বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

‘শুধুই ভাষাজ্ঞান দিয়ে তো আর ভালো অনুবাদ হয় না’

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার : বিকাশ গণ চৌধুরী

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান

[কবিতা ও গল্প লিখেন বিকাশ গণ চৌধুরী। তার অনুবাদও প্রসাদগুণসম্পন্ন। একাধিক ভাষা থেকে অনুবাদ করেন তিনি। অনুবাদের জন্য মননশীল সাহিত্য নির্বাচন—সাবলিল ভাষা জ্ঞানই নয়; সাহিত্য সংশ্লিষ্ট মিথ-ইতিহাস-দর্শনও তিনি জেনেনেন সমান গুরুত্বে। একটা ভাল অনুবাদের জন্য বহুবার খসড়া করতে তিনি ক্লান্ত হন না।
গল্পে অন্তঃশক্তিতে তিনি গল্পকার আবিষ্কার করেন। যেজন্য তার অনুদিত সাহিত্যে বিশেষ স্বাদ পাওয়া যায়। সাহিত্যের মতো কথা বার্তায়ও তিনি নির্মেদ ও ইঙ্গিতময়। তার সঙ্গে কথা-বার্তায় সাহিত্যবোধ, অনুবাদ বিবেচন, বিশ্বসাহিত্যের অনুবাদের গুরুত্বসহ অন্যান্য বিষয়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান]


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ, আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কী রকম?

বিকাশ গণ চৌধুরী : ‘পরিণত কাজ’ এই শব্দবন্ধটা ঠিক বুঝতে পারলাম না; অনুবাদের কাজটাকে আমি সিরিয়াসলি নিই কিনা যদি সেটা জানতে চাও তো আমার উত্তরটা ইতিবাচকই হবে। আর প্রস্তুতি—অনুবাদের কাজের জন্য আলাদা বা বিশেষ কোন প্রস্তুতি আমার নেই, ছোটবেলা থেকেই আমি একজন গোগ্রাসী পাঠক, এই আগ্রাসী পাঠাভ্যাসই আমাকে তৈরি করেছে বলে মনে হয়; এর পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের লেখালিখি, কাগজ/বই সম্পাদনা, এইসবও করছি বহুদিন, আর এইসব করতে গিয়ে আমাকে পড়া ছাড়াও নানান পত্রপত্রিকা ঘাঁটতে হয়েছে, ভাষার নানান কায়দাকানুন, প্যাঁচপয়জার রপ্ত করতে হয়েছে, তারপর মূল ভাষায় কবিতা পড়বো বলে ফরাসী ভাষা শিখতে শুরু করি, সেটা মোটামুটি আয়ত্ত করার পর নেরুদা পরার জন্য স্প্যানিশ অভিধানের সাহায্যে গুটিগুটি এগোই..., তা এইসবই আমার অনুবাদকের প্রস্তুতি বলে ধরে নিতে পারো।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো শুধু ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবের অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ তো একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?

বিকাশ গণ চৌধুরী : অনুবাদের এই সমস্যার কথা সকলেই জানেন, তাই কবিতার অনুবাদের ক্ষেত্রে একটা কথা বলি, সব কবিতা কিন্তু অনুবাদ করা যায় না, অন্তত আমার তাই মনে হয়; এক্ষেত্রে ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ এবং রূপকের ব্যঞ্জনা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যেমন—‘এ ভরা ভাদর / মাহ ভাদর / শূন্য মন্দির মোর’, এটাকে একটা ইউরোপীয় ভাষায় অনুবাদ করা কি সম্ভব, আমার তো মনে হয় সম্ভব নয়, তা এরকম লেখা তো অন্য ভাষাতেও আছে, সেগুলো অনুবাদ করা প্রায় অসম্ভব বলেই আমার মনে হয়; তবে ভাবটাকে নিয়ে ভাষার একটু ওলটপালট ঘটিয়ে অনুবাদের চেষ্টা অনেকে করেছেন এবং বলা যায় সফলও হয়েছেন, উদাহরণ হিসেবে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের নাম করি, 

ভের্লেনের ‘Chanson d'automne’-এর প্রথম স্তবক—
Les sanglots longs
Des violons
De l'automne
Blessent mon coeur
D'une langueur
Monotone.

এর অনুবাদ সত্যেন দত্ত করছেন—

কাঁদন আজি হায়,
ধ্বনিছে বেহালায়
শিশিরের;
উদাস করি’ প্রাণ
যেন গো অবসান
নাহি এর!


আবার দেখুন অরুণ মিত্র অনুবাদ করছেন, যা অনেকটাই আক্ষরিক—

হেমন্তের বেহালায়
দীর্ঘ কান্না গুমরায়
এবং আমার
হৃদয়ে কেবলই হানে
ক্লান্তি, অবিচ্ছিন্ন তানে
ক্লান্তির বিস্তার।


এখানে ভের্লেনের কবিতার সঙ্গীত সত্যেন দত্তের অনুবাদে যতটা এসেছে, ফরাসি ভাষাবিদ ও পন্ডিত অরুণ মিত্রের অনুবাদে ততটা আসেনি।

আমি এখনো পর্যন্ত ঐ “এ ভরা ভাদর / মাহ ভাদর / শূন্য মন্দির মোর”-ধরনের কোনকিছু অনুবাদ করিনি, তবে ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ-এর ব্যাপারে বেশিরভাগ সময়ে মূলের ইতিহাস, মিথ এগুলোকেই ব্যবহার করি, সঙ্গে টীকা-টিপন্নী দিয়ে দিই।


অলাত এহ্সান : লেখার সঙ্গে, বিশেষতঃ সাহিত্যের সঙ্গে দেশের ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদি গভীরভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি কি?

বিকাশ গণ চৌধুরী : নিশ্চয়ই, এ ব্যাপারটা অবশ্যই খুব জরুরি।


অলাত এহ্সান : অনুবাদের দক্ষতা অর্জনের জন্য কোন একটা দেশ বা মহাদেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেওয়া উত্তম, তাই না?

বিকাশ গণ চৌধুরী : হ্যাঁ; তবে একটা কথা আছে, যেহেতু বিশ্বের প্রায় সর্বত্রই মানুষের বেসিক অনুভূতির জায়গাটা একই সেকারণে অনুবাদের দক্ষতা সেই অনুভূতির প্রকাশের দক্ষতার ওপরও অনেকাংশে নির্ভরশীল।


অলাত এহ্সান : একজন লেখক তো মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ-ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। এজন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক নয় কি?

বিকাশ গণ চৌধুরী : আমি যেহেতু জীবিকা অর্জনের জন্য অনুবাদ করি না সে-কারণে এটা ঠিক কি বেঠিক বলতে পারবো না; আসলে পাঠক হিসেবে আমার যে লেখা খুব ভালো লাগে, যে লেখার সঙ্গে আমি একাত্মতা অনুভব করি, আমি সেই লেখাই অনুবাদ করি, সেকারণে আমার অনুবাদ করা কবি/লেখক-এর সংখ্যা একের বেশি, তবে একজন কবি বা লেখকের ওপর সারাজীবন বা টানা অনেকগুলো বছর কাজ করতে পারলে সেটা যে খুবই ভালো হয় সেটা তো আমরা বিভিন্ন অনুবাদের ক্ষেত্রে দেখেছি, তবে সেক্ষেত্রে অনুবাদের কাজটা করে পেটের ভাতটা যোগাড়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে।


অলাত এহ্সান : একজন অনুবাদকের তৃপ্তি কোথায়, একটি অনুবাদ করায়, না একটি ভাষা-দেশ-সংস্কৃতি-লেখক সম্পর্কে গভীরভাবে জানার?

বিকাশ গণ চৌধুরী : অবশ্যই অনুবাদ করায়, কারণ সেটা তো তার একটা সৃষ্টি, সৃষ্টির আনন্দ সবসময়ই জানার আনন্দের থেকে বেশি, তোমার কী মনে হয়...


অলাত এহ্সান : প্রায়ই শোনা যায়, অনুবাদ কোন সাহিত্য নয়। অনুবাদের সাহিত্য হয়ে ওঠার অন্তরায়টা কোথায়? অনুবাদ কিভাবে সাহিত্য হয়ে উঠতে পারে?

বিকাশ গণ চৌধুরী : ‘অনুবাদ কোন সাহিত্য নয়’ একথা যারা বলেন তারা নিশ্চয়ই তাদের মাতৃভাষার সাহিত্য ছাড়া অন্য কোন ভাষার সাহিত্য মাতৃভাষায় পড়েন না, আমাদের এই উপমহাদেশের কথা যদি ধরি তাহলে আমরা দেখবো যে এখানকার পাঠকেরা মাতৃভাষার সাহিত্য পড়ার পাশাপাশি ইংরেজিতে প্রকাশিত সাহিত্য পড়েন, কিন্তু একটু খুঁটিয়ে দেখলেই আমরা দেখবো যে এই ইংরেজিতে পড়া বইগুলোর বেশিরভাগটাই ইংরেজিতে অনুবাদ হওয়া অন্য ভাষার বই, তা অনুবাদ যদি সাহিত্যই না হবে তবে তারা সেই বইগুলো পড়ে সাহিত্যের স্বাদ কেমন করে পায়, আর আমাদের দেশেতো সিংহভাগ পন্ডিত/অধ্যাপকরা তো অনুবাদ পড়েই বিশ্বসাহিত্য এবং/বা তার তত্ত্ব আওড়ান, এরপরেও যদি অনুবাদ সাহিত্য না হয় তবে সেটা কী আমি জানি না; তবে সামাজিকভাবে আমাদের দেশে, বিদেশের কথা বলতে পারবো না কারণ বিদেশে আমি কখনও যাই নি বা কোন বিদেশি আনুবাদকের সঙ্গে এবিষয়ে কখনও আমার কোন কথা হয় নি, অনুবাদকের লেখকের মতো মর্যাদা নেই বা বলা ভালো প্রায় কোন মর্যাদাই নেই,আমাদের এখানে যে অন্যভাষার লেখা থেকে টুকে/ঝেড়ে লেখে তার মর্যাদা অনুবাদকের থেকে বেশি...

একটা ভালো লেখা আর খারাপ লেখার মধ্যে যে ফারাক, একটা অনুবাদের সাহিত্য হয়ে ওঠা আর না হয়ে ওঠার মধ্যে সেটাই ফারাক, অনুবাদ কবিতা/লেখাকে প্রথমেই তার লক্ষ্য-ভাষায়, অর্থাৎ যে ভাষায় তিনি লিখছেন, ভাষাব্যবহারে সেই ভাষার ভালো সাহিত্যের মানে পৌঁছতে হবে, এর অন্যথা করার উপায় নেই...


অলাত এহ্সান : অনেকসময় দেখা যায় কোন লেখক বা দেশের কিছু গল্প অনুবাদ করেই তাকে ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’ বলে দিচ্ছে, বইয়ের ভূমিকাতেও এগুলো কেন শ্রেষ্ঠ গল্প সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু থাকে না, বা গল্পগুলো কিভাবে বাছাই করা হয়েছে তাও বলা থাকে না; সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?

বিকাশ গণ চৌধুরী : এ বিষয়ে কিছু বলা বাহুল্য মাত্র।


অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোন ভাষা, বিশেষতঃ ইংরেজি থেকে। তাহলে আমরা ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?

বিকাশ গণ চৌধুরী : দেখ মূ্লভাষা থেকে অনুবাদ করা গেলে তো খুবই ভাল, কিন্তু সেক্ষেত্রে অনুবাদককে একটা/দু’টো ভাষার সাহিত্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, এখন অনুবাদকে জীবিকা হিসেবে নেওয়া সম্ভব হলে সেটা হয়তো সম্ভব; কিন্তু আমরা যারাআমাদের ভাললাগার ওপর নির্ভর করে অনুবাদের কাজটা ভালবেসে করি তাদের পক্ষে এটা সবসময় মানা সম্ভব নহয় না, আর মূল ভাষা থেকে না করে ইংরেজি অনুবাদ থেকে করা অনেক ভাল অনুবাদ তো আমরা পেয়েছি; তবে এখানে একটা ‘কিন্তু’ আছে, বিভিন্ন সময়ে অনুবাদ করতে গিয়ে দেখেছি ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের সময় অনুবাদকেরা অনেক বিচ্যুতি ঘটান, তো সেই ইংরেজি অনুবাদ থেকে যদি আমারা বাংলায় অনুবাদ করি তো মূল রচনা থেকে অনেকটাই সরে আসা হয়, কবিতার ক্ষেত্রে এই বিচ্যুতির ঘটনা খুব বেশি, নাটকের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটেছে, ইংরেজি নাটক প্রকাশের বিখ্যাত প্রকাশক, যাদের প্রকাশনাকে আমরা খুব প্রামান্য বলে মনে করি সেই Methuen-ও এর মধ্যে আছে। তবে কী আর করা যাবে, একজন অনুবাদক ক’টা ভাষা শিখবে; যেহেতু আমাদের এখানে আমরা অনুবাদের কাজটা একটা ভালবাসার জায়গা থেকে করি, তাই ওই ‘বালির তাপ’ তো আমাদের নিতেই হবে, নইলে আমরা অনেক ভালো বইয়ের পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হব।


অলাত এহ্সান : আধিকাংশ অনুবাদই বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত মানে ‘বেস্ট সেলার’ বইগুলো হয়ে থাকে। এই অনুবাদ দ্বারা একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?
বিকাশ গণ চৌধুরী : দেখ, বাজার এই ব্যপারে তার ছড়ি ঘোরাবেই, তবে অনেক ভাল সাহিত্যও তো ‘বেস্ট সেলার’ হয়, যেমন ধরো মার্কেজের বইগুলো, ক’দিন আগে দেদার বিকোচ্ছিল পামুখের বই, বা এখন তো হারুকি মুরাকামির বইগুলোও ‘বেস্ট সেলার’... তা এইসব বইগুলো থেকে বেছে কয়েকটার যদি ভাল অনুবাদ হয় তো তা একটা দেশের সাহিত্যের পক্ষে উপকারী হবে বলেই আমার বিশ্বাস; আর এর পাশাপাশি রগ্‌রগে কিছু বইয়ের অনুবাদ তো থাকবেই, সেটা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও থাকে, সেগুলো একেবারে পচা মাল, ও নিয়ে আমাদের না ভাবলেও চলবে।


অলাত এহ্সান : বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যেগুলো ভাল কিন্তু বহুল আলোচিত নয়, যেখানে প্রকাশকরাও বিনিয়োগ করতে চান না, সেক্ষেত্রে আমরা মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?
বিকাশ গণ চৌধুরী : এ ব্যাপারটা দেখবার জন্য তো সরকারি একাদেমি আছে, আমাদের দেশে ‘সাহিত্য আকাদেমি’ এ ব্যাপারটা দেখে। তবে সরকারি ব্যাপার, এরজন্য ধরা-করার বা চেনা-জানার একটা খেলাও চলতে থাকে।


অলাত এহ্সান : একটি দেশ উপনিবেশ মুক্ত হওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তা শীল বইগুলো ব্যাপকভাবে রাস্ট্রীয় উদ্যোগেই দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। আমাদের দেশে তা হয় নি। এটা কি আমাদের দেশের সাহিত্যের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছে মনে করেন?
বিকাশ গণ চৌধুরী : বাংলাদেশে তাদের আকাদেমি কী কী কাজ তা আমি জানি না, কিন্তু আমাদের দেশে সাহিত্য একাদেমি, বাংলা আকাদেমি কিছু কিছু কাজ করেছেন, ব্যবসায়িক প্রকাশন সংস্থারাও অনেক কাজ করেছেন, তবে সরকারি স্তরে আরও কাজ করার অবকাশ ছিল, কিন্তু যেহেতু সরকারি ব্যাপার-স্যাপার রাজনৈতিক নেতা বা তাদের বশংবদ/দলদাসদের দিয়েই প্রায় সবসময় চলে সে-কারণে আমাদের প্রত্যাশা একটু হোঁচোট খায়, তবে আশার কথা আমাদের এপার বাংলায় অনেক লিটিল ম্যাগাজিন আর ছোট প্রকাশক স্বেচ্ছায় এই দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে, আগামীদিনেও আমরা এ ভাবেই চলবো বলে মনে হয়... আর সাহিত্যের ওপর এর প্রভাব তো নিঃসন্দেহে পড়েছে, এবং খুব ইতিবাচকভাবেই পড়েছে বলে আমার বিশ্বাস।


অলাত এহ্সান : ট্যেকনিক্যাল শব্দগুলো ছারাও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সঙ্গকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরি তেমন কোন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কী করণীয়?
বিকাশ গণ চৌধুরী : রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তায় কোন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ ছাড়া একাজ সম্ভব নয়, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় একা কিংবা একসঙ্গে একাজটা করলে একটা কাজের কাজ হয়, আর শুধু পরিভাষার ক্ষেত্রেই নয়, আমাদের এপার বাংলায় তো নতুন নতুন অভিধান প্রকাশ করাও খুব জরুরি, ফরাসি Robert বা Oxford / Cambridge-এর মতন মানের অভিধান এখনও আমাদের পশ্চিমবাংলায় নেই, সেই পুরনো কয়েকটা অভিধান দিয়েই আমাদের কাজ সারতে হচ্ছে, তবে আমাদের বাপের ভাগ্যি কয়েকজন মানুষের অকল্পনীয় পরিশ্রম, প্রজ্ঞা আর উদ্যোগে সেগুলো আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, এই সুযোগে তাঁদের আমার সষ্টাঙ্গ প্রণাম জানাই...


অলাত এহ্সান : অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি স্থাপন করা দরকার। আপনার কী মনে হয় ? আমরা কিভাবে মানসম্মত অনুবাদ পেতে পারি?
বিকাশ গণ চৌধুরী : বাপ্‌রে! আমাদের দেশে/রাজ্যে সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলোর এত দাদাগিরি যে ওসব না হওয়াই ভাল, কারণ দলদাসদের হাতে অন্যান্যদের যা নাকানি-চোবানি খেতে হয় বা অপমান হজম করতে হয়... সেটা না হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগেই যেমন মানসম্মত অনুবাদের চেষ্টা চলছে চলুক, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি এই ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে সন্মান জানিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় তো ভাল, আর পাঠকরা, যারা বইগুলো কিনে পড়বেন, তাদের হাতেই বিচারের ভার থাকুক...


অলাত  এহ্সান : অনেকেই পাঠের জন্য মূলগ্রন্থ পাঠকে গুরুত্ব দেন। লেখক প্রস্তুতি হিসেবে অনুবাদ সাহিত্য পাঠকে আপনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন?
বিকাশ গণ চৌধুরী : মূলভাষায় যারা পড়তে পারেন তারা তো মূলগ্রন্থ পাঠকে গুরুত্ব দেবেনই, মূলগ্রন্থ পাঠের গুরুত্ব সব সময়ই থাকবে এবং সেটা ভীষণ প্রয়োজনীয়ও। আর লেখক প্রস্তুতি হিসেবে অনুবাদ সাহিত্য পাঠ তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে আমার মনে হয়, এতে আমাদের দুনিয়া দেখার জানালাটা বড় থেকে আরও বড় হতে থাকে, মাথার মধ্যে খেলতে থাকে মননের দৈবী সৌরভ, আমাদের প্রতাশার দিগন্তটা ক্রমশ বাড়তে থাকে...


অলাত এহ্সান : প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হয়; তার সবই জনপ্রিয় ও বহুল আলোচিত গ্রন্থ। অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক বা বই, অনুবাদকের তেমন কোন আবিষ্কার নেই। এটা কি অনুবাদকের দূর্বলতা না অন্যকিছু?
বিকাশ গণ চৌধুরী : অনুবাদকের দূর্বলতার ব্যাপারটা কোথা থেকে এল বুঝলাম না, অনুবাদের ব্যাপারে যা হয়ে চলেছে সেটা তো বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চলেছে, আর আমাদের শিক্ষার প্রসারের মানের ব্যাপারটাও সেখানে কাজ করছে, তো বাজে গল্প/কবিতা/উপন্যাসের মতো বাজে অনুবাদের ছড়াছড়ি থাকবেই, আমরা এসব নিয়ে কথা বলবো না, কারণ এসব নিয়ে কথা বলা আর ঘরে বসে অন্ডকোষ কন্ডুয়ন একই ব্যাপার...


অলাত এহ্সান : কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলে সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনি কী মনে করেন?

বিকাশ গণ চৌধুরী : কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলেই সেরাটা পাওয়া সম্ভব হবেই এরকম কোন কথা নেই, অনেক বড় কবি/লেখক খুব ভাল অনুবাদ করেছেন, আবার অনেকের হাতে মূল লেখাটা প্রায় খুন হয়ে গেছে বলা যায়, তাই প্রত্যেক ভাল কবি, গল্পকার ভাল অনুবাদক হবেন এমন কোন কথা নেই তবে একজন দক্ষ অনুবাদক যদি কবি/লেখক হন তো তার কাছ থেকে সেরা অনুবাদটা পাওয়ার সম্ভবনা খুব বেশি থাকে।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো দু’ভাবে হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশী ভাষায় আর দেশী সাহিত্য বিদেশী ভাষায়। আমরা কিন্তু তা দেখছি না। এর কারণ কী? এ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

বিকাশ গণ চৌধুরী : সেই বাজারের পুরণো গল্প...


অলাত এহ্সান : অনেক সময়েই দেখা যায় একই কবিতা/গল্প অনেকে নানান সময়ে করেছেন, আপনিও এরকম একটা কবিতা/গল্প অনুবাদ করলেন, ব্যাপারটা মনোটোনাস হয়ে গেল না? কিংবা আপনার বিশেষত্ব কোথায়?
বিকাশ গণ চৌধুরী : গল্পের ব্যাপারে বলি একই গল্প যদি অনেকে অনুবাদ করেন তবে আমরা ভাষা ব্যবহারের নানান দিক দেখতে পাই কারণ সকলে একই ভাষায় লিখলেও তাদের লিখনটা ভিন্নভিন্ন হয়, আর কবিতার ক্ষেত্রে এই লিখনের ব্যাপারটা ছাড়াও কবিতাটির নানান পাঠ আমাদের সামনে আসে, তাই মনোটোনাস হবার কোন সুযোগই নেই, তবে এ-কথাটাও এ-প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল যে, এই ব্যাপারটা শুধুমাত্র সেই অনুবাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য যেগুলো সাহিত্য হিশেবে উৎরেছে, বাজে অনুবাদ নিয়ে কোন আলোচনা হয় না।
আর আমি যখন এরকম কোন অনুবাদে হাত দিই তখন বুঝতে হবে যে আগে যে অনুবাদগুলো হয়েছে সেগুলো আমাকে পাঠতৃপ্তি দেয় নি, বা আমার কোনও ‘নতুন পাঠ’ আছে যা আমি পাঠকদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।


অলাত এহ্সান : অনুবাদকের স্বাধীনতা বিষয়ে আপনি কী ভাবেন? অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীওনতা আছে কি?

বিকাশ গণ চৌধুরী : হ্যাঁ, অনুবাদকের স্বাধীনতার ব্যাপারটা অনেকটাই কম। অনুবাদককে একটা ঘেরা জায়গার মধ্যে খেলতে হয়, তবে অনুবাদ যেহেতু একটা সৃষ্টিশীল সাহিত্যের কাজ, তাই স্বাধীনতা তার আছেই, ওই সঙ্গীতের মতো, স্বরলিপির ঘেরার মধ্যে থেকেও সঙ্গীতশিল্পী যেভাবে তার স্বাধীনতা, তার স্বকীয়তার প্রকাশ করতে পারেন অনুবাদকও তেমনি এক স্বাধীনতার উপভোগ করেন।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ আমাদের সাহিত্যে কী অবদান রাখছে?
বিকাশ গণ চৌধুরী : সাহিত্যপাঠের যে প্রাথমিক অবদান—আনন্দদান আর প্রজ্ঞার সঞ্চয়, সেসব ছাড়াও অনুবাদ সাহিত্য পাঠে আমাদের জানা-বোঝার দিগন্ত প্রসারিত হয়, আমাদের ভাষার শব্দভান্ডার বাড়ে, অনুভূতি প্রকাশের উপায় বাড়ে, আর যে কথাটা একটু আগে বলেছি আমাদের দুনিয়া দেখার জানালাটা বড় থেকে আরও বড় হতে থাকে, মাথার মধ্যে খেলতে থাকে মননের দৈবী সৌরভ, আমাদের প্রতাশার দিগন্তটা ক্রমশ বাড়তে থাকে...


অলাত এহ্সান : এই মুহূর্তে দেশে যে অনুবাদ হচ্ছে তার মান নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?
বিকাশ গণ চৌধুরী : দেখ, এই অনুবাদের কাজটা ভালোবেসে সিরিয়াসলি এত কম অনুবাদক করেন যে বেশিরভাগ অনুবাদই আমার অপাঠ্য বলে বোধ হয়; আসলে শুধুই ভাষাজ্ঞান দিয়ে তো আর ভালো অনুবাদ হয় না, তার জন্য সাহিত্যবোধ, বিভিন্ন দেশের এবং ধর্মের ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ সম্পর্কে বোঝাপড়া এবং লেখার পটুত্ব থাকা ভীষণভাবে প্রয়োজন; একটা লেখা আমাকে মুগ্ধ করলে তবেই আমি সেটা ভালোবেসে অনুবাদ করার কথা ভাবি, আর আমার অনুবাদ যদি পাঠকের মধ্যে কোন মুগ্ধতাই জাগাতে না পারে তো আমার অনুবাদ ব্যর্থ, আমি ব্যাপারতা এভাবেই দেখি... তবে আমি হতাশ নই, বাংলা ভাষায় অনেক ভাল ভাল অনুবাদ হয়েছে, হচ্ছে এবং হবেও, দেখ, ভাল সাহিত্যের সংখ্যা সবসময়ই কম, তাই ভাল অনুবাদওভুরিভুরি হবে এরকম ভাবাতাই বাতুলতা, তুমি কী বলো?


অলাত এহ্সান : অনুবাদ নিয়ে আপনার চিন্তা, বোঝা-পড়ার সাবলিল সাক্ষাৎকারের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
বিকাশ গণ চৌধুরী : তোমাকেও ধন্যবাদ। গল্পপাঠের পাঠকদেরও ধন্যবাদ। এতে যদি অনুবাদ সাহিত্যের মর্মার্থ, পাঠের উন্নতি রূচি তৈরি সহায় হয়, তাহলে ভাল লাগবে।


অনুবাদক পরিচিতি
বিকাশ গণ চৌধুরী
আদি নিবাস কুমিল্লা জেলার বুড়িচং গ্রাম হলেও, পাহাড় ঘেরা একটা ছোট্ট শহর দেরাদুনে ১৯৬১ সালে জন্ম, ছোটবেলার অনেকটা সেখানে কাটিয়ে বড় হওয়া কলকাতায়, চাকরিসূত্রে অনেকটা সময় কেটেছে এলাহাবাদ আর মধ্যপ্রদেশের রায়পুরে। বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা... লেখেন কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ; ফরাসি, হিস্পানি, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন মন্‌পসন্দ নানান লেখা, সম্প্রতি শেষ করেছেন পাবলো নেরুদার শেষ কবিতার বই ‘El libro de las preguntas’ –এর পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ ‘প্রশ্ন-পুঁথি’। দীর্ঘদিন যুগ্মভাবে সম্পাদনা করেছেন সবুজপত্র ‘বিষয়মুখ’।



সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ(ইন্টারমিডিয়েট) ও ঢাকা কলেজে(অনার্স-মাস্টর্স)। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে।০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন