বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

লক্ষ করলে দেখা যায়

হামীম কামরুল হক

অনেক দিন আমার কোনো অসুখ হয় না। এমন লোক বলে দুম করে একদিন মরে যায়। আমি মরে গেলে ভালোই হতো। আম্মু শান্তি পেত। আরেকটা বিয়ে করতে পারতো। না করলেও যখন যাকে ইচ্ছা বাসায় আনতে পারতো। আমার জন্য প্রতিদিন ঘ্যানঘ্যান করতে হতো না। আর কিছু না হলে যেকোনো কাপড়াচোপড় পরে এমনকি না-পরে ঘরে ইচ্ছা মতো থাকতে পারতো, ঘোরাফেরা করতে পারতো। তবে এও ঠিক আম্মু আমাকে অনেক ভালোবাসতো। এখনও বাসে, কিন্তু আমাকে নিয়ে তার রাগের ও বিরক্তির শেষ নেই। প্রতিদিন একটাই কথা, লেখাপড়া না করলে নিজের পথ দেখো।

লেখাপড়া করো, আমি সব মেনে নেব। আম্মু নিজে লেখাপড়ায় ভালো ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ, এমবিএ পাশ। এখন বড় একটা কোম্পানিতে কাজ করে তাছাড়াও কত কী করে। একটা নাটকের গ্রুপে বলে যাওয়া-আসা আছে। আমি কেন এমন হলাম? আমি পেয়েছি নাকি আমার বাপচাচাদের ধাত। দেখতে সুন্দর, কিন্তু মাকাল ফল। হ্যান্ডসাম, ম্যানলি পুরুষের প্রতি আম্মুর মারাত্মক দুর্বলতা। সেই দুর্বলতার জন্যই আমার বাপের মতো সেই সময়ে আধপাগল, এখন পুরোপাগল, একটা লোককে কিছু না দেখে বিয়ে করেছিল। আম্মু দেখতে কালো কিন্তু এমন মায়াকাড়া একটা চেহারা আর স্বাস্থ্য। আম্মুকে দেখে কারো অভক্তি জাগার অন্তত সুযোগ নেই। সবচেয়ে ভালো আম্মুর কণ্ঠস্বর। আবৃত্তি শিখেছিলেন। ছাত্রী থাকার সময় বিদেশি ছবির বাংলা ডাবিংয়ের জন্য আম্মু ছিল সেরাদের একজন। তারপর এত পড়ালেখা। নিজে থেকে ছবি আঁকতে পারা, এত ভালো রান্না, ঘরাসাজানোর রুচি-- কোন গুণটা আম্মুর নেই? তার ছেলে হয়ে আমি কোনো কিছুই পেলাম না! সব বাপচাচারদের থেকে পেলাম? তারা আবার বড় বংশ। সৈয়দ। পূর্বপুরুষেরা মধ্যএশিয়া, ইরান, আফগানিস্তান থেকে নাকি আসা। পুরুষরা কেউ পাঁচফুট দশের নিচে নেই। তেমন টকটকে গায়ের রঙ। আমিও অল্প বয়সে ধাই ধাই করে লম্বা হয়ে গেছি। ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়ই আমি পাঁচফুট আট। এখন তো ছয়ফুট দুই। এত বড় একটা ছেলেকে আম্মু মারাতো। রুটি বেলার বেলুনি দিয়ে পায়ের দুপাশে, কখনো হাতের দুপাশে মারতো। যা ভাগ আমার বাসা থেকে। দিনের পর দিন শুনতে শুনতে আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। এদিন দুম করে বেরিয়ে পড়লাম। আসলে দিনের পর দিন আমার ফিরতে রাত হতো। এই নিয়ে প্রতিদিন আম্মুর রাগ। আম্মু নিজেও প্রায় রাত করে বাসায় ফিরে। আমার কাছে আলাদা চাবি থাকতো। কিন্তু আমি আম্মুর পর বাসায় ফিরতাম। এই নিয়ে আম্মুর রাগ চূড়ান্ত পর্যায়ে ওঠে। হয় তাড়াতাড়ি করে বাড়ি ফিরবো, নইলে আর যেন সেদিন না ফিরি। সে চেষ্টা যে করিনি তাও না। বহুদিন চেষ্টা করে দেখেছি। পারিনি। কেবলই রাত হয়ে যায়। এটা যেন কার কবিতা? হ্যাঁ কবিতা পড়তাম। এখন আর পড়ি না। এখন যে কী করি তাও জানি না। মানে মন যে কী চায় জানি না।


ভাবছেন আমি কোনো নষ্টভ্রষ্ট ছেলে? তাও কিন্তু না। তবে বাড়িতে ফিরলেই আমার কী যেন হয়। আম্মুর কথা একদম সহ্য করতে পারি না। আরও মেজাজ বিগড়ে যায় আম্মুর সঙ্গে কোনো পুরুষ মানুষ দেখলে। আম্মু যদি আব্বুর কাছে চলে যেত, বা আব্বুর সঙ্গে একসাথে থাকা শুরু করতো, তাহলে হয়তো আমিও ঠিক হয়ে যেতাম। আম্মু বলেছে, সেটা আর সম্ভব নয়। তাদের ডির্ভোস হয়ে গেছে। আমি যখন আরো ছোট তখন। তারপরও আমি ওই বাড়ির ছেলে, তাই আমাকে তাদের বাড়িতে নিয়ে যেত মাঝে মাঝে। এই নিয়ে যাওয়াটাই নাকি ভুল হয়েছে।


শহরের প্রান্তে নাকি বৃদ্ধাশ্রম আছে। আমার মতো ছেলের জন্য কোনো কিশোর আশ্রম নেই? আমি তাও জানি না। যেখানে আমি ¯্রফে থাকবো। কোনো কিছু করতেও পারি, নাও করতে পারি। স্রেফ আমাকে রাখা হবে। বলা যায় অকম্মাদের আশ্রম হবে সেটা। নেই এমন একটাও?


ছোটবেলা থেকে আম্মু আমাকে অনেক আদর ভালোবাসা দিয়েছে। অনেক কষ্ট করে এই আমাকে বড় করে তুলেছে। এর সবই ঠিক আছে। সবই আমি মানি। কিন্তু আম্মু কেন আব্বুর কাছে যায় না? আব্বু পাগল বলে? কই আব্বু তো আমার সঙ্গে বেশ ভালো। আমি গেল কত আদর করে। আর আম্মু বলে, বাবা ও চাচারাই নাকি আমার মাথাটা খেয়েছে। নইলে আমি এমন বদলে গেলাম কেন? আমি কত লক্ষ্মী একটা ছেলে ছিলাম।


আম্মু আমাকে কদিন আগে মুন্সিগঞ্জের একটা মিশনানি স্কুল থেকে নিয়ে এসেছে। আমার সম্পর্কে আসলে সবাই মনে হয় ক্লান্ত হয়ে যায়। কেন ক্লান্ত হয়ে যায়? আমি তা জানি না। বাসায় আমার যে কী হয়। একবার রাগ হলো তো টিভিটা দা দিয়ে কুপিয়ে কুপিয়ে ভেঙেছি। এর আগে একদিন ঘরের পর্দাগুলি কাঁচি দিয়ে কুচি কুচি করে কেটেছি। আম্মুর দামি ডিনার সেট এক আছাড়ে ভেঙেছি একদিন। আচ্ছা আমিও কি বাবার মতো পাগল হয়ে যাচ্ছি? তাও আমি জানি না।


আমার তো কোনো কিছু করতেই ভালো লাগে না। লেখাপড়া করতে তো ভালো লাগেই না। ঘরে থাকতে ভালো লাগে না। বাইরে যেতেও ভালো লাগে না। কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করে না। চুপ করে থাকতেও ভালো লাগে না।


একটা মেয়েকে খুব ভালো লাগতো। কিন্তু মেয়েটা জানিয়ে দিয়েছে আমার সঙ্গে তার কোনো কিছুই সম্ভব নয়। কারণ আমি মুসলমান ও হিন্দু। আমি বুঝতে পারি না। মুসলমান আর হিন্দু আলাদা হওয়ার মানে কী। শ্রাবণীকে দেখে কেউ বলতে পারবে না সে হিন্দু নাকি মুসলমান। কিন্তু শ্রাবণী বলেছে আমাকে দেখলেই বলে বোঝা যায় আমি মুসলমান। তাছাড়া আমার খতনাও হয়েছে। খতনা না হলে আমরা একসঙ্গে পালিয়ে যেতে পারতাম। তাও আমি যদি বিশ্ববিদ্যায়ল পাস করি তারপর দেখা যেতো কী করা যায়। কিন্তু ততদিন পর্যন্ত কোনো মুসলমান লোক খতনা না করে থাকে? আমি জানি না।


আমি এমন অনেক কিছুই জানি না। আসলে জানার প্রয়োজনও বোধ করি না। কোথা থেকে কী হয় সেদিকে আমার কোনো কালে কোনো নজর ছিল না। মানুষের চামড়া তো গ-ারের মতো হয়ে গেছে। আমার চামড়াও। আমি চোখের সামনে, নিজের কানে শুনলেও কিছু বলি না। লোকে এই যে রাতের বেলায় বাড়ির ছাদে গায়েহলুদ, বিয়ের অনুষ্ঠান করতে গিয়ে প্রচ- শব্দে গান বাজায়, ফজরের আজানের আগপর্যন্ত চলে সেই শব্দ-- কেউ তো কিছু বলে না। কাউকে এই নিয়ে বলতে দেখিনি কোনোদিন। বলতে দেখিনি বলেই হয়তো শিখিনি। অন্যরাও শেখেনি। শেখার নাকি একটা পরম্পরা থাকে। আমাদের শেখার পরম্পরা কবে থেকে বন্ধ হলো তাও তো জানি না। কে যে জানে কার কাছ থেকে জানা যেতে পারে, সেটাও কখনো আমার জানতে ইচ্ছা করেনি।


জানতে ইচ্ছা করেনি বলেই তো জানি না। জানাটাতো কোনো স্বয়ংক্রিয় ব্যাপার নয়। অটোমেটিক কোনো কিছু হবে না। কিন্তু আমরা অটোমেটিক মনে করি। এই কথা বলতে একজন বলল, অটোমেটিক জীবন ও সমাজ--- পড়েছি কিনা। আমি তো নামই শুনিনি, তাই পড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।


এর ভেতরে কানে এল ঢাকার আজিজ মার্কেটের নানান আড্ডা বসে, জ্ঞানের আড্ডা, সেখানে গেলে ভালো ভালো কথা শোনা যায়। ভালো ভালো কথা শোনার মূল ব্যাপার হলো নিজেরে ভেতরের ভালোটা সম্পর্কে জানা। সেই জানাটাই আসল। নিৎসে নামের একজন পণ্ডিত বলেছেন, শক্তিমানকে দুর্বলের হাত থেকে বাঁচতে হবে। তিনি বলে যথার্থই পণ্ডিত ছিলেন, কারণ তিনি আগের অনেক কিছু পণ্ড করে দিয়েছেন। এই পণ্ড কেবল তিনি করে ছেড়ে দিয়েছেন তাই নয়, তার এই পণ্ড করার পরম্পরা এখনো চলছে। এতো গেল পণ্ডিতের পণ্ড করা। আর গল্পণ্ডউপন্যাসে পণ্ড করার একটা আছে তার নাম ফ্রাঞ্জ কাফকা । এছাড়াও লোকজনের মুখে লাঁকা-ফুকো-দেরিদার শুনি। এরপর নতুন লোকজনের নাম শুনি। উত্তরঔপনিবেশিকতা, উত্তরাধুনিকতা মিলেমিশে তারা কত কথা বলেন। আগামবেনে-আমিরকার কারবাল-ফ্রাঞ্জ ফ্রানোর কথা শুনি। তারা বলে, দুই ফ্রাঞ্জ-- ফ্রাঞ্জ কাফকা আর ফ্রাঞ্জ ফানো-- এই দুইকেই পড়তে হবে। আধুনিক রাষ্ট্রপৃথিবীর রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ নীতি বুঝতে হলে। তাদের আড্ডা শুনে আমার মাঝে মাঝে মনে হতো ঘরে ফেরা দরকার। আম্মুর কাছে দুজনেরই বই আছে। আম্মু অবশ্য বলে, ফানৎস কাফকা। আমি বলতাম কাফঅকা। আম্মু হি হি করে হাসতেন। কাফঅকা কিরে? কাফ্কা। তার উপন্যাস নিয়ে আম্মু ফিল্ম করতে চায়। আম্মু যে আমার কত কিছু করতে চায় আমি জানি না।


বড় ভাই একদিন বললেন ফ্রয়েডের কথা। ফ্রয়েড়ের সাইকোঅ্যানালিসিসের শেষ কথাও ‘নিজেকে জানো’। মানুষ নিজেকে জানতে পারলে নিজে সুস্থ থাকতে পারে। অন্যদেরও জানতে পারে। নিজের জানার সবচেয়ে প্রথমে দরকার নিজের বাবা-মাকে জানা। তুমি যদি নিজেকে জানতে চাও তো সবার আগে তোমার বাবা ও মাকে জানো। তারা কে কেমন ছিল বা আছে -- সেবসব জানো তাহলেই অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। কিন্তু আমরা, আমাদের বেশিভাগই, নিজেদের বাবামা সম্পর্কে কিছুই জানি না। সবচেয়ে কাছের মানুষ, যাদের মাধ্যমে জন্ম নিলাম-- তাদের সম্পর্কে আমাদের প্রায় কিছুই জানা নেই।


আমি নিজের সমস্যার কথা কাউকে বলি না। ঢাকায় একটা মেস ভাড়া নিয়েছি। একটা প্রেসে ঢুকিয়ে দিয়েছেন আজিজ মার্কেটের আড্ডার এক বড় ভাই। তিনি বলছেন, তোমার জীবন খুব স্ট্রাগলের হবে। কখনো হতাশ হবে না।


আমার আসলে আশা ও হতাশা কোনোটাই নেই। আসলে আশা থাকলেই তো হতাশা থাকবে। কোনো স্বপ্ন মাথার মধ্যে কাজ করে না। এখন কোনো নারী, কোনো প্রেম মাথায় এসে ঘুরপাক খায় না। ভালোলাগার মতো কিছু নেই, মন্দ লাগার মতোই কিছু নেই। আমি যে মেয়েটাকে ভালোবাসতাম সে আমারই মহল্লারই এক বড় ভাইয়ের প্রেমে পড়ে। আমিই তাকে একদিন বাসে যেতে যেতে কিছুক্ষণ আগে ঝালমুড়ির ঠোঙায় সেই বড় ভাইয়ের নাম ও তার লেখা একটা গল্পের টুকরা দেখিছিলাম। সে ভেবেছিল ঠোঙার ভেতরে যার গল্প পাওয়া যায়, না জানি সে কত বড় লেখক, কত বড় প্রতিভা। আজিজ মার্কেটে এসে শুনি, ওখানে আড্ডামারা লেখকরা ঠোঙার হাত থেকে গল্পকে বাঁচাবেন বলেই লিটল ম্যাগাজিন করেন। গল্পলেখা একটা পবিত্রকাজ। সেই পবিত্র কাজটি যেখানে ছাপা হবে সেটি ততোধিক পবিত্র। তাদের এসব কথার মাথামু- আমি বুঝতে পারতাম না।


আমি চা খেতাম, সিগারেট খেতাম, কিন্তু কোনোটাই আমাকে টানতো না। আসলে কোনো কিছুই তো আমাকে টানতো না। অনেক দিন পর হুমায়ুন আজাদের ‘প্রবচনগুচ্ছ’ এক বড় ভাইয়ের কাছে দেখি। ছোট্ট বই। আজিজের বারান্দায়ই একটানে পড়ে ফেলি। চমকে চমকে উঠি। তারপর বইটা দিয়ে দিলে সব ভুলে যাই তাও না। দুয়েকটা মাথার ভেতরে কাজ করে। বেশিরভাগই হারিয়ে যায়। আবার অনেক দিন যেগুলি ভুলে গিয়েছিলাম সেখান থেকে দুয়েকটা লাফ দিয়ে উঠে আসে, যেন উঠে আসার জন্য ওৎ পেতে ছিল। এমনিতে আমার অবশ্য কোনো বইপত্র পড়তেই ভালো লাগে না। মেসের একজন ছুটির দিনে হূমায়ুন আহমেদের বই পড়ে। হূমায়ুনের বই বলে তাকে বেঁচে থাকার শক্তি দেয়। আমার কোনো আগ্রহ হয় না। বেঁচে থাকা প্রতি মায়া থাকলে বেঁচে থাকার জন্য দুর্বলতা জন্মায়। সেই দুর্বলতাই নাকি শক্তি হয়ে ওঠে। একটা মেয়ের প্রতি দুর্বল হলে যেমন ভালোবাসা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, বেঁচে থাকাও প্রায় একই রকমের বিষয়। কারো কারো কাছে নাকি ভালোবাসাই বেঁচে থাকার শক্তি। লোকটা মাঝে মাঝে এসব জ্ঞান দেয়। আমি চুপ করে থাকি। বেঁচে থাকার শক্তি কী আর বেঁচে থাকার দুর্বলতাইবা কী-- সেসব আমি জানি না। জানতেও চাই না। জানতে চাই না মানে, আমি সব জেনে গেছি এমন কোনো অহংকারও আমার নেই। আমার কী আছে আর কী নেই-- সেবও আমি জানতে চাই না। আমি বেঁচে থাকতে চাই বা মরে যেতে চাই-- এমন কোনো কিছুই আমাকে ভোগায় না। জিনেকা ঠিকানা নেহি, মারনেকা বাহানা হ্যায়-- আমার অবস্থা নুসরাত ফাতেহ আলি খানের ওই গানের মতো।


আমার কোনো মোবাইল নেই। প্রেসে আমাকে খোঁজার আগেই আমি হাজির হই। আমার কাজ কাগজের হিসাবা রাখা। আর প্রেসের কর্মচারীদের সবার দেখাশোনা খোঁজ খবর নেওয়া। এজন্য প্রেসে একটা মোবাইল আছে। সেটা প্রেসেই থাকে। আমি সঙ্গে নিয়ে আসি না। আর থাকিও আরামবাগের একটা মেসে। কয়েকটা বাড়ির পরই প্রেস। প্রেসের মালিক একজন লেখক মানুষ। আমাকে নিয়ে নাকি কাজ হচ্ছে সেটা আমি শুনতে পাই আমার বড় ভাইয়ের কাছে। তিনি বলেছেন,‘তুমি আমার ইজ্জত রাইখো মিয়া। তাইলেই হইব।’


আমার মুখে কেউ কোনো হাসি দেখে না। আমি জানি লোকজন আমাকে যন্ত্র বলে জানে। আমি নিজেও চাই ¯্রফে একটা যন্ত্র হয়ে যেতে। আজিজের ওই আড্ডায়ও আমি আর যাই না। এখন বলে তেমন আড্ডাও হয় না। সবকিছুই ভেঙে গেছে। এখানে যা কিছু গড়ে ওঠে ভেঙে যাওয়ার জন্য। ওই বড় ভাই একদিন আরামবাগে কী একটা কাজে এসে আমাকে দেখে গেছেন। তার কাছে এসব শুনতে পাই। তুমি কারো কোনো খবর রাখো না? আমি বলি, আমারও কেউ কোনো খবর রাখে না।


ভালো, এমন গোপনে বাঁচতে পারলে ভালো। বেঁচে আছো, কিন্তু কোথায় আছো কেমন আছো কীভাবে আছো কেউ জানে না-- এইটারে কয় গোপনে বাঁচা। বড় দরকারি এই বাঁচা। শেক সাদী কইছিল, রাস্তা দিয়া এমন কইরা হাঁটবা যেন কেউ তোমারে সালাম না দেয়। চিনতেই যেন না পারে।


এরপর একদিন শুনি আম্মু আমার খোঁজে এখানে এসেছিলেন। আজিজ মার্কেটের আড্ডার কার কাছ থেকে জেনেছেন আমি এখানে আছি। আমি অবশ্য একটু চমকে উঠেছিলাম। প্রেস মালিক আমাকে একদিন বলেন বাড়ি ফিরে যাও। তোমার মা তোমাকে আর বকবে না। মানে নিজের ভালো চাও তো। তুমি তো ভদ্রঘরের ছেলে। আমি অবশ্য দেখেই বুঝেছিলাম।





তিনি কী বুঝেছিলেন, তিনিই ভালোই জানেন, আমি নতুন করে বুঝলাম-- আমাকে আবার পালাতে হবে। এবার ঢাকার বাইরে। বেতনের জন্য ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট একটা খুলেছিলাম। খাওয়া দাওয়া আর মেসভাড়ার পরও সেখানে গত কয়েকমাসে ভালোই টাকা জমেছে। সেই টাকাগুলি সব তুলে আনি। যেদিন প্রেস মালিককে বলতে যাবো, তার আগেই তিনি আমাকে ডেকে পাঠান। আমি তার ঘরে ঢুকে দেখি আম্মু । আমি ঢুকতেই আম্মু উঠে দাঁড়ায়। আমার দিকে একরকম দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। আমার ভেতর থেকে একটা কান্না উঠে আসতে গিয়েও আসে না। আমি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।#


লেখক পরিচিতি 
হামীম কামরুল হক
ঢাকা
গল্পকার। প্রবন্ধকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন