বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

‘অনুবাদ অবশ্যই সাহিত্য, তবে তাকে সাহিত্য করে তুলতে হয়’

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার: শরীফ আতিক-উজ-জামান

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান

[মননের গভীর প্রত্যয় থেকেই অনুবাদে যুক্ত হয়েছেন শরীফ আতিক-উজ-জামান। বাংলা-ইংরেজি দুই ভাষাতেই অনুবাদ করেন তিনি। বিশ্ব সাহিত্যের সেরা সাহিত্য যেমন তুলে আনেন, বাংলা সাহিত্যকেও তিনি বিশ্ব পাঠকের দরবারে পৌঁছেদিতে প্রতিশ্রুত। পেশা গতভাবে সরকারি একটি কলেজে শিক্ষক ইংরেজি বিষয়ে অধ্যাপনা করছেন। অনুবাদক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত শরীফ আতিক-উজ-জামান গল্পকার হিসেবেও সমধিক পরিচিত। প্রবন্ধ লিখেছেন প্রচুর। জ্ঞান-তাত্ত্বিক জগতেও তার অবাধ বিচরণ। এসব কিছুই তার সাহিত্য বোধকে সমৃদ্ধ করেছে। অনুবাদ নিয়ে তার বোঝাপড়া গভীর।
একে কোনো ভাবেই দ্বিতীয় শ্রেণির সাহিত্য হিসেবে মনে করেন না তিনি। তার সেই বোঝাপড়ার কথা জ্ঞান-তাত্ত্বিক সংশ্রব আর মৌলিক সাহিত্যচর্চার অভিজ্ঞতার আলোকেই বলেছেন এখানে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান]

অলাত এহ্সান : আপনি অনেকদিন যাবত লেখালেখি করছেন, অনুবাদ করছেন। অনুবাদক হিসেবে আপনার একটা পরিচিতিও দাঁড়িয়েছে । তা, কত দিন যাবত অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : ধন্যবাদ। প্রথমে একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার যে আমি শুধু অনুবাদক নই। এই ধরনের পরিচয়ে আমি খুব স্বাচ্ছন্দ্যও বোধ করি না। কারণ আমার যে কয়টি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে তার প্রায় সমসংখ্যক মৌলিক প্রকাশনা রয়েছে, যার মধ্যে ৪টি গল্পগ্রন্থ (স্বপ্নঘোড়ার সওয়ারী, চোখ, স্বপ্নদহন ও জীবননামতা, খেরোখাতার জীবন), একটি গবেষণা গ্রন্থ, ৩টি শিল্পকলাবিষয়ক গ্রন্থ, ফিলিস্তিনি কবি মাহমুদ দারবিশ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী একবাল আহমেদকে নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থ ইত্যাদি। তবে সব লেখকের মতো আমার লেখালেখির শুরু কবিতা দিয়ে নয়। কবিতা আমার আসে না। আজ থেকে আড়াই দশক আগে আমি লেখালেখি শুরু করেছি প্রবন্ধ দিয়ে এবং দীর্ঘসময় দৈনিক পত্রিকা, লিটল ম্যাগ ও একাডেমিক জার্নলের জন্য প্রচুর প্রবন্ধ লিখলেও আমার প্রবন্ধের কোনো সংকলন এখনো প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু আমার ধারণা, আমার প্রবন্ধই মানুষ বেশি পড়েছেন। তবে এটা আমার কোনো আক্ষেপের জায়গা নয়। গ্রন্থ আজ নয়তো কাল প্রকাশিত হবে। আমি মূলত লেখক। আর অনুবাদ লেখনীকর্মেরই অংশ। এই দুইয়ে একটি বিভক্তিরেখা টানার প্রবণতা সবসময় ছিল, এখনও আছে। কারণ আমাদের দেশে যারা অনুবাদ করেন তাদের বেশিরভাগই সৃষ্টিশীল লেখক নন। কিন্তু অনুবাদও একটি নতুন সৃষ্টি। একে Translation না বলে Transcreation বললে ভালো হয়। আর সৃষ্টিশীল লেখকের হাতেই বোধহয় অনুবাদ সাবলীল হয়ে ওঠে। বিষ্ণু দে’র এলিয়ট অনুবাদের প্রসঙ্গ টানা যেতে পারে। কেউ হয়তো পাল্টা দৃষ্টান্ত হিসেবে মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম বলতে পারেন। তারপরও আমি মনে করি, সৃষ্টিশীল লেখকদের অনুবাদের কাজ বেশি করা উচিত। এক্ষেত্রে ইমরে কার্তেশকে মনে করিয়ে দিতে চাই। তার দেশে তাকে সবাই অনুবাদক হিসেবে জানত, কিন্তু সেই মানুষই যখন ‘ক্যাডিস ফর আ চাইল্ড নট বর্ন’-এর জন্য নোবেল পেলেন তখন তার মৌলিক লেখনীর ক্ষমতা সম্পর্কে সবাই অবগত হলেন। বিশ্বসাহিত্যে এ রকম অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে যে মৌলিক বা সৃষ্টিশীল লেখকরা ভালো অনুবাদকও বটে। তবে আমাদের দেশে অনুবাদকে বোধহয় দ্বিতীয় শ্রেণির সাহিত্য বলে মনে করা হয়। তাই অনুবাদক হিসেবে ছাপ লেগে গেলে মৌলিক লেখকের পরিচয় ন্যূন হয়ে পড়ার আশংকায় অনেকে অনুবাদে হাত দিতে চান না। এই অমূলক ভয় কাটিয়ে উঠে যোগ্য লেখকরা যদি অনুবাদকর্মে এগিয়ে আসেন তাহলে তা সাহিত্যের জন্য ভালো হবে বলে আমার ধারণা।

অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ। আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কি রকম?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : সব লেখনীই একটি পরিণত মাত্রা দাবী করে। সেক্ষেত্রে প্রস্তুতির সাথে সাথে চর্চার বিষয়টিও জরুরি। খুব প্রস্তুতি নিয়ে লেখালেখিতে আসার দৃষ্টান্ত বেশি নয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তো বন্ধুদের সাথে বাজি ধরে লিখতে এসেছিলেন। লিখতে লিখতেই লোকে লেখক হন। শুরুর দূর্বলতা কাটিয়ে পরিণত হয়ে ওঠেন। তবে আমাদের এখানে বিষয়টা একটু আলাদা মনে হয়। অনেকের অনুবাদ পড়লে মনে হয় যে কাজটা সম্পর্কে তাদের সচেতনতার ঘাটতি আছে। অনুবাদকর্মটি যে সময় বা মেধাশ্রম দাবী করে তা তারা দেন না। দ্রুত কাজটা শেষ করে ছেপে বের করতে পারলেই যেন হয়ে গেল। একে আজকাল বলা হচ্ছে ‘কাজ নামানো’। যদি কোনো কিছু মাথায় বোঝা হয়ে চেপে বসে আর তাকে নামানোর জন্য প্রাণ ছটফট করতে থাকে তাহলে ভালো কাজ হয়? এখানে দায় থেকে দায়িত্ববোধের পরিচয় দিতে হবে বেশি করে। আমার কাছে সব লেখনীই গুরুত্বপূর্ণ। যদি কাজটা আমি করব বলে সিদ্ধান্ত নেই তাহলে পরিপূর্ণ মনঃসংযোগের সাথেই করতে চাই। আর তা না পারলে আমি কোনো কাজের দায়িত্ব নেই না। আর সেই কারণেই আমার গ্রন্থের সংখ্যা কম।

অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো কেবল ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবের সঙ্গেও যুক্ত। অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?

শরীফ আতিক-উজ-জামান : অনুবাদ সম্পর্কে আমাদের পাঠকের দৃষ্টিভঙ্গিও স্বচ্ছ নয়। অনুবাদ আক্ষরিক রূপান্তর নয়। This is a pen-এর আক্ষরিক অনুবাদ ‘এই হয় একটি কলম’ ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ হলেও শিক্ষায়তনিক পঠন-পাঠনে আমরা দীর্ঘদিন বিষয়টিকে মেনে নেওয়ায় বা অবহেলা করায় আমাদের বিশেষ এক mind-set তৈরি হয়েছে, যার ফলে ভাবানুবাদকে আমরা বিচ্যুতি বলে ধরে নেই। তবে তারও কারণ আছে। অনেকে ভাবানুবাদের নামে যথেচ্ছাচার করে মূল বিষয়টিকেই হারিয়ে ফেলেন। সার্থক অনুবাদ এই দুইয়ের সমন্বয়। তারপরও ভাষার কিছু সীমাব্ধতা থাকে যা কখনোই কাটিয়ে ওঠা যায় না। ডানের For God’s sake hold your tongue...এর অনুবাদ রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন, ‘দোহাই তোদের, একটুকু চুপ কর...’ যেখানে মূলের ধাক্কাটি হারিয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ রমানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে এক পত্রে লিখেছিলেন, ‘...প্রত্যেক ভাষা আপন সাহিত্য-সম্পদ কৃপণের মতো বন্ধ করে রেখে দেয়; ভাষান্তরে তার রস পৌঁছাতে দেয় না।’ আবার রবীন্দ্রনাথের নিজের ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদও কি মূলের স্বাদ দেয়? অনেক শব্দের সঠিক প্রতিশব্দ পাওয়া যায় না। বাংলা ‘অভিমান’ শব্দের ইংরেজি কী? ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা’-এর অনুপ্রাস কীভাবে ইংরেজিতে আসবে? অনুবাদে ৩টি বিষয় হামেশাই ঘটে: ১. Loss of information (তথ্যের হানি),২. Addition of information (তথ্যের সংযুক্তি) ও ৩. Skewing of information (তথ্যের বিকৃতি)। ভাষায় কাঁচা দখল নিয়ে অনুবাদকর্মে হাত না দেওয়াই ভালো। আবার রবীন্দ্র-গবেষক আবু সায়ীদ আইয়ুব ‘গীতাঞ্জলি’ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রথমে উর্দুতে, পরে ইংরেজিতে, কিন্তু তারপরও তার তৃষ্ণা মেটেনি, তিনি বাংলা ভাষা শিখে মূল বাংলায় গীতাঞ্জলি পড়েছিলেন। তাহলে কি অনুবাদ অপ্রয়োজনীয়? এর উত্তর হলো, না। ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা আছে। কয়টি ভাষা মানুষ শিখতে পারে? ভীনদেশি বা ভিন্নভাষার সাহিত্য অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অনুবাদের বিকল্প নেই। কিন্তু যারা কাজটি করবেন তাদের ভাষার ওপর পাকা দখল ও সমৃদ্ধ সাহিত্যজ্ঞান জরুরি। নিজের ক্ষেত্রে উল্লেখিত বিষয়গুলোর দিকে খেয়াল রেখে কাজ করার চেষ্টা করি, কখনো কখনো একটা যথাশব্দ খুঁজে পেতে অনেক সময় ব্যয় হয়। তারপরও হয়তো সীমাবদ্ধতার কাছে আত্মসমর্পন করতে হয়। সেই অসহায়ত্ব মেনে নেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না।

এহ্সান : একজন লেখক তো লেখায় মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ—ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত অনুবাদক আছেন, যারা একজনকে প্রধান করে অনুবাদে সাফল্য সমৃদ্ধি দেখিয়েছেন। আপনার কি মনে হয় যে, অনুবাদের সাফল্যের জন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক? বা ভাল অনুবাদের জন্য এটা একটা দিক?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : ফিটজেরাল্ড মৌলিক কবি ছিলেন। কিন্তু তারপরও তার খ্যাতি ওমর খৈয়ামের সফল অনুবাদক হিসেবে। এরকম আরো দুই একটা দৃষ্টান্ত হয়তো দেওয়া যাবে, কিন্তু আমি মনে করি না যে একজন লেখককে নির্বাচন করেই অনুবাদকর্ম এগিয়ে নিতে হবে। আর ভালো অনুবাদের জন্য এটা বিশেষ কোনো দিক নয়। বিশেষ দিকগুলোর কথা  ইতোমধ্যেই বলে ফেলেছি। আরেকটু যোগ করতে চাই, আর তা রবীন্দ্রনাথের বয়ানে। একবার সুধান্দ্রনাথ দত্তকে তিনি এক পত্রে লিখেছিলেন, ‘সবসময় প্রত্যেক শব্দ সুনির্দিষ্ট একটি অর্থই বহন করে তা নয়। সুতরাং অন্য ভাষায় তার একটিমাত্র প্রতিশব্দ খাড়া করবার চেষ্টা বিপত্তিজনক। ‘ভরসা’ শব্দের একটি ইংরেজি প্রতিশব্দ Courage আরেকটি Expectation। আবার কোনো কোনো জায়গায় দুটো অর্থই একত্রে মেলে, যেমন,
নিশিদিন ভরসা রাখিস
ওরে মন হবেই হবে।
এখানে Courage-ও বটে Hope-ও বটে। সুতরাং ইংরেজিতে তরজমা করতে গেলে ও দুটোর কোনোটাই চলবে না। তখন হবে-
Keep firm the faith, my heart
It must come to happen
তাই অনুবাদকে অতি সহজ কোনো কাজ বলে ভেবে নেওয়া ঠিক নয়।

এহ্সান : লেখার সঙ্গে, বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে দেশটির ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদি গভীর ভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য লেখকের দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। আপনি যেমন একটা ভাষা বা ওই ভাষাভাষি সাহিত্য গোষ্ঠীকে বেছে নিয়েছেন। অনুবাদের দক্ষতা অর্জন, ভাল অনুবাদের জন্য কোনো একটা দেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেয়া উত্তম কি না। আপনি কি মনে করেন?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : কোনো একটি ভাষা বা দেশ বেছে নিলেই সফল অনুবাদ সম্ভব হবে এমন নয়। ইংরেজি আমরা প্রতিষ্ঠানিকভাবে চর্চা করি বলে এই ভাষার সাথে আমাদের পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু এই পরিচয় ভাষার ওপর দখল অর্জনের ক্ষেত্রে যে সহায়তা করে না তার ভুরি ভুরি প্রমাণ আমাদের সামনে আছে। তবে দেশ-সংস্কৃতি-পুরাণ সম্পর্কিত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কোলরিজের The Rime of the Ancient Mariner-এর ‘The wedding guest here beat his breast’ লাইনটি কঙ্গো, এঙ্গোলা ও জাম্বিয়ার Bantu ভাষার অন্তর্গত Chowke ভাষায় অনুবাদ করলে অর্থ দাঁড়ায় ‘নিজেকে অভিনন্দিত করা’, যা মূল ভাবের সম্পূর্ণ বিপরীত। যেমন ‘লাল রঙের অজস্র রকমফের রয়েছে’ ইংরেজিতে : red/purple/crimson/vermilion/mauve ইত্যাদি। সাংস্কৃতিকভাবে অভ্যস্ত (culturally conditioned) শব্দের গূঢ়ার্থ জানা জরুরি।

এহ্সান : অনুবাদ করতে গিয়ে অনুবাদক একটি সাহিত্য জানছেন। তার সঙ্গে একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে জানছেন। এক্ষেত্রে অনুবাদকের তৃপ্তিটা আসলে কোথায়, সাহিত্য অনুবাদে, না ওই দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে জানায়?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : দু’টোই। নিজে সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অন্যের জানার জন্য পথ তৈরি করছেন।

এহ্সান : প্রায়ই শোনা যায়, মন্তব্যের ছড়াছড়িও আছে যে, অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়। তাহলে অনুবাদকে সাহিত্য হয়ে ওঠায় অন্তরায়টা কোথায়? কীভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠতে পারে?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : অনুবাদ অবশ্যই সাহিত্য, তবে তাকে সাহিত্য করে তুলতে হয়। যে কাজটি করবেন অনুবাদক তার সার্থক অনুবাদের মাধ্যমে। আর কীভাবে সার্থক অনুবাদ সম্ভব তা নিয়ে যেহেতু অনেক কথা বলেছি তাই বিষয়টি বোধহয় এর মধ্যেই পরিষ্কার হয়েছে।

এহ্সান : আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা, বিশেষত ইংরেজি থেকে। আমরা তাকে পাচ্ছি তৃতীয় ভাষা হিসেবে। এক্ষেত্রে মূল সাহিত্যের নির্যাস পাচ্ছি না,  বা সরাসরি সংযোগ স্থাপন হচ্ছে না। আমরা কি ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : তাপটা যেখান থেকেই নিই না কেন, তা কি শুধু পোড়ায় নাকি উষ্ণতা দেয় সেটাই বড় কথা। মূল ভাষা থেকে অনুবাদ করলেই সফল অনুবাদ হবে এমন নয়। আমি বারংবার অনুবাদকের ক্ষমতার ওপর জোর দিচ্ছি। পার্শি বিশি শেলীর এই কবিতটির অনুবাদ নীরেন্দ্রনাথ রায় ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে কেমন হয়েছিল তার দৃষ্টান্ত দেখলেই অনুবাদকের ক্ষমতা সর্ম্পকে একটি ধারণা হবে বলে আমার বিশ্বাস। মূল কবিতার পংক্তিগুলো:
One word is too often profaned
For me to profane it.
One feeling too falsely disdained
For those to disdain it;

নীরেন্দ্রনাথ রায়ের অনুবাদ:

একটি কথা লোকে এত করে কলুষিত,
আমি তাহা করিব না আর
একটি অনুভূতি এত বৃথাই হেলিত
তারে হেলা অযোগ্য তোমার।

রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ:

একটি কথা বারেবারেই পেয়েছে লাঘবতা,
তাহাকে লঘু করিবনাকো আর।
দিনে দিনেই সয়েছে হেলা একটি মনোব্যথা
অবমাননা করো না তুমি তার।

আমার মনে হয় পার্থক্যটা খুব চিনিয়ে দিতে হয় না। প্রথম অনুবাদের দুর্বলতা অনেক। ‘হেলিত’  শব্দটি কি আভিধানিক? কিন্তু কাব্যের খাতিরে মেনে নিলেও তাল-লয়-ছন্দ-অন্তমিলের দুর্বলতা সুস্পষ্ট। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অনুবাদে সেই বিচ্যুতিগুলো অনেকটাই ঢাকা পড়েছে। এটাকেই আমি অনুবাদকের ক্ষমতা বলে বোঝাতে চেয়েছি যা সফল অনুবাদকর্মের জন্য অর্জন করা জরুরি।

এহ্সান : অনেক সময় দেখা যায়, কোনো দেশের-কোনো লেখকের কিছু গল্প বা কবিতা অনুবাদ করেই তাকে সেই দেশ বা লেখকের ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ বা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে দেয়া হচ্ছে। বইয়ের ভূমিকায়ও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু থাকে না যে, এগুলো কেন শ্রেষ্ঠ। কিভাবে বাছাই করা হয়েছে।  সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : এগুলো কিছুটা অজ্ঞতা, বাকিটা ব্যবসায়িক দুরভিসন্ধি। অবশ্যই পাঠক প্রতারিত হচ্ছেন। এটা রোধকল্পে অনুবাদকের বুদ্ধিবৃত্তিক আর প্রকাশকের ব্যবসায়িক সততার বিকল্প নেই।

এহ্সান : আমাদের দেশে যে অনুবাদগুলো হয়, তার অধিকাংশ বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত, মানে ‘বেস্ট সেলার’ বইগুলোর অনুবাদ। এই ধরনের অনুবাদের মধ্যদিয়ে একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : ‘বেস্ট সেলার’ অনূদিত হওয়ায় দোষের কিছু নেই। বরং সেগুলোর খোঁজ পাঠকরা টুকটাক রাখেন বলেই তার চাহিদা তৈরি হয়। মূল ভাষায় স্বাদ গ্রহণের অক্ষমতাও কিন্তু অনুবাদের চাহিদা তৈরি হওয়ার বড় একটি কারণ। কিন্তু আমার দেশের সাহিত্য উপকৃত হবে কি হবে না তা নির্ভর করবে সফল অনুবাদের ওপর। 

এহ্সান : আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যেগুলো ভাল, সাহিত্যের জায়গায় শ্রেষ্ঠ, লেখকও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বহুল আলোচিত নয়। প্রকাশকদেরও তাতে কোনো বিনিয়োগ, উৎসাহ নেই। বহুলালোচিতগুলো হচ্ছে, এগুলো হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে এই ভাল বা মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : প্রকাশককে খুব দোষ দেওয়া যায় কি? তিনি তো বইয়ের ব্যবসায়ি। অর্থ লগ্নি করবেন মুনাফা হবে বলেই। সেক্ষেত্রে পাঠক যাদের চেনেন বা জানেন তাদের বইয়ের অনুবাদই তিনি ছাপবেন লগ্নিকৃত অর্থ ফেরৎ পাওয়ার প্রত্যাশায়। অজানা বা অচেনা লেখকের বই ছাপার আর্থিক ঝুঁকি তিনি নেবেন কেন? তাছাড়া আমাদের বাজার ছোট, বিপনন দুর্বল। বই ছাপার সাথে সাথে অন্তত বিপনন ব্যবস্থাটা ভালো করতে হবে। শুধু মেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ ভালো লক্ষণ নয়। এতে বইয়ের মান কমে যায়। আর ভালো অনুবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনুবাদকের সম্মানীর বিষয়টিও উপেক্ষণীয় নয়। তিনি তার পরিশ্রমের কিছু মূল্য তো প্রত্যাশা করতেই পারেন, যা এখানে পাওয়া যায় না। স্বল্প পরিচিত কিন্তু গুণী লেখকের বইয়ের মানসম্মত অনুবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমীর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ প্রকল্পের আওতায় যোগ্য অনুবাদক নির্বাচনের মাধ্যমে স্বল্প পরিচিত ভালো লেখকদের বইয়ের অনুবাদ করিয়ে নেওয়া সম্ভব। অজস্র লোক দিয়ে এক-আধজনের একাধিক জীবনীগ্রন্থ রচনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অর্থ ব্যয়ের নজীর রয়েছে। তাতে আমাদের সাহিত্য উপকৃত হোক বা না হোক কারো কারো পকেট ভারী হয়েছে। তাহলে অনুবাদের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ প্রকল্প প্রনয়ণ কেন অসম্ভব? আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়িয়ে কাজটি করা গেলে সাহিত্যস্রষ্টা ও পাঠক সবাই উপকৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।

এহ্সান : একটি দেশ যখন উপনিবেশ মুক্ত হয়, স্বাধীন হয়, তার একটা জরুরি কাজ হচ্ছে বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তাশীল বইগুলো ব্যাপক ভাবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই, দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রে আমরা তা-ই দেখি।  সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন বা ইউরোপের ক্ষেত্রে তা ব্যাপক মাত্রায় দেখেছি। আমাদের দেশে তা ব্যাপক মাত্রায় হয়নি বা হয়নি বললেই চলে। এই না হওয়ার ফলে আমাদের দেশে তা কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?
শরিফ আতিক-উজ-জামান : আমরা যে ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ মুক্ত হয়েছি এই বোধটি আমাদের মাঝে প্রবল কি না তা আমাদের বুঝতে হবে। চিনুয়া আচেবে যখন Things Fall Apart লিখেছিলেন তখন বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ তাকে চিঠি লিখে জানিয়েছিল যে এতো তাদের কাহিনি। সেই তালিকায় আমরা ছিলাম কি? এই না হওয়াটা যতটা বেদনার তার চেয়ে বেশি দুর্ভাগ্যের, কারণ তাতে আমরা ইতিহাস চেতনায় পিছিয়ে পড়েছি। শুধু ইতিহাস পাঠেই ইতিহাস চেতনা সমৃদ্ধ হয় না। সাহিত্যে ইতিহাসকে যতটা নান্দনিকভাবে ধারণ করা যায় আর কিছুতে যায় কি? দেরি হয়ে গেছে বলে শুরু করা যাবে না তা নয়। এক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে যে সরকার তাকেই এগিয়ে আসতে হবে।    

এহ্সান : সেক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি বা সম্পাদনা পরিষদ স্থাপন করা দরকার। আপনার কি মনে হয়?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : আসলে আমাদের কোনো পেশাজীবী সম্পাদনা পরিষদ নেই যে কারণে প্রকাশিত গ্রন্থে ভুলের মাত্রা অনেক বেশি থাকে। শিল্পজ্ঞানে সমৃদ্ধ তরুণরা প্রচ্ছদশিল্পে আত্মনিয়োগ করায় বইয়ের চেহারা ভালো হচ্ছে বটে, কিন্তু মূল যে বিষয়টি সেটাই উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। বিদেশে নোবেল লরিয়েটের বইও কিন্তু সম্পাদনা টেবিলে যায়, তারা মন্তব্য লিখে আবার তার কাছে ফেরৎ পাঠান, তিনি চাইলে তাদের পরিমার্জনের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন, না চাইলে নয়। আর ভাষাগত শুদ্ধতা সংশোধনের বিষয়টি বোর্ডের নিজস্ব এক্তিয়ার। তাই ধারণাটি যুগোপযোগী।   

এহ্সান : অনুবাদের ক্ষেত্রে ট্যাকনিক্যাল শব্দগুলো ছাড়াও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সংকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। কি ইংরেজি কি অন্য - যে ভাষার কথাই বলি। আবার আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কি করনীয়?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : এক্ষেত্রেও বাংলা একাডেমীই একমাত্র প্রতিষ্ঠান যারা দায়িত্ব নিয়ে কাজটি করতে উদ্যোগী হবেন। অভিধান, পরিভাষা বা অন্যান্য কোষগ্রন্থ ছাপার দিকে তাদের নজর দিতে হবে বেশি। আর একবার ছেপে ছেড়ে দিলেই হবে না। প্রতি ৫ বছর পর পর পরিমার্জনের কাজটিও করতে হবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ ব্যাপারে গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নওয়ার এখনই সময়। ব্যক্তি উদ্যোগে এই কাজগুলো করা অসম্ভব, উচিতও নয়। বোর্ড গঠনের মাধ্যমে কাজটি করলে তা গুরুত্বপূর্ণ ও প্রতিনিধিত্বশীল হয়ে ওঠে।

এহ্সান : আগেও বলেছি, প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হচ্ছে। তার সবই জনপ্রিয়, বহুলালোচিত নয়তো পুরষ্কার প্রাপ্ত গ্রন্থ। তার বাইরে অনুবাদকদেরও কোনো আবিষ্কার দেখছি না। একজন অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক, যিনি ভাল লেখেন, কিংবা কোনো  বই যেটা উঁচু মানের। এটা অনুবাদকের দুর্বলতা, না কি?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : কেন পরিচিত লেখকের বই বেশি অনূদিত হয়ে ছাপা হয় সে সম্পর্কে বোধহয় বলেছি। আর অনুবাদকের দুর্বলতার বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নতুন প্রতিশ্রুতিশীল লেখক বা অপরিচিত ভালো লেখকদের সম্পর্কে অনুবাদকের তথ্যশূন্যতা থাকতে পারে। কিংবা তিনি করতে চাইলেও ছাপার জন্য প্রকাশক নাও মিলতে পারে। সেক্ষেত্রে তিনি কিন্তু অসহায়। তাই অনেক বিষয়কে ঠিকঠিক মেলাতে পারলেই কেবল একটি ভালো অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করা যায়।

এহ্সান : বুদ্ধদেব বসুর প্রসঙ্গ ধরেই আসে—রবার্ট ফ্রস্ট, টি এস এলিয়ট, শার্ল বোদলেয়ার, শাহনামা অনুবাদের কথা। এগুলো অনেকেই অনুবাদ করেছেন। কিন্তু তা শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলামের মতো কেউ করতে পারেননি, ভাল বা জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলেই কি সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনার কি মনে হয়?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : অনুবাদক সৃষ্টিশীল লেখক হলে তার অনুবাদ যতটা সাহিত্য হয়ে উঠবে ততটা অন্যের হাতে না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আপনি যে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন তার সাথে আরো অনেক কিছু যোগ করা সম্ভব। গল্প বা কথাসাহিত্যের শাখায় যারা দক্ষতার সাথে বিচরণ করছেন তাদের হাতে এর অনুবাদ হলে ভালো হতে পারে যদি দুটি ভাষায়ই তাদের পাকা দখল থাকে। নইলে কোথাও না কোথাও খামতি থেকে যাবে। তবে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তও যে নেই তা নয়। তারপরও আমার মত হলো, মৌলিক সাহিত্য স্রষ্টাদেরই বেশি করে অনুবাদের কাজ করা উচিত।

এহ্সান : অনুবাদ তো দুইভাবেই হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশি ভাষায়, দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায়। আমাদের সাহিত্য কিন্তু সে ভাষায় যাচ্ছে না। এর কারণ কি? এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় কি বলে মনে করেন?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : বাংলা সাহিত্য বেশি করে অনূদিত না হওয়ায় তা বৈশ্বিক হতে পারছে না। ভিনদেশের মানুষ আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারছেন না। এখানে আমরা অনেক দেশ থেকে পিছিয়ে আছি। সোমালিয়ার মতো দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশের লেখক নুরুদ্দিন ফারাহ অনেকদিন থেকেই নোবেলের হ্রস্ব তালিকায় না হলেও ২০-২৫ জনের মধ্যে থাকছেন। তার লেখনীর ক্ষমতাকে শ্রদ্ধা করেই বলতে চাই যে, বইগুলো ইংরেজিতে লেখা না হলে কি তা সম্ভব হতো? অনেক নোবেল লরিয়েটের লেখা পড়ে আফসোস হয় যে, এর চেয়ে অনেক ভালো লেখক আমাদের বাংলা সাহিত্যে আছেন। কিন্তু তার সাহিত্য অনূদিত না হওয়ায় তিনি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে অপরিচিত থেকে যাচ্ছেন। উদ্যোগহীনতাই অনুবাদ না হওয়ার একমাত্র কারণ। তবে সম্প্রতি এ বিষয়ে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রশংসাযোগ্য উদ্যোগ নিয়েছে। লেখক কাজী আনিস আহমেদের উদ্যোগে প্রথম দফায় বাংলাদেশের ৪ জন কথাসাহিত্যিকের উপন্যাস ইংরেজিতে অনূদিত হতে যাচ্ছে। যদিও এর আগে এস এম নজরুল ইসলামের অনুবাদে হোসেনউদ্দিন হোসেনের ‘প্লাবন ও একজন নূহ’ এবং কায়সার হকের অনুবাদে নাসরীন জাহানের ‘উড়ুক্কু’ ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আমি নিজে হোসেনউদ্দিন হোসেনের ‘ইঁদুর ও মানুষেরা’ (উপন্যাসটি কোলকাতার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সম্মান ও স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠ্য) অনুবাদ করে প্রকাশকের অপেক্ষায় ২ বছর ধরে অনলাইন পাবলিশার্স ডেস্কে ফেলে রেখেছি, যদিও অর্থলগ্নির শর্তে অনেকেই ছাপতে আগ্রহ দেখিয়েছেন, কিন্তু স্ব-পুঁজি বিনিয়োগে বই ছাপানোটা খুব যৌক্তিক বা সম্মানের নয় বলেই আমি সে প্রস্তাবে সাড়া দেই নি। এখানে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আমাদের সাহিত্যের পরিচিতির ব্যাপ্তি বাড়াতে হলে অনুবাদের বিকল্প নেই বলে আমি মনে করি।

এহ্সান :  অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকে ভাষা, অনেকে ভাব, অনেকে মূলবক্তব্য অনুসরণ করেন। এতে কি একটি সাহিত্যের প্রকৃতাবস্থার হের ফের ঘটে যায় না?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : আসলে উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনো একটিকে গুরুত্বহীন করে ভালো অনুবাদ প্রত্যাশা করা যায় না। আবার কী কী কারণে অনুবাদ দুর্বল হয় সে বিষয়ে বলেছি। তবে সার্থক অনুবাদেও কিছু খামতি নজরে পড়ে যাকে অনুবাদের সীমাবদ্ধতা হিসেবে মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

এহ্সান : অনুবাদকের স্বাধীনতা­—শব্দ তৈরি, বাক্য ভাঙা ইত্যাদি দিক— অনেকে সামনে আনেন। এটাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? তা ছাড়া অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীনতা আছে কি?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : অনুবাদক স্বাধীন তবে স্বেচ্ছাচারী নন অর্থাৎ তার স্বাধীনতার একটি সীমা বেঁধে দেওয়া আছে। শব্দ তৈরির বিষয়টি ব্যাকরণের নিয়মে মেনে হলে ভালো হয়, তবে কবিতার ক্ষেত্রে সে নিয়মও অনেক সময় শিথিল হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, ‘ঘন মেঘে আঁধার হল দেখে, ডাকতেছিল শ্যামল দুটি গাই’, কিংবা ‘আমি কোথায় যাব কোথায় যাব ভাবতেছি তাই একলা বসে’ তখন ‘ডাকতেছিল’ ও ‘ভাবতেছি’ শব্দ দুটো নিয়ে কি আমাদের কোনো অস্বস্তি হয়? কারণ আভিধানিকভাবে চিন্তা করলে শব্দ দুটো হবে ‘ডাকছিল’ বা ‘ডাকিতেছিল’ এবং ‘ভাবছি’ বা ‘ভাবিতেছি’। কিন্তু পয়ার মেলাতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ যা করেছেন তা সুর-লয়-তালে পড়ে এবং সর্বোপরি কানে মানিয়ে যায় বলে কোনো প্রশ্ন ওঠে না। আর যোগ্যলোকেরা কিছু সৃষ্টিশীল কর্তৃত্ব অর্জন করেন যা স্বীকার করে নিলে ভাষা বা সাহিত্যের কোনো ক্ষতি হয় না। বাক্য ভাঙার ক্ষেত্রে প্রাঞ্জলতাই একমাত্র লক্ষ্য। জটিল বা যৌগিক বাক্য ভেঙে ফেলাতে তাই দোষের কিছু নেই, বরং কখনো কখনো তা অনিবায হয়ে পড়ে।

এহ্সান : অন্য একটি ভাষায় লেখা অনুবাদ হচ্ছে। লেখক তা জানছেন না, রয়েলটি পাচ্ছেন না। রয়েলটি না হয় গেল, কিন্তু তথ্যটি জানা বা মূলানুগ অনুবাদের জন্যও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যেতে পারতো। তাও হচ্ছে না। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : রয়্যালটি দেওয়ার ভয়েই এই কাজটি করেন না। তবে বলতে দ্বিধা নেই যে, কাজটি নৈতিকতা সমর্থিত নয়। মৃত লেখকদের ক্ষেত্রে কার সাথে যোগযোগ করা হবে সে বিষয়ে সমস্যা থাকলেও জীবিত লেখকদের বেলায় তা থাকার কথা নয়। বিষ্ণু দে এলিয়টকে তার কৃত অনুবাদগ্রন্থের একটি কপি উপহার দিয়েছিলেন, তিনি খুশী হয়েছিলেন। অনেক সময় ওরা রয়্যালটি প্রত্যাশাও করেন না। আমাদের বাজার ছোট, খুব মুনাফা যে হয় না তা তারাও বোঝেন। তাই লিখিত বা মৌখিক অনুমতি নেওয়াটা সৌজন্যের মধ্যে পড়ে। যেমন- এ বছর আমি ফরাসি নবীন ঔপন্যাসিক ফ্লোরেন্স নোয়াভিলের ‘লা এটাচমেন্ট’ অনুবাদ করেছি যা কাগজ প্রকাশন ছেপেছে, এবং তারাই তার অনুমতি সংগ্রহ করেছিলেন এবং কোলকাতা বইমেলায় তিনি এলে তাকে একটা কপি উপহার দিয়েছেন। তিনি খুব খুশি হয়েছেন। এটা অনুবাদকের জন্য আরেক প্রাপ্তি।

এহ্সান : লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে অনুবাদের তেমন পেশাদারিত্ব দেখছি না। তবে অনেকে পেশাদার অনুবাদক হয়ে ওঠতে চান। এটা আনন্দের। অনুবাদের মানোন্নয়নের জন্য পেশাদারিত্বের ভূমিকা কি?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : যে কোনো কাজের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পেশাদারিত্ব জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে মৌলিক লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেওয়াইতো সম্ভব হয়ে উঠছে না, সেখানে
অনুবাদকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করে একজন মানুষ টিকে থাকতে পারবেন কি না-সে ব্যাপারে আমার সন্দেহ আছে।
এহ্সান : এই প্রসঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এই মুহূর্তে দেশে যে অনুবাদগুলো হচ্ছে, বইয়ে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে তার মান নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট? আপনার চোখে কারা ভাল অনুবাদ করছে?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : একটু সংকোচের সাথেই বলতে হচ্ছে, না অনুবাদের সামগ্রিক মান নিয়ে আমি খুব সন্তুষ্ট নই, আর অনেকে অনুবাদ নিয়ে যথেচ্ছাচার করছেন এবং তা জেনেশুনেই। সেপ্টেম্বরে যে লেখক নোবেল পাচ্ছেন ফেব্রুয়ারিতে তার বই অনূদিত হয়ে মেলায় চলে আসছে। মাত্র ৪-৫ মাসে ২০০-২৫০ পৃষ্ঠার বইটি কীভাবে অনূদিত হয়-ভেবে আমি অবাক হয়ে যাই। আর ক্ষুব্দ হই পাতা উল্টালে। এই পাঠক প্রতারণা বন্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু কিভাবে? পাঠক যতক্ষণ এদের প্রত্যাখ্যান না করছেন ততক্ষণ এটা চলবে। আর পাঠকরা তখনই প্রত্যাখ্যান করবেন যখন তারা ভালো অনুবাদ হাতে পাবেন।
কেউ কেউ ভালো করছেন, তবে খুব উচ্ছ্বাসের সাথে উল্লেখ করার মতো কোনো নাম দেখছি না।

এহ্সান : লেখালেখির এখন বহু মাধ্যম তৈরি হয়েছে। এখনো নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে লিটল ম্যাগকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়। অনেকে অনুবাদক হওয়ার চিন্তাও করেন। আবার গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের ভাল ম্যাগ থাকলেও অনুবাদের তেমন লিটলম্যাগও নেই। অনুবাদক তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমটি আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? কিভাবে অনুবাদ তৈরি হবে?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : আসলে মাধ্যমটা এখন আর গুরুত্বপূর্ণ নয়। এখন ওয়েব পোর্টালে লেখা যায়। বর্তমানে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য যথেষ্ট দুর্বল হয়ে গেছে। ৪ পৃষ্ঠার ২ পৃষ্ঠাই বিজ্ঞাপন গিলে খেয়েছে। বাকি ২ পৃষ্ঠায় কতটুকু আর তুলে ধরা যায়। পত্রিকাওয়ালারা বোধহয় সাহিত্যকে আর গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারছেন না। কাগজের মালিকরা ব্যবসায়ী। সাহিত্যে ব্যবসা হয় না। তার চেয়ে বিজ্ঞাপন ছাপলে পয়সা আসে। ওরা বোধহয় মনে করেছেন যে, শরীরের একটি অঙ্গ বেড়ে যাওয়াকেই স্বাস্থ্য বলে। তবে বিকল্প এসেই যায়। তাই হা-পিত্যেশ না করে নতুন মাধ্যমের দিকে মনোনিবেশ করা উচিত। মাধ্যমটা প্রকাশের জন্য জরুরি, কিন্তু অনুবাদকের জ্ঞান, অধ্যবসায় ও অভিনিবেশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এহ্সান : অনুবাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার/পদক দেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের দেশে মানসম্মত অনুবাদের ক্ষেত্রে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে? আদৌ তা রাখছে কি না?
শরীফ আতিক-উজ-জামান : পুরস্কার হলো কাজের স্বীকৃতি। তা দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। তবে পুরস্কার প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতি সম্মান রেখেই বলতে চাই যে সবসময় স্বীকৃতি সঠিক লোকের হাতে পড়ে না। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলেও এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। আর মানসম্মত অনুবাদ পেতে রাষ্ট্রের কোন ধরনের ভূমিকা থাকা দরকার সে সম্পর্কে আগেই বলেছি। অনুবাদকে আমি দেখি সাহিত্যের বিনিময় মাধ্যম হিসেবে। পুরস্কার প্রদানের আগে মানসম্মত অনুবাদ পাওয়ার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অবশ্যই ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

অনুবাদক পরিচিতি পরিচিতি
শরীফ আতিক-উজ-জামান
জন্ম: ১৯৬৫ সালের ১২ জুলাই, নড়াইল। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। খুলনার সরকারি ব্রজলাল কলেজে ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। গল্পগ্রন্থ: স্বপ্নঘোড়ার সওয়ারী, চোখ, স্বপ্নদহন ও জীবননামতা, খেরোখাতার জীবন। গবেষণা: শিল্প ও সাহিত্যে তেভাগা আন্দোলন। শিল্পকলা: চিত্রকলার সপ্তরথী, দশ পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী, শিল্পকোষ। অনূদিত উপন্যাস: ফো (জে এম কোটেজি), দ্য ব্লুয়েস্ট আই (টনি মরিসন), অ্যাটাচমেন্ট (ফ্লোরেন্স নোয়াভিল); অনূদিত জীবনী: নাইট (এলি উইজেল); অনূদিত প্রবন্ধ : বেকনের নির্বাচিত প্রবন্ধগুচ্ছ; অনূদিত গল্পগ্রন্থ: আমার প্রতিবেশী ও অন্যান্য গল্প, যেদিন স্টালিন মারা গেলেন, বিগতপ্রাণের বিশ্বকোষ; সাক্ষাৎকার: কথায় কথায় : ফস্টার থেকে পামুক; সম্পাদিত গ্রন্থ : একবাল আহমেদ : পাঠ ও বিবেচনা, মাহমুদ দারবিশ: পাঠ ও বিবেচনা।০

সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান


জন্ম ঢাকা জেলার অদূরে নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ ও ঢাকা কলেজে। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে।০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন