বুধবার, ১১ মার্চ, ২০১৫

‘অনুবাদ সাহিত্য হয়েই আছে, যদিও তার রূপ ও বৈশিষ্ট্য বদলাচ্ছে হয়তো’

অনুবাদকের সাক্ষাৎকার : জি এইচ হাবীব

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান

[অনুবাদের গভীর মনন ও নিষ্ঠতার জন্য জি এইচ হাবীব অবশ্যই স্মরণীয়। গুরুত্বের বিচার কঠিন ও ঢাউস আকৃতির বইয়ের অনুবাদে তিনি নিবিষ্ট হয়েছে। ইয়স্তাইন গোর্ডারের ‘সোফির জগৎ’ সহ অন্যান্য গ্রন্থ, মার্কেজের আত্মজীবনী ‘গল্পটা বলবো বলে বেঁচে আছি’, ‘নিঃস্বঙ্গতার একশ বছর’ সহ অনেক গ্রন্থই তার বহুল আলোচিত ও মুদ্রিত বই।
বিশ্ব সাহিত্যের অতল থেকে তুলে আনা অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ-ই বাংলাভাষা পাঠকদের দিয়েছেন ‍সিদ্ধহস্তে। অনুবাদগুলো বিষয় বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ। সমাজে জ্ঞানের শূন্যতা পূরণে অনুবাদ বিশেষ অবলম্বন করে তুলেছেন তিনি। অনুবাদের সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে মানের প্রতি অধিক খেয়াল। তার প্রতিটি অনুবাদই পাঠক সমাদৃত। জ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ বিকাশও ঘটিয়েছেন তিনি। প্রস্তুতি আর বোঝাপড়াই নয়, তার চিন্তায়ও গভীর তিনি। নিজেকে ‘অনুবাদকর্মী’ হিসেবেই পরিচয় দিতে চান। তিনি নিভৃতচারী, অনুবাদের ব্রতচারী। সাক্ষাৎকারে নির্মেদ নিতবাক, কিন্তু গভীর ও ইঙ্গিতময়তা তারই পরিচায়ক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন গল্পকার অলাত এহ্সান]


অলাত এহ্সান : আপনি অনেকদিন যাবত লেখালেখি করছেন, অনুবাদ করছেন। অনুবাদক হিসেবে আপনার একটা পরিচিতিও দাঁড়িয়েছে । তা, কত দিন যাবত অনুবাদের সঙ্গে যুক্ত আছেন?

জি এইচ হাবীব : ২৫ বছরের বেশি হবে।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো একটা পরিণত কাজ। আপনার কাছে অনুবাদক হয়ে ওঠার প্রস্তুতি কি রকম?

জি এইচ হাবীব : প্রথম প্রস্তুতি বোধহয়, অন্য সব কিছুর মতোই, কাজটা ভালো লাগা। আর সে ভালো লাগাটা আসে বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থেকে। অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রচুর অনুবাদ পাঠের মাধ্যমে। তারপর, অবশ্যই কাজটা করার ইচ্ছে মনের মধ্যে অংকুরিত হওয়া, শুধু কাজটা ভালোবেসেই। অপরিণত বয়েসে হয়ত প্রথম দিকে খ্যাতি বা অর্থের দিকে নজর থাকতে পারে। কিন্তু পরে এই বোধটি জন্মায় যে কাজ ভালো হলে সম্ভবত সে দু’টো জিনিস আপনা আপনি আসে। কম আর বেশি। মূল কথা হলো, কাজটি ভালো লাগা আর তার পর সেটার অনুশীলন। কাজটি করে যেতে থাকা। বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করা, খোঁজ-খবর রাখা।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো কেবল ভাষার পরিবর্তন নয়, ভাবের সঙ্গেও যুক্ত। অনুবাদের ক্ষেত্রে ভাবের অনুবাদ একটা মৌলিক সমস্যা। আপনি এই সমস্যা দূর করতে কি করেন?

জি এইচ হাবীব : চেষ্টা করি মূল লেখার মেজাজ বুঝতে, মূল লেখকের সং স্কৃতির সঙ্গে ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হতে, তা বুঝতে।


অলাত এহ্সান : একজন লেখক তো লেখায় মেজাজ-মর্জি-ছন্দ-গতি দিয়ে লেখেন। অনুবাদেও সেই মেজাজ—ছন্দের জন্য সেই লেখকের ওপর প্রস্তুতি দরকার। বিশ্বের অনেক বিখ্যাত অনুবাদক আছেন, যারা একজনকে প্রধান করে অনুবাকে সাফল্য সমৃদ্ধি দেখিয়েছেন। আপনার কি মনে হয় যে, অনুবাদের সাফল্যের জন্য একজন লেখককে নির্বাচন করাই ঠিক। বা ভাল অনুবাদের জন্য এটা একটা দিক?

জি এইচ হাবীব : সেটা এক দিক থেকে ভালো। একজন অনুবাদক হয়তো বিশেষ একজন বা দু’জন লেখকের কাজ ও চিন্তা ভাবনার সঙ্গে নিজের একটি নৈকট্য অনুভব করেন। তখন সেই অনুবাদকের কাজের পক্ষে সুবিধে হয়। তবে এটি, আমার ধারণা, সেসব ভাষার পক্ষে বেশি সুবিধেজনক যেসব ভাষায় প্রচুর অনুবাদ হয়েছে। কিন্তু আমাদের বাংলা ভাষা, অনুবাদের ক্ষেত্রে, এখনো সে পর্যায়ে যায়নি বোধহয়। তাই একজন অনুবাদক নানান লেখকের সেরা কাজগুলো অনুবাদে সচেষ্ট হন। একটা সময় হয়তো আসবে যখন তাঁরা বিশেষ কোনো লেখকের দিকে মনোনিবেশ করতে পারবেন।


অলাত এহ্সান : লেখার সঙ্গে, বিশেষত সাহিত্যের সঙ্গে দেশটির ইতিহাস-সংস্কৃতি-মিথ ইত্যাদির গভীর ভাবে যুক্ত। সেক্ষেত্রে অনুবাদের জন্য লেখকের দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে জানা খুবই জরুরি। আপনি যেমন একটা ভাষা বা ওই ভাষাভাষি সাহিত্য গোষ্ঠীকে বেছে নিয়েছেন। অনুবাদের দক্ষতা অর্জন, ভাল অনুবাদের জন্য কোনো একটা দেশ এবং ভাষাকেই বেছে নেয়া উত্তম কি না। আপনি কি মনে করেন?

জি এইচ হাবীব : অনেকটা এ-কথারই জবাব ওপরের দু-একটি প্রশ্নের উত্তরে দিয়েছি।…জরুরি তো বটেই। তবে আমিও কিন্তু বিশেষ কোনো দেশের সাহিত্য নিয়ে কাজ করছি তা বলা যাবে না।


অলাত এহ্সান : অনুবাদকের তৃপ্তিটা আসলে কোথায়, সাহিত্য অনুবাদে, না ওই দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীরভাবে জানায়?

জি এইচ হাবীব : তৃপ্তি এই দু’দিক থেকেই। আরো আছে। পাঠকদেরকে সেসব দেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে পারার আনন্দ-ও আছে। এছাড়া, আমার নিজের ভাষার ক্ষমতা, আমার নিজের ভাষার বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে এসব কাজ খুব অল্প হলেও সাহায্য করে বলে মনে করি; তো, সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারার একটি তৃপ্তিও এসব অনুবাদে আছে বৈকি।


অলাত এহ্সান : প্রায়ই শোনা যায়, মন্তব্যের ছড়াছড়িও আছে যে, অনুবাদ কোনো সাহিত্য নয়। তাহলে অনুবাদকে সাহিত্য হয়ে ওঠায় অন্তরায়টা কোথায়? কীভাবে সাহিত্য হয়ে ওঠতে পারে?

জি এইচ হাবীব : অন্তরায় আমাদের মানসিকতায়, দৃষ্টিভঙ্গিতে। চোখ ও মন খুলে বাইরের দিকে তাকানো জরুরি। আমাদের ও পৃথিবীর চিন্তার, লেখাপড়ার, অনুবাদের ইতিহাস জানা জরুরি। তাহলেই বোঝা যাবে যে অনুবাদ সাহিত্য হয়েই আছে, যদিও তার রূপ ও বৈশিষ্ট্য বদলাচ্ছে হয়তো।


অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে সাধারণত যে অনুবাদগুলো হয় সেগুলো মূলভাষা থেকে নয়, দ্বিতীয় কোনো ভাষা, বিশেষত ইংরেজি থেকে। আমরা কি ‘সূর্যের রশ্মি থেকে তাপ না নিয়ে বালি থেকে তাপ নিচ্ছি’ বলে মনে হয় না?

জি এইচ হাবীব : সেটা খানিকতা তো বটেই। যদিও, মূল থেকে অনুবাদ করলেই কেউ ভাল অনুবাদ করবেন তার নিশ্চয়তা দেয়া যায় না।


অলাত এহ্সান : অনেক সময় দেখা যায়, কোনো দেশের-কোনো লেখকের কিছু গল্প বা কবিতা অনুবাদ করেই তাকে সেই দেশ বা লেখকের ‘শ্রেষ্ঠগল্প’ বা ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ বলে দেয়া হচ্ছে। তার ব্যাখ্যাও নেই। সেক্ষেত্রে পাঠকরা কি প্রতারিত হচ্ছেন না?

জি এইচ হাবীব : সেটা যাঁরা বাছাই করছেন তাঁরাই ভালো বলতে পারবেন।…কিছুটা তো হচ্ছেনই।


অলাত এহ্সান : শুধুমাত্র বিশ্বের জনপ্রিয় বা বহুল আলোচিত, অনুবাদের মধ্যদিয়ে একটি দেশের সাহিত্য কতটুকু উপকৃত হতে পারে?

জি এইচ হাবীব : কিছু হলেও হচ্ছে। কিন্তু অন্যান্য ভালো বই-পত্র-ও অনূদিত হওয়া উচিত বলে মনে করি। তাহলে আমাদের ভাষা আরো উপকৃত হবে।


অলাত এহ্সান : আরেকটি ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বের অনেক বিখ্যাত গ্রন্থ আছে যেগুলো ভাল, সাহিত্যের জায়গায় শ্রেষ্ঠ, লেখকও গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বহুল আলোচিত নয়। প্রকাশকদেরও তাতে কোনো বিনিয়োগ, উৎসাহ নেই। সেক্ষেত্রে এই ভাল বা মানসম্মত সাহিত্য অনুবাদ কি করে পেতে পারি?

জি এইচ হাবীব : এসব কাজে সরকারের একটা পৃষ্ঠপোষকতা থাকা জরুরি। আমাদের একটা ভালো ভাষানীতি থাকা জরুরি। লেখক-প্রকাশক-পাঠকদের সচেতনতা থাকা জরুরি।


অলাত এহ্সান : একটি দেশ যখন উপনিবেশ মুক্ত হয়, স্বাধীন হয়, তার একটা জরুরি কাজ হচ্ছে বিশ্বের সেরা সাহিত্য, জ্ঞানগর্ভ-মননশীল-চিন্তাশীল বইগুলো ব্যাপক ভাবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই, দেশি ভাষায় অনুবাদ করা। বিশ্বের অনেক দেশের ক্ষেত্রে আমরা তা-ই দেখি। আমাদের দেশে তা ব্যাপক মাত্রায় হয়নি বা হয়নি বললেই চলে। এই না হওয়ার ফলে আমাদের দেশে তা ধরনের প্রভাব ফেলেছে বলে আপনি মনে করেন?

জি এইচ হাবীব : আমাদের উচিত ছিল একটি সুদূরপ্রসারী ভাষানীতি প্রণয়ন করা। আরো অনেক জরুরি কাজের মতো, আমি যতদূর জানি, এটাও করা হয়নি। ভাষা ও সাহিত্য একটি জনগোষ্ঠীর প্রাণস্বরূপ। আমাদের দেশের ভাষা ও সাহিত্যের নানান বৈচিত্র্যমণ্ডিত সম্পদের দিকে আমাদের নজর দেয়া উচিত ছিল। তা না করাতে বাংলা ও দেশের অন্যান্য ভাষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, হিংসা, হানাহানি বেড়েছে।


অলাত এহ্সান : অনেকেই মনে করেন অনুবাদের মান রক্ষার জন্য দেশে রেগুলেটরি বা সম্পাদনা পরিষদ স্থাপন করা দরকার। আপনার কি মনে হয়?

জি এইচ হাবীব : সেটা কতটুকু কার্যকরভাবে করা সম্ভব তা নিয়ে আমার মনে দ্বিধা আছে।


অলাত এহ্সান : অনুবাদের ক্ষেত্রে ট্যাকনিক্যাল শব্দগুলো ছাড়াও অন্য ভাষার সাহিত্য অনুবাদে সংকট হলো যথাযথ পরিভাষার অভাব। কি ইংরেজি কি অন্য—যে ভাষার কথাই বলি। আবার আমাদের দেশে পরিভাষা তৈরিতে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক তেমন কোনো উদ্যোগও নেই। সেক্ষেত্রে আমাদের কি করনীয়?

জি এইচ হাবীব : দেখুন, এ বিষয়ে এবং আমাদের দেশের অনুবাদের পরিমাণ ও মান বাড়ানোর ব্যাপারে একটি কথা অনেক দিন থেকেই বলছি। আর তা হলো, আমাদের দেশের কলেজ ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক্ষেত্রে খুব বড় একটি ভূমিকা রাখতে পারতো, চাইলে এখনো পারে। বেটার লেইট দ্যান নেভার। নানান বিষয়ের শিক্ষকদের পদোন্নতির বিকল্প শর্ত হিসেবে তাঁদের বিষয়সংশ্লিষ্ট কোনো প্রবন্ধ বা বই অনুবাদের কথা থাকতে পারতো। কেউ ইচ্ছা করলে গবেষণামূলক ‘মৌলিক’ লেখা লিখতে পারতেন, আবার কেউ চাইলে অনুবাদ-ও করতে পারতেন। তাহলে পরিভাষার সমস্যারও একটি সহজ সমাধান হতে পারতো। আমরা আমদের শিক্ষার্থীদের জন্যা অনেক বাংলা টেক্সট পেতাম। শিক্ষার্থীরাও না বুঝে নানান কিছু মুখস্ত করে পরীক্ষা দিত না। এমন কি বিজ্ঞানের বিষয়ের জন্যেও এই অনুবাদ জরুরি। কেন, বলছি। বিজ্ঞানের নানান গবেষণা করার জন্য যথেষ্ট অর্থ আমাদের নাই। কিন্তু সে জন্য হাপিত্যেশ না করে পৃথিবীর নানান ভালো ভালো গবেষণা প্রবন্ধ, বিজ্ঞানের নানান বই-পত্র অনুবাদে শিক্ষকেরা নিয়োজিত হতে পারতেন। তাহলে অন্তত সে সব গবেষণার বিষয়, মান, ও ফলাফল সম্পর্কে আমাদের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী মহল ওয়াকিবহাল থাকতে পারতো। গড়ে উঠত বিজ্ঞান বিষয়ক পরিভাষা। আমাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ত।


অলাত এহ্সান : আগেও বলেছি, প্রতিবছরই দেশে প্রচুর অনুবাদ হচ্ছে। তার সবই জনপ্রিয়, বহুলালোচিত নয়তো পুরষ্কার প্রাপ্ত গ্রন্থ। তার বাইরে অনুবাদকদেরও কোনো আবিষ্কার দেখছি না। একজন অপরিচিত কিন্তু শক্তিশালী লেখক, যিনি ভাল লেখেন, কিংবা কোনো বই যেটা উঁচু মানের। এটা অনুবাদকের দূর্বলতা, না কি?

জি এইচ হাবীব : সব বইই যে পুরস্কার প্রাপ্ত—তা নয়। তবে অনেকগুলোই হয়তো আলোচিত। আর সেগুলোই সাধারণত আলোচিত যেগুলো বেশ ভালো। ব্যতিক্রম নেই—তা বলছি না। তবে একথা-ও সত্য যে, এই পরিমণ্ডলের বাইরেও প্রচুর ভালো কিন্তু আমাদের এখানে বা বাইরে অনালোচিত বা কম আলোচিত বই রয়েছে যেগুলো অনূদিত হলে আমরা উপকৃত হতাম। তা না হওয়া আমাদের একটি দুর্বলতা তো বটেই।


অলাত এহ্সান : কবিতার অনুবাদ কবি, গল্পের অনুবাদ একজন গল্পকার করলেই কি সেরাটা পাওয়া সম্ভব বলে অনেকে মনে করেন। আপনার কি মনে হয়?

জি এইচ হাবীব : সে রকম কোনো নিশ্চয়তা বোধহয় কেউ দিতে পারে না।


অলাত এহ্সান : অনুবাদ তো দুইভাবেই হতে পারে। বিদেশি সাহিত্য দেশি ভাষায়, দেশি সাহিত্য বিদেশি ভাষায়। আমাদের সাহিত্য কিন্তু সে ভাষায় যাচ্ছে না। এর কারণ কি? এ সমস্যা থেকে উত্তোরণের উপায় কি বলে মনে করেন?

জি এইচ হাবীব : আমাদের সাহিত্য বিদেশী ভাষায় অনুবাদ হওয়া জরুরি তো বটেই। ইদানিং এ লক্ষ্যে কিছু কিছু উদ্যোগের কথা কানে আসছে। কিন্তু তা অবশ্যই পর্যাপ্ত নয়। আগেই বলেছি, আমাদের একটি সুষ্ঠু ভাষানীতি নেই, যা থাকা বা প্রণয়ন করা জরুরি। কিন্তু কারো সে বিষয়ে কোনো মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। ভাষা, শিক্ষা ইত্যাদি বিষয়ে ভাবা এদেশে একরকম বন্ধই হয়ে গেছে বলে মনে হয়।


অলাত এহ্সান : অনুবাদের ক্ষেত্রে অনেকে ভাষা, অনেকে ভাব, অনেকে মূলবক্তব্য অনুসরণ করেন। এতে কি একটি সাহিত্যের প্রকৃতাবস্থার হের ফের ঘটে যায় না?

জি এইচ হাবীব : অনুবাদের নানান রকম ফের আছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই সর্বমান্য নয়। সময়ের পরিবর্তনে, যুগের দাবিতে, নানান প্রয়োজনে সেসবের হেরফের ঘটে। অনুবাদের-ও আছে নানান রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক কারণ। কাজেই এটাই খুব স্বাভাবিক যে নানান পদ্ধতিতে অনুবাদ হবে। এ-বিষয়ে একটা চমৎকার ধারণা পাওয়া যাবে Jean Delisle এবং Judith Woodsworth-এর "Translators through History" বইটিতে।


অলাত এহ্সান : অনুবাদকের স্বাধীনতা—শব্দ তৈরি, বাক্য ভাঙা ইত্যাদি দিক— অনেকে সামনে আনেন। এটাকে আপনি কি ভাবে দেখেন? তা ছাড়া অনুবাদকের আদৌ কোনো স্বাধীনতা আছে কি?

জি এইচ হাবীব : আগের প্রশ্নের উত্তরে কিছুটা আলোকপাত করা হয়েছে এ-বিষয়টি। অনুবাদকের যদি স্বাধীনতা কিছু না-ই থাকে তাহলে জগতে কোনো কোনো টেক্সট-ই অনূদিত হতে পারবে না। সাহিত্যে যেমন সর্বমান্য কোনো নিয়ম কানুন নেই সে অর্থে, অনুবাদেও নেই বলেই আমার ধারণা।


অলাত এহ্সান : অন্য একটি ভাষায় লেখা অনুবাদ হচ্ছে। রয়েলটি পাচ্ছেন না, তার সঙ্গে যোগাযোগ করাও হচ্ছে না। বিষয়টা কিভাবে দেখেন?

জি এইচ হাবীব : এটা হলে খুব ভালো হয় বা হতো। কিন্তু নানান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে তা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না।


অলাত এহ্সান : লেখালেখির ক্ষেত্রে পেশাদারিত্বের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে অনুবাদের তেমন পেশাদারিত্ব দেখছি না। তবে অনেকে পেশাদার অনুবাদক হয়ে ওঠতে চান। এটা আনন্দের। অনুবাদের মানোন্নয়নের জন্য পেশাদারিত্বের ভূমিকা কি?

জি এইচ হাবীব : বর্তমানে যেসব স্বীকৃত পেশা রয়েছে সেগুলোরই নাজুক দশা, অনুবাদকে পেশা হিসেবে নেয়া তো সেখানে দিবাস্বপ্ন মাত্র। আগ বলেছি, এজন্য সরকারের একটি পৃষ্ঠপোষকতা একটি সুষ্ঠু ভাষানীতি দরকার। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের একটি ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। তা যতো দিন না হবে, আধা-খেঁচড়া ভাবেই চলবে অনুবাদ তথা মন ও মন সংক্রান্ত নানান কাজ।


অলাত এহ্সান : এবার বই মেলায় আপনার অনুবাদ গ্রন্থ সম্পর্কে বলুন।

জি এইচ হাবীব : সে-অর্থে নতুন কিছু বের হয়নি। ‘শব্দমূলকল্পদ্রুম’ নামে ইংরেজি কিছু শব্দের উৎসকথা বিষয়ক ছোট্ট একটি বই বের হয়েছিল দু-তিন বছর আগে। সেটা নতুন বেশ কিছু ভুক্তি নিয়ে, আকারে-প্রকারে কিছুটা পরিবর্ধিত হয়ে বেরোবার কথা ছিল। অনিবার্য কিছু কারণে তা হয় নি। হয়তো বছরের মাঝামাঝি বের হবে।


অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে অনেকই অনুবাদ করছেন। আপনার সমসাময়িক তো করছেই, আগেও করেছেন, আপনার অনুজরাও করছেন। বাজারে তাদের বইও আছে। এদের থেকে আপনি নিজেকে কিভাবে আলাদা করেন?

জি এইচ হাবীব : আমি আলাদা তো নই। আমিও তাঁদের মতো একজন অনুবাদকর্মী।


অলাত এহ্সান : এই প্রসঙ্গে আরেকটা প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এই মুহুর্তে দেশে যে অনুবাদগুলো হচ্ছে, বইয়ে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে তার মান নিয়ে কি আপনি সন্তুষ্ট? আপনার চোখে কারা ভাল অনুবাদ করছে?

জি এইচ হাবীব : কিছু ভালো, উঁচুমানের অনুবাদ অবশ্যই হচ্ছে। হয়তো সব অনুবাদের মান নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। কিন্তু কিছু কাজ যে অন্তত হচ্ছে এই বৈরী পরিবেশ-পরিস্থিতিতে, তাতে বরং আমি খুশি। অনেকেই ভালো কাজ করছেন। তাঁদের সবার প্রতি সুবিচার করতে হলে, এমনকি শুধু একটি তালিকা তৈরি করতে হলেও বেশ সময় ও পরিসর প্রয়োজন। শুধু এটুকু বলি, এঁদের অনেকের কাজ দেখেই আমার মনে হয়, আহা! আমি যদি এ-রকম খেটে, এ-রকম সময় দিয়ে, এতোটা আত্ম-নিবেদনের সঙ্গে কোনো কাজ করতে পারতাম, আমার ভালো লাগতো।


অলাত এহ্সান : লিখালেখির এখন বহু মাধ্যম তৈরি হয়েছে। দেশে গল্প-কবিতা-প্রবন্ধের ভাল ম্যাগ থাকলেও অনুবাদের তেমন লিটলম্যাগও নেই। অনুবাদক তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মাধ্যমটি আপনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন? কিভাবে অনুবাদ তৈরি হবে?

জি এইচ হাবীব : এই প্রশ্নের জবাব কিছুটা দেয়া হয়েছে প্রতিশব্দ তৈরি সংক্রান্ত একটি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে। সেই সঙ্গে বলি, যেখানে যে সুযোগ পাওয়া যায় সেখানেই অনুবাদকে কাজে লাগানো সম্ভব বা উচিত বলে মনে করি।


অলাত এহ্সান : অনুবাদের জন্য রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার দেয়া হচ্ছে। এটা আমাদের দেশে মানসম্মত অনুবাদের ক্ষেত্রে কি ধরনের ভূমিকা রাখছে? আদৌ তা রাখছে কি না?

জি এইচ হাবীব : কোন ভূমিকাই রাখছে না—তা বলা যাবে না। অনুবাদক তাঁর কাজের একটা স্বীকৃতি পেয়ে খুশি হচ্ছেন, একটা দায়িত্ব অনুভব করছেন আরো ভালো কাজ করার, তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ তুষ্ট হছে কিছুটা। কিন্তু যেসব পদক বা পুরস্কার দেয়া হচ্ছে সেগুলো কি খুব খোঁজ-খবর করে দেখে শুনে দেয়া হচ্ছে? এ-বছর অনুবাদে কোনো পুরস্কার দেয়নি বাংলা একাডেমি। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, মান সম্পন্ন কাজ পাওয়া যায়নি। এই যুক্তি মানা যায় না।



অনুবাদক পরিচিতি :
জি এইচ হাবীব
অনুবাদক





সাক্ষাৎকারগ্রহণকারীর পরিচিতি
অলাত এহ্সান

জন্ম ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার আরো ভেতরে, বারুয়াখালী গ্রামে। কঠিন-কঠোর জীবন বাস্তবতা দেখতে দেখতে বড় হয়ে ওঠা। পারিবারিক দরিদ্রতা ও নিম্নবিত্ত অচ্ছ্যুত শ্রেণীর মধ্যে বসত, জীবনকে দেখিয়েছে কাছ থেকে। পড়াশুনা করেছেন মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজ(ইন্টারমিডিয়েট) ও ঢাকা কলেজে(অনার্স-মাস্টর্স)। ছাত্র জীবন থেকেই বাম রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া। কবিতা লেখা দিয়ে সাহিত্য চর্চা শুরু হলেও মূলত গল্পকার। প্রবন্ধ লিখেন। প্রকাশিতব্য গল্পগ্রন্থ ‘পুরো ব্যাপারটাই প্রায়শ্চিত্ব ছিল’। প্রবন্ধের বই প্রকাশের কাজ চলছে।০



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন