বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

রেট্রোস্পেক্টাকল্

শামসুজ্জামান হীরা

চানখারপুল থেকে আসুন আমরা নাজিমুদ্দিন রোড ধরে এগোই। পায়ে হেঁটে এগোনো বুদ্ধিমানের কাজ। গাড়ি বা রিকশায় যতক্ষণে একশ’ গজ এগোবো পায়ে হেঁটে ততক্ষণে এক কিলোমিটার। সেন্ট্রাল জেলকে ডানে রেখে প্রথমে বামে মোড়, একটু এগোলে আবার বামে যাবার পথ। ওদিকে নয়, সোজা যে পথ দেখা যাচ্ছে সেটা ধরে কিছুদূর এগোলে একটু বায়ে ঘুরে আবার ডান এবং সোজা হাঁটা। এই আর একটু পথ। চিনতে পেরেছেন জায়গাটা, কোথায় পৌঁছোলাম?
বেচারাম দেউড়ি। হ্যাঁ, এই বেচারাম দেউড়ি আজ আমাদের গন্তব্য। চানখারপুল থেকে সামান্য এই পথটুকু হেঁটে আসতে বেশ কষ্ট হয়েছে আপনার, --- চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। গাড়ি-টেম্পু আর রিকশার যা ঠাসাঠাসি, তাতে পায়ে চলাও খুব একটা সহজ কাজ নয়। রাস্তার পাশের ড্রেনের কালো থিকথিকে নোংরা জল থেকে কেমন ঝাঁজালো গন্ধ নাকে এসে জ্বালা ধরিয়েছে আপনার, রুমোল চাপা দিয়েছেন। ভাঙাচোরা ডাস্টবিন থেকে উপচে-পড়া আবর্জনার ওপর পাতিকাকের ওড়া-বসা, কুকুরের কেঁউ-কেঁউ আর কামড়াকামড়ি আপনার নাক ও চোখ দুটোকেই খুব পীড়া দিয়েছে। বুঝি। কিন্তু কী করা, বেচারাম দেউড়ি যেতে হলে আপনার এসব সহ্য না করে উপায় নেই। বেচারাম দেউড়ি পৌঁছে ভাবছেন হাঁফ ছাড়বেন, সে আশার গুড়ে বালি। এখানেও অবস্থা তথৈবচ। গাদাগাদি করা ব্রিটিশ আমলের চুনসুড়কি খসে-যাওয়া দালানকোঠা, পথের ধারে সেই নোংরা আবর্জনা --- অবশ্য কিছু কিছু নতুন বিল্ডিংও চোখে পড়ছে আপনার, তাই না ?

আসুন এই বাসায়, হ্যাঁ আপনি যার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে, ঢোকা যাক। আস্তে ঢুকুন, সাবধানে, আপনি তো আবার ছ-ফুটেরও বেশি লম্বা, চৌকাঠে মাথা ঠুকে যেতে পারে। ব্যস, বসুন এই চেয়ারটাতে, আরাম করে বসুন। এখন আমি আপনার চোখে একজোড়া লেন্স পরিয়ে দিতে চাই। ভয় পাবেন না --- কোনও অসদুদ্দেশ্য আমার নেই। এ চশমাটার অদ্ভুত গুণ, এটা চোখে দিলে আপনি ইচ্ছা মত অতীতে চলে যেতে পারবেন। এটার নাম দিয়েছি আমি রেট্রোস্পেক্টাকল্। রেট্রোস্পেক্ট প্লাস স্পেক্টাকল্, রেট্রোস্পেক্টাকল, কেমন হয়েছে নামটা? ডিকশনারিতে আপনি এধরনের কোনও শব্দ আতিপাতি খুঁজলেও পাবেন না কিন্তু। আপনি নির্ভয়ে চশমাটা পরতে পারেন এবং যদি ইচ্ছা করেন অতীতের যেকোনও সময়ে চলে যেতে পারেন --- দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ,পঞ্চাশ বছর… যা খুশি। বাহ্, এই তো চশমাটা চোখে বেশ মানিয়েছে আপনাকে। আমার আগ্রহ শুধু আপনার অতীত গমনের সময়কালটা জানার, তারপর আমি কিছুক্ষণের জন্যে সরে পড়ব আপনার কাছ থেকে যাতে আপনি গভীর মনোযোগের সঙ্গে অতীতকে দেখতে পান। কী বললেন? চুয়াল্লিশ বছরের অতীতে যেতে চান? খুব ভালো, একসেলেন্ট, যান। আপনার তো তখন বোধহয় জন্মই হয়নি, হলেও তখন নেহাত শিশু --- স্মৃতিশক্তির স্থায়িত্ব আসেনি। শিশুদেরও স্মৃতি থাকে তবে তা খুবই ক্ষণস্থায়ী, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতির দৈর্ঘ্য বাড়ে --- স্থায়ীত্বও, এসব আপনি ভালই বোঝেন। আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না, আপনি কি দেখছেন কিছু? দেখছেন --- গুড, চশমাটার অব্যর্থ ক্ষমতা, আপনি যে শুধু ঘটনাই দেখবেন তা নয়, ইচ্ছা মত রিওয়াইন্ড, ফাস্ট ফরওয়ার্ড করতে পারবেন, ভিডিও প্লেয়ারে যেমন করা যায়, আপনার ইচ্ছার ওপরই এগুলো হবে, রিমোট বা বাটন টেপার বালাই নেই। আর মজা হল পাত্রপাত্রীদের মনের ভেতরও ঢুকে যেতে পারবেন যখন খুশি --- মানে চশমাটা আপনাকে সে সুযোগও করে দেবে। তাহলে কিছুক্ষণের জন্য আমার বিদায়। ধারেকাছেই থাকব, চশমা খুললে আপনার সামনেই দেখতে পাবেন আমাকে।



১.

নভেম্বর মাস। সন্ধ্যা গড়াতেই বাতাসে শীতের নিশ্বাস। বেচারাম দেউড়ির রাস্তাঘাট-অলিগলি ফাঁকা ফাঁকা। মহল্লার একমাত্র চোখ ধাঁধানো ইমারত তারা মসজিদ --- সিরামিকের ভাঙা টুকরো দিয়ে সারা গায়ে তারা আঁকা। তারা মসজিদ থেকে এশার নামাজ আদায় করে মুসুল্লিরা যে যার বাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছে। যেতে যেতে তাদের মধ্যে বাতচিত হচ্ছে। একজন খুকখুক কাশে, নাক ঝাড়ে তারপর বলে ওঠে : যেমন অবস্থা দ্যাখা যাইবার লাগছে, মনে হয় পাকিস্থান আর টিকবো না

--- হহ্, আমার ভি সন্দ হইবার লাগছে ... কাইল রাইতেও কবিরাজ গল্লির নজদিক নাকি গোলাগুলি হইছে, দুইটা পাকরে নাকি ফালাইয়া দিছে। হালায় আমরা পড়ছি ঐ কি জানি কয় ছাখের করাতের উপরে, পাক আর্মি নাখোশ তো জানের খতরা আবার হালায় মুক্তিগরও ডর ... যামু কই এলা...। অন্য একজন বলে।

সত্যিই খুব নাজুক অবস্থা পুরনো ঢাকার এই লোকগুলোর। অধিকাংশ বাড়ির দরজায় বড় বড় হরফে উর্দু এবং বাংলায় লেখা, আল্লাহু আকবার --- মুসলমান বাড়ি, কোনওটায় আবার পাকিস্তান জিন্দাবাদ। সরু বাঁশের ডগায় পাকিস্তানি পতাকা বাড়ির প্রধান ফটকের ওপর কাত্ করে লাগানো, কারও বা বাড়ির ছাদে। যেগুলোতে নেই সেগুলোর দরজায় বড় বড় তালা ঝুলছে ছ-সাত মাস বা তারও বেশি সময় ধরে। কোনও কোনওটার ভেতর খাঁ খাঁ, লুটপাট করে পরিষ্কার করে দিয়েছে চোর-ছেঁচড় আর পাকিদের দোসরেরা। দখলই নিত কিন্তু দোনোমনায় আছে --- অবস্থা কোন দিকে মোড় নেয় বোঝা যাচ্ছে না তো।

বেচারাম দেউড়ির বাড়িগুলোর মধ্যে এমনই একটি বাড়িতে থাকে সাইফুল ইসলাম পাঠান। পাঠান গোত্রনামটি ওর কোন পুরুষ থেকে শুরু তা সে নিজেও জানে না। বাবা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ খাদেমুল ইসলাম পাঠান --- দাদা দীন মোহাম্মদ পাঠান। সুতরাং সাইফুল ইসলামের পাঠান পদবীটা নিয়ে কোনও দ্বিধা-সংশয় ছিল না কখনও। আর এখন তো ওটা ওর মোক্ষম রক্ষাকবচ।

এই তো সেদিন, কি মাস যেন --- জুলাই-ই মনে হয়, বিকেলবেলা চকবাজারের মোড়ে এক পাকসেনার একেবারে মুখোমুখি। সাইফুলের বয়স তিরিশের মত হলেও দেখতে অনেক কম মনে হয়, মনে হয় ছাত্র, চালচলনে যথেষ্ট ধোপদুরস্ত। আর ছাত্ররা তো পাকিদের খুবই কুনজরে। পাকসেনা ওকে থামিয়ে সওয়াল করল : ঠেরো, ক্যায়া নাম হ্যায় তুমহারা? নাম শুনে ওরা প্রথমে সম্প্রদায়গত পরিচয়টা জেনে নেয়। তারপর অন্য পরিচয়।

নিঃশঙ্কচিত্তে জবাব দেয় ও : মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম পাঠান। পাকসেনা যেন একটু থতমত খেয়ে যায়, দেখতে বাঙালি আবার বলছে পাঠান, ঝুট বলছে না তো!

-- ঝুট বোল রাহে হো তুম, তুম স্টুডেন্ট হো আউর মুক্তি মালুম হোতা হ্যায়...

-- ঝুট কিউ বোলেঙ্গে, সাচ্ সাচ্ বোল রাহা হুঁ, একিন নেহি হোতা তো ডান্ডি কার্ড দেখিয়ে। পকেট থেকে আইডেন্টিটি কার্ড বার করতে নেয় সাইফুল। মহল্লার বিহারিদের সঙ্গে আড্ডা মেরে মেরে কাজ চালাবার মত উর্দু রপ্ত করে নিয়েছিল ও।

-- ডান্ডি রাখ দো। ইমানসে বোল রাহে হো তুম পাঠান? ঠিক হ্যায় তোমহারা পাতা লাগায়েঙ্গে, বলে পাকসেনা ওকে সঙ্গে করে হাজির হয় ধারে কাছেই এক কসাইর দোকানে। কসাইকে পুছ করে : ইসকো পেহচানতে হো তুম?

-- জি, কিউ নেহি, ইসকো তো হাম বহুত দিনোসে সাইফুল ইসলাম পাঠান নামসে জানোইস্...

কসাইর আধখেঁচড়া ভাষা পশতুন পাকসেনার পক্ষে বোঝা কঠিন, তবু লোকটার নামের শেষে যে পাঠান আছে এবং তা যে সত্যি সেকথা বুঝতে পারে। এবং যেহেতু পাঠান সেহেতু কোনও না কোনও সময়ে ওর আদি নিবাস ছিল পাখতুনিস্তানে, --- বর্তমান পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার যার একটা অংশ। কোমল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে পাকসেনা : গালতি হো গিয়া, তুম তো মেরা কওমকে লোগ হো ... আও চায়ে পিলে, বোন্দু ...।

সেই থেকে ও পাকবাহিনীর লোকদের ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত। পুরনোদের দোন্ত --- ডিউটি বদলে যারা নতুন আসে, যাবার সময় তাদের সঙ্গে দোস্তের পরিচয় করিয়ে দিয়ে যায় --- নতুনরাও দু’দিনেই দোস্ত।

পাঠানের আদিবাড়ি ময়মনসিংহের গফরগাঁও। গ্রামে ওর বাবার যথেষ্ট ভূসম্পত্তি, চকবাজারে ক্রোকারিজের পাইকারি ব্যবসা বহু বছরের। বাবার সঙ্গে সাইফুলও গদিতে বসত। মার্চ মাসের ক্র্যাকডাউনের পর বাবা-মা আর ছোট বোন দুটো শহর ছেড়ে চলে যায় গ্রামের বাড়িতে। এখন ওকে একাই দেখতে হয় দোকান, কর্মচারী আছে অবশ্য একজন, অনেক পুরনো, প্রায় ওর বাপের বয়সী।

বেচারাম দেউড়ির বাড়িটা ওর বাবা কিনে নিয়েছিল ভারত চলে-যাওয়া এক হিন্দু ভদ্রলোকের কাছ থেকে --- পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন সালের দিকে। তখন সাইফুল তের-চোদ্দ বছরের কিশোর। বড়সড় বাড়ি। তিনটা শোবার ঘর, বেশ বড় বসবার ঘর, সাথেই খাবার জায়গা, রান্নাঘর সংলগ্ন স্টোর, খাবার জায়গার দেওয়ালে বেসিন লাগানো, বেসিনের ওপর আয়না।

এমনিতে যথেষ্ট চালাক চতুর কিন্তু লেখাপড়ায় এগোতে পারেনি সাইফুল। ছোটবেলা থেকেই বই ওর কাছে বিছার মত ভীতিকর কিছু একটা বলে মনে হত, কেন তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। কোনও রকমে ম্যাট্রিক পাশ করার পর বাবা একসময় তার গুণধর পুত্রটিকে নিজের পাশে নিয়ে গদিতে বসাল।



ঊনসত্তরের শেষ দিকে চকবাজারে এক ব্যবসায়ীর কন্যার সাথে বিয়ে হয় সাইফুলের। অসামান্য রূপসী ছিল দুলহান্ --- বাপ-মা নামও রেখেছিল নূরজাহান। সাইফুল ডাকত নূরি। একাত্তরের এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে, ওর পরিবার শহর ত্যাগ করে চলে যায় গফরগাঁও। এতবড় বাড়িতে তখন লোক মোটে দুজন --- সাইফুল ও নূরজাহান। একটা ঠিকে ঝি অবশ্য সকালে আসে, কাজ সেরে দুপুরেই চলে যায়। একদিন সন্ধ্যায় বাসায় ফিরে সাইফুল দেখে ঘরদোর তছনছ --- নূরি উধাও। খোঁজ নিয়ে জানে, পাকসেনাদের ক’জন ওর বাসায় ঢুকেছিল। এ-ক্যাম্প ও-ক্যাম্প পাগলের মত ঢুঁ মেরেছে নূরির খোঁজে --- পায়নি কোথাও। হ্যাঁ, নূরিকে পেয়েছিল দিন দশেক পর, নূরির মতই মুখের আদল, বিবস্ত্র শরীর থেকে খুবলে খুবলে মাংস ছিড়ে খেয়েছে শেয়াল-কুকুরে, সোয়ারিঘাটের কাছে নদীর চরে পড়েছিল নূরি, নূরিই হবে--- মুখটা একেবারে বিকৃত হয়নি তখনও। সেই চিকন জোড়া ভুরু, হিন্দি ছবির নায়িকা মধুবালার মত ঠোঁট, ঠোঁটের বামদিকে তিল বিবর্ণ মুখের ওপর তখনও স্পষ্ট দেখা যায়। ঘটনার পর অনেকদিন অস্বাভাবিক ছিল সাইফুল। তারপর খুব কষ্টে নিজেকে স্বাভাবিক করে তুলেছিল --- এতটাই স্বাভাবিক যে নিজের কাছেই অস্বাভাবিক ঠেকেছিল সেই স্বাভাবিকতা।



২.

সাইফুলের বাসার সামনে একটা বেবি ট্যাক্সি এসে থামল। ট্যাক্সি থেকে নেমে চাদরমুড়ি-দেওয়া মাঝারি আকৃতির একজন লোক দ্রুত ওর বাসায় ঢুকল। রাত আটটা হবে। ধারে কাছেই কোনও দোকানে রেডিয়োতে খবর হচ্ছে। দোকানের সামনে লোকজনের জটলা । ঘরের ভেতর ঢুকে লোকটি তার চাদর খুলে বিছানার ওপর রাখতেই ওটার নিচে লুকিয়ে থাকা স্টেনগানটার কালো শরীর ষাট পাওয়ারের বাল্বের আলোয় চিকচিক্ করে উঠল।

-- খবর কি মোতালেব? সব ঠিকঠাক আছে তো ... জিজ্ঞেস করে সাইফুল।

-- হ্যাঁ, বড্ড খিদে পেয়েছে রে, সারাদিন পেটে তেমন কিছু পড়েনি। কিছু খেতে দে, আছে তো? দুহাতে তালু ঘষতে ঘষতে বলে মোতালেব। মারুফ বাহিনীর একজন গেরিলা। আসামের তেজপুর থেকে স্পেশাল গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে মাসখানেক হল দেশে ঢুকেছে।

সাইফুল খাবার সাজিয়ে দেয় টেবিলের ওপর।

বিস্মিত চোখে সাইফুলের দিকে তাকায় মোতালেব, মুখে ভাত নিয়ে বাঁধো বাঁধো গলায় জিজ্ঞেস করে : কী রে, ব্যাপার কী? এ-তো দেখছি নান্না বাবুর্চির রান্না, কে পাকিয়েছে রে?

-- জামিলের বউ, জামিলকে তোর চেনার কথা নয়। লেখাপড়ায় খুব ভাল ছিল। এমএ পাশ করে এক পত্রিকায় ভাল চাকরি করত --- এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে ...আমার জিগরি দোস্ত...

-- তারপর?

-- আজ বউ নিয়ে এসে উঠেছে এখানে। ভালোই হল, বাড়িটা এখন বাড়ির মত হল...

কথা শেষ হতে-না-হতেই তাঁতের শাড়ি-পড়া ফর্সামত এক মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। বয়স পঁচিশ পেরোয়নি বলেই মনে হয়, কেমন মায়া মায়া চোখের চাউনি।

-- পরিচয় করিয়ে দেই, আমার বন্ধু মোতালেব। আর ইনি হচ্ছেন যার কথা তোকে বললাম ...

-- তা তোর জামিল সাহেবটি কোথায়?

-- বাইরে গেছে, ফিরে আসবে একটু বাদেই ...

একটু পরেই জামিল এল। পরিচয় হল মোতালেবের সঙ্গে। ঘিয়ে হাওয়াই শার্ট আর কফিরং পাতলুনে বেশ মানিয়েছে জামিলকে। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মাঝারি আকারের হ্যাংলা-পাতলা দেহ। মুখে ব্রণের দাগ এতই গভীর যে দেখলে মনে হয় বসন্তের। চোখে পুরু ফ্রেমের চশমা। লেন্সের ওপিঠে-থাকা ভাসাভাসা চোখদুটোই সাক্ষ্য দেয় ওর তীক্ষ্ণ মেধার। সাইফুলের বন্ধু হলেও জামিলকে ওর থেকে বেশি বয়সী মনে হয়; কপালে এরই মধ্যে ভাঁজ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোবার পর প্রায় পাঁচ বছর তো কাটলই সাংবাদিকতা করে --- সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের সংস্পর্শে। ওই মহলের বেশির ভাগই বয়সে ওর চেয়ে অনেক বড়, কিন্তু তাতে কি, ওকে সমীহের চোখে দেখে সবাই। ব্যাপক পড়াশোনা আর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ক্ষমতা ওর। বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, এর অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব, অবশ্যম্ভাবী পরিণতি জামিলের নখদর্পণে। সত্তরের নির্বাচনের পর থেকে, উহুঁ, তারও আগে ছেষট্টির ৬ দফা আন্দোলন থেকে ওর কলমে বাঙালির স্বাধিকারের ওপর যেসব লেখা বেরিয়েছে তার অবদান কম নয় আজকের এই অবস্থায় আসার পেছনে। হাতেগোনা কজন দুঃসাহসী কলম-সৈনিকের মধ্যে জামিল একজন।

সাইফুল জামিলকে বলে : মোতালেব আমার বাল্যবন্ধু --- মুক্তিযোদ্ধা ...

-- গ্ল্যাড টু মিট ইউ, হাত বাড়িয়ে দেয় জামিল।

একটু অপ্রতিভ মোতালেব হাত ঝাঁকায় জামিলের নরম তালুতে নিজ তালু চেপে ধরে।

-- কোথায় ট্রেনিং আপনার? হাল্কা সুরে জানতে চায় জামিল।

-- আসামে, আসামের উঁচু উঁচু পাহাড়ে অনেকদিনের ট্রেনিং নিয়েছে ও, ওখানে কত অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটেছে, সব শুনবি আস্তে আস্তে সাইফুলই বলে ওঠে মোতালেব মুখ খুলবার আগেই।

-- বেশ, ভালই হল। আপনার বিচিত্র অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে আসবে আমার।

-- ও হ্যাঁ, মোতালেব, জামিল আবার একজন নামজাদা সাহিত্যিকও। বেশ কটা বই বেরিয়েছে ওর, প্রবন্ধ আর কবিতার বই ... কটা জানি রে?

-- তিনটা। ওকথা থাক, মুক্তিযুদ্ধের উপর একটা বই লেখার পরিকল্পনা আছে। এমন এক বই যা হবে মুক্তিযুদ্ধের নিখাদ এবং বিস্তারিত দলিল। বহুবছর থেকেই তো ডায়রি লেখার হ্যাবিট ; বিশদ বিবরণ থাকবে বায়ান্ন থেকে...

-- তোর কথা শুনে মনে হয় যুদ্ধে আমরা জিতেই গেছি...। সাইফুল বলে।

-- সন্দেহ আছে নাকি তোর? কাপড় পাল্টাতে পাল্টাতে জামিল বলে। ঠোঁটের কোণে হাসির অস্পষ্ট রেখা।

সেই মেয়েটি ঘরে ঢুকে তাগাদা দেয় : কথা পরে বলা যাবে’খন, এখন হাতমুখ ধুয়ে মুখে দুটো দেওয়া হোক ...।

মেয়েটার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি হেসে জামিল বলে : ঠিক আছে আলেয়া, আমি এক্ষুনি রেডি হয়ে নিচ্ছি, টেবিলে খাবার দিয়ে দাও ...।

মোতালেব জামিল আর আলেয়ার দিকে তাকায়। স্বামী-স্ত্রীতে যতটা স্বাভাবিকতা থাকার কথা, মনে হয় কোথায় যেন তার কিছুটা ঘাটতি আছে। ও কিছু না, নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। তাছাড়া ওদের দুজনের কাছে মোতালেব একেবারে নতুন তো।

মোতালেবও এক ব্যবসায়ীর ছেলে। আগামসি লেনে ওর বাপের ব্যবসা --- রড-সিমেন্টের দোকান। একই মহল্লায় বসবাস, একই খেলার মাঠে খেলাধুলো, হৈ-হুল্লোড় --- হাফপ্যান্ট-পরা বয়স থেকেই সাইফুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের একজন মোতালেব। আরমানিটোলা স্কুলে পড়ত ও। স্কুল পেরিয়ে জগন্নাথ কলেজ --- ওখান থেকেই গ্রাজুয়েশন। তারপর চলে গিয়েছিল চাটগাঁয় ওর এক আত্মীয়র মিলে --- রিরোলিং মিল। কাজ শেখা এবং সেই সাথে আয়-রোজগার। ষোলশহরে ছিল রিরোলিং মিলটি আর মিলের কাছেই মেসে থাকত মোতালেব। মেসের অদূরে বাংলো টাইপের সেমিপাকা বাসায় যে মেয়েটি থাকত তার কথা মনে এলে এখনও কেমন যেন হয়ে পড়ে মোতালেব।

চাটগাঁর সেই আট-ন’ বছরের স্মৃতিগুলো কোনওটা আবছা, কোনওটা-বা ঝকঝকে ছবির মতন এখনও মনের দেওয়ালে থরে থরে ঝুলে আছে।

মার্চ মাসের আগুনঝরা দিনগুলোর জীবন্ত দৃশ্য মোতালেবের মনে উঁকি দেয়। তেসরা মার্চ-এর গণপরিষদের অধিবেশন বাতিল...সব পত্রিকার ব্যানার হেডলাইন। সকাল থেকেই চট্টগ্রাম শহর বঙ্গোপসাগরের জলোচ্ছ্বাসের মত ফুঁসে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ জনগণের ক্ষোভের বারুদে স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়। স্বতঃস্ফূর্ত জঙ্গি জনস্রোত, গগন-বিদীর্ণ-করা শ্লোগান, মিটিং-মিছিল। প্রতিরোধ গড়ে তোলে নিরস্ত্র জনতা। একসময় খবর আসে, চিটাগাং ক্যান্টনমেন্টে বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা স্বাধীনতার লড়াইয়ে যোগ দিয়েছে। নিরস্ত্র জনতার মনোবল চাঙা হল। যাক্, বাঙালি আর্মি তাহলে খোলাখুলি মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়েছে।

পাকবাহিনীর নির্বিচার হত্যা --- বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ; দু’তিন দিনের মধ্যেই বোঝা গেল, এভাবে টেকা যাবে না। অযথা জান খোয়াবার কোনও মানে হয় না --- সিদ্ধান্ত হল শহর ছেড়ে পালানোর; প্রথমে কর্ণফুলী পেরিয়ে দক্ষিণে পিছু হটা, তারপর একসময় উত্তরে উজিয়ে বর্ডার পার। আগরতলা। আগরতলায় কিছুদিন কাটিয়ে ট্রেনিঙের জন্য তেজপুর। তেজপুর শহর থেকে ট্রেনিং ক্যাম্প খুব একটা দূরে ছিল না। ক্যাম্পের জায়গাটা সমতল, কাঁটাতারের ঘেরাও, বাইরে ডোবা-জলা, পাটখেত। আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে বহুদূরের বরফ-ঢাকা পর্বতচুড়ো দেখা যায়, সূর্যকিরণে চিকচিক করে। গ্রেনেড থ্রোয়িং, অ্যামবুশ, এক্সপ্লোসিভ ডেটোনেশন এসব হাতেকলমে শিখতে চলে যেতে হত পাহাড়ে। এক পাহাড়ের নাম ছিল ভালুকপং। পাহাড়ের চুড়ো থেকে নিচে মেঘ দেখা যেত। মেঘের দলেরা ভেসে যেত --- ভেসে যেত পাহাড়ের গা ছুঁয়ে, অরণ্যানীর দেহ সিক্ত করে।



৩.

দেওয়ালে লাগানো আয়নার সম্মুখে দাঁড়িয়ে বাংলা সিনেমার একটা গান গুনগুন করে গাইছিল আর চুলে খোঁপা বাঁধছিল আলেয়া। খোঁপা বাঁধার সময় যখন দুহাত ওপরে তুলছিল তখন আঁচল সরে যাওয়ায় ওর সুগঠিত স্তন আর শরীরের বাঁক স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। হঠাৎ ঘরে ঢুকতে গিয়ে গলাখাঁকারি দেয় মোতালেব। ঘাড় বাঁকিয়ে তাকায় আলেয়া, মুখে সলাজ হাসির রেখা।

-- তা ভাবি কি বাইরে যাবেন? সাজগোজ করছেন মনে হয়, বলে মোতালেব।

-- ঘরে থাকলে কি চুল বাঁধতে নেই? বাইরে যা অবস্থা, যাব কোথায়? যাওয়ার জায়গা কই?

-- ঠিকই বলেছেন। বাইরে বেরোনোই তো এখন খুব রিস্কি ... কাল পাকবাহিনী হোসনি দালানের কাছে দুইজন নিরীহ লোক মেরেছে। আমি জানি ওরা সাতেও নেই পাঁচেও নেই, নিরীহ মানুষ, কাগজের ঠোঙা বানিয়ে বেচত।

-- এখানে থাকাও কি ঠিক? আমার কেন জানি ভয় ভয় লাগে...

-- ভয়ে গান বেরোয় বুঝি? হেসে ওঠে মোতালেব।

-- ভয় তাড়ানোর জন্য গান খুবই ভাল ওষুধ, বলে আলেয়া।

-- তা আপনার গলায় সুর আছে, গানের চর্চা করলে ......

-- রুনা লায়লার মত গাইতে পারতাম, নাকি? মোতালেবের কথার পিঠে কথা জুড়ে দেয় আলেয়া : কী পিচ্চি মেয়ে অথচ কী গলা, নূরজাহান নাকি হিংসা করে ...

-- হিংসা করাটাই তো স্বাভাবিক। ওরা বাদশা আর আমরা বঙ্গালরা ওদের প্রজা --- ভাবখানা তো এমনই। প্রজা হয়ে টপকে যাবে, সহ্য করা যায়!

-- কি মনে হচ্ছে আপনার, আর কতদিন লাগবে ঐ হারামজাদাদের দেশছাড়া করতে?

-- আমি তো সাধারণ এক গেরিলা, এসব জামিল ভাই ভাল বোঝেন ...। ওকে জিজ্ঞেস করলেই পারেন ...।

-- অ। কেমন এক দৃষ্টি আলেয়ার। দৃষ্টিতে মমতা, শ্রদ্ধা নাকি অন্য কোনও কিছুর ছোঁয়া!

জামিল সেই যে সকালে বেরিয়েছে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল ফেরার নাম নেই। অবশ্য যাওয়ার সময় বলেছিল, ফিরতে দেরি হতে পারে, দূরে কোথায় নাকি যাবে, কোন এক বন্ধুর কাছে কিছু পয়সাকড়ি জোগাড় করতে।

জামিলের বিলম্ব এক পর্যায়ে উদ্বিগ্ন করে তুলল সবাইকে। রাত পেরিয়ে পরদিন বিকেল, দেখা নেই জামিলের। আলেয়া বারবার উঁকি দেয় পথের দিককার জানালায়। রাজ্যের বিষণ্নতা এসে ভর করে ওর চোখেমুখে। মোতালেব সকালে বেরিয়ে গেছে --- একা ঘরে অস্বস্তির বোঝা আরও চেপে বসে আলেয়ার বুকে। সন্ধ্যার দিকে সাইফুল খবর নিয়ে আসে। জামিল এক লোকের হাতে চিরকুট পাঠিয়েছে, ফিরতে তিন-চারদিন লেগে যেতে পারে। আলেয়ার খেয়াল রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। যাক্, আশ্বস্ত হওয়া গেল, দেরি এই যা, বিপদ-আপদ হয়নি কোনও!

সাইফুল হাতে-ধরা প্যাকেটটা আলেয়ার দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল: আপনার জন্য, ভাবি।

বিস্মিত আলেয়া: আমার জন্য কী?

-- শাড়ি, দেখেন পছন্দ হয় কি না। পছন্দ না হওয়ারই কথা, অনেক দিন কিনি না তো ...।

শাড়ি দেখে আলেয়ার মুখে খুশির ঝিলিক : ওম্মা, কী সুন্দর! পছন্দ হবে না মানে! এত দামি শাড়ি কমই পরি আমি ...।

-- জামিল কি শাড়ি দিতে কিপটেমি করে? মৃদু হেসে বলে সাইফুল। শাড়িটা পছন্দ করায় মনে মনে পুলক বোধ করে।

সাইফুলের জন্য বুকের ভেতর কেমন করে ওঠে আলেয়ার। আহা রে, অল্প বয়সে লোকটা কেমন একা, দু’বছর ঘরসংসার করার পর একা! পুরুষেরা কি পারে, নারীর শরীরে শরীর ঢোকাবার অভ্যেস হওয়ার পর তা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে? কী জানি! অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক আছে কিনা কে জানে!

দরজার কড়া নাড়ার শব্দ। খুলে দিতেই ত্রস্তে ঘরে ঢোকে মোতালেব, দুহাতে দুটো চটের ব্যাগ। রীতিমত ঘেমে গেছে ও। কপালে-জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম হাতের চেটোতে মোছে।

-- বাজার করে আনলি নাকি? সকৌতুক প্রশ্ন সাইফুলের।

-- হুঁ, আনারস, নতুন চালান...। সাবধানে কোথাও রাখ্। বলে আলেয়ার দিকে একটু বিরক্তি নিয়ে তাকায় মোতালেব। মেয়েটাকে ও ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। এমনিতেই মেয়েদের ব্যাপারে ওর ধারণা খুব একটা ভাল নয়, হাল্কা স্বভাব আর মুখ পাতলা, --- বেশির ভাগ মেয়ের এ দোষ তো আছেই। জামিলের বউ, জামিলের দীর্ঘ এক সংগ্রামী ইতিহাস আছে বুদ্ধিজীবী হিসেবে --- এই যা ভরসা। জামিলের স্ত্রী জামিল না হোক কাছাকাছি তো হবে। তারপরও ...।

-- তোর চোখ-মুখ কেমন দেখাচ্ছে, শরীর খারাপ করে নাই তো? সাইফুল বলে।

-- যা পরিশ্রম গেল, জ্বরজ্বর লাগছে... ঠিক হয়ে যাবে লম্বা একটা ঘুম দিলেই। ঝটপট দু’মুঠো মেরে ঘুম... লম্বা ঘুম...।

-- ঘাম দিয়ে জ্বর নামে। তোর তো দেখছি উল্টো ...। এক চিলতে হাসি সাইফুলের ঠোঁটে।

-- হেভ্ভি এক অ্যামবুশ মারলাম দোস্ত। এত পাকি এর আগে একসাথে শিকার করার সুযোগ কখনও আসেনি।

-- কটা পাখি মারলি?

-- গুনবার সময় কোথায়, মারো এবং পালাও, হিট অ্যান্ড রান। পরে লোকের মুখে শোনা, নয়জন ...।

ওদের কথার মাঝখানে কখন আলেয়া হেঁশেলে গেছে, রান্নাবান্নার কাজ শুরু করেছে কেউ টের পায়নি। ছ্যাচ্ করে শব্দ হওয়ায় টের পেল, ডালে সম্ভার দিচ্ছে আলেয়া।



৪.

লম্বা ঘুম দিল ঠিকই কিন্তু লাভ তেমন কিছুই হল না। জ্বর ছাড়ল না মোতালেবের। মেজাজ তিরিক্ষি, শালার রোগ-ব্যাধি বাধবার আর সময় পেল না! এমনিতেই প্রতিমুহূর্তে বিপদের আশঙ্কা তার ওপর অসুখ। সকাল থেকেই মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে আলেয়া। পানিও ঢেলেছে ক’বার। জ্বর নামে --- আবার চড়ে যায়। মোতালেব কিছুটা কুণ্ঠা বোধ করেছে। মৃদুস্বরে বলেছে : এমনিতেই সেরে যাবে, আপনার অতো কষ্ট করার দরকার নেই ভাবি ...।

মোতালেবের কথায় পাত্তা দেয়নি আলেয়া। জলপট্টি, শরীর মুছে দেওয়া এগুলো করেই গেছে পরম যত্নে। দিন তিনেক ভোগাবার পর জ্বর নামে। জ্বর গেলেও মুখের তেতো ভাবটা তো রয়েই গেল। সাইফুল এটা-ওটা এনে দেয়, আলেয়া মোতালেবের পছন্দের খাবার তৈরি করে।

-- আচ্ছা একটা প্রশ্ন করি, কিছু মনে করবেন না তো, আপনি তো সাইফুল ভাইয়ের বন্ধু, তাই না? মোতালেবের সিথানে বসে আলতোভাবে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে জিজ্ঞেস করে আলেয়া।

মোতালেব আশ্চর্য হয়। জামিলের সঙ্গে ওর পরিচয় হল এই সেদিন। তার স্ত্রী, প্রথম যাকে দেখে মনে হয়েছিল জড়তার আড়ত, হঠাৎ এ কদিনের মধ্যেই এত কাছাকাছি ... ।

-- কী, কথা বলছেন না যে? আবার প্রশ্ন আলেয়ার।

-- ওহ্, হ্যাঁ, আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছোটকাল থেকে, কিন্তু এ প্রশ্ন কেন?

-- সাইফুল ভাইয়ের না হয় বুঝলাম একটা দুর্ঘটনা ... মানে জীবনের দুর্ঘটনা ... কিন্তু আপনার? আপনি এখনও একলা ...!

-- উহ্ ...! মুখ কুঁচকে শব্দ করে মোতালেব, জ্বরের মধ্যে যেমন করত, কিছু বলে না। বলতে ইচ্ছে হয় না যে, মেয়েদেরকে ও ভাল চোখে দেখে না। বলতে ইচ্ছে করে না, ষোলশহরের যে মেয়েটিকে ভালবেসেছিল পাগলের মত, মেয়েটিও বলেছিল, ওকে ছাড়া অন্য কাউকে ভালবাসবার কথা ভাবতেও পারে না; অথচ কী আশ্চর্য, একদিন নির্দ্বিধায় সে চলে গিয়েছিল অন্য এক ধনীর ঘরে। এখন দু’কন্যা এক পুত্রের জননী --- সুখী গৃহিণী!

আলেয়া যে একেবারে কিছুই বোঝে না তা নয়। মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে কিছু একটা আছে বোধহয়। আর তা দিয়েই সে আঁচ করে, মোতালেবের মনের গহিনে কোনও একটা ক্ষত আছে যা ওকে জীবনের একটি দিক থেকে আড়াল করে রেখেছে।

মোতালেব অসুস্থ হওয়ার পর গত তিনদিন আলেয়ার ওপর কম ধকল যায়নি। সেবাযত্ন, রাতে বারবার এসে জ্বর দেখে যাওয়া, কখনও জলপট্টি দেওয়া --- ঘুমোনর সময় খুব কমই পেয়েছে। মোতালেবের মত সাদামাটা একজন মানুষের জন্য এত দরদ হওয়ার মানেটা কি? আলেয়া নিজেকে প্রশ্ন করে। তাহলে! তাহলে কি দেশের রাজনীতির ভূত আমার ঘাড়েও ভর করেছে! স্বাধিকার --- স্বাধীনতা কী সব কথা জামিল বলাবলি করে। ওর কথায় জাদু আছে। যখন লড়াই-সংগ্রাম নিয়ে কথা বলে, শরীরের রক্ত তেতে ওঠে, যখন পাকবাহিনীর নির্মমতার বিবরণ দেয়, গায়ের পশম কাঁটা দিয়ে ওঠে, যখন আক্রান্তের আহাজারির কথা বলে, বুক ঠেলে কান্না আসে। কথা বলতেও জানে লোকটা! এত গুছিয়ে কথা বলতে কাউকে কখনও দেখেনি আলেয়া। ওকেও কি ওগুলোর নেশায় পেয়ে গেল? কিছু বোঝে না। মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে কখন যে মোতালেবের মাথার পাশেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে টেরও পায়নি।

আলেয়ার মাথার চুল মুখে এসে পড়ায় মোতালেবের তন্দ্রা ছুটে যায়। চুলের গন্ধ --- আলেয়ার নিশ্বাসের গন্ধ --- মাথার ওপর এলিয়ে থাকা হাত --- কেমন এক ঘোরের মধ্যে চলে যায় ও। দুর্বল শরীরটা খুব আলগোছে তুলে কনুইয়ে ভর রেখে কী জানি কী মনে করে চেয়ে থাকে ঘুমন্ত আলেয়ার মুখের দিকে। ভোরের শিশির-ধোওয়া চাঁপা ফুলের পাপড়ির মত পেলব --- নিষ্পাপ দেখাচ্ছে মুখখানা। মায়ের মুখ স্মরণ করবার চেষ্টা করে মোতালেব, ছোটকালে মারা গিয়েছিল মা, সময়ের পলি চাপা-পড়া সে মুখ ভাল করে এখন আর স্মৃতিতে আসে না।



৫.

এখন যথেষ্ট সুস্থ মোতালেব। সকালে বেরিয়ে গেছে দলের লোকদের সঙ্গে দেখা করতে। বেশ কদিন কোনও যোগাযোগ নেই। বেরোবার আগে অবশ্য আলেয়াকে বলেছে : সাইফুল এলে বলবেন আমি ৬১৯ নম্বর কায়েতটুলি, এটুকু বললেই বুঝবে। মনে থাকবে তো?

বাইরে আজ বেশিক্ষণ থাকে না। দুপুরের আগেই ফিরে আসে বাসায়। বাসা --- ঘর; ঘর এখন মনে হয় টানে ওকে। অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন নিজের মধ্যে অনুভব করে মোতালেব। ওকে তাড়াতাড়ি ফিরতে দেখে আলেয়ার মুখে আনন্দের সূক্ষ্ম অভিব্যক্তি মোতালেবের চোখ এড়ায় না।

-- কী, কাজ হল? শরীর এখনও দুর্বল, বিশ্রাম দরকার আপনার ...

মোতালেব কোনও কথা বলে না। কাপড়চোপড় ছেড়ে বিছানায় সটান শুয়ে পড়ে। শরীর আসলেই এখনও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি। একটু হাঁটাহাঁটি করলেই ক্লান্তি এসে ছেঁকে ধরে।

বিকেলে সাইফুল এল। চেহারায় দুশ্চিন্তার ছাপ, জামিল তিন-চারদিনের কথা জানাল, অথচ আজ সাত দিন। এত দেরি হচ্ছে কেন বুঝে ওঠে না সাইফুল। মোতালেবের সাথে এ ব্যাপারে কথা বলে, আলেয়ার সঙ্গেও।

-- কেন জানি মনে হচ্ছে আপনার বন্ধু বিপদে পড়েছে, ছলছল চোখে সাইফুলের দিকে তাকিয়ে বলে আলেয়া।

-- কাল যে করেই হোক ওর খোঁজ নেব, চিন্তা করবেন না ভাবি। সাইফুল আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে আলেয়াকে।

কিন্তু শতচেষ্টা করেও জামিলের চিন্তা মাথা থেকে তাড়াতে পারে না আলেয়া। রাতে নিজের কক্ষে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে। একসময় চাপা সুরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। রাত অনেক প্রহর। মোতালেব গভীর ঘুমে ডুবে আছে। সাইফুল বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে আলেয়ার দরজায় টোকা দেয়। দরজা খুলে যায়। কিছু বুঝে উঠবার আগেই সাইফুলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফোঁপাতে থাকে আলেয়া। ভড়কে যায় সাইফুল, বিব্রত বোধ করে। কণ্ঠলগ্না আলেয়ার শরীরের ভার অনুভব করে ও। মহাবিপদে পড়া গেল তো! বেহুঁশ হয়ে পড়ল নাকি মেয়েটা! আলেয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়ে ওর মুখের দিকে তাকায় সাইফুল। চলে আসতে যাবে, ঠিক তখনই আচমকা হ্যাঁচকা টানে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ও আলেয়ার ওপর। আলেয়ার উষ্ণ নিশ্বাস ওর বুকে-মুখে আছড়ে পড়তে থাকে। কেমন এক নেশার গহ্বরে তলিয়ে যেতে থাকে সাইফুল --- তলিয়েই যেতে থাকে।

অস্ফুট উহ্-আহ্ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মোতালেবের। কিসের শব্দ! কোথা থেকে আসছে! ঠাওর করতে ক’মিনিট লেগে যায় ওর। তারপর আলেয়ার কক্ষের ভেজানো দরজার ফাঁকে চোখ ফেলতেই বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে পড়ে সে। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে, তাকিয়ে থাকে প্রায়ান্ধকার কক্ষের ভেতর। মানব-মানবীর আদিম শারীরিক খেলা চলছে সেখানে। সাইফুল যেন দীর্ঘদিনের অভুক্ত এক হিংস্র পশু --- আলেয়ার সারা শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে খেয়ে চলেছে পৃথিবীর সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে।

সরে আসে মোতালেব। গা ঘিন ঘিন করতে থাকে ওর। ছিঃ, এত নোংরা মেয়ে ও, স্বপ্নেও ভাবেনি --- আর সাইফুলটারও কি বোধশোধ লোপ পেল! জামিলের খোঁজ নেই অথচ দেখ কী দিব্যি মাস্তিতে মেতে আছে ওর সতী স্ত্রী আর জিগরি দোস্ত দুজনাতে মিলে। এখানে আর থাকা চলে না --- একেবারেই না। কিন্তু যাবে কোথায়? এমন নিরাপদ আশ্রয় পাবে কোথায়; আর জিনিসপত্রগুলো সরানো কি সহজ কাজ! কী করবে ভেবে পায় না মোতালেব। খট্ করে শব্দ হয়; মোতালেব বোঝে, সারারাতের জন্য আলেয়ার রুমের ছিটকিনি বন্ধ হয়ে গেল।

৬.

বেশ দেরিতেই ঘুম ভাঙল মোতালেবের। রাতের ঘটনাকে দুঃস্বপ্ন মনে হল তার। দুঃস্বপ্নই হবে হয়ত, দুর্বল শরীর, দুঃস্বপ্ন দেখতেই পারে। চেষ্টা করে ঝেড়ে ফেলতে রাতের সে স্মৃতি।

আলেয়া দিব্যি খাবার টেবিলে নাস্তা সাজিয়ে দিয়েছে। ওর জন্য একটু বেশি বেশি খাবার, নিত্যদিনের মত সবকিছু। সবকিছু নিত্যদিনের মত, মাঝখানে ঝুলে আছে বড়ই বেখাপ্পাভাবে শুধু গতরাতের স্মৃতি।

নাস্তা সেরে বেরোবার প্রস্তুতি নিচ্ছে মোতালেব। আলেয়া স্বাভাবিক গলায় বলে : আজ আবার বেরোতে হবে? তাড়াতাড়ি ফিরতে চেষ্টা করবেন, মনে থাকবে তো? যতক্ষণ বাইরে থাকেন খুব দুশ্চিন্তায় থাকি। সাবধানে থাকবেন ...।

আলেয়ার কথাগুলো ঠাট্টার মত কানে বাজে মোতালেবের। আহা কী দরদ! কোনও কথা না বলে বেরিয়ে পড়ে বাসা ছেড়ে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে আপন মনে বিড়বিড় করে সাইফুল: কী, বেরিয়ে গেল গেরিলাটা। আহা কী যে ছেলে, আমি যদি ওর মত হতে পারতাম। আমার নূরির আত্মা শান্তি পেত ... নূরজাহান, আমার নূরি ...। গতরাতের ঘটনা ওর মধ্যে কেমন এক অনুভূতির জন্ম দিয়েছে; আলেয়ার মুখোমুখি হতে, কথা বলতে বাধোবাধো ঠেকছে। চোখে চোখ রাখতে কেমন অস্বস্তি! কিন্তু আলেয়ার তেমন কোন ভাবান্তর নেই। প্রতিদিনকার মতই স্বাভাবিক! হেট-মাথা সাইফুল আলেয়াকে উদ্দেশ করে বলে: আজ অবশ্যই জামিলের খোঁজ নেব --- অবশ্যই। ও কোথায়, জানতেই হবে। কেনই-বা এত দেরি করছে ফিরতে ...।

নাস্তার পাট চুকিয়ে বেরোতে যাবে এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। কপাট খুলতেই দেখে সম্মুখে জামিল। উষ্কখুষ্ক চুল, খোঁচাখোঁচা দাড়ি, চোখের নিচে কালচে দাগ, রোগাটে মুখে আঘাতের চিহ্ন। ফ্যালফ্যাল তাকিয়ে আছে ও সাইফুলের দিকে। জামিল একা নয়, ওর সঙ্গে আরও জনাপাঁচেক, দুজন কালো চামড়া, তিনজন ধবধবে ফর্সা, চাইনিজ রাইফেল আর এসএমসি হাতে। জামিলের হাত পেছনমোড়া করে বাঁধা। কোমরে সজোর এক লাথি, টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ও ঘরের মেঝেতে।

চাইনিজ হাতে এক পাকসেনা সাইফুলকে লক্ষ করে গর্জে ওঠে: সালে গাদ্দার, গিদর কা বাচ্চা, তুম মুক্তি হোকে ধোঁকা দিয়া হামলোগোকো ... বেহেনচোৎ ....

মিনমিনে গলায় সাইফুল পাঠান বলে: কেয়া বাকোয়াস কার রাহে হো দোস্ত...

ওর কথা শেষ হবার আগেই আবার হুংকার: দোস্ত তোমহারা গার মে ঘুসা দেঙ্গে সালে... । মুক্তি কাহা হ্যায় বোল, মুতালিব কাহা হ্যায়? ইসনে (জামিলের দিকে ইঙ্গিত করে), ইস কুত্তেনে সব কুছ বাতা দিয়া...

-- মোতালিব, মোতালিব কোউন? মোতালিব নামকে কোই নেহি রেহতা এহা। ত ত করে বলে সাইফুল।

মেঝে থেকে কোনওমতে উঠে দাঁড়ায় জামিল। ওকে লক্ষ করে বলে ওঠে পাকসেনা: তুম পুছো উসকো, বোলো কাহা হ্যায় মুতালিব ...

শ্লেষ্মাজড়ানো ফ্যাসফ্যাসে গলায় জামিল বলে: এখানেই থাকে। সাইফুল বলে দে কোথায় মোতালেব, বলে দে...

সাইফুল বুকটান করে গলা ছেড়ে বলে ওঠে: মোতালেব বলে কেউ এখানে থাকে না।

-- বলে দে সাইফুল মোতালেব কোথায়, না বললে ওরা তোকে মেরে ফেলবে...। কাতর কণ্ঠে অনুনয় জামিলের।

-- মোতালেবকে আমি চিনি না, নেহি জানতা মোতালেবকে বারে ...।

-- নেহি জানতা? আবার হুংকার এসএমসি হাতে পাকসেনার।

-- নেহি... নেহি... নেহি...। দৃপ্তকণ্ঠে সাইফুলের জবাব।

এসএমসির কালো মুখ থেকে সশব্দে কি যেন বেরিয়ে আসে। সাইফুল মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।

এবার আলেয়ার দিকে এগিয়ে যায় পাকসেনা ও তাদের দোসররা।

-- বাহুত খুবসুরাত আওরাত, কেয়া নাম হায় তেরি? --- ব্যঙ্গ মেশানো হাসি হেসে চাইনিজধারী এক পাকসেনা আলেয়াকে হ্যাঁচকা টানে সম্মুখে নিয়ে আসে।

-- আলেয়া। নিরুদ্বেগ গলায় জবাব দেয় ও।

-- ইসকো পেহ্চানতি হো? জামিলকে দেখিয়ে বলে পাকসেনা।

-- ইয়ে হামার সোয়ামি হ্যায়...। আলেয়ার জবাব।

-- নেহি সাব, ও আমার ওয়াইফ নেহি ... ও এক বেশ্যা ... প্রসটিটিউট। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলে জামিল।

স্তম্ভিত আলেয়া --- কী বলছে জামিল! নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ওর।

-- ক্যায়া আলিয়া বেগম, এ ঠিক বোল রাহা হ্যায়, তুম তাওয়ায়েফ হো ... বেইস্যা? রসালো গলায় বলে ওই পাকসেনাটা। ক’মুহূর্ত নীরবতা। আলেয়া কী বলবে। মুখে কথা জোগায় না ওর।

-- চুপ কিউ? কুছ তো কাহো। বাত ইয়ে সাচ ইয়া ঝুট...

-- হ্যাঁ, বেশ্যা ... ওই ধ্বজভঙ্গ ছাম্বাদিকের পেয়ারের বেশ্যা...। মুখ বিকৃত করে জামিলের দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট গলায় বলে ওঠে আলেয়া। ওর চোখে ঘৃণার আগুন।

-- ওয়াহ্, কেয়া আচ্ছি আওরাত, সাচ্ বাত বোলনে সে ইনকার নেহি! তাওয়ায়েফ মাগার আচ্ছি আওরাত। তো মহাতারেমা আব হামলোগোকো মেহেরবানি করকে মুতালিব কা পাতা বাতা দিজিয়ে...।

-- হামি মুতালিবকে নেহি চিনতা, মুতালিব কে হ্যায়?

-- ঠিক হ্যায়, মুতালিব কোউন হ্যায়, কাঁহা হ্যায় জরুর পাতা মিলেগা...। পাকসেনা ও তাদের সঙ্গে-আসা কালো চামড়ার লোকগুলো বাসা তল্লাশি শুরু করে। রান্নাঘরের লাগোয়া স্টোর রুমের খড়ির গাদার ভেতর থেকে বের করে আনে দু-ব্যাগ গ্রেনেড আর অস্ত্রশস্ত্র।

-- ইয়ে সব কেয়া হ্যায় তাওয়ায়েফ সাহেবা? আপকি চুলে কা লাকড়ি হ্যায় না ক্যায়া? অস্ত্রগুলো এক জায়গায় জড়ো করতে করতে বলে ওঠে চাইনিজধারী।

আলেয়া ফাঁকা দৃষ্টিতে শুধু তাকিয়ে থাকে অস্ত্রগুলোর দিকে। কিছুই বলে না।

-- ইয়েহ্ আদমি, ইসকো সামঝা দো, মুতালিবকা পাতা নেহি বাতানে সে কেয়া আঞ্জাম হোগি...। একজন দালালকে লক্ষ করে বলে চাইনিজধারী।

দোসরদের একজন আলেয়াকে বোঝায়, মোতালেবের খোঁজ না দিলে কি পরিণতি হবে তার। জানে শ্যাষ কইরা দিবো, বুজলা নি?

আলেয়া দৃঢ়কণ্ঠে আবার বলে, মোতালেব বলতে কাউকে সে চেনে না। তাই তার খোঁজ জানার কোন প্রশ্নই ওঠে না। এরই মধ্যে বোঝা হয়ে গেছে পরিণতিটা কি হতে যাচ্ছে ওর। মরবার আগে কিছু একটা চেঁচিয়ে বলতেই হবে এই হারামজাদাদের মুখের ওপর। মোতালেবের মুখ থেকে যে দুটো শব্দ শুনত, মনে গেঁথে নেয় আলেয়া।

-- এতনি দের কিউ, জলদি বাতা দো মুতালিব কা পাতা।

-- হামি নাই জানতা।

-- হাম এক দো তিন গিনেঙ্গে, ইসকা আন্দর আগার নেহি বাতাঈ তো ফির বাতানে কা মওকা নেহি মিলেগি তুমকো, সমঝি?

দালাল একজন অতি উৎসাহী হয়ে বলে, এই মাতারি, স্যার এক দুই তিন গুনার আগে মোতালেব কুনখানে আছে তা না বললে তোমারে কিন্তু, বুঝতেই তো পারতেছ ...

লোকটার কথা আলেয়ার কানে গেল কিনা বোঝা গেল না। নির্বিকার দাঁড়িয়ে রইল সে।

তাজ্জবের ব্যাপার, একজন তাওয়ায়েফের এত বড় বেতমিজি --- গুমান! এতো হিম্মতই-বা ওর এল কোত্থেকে! চোখের সম্মুখেই তো একটাকে পড়ে যেতে দেখল --- তারপরও মুখ থেকে কথা বার হয় না। এভাবে কাজ হবে না --- বোঝে ওরা। চাইনিজধারীর ইশারায় হাত-পা বেঁধে ফেলা হয় আলেয়ার। কয়েক মুহূর্ত গোল গোল চোখদুটো পাকিয়ে পাকসেনাটি তাকিয়ে থাকে ওর দিকে। আচমকা ক্ষিপ্র খামচায় ছিড়ে ফেলে ব্লাউজ --- শকুনের ঠোঁটের মত বাঁকানো আঙুলের টানে এক ঝটকায় খুলে ফেলে ব্রা।

--মাশাল্লাহ্, ক্যায়া উমদা চিজ ...! মোটা গোঁফের নিচে দু-সারি চকচকে দাঁত ঝিলিক দিয়ে ওঠে। জেব থেকে একশলা কিংস্টোর্ক বার করে ধরায়। আলেয়ার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গলগলিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। তারপর জ্বলন্ত সিগারেটের মাথা ছোঁয়ায় ওর অনাবৃত স্তনে --- স্তনের বোঁটায়। যন্ত্রণায় কুঁচকে ওঠে আলেয়ার মুখ। দাঁতে দাঁত চেপে গোঙাতে থাকে ও।

--বোলো, বোল দো কাঁহা হ্যায় ও, কিউ আপনা জান খতরে মে ডাল রাহি হো... মুক্তি সে তুমহারি ক্যায়া ওয়াস্তা, হাহ্? একটু নরম সুরে বলে পাকসেনাটি এবং দোসরদের মাধ্যমে বোঝায়, আওরাতদের নিয়ে ওদের কোনও সেরদর্দ নেই --- ওরা তো আর হাতিয়ার চালাতে পারে না। মোতালেবের খোঁজ দিলে ছেড়ে দেবে আলেয়াকে। আলেয়া পাথরের মত অনুভূতিহীন, কেমন এক দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে সম্মুখের সচল ক’টি বস্তুর দিকে --- ওরা কারা? কারা ওরা!

ওর কাঁধ ধরে সজোরে ঝাঁকুনি দিয়ে তারস্বরে চিল্লিয়ে ওঠে পাকসেনা: বোল, জলদি বোল বেইস্যা কি বাচ্চি।

তবু কোনও সাড়া নেই।

নাহ্, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। পাকসেনা তিনজন কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে সলা-পরামর্শ করে। একজন, সেই মোটা গোঁফঅলা এগিয়ে যায় আলেয়ার দিকে। ওর বুক বরাবর রাইফল তাক করে হাক ছাড়ে: এক। আলেয়া নির্বাক। দো। আলেয়া নির্বিকার। তিন --- তীক্ষ্ণ একটি শব্দ বেরিয়ে আসে রাইফেলের নল থেকে। আর ঠিক তক্ষুনি সবাইকে হকচকিয়ে দিয়ে রাইফেলের শব্দের চেয়েও তীক্ষ্ণতর শব্দ আলেয়ার কণ্ঠ চিরে প্রক্ষিপ্ত হয় --- জয় বাংলা।

বাড়ির কার্নিশে-বসা একঝাঁক সন্ত্রস্ত কাক ডানা মেলে উড়াল দেয় অন্য কোনও গন্তব্যের উদ্দেশে।



আহা, দৃশ্যগুলো দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল বুঝি আপনার? ভুরু কোঁচকাচ্ছিলেন, মুখ থেকে কী সব শব্দ বেরোচ্ছিল। আই অ্যাম সরি টু ট্রমাটাইজ ইউ। আমাদের অতীতের অতি ক্ষুদ্র একটা অংশ শুধু দেখলেন আপনি, আরও কত ঘটনা! হোয়াট! কী বললেন? ওই লোকগুলোর কোনও একজনের সঙ্গে আমার চেহারার মিল খুঁজে পাচ্ছেন? বয়স তো একেবারেই কম, মানে আমার তুলনায়, বয়স কম হলে চোখের জ্যোতি বেশি থাকে, আপনারও থাকবার কথা। ভাল করে দেখেছিলেন সবার চেহারা? আহ্, তারপরও বলছেন আমার চেহারার সঙ্গে যথেষ্ট মিল আছে একজনের। কার বললেন? মোতালেবের? ধ্যাৎ, কী যে বলেন; কোথায় মোতালেব আর কোথায় আমি! বুড়ো এক অথর্ব কি ছিল মোতালেব? মানে আমার মত চুয়াত্তর বছরের বুড়ো? হ্যাঁ, তবে এটা ঠিক, মাঝে মাঝে এখনও আমার ইচ্ছা হয় তিরিশ বছরের মোতালেব হতে।

এখন তাহলে ফেরা যাক। অন্য পথে ফিরি, কি বলেন?

কি বললেন? হ্যাঁ, যে-পথে এখন হাঁটছি, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার আগের নাম পাল্টে ‘শহীদ সাংবাদিক জামিল সরণি’ রাখা হয়েছে!



রেট্রোস্পেক্টাকলটা দিন আমায়...।



লেখক পরিচিতি
শামসুজ্জামান হীরা
মুক্তিযোদ্ধা। গল্পকার। অনুবাদক। 

1 টি মন্তব্য: