বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫

অমর মিত্রের গল্প : পাসিং শো

এই সেই সাবান। এখন আর এর কথা শোনা যায় না। কিন্তু এই সাবানই না এক সময় ছিল নারীর সকল সৌন্দর্যের গোপন কথা, তা ঘোষণা করতেন সে সময়ের মোহময়ী এক চিত্রাভিনেত্রী। সিনেমা আরম্ভের আগে, ইন্ডিয়ান নিউজ রিল শেষ হওয়ার পরে তাঁর মুখ দেখা যেত বড় পর্দা জুড়ে। ব্রতীনের মনে আছে তাঁর গায়ের রঙ ছিল দুধে আলতায়।
গোলাপের পাপড়িখচিত শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ত। মা তাকে দিয়ে কিনিয়ে আনত আলাদা করে। সেই সাবান নিয়ে সদ্য কিশোরী দিদির কী আহ্লাদ! প্রথমে পাড়ার দোকানে, তার পর শ্যামবাজারে, সব শেষে নিউ মার্কেটে সাবানটির খোঁজ করে সকলেই অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল, ও সব আর চলে না স্যার, এখন ফ্রেঞ্চ, স্প্যানিশ, মেক্সিকান সাবান এসে গেছে—

শেষ অবধি মিলল। কোথায়, না একটি ছোট দোকানে। বাংলাদেশে চলে। কোম্পানি ও-দেশের মার্কেট নিয়েছে। হ্যাঁ, আর পাওয়া যায় ক্যানিং লাইনে। ওদিকে নকল জিনিস সব মেলে।

সাবানটি নিয়ে নীলিমাকে দিল ব্রতীন। নীলিমার বিয়াল্লিশ, ব্রতীনের পঞ্চাশ পার। সাবান হাতে নিয়ে নীলিমা হাসতে লাগল, তোমার কী হয়েছে বলো দেখি, আমি তো এমনি বলেছিলাম, নিয়ে এলে!

ব্রতীন বলল, এর ভিতরে মা-মাসিদের গন্ধ জড়িয়ে আছে নীলিমা।

নীলিমা বলল, তোমার বউয়ের গা থেকে মা-মাসিদের গন্ধ নেবে?

ব্রতীন বলল, চল্লিশ বছর আগের পৃথিবী ফিরে আসবে।

আমি তো ফিরতে চাই না, এ সাবান আমার লাগবে না।

ব্রতীন এমনই। পঞ্চাশ পেরোনোর পর ব্রতীন শুধু পুরনো জিনিস খুঁজে বেড়ায়। ব্রতীন কিছুতেই বুঝতে চায় না তার পঞ্চাশ, মানে পঞ্চাশটি বছর গেছে এ পৃথিবীরও। পঞ্চাশ বছরে তার মতো পৃথিবীটাও কি বদলায়নি? দুটো জার্মানি আবার মিলে গেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। পৃথিবীটা কি অনড় পাথর? আর পাথরেরও তো ক্ষয় হয়। ব্রতীন একদিন পুরোন অ্যালবাম থেকে তার চোদ্দ বছরের ছবি দেখিয়েছিল নীলিমাকে। আরে এ যে পাগলা দাশু। এ ছবি আগে দেখলে তোমাকে কিছুতেই বিয়ে করতাম না আমি।

ঠিক আছে, তোমার বারো-চোদ্দ বছর দেখাও।

সে সব নেই, তবে তোমার মাথা খারাপ হয়ে যেত; আমি আরও সুন্দর ছিলাম বুঝলে হে দাশুবাবু।

ব্রতীন বলেছিল, বাইরেটা, খোলসটা রোদে-হাওয়ায়-বৃষ্টিতে-শীতে-গ্রীষ্মে বদল হয় নীলিমা, ভিতরটা কি আসলে তা হয়?

জানি না, ও সব আমি বুঝি না।

এ সব তো কথার কথা। দাম্পত্যে এমন কথা তো হয়েই থাকে। কিন্তু ব্রতীন তো ছাড়ছে না। আবার সাজিয়ে নিতে চাইছে হারিয়ে যাওয়া বয়স। কী করে সাজাবে? পাসিং শো, সিজার সিগারেট দিয়ে, গন্ধ তেল, এগ শ্যাম্পু দিয়ে। আহা-সেই জবাকুসুম, সে কোথায় গেল? সেই যে বেঁটেখাটো মোটাসোটা খুলনার কবরেজ মশায় নিয়ে আসতেন সাধনা ঔষধালয়ের ঝালমাজন।

নীলিমা এক সন্ধ্যেয় জিজ্ঞেস করল, তোমার আসলে কী হয়েছে বলো দেখি?

জানি না, মনে হচ্ছে সব বোধহয় হারিয়ে যাচ্ছে।

এত দিন মনে হয়নি, এখন কেন?

হাঁটতে হাঁটতে এখন যে বার বার পিছনে ফিরে তাকাচ্ছি।

নীলিমা বলল, তুমি আমি কি আর আগের মতো আছি, থাকা যায়?

ব্রতীন বলল, আমার যদি ইচ্ছে হয় ও সব খুঁজে পেতে, খুঁজি না কেন নীলিমা।

দু’জনে তাদের দু’কামরার এক চিলতে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে। ব্রতীনের হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ। কী সুগন্ধ প্রতিটি ফুলে! এই গন্ধই তো তাকে ফুলওয়ালি বউটির কাছে টেনে নিয়ে গিয়েছিল বাসস্টপ থেকে। মনে হয়েছিল ছেলেবেলায় দেখা বাবার হাতে ফোটানো টবের গোলাপ গাছটি থেকে গন্ধ ভেসে এল। শীত চলে যাওয়ার মুখে, যে বাতাস বইতে আরম্ভ করেছে এখন, এই শহরে তা যেন চল্লিশ বছর ধরে ধুলোর পরতে ঢেকে থাকা সেই সব গোলাপ, রজনীগন্ধা, বার্মাটিকের পাল্লা জোড়া আয়না বসানো আলমারি।, সোফা সেট, পুরনো গান, পুরনো কথা আছড়ে এনে ফেলছে প্রশস্ত রাজপথে। এই হাওয়া কত কালের চেনা। এই হাওয়া উঠলে দিদি গেয়ে উঠত, ঘরেতে ভ্রমর এল গুঙ্গুনিয়ে...। বাবা, হ্যাঁ বাবা গেয়ে উঠত, নদীটি গিয়াছে চলিয়া। বেলগাছিয়ার সেই পুরনো বাড়ি ভেঙে তো এই ফ্লাট। কিছুই থাকল না,। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে কোনও কিছুই চোখে পড়ে না।

ব্রতীন বলল, কাঠের আলমারিটা দিদি নিয়ে গেল, পরে ওটা বেঁচেও দিয়েছে শুনি, আমি আবার ওটা খুঁজে আনব, কোথাও না কোথাও তো আছে।

আহা রে! নীলিমার শরীর জুড়ে তখন ভালোবাসা জেগে ওঠে। মায়া জন্মায় মনে। ব্রতীনের মাথার কালো চুল আর নেই। ব্রতীনের শরীর আর আগের মতো জাগে না। তবু ব্রতীন তো ব্রতীনই নীলিমা তার কাঁধে মাথা রেখে বলে, তুমি খোঁজো, দেখি কত কী উদ্ধার করে আনতে পারো, পুরনো বাড়িটার মতো আলমারিও গুড়িয়ে দেয়নি নিশ্চয়ই কেউ, থাকতে পারে কোথাও।

ব্রতীন বলল, এক বার একটা লোক বাবার জন্য মস্ত এক গ্রামোফোন নিয়ে এসেছিল, ঘুষ, দরজা থেকে ফেরত পাঠিয়ে ছিলেন বাবা, কিন্তু তখন তো খুব দরকার ছিল, অতুলানন্দদে বাবার গান রেকর্ড করেছিলেন। ভারী সুন্দর গেয়েছিলেন!

রেকর্ডটা নিয়ে এসো না, এ বাড়িতে তো নেই।

থাকবে কী করে, গ্রামোফোনই তো ছিল না, গ্রামোফোন নিয়ে আসব আমি।

পারেও বটে ব্রতীন। কোথা থেকে নিয়ে এল ঢাউস এক গ্রামোফোন, তার গায়ে মস্ত চোঙা লাগানো। এ বার আনবে রেকর্ড। রেকর্ডেরও খোঁজ দিয়েছে এক জন। ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গুলাম হুসেন পুরনো রেকর্ড কেনা-বেচা করে, তার কাছে শচীন দেব, হেমন্ত, মান্না, লতা, সন্ধ্যা—সব এলপি পেয়ে যাবে।

গুলাম হুসেন সত্তর পার। গালে পাকা দাড়ি, মাথার চুলও সাদা, খালি চোখে দ্যাখে, ঘন নীল রঙের পাঞ্জাবি আর চেক লুঙ্গি, বলল, উ-সব রিকড তো এমনিই পাবেন বাবু, লেকিন রেয়ার কিছু চাই না—বড়ুয়া, কাননবালা, তারও আগে মিস লাইট?

বুক ঝমঝম করে উঠল, ব্রতীন বলল, অতুলানন্দ দে, সেভেনটি এইট।

কৌন? বুড়ো শুনতে শুনতে দু’চোখ বন্ধ করে ফেলে চেষ্টা করছিল খুঁজে পেতে।

অতুলানন্দ, একটাই রেকর্ড বেরিয়েছিল ওঁর।

চুপ করে থাকল গুলাম হুসেন। আবার খুঁজতে আরম্ভ করেছে মনে মনে।

ব্রতীন বলল, সেভেনটি এইট, কোন কোম্পানি করেছিল মনে নেই, আমরা সেই গান শুনেছিলাম জানালায় বসে, পাশের বাড়ির গ্রামোফোনে বাজিয়ে অতুলানন্দ আমাদের শুনিয়েছিলেন, বাবার লেখা গান তো, শুনতে শুনতে মায়ের চোখে জল...।

গুলাম হুসেন জিজ্ঞেস করল, ইয়োর ফাদার, হিজ নেম?

ব্রতীন বলল, সুবিনয় দত্ত, হি ওয়াজ আ পোয়েট।

মিউজিক দিতেন, মানে সুর লাগাতেন?

না, ব্রতীন মাথা নাড়ল, উনি ছিলেন রাইটার্সের ক্লার্ক।

পোয়েট বললেন যে।

পোয়েট তো বটেই, অতুলানন্দের ওই দুটো গান বাবারই লেখা।

আর কোনও গান?

লিখেছিলেন কিন্তু রেকর্ড হয়েছিল ওই একটাই। বলতে বলতে ব্রতীন চুপ করে গেল। শুনতে শুনতে বুড়ো গুলাম হুসেনও। ব্রতীন টের পাচ্ছিল ধর্মতলা স্ট্রিট—লেনিন সরণি ধরে ধর্মতলা থেকে পুরনো বাতাস ধেয়ে আসছে এ দিকে। এই বাতাস বছর বছর আসে। কিন্তু এমন করে আসে না কখনও। ব্রতীন গুনগুন করল, অভিমান আর নয় আর...মুখ তোলো অভিমানী...।

রেকর্ডের আর এক দিকে সেই গান, নদীটি গিয়াছে চলিয়া...নদীটি গিয়াছে...। ছিল সে এমনই সন্ধ্যা। বাবার হাতের পাসিং শো সিগারেট পুড়ে যাচ্ছে। মুখ থমথম করছে। বাবা-মা ছেড়ে এসেছিল কপোতাক্ষ। কিন্তু ব্রতীন ছেড়ে এল কোন নদী? ব্রতীন সুরটি তোলার চেষ্টা করে চল্লিশ বছর আগের স্মৃতি থেকে। এই তো ব্রতীন পারছে। রাগটি ছিল মারোয়া...নদীটি গিয়াছে চলিয়া... চলিয়া গিয়াছে। গুনগুন করে ওঠে ব্রতীন। পারবেন গুলাম ভাই?

গুলাম হুসেন না বলে না সাব, হাঁ বলছে, লেকিন টাইম লাগবে।

দেখুন যদি পান, রেকর্ডটা আবার বাজাতে চাই, গুনগুন করলেই আমি পাসিং শো সিগারেটের গন্ধ পাচ্ছি গুলাম ভাই।

পাসিং শো, হায় আল্লা, ও সিগ্রেট কোথায়?

পাওয়া যাবে?

কী জানি সাব, যাবে না বলি কী করে? বছর সাত আগে ইউ পি-র ঝাঁসিতে গিয়ে দেখেছিলাম যেন, সেই যে হ্যাট পরা সায়েব, ঝাঁসির রানির কেল্লা দেখতে এসেছে।



কী বলতে কী বলছে বুড়ো। সেই সায়েবকেই দেখেছিল, যার ছবি থাকত প্যাকেটে। বলতে বলতে দুলছে গুলাম হুসেন, হামি দেখছি সাব, গুলাম হুসেন ঠিক পারবে, পাসিং শো সাহিব, অতলানন্দ আউর নদীটি গিয়াছে চলিয়া...।

ফিরে এল ব্রতীন ঝমঝম করতে করতে। হাওয়ায় উড়ল কিছু সময়। তার পর ঘরে ঢুকে নীলিমাকে বলল, পেয়েছি, পেয়ে যাব।

নীলিমা তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, নরম তুলোর মতো চুমু দেব রেকর্ড যদি আনতে পারো, আমারও তো ইচ্ছে করে তোমার ছেলেবেলাটা দেখে নিতে।

তিনদিন বাদে ব্রতীন আবার পৌঁছে গেল গুলাম হুসেনের কাছে। বুড়ো যেন তার জন্য অপেক্ষা করছিল, ডাক দিল, আইয়ে সাব, লোক লাগানো হয়ে গছে। ওনলি ওয়ান রেকর্ড, অতলানন্দ, নদীটি গিয়াছে চলিয়া...পাসিং শো, হাঁ সাব, পাসিং শো-র খবর মিলেছে।

কোথায়, এখনো আছে?

গুলাম হুসেন বলল, আছে সাব, সব কুছ রহি যায়। হামি সেভেনটি আপ, ঝুটা বলব না, কাল ই-সময় একটু ঘুম ঘুম লাগল, হাওয়া কেমন উঠছে দেখছেন! বডির ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে যেন, ঘোর লাগছে এক একবার ঝাপ্টা মারলে, তো লোকটা সেই সময় এল ট্রাম লাইন পার হয়ে। মাথায় ফেল্ট হ্যাট, গায়ে একটা মিলট্রি ওভারকোট, ভাঙা মুখ, হামি চিনে গেছি, ঝাঁসির কেল্লায় দেখেছিলাম। পুরা ছ’ফুট হাইট হবে, পাসিং শোর সায়েব, হামাকে এসে জিজ্ঞেস করল ম্যাকার্থি লেন কঁহা—

হিন্দি বলল?

কী বলল, হিন্দি না ইংলিশ বলতে পারব না স্যার, লেকিন ম্যাকার্থি লেন কাঁহা?

লোকটা বলছে সে জন ম্যাকার্থির নাতির নাতি, উসকো নাম ভি জন ম্যাকার্থি...

কোথায় সে রাস্তা?

পাতা নেহি, লোকটা যেন হামার জন্মের আগের কথা বলছে। হামি ও রাস্তা জানি না, আই ডোন নো শুনে এমন ভাবে তাকাল সাব, মনে হল পুরা পাসিং শো, পাকিটে যে সাহাব ছিল সে।

জাহাজি?

হতে পারে সাব, নাও হতে পারে, তার পর হামাকে বলল ক্যানিং ডক যাবে, কী মুশকিল বলুন দেখি, সে ডক কি আছে, নদী ভি শুখা হয়ে গেল প্রায়, রিভার মাতলা, তো হামি বললাম, ট্রেনে ক্যানিং চলে যান, সে বলে পানসি চায়, বাগবাজার থেকে যে ক্যানেল গেছে বিদ্যাধরী নদী তা ধরে যাবে। লেকিন, ও ক্যানেল ভি শুখা হয়ে গেছে, কত বার চেষ্টা হল, লঞ্চ চলল ? কাদায় আটকে গেল, তো সে বলল, গুলাম হুসেনকে বোলাও, উন কা পানসি চাহিয়ে!

তুমি কোথায় পানসি পাবে?

লোকটা কিন্তু ভুল বলেনি সাব। হামার ফেমিলি তো সেইলার-এর ফেমিলি। ঠাকুর্দার বাবা ছিল সেইলার, খিদিরপুরে সিটেল হল কত বছর আগে...। বকবক করেই যাচ্ছে গুলাম হুসেন। তার নাকি ‘সেইলার ‘ হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু তা না হয়ে এই কারবার করছে। গান এক বার শুনলেই মাথায় লেগে যায়, ওই যে গান, নদীটি গিয়াছে চলিয়া...মনে হয় ওটাও শুনেছে কোনও দিন, কোনও বছরে এমন কোনও মার্চের সন্ধ্যায়।

একটু থেকে গুলাম হুসেন আবার বলল, সাব, ওই পাসিং শো-র গোরা আদমী ডক ক্যানিং গেছে, আপনি চলে গেলে ওকে ওখানেই পেয়ে যাবেন।

ম্যাকার্থি লেন নেই কলকাতায়?

ছিল হয়তো, এখন সব দুরমুশ হয়ে গেছে সাব, আরও দুরমুশ হবে, দেখলেন না বস্তি পুড়ছে, কী আগুন লাগল, সব ছাই হয়ে গেল, পরপর কত বস্তি পুড়ল বলুন সাব, কলকাত্তা থেকে সব ফুটে যাবে, হামি আপুনি সব। সাব, ক্যানিং চলে যান, ডকের ঘাটে পাসিং শো গোরা বেটা দাঁড়িয়ে আছে জাহাজের জন্য, হা-হা-হা। ওকে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে, নদী তো বুড্ডা, ভাটার সময় হাড়পাঁজরা বেরিয়ে যায়।

শুনতে শুনতে ব্রতীনেরও ঘোর লেগে যায়। পাসিং শো সায়েব জন ম্যাকার্থি পালিয়েছে কলকাতা থেকে। জুয়ায় হেরে নাকি টাকা দিতে পারেনি। গুলাম হুসেন গুনগুন করছে। নদীটি গিয়াছে চলিয়া...’। রেকর্ড সে এনে দেবেই। ওই যে জন ম্যাকার্থি সায়েব গিয়ে দেখছে নদীটি গিয়াছে চলিয়া, মাতলা নদীতে কোনও দিনই জাহাজ ঢুকবে না। ঘোরের মাথায় বাড়ি ফিরে নীলিমাকে কথাগুলো খুলে বলতে সে গম্ভীর, তোমার গায়ে কুবাতাস লেগেছে।

কে বলল! শহর জুড়ে কী আশ্চর্য বাতাস নেমেছে, ঝড় উঠেছে মনে হচ্ছে নীলিমা।

নীলিমা বলল, কুবাতাস ঝাড়তে হবে ওঝা ডেকে। পাগলের পাল্লায় পড়ে আমার স্বামীও পাগল হয়ে যাচ্ছে, ওগো তুমি গুলাম হুসেনের কাছে যেও না।

হা-হা করে হাসল ব্রতীন, জাপ্টে ধরে অনেক দিন বাদে চুমুতে ভরিয়ে দিল নীলিমার ঠোঁট গাল। চুমু-চুমু-চুমু—চলো আমরা ডকের ঘাটে যাই।

যেতে পারি, কিন্তু ওই গোরা সায়েব পাসিং শো যদি আমাকে হরণ করে! বলতে বলতে খিলখিল করে হাসতে লাগল নীলিমা, কানে গুনগুন করল, তুমি খুব ভাল, খু-উ-ব! আচ্ছা তোমার গুলাম হুসেন কি আফিম খায়?

খেতে পারে। জাহাজিয়ার বংশ আবার গানও শোনে। ব্রতীন বলল।

ও-সব আবার হয় নাকি, যা বলছে তা কি সত্যি হতে পারে?

হতেই পারে নীলিমা, যা হতে পারত তা ই তো ঘটিয়ে দিচ্ছে গুলাম হুসেন, এটাই তো আসল সত্য।

আমার ভয় করছে। তুমি যা বলছ, তা বুঝতে পারছি না।

বুঝতে কি ব্রতীনও পেরেছে? দু’দিন বাদে গুলাম হুসেন আবার বলল, রেকর্ড মিলতে বাধ্য, নূর মহম্মদকে দ্বায়িত্ব দিয়েছে,। কে নূর মহম্মদ? না জমির দফতরের আমিন, সে ডেলি ক্যানিং যায় সকালে, সন্ধের পর ফেরে, না, গানটান সে বোঝে না, তবে বলেছে পাসিং শো সিগারেট এনে দেবে ক্যানিং থেকে, প্যাকেটে সেই সায়েবের ছবি। কী বলছে গুলাম হুসেন? বলছে নূর মহম্মদ খোঁজ এনে দেবে অতলানন্দর।

এ সব কথা শুনতে শুনতে নীলিমার মুখ থমথম করতে লাগল। বলল, এভাবে হয় না ব্রতীনবাবু, আমিনবাবু খুঁজবে গানে রেকর্ড!

পারবে নীলিমা পারবে। কী ভাবে কী হয়, তার কী জানি আমরা?

জানি জানি খুব জানি! নীলিমা তার গলা বেড় দিল, দাঁতে তার ঠোট্ট কামড়ে দিয়ে গুনগুন করল চাপা গলায়, এমন ফুলিয়ে দেব যে, গুলাম হুসেনও টের পাবে সব। তুমি এখনও ফুরোওনি ব্রতীনবাবু, ফুরোওনি বলে তোমার এত বিশ্বাস, এত ভালবাসা! এত স্বপ্ন দ্যাখো তুমি, ঠিক আছে, নূর মহম্মদ আমিনের জন্য ওয়েট করো।

ঘরে বসে ক’দিন চুপচাপ হয়ে থাকল ব্রতীন। শহরে ঢুকে পড়া মন আনচান করা বাতাসও ক’দিন ঘুমিয়ে থাকল। তার পর না পেরে আবার বেরোল এক সন্ধেয়। ঠিক তার জন্যই বসে আছে সাধুসন্তের রূপ নিয়ে ‘গুলাম হুসেন রিকডিয়া’। রেকর্ড কেনাবেচা করে তো!।

ব্রতীনকে দেখে উঠে দাঁড়াল বুড়ো, আইয়ে সাব, চলিয়ে সিঙ্গারের বাড়ি।

অতুলানন্দ দে?

হায়ঁ সাব, ফকিরচাঁদ লেনে ফকিরচাঁদের পুরনো হাভেলি, বললাম না নূর মহম্মদ ঠিক খোঁজ এনে দেবে।

এখনও বেঁচে?

আরে সাব আটিস তো বেঁচেই থাকে, আটিস এক সময় ঠিক বেঁচে ওঠে, টায়েম লাগে।

বাসে চাপে না গুলাম হুসেন। পায়ে হেঁটেই তো শহরের এক দিকে থেকে ও দিকে যায়। কী বকবকই না করতে পারে লোকটা! গুনগুন করে এক বার, নদীটি গিয়াছে চলিয়া—চলিয়া গিয়াছে—মারোয়া হতে পারে, পূরবীও, আপনার পিতাজি কী সুন্দর লিখেছিলেন, শুনে হামার কত নদীর কতা মনে পড়ে, পানি নাই শুখা হয়ে পড়ে থাকছে, মানুষ ভি নদীর মতো হয়ে যাচ্ছে শুখা, দয়া নাই, কলকাতা ভি অমন হয়ে যাচ্ছে, কলকাত্তা থেকে কলকাত্তা চলে যাচ্ছে সাব, সিঙ্গারের হাভেলি নিয়ে খুব গোলমাল, শরিকরা বাড়ি তুলে দিল পোমোটারের হাতে। লেকিন বুড়িমা, অতলানন্দের ওয়াইফ দেবে না, নূর মহম্মদ আমিন গেল জমি ভাগ করতে, দো কাঠা দেড় ছটাক জমিন সিঙ্গারের ফেমিলির রয়ে গেল। ওই মাকান ভাঙা পড়ল। শুধু একটুখানি রয়ে গেল, ভাঙা মাকানে বুড়ি রয়ে গেছে তার পাগলা ছেলেকে নিয়ে।

শুনতে শুনতে ব্রতীন বলল, আমার ভয় করছে গুলাম ভাই রিকডিয়া।

বুড়ির তো ডর নেই, ফুটে যেতে যেতে থেকে গেল, সব ফুটে যাবে, কিকড আটিস থেকে যাবে।

অন্ধকার প্রায় ভুতুড়ে রাস্তা দিয়ে ঘণ্টাখানেক হাঁটিয়ে গুলাম হুসেন তাকে দাঁড় করাল এক নির্মীয়মান বহুতলের সামনে। গরগর করে উঠল, পোমোটার খুব চেষ্টা করেছিল, পারেনি। কলকাত্তা থেকে কলকাত্তা চলিয়া গিয়াছে সাব।

সেই বাড়ি কই?





পিছনে পড়ে গেছে, মাল্টিস্টোরিড পুরা হয়ে গেলে ওরা চাপা পড়ে যাবে, না আলো না বাতাস, লেকিন আটিস ফেমিলি তো, কত রূপায়ার লোভ দেখাল, মাথা নেড়েই গেল, কলকাত্তা নিয়ে বাবুরা পাগল হয়ে গেছে, উন্মাদ।

গুলাম ভাই আস্তে, বাজছে মনে হয় গানটি।

বাজতেই হবে, রিকড বাজলেই পাগলা ছেলেটা শান্ত হয়ে যায়।

ওরা দু’জনে নিঃশব্দে নির্মীয়মান বহুতলের পিছনে হেঁটে গেল। ধ্বংসস্তুপে এটুখানি আলো জেগে। জানালা দিয়ে সেই আলো এসে পড়েছে বাইরের মরা ঘাসে। অন্ধকারে বেজে উঠেছে, ‘নদীটি গিয়াছে চলিয়া...’। বাজছে গান। ব্রতীনের দু’চোখ জলে ভরে গেল। বুড়ো গুলাম হুসেন ফিসফিস করছে, অতলানন্দ সিঙ্গারের একটাই বেটা। আপনার বয়সী হবে, নূর মহম্মদ খবর দিল, আমিন তো, সব জানে, বাবার গান শুনলে ও ছেলের আঁখিতে নিদ আসে সাব।

শুনতে লাগল ব্রতীন। দেখতে পেল রূপবান গায়ক তাদের পাশের বাড়িতে রেকর্ড বাজিয়ে তাদের শোনাচ্ছেন তাঁর গান। বাবার হাতে পুড়ে যাচ্ছে পাসিং শো। পাশের বাড়িও নেই এখন, তাদের বাড়িও নেই, শুধু গানটি রয়ে গিয়েছে কোথাও। গানে গানে ঘুমিয়ে পড়ছে উন্মাদ পৃথিবী। মাটিতে উবু হয়ে বসে পড়ল ব্রতীন। গুলাম হুসেনও। অন্ধকারে দেখতে পেল গানের নদীর ধারে দাঁড়িয়ে গোরা সায়েব। মাথায় সেই টুপি। সেই চাহনি। অবিকল সেই রকম।








৫টি মন্তব্য:

  1. Oshadaron ! " Rikod bajlei pagla celeti santo hoye jai" ....ei bakke keno choke pani chole elo !

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
  3. খুব বৃষ্টি। আজ বেরোতে পারলাম না। কোথায় যাই আমরা? আমরা, মানে আমি আর তমাল, কবি তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রায় প্রতিদিন, বিভূতিভূষণের পায়ের ছাপ পড়েছিল যে গ্রামে সেখানেই দুজনের বসে থাকা। চারদিকে অবিরাম শান্ত আঁধার। আজ বাড়ি থেকে লাভই হল। সেই শান্ত আধাঁরের ব্যাখ্যা খুঁজে পেলাম এই গল্পে। চোখ বন্ধ করি কিছুক্ষণ। আনন্দে। শান্তির আঁধারে।
    উত্তরমুছুন

    উত্তরমুছুন
  4. আহা কেনো যে চোখে জল চলে এলো

    উত্তরমুছুন