বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

মোমিনুল আজম এর গল্প- পেনশন


টাকা তুমি দিবে কেন? টাকা দেয়ার কথা তো অফিসের। আর এটা তো নিয়মের মধ্যেও পড়ে না--



স্যার, আমার বেলায় শুধু নিয়ম দেখলেন, অন্যরা অফিসে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যায়, সারাদিন আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় না, তাদের ছুটি-ছাটার কোন সমস্যা হয় না। আর আমি ছুটি চাইলেই টেনিসরা না খেয়ে থাকবে, অফিসাররা কোথায় খাবে ইত্যাদি অনেক কথা শুনতে হয়।


তমিজ গড়গড় করে এতোগুলো কথা বলে মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকে যা শুনে বাহালুলের বয়সের চাপে কপালের ভাঁজের সাথে আরও দু'তিনটা ভাঁজ যুক্ত হয়। উচু স্বরে, রাগ করে কথা বলা, কাউকে শাসানো তার স্বভাবে নেই। হয়তো দীর্ঘদিন উর্দ্ধতণ কর্মকর্তাদের সাথে কাজ করতে করতে মানুষের সনাতন এ বদগুণটি তিনি বিসর্জন দিতে পেরেছেন। তারপরও ভিতর একটা অস্বস্তিভাব বিরাজ করে। মাথা থেকে তেল চিটচিটে গোল টুপিটা খুলে টেবিলের ওপর রাখে, থুতনিতে পাক ধরা কটা দাড়িতে হাত বুলোতে বুলোতে তমিজের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে।

তমিজ শান্তশিষ্ট আর বোকা বোকা স্বভাবের বাবুর্চি। তার দায়িত্ব প্রশিক্ষণ চলাকালীন সময়ে একবেলা রান্না করা । একাজটি সে নিষ্ঠার সাথে পালন করে, রাধুনি হিসেবেও তার সুনাম আছে। শোনা যায় এ প্রতিষ্ঠানের কোন এক শীর্ষ কর্মকতর্া হোটেলে খেতে গিয়ে মজার রান্নার স্বাধ পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে এসে চাকুরি দিয়ে দেয়। সেটা ১৯৮৫ সালের কথা। সেই থেকে বোকা সোকা তমিজ বাবুচর্ি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে। কর্মকতর্াদের সাথে চোখ তুলে কোন সময় কথা বলেনা , দায়িত্ব দিলে কখনও না করেনা । সেই তমিজ যখন তমিজের সুরে কথা না বলে কিছুটা উদ্ধত সুরে কথা বলে তখন বাহালুল চমকে ওঠে। তবে কী তার প্রশাসনিক ক্ষমতায় কিছুটা শৈথিল্য এসেছে। হবে হয়তো, তা না হলে গত পরশু ড্রাইভারের নিয়ম বর্হিভূতভাবে দাখিল করা ওটি বিল থেকে দুইশত টাকা কর্তন করায় সবাই মিলে তাকে শাসিয়ে গেল , সে তাদেরকে কিছুই বলতে পারলো না।

একটি মধ্যম গোছের সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কর্মর্কর্তা বাহালুলের বয়স হয়েছে। নিম্নমান সহকারি হিসেবে চাকুরিতে ঢুকে বত্রিশ বছর চাকুরি করার পর গত এক বছর হলো সে কর্মকর্তার তকমা পেয়েছে, তাও আবার চলতি দায়িত্বে। আগামি মার্চে তার এলপিআর। অফিসপ্রাণ বাহালুল ঘড়ির কাটা ধরে সকাল নয়টায় অফিসে এসে হাকডাক শুরু করে দেয়। পিয়ন, চাপরাশি, মালি, বাবুর্চিদের হাজিরা খাতায় লাল কালি দিয়ে ক্রস দেয় আর বাকিসময় অফিসে বসে তসবি টিপে দ্বীনের কাজে ব্যস্ত সময় পার করে। ফুরসৎ পেলেই কর্মকর্তাদের রুমে গিয়ে বৈষয়িক আলোচনায় মেতে ওঠে। এতে প্রায়ই প্রাধাণ্য পায় সরকার কবে নতুন পে স্কেল ঘোষনা করবে? তার খুব ইচ্ছে নতুন একটি পে স্কেল নিয়ে সে এলপিআর এ গমন করবে। এতে করে না হলেও তার দু'তিন লক্ষ টাকা বাড়তি গ্রাচুইটি পাবে। সারা জীবনের আয় দিয়ে দুই ছেলে আর এক মেয়েকে মানুষ করেছে। একমাত্র মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে দু'বছর আগে। তার খুব ইচ্ছে ছিল অফিসার হওয়ার পর মেয়েকে বিয়ে দেবে। এতে শ্বশুর বাড়িতে মেয়ের সন্মান যেমন বাড়তো তেমনি আরও ভাল বর পেত বলে তার ধারণা, এমন কি বিসিএস বর পাওয়াও অসম্ভব ছিল না। কিন্তু মন্ত্রণালয় আর পিএসসির গড়িমসিতে নির্ধারিত সময়ের তিন বছর পরে সে অফিসার হতে পেরেছে। হতে যে পেরেছে এতেই সে সন্তুষ্ট। যার প্রমান পাওয়া যায় ঘড়ি ধরে অফিসে আসা আর কর্মচারিদের প্রতি হাকডাক দেখে। তবে তার সে হাকডাকে শাসনের চেয়ে প্রশ্রয়ের পরিমান বেশি। এখন তার একটাই স্বপ্ন পেনশন গ্রাচুইটির টাকা দিয়ে শহরের পাশে সে বাড়ি বানাবে। ৩ শতক জমি অবশ্য সে আগেই কিনে রেখেছে।

বাহালুলের প্রশাসনে যে ঘুন ধরেছে তা বোঝা যাচ্ছিল বেশ কিছুদিন ধরে। প্রতিদিন সোয়া নটায় হাজিরা খাতা নিয়ে এসে সে লাল কালিতে ক্রস দিবে কিন্তু মাস শেষের বেতন কর্তনের তালিকায় ইউনিয়ন নেতাদের নাম নেই, তারা অফিসে এসে চলে যায় , ফাইল স্পশর্ও করে না এটি দেখেও না দেখার ভান করে বাহালুল। এসব নিয়ে সাধারণ কর্মচারিদের মাঝে অসন্তোষ আছে কিন্তু সে অসন্তোষ সামনা সামনি কেউ প্রকাশ করেনি। তমিজের কথায় তার মনে হলো নিজেকে সংশোধন করা দরকার, প্রশাসনকে তার নিজের পথে চলতে দেয়া উচিত। পক্ষপাতমুলক প্রশাসন কারো জন্য শুভ নয় এটা সে ভাল করেই জানে কিন্তু সে তো অসহায়। তার দায়িত্ব অনিয়ম তুলে ধরে রিপোর্ট করা। সেই আগুন রিপোর্ট যখন দু নম্বর হয়ে এক নম্বরের কাছে যায় তখন তা পানি হয়ে নীচে নেমে আসে। যাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা হয় তখন তারা তাচ্ছিল্য করে সামনে দিয়ে চলে যায়। এরুপ অবস্থায় মাঝে মাঝে বাহালুল ভাবে, সে আগাম অবসর নিয়ে চলে যাবে কিন্তু পরক্ষণেই মনে হয়, যে পদের জন্য সে সারাজীবন কষ্ঠ করেছে সে পদের সবটুকু ভোগ না করলে তার সারা জীবনের কষ্ঠই বৃথা যাবে। সরকারি অফিসের এ কালচারে সে তো চাকুরি জীবনের প্রথম থেকেই অভ্যস্থ। আগে অনিয়ম ভোগ করেছে আর এখন অনিয়ম ভোগে সহায়তা করছে।

হঠাৎ তার রুমের ফোন বেজে উঠলো। জী স্যার আসছি স্যার বলে সে হন্ত দন্ত হয়ে রুম থেকে বেরুনোর জন্য অস্থির হয়ে পড়লো। রুমে যারা ছিল তারা একে একে সবাই বের হয়ে গেল। তমিজও বের হওয়ার জন্য পা বাড়িয়েছিল। তাকে চোখের এবং হাতের ইশারায় থাকতে বলে বাহালুল পদাধিকার বলে দুই নম্বর স্যারের রুমে গেল জরুরি আলাপ সারতে। তমিজ মাথা নীচু করে দাড়িয়ে থাকলো। অজানা আশঙ্খায় তার শরীর কাপতে লাগলো। পচিশ বছর ধরে চাকুরি করছে সে , চাকুরি জীবনের প্রায় প্রতিদিনই একবার না একবার চিন্তা করেছে সে পেনশনের কথা। আজ হঠাৎ মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়া একটা কথায় বাহালুল স্যার কি আটকে দিতে পারে তার পেনশন। যদি তাই হয় বুড়ো বয়সে তাকে না খেয়ে মরতে হবে। এসব চিন্তার মাঝেই বাহালুল রুমে ঢুকে আস্তে করে দরজাটা ভেজিয়ে দিল। তা দেখে তমিজের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। সে গলা দিয়ে আর শব্দ বের হচ্ছেনা। দু একবার চেষ্ঠা করে দেখলো, না পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। জোড় করলে যেটা হচ্ছে সেটা গোঙ্গানী। এ পরিস্থিতিতে তমিজ মাথা নিচু করে চুপচাপ দাড়িয়ে থাকলো।

তমিজ তোমার ছুটি দরকার কেনো?

এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তমিজ তোতলাতে থাকে।

কোন কথাই তার মুখ থেকে বের হয়ে আসছে না, চোখ থেকে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। ঘটনার অস্বাভাবিকতায় বাহালুল স্তম্বিত!

কি হয়েছে তোমার?

বলতেই ঘুরে এসে টেবিলের ভিতর ঢুকানো বাহালুলের পা অনেক কষ্টে চেপে ধরে তমিজ। হাউমাউ করে কেঁদে তমিজ যা বললো তা থেকে মাত্র একটি কথা উদ্ধার করা গেল, তা হলো পেনশন।

পেনশন নিয়ে বাহালুলেরও টেনশন কম না। বত্রিশ বছরের চাকুরি জীবনে সে অনেক জায়গায় কাজ করেছে, অনেক ফিনানশিয়াল ট্রানজেকশনের সাথে সে জড়িত। জীবনে খুব বেশি অনিয়ম করেছে তাও না, যা করেছে তা অফিসের স্বার্থে এবং বসের ইচ্ছা অনুযায়ী। একবার তো এক অফিসারের পাল্লায় পড়ে সারা বছরের বাজেট তিনমাসেই শেষ করে ফেলেছিল। পরের বছর অডিট এসে যখন ধরলো তখন সবদোষ গিয়ে পড়লো তার উপর। অনেক কষ্টে ধারকর্য করে সে বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিল। পানি সবসময় নীচের দিকে গড়ায়- অফিস আদালতের এ বেদবাক্যটি সেবার হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল বাহালুল, তারপরও মাঝে মাঝে ভয় হয় । এলপিআরকালীন সময়ে পাষ্ট ওয়াকর্ ভেরিফিকেশনে যদি কোন অনিয়ম বেরিয়ে যায় তাহলে পেনশন প্রাপ্তি অনিশ্চিত হয়ে যাবে। আর্থিক সংশ্লিষ্টতা আছে এরুপ প্রতিষ্টানে কাজ করার এটাই সবচেয়ে বড় ঝুকি। যে কারনে প্রতিদিন নামাজ শেষের মোনাজাতে যেটি বিশেষ গুরুত্ব পায় তা হলো 'হে খোদা, সারা জীবন ইচ্ছা-অনিচ্ছায় কত অনিয়ম করেছি, কত হারাম খেয়েছি, জানা অজানা কত লোকের ক্ষতি করেছি সেসব তুমি মাফ করে দিও খোদা, চাকুরি শেষে পেনশন প্রাপ্তি সহজ করে দিও, ভবিষ্যত মনোবাঞ্চা পুরণ করে দিও!

বাহালুলের ধারণা কিছু কিছু কর্মকর্তা আছে যারা হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে। নিজের বেদনা জাগালে বাহালুলের কোন আপত্তি থাকতো না, তারা অন্যের হৃদয় খুড়েখুড়ে বেদনা জাগায় এবং এ কাজের জন্য তারা পরম তৃপ্তিবোধ করে। শুকনো একটি ক্ষত তারা খামচিয়ে দগদগে ঘা এ পরিণত করে। এলপিআরের সময় বাহালুলের পেনশন কেস যদি এমন একজন কর্মকর্তার হাতে পড়ে তাহলে তার পেনশন কেসের কি অবস্থা হবে তা আল্লাই জানে। চাকুরি জীবন শৃঙ্খলিত জীবন, অবসরের সময় যত কাছে আসে নিজেকে মুক্ত বিহঙ্গের মতো মনে হয় কিন্তু পেনশনের চিন্তা বাহালুলের জীবনী শক্তি অনেকটা কমিয়ে দিয়েছে। আগে কর্মকর্তাদের অন্যায় আবদারে সে সামান্য হলেও মেরুদন্ড সোজা রাখতে পারতো কিন্তু এখন বাকানো মেরুদন্ড সামান্য নড়াচড়া করলেই ব্্যথা অনুভব করে, সে ব্যথা তিলে তিলে গড়ে ওঠা অন্যায়ের, পেনশনের।

তমিজের মুখে পেনশনের কথা শুনে সে সম্বিত ফিরে পায়। আগামী মাস থেকেই তো তমিজের এলপিআর। পেনশন নিয়ে যে ভীতি তা সে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে। ঠিক একই ভীতি তমিজের মধ্যে। সেতো পারে তমিজের এই ভীতি দুর করতে কারন তমিজের পেনশনের কাগজপত্র তৈরি করে দেয়ার ক্ষমতা তো তার হাতে।

তমিজের মঙ্গল চিন্তায় সেদিন থেকেই কাজ শুরু করে দেয়। আগামী কয়েকদিনেই সে তমিজের পেনশনের কাগজ তৈরি করে ফেলবে। যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাহালুল পুরো অফিস নিয়োজিত করলেন তমিজের কাগজপত্র তৈরি করতে। তার পরম শত্রুরাও বলতে লাগলো- আহা এমন কর্মকর্তা যদি সবাই হতো!

তৃতীয় দিনেই বাহালুলের মাথায় হাত। যে পদে তমিজের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল সে পদের তখন কোন ছাড়পত্র ছিল না। এতোদিন কিভাবে এমন একটি ত্রুটি সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে রয়ে গেল তা ভেবে বিস্মিত বাহালুল। তমিজের ভবিষ্যত অসহায় অবস্থার কথা চিন্তা করে শক্ত কাঠের চেয়ারে স্থানুর মতো বসে নিজের পেনশনের কথা ভেবে অতল গভীরে তলিয়ে যেতে থাকে বাহালুল।


লেখক পরিচিতি
মোমিনুল আজম

জন্মেছেন - ১৯৬৫ সালে, গাইবান্ধায়

পড়াশুনা করেছেন- শের ই বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে
কাজ করেন- বাংলাদেশ ডাক বিভাগে
বর্তমানে- কানাডায় থাকেন
ফিলাটেলি- ডাকটিকিট সংগ্রহের শখ নামে একটি প্রকাশনা আছে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন