বর্ণনায় সাধারণত ক্রিয়া কাল ব্যবহার করা হয়। অর্থ হল, এখনি ঘটছে এমন কিছুর বর্ননা করা। এতে করে প্রতিটি পাঠ্কের অন্তরে গেঁথে যাবে ঘটনাগুলো। পাঠক প্রবেশ করবেন আপনার গল্পে, নিজেই মনে মনে হয়ে উঠবেন একটি চরিত্র। আর পাঠকের এই আকর্ষণটাই আপনার কথাসাহিত্যের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেবে বহুগুন।


বর্ণনা

বিশেষ করে কাজের ধরণ, স্টাইল কিংবা নামের (সুনাম বা দুর্নাম)বর্ননার ক্ষেত্রে বর্তমান কাল ব্যবহার করা ভাল। এতে করে পাঠক গল্পটির সাথে একাত্ম হয়ে উঠবে। এতে করে লেখক হিসেবে আপনার নিজস্ব একটা পরিচিতি গড়ে উঠবে। উদাহরণ: রাহুল সাংকৃত্যায়নের ‘ভোলগা থেকে গঙ্গা’ বইটির শুরুতেই একটি অংশ এরকম, ‘এইমাত্র একটি শিশু চিৎকার করে উঠল, দিদিমা সেদিকে তাকাল। এক বছর ও দেড় বছরের দুটি শিশু, মাথায় দুজনেই সমান। দু’জনেরই চুল পিঙ্গল বর্ণ। এদের চুলের রং বৃদ্ধার চেয়ে আরো সুন্দর ও উজ্জ্বল। এদের নধরকান্তি দেহ, দুধে আলতায় রং, বড় বড় চোখ, ঘন নীল তারা। ছেলেটি চিতকার করে কাঁদছে, মেয়েটি দাঁড়িয়ে চুষিকাটির মতো একটি ছোট হাড় চুষছে।
দিদিমা কম্পিত স্বরে ডাকল, অগিন! আয়! এখানে আয় অগিন! এই যে তোর দিদি এখানে’।

নীল রঙে ঘটমান অতীতে বর্ণনা করা হয়েছে। আর লাল রঙে শিশু চরিত্রটির বর্ণনার ক্ষেতে ঘটমান বর্তমানে লেখা হয়েছে।
-----এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা। যখনি পড়া শুরু করবেন, মনে হবে যেনো তখনকারই কথা বলছেন। কাল কে জয় করেই জন্ম হয় কালজয়ী সব উপন্যাস, গল্প বা কথাসাহিত্যের। আর যারা এটা করেন তারাই হয়ে উঠেন কালস্রষ্টা।


সংক্ষিপ্তকরণ:
কথাসাহিত্যের প্রয়োজনে অনেক সময়ই পূর্বের কোনো ঘটনা, ইতিহাস কিংবা পরবর্তী কোনো কিছুর বর্ণনা দিতে হতে পারে। অনেক লেখক দেয়ও। এই বর্ননার ক্ষেত্রে লেখককে অনেক সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একটি আখ্যানের বর্ননার ক্ষেত্রে যতটা সম্ভব সংক্ষিপ্ত হওয়া বাঞ্চনীয়। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘শর্ট এন্ড সুইট’।


উদ্ধৃতি:
কথাসাহিত্যে অনেক সময় অন্যসাহিত্য থেকে উদ্ধৃতি ব্যবহার প্রয়োজন হয়ে পরে। কারো উদ্বৃতি হুবহু তুলে ধরাই একমাত্র নিয়ম। এর কোনো ব্যতিক্রম নাই। মানে আগে যিনি যেভাবে যা লিখেছেন, হবহু ঠিক তাই লিখতে হবে। উদ্ধৃতি উদ্ধৃতিই-এখানে নতুনত্ব বা পরিবর্তন আনার অপরাধ। সুতরাং কোনো প্রয়োজনে কারো উদ্ধৃতি ব্যবহার করলে তা হবহু তুলে ধরতে হবে।


প্রসঙ্গ:
অনেক সময় বইয়ের পান্ডুলিপি হিসেবে অতীতের কোনো বিষয় হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে লেখক ভূমিকাতেই মূল বিষয়বস্তুর প্রেক্ষাপট ও কেন প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন-তা পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারেন। এতে করে মূলগল্পের কোন তারতম্য ছাড়াই একটি ভালো কথা সাহিত্যের সৃষ্টি হতে পারে। এমন একটি কথাসাহিত্য এখনও কালজয়ী হয়ে আছে যার নাম মৈমনসিংহ-গীতিকা। শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন, রায় বাহাদুর বি.এ, ডি.লিট-এর মৈমনসিংহ-গীতিকা-এর শুরুতেই তারা উপখ্যানের প্রয়োজনীয়তা এবং লেখকের অবস্থান পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। অতীতের গীতিকাব্য বিষয় হলেও মহুয়া, মলুয়া চন্দ্রাবতী, কমলা, দেওয়ান ভাবনা, দস্যু কেনারামের পালা, রূপবতী, কঙ্কা ও লীলা, কাজলরেখা এবং দেওয়ানা মদীনা এখনও প্রাসঙ্গিক ও সমসাময়িক মনে হয়।

সাহিত্যে ক্রিয়াপদের ব্যবহার:

বাক্যে কর্মের ব্যবহার ‘সময়’কে বুঝিয়ে দেয়। কখন কাজটি করা হয়েছে, তা নির্ধারণ করে এই ‘কাল’। স্থান-কাল-পাত্রভেদে এই কালেরও না বদলে যায়। কখনো সে হয় অতীত, কখনো বর্তমান, কখনোবা ভবিষ্যত। তাই লেখক হিসেবে এই কালের ব্যবহারের সময় সতর্ক থাকতে হবে বৈকি! মনে রাখতে পারেন এই নিয়মগুলো:

১) কথাসাহিত্যকে যতটা সম্ভব বর্তমান কালে রাখুন। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার রাতেই ছবি দেখার অভ্যাস আমার। অথবা, সে চিকেন ফ্রাই বেশ পছন্দ করেন’ এই বাক্যদুটি খেয়াল করুন, দেখুন পড়েই মনে হবে যেনো, এখনকার কথাই বলা হচ্ছে।

২) প্রয়োজনে ঘটমান অতীতের মাধ্যমে ক্রিয়াকে উপস্থাপন করতে পারেন। যেমন: ‘গতরাতে পুরোনো একটা ছবি দেখলাম’।

৩)কোনো কিছুর ইঙ্গিত বা আভাস দেয়ার সময় ভবিষ্যত কালের সাহায্য নিতে পারেন। বলতে পারেন এভাবে: ‘ আজ রাতে পুরোনো মুভিটা দেখব’।

৪) ঘটমান অতীত কাল বোঝাতে আছে, ছিল, ছিলাম, করবে, হবে ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫) সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার বর্ননা যোগ করতে পারেন এভাবে, শেষ পর্যন্ত গবেষণাপত্রটি কাজ শেষ করতে পেরেছে পলাশী। কিংবা এই নিয়ে ছবিটি আমি দু’বার দেখলাম, আরো একবার দেখবার ইচ্ছা আছে।

৬) একই সাথে দুটো ঘটনার বর্ণনা দেয়ার জন্য একটিকে ভবিষ্যত এবং অন্যটিকে অতীতকালের সাহায্য নিতে পারেন এইভাবে, ‘যে সময়ের মধ্যে মিটিংয়ে বিষয়টি তুলে দরা হবে, তার আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে যাওয়ার কথা’।

৭) কথাসাহিত্যের প্রয়োজনে ভবিষ্যতের ব্যবহার হতেই পারে। উদাহরণ: কালকের আগেই আমরা সামিটে পৌঁছতে পারবো হয়তো’।

৮) একাধিক ক্রিয়া ব্যবহার করুন। ‘হইবে’ ‘আছে’ হবে’ বা ‘হয়েছে’ শব্দগুলোর সাহায্য নেয়া যেতে পারে।


লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
সাংবাদিক। লেখক।
ঢাকা। 





1 টি মন্তব্য:

  1. আপনার সবগুলো আর্টিকেল-ই পড়েছি। অনেক ভাল লেগেছে, চালিয়ে যান। অনেকেই বলে লেখালেখি নাকি শেখা যায় না; কেন বলে?

    উত্তরমুছুন