বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

বিলকিস বেগমের পতনজনিত আখ্যান ও অন্যান্য গল্প

সোহিনী সেন 

শামিম আহমেদের’ ‘বিলকিস বেগমের পতনজনিত আখ্যান ও অন্যান্য গল্প’ তাঁর প্রথম গদ্যগ্রন্থ। ভাষাবন্ধন প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই গল্পগ্রন্থটি মোট উনিশটি ছোটোগল্পের সমাহার। উনিশটি ভিন্ন স্বাদের জীবননামার এক আলোছায়াময় মৃদু উৎক্ষেপ ধরা দিয়েছে সান্ধ্য চায়ের টেবিলে। এখানে নেই কোনো প্রহেলিকাময় শব্দের অহেতুক আতিশয্য কিম্বা কৃত্রিম ব্যাঞ্জনার অকারণ বুনোট। আর ঠিক সেই কারণেই বোধ হয় কোনো ছেদ-যতি—বিরামচিন্হের পিছুধাওয়া ছাড়াই গোগ্রাসে গিলে ফেলা যায় বইখানা।


উনিশটি গল্পের প্রায় পনেরোখানাতেই দৃষ্টি নিক্ষিপ্ত হয়েছে একুশ শতকীয় গ্রামবাংলার মুসলিম সমাজের ওপর। বাকি চারটির মধ্যে তিনটি হস্তান্ত্বর, ভ্রান্তিবিলাপ ও বাবার মৃত্যু। এই তিনটি গল্পই নাগরিক মন-মনন ও সমাজের কৌটোবন্দি দুরন্ত প্রহর। হস্তান্ত্বর রাজনীতির জাঁতাকলে আটকা এক সমাজের সুবিধাবাদ ও সুবিধাবাদীদের কাহিনি। বছর চারেক আগের কোলকাতা যখন পরিবর্তন ও প্রত্যাবর্তনের মধ্যবর্তী কোনো এক নিরঘুম ব্যারিকেডে খানিক জিরিয়ে নিচ্ছে, এই গল্প সেই কুয়াশাময় সময়কারই প্রতিচ্ছবি। ভ্রান্তিবিলাপ-এ রয়েছে আমাদেরই বর্তমানের গল্প, যে বর্তমানের সচেতন-অচেতন-অবচেতন জুড়ে এক কঙ্কালসার রিক্ত নিঃস্ব একাকী ভবিষ্যতের বিভীষিকা কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে। আমাদের আজ আমাদের সেই ভয়াদ্র ভবিষ্যতকে আছড়ে পিষ্টে মেরে ফেলতে চায়। কিন্তু পারে কি সব সময়? গল্পটি য্যানো সেই উত্তরখানাই খোঁজার চেষ্টা করেছে। এর কাহিনি বিন্যাসক্রম ছলতি গল্পগুলির তুলনায় আনকোরা এবং অদ্ভুতভাবে সুন্দর। বাবার মৃত্যু এক মেয়ের আত্মকথনের মধ্যে দিয়ে তার আলাদা থাকা মা-বাবার পৃথক সত্তার স্মৃতিচারণা। কিন্তু গল্পের শেষটা ভীষণভাবে পূর্বনির্ধারিত। কোনো আলাদা নতুন চমক নেই যা মন ছুঁয়ে যেতে পারতো। এই তিনটি ছাড়া বেবি-কে নামক চতুর্থ গল্পটি বিশ্বজোড়া সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও আতঙ্কবাদের পারস্পারিক পরিকল্পিত আস্ফালন নিয়ে তৈরি এক সূক্ষ্ম ব্যাঙ্গ। কিন্তু এর শব্দ, ভাষা ও ভাবনা নির্মাণে লেখকের নিজস্বতা অনুপস্থিত। কৃতজ্ঞতায় শামিন নবারুণ ভট্টাচার্য্যের নাম করেছেন বটে, তবে ওখানে ‘কৃতজ্ঞতা’ শব্দটির বদলে ‘লেখক’ লেখা থাকলেও বিশেষ আশ্চর্য্য হোতাম না।

মুসলিম সমাজনির্ভর গল্প ভাষার সারল্যে বড্ডো বেশী মন কাড়া। ‘বিলকিস বেগমের পতনজনিত আখ্যান ও অন্যান্য গল্প’ লেখকের প্রথম গদ্যসৃষ্টি হওয়ায় এ সারল্যে হয় তো লেখকীয় দক্ষতার অপরপক্ক দিকটিই বেশি চোখে পড়ে। আর সেইটাই য্যানো হয়ে উঠেছে বইখানার এক্স-ফ্যাক্টর্। গল্প উপস্থাপনার কাঞ্ছা-পাকা ধরণ, আরবি ফারসি শব্দের ব্যাবহার ও অব্যক্ত কিছু আবেগ বইটি পড়তে পড়তে নিয়ে যায় সেই সুদূর আরশিনগরে, যেখানকার পরশিদেরকে আমরা আলাদা করে রেখেছি আমাদের নাগরিক ইগো্র অন্ধ জৌলুসের বিচ্ছুরণে। মেহেবুব হাসানের যৌবন, লখিন্দর, কাঁটাবন, আশ্চর্য্য ঘটি ও লাল কাপড়ের ঘুড়ি, আলাদিনের চেরাগ ও মাজারের দৈত্য, শেষ যাত্রা প্রভৃতি গল্পগুলিতে আছে ঋপুজনিত তারণা-কামনা। আছে চাওয়া-পাওয়া-না পাওয়ার অনন্ত কক্ষপথে আটকে থাকা মানবিক চূর্ণতার কাহিনি। মেহেবুব হাসান তার মৃত যৌবনের পুনরুদ্ধারের কামনায় হারিয়ে ফেলে নিজের বোধ-জ্ঞান ও স্বাভাবিক মনুষ্যত্ব। পয়সার লোভে লখিন্দর হারায় তার অস্তিত্বের শেষ নির্যাসটুকু। আর্শাদ মিঞার ঠগবাজী ধরা পড়ে যায় কায়েম মাস্টারের কাছে, আর্শাদ হারিয়ে ফেলে তার নকল মেরুদণ্ডখানাও। বাবার অনিয়ন্ত্রিত অর্থলিপ্সার জোরে আইবুড়ো রজব আলিকে নিজের নতুন সংসার গড়ার স্বপ্নটুকু হারিয়ে ফেলে মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দিন গুণতে হয়। গল্পগুলি পড়ে বারবার মনে হয় একটা অনাথ বিপন্ন সমাজের ছদ্ম প্রকল্পনা য্যানো। য্যানো তার বিবেকের অন্তঃসারশূন্য পতনখানাই লেখক তুলে ধরতে চেয়েছেন। এ সমাজের ভাবনা ও নির্মিতিতে মিশে আছে ধর্মীয় অন্ধবিশ্বাসজনিত দূষণ। খবিস-জিন-ইবলিশরা তাই বাইরে নয়, তাদের নিঝুম অস্তিত্ব নিয়ে মিশে আছে চেতনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মিশে আছে পুংপ্রধান সমাজের প্রপঞ্চে। তাই গর্ভগৃহতে দেখি জুলেখা, রোশনি, শরিফাদের স্বামীরাই বৈজ্ঞানিক ডাক্তারি পরীক্ষায় অক্ষম বলে প্রমাণিত হোলেও মউলবি-আলেমপুষ্ট সমাজের চাপে তারা মেনে ও মানিয়ে নিতে বাধ্য হয় – ছেলেমেয়ে না হওয়াটা মরদ মানুষের দোষ না। সন্তান পেটে না ধরতে পারে যে মেয়েমানুষ, যাবতীয় দায় তারই।


মীরাসিন-এ মোমেনা বেওয়াকে তার অত্যাচারী শয়তান স্বামীর কবরের আত্মাকে ঠাণ্ডা করতে বারবার গোসল্ করতে বলা হয়। কখনো মীরদের ছোটো বৌ, কখনো মেজো বৌ, কখনো বা খোদ মেয়ে জরিনা মা’কে অতিষ্ঠ করে তলে স্ত্রীর পালনীয় কর্তব্যটি সমাধা করতে। কারণ এই জুম্মাবারেই - রোজ কিয়ামত হবে। যেতে হবে হাসরের ময়দানে। এমন দিনে বেওয়া যদি গোসল্ না করে ছুপছাপ বাড়িতে বসে থাকে, তার স্বামী কবরে ছটপট করে দৌড়ে বেড়াবে। কিন্তু মোমেনার যুক্তিবাদী ভাবনা – সকাল থেকেই সারা গা ম্যাজম্যাজ করছে। জ্বরও এসেছে একটু। এই অবস্থায় গোসল্ করলে শরীরটা আরও খারাপ হবে। আর ফইজুলের মা যখন তাকে নামাজের সঙ্গী হোতে বলে তখন সে বলে – “জায়নামাজের পাটিতে বসল্যা আমার গীত মুনে পড়্যা যায়।” এমন সহজ সরল অকপট স্বীকারোক্তি তাজ্জব বানিয়ে দ্যায়। সত্যিই তো; এক শিল্পীর(মীরাসিন/গাইয়ে) কাছে ঈশ্বরের উপাসনা আর শিল্পের উপাসনা কি কখনো আলাদা হোতে পারে? তাই মৌলবিরা যেখানে বলে “শাদির টাইমে নাচাগানা করা হারাম। …হে আল্লাহ তবারকতালা, যেনারা এই বেশারা কাজে লিপ্ত থাকিয়া গুনাহ্ করিতেছে তাদেরকে তুমি নেকির পথে হাঁটবার তৌফিক দান করো।” সেখানে পুরো সমাজের কাছে মোমেনার নির্বাক জিজ্ঞাসা – তবে কি মানুষকে আনন্দ দেওয়াটা গুনাহর কাজ? আর এইখানেই মোমেনা তথা মীরাসিন চরিত্রের স্পিরিট্। এইভাবেই সে এগিয়ে যায় বোধোদয়হীন পুংস্তুতিকারী অসহায়ে নারী সমাজের চেয়ে অনেক দূর। নিজের পথ নিজেই বানিয়ে নেয় সে। বিলকিস বেওয়া বা রাশিদা বেওয়ারা যেখানে সমাজের তর্জনীকে উপেক্ষা না করতে পেরে অর্ধমৃত যাপনকে আঁকড়ে ধরতে বাধ্য হয়, মোমেনার যুক্তিবাদী মনটি সেখানে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ঘোষণা করে কালাপাহাড় সমাজকে। কি প্রবল এই জিহাদ – ভাবলে অবাক হোতে হয়। এভাবে বারজাখ্ গল্পটিতেও দেখি চিকু গ্রাম্য সংস্কার আর হাই-টেক শহুরে মানসিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হোতে হোতেও শেষ পর্যন্ত বেছে নেয় তার শুভ বোধের হাতছানিটিকেই। আত্মসমীক্ষায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে আবারও গড়ে তোলে সে নিজেকে। To Be Or Not To Be’র মায়াবী বিভ্রমে যখন আমরা বশীভুত, তখন মোমেনা বা চিকুর মতো চরিত্রগুলিই বোধ হয় আমাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে শেখায়। শেখায় সঠিক পথ চিনতে। আর হয় তো সেই কারণেই নকশাবন্দীর ফকিরটি আদ্যোপান্ত সুফিবাদী তর্জমায় আমাদের শুনিয়ে যায় আত্মার শুদ্ধিকরণের উপায়টি। আমাদের ভেতরের যে বহুকালব্যাপী বন্দীদশা, নকশা দিয়ে তা ঘোচানোর তরীকা বাতলে যায়। - “আলজিহ্বায় আলেক শহর, আল্লাহ বসে রয়েছে।”


তাই কাহিনিগুলি পতনজনিত হোলেও তার শরীরে কোথায় য্যানো জড়িয়ে থাকে উত্থানের আমলনামা, উত্তরণের দ্যোতকে।


কিন্তু একটি প্রশ্ন য্যানো মনে খচখচ করতেই থাকে। কথাসাহিত্যের ধারায় আখ্যান হোলো কোনো ঘটনা আর গল্প হোলো আখ্যানের পরিপাটি বুনন। এতি লেখকমানসের প্রতীতীজাত এক সংহত গদ্যরূপ। গল্প হয়ে ওঠার জন্য গদ্য কাহিনিকে কী কী বৈশিষ্ট্যের অধীন হোতে হয় সে প্রসঙ্গ স্বতন্ত্র। এখানে লেখক তাঁর এই বইটিকে গল্পসংকলন বলেই উল্লেখ করছেন যেহেতু, সেহেতু বইয়ের উনিশটি পৃথক সৃজনও এক একখানা গল্প – এই সিদ্ধ্বান্তে উপনীত হোতে আমরা বাঁধা পাই না। এখন প্রশ্ন এই যে, বিলকিস বেগমের পতনজনিত কাহিনিটি ‘আখ্যান’ হয়ে অন্যান্য ‘গল্পের’ তুলনায় ঠিক কোথায় আলাদা হচ্ছে? আরও সহজে বলতে গেলে বলতে হয় নামকাহিনিটিকে ‘আখ্যান’ বলে বাকি আঠেরোটি কাহিনিকে ‘গল্প’ ক্যানো বলছেন শামিম? তবে কি কথাসাহিত্যের ধারায় নতুন কোন প্রকরণের অবতারণা করতে চাইছেন তিনি?




লেখক পরিচিতি
সোহিনী সেন 

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী। সম্প্রতি প্রেসিডেন্সি
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পাশ করেছেন। মূলত কবিতা লেখেন। তাঁর আগ্রহের
বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সেমিটিক পুরাণ ও সুফি দর্শন। থাকেন কলকাতায়। গদ্য
সাহিত্যের অনুরাগী পাঠক ও সমালোচক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন