বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

তেত্রিশ বছর

স্বকৃত নোমান

লোকটিকে প্রথম দেখতে পাই মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে, ভোরে, গাঢ় কুয়াশায়। লাঠিতে ভর দিয়ে, ঝুঁকে, স্থিরমূর্তির মতো যেভাবে সৌধের মূল স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে ছিল, তাতে মনে হয়েছিল আশির কম নয় তার বয়স। মোটা ফ্রেমের চশমার ভেতর চোখ দুটোর পলক পড়ছিল কিনা দূর থেকে খেয়াল করতে পারিনি।


হাঁটতে হাঁটতে আমি ভাবি, গ্রাম থেকে আসা বুঝি? হতে পারে। কেননা স্মৃতিসৌধকে যেভাবে সে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখছিল, যেন জীবনে কোনোদিন দেখেনি। চোখ জুড়িয়ে দেখছে এখন। গ্রাম থেকে আসা মানুষেরা স্মৃতিসৌধকে ঠিক এভাবেই দেখে, বিপুল কৌতুহলের সঙ্গে। শুধু স্মৃতিসৌধ কেন, ঢাকা শহরের প্রতিটি বস্তু তাদের চোখেমুখে বিস্ময় জাগায়। সেদিন তো ফার্মগেট ফুটওভারব্রিজ পার হতে হতে একটা লোককে বলতে শুনলাম, একি! রাস্তার উপর পুল! অথচ আমরা সাঁতরে নদী পার হই। দেখো দেখি কাণ্ড!

অশীতিপর লোকটিকে একবার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়েছিল, বাড়ি কোথায়? কিন্তু এড়িয়ে গেলাম। প্রতিদিন কত লোকই তো ঢাকা শহর দেখতে আসে। শাহ আলীর মাজার, বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, জাতীয় জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক এবং সংসদ ভবন দেখতে আসে। কে কার খবর রাখে? কে কাকে বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করে? তাছাড়া আমার তখন তাড়া ছিল। হারুন স্যার ঠিক ছয়টায় তার বাসায় থাকতে বলেছেন। এখন বাজে পাঁচটা চল্লিশ। মীরপুর থেকে বিশ মিনিটে শাহবাগ পৌঁছা প্রায় অসম্ভব। তবে রাস্তাঘাট এখনো খালি, ডাইরেক্ট সার্ভিস হলে পৌঁছেও যেতে পারে। কিন্তু শাহবাগ থেকে রিকশায় স্যারের বাসায় যেতে লাগবে আরো পনের মিনিট। অর্থাৎ পনের মিনিটের দেরি। স্যার কি ততক্ষণ আমার অপেক্ষায় থাকবেন?

থাকলেও থাকতে পারেন। যে শীত পড়ছে, কম্বলের ওম কি এত সহজে ছাড়তে পারবেন! অবশ্য যারা ডায়াবেটিস রোগী, যারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধ্যা নিয়ম করে হাঁটে, তারা শীত-গ্রীষ্মের ধার ধারে না। রোজই তাদের হাঁটা চাই। হারুন স্যারও রোজ ভোরে নিয়ম করে এক ঘণ্টা হাঁটেন। রাতে ফোনে বলেছিলেন হাঁটতে হাঁটতে থিসিসের বিষয়ে আলোচনা করবেন। ‘জহির রায়হান : জীবন ও কর্ম’ বিষয়ে তার অধীনে পিএইচডি করছি। থিসিস লেখা শেষ। মাসখানেক আগে পাণ্ডুলিপিটা স্যারের কাছে জমা দিয়েছিলাম। তারপর দশ-পনের দিন আর খবর নেই। একদিন ডিপার্টমেন্টে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলে তিনি বললেন, থিসিসটা অসম্পূর্ণ। ভাষাগত দুর্বলতা আছে। তুমি বরং আরেকবার রিভাইস দাও। তাছাড়া আরো কিছু বিষয় যোগ করতে হবে। মীরপুর বিহারি ক্যাম্পে গিয়ে বিহারিদের সঙ্গে কথা বলো। সেদিন বিহারি, ছদ্মবেশি পাকসেনা ও আলবদর বাহিনী ঠিক কয়টা নাগাদ বাংলাদেশিদের ওপর গুলি চালিয়েছিল, আনুমানিক কতজন বাংলাদেশি সেখানে ছিল, কতজন নিহত হয়েছিল এবং কতজন বেঁচেছিল তার বিস্তারিত একটা বিবরণ জুড়ে দাও। তাহলে কাজটা আরো ভালো হবে।

স্যারের পরামর্শমতো সব কাজ শেষ করে নতুন করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে আরো দুই সপ্তাহ লেগে গেল। আজই স্যারের কাছে পাণ্ডুলিপিটা জমা দেব, কিন্তু স্যারের বাসা পর্যন্ত পৌঁছতে সাড়ে ছয়টা বেজে গেল। স্যার ঠিক ছয়টায় বেরিয়ে গেছেন। কোথায় গেছেন তার স্ত্রীও বলতে পারলেন না। হয়ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অথবা রমনা পার্কে অথবা রবীন্দ্র সরোবরে। কোথায় খুঁজব? ডিপার্টমেন্টে আসবেন দশটা নাগাদ। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।

অগত্যা মধুর কেন্টিনের দিকে হাঁটা ধরলাম। এই ফাঁকে নাস্তাটা সেরে ফেলি। নাস্তার পর আমাকে আবার টয়লেটে যেতে হয়। পেটে এক কাপ গরম দুধচা পড়ার আগে যতই চেষ্টা করি লাভ হয় না। কয়েক চুমুক দেয়ার পরই পেটে একটা মোচড় দেয়। তখন আমি আমার কর্তব্য বুঝতে পারি।

কিন্তু এত ভোরে কি মধুর কেন্টিন খুলেছে? মনে হয় না। তার চেয়ে বরং টিএসসির বেঞ্চিতে বসে কিছুক্ষণ রোদ পোহাই। রাস্তায় যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। জনমানুষের সংখ্যাও। হারুন স্যারের মতো অনেকে জগিংয়ে বেরিয়েছেন। গায়ে ট্র্যাকস্যুট, পায়ে কাপড়ের জুতো, কারো কারো মাথায় ক্যাপ। তাদের মধ্যে আমি হারুন স্যারকে খুঁজি। জানি তিনি পার্ক ছাড়া রাস্তায় হাঁটেন না, তবুও।

কুয়াশা ঠেলে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গাছগাছালি উজিয়ে রোদ ততক্ষণে টিএসসি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। কিন্তু নিরুত্তাপ। সূর্যের দিকে মুখ করে বসে আমি পাণ্ডুলিপিটা উল্টেপাল্টে দেখি। কদিন ধরে পাণ্ডুলিপিটার মধ্যে একেবারে ডুবে আছি। জহির রায়হানের জীবন, তার কর্ম এবং তার সমসাময়িক কালকেন্দ্রিক যে বৃত্তটা তৈরি হয়েছে আমার মধ্যে, সেই বৃত্ত থেকে কিছুতেই বেরুতে পারছি না। মাথায় কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছে জহির রায়হান, মজুপুর, ভাষা আন্দোলন, জীবন থেকে নেয়া, হাজার বছর ধরে, বরফ গলা নদী, আর কতদিন, সুমিতা দেবী, সুচন্দা, বিপুল রায়হান, অনল রায়হান, তপু রায়হান, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদুল্লাহ কায়সার, মীরপুর, বিহারি ক্যাম্প, আল-বদর ইত্যাদি স্থান ও নামবাচক শব্দগুলো। এই নামটি ভেসে উঠল তো ওই স্থানটি ডুবে গেল। বুদ্বুদের মতো। ভেসে উঠছে, মিলিয়ে যাচ্ছে। আবার ভেসে উঠছে, আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। এই হয় আমার। ইতিহাসের ছাত্র আমি। অনার্স ফাইনাল ইয়ারের সময় তো মাঝেমধ্যে মনে হতো আমি বুঝি সুলতানি বা মোগল আমলে বসবাস করছি।

হঠাৎ গাড়ির তীক্ষ হর্ন। একটানা বেজেই চলছে। তাকিয়ে দেখি রাজু ভাস্কর্যের সামনে, মীরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে যে লোকটিকে দেখেছিলাম, সে দাঁড়িয়ে! ঠিক একই ভঙ্গিতে―লাঠিতে ভর দিয়ে, ঝুঁকে, স্থির মূর্তির মতো। তার পেছনে একটি কালো গ্লাসের প্রাইভেট কার হর্নের পর হর্ন বাজিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু লোকটির কানে ঢুকছেই না। রাস্তায় যানজট লেগে যাচ্ছে। কোনো ট্রাফিক পুলিশ নেই। তারা কি আর এত ভোরে ডিউটিতে আসে!

লোকটির পেছনে হর্ন বাজাতে থাকা প্রাইভেট কারটির কালো গ্লাস নেমে গেল। মাথাটা বের করে ড্রাইভার খিস্তি করল, ঐ বুড়া মিয়া, কানে শোন না?

না, বুড়োর কানে কিছু ঢুকছে বলে মনে হচ্ছে না। ভারি তো অদ্ভুত কাণ্ড! লোকটা যে গেঁয়ো তাতে কোনো সন্দেহ নেই। নইলে কি শহরের রাস্তায় এভাবে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে! সম্ভবত বধিরও। নইলে হর্নের তীব্র শব্দ তার কানে ঢুকবে না কেন।

আমি দৌড়ে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, চাচা, পেছনে গাড়ি। সরেন সরেন।

লোকটি পেছনে ফিরে তাকাল। বুঝতে পারি সে বধির নয়। তার মন ভাস্কর্যে এতটাই নিবিষ্ট হয়েছিল, পার্থিব কোনো শব্দ এমনকি তার শ্বাস-প্রশ্বাসও কানে ঢুকছিল না। সে আমার কাঁধে বাঁ-হাতটি রাখল, আমি তাকে নিয়ে রাস্তার ওপাশে সরে দাঁড়ালাম। গাড়িগুলো চলে গেলে তার হাত ধরে আমি তাকে বহেরাতলায় বেঞ্চির সামনে নিয়ে এলাম। তার ঠোঁট দুটো তির তির করে কাঁপছে, দু চোখের কোণে অশ্র। চাদরের কোণায় সে বারবার চোখ মুছছে।

বললাম, কোথায় যাবেন আপনি চাচা?

লোকটি নিরুত্তর। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। একপাশে লাঠিটা রেখে বেঞ্চির ওপর বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে খুব উৎফুল্ল কণ্ঠে সে বলল, আমি তো ফিরে এলাম বাবা। যাব আবার কোথায়?

: ফিরে এলেন? কোথা থেকে? আপনি কি দেশের বাইরে ছিলেন?

লোকটি আমার দিকে তাকাল। মুখে হাসি ছড়িয়ে মাথাটা এদিক-ওদিক নাড়াতে নাড়াতে বলল, আর যাব না। এই দেশটা আমার। আমি চলে এসেছি। বুঝলে, আমি চলে এসেছি। সারা জীবন এ দেশেই থাকব। আর যাব না, হে হে... আর যাব না।

বুঝে না বুঝে আমিও হাসলাম, নিশ্চয়ই। তা আপনার বাসা কোথায়? আমি তো আপনাকে মীরপুর বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে দেখেছি। এত ভোরে আপনি ওখানে কী করছিলেন?

: দেখছিলাম, বাবা। এই দেশ তার বীরসন্তানদের মনে রেখেছে। বুঝলে, মনটা ভরে গেল। আচ্ছা, তোমার বাড়ি কি ওদিকে?

: আমার? বগুড়ায়। থাকি মীরপুর।

: মীরপুর!

লোকটা হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল, মুখের অমলিন হাসি মিলিয়ে গেল, চেহারায় ফুটে উঠল বিভীষিকা। ভাবি, লোকটা হয়ত মীরপুরের সেই গণহত্যার কথা জানে অথবা সে স্বচক্ষে ওই হত্যাকাণ্ড দেখেছে। নইলে মীরপুরের কথা শুনে তার দশা এমন হয়ে গেল কেন?

আমার কৌতুহল বাড়ল। বললাম, আচ্ছা, স্বাধীণতার পর আপনি কি আর দেশে আসেননি?

প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলেন তিনি। বললেন, কী করো তুমি?

: একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে জব করছি। পাশাপাশি পিএইচডি করছি।

: আচ্ছা। কোন বিষয়ে?

আমি তাকে আমার পিএইচডির বিষয়টি জানালাম। সে বিস্ময়ে, খানিকটা কৌতুহলে আমার মুখের দিকে তাকাল। মাথাটা দোলাতে দোলাতে বলল, হুম, কর্ম ও জীবন। আচ্ছা। তা তার জীবনের উপসংহারে কী লিখলে?

: লিখেছি, নিখোঁজ বড়ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে মীরপুরে খুঁজতে গিয়ে তিনিও নিখোঁজ হন।

: আচ্ছা। কিন্তু তুমি তো এই সিদ্ধান্তে আসতে পার না।

: কেন?

: সেদিন বিহারি, ছদ্মবেশি পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর বাহিনীর গুলিতে তিনি নিহতও হতে পারেন। নিখোঁজ আর নিহত কিন্তু এক নয়।

: হ্যাঁ, সে কথাটিও তো লিখেছি।

: এটাও কিন্তু তুমি নিশ্চিত করে বলতে পারো না। তিনি মারা নাও যেতে পারেন।

: তা তো বটেই। আসলে আমি কিছুই নিশ্চিত করে লিখিনি। তার কী দশা হয়েছিল আমরা তো কেউ জানি না, লিখব কী করে।

: এমনও তো হতে পারে সেদিন তিনি আহত হয়ে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, অথবা কোনো কারাগারে বা পাগলাখানায় বন্দি আছেন। এমনও হতে পারে, বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে পথে পথে ঘুরছেন, কিংবা ঘুরতে ঘুরতে একদিন মারা গেছেন। বেঁচে থাকাটাও কিন্তু বিচিত্র কিছু নয়। মানুষ তো আশি-নব্বই বছরও বাঁচে তাই না?

লোকটির সঙ্গে আড্ডা জমে উঠল। সে থামছে না, একটা পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছে। গেঁয়ো নয়, কথাবার্তায় তাকে উচ্চশিক্ষিত বলেই মনে হলো। কিন্তু তার প্রশ্নগুলো একেবারেই বাচ্চাদের মতো। ভাষা আন্দোলন থেকে গণঅভ্যুত্থান, এমনকি মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনার কথা সে বলছে। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। ভাবি, যুদ্ধের সময় হয়ত সে ভয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। আবার ভাবি, তাই বা কেমন করে হয়? পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট তো ছোট কোনো ঘটনা নয়। পৃথিবীর যেখানেই থাকুক, কোনো বাঙালি সেদিনের ঘটনা জানে না? অথচ লোকটা কিনা সেদিনের কথা শুনে আঁতকে উঠল! জিবে কামড় দিয়ে উঠে দাঁড়াল। মনে হচ্ছিল এক্ষুণি বুঝি মূর্ছা খাবে। আমি তাকে ধরে আবার বসিয়ে দিলাম। সে কাঁদছে। বাঁধভাঙা অশ্র তাকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কিছুতেই সে কান্না থামাতে পারছে না। কী আশ্চর্য! শিক্ষিত লোক, যে দেশেই থাকুক, পনেরই আগস্টের ঘটনা তো তার অজানা থাকার কথা নয়।

কে জানে, লোকটি হয়ত মুক্তিযোদ্ধা। হানাদার বাহিনীর হাতে আটক হয়ে হয়ত সে এতদিন পাকিস্তানের কোনো কারাগারে বন্দি ছিল। কিন্তু তাতেও তো হিসাব মেলে না। কারাগারে থাকলেও তো এমন একটা সংবাদ তার অজানা থাকার কথা নয়। তবে কি লোকটা পাগল? এতদিন কোনো পাগলাগারদে আটক ছিল? হলেও হতে পারে। অথবা যুদ্ধের সময় বড় কোনো আঘাতে তার স্মৃতিশক্তি হারায়। তার স্বজনরা এতদিন তাকে ঘরে অথবা কোনো পাগলাগারদে আটকে রেখেছিল। এখন সুস্থ হয়ে উঠেছে বলে ছাড়া পেয়েছে।

আসলে ঠিক মেলাতে পারি না।

লোকটি আমার কাছে যুদ্ধ-পরবর্তী তেত্রিশ বছরের ইতিহাস জানতে চায়। আমার হাতে সময় আছে। হারুন স্যার ক্যাম্পাসে আসতে আরো প্রায় তিন ঘণ্টা বাকি। বসে বসেই তো সময়টা কাটাতে হবে। এত ভোরে আড্ডা দেয়ার মতো কোনো বন্ধুকেও তো পাব না। তারা কি এত ভোরে ঘুম থেকে ওঠে? লোকটিকে পেয়ে বরং ভালোই হলো, সময় কাটাতে পারছি। মধুর কেন্টিনে যেতে ইচ্ছে করছে না। যতক্ষণ সম্ভব লোকটার সঙ্গে আড্ডা চলুক, সে চলে গেলে না হয় নাস্তা করা যাবে। না করলেও বিশেষ কোনো ক্ষতি নেই।

আমি তাকে ইতিহাস শোনাই। ডান হাতের দু আঙুলে ঠোঁট ঘষতে ঘষতে, কখনো বা সাদা লম্বা দাড়িতে আঙুল চালাতে চালাতে সে আমার কথা শোনে। তার চোখে কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদ, কখনো ভয়, কখনো বা বিস্ময় খেলা করে। শিশুর মতো সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। পনেরই আগস্টের পর যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল আমি তাদের নাম বলি। সে বারবার চোখ মোছে। আমি যখন বলি, এক সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মেজর জিয়াও রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন, লোকটি তখন উৎফুল্ল কণ্ঠে বলল, তারপর? নিশ্চয় মুজিব হত্যার বিচার করেছে জিয়া?

আমি প্রশ্নটি এড়িয়ে যাই। বলি, চট্টগ্রামে নির্মমভাবে খুন হলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া।

লোকটি আবারও আঁতকে উঠল। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল, আবারও খুন!

: হ্যাঁ, ধারাবাহিক খুন। এর আগে কর্নেল তাহেরও কিন্তু খুনের শিকার হয়েছেন।

লোকটি চোখ বন্ধ করল। আবার সে কাঁদতে শুরু করেছে। তার সাদা শ্মশ্র ভিজে যাচ্ছে লোনা জলে। সে বেঞ্চিতে দু হাতে চেপে ধরে দুলছে আর কাঁদছে। যেন স্বজনের মৃত্যুতে শোকের মাতম। আমি তার কাঁধে হাত রাখি। কান্না থামাতে সে মিনিট দশেক সময় নেয়। তারপর চোখেমুখে জেগে ওঠে ভীষণ ক্রোধ। ক্রোধানিত্ব কণ্ঠে বলে, কর্নেল তাহেরকে কে খুন করেছে?

আমি চুপ করে থাকি।

সে বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে, রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর নেতারা কীভাবে ফিরল? মেজর জিয়া কেন বাধা দেয়নি?

আমি চুপ করে থাকি। সে একই প্রশ্ন আবারও করল। আমি এড়িয়ে যাই। সে জোর শব্দে থুতু নিক্ষেপ করল। খানিক ছিটা আমার গায়েও পড়ল। বললাম, জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় এসে সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছেন।

লোকটি বিস্ময়ে আমার দিকে তাকাল। তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর হাসতে শুরু করল―হেহ্ হেহ্...হেহ্ হেহ্...হেহ্ হেহ্...হেহ্ হেহ্...। ভাবি, লোকটি হয়ত মুসলমান বলেই সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করার কথাটি শুনে খুশিতে হাসছে। কিন্তু তার হাসিটা ভালোভাবে খেয়াল করে বুঝতে পারি ঠিক স্বাভাবিক হাসি নয়। কিছুটা অস্বাভাবিক। পাগলেরা যেমন করে হাসে। লোকটিকে এবার সত্যি পাগল বলেই মনে হচ্ছে। নইলে কেউ এমন করে হাসে!

হাসি থামিয়ে বলল, তারপর?

তারপর আমি পরবর্তী বছরগুলোতে রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা এসেছে তাদের নাম বললাম। তার চেহারায় কখনো আনন্দ, কখনো বিষাদের ছাপ ফোটে। বর্তমান সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর নাম জানতে চাইল সে। আমার জানা কয়েকজন মন্ত্রীর নাম জানালাম তাকে। এত মন্ত্রী, সবার নাম মনেই থাকে না। তবে কিছু মন্ত্রীর নাম ভোলা যায় না। যেমন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী কিংবা সমাজকল্যাণমন্ত্রীর নাম তো সবার আগে চলে আসে।

দুই মন্ত্রীর নাম শুনে লোকটি তৃতীয়বার অর্থাৎ শেষবারের মতো আঁতকে উঠল। আমার মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে রইল। আমি বুঝতে পারি না তার চেহারায় দুঃখ, ক্রোধ, ঘৃণা নাকি প্রতিহিংসা। আমিও তার দিকে তাকিয়ে থাকি।

বেঞ্চি থেকে উঠে দাঁড়াল লোকটি, লাঠিটা হাতে নিয়ে পা বাড়াল।

বললাম, চলে যাচ্ছেন?

বলল সে, হ্যাঁ, চলে যাচ্ছি।

: এখন কোথায় যাবেন?

: জানি না।

: বাড়িতে যাবেন না?

: জানি না।

: আপনার বাড়ি কোথায়?

লোকটি চিৎকার করে উঠল, জানি না শূয়রের বাচ্চা।

আমিও দাঁড়িয়ে গেলাম। ভয়ে, বিস্ময়ে, ক্রোধে, নাকি শ্রদ্ধায় ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। লোকটা চলে যাচ্ছে। আমি তার চলে যাওয়া দেখি।

পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে দেখি দশটা বাজতে পনের মিনিট বাকি। হারুন স্যার আসার সময় হয়ে গেছে। ডিপার্টমেন্টের দিকে হাঁটা ধরি। মাথা উঁচিয়ে একবার লোকটাকে দেখার চেষ্টা করলাম। না, তাকে আর দেখা যাচ্ছে না। আমি আবার আমার পাণ্ডুলিপির বৃত্তে ঢুকে পড়ি। জহির রায়হান সম্পর্কে লোকটার কথাগুলো মাথায় ঘুরছে। আমি আবার বেঞ্চিতে ফিরে পকেট থেকে কলমটা বের করি। পাণ্ডুলিপিতে জহির রায়হানের জীবনের উপসংহারে লিখি : এমনও হতে পারে জহির রায়হান গুরুতর আহত হয়েও বেঁচে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি লোপ পায়। পাগলের মতো দেশ-দেশান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছেন অথবা কোনো কারাগারে বা পাগলাগারদে বন্দি ছিলেন। একদিন বার্ধক্যের চাপে স্বাভাবিকভাবে অথবা কোনো দুর্ঘটনায় তার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। কে জানে, হয়ত এখনো বেঁচে আছেন। মানুষ তো আশি-নব্বই বছরও বাঁচে।

আসলে এই বিষয়ে আমরা নিশ্চিত নই।




লেখক পরিচিতি
স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান বাংলা ভাষার প্রতিশ্রুতিশীল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর―ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায়। বাবা মাওলানা আবদুল জলিল ও মা জাহানারা বেগম। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন, এরপর তিনি স্বউদ্যোগে ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসে একাঙ্গ হয়ে থাকে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতির বিপুল বৈভব, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। এখন পর্যন্ত তার ছয়টি উপন্যাস এবং একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও সাতটি অন্যান্য গ্রন্থ আছে তার লেখা। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নাভি, বংশীয়াল, জলেস্বর, রাজনটী, বেগানা ও হীরকডানা। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থ ‘নিশিরঙ্গিনী’।

বর্তমানে তিনি সংবাদ ম্যাগাজিন ‘এই সময়’-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ২০০২ সালে দৈনিক আজকের কাগজের পরশুরাম উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। ২০০৪ সালে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি)-এর ফেলোশীপ লাভ করেন। ২০০৬ সালে প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে সংবাদ ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আবার সাংবাদিকতায় যোগ দেন। এছাড়া তিনি ‘সম্প্রীতি’ [সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা]-এর সম্পাদক। ‘রাজনটী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার ‘বেগানা’ ও ‘হীরকডানা’ উপন্যাস দুটি পাঠকনন্দিত। এবারের একুশে বইমেলায় জাগৃতি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে তার সপ্তম উপন্যাস ‘কালকেউটের সুখ’।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন