বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

‘একটা বাক্য কীভাবে লেখা হয়েছে তার ওপরেও অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা নির্ভর করে।’

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার : রওশন জামিল

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান

[বাংলা-ইংরেজি—দুই ভাষাতেই অনুবাদে তিনি দক্ষ। তিন দশকে অধিক সময়ের চর্চায় অনুবাদ তার হাতে যেন মৌলিক সাহিত্যের মতো স্বাচ্ছন্দে খেলা করে। তার লেখক আবিষ্কার ও অনুবাদের সংখ্যা প্রচুর। পারিবারিক আবহ, বিপুল পঠন-পাঠন ও সাহিত্য প্রীতি এবং প্রবাস জীবনে পেশা গত কারণে আরো বেশি ইংরেজি ভাষার নিটবর্তী। দীর্ঘ দিনের অনুবাদে সাহিত্যের সকলধারা রচনাই অনুবাদ করেছেন।
তিনি যেমন জনপ্রিয় ও থ্রিলার বই অনুবাদ করেছেন, গভীর অভিনিষে করেছেন মননশীল বই। বাংলা ভাষায় বিপুল বিদেশে সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত করেছেন, জনপ্রিয় করেছেন, গড়েছেন পাঠকরুচিও। তাই সাহিত্যের কাছে তার চাওয়া অনেক। অনুবাদক হিশেবে তার অভিজ্ঞতা-বোঝাপড়া গভীর। লেখার মতোই অনুবাদ নিয়ে কথাবার্তায় তিনি ঝড়ঝড়ে। মননের একনিষ্ঠতা থেকে সাহসিকতার সঙ্গেই কথা বলেছেন এখানে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান]

অলাত এহ্সান : আপনি অনেকদিন যাবত লেখালেখি করছেন, অনুবাদ করছেন। অনুবাদক হিশেবে আপনার একটা পরিচিতিও দাঁড়িয়েছে । তা, কত দিন যাবত অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন?
রওশন জামিল : প্রায় ৩০ বছর।

অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ। আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কি রকম?
রওশন জামিল : প্রশ্নটা ঠিক ধরতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে যদি বলে থাকেন আমার প্রস্তুতি কেমন তাহলে বলব নেহাত খারাপ না। আবার যে বিশাল কিছু তাও না। বাবা সাংবাদিক ছিলেন, বাড়িতে সব কাগজ আসত, ছোটবেলা থেকেই বাংলার পাশাপাশি ইংরেজি কাগজ পড়ার অভ্যাসটা গড়ে উঠেছিল। ইন্টারমিডিয়েটে পড়ার সময় থেকে নিয়মিতভাবে ইংরেজি বই পড়া শুরু করি। বেশিরভাগই থ্রিলার জাতীয়। তাছাড়া, হাই স্কুলে ওঠার পর, বাড়িতে রোজ বাংলা এবং ইংরেজি অনুবাদ করতে হতো। বড় কিছু না, কোনো খবরের এক-দুই প্যারাগ্রাফ। কোনো ভুলভাল হলে বাবা ধরিয়ে দিতেন সেগুলো, বলে দিতেন অনুবাদের সময় ভাষার কোন্ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে খেয়াল রাখতে হবে। তো এভাবেই হাতেকলমে শিখেছি বলতে পারেন

অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো কেবল ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবের সঙ্গেও যুক্ত। অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?
রওশন জামিল : খুব জরুরি প্রশ্ন। অনুবাদ শুরু করার আগে মূল লেখাটা কমপক্ষে বার দুয়েক পড়ি। প্রথমবার কাহিনিটা জানবার জন্য, আর পরে এর আলঙ্কারিক বিষয়গুলো ধরতে, যা ভাব বুঝতেও সাহায্য করে। এরপর আক্ষরিক অনুবাদ বলতে যা বোঝায় সেটা করি। অনুবাদ শেষ হওয়ার পর, ঝাড়া বিশ্রাম, সপ্তাহখানেক। এবার এভাবে আবার লিখতে শুরু করি, যেন গল্পটা আসলে বাংলায়ই লেখা। এখানে একটা বিষয় আছে। ভাব তো কেবল ভাষার এক স্তরে থাকে না, এটা একাধিক স্তরে পরতে পরতে জড়িয়ে থাকে। একটা বাক্য কীভাবে লেখা হয়েছে তার ওপরেও অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা নির্ভর করে। অনুবাদের সময় সব থেকে সমস্যা হয় এখানটায়। লক্ষ্য করে থাকবেন সচরাচর বাংলায় খুব সরল বাক্য লেখা হয়ে থাকে, স্রেফ তথ্য দেয়া। ইংরেজিতে ব্যাপারটা ঠিক এ-রকম না। প্রচুর ভাংচুর থাকে; বিশেষ করে অ্যাপজিটিভ, অ্যাডভারবিয়াল ক্লজ, রিলেটিভ প্রোনাউন এ-গুলো একটা বাক্যের মেজাজ বা মূল সুরটা মূর্ত করে থাকে। এখন এটা বাংলায় আনা কঠিন তা নয়, কিন্তু বাক্য জটিল এবং জড় হওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার যদি একটা বাক্য ভেঙে একটা বা দুটো করেন, তাহলে আপনি গল্পটা দিলেন মাইনাস পোয়েট্রি। অন্তত আমার সেটাই মনে হয়। এসব ক্ষেত্রে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করি মূলানুগ থাকতে। তাছাড়া, আমার নিজের বাংলাটাও বোধকরি ইংরেজিগন্ধী। হা হা হা।

এহ্সান : একজন লেখক তো লেখায় মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ—ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত অনুবাদক আছেন, যারা একজনকে প্রধান করে অনুবাকে সাফল্য সমৃদ্ধি দেখিয়েছেন। আপনার কি মনে হয় যে, অনুবাদের সাফল্যের জন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক। বা ভাল অনুবাদের জন্য এটা একটা দিক?
রওশন জামিল : একটা স্পেশালাইজেশন হয় তো বটেই। লেখকের অন্ধিসন্ধি জানা হয়। সমগ্রের প্রেক্ষাপটে লেখককে বিচার করে অনুবাদে অগ্রসর হওয়া যায়। কিন্তু বাংলায় এটা কতটা সম্ভব বলা কঠিন। এটা কনস্যুমারিজমের যুগ। পাঠক সব বই নেন না। প্রকাশক সেটাই ছাপতে আগ্রহী হন যেটা পাঠক কিনবে, যেটার বাজার পরিচিতি আছে। ফলে, আমাদের দেশে, একজন লেখক নিয়ে পড়ে থাকলে অনুবাদক বেকায়দায় পড়তে পারেন। সব লেখক তো একজন বোর্হেস বা একজন মার্কেস নন, যে নামেই প্রকাশক ও পাঠকের ব্যাটে বলে হবে।

এহ্সান : লেখার সঙ্গে, বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে দেশটির ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদির গভীর ভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য লেখকের দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। আপনি যেমন একটা ভাষা বা ওই ভাষাভাষি সাহিত্য গোষ্ঠীকে বেছে নিয়েছেন। অনুবাদের দক্ষতা অর্জন, ভাল অনুবাদের জন্য কোনো একটা দেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেয়া উত্তম কি না। আপনি কি মনে করেন?
রওশন জামিল : ভাল অনুবাদের জন্য অবশ্যই উৎস ভাষার নাড়ি-নক্ষত্র জানা জরুরি। যেমন ধরুন, আমি অনুবাদের অনুবাদ করছি। কিন্তু আমাকে মূল লেখকের দেশ, সংস্কৃতি, মিথ, তাঁর সময় এবং কাহিনিতে যে সময়ের কথা বলা হচ্ছে—সবকিছুই আমাকে যথাসম্ভব জানতেই হবে। নয়তো আমি লেখকের প্রতি, তাঁর লেখার প্রতি সুবিচার করব না। আমার অনুবাদ এবং আমার পাঠকের প্রতি সুবিচার করছি না। আমার কাছে এটা অন্যায় মনে হয়।

এহ্সান : অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক একটি সাহিত্য জানছেন। তার সঙ্গে একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে জানছেন। এক্ষেত্রে অনুবাদকের তৃপ্তিটা আসলে কোথায়, সাহিত্য অনুবাদে, না ওই দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে জানায়?
রওশন জামিল : আমার বিবেচনায় দু’টোই। প্রথম তৃপ্তিটা হয়তো আসে অনুবাদটা যদি ভাল হয়, অর্থাৎ আমার কাছে মনে হয় কাজটা আমার সাধ্যানুসারে ভাল হয়েছে; এবং এরপর একটা অর্জন বোধ করলাম আরেকটা দেশ-সংস্কৃতিকে জানতে পারায়। আসলে, দু’টো অনুভূতি এতটাই একে অপরে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে থাকে যে আলাদা করে বলা কঠিন ঠিক কোনটা আগে আর কোনটা পরে।

এহ্সান : প্রায়ই শোনা যায়, মন্তব্যের ছড়াছড়িও আছে যে, অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়। তাহলে অনুবাদকে সাহিত্য হয়ে ওঠায় অন্তরায়টা কোথায়? কীভাবে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে?
রওশন জামিল : আছে নাকি এমন রটনা? কী জানি? হা হা হা। না, আসলেই অনুবাদ সম্পর্কে এরকম একটা বাজার-চলতি ধারণা রয়েছে। পাঠক, প্রকাশক উভয় পক্ষই অনুবাদের কাজটাকে খেলো করে দেখেন, এটা মোটেও মিথ্যা নয়। আমার নিজেরই এমন অনেক অভিজ্ঞতা আছে। কেউ বলছেন, আপনি ভালই বাংলা লেখেন, খালি অনুবাদ করেন কেন (যেন অনুবাদ করা একেবারেই ছেলেখেলা, চাইলেই পারা যায়) মৌলিক লেখেন! এ-ধরনের কথা যে শুধু একজন সাধারণ পাঠক আমাকে বলেছেন তা কিন্তু না; দেশের প্রতিষ্ঠিত এবং জনপ্রিয় অনেক লেখকও বলেছেন। আমি তাদের পাল্টা জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু অনুবাদ ছাড়া আপনি বিদেশি সাহিত্য জানছেন কীভাবে? আর না জানলে একটা বদ্ধ জলাশয়ে আটকে পড়বার ঝুঁকি থাকছে! আপনার লেখায় বিষয়-বৈচিত্র্য, ফর্মের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এগুলোর অভাব থাকবে, লেখা একঘেয়ে হয়ে পড়বে। শেষের কথাগুলো অবশ্যি সরাসরি বলি না, বুঝতেই পারেন।

এহ্সান : আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা, বিশেষত ইংরেজি থেকে। আমরা তাকে পাচ্ছি তৃতীয় ভাষা হিশেবে। এক্ষেত্রে মূল সাহিত্যের নির্যাস পাচ্ছি না,  বা সরাসরি সংযোগ স্থাপন হচ্ছে না। আমরা কি ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?
রওশন জামিল : সত্যি বলতে কি, মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করতে পারলে, যাকে বলে, সোনায় সোহাগা। কিন্তু আমাদের দেশের পঠন-পাঠন পদ্ধতি এমন, বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ সীমিত। ফলে অনুবাদের অনুবাদ, বা পরের হাতে ঝাল খাওয়া ছাড়া উপায় কী? বইগুলোর সঙ্গে অন্তত বাংলাভাষী পাঠকের পরিচয় ঘটছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজে ইংরেজি অনুবাদকেই মূল বিবেচনা করে এগোই। এছাড়া উপায় কী, বলুন।

এহ্সান : অনেক সময় দেখা যায়, কোনো দেশের-কোনো লেখকের কিছু গল্প বা কবিতা অনুবাদ করেই তাকে সেই দেশ বা লেখকের ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ বা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে দেয়া হচ্ছে। বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু থাকে না যে, এগুলো কেন শ্রেষ্ঠ। কিভাবে বাছাই করা হয়েছে।  সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?
রওশন জামিল : ভাল প্রশ্ন। আমি জানি না কোন্ মাপকাঠিতে সেগুলো সেরা বলা হয়। আমি নিজে তা করব না। কারণ আপনি যখন একজন লেখকের কিছু গল্প বা কবিতাকে সেরা বলছেন, তখন আপনার অবশ্যই বলা উচিত কোন্ মাপকাঠিতে সেগুলো সেরা বিবেচিত হয়েছে। এটা সবিস্তারে বলা না হলে, অনুবাদক হিশেবে আপনি আপনার দায়িত্বপালন করছেন না। 

এহ্সান : আমাদের দেশে যে অনুবাদগুলো হয়, তার অধিকাংশ বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত, মানে ‘বেস্ট সেলার’ বইগুলোর অনুবাদ। এই ধরনের অনুবাদের মধ্যদিয়ে একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?
রওশন জামিল : এটা মূলত কনস্যুমারিজমের কুফল। সাহিত্যের জগতে প্রবেশের জন্য পাঠকের তরফেও মনস্তাত্ত্বিকভাবে তৈরি হওয়ার ব্যাপার আছে। তার বুদ্ধির ম্যাচ্যুরিটর ব্যাপার আছে। সাহিত্য আর সাংবাদিকতা এক জিনিস না। একটা মিন্স টু অ্যান এন্ড, উদ্দেশ্যমূলক, নরম্যাটিভ; অন্যটা এন্ড ইন ইটসেলফ, কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সামনে রেখে লেখা হয়নি। লেখক একটা গল্প বলেছেন যার ভেতরে তাঁর জীবনদৃষ্টির একটা ইশারা রয়েছে। এখন এই ইশারা একেক জনের কাছে একেক রকম। পুরো ব্যাপারটাই সাবজেকটিভ। কনস্যুমারিজম এই বৈশিষ্ট্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে। সাংবাদিকতা আর সাহিত্যকে এক করে ফেলেছে। সবটাই পণ্য। প্রায়ই দেখা যায় যাকে ‘বেস্ট সেলার’ বলা হচ্ছে তার শিল্পমূল্য সামান্যই, বাজারের কথা মাথায় রেখে লেখা হয়েছে। এই ফিফটি শেডস অভ্ গ্রে’র কথাই ধরুন। পুরোটাই সেক্সের পণ্যায়ন। এ-কারণেই আমি মনে করি না তথাকথিত ‘বেস্ট সেলার’ অনুবাদেই যদি অনুবাদ শিল্প থেমে থাকে, তাহলে দেশের সাহিত্যের তেমন উপকার হবে। তবে পাঠকরা ওই বইগুলোর গল্প জানতে পারেন আরকি।

এহ্সান : আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যেগুলো ভাল, সাহিত্যের জায়গায় শ্রেষ্ঠ, লেখকও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বহুল আলোচিত নয়। প্রকাশকদেরও তাতে কোনো বিনিয়োগ, উৎসাহ নেই। বহুলালোচিতগুলো হচ্ছে, এগুলো হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই ভাল বা মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?
রওশন জামিল : এগুলো অনুবাদের দায়িত্ব নিতে হবে বাংলা একাডেমিকে। এটা তো ওদের অন্যতম কাজ হওয়া উচিত, ভাষা পুলিশ হওয়ার বদলে, তাই না? কিন্তু একাডেমি কার্যত করছে-টা কী? আমাদের সাহিত্যবোধ সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে উঠে পড়ে লেগেছে ভাষা নিয়ে পুলিশি করতে, যেন ভাষা ওদের পুলিশি নির্ভর! বেসরকারি উদ্যোগেও ভাল বা মানসম্মত অনুবাদ হতে পারে। দু-একটি প্রকাশন এগিয়ে এসেছে বলে জানি। এটা ভাল লক্ষণ।

এহ্সান : একটি দেশ যখন উপনিবেশ মুক্ত হয়, স্বাধীন হয়, তার একটা জরুরি কাজ হচ্ছে বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তাশীল বইগুলো ব্যাপক ভাবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই, দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রে আমরা তা-ই দেখি।  সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা ইউরোপের ক্ষেত্রে তা ব্যাপক মাত্রায় দেখেছি। আমাদের দেশে তা ব্যাপক মাত্রায় হয়নি বা হয়নি বললেই চলে। এই না হওয়ার ফলে আমাদের দেশে তা কি ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?
রওশন জামিল : অবশ্যই খারাপ প্রভাব ফেলেছে। কেবল উপনিবেশ মুক্ত হওয়ার কথা বলছেন কেন, যখন মানুষের বুদ্ধির মুক্তি ঘটে তখনো কিন্তু অনুবাদের কদর বেড়ে যায়। য়ুরোপীয় রেনেসাঁর কথাই ধরুন। ক্লাসিক গ্রীক সাহিত্যের অনুবাদ তখন বেড়ে গিয়েছিল সভ্যতার ওই স্বর্ণযুগ সম্বন্ধের জানবার আগ্রহে। এর মধ্যদিয়ে য়ুরোপ প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান-দর্শনের আলোয় নিজেদের সমৃদ্ধ করতে পেরেছে। নতুন চিন্তার রসদ পেয়েছে। জীবনটা আসলে কী? অতীতের অভিজ্ঞতায় উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা, আর বর্তমানটা হলো ট্রানজিসটরি, প্রতিমুহূর্তে অতীত, তাই না? কিন্তু বাংলাদেশে তা হয়নি, কারণ এটি করার দায়িত্ব যাঁদের ছিল/আছে তাঁরা নিজের তরক্কি নিয়ে যতটা আগ্রহী, দায়িত্বপালনে ততটা নন। রাষ্ট্রপরিচালনের দায়িত্বে যাঁরা ছিলেন/আছেন তাঁদের অদূরদর্শিতাও এর আর একটা কারণ বৈকি!

এহ্সান : সেক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি বা সম্পাদনা পরিষদ স্থাপন করা দরকার। আপনার কি মনে হয়?
রওশন জামিল : দেখুন, আমি পুলিশির বিপক্ষে। তবে একটি কাজ মানসম্মত হয়েছে কিনা তা দেখার জন্য অবশ্যই সম্পাদনা পরিষদ থাকতে হবে। তবে দেখা দরকার সম্পাদক যেন পুলিশ না হয়ে ওঠেন। লেখক/অনুবাদক ও সম্পাদকের চিন্তা, শিল্পবোধ এক ওয়েভ লেংথে না থাকলে বিপত্তি দেখা দিতে পারে। একটা ঘটনা বলি। সাহিত্য-সমাজ সমালোচক এডমান্ড উইলসনের কাছে ভ্লাদিমির নবোকভ একবার অভিযোগ করেন—নিউ ইয়র্কার সাময়িকীর ক্যাথরেরিন হোয়াইট তাঁর গদ্য নিয়ে তুচ্ছ-তাচ্ছিল‍্য করছেন। উইলিসন সঙ্গে সঙ্গে এক কড়া চিঠিতে বিষয়টিকে সম্পাদকের হতবিহ্বলতার ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত বলে উল্লেখ করেছিলেন। সম্পাদকের কাজ প্রুফ রিডিং নয়, যেটা কোথাও কোথাও হয় জানি, নির্দিষ্ট করে আর কাউকে না দেখাই, তাঁকে লেখকের নিজস্বতার প্রতিও সমহমর্মী হতে হবে।

এহ্সান : অনুবাদের ক্ষেত্রে টেকনিক্যাল শব্দগুলো ছাড়াও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সংকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। কি ইংরেজি কি অন্যযে ভাষার কথাই বলি। আবার আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কি করনীয়?
রওশন জামিল : রাষ্ট্রীয়/প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের জন্য দাবি জানাতে হবে। পাশাপাশি অনুবাদক নিজের মতো করে পরিভাষা তৈরি করে নেবেন। তবে খেয়াল রাখা দরকার পরিভাষা যেন কান হয়ে পাঠকের মনের গভীরে পৌঁছয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার কথা বলতে পারি, আমার যদি মনে হয় মূলের কোনো শব্দ নতুন তৈরি বাংলা বা প্রচলিত বাংলার চেয়ে বুঝতে সুবিধা এবং লেখার সার্বিক পরিবেশে কানে ভাল শোনাচ্ছে, আমি অবলীলায় সেটা আত্মসাৎ করি/করব।

এহ্সান : আগেও বলেছি, প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হচ্ছে। তার সবই জনপ্রিয়, বহুলালোচিত নয়তো পুরষ্কার প্রাপ্ত গ্রন্থ। তার বাইরে অনুবাদকদেরও কোনো আবিষ্কার দেখছি না। একজন অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক, যিনি ভাল লেখেন, কিংবা কোনো  বই যেটা উঁচু মানের। এটা অনুবাদকের দূর্বলতা, না কি?
রওশন জামিল : আমি সব দোষ নন্দ ঘোষের বলে অনুবাদকের দিক তর্জনী তুলতে চাই না। দায়টা সেক্ষেত্রে আমার ঘাড়েও পড়ে। আসলে অনুবাদকের দর্বলতা অতটুকুই—যদি তাঁর বিদেশি বই পড়া, বইয়ের খবর রাখা এসব কম থাকে। তাহলে তিনি সঙ্গত কারণেই নতুন লেখক আবিষ্কার করতে পরবেন না। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মাথায় রাখতে হবে যে অনুবাদক ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পারেন না। তাঁর জীবিকার ব্যাপার রয়েছে। অনুবাদ করে কত পান একজন অনুবাদক, সেটা সম্মানজনক কিনা, তার ওপরেও তাঁর নতুন বিদেশি লেখক/বই আবিষ্কারের আগ্রহ নির্ভর করে। প্রকাশক তো অজানা লেখকের বই ছাপতে রাজি হন না। এবং পাঠকও বাজারপ্রিয়বই পড়তেই উৎসাহী। আর সাধারণত সব সমাজেই সেই বইগুলোই বাজারকাটতি হয়ে থাকে যেগুলো কিছু সাজানো-গোছানো ভাল ভাল কথা বলে, মানুষ যেগুলো শুনতে চায়, এবং পড়ার মাথা ঘামাতে হয় না। ফলে পুরো বিষয়টাই ব্যবস্থাব্যাপী, কাউকে একা দোষী করা অনুচিত।

এহ্সান : বুদ্ধদেব বসুর প্রসঙ্গ ধরেই আসে—রবার্ট ফ্রস্ট, টি এস এলিয়ট, শার্ল বোদলেয়ার, শাহনামা অনুবাদের কথা। এগুলো অনেকেই অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তা শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কেউ করতে পারেননি, ভাল বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলেই কি সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনার কি মনে হয়?
রওশন জামিল : সত্যি বলতে কী, আমি আসলে এভাবে কখনো ভেবে দেখিনি। আমার মনে হয় না—একজন কবিতার সমাঝদার হলে গল্পের সমাঝদার হতে পারবেন না। আসল ব্যাপার আপনি যেটা অনুবাদ করছেন তার ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করা, জেগে ওঠা। আপনি জনপ্রিয়তা বা পাঠকপ্রিয়তার কথা বলেছেন; আমি মনে করি না জনপ্রিয়তা শিল্প সাফল্যের মানদণ্ড। এবং অনুবাদ করতে গিয়ে আপনি মূল থেকে এতটা সরতে পারেন না যে, মূলে নেই এমন কিছু ভরে দিলেন অনুবাদে কেননা শুনতে ভাল শোনায়, বা স্তবকসজ্জা বদলে দিলেন।

এহ্সান : অনুবাদ তো দুইভাবেই হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশি ভাষায়, দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায়। আমাদের সাহিত্য কিন্তু সে ভাষায় যাচ্ছে না। এর কারণ কি? এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কি বলে মনে করেন?
রওশন জামিল : বহুভাষী বাঙালি ক’জন আছেন, এবং তাও একটা উদ্দিষ্ট ভাষায় দখল আছে এমন? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন, ভাষা শেখায় না, কী বাংলা কী অন্য ভাষা। আমি নিউ ইয়র্ক সিটি শিক্ষা বিভাগে কাজ করি। দ্বিতীয় ভাষা হিশেবে ইংরেজি শিক্ষকদের সঙ্গে প্রায়ই মতবিনিময় হয়। তাঁরা বলেন, তোমাদের যারা ইংরেজি শিখতে আসে, তাদের লেখা থেকে আমরা বুঝি বেশিরভাগই মাতৃভাষাটাও ভালভাবে জানে না। উত্তরণের উপায় ভাষা শিক্ষার ওপর স্কুল পর্যায় থেকে গুরুত্ব দেয়া।

এহ্সান :  অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকে ভাষা, অনেকে ভাব, অনেকে মূলবক্তব্য অনুসরণ করেন। এতে কি একটি সাহিত্যের প্রকৃতাবস্থার হের ফের ঘটে যায় না?
রওশন জামিল : মনে হয় এ প্রসঙ্গে আগে বলেছি। তবু আবার বলি, যদি আগে খোলাসা না হয়ে থাকে। ভাব, মূল বক্তব্য যাই বলুন, দাঁড়িয়ে থাকে ভাষার ওপর। ফলে ভাষা বাদ দিয়ে তো আপনি এগোতে পারবেন না। হের ফের ঘটে যখন আপনি আপনার মর্জিমাফিক গ্রহণ-বর্জন করেন। আপনি গল্পটা রাখলেন, কিন্তু এর ভেতরকার কবিতাটা বাদ দিলেন, তা তো হয় না। এর নাম খোদার ওপর খোদকারী। না করাই সঙ্গত, কী মনে হয় আপনার?

এহ্সান : অনুবাদকের স্বাধীনতা­—শব্দ তৈরি, বাক্য ভাঙা ইত্যাদি দিক— অনেকে সামনে আনেন। এটাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? তা ছাড়া অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীনতা আছে কি?
রওশন জামিল : নবোকভ একজন অনুবাদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য তিনটা ক্ষতি চিহ্নিত করেছেন। এক. অজ্ঞতা এবং বিপথগামী জ্ঞানপ্রসূত অনিবার্য ভুল। নবোকভ বলছেন এটা হল অপেক্ষাকৃত কম ক্ষতি। মানুষের স্বভাব দূর্বলতা এবং তাই ক্ষমার যোগ্য। অনুবাদক নরকের পথে আরেক ধাপ এগিয়ে যান, যখন তিনি বোঝার চেষ্টা না করে বা তার অস্পষ্ট কল্পনায় পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য বা অশালীন মনে হতে পারে ভেবে শব্দ বা অংশ বাদ দেন; অর্থপ্রকাশে তাঁর অভিধানের সীমাবদ্ধতা বিনা সংশয়ে মেনে নেন; কিংবা পাণ্ডিত্যকে পরিচ্ছন্নতার অধীন করেন; যেমন সহজেই মেনে নেন তিনি লেখকের চেয়ে কম জানেন, তেমনি মনে করেন তিনি বেশি বোঝেন। তৃতীয়, এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর, স্খলন ঘটে যখন একটা সেরা শিল্পকর্মকে পাঠকের প্রবণতা ও পক্ষপাত অনুসারে অশালীনভাবে সুন্দর করার জন্য গড়াপেটা করা হয়। এটা একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আশা করা অনুবাদকের স্বাধীনতা সম্পর্কে আমার মনোভাব বোঝাতে পেরেছি।

এহ্সান : অন্য একটি ভাষায় লেখা অনুবাদ হচ্ছে। লেখক তা জানছেন না, রয়েলটি পাচ্ছেন না। রয়েলটি না হয় গেল, কিন্তু তথ্যটি জানা বা মূলানুগ অনুবাদের জন্যও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারতো। তাও হচ্ছে না। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?
রওশন জামিল : অবশ্যই লেখকের সঙ্গে যোগাযোগ করে অনুমতি নেয়া উচিত, নৈতিকতার কথা যদি বাদ দিই তারপরও। বাংলার খবর বিদেশে কেউ তেমন রাখে না। ইকোনমিক পাওয়ার হাউস নয় বলেই রাখে না। অন্য কারণ আছে মনে হয় না। যদি ওরা টের পায় আপনি বিনাঅনুমতিতে কিছু ছেপেছেন, স্রেফ অর্থ দাবি করবে, না দিলে মামলা।

এহ্সান : লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে অনুবাদের তেমন পেশাদারিত্ব দেখছি না। তবে অনেকে পেশাদার অনুবাদক হয়ে উঠতে চান। এটা আনন্দের। অনুবাদের মানোন্নয়নের জন্য পেশাদারিত্বের ভূমিকা কি?
রওশন জামিল : পেশাদারত্ব অবশ্যই দরকার। পেশাদারত্ব না থাকলে আপনি যথাযথ অনুবাদ করছেন কীভাবে। আমি যখন নিউ ইয়র্ক শিক্ষাবিভাগে অনুবাদকের কাজ নেয়ার জন্য ইন্টারভ্যু দিই, ওরা তিনটা বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছিল। উৎসের সঙ্গে অনুবাদে কিছু আমদানি করছি কিনা, বাদ দিচ্ছি কিনা, এবং উৎসের অর্থ অনুবাদে বদলে দিচ্ছি কিনা। অনুবাদের কাজে একজনকে তার নিজের ভাষা এবং উৎস ভাষাটাও জানা চাই নিজের হাতের দুই পিঠের মতো। এগুলোর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা প্রয়োজন। বিদেশে অনুবাদ বিষয় হিশেবে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট, গ্র্যাজুয়েট পর্যায়ে পড়ানো হয়। তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগেও কোর্স হিশেবে পড়ানো হয়।

এহ্সান : এবার বই মেলায় আপনার হারুকি মুরাকামির ‘হাতি গায়েব ও অন্যান্য গল্প’ অনুবাদ গ্রন্থ বের হয়েছে, সে সম্পর্কে বলুন।
রওশন জামিল : মুরাকামির লেখা আমার বিশেষ পছন্দ। এক-কথায় একজন বিশ্বায়িত কথাসাহিত্যিক। তাঁর কাহিনির পটভূমি জাপান, কিন্তু শিল্প-পরিচর্যায় পাশ্চাত্য ভাবধারা, পরাবাস্তবতা ও জাদুবাস্তবতার সঙ্গে জাপানি ঐতিহ্যের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। পুঁজিবাদী সমাজকাঠামোর আওতায় মানুষ কতটা অসহায় আর নিঃসঙ্গ তা মুরুকামির লেখা পড়লে বোঝা যায়। এগুলোই যে তাঁর সেরা গল্প এমন দাবি করি না। আমাকে যে গল্পগুলো টেনেছে আমি সেগুলোই অনুবাদ করেছি। মূলের মেজাজটা ঠিক রেখে যথাসাধ্য বঙ্গায়ন করতে চেষ্টা করেছি।

এহ্সান : আমাদের দেশে অনেকই অনুবাদ করছেন। আপনার সমসাময়িক তো করছেই, আগেও করেছেন, আপনার অনুজরাও করছেন। বাজারে তাদের বইও আছে। এদের থেকে আপনি নিজেকে কিভাবে আলাদা করেন?
রওশন জামিল : অন্যদের কথা আমি বলতে পারব না। কারণ বইগুলো আমার পড়া নেই। আর বিচার করতে গেলে কেবল অনুবাদ পড়লেই হবে না, যে উৎস বইটিও পড়া থাকতে হবে। সুতরাং, আমি ভাল-মন্দ বিষয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে তাঁদের বই যখন বাজারে বিক্রি হচ্ছে, প্রকাশক ছাপছেন তখন আমরা অনুমান করে নিতে পারি অনুবাদ কাজ করছে। আমার নিজের ক্ষেত্রে এটুকু বলতে পারি কোনো গল্প বা উপন্যাস অনুবাদে হাত দেওয়ার জন্য যতটা প্রস্তুতি থাকা দরকার মনে করি সেটা না থাকলে আমি সেটা অনুবাদে হাত দিই না।

এহ্সান : লিখালেখির এখন বহু মাধ্যম তৈরি হয়েছে। এখনো নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। অনেকে অনুবাদক হওয়ার চিন্তাও করেন। আবার গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের ভাল ম্যাগ থাকলেও অনুবাদের তেমন লিটলম্যাগও নেই। অনুবাদক তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমটি আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? কিভাবে অনুবাদ তৈরি হবে?
রওশন জামিল : অনুবাদ সাহিত্যের জন্য আলাদাভাবে সাময়িকী থাকলে অবশ্যই ভাল, তাতে আপনি একটি বিশেষায়িত কাঠামো পাচ্ছেন। কাজ ঝাড়াই-বাছাই করে ছাপবার সুযোগ বেশি থাকছে। মোদ্দা কথা, অনুবাদ ছাপা হওয়ার জন্য জায়গা দেয়া। যখন জায়গা থাকবে তখন লেখকও আসবে।

এহ্সান : অনুবাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার/পদক দেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের দেশে মানসম্মত অনুবাদের ক্ষেত্রে কি ধরনের ভূমিকা রাখছে? আদৌ তা রাখছে কি না?
রওশন জামিল : পুরস্কার লেখার মান ঠিক করে কিনা বলতে পারছি না। কোনো লেখকই পুরস্কারের কথা মাথায় রেখে লেখেন না। অন্তত আমার তাই বিশ্বাস। পুরস্কার বরং লেখকের সত্য উচ্চারণের ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারে বলে আমার মনে হয়। আপনি প্রতিষ্ঠানকে চটাতে চান না। কারণ তাতে আপনার লোকসান। আবার এটাও ঠিক, পুরস্কার পেলে একজন লেখকের ভালো লাগতেই পারে। আপনি পাদপ্রদীপের আলোয় আসছেন।

অলাত এহ্সান : অনুবাদ বিষয়ে অনেক খোলামেলা কথা বলছেন। আশা করি এটা পাঠকের পাঠরুচি ও অনুবাদ বিবেচনা বিশেষ ভূমিকা রাখবে। আপনাকে ধন্যবাদ।
রওশন জামিল : আপনাকেও ধন্যবাদ। ধন্যবাদ গল্পপাঠের পাঠক-লেখক-কর্মী-শোভাকাঙ্ক্ষি সবাইকে।

অনুবাদক পরিচিতি :
রওশন জামিল
১৯৫৮ সালে ঢাকায় তার জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব বিএ অনার্স, এমএ (বাংলা)সম্পন্ন করেছেন। জার্নালিজম ও ফোটোগ্রাফি’র ওপর আন্ডারগ্র্যাজুয়েশন করেছেন সিটি ইউনিভার্সিটি অভ ন্যু ইয়র্ক থেকে। প্রবাশে আছেন দীর্ঘদিন। নিউ ইয়র্ক সিটি ডিপার্টমেন্ট অভ এডুকেশন বিভাগে লিঙ্গুইস্ট (অনুবাদক) হিশেবে কর্মরত। দীর্ঘদিনের চর্চায় তার অনুবাদ মূলের মতো প্রসাদগুণসম্পন্ন। তার অনুবাদের সংখ্যাও বিপুল। উল্লেখযোগ্য অনুবাদ গ্রন্থ: দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি, দি অ্যাডভেঞ্চার অভ হাকলবেরি ফিন, যুদ্ধের মেয়েরা ও অন্যান্য গল্প। এছাড়া ওয়েস্টার্ন ধারার ওসমান পরিবার সিরিজ।

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার অদূরে নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ(ইন্টারমিডিয়েট) ও ঢাকা কলেজে(অনার্স-মাস্টর্স)। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে।০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন