শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

মন তার শঙ্খিনী

হাসান আজিজুল হকের গল্প

শাদুর মনটা আজ ক'দিন থেকে ভালো নেই। এটা অবশ্য খুব একটা বড় খবর হোল না। ওর আশেপাশে যারা রয়েছে এতে যে তাদের কিছু এসে যাচ্ছে তাও নয়। কিন্তু শাদুর মনটা ভালো নেই। শরীর ম্যাজ ম্যাজ করছে না, মাথা ধরেনি, কিছুই নয়, কিন্তু সে দুনিয়ার উপর চটে আছে, বিরক্ত হয়ে আছে, ভ্রু কুঁচকে আছে, এক কথায় সে ভীষণ রেগে আছে। ওর কাছে যাওয়া চলছে না, ওর বুকটা জ্বলে যাচ্ছে, মনটা হু হু করছে। খরার দিনের সন্ধ্যায় শস্যহীন মাঠের মতো ওর মনটা ধূসর ঝাপসা। এখন শরতের উজ্জ্বল সকালে গ্রামের প্রান্তে একটা পগারের উপর বসে শাদু মরা ঘাস ছিঁড়ছে, একটা মরা পাখির পালক থেকে শিশির ঝাড়ছে।


শাদুর মনটা খারাপ।

ওকে এমনি করে বসে থাকতে দেখে কেউ হয়তো বলে, কি বাপধন, এমন করে বসে কি?

শাদু জবাব দেয় না, গুম হয়ে থাকে।

কি বাপ, কতা বলছ না ক্যানে?

জানটো ভালো নেই, বাপু!

জানের আবার কি হোল তোমার?

না, বাপু জানটো ত্যামন ভালো নাই।

শাদু আবার স্তব্ধ হয়ে যায়। স্পষ্টতই বুঝিয়ে দেয় কথা বাড়াতে চায় না সে। হীতাকাঙ্ক্ষী আরও কিছু জিজ্ঞেস করলে সে হয়তো ক্ষেপে উঠল, মানে মানে কেটে পড়ো দিকিন। বলচি ভালো লাগছে না, ভ্যালো বেপদ বটে।

হীতাকাঙ্ক্ষী সত্যিই বিপদ গোনে। শাদুর রাগটা একটু বিপজ্জনকই বটে। শরতের উজ্জ্বল সকালে ওর মনটা কেন খারাপ সে কথা ও ছাড়া আর কেউ জানে না। প্রসন্ন শীত শীত বাতাস বইছে, রোদ যেন সোনা, মাঠভর্তি সবুজ ধানের ওপর রোদের সোনা-- কিন্তু সব তার কাছে বিস্বাদ।

শাদু আপন মনে বিড় বিড় করে, রাককুসী, রাককুসী, মানুষখেকো রাককুসী, আমার জানটো খেলে, শালো, আমাকে খেলে। আমাকে বরবাদ করলে।

ঠিক এই সময়ে পগারের আর এক প্রান্তে একটি মেয়ে দেখা যায়--কোমরে একটি ঝুড়ি, তাতে গোবর, কাঠিখোঁচা, শুকনো পাতা। মেয়েটির তৈল হীন রুক্ষ চুল বাতাসে উড়ছে, শাড়িটা এমন করে পড়া যে মনে হয় ছোবল দেবার আগে লেজের ওপর ভর দিয়ে একটি কালো সাপিনী দুলছে। অলঙ্কারহীন মিশমিশে কালো মেয়েটি যেন এই পগারের গর্তে যেসব সাপ পাওয়া যায় তাদেরই একটি।

শাদু আড়চোখে চাইল ওর দিকে। চোখে বিদ্যুতের ঝিলিক হেনে ঘাড় ফিরিয়ে নিল মেয়েটি। এদিকে ওদিকে চেয়ে শাদু ডাকল, এই হামি, এদিকে শোন। মেয়েটি স্রেফ নাকচ করে দিল এই আহবান।

হামি!

হামি অর্থাৎ হামিদা নিরুত্তর।

এই হামি!

ঝঙ্কার দিয়ে উঠল হামিদা, কি?

শোন ইদিকে!

কি বেপার?

কাছে আয়, বলচি।

আমার শোনবার দরকার নাই।

আমার কি কুনো কতাই শুনবি না তু!

কি শুনব?

কাছে আয়।

হামিদা কাছে আসে। শাদু চেয়ে থাকে ওর দিকে, আবার একটি বিদ্যুতের ঝিলিক হেনে চোখ নাচিয়ে হামিদা বলে, সং।

সত্যিই সং-এর মতো বসে থাকে শাদু। তার মনে হয় হামিদার সঙ্গে এখন দেখাটা না হলেই ভালো হোত। সে ওর ঘুম কেড়ে নিয়েছে, শান্তি কেড়ে নিয়েছে, ওর মনটা যে এখন খরার সাঁজের মাঠের মতো-- এর সব কিছুর জন্যে দায়ী এই মেয়েটির সঙ্গে এখন ওর দেখা না হলেই ভালো হোত। কিন্তু ওকে দেখেই ওর বুকের রক্ত ছলাৎ করে ওঠে, একটা ভীষণ আবেগে সে নিশপিশ করে।

বাক্যহীন আবেগে থমথমে মুখটির দিকে চেয়ে কৌতুকে উচ্ছল হয়ে ওঠে হামিদা, ভ্যাবার মতুন বসে বসে ভাবচিস কি? তোর কত ক্ষ্যামতা জানা আচে। যত লাফানি আমার কাচে। উদিকে কি বেপার হচে দেখগা!

কি বেপার?

রহম মালামো করছে বর্গীতলায়। তিনটাকে চিৎ করলে আমার ছামনে। লাগগা দিকিন ওর সাথে। জানে শ্যাষ করে দেবে। ব্যাটা ছেলেরা যা করে তার খোঁজ নাই, মেয়েমানুষের কাছে বাহাদুরি।

শাদু বলল, মারামারি করে লাভটো কি বলতে পারিস! এ গাঁয়ে কুন শালা আচে আমার সাতে পারবে--জানটো খেয়ে লোব।

হামিদার নাকের পাশটা কুঁচকে উঠল, তোর খালি বোলচাল, খালি বাহাদুরি। ক্ষ্যামতা থাকলে লাগগা না!

লাভ টো কি হবে?

শাদুর দু'চোখ জ্বলে উঠল। ওর পিঙ্গল চোখের তারা দু'টি যেন আগুনের ফুলকি ছিটোল। ঠোঁট টিপে মুচকি হাসল হামিদা। সে হাসিটাও চোখে পড়ল শাদুর, দ্যাখ হামি মাথাটো খারাপ করে দিস না সকাল বেলায়, আজ যদি লাগি রহমের জান লিয়ে লোব।

তাই যা না।

যদি পারি?

যদি পারিস তো কি?

যদি পারি তো কি দিবি?

আমি নাচব এখানে।

ঠিক?

লিশ্চয়।

চোতমাসের দুপুরে গাদা করা কাঠে আগুন লাগলে যেমন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, শাদুর বুকে যেন তেমনি আগুন ধরে যায়। আস্তে আস্তে সে উঠে দাঁড়ায়। ওর চোখের একগুঁয়ে মোষের মতো চাহনিটা দেখে এক মুহূর্ত ভয় পায় হামিদা, তারপরেই আবার কৌতুকে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। তাকাইচ্চে দ্যাকো দিকিন? ইখানে কি, যা না বর্গীতলায়।

শাদু কথা না বলে চলে গেল।

বর্গীতলায় তখন একটা ভিড় জমে উঠেছে বলা যায়। রহম দড়াম করে একবার মাটিতে আছাড় খেল, মোষের মত কালো শরীরটায় দু'হাতে ধুলো মাখাল, চুলটাকেও ধুলো মাখিয়ে ফাঁপিয়ে তুলল, তারপর গরিলার মত বুক পিটোতে পিটোতে ঘ্যাষঘেষে গলায় চিৎকার করে উঠল, আয় ইবার ক্যা আচিস।

দু'নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী তখন ধুঁকছে। দুই হাঁটু থরথর করে কাঁপছে তার। পয়লা নম্বর তখন একটু সামলিয়েছে, দুই পায়ের ফাঁকে ল্যাজ চালিয়ে দিয়ে পরাজিত কুকুর যেমন করে দাঁড়িয়ে থাকে তেমন করে সে দাঁড়িয়ে থাকে।

জুলজুল করে তাকিয়ে দেখচিস কি? আর একবার লাগ না!

পয়লা নম্বর প্রতিদ্বন্দ্বী ম্লান হাসে, কালো কালো মাড়ি বের করে বলে, উ শালোর সাতে কি পারা যায়!

হুঁ হুঁ, শালো যে বাঘের দুধ খায়।

অপরাজিত প্রতিদ্বন্দ্বী রহম আর একবার হাঁক দেয়, ক্যা আচিস, আয়।

ওর সাতে কেউ পারে গো--গতরটো দেখচ না!

হ্যাঁ বাপু থোড়পারা গতর টো হইচে বটে।

ঠিক এমনি সময়ে শাদুকে দেখা গেল। উল্লাসে চিৎকার করে উঠল দর্শকের দল, আয় বাপ, একবার দেখিয়ে দে একহাত।

শাদু কারও দিকে চাইল না, কারও কথায় কান দিল না, একটা ভীষণ মরণ প্রতিজ্ঞায় চোখে প্রতিহিংসার কঠিন আলো জ্বেলে সে রহমের মুখোমুখি দাঁড়াল। হবে লিকি স্যাংগাত, লাগবি লিকি একহাত?

শাদুর চোখের দিকে চেয়ে প্রায় শিউরে ওঠে রহম। একটা অস্বস্তির ঠাণ্ডা স্রোত যেন মেরুদণ্ড দিয়ে নীচের দিকে নেমে যায়। লড়াই করার প্রবৃত্তিটা সঙ্গে সঙ্গে চলে যায় ওর।

ইতস্তত কণ্ঠে সে বলে, সেই লেগেই তো দাঁড়িয়ে আচি-- তা ব্যালা হোল অ্যানেক, একন--

শাদু লোহার সাঁড়াশীর মত আঙুল বাড়িয়ে মুঠো করে রহমের ফাঁপানো চুলের মুঠি ধরে বার দুই ঝাঁকি দেয়, তারপর চুল ছেড়ে দিয়ে ওর বুকে দু'টো থাপড় দিয়ে বলে, শালো ভয় পেলি?

রাঢ়ের লড়াইয়ের ইতিহাসে এর চাইতে অপমান আর কিছু নাই। রহম যদিও তার বুকের হাড়ে শাদুর থাপড় দু'টো তখনও অনুভব করে, মাথার চুলের যন্ত্রণায় ওর হাতের কঠিন শক্তির পরিচয় পায়, তবুও সে খেপে ওঠে, অ্যাই খবরদার, গায়ে হাত দিবি না, পারিস তো চলে আয়।

আজ কিন্তুক সাবধান--মারাত্মক অ জোরালো গলায় বলল শাদু।

তু সাবধান হ' আগে।

সকলে সরে গিয়ে ওদের জায়গা করে দেয়। একটা নিদারুণ লড়াই হবে এই আশায় সবাই উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নানারকম মন্তব্য শোনা যায়। আজ আর শাদুকে পারতে হবে না--রহম খেপেচে।

তা খেপুক--শাদুর কাচে উ কিছুই লয়।

দু'জনে দু'টো বুনো মোষের মত সামনাসামনি দাঁড়াল। ঘাড় বাঁকিয়ে ছোট ছোট লাল চোখে রক্তাক্ত দৃষ্টিতে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল ওরা। শাদুর কৌশলটা রহম জানে, এঁকেবেঁকে ধুপ ক'রে সে পড়বে, সবার ধারণা হবে শাদু নীচে পড়েছে, এর পরেই বোধ হয় হার স্বীকার করবে সে। যন্ত্রণায় আর্ত চিৎকার করতে করতে শাদু লড়াই করে, হারও স্বীকার করে না, লড়াইও বন্ধ করে না--সে যেন সুযোগের অপেক্ষা করে বনবেড়ালের মত। তারপর কোন এক চূড়ান্ত মুহূর্তে গর্জন করে সে প্রতিদ্বন্দ্বীর ওপর পড়ে। সে আক্রমণ আজ পর্যন্ত কেউ সহ্য করতে পারেনি।

শাদুর মনে মনে চিন্তাটা প্রায় একটা বিড় বিড় শব্দে পরিণত হয়, রাককুসী, তোর লেগে আজ মানুষ খুন করব আমি, তা বাদ তোকে ধরব আজ, ইঁদুর ধরা ধরব আজ।

রহম লাফ দিয়ে পড়ল শাদুর ওপর। শাদু নীচে গড়িয়ে পড়েছে, রহম ওর বুকে বসেছে, গলাটা টিপে ধরেছে শাদুর--দু'চোখ বেরিয়ে আসার উপক্রম হয়েছে ওর। আশেপাশে যারা দাঁড়িয়েছিল তাদের কেউ চেঁচিয়ে ওঠে, ছাড়িয়ে দে র‍্যা, মরবে যি, শাদু মরবে যি।

রুদ্ধকণ্ঠে শাদু গর্জন করে, খবরদার।

এর পর যখন চূড়ান্ত মুহূর্ত এসেছে বলে মনে হয়, সমকক্ষ দুটি শক্তি যখন নিঃশব্দ দ্বন্দ্বে লিপ্ত, নিঃশ্বাস ছাড়া অন্য শব্দ নেই যখন, দর্শক যখন নিরুদ্ধশ্বাস তখন সেই আতঙ্কিত নৈঃশব্দ চিরে একটি দীর্ঘ জান্তব শব্দ ভেসে এলো, ভেঙে দিয়েচে গো, কোমরটো আমার ভেঙে দিয়েচে, শালো শাদু আমাকে মেরে ফেললে--অর রক্ত দেখব আমি।

শাদু গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। রহম তখনও মাটিতে পড়ে চিৎকার করছে।

অর রক্ত দেখব আমি, শালো আমার কোমরটো ভেঙে দিয়েচে।

ইকি র‍্যা, কোমরটো অর ভেঙে দিলি লিকিন?

শাদু বলল, বললোম আজ সাবধান, আমার কিরে আচে।

কিরে কিসের কিরে র‍্যা?

হ্যাঁ, আচে--আমার কিরে আচে।

আর কোনও কথা না বলে শাদু চলে গেল। পগারটার দিকে সোজা এগিয়ে গেল সে। ওকে ফিরতে দেখে হামিদার চোখ চিকচিক করে ওঠে, হেরে এলি তো?

শাদু চুপ করে থাকে-- জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে সে। কথা বলচিস না যি, হেরে এলি লয়?

গম্ভীর মুখে শাদু বলে, দেখে আয় গা যা।

কি?

রহমের কোমরটো ভেঙে দিইচি আজ।

সত্যি?

কোমরটো ভেঙে দিইচি শালোর। শালো দশদিন উঠতে পারবে না, চেরজন্ম সোজা হয়ে হাঁটতে পারবে না।

হামিদার দু'চোখের কোণ আর্দ্র হয়ে ওঠে, করুণায় আর রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সে। আই সব্বনাশ, আই সব্বনাশ, কোমরটো ভেঙে দিয়ে এলি তু?

তু যি বললি!

তা বলে কোমরটো ভেঙে দিবি তু?

তু বললি ক্যানে?

হ্যাঁ যমের অরুচি, তা' বলে মানুষ খুন করবি তু। মানুষটে! আই সব্বনাশ মানুষটোর কোমর ভেঙে দিলি তু? লে অ্যাকন আমাকে লিয়ে কি করবি কর, ধুয়ে ধুয়ে খা আমাকে।

তু বল আমি কি করব? আমি যে তোর কথা মন থেকে তাড়াইতে পারচি না, আমার ঘুম লষ্ট হবে, আমার কাজে মন যেচে না, আমি কি করি তু বল!

আমি কি বলব?

আমি তোকে বিয়ে করব।

মরণ, আমার সোয়ামি বেঁচে নাই লিকিন! সোয়ামি থাকতে তোকে বিয়ে করব ক্যানে? মরণ!

তাইলে আমি কি করব আমাকে বল।

খা দা আর ঘুমো, কাজকম্ম কর।

তু যি বলেছিলি ভালবাসিস।

বলেছেলোম একদিন।

আজ কি ভালবাসিস না?

না।

দেহটি মোচড়ায় শাদু, হাত ধরা কাঠি খোঁচাগুলি মড় মড় করে ভাঙে, নিশপিশ করে, তারপর বলে, ক্যানে তবে বলেছিলি?

হামিদা চুপ করে থাকে।

ক্যানে আমার মন টো ভাঙলি?

মেয়েটি চুপ করে থাকে।

আমি তোকে বিয়ে করি।

না।

ক্যানে?

আমার যে বিয়ে হয়ে গেচে।

তু সোয়ামির বাড়িতে গেলি না, সে শালোর ঘাড় টো আমি ভাঙব, ই গাঁয়ে শা লো যেন না আসে। তু সোয়ামির ঘরও করবি না, আমার ঘরও আসবি না, আমি ঠিক তোকে খুন করে ফাঁসি যাব।

আমাকে ত্যাখন বিয়ে করলি না ক্যানে? খেতে দেবার ক্ষ্যামতা নাই তোর। তোর বিয়ের সখ ক্যানে?

শাদু অসহায় চোখে চেয়ে থাকে। শরতের রোদ প্রখর হয়ে ওঠে। অনেক দূরে চিলের তীক্ষ্ণ ডাক শোনা যায়। মনটা কেমন করতে থাকে। মরা পাখিটার ভিজে পালক শুকিয়ে গিয়েছে। ওর মত চোখ বন্ধ করে ঘুমোতে ইচ্ছে করে শাদুর।

হামি?

হঠাৎ হু হু করে কেঁদে ওঠে মেয়েটি। অশ্রুরুদ্ধকণ্ঠে বলে, আমার যে বিয়ে হয়ে গেছে, আমার যে সোয়ামি আছে।

তাকে তো তু ভালবাসিস না।

না।

ভালো না বাসলে আর সোয়ামি কি? আর ভালবাসলে সোয়ামি না হলেই বা কি?

ছি, উকথা বলিস না।

ক্যানে বলব না, ইটা নেয়ম। তু যিনি বলেছিলি ভালবাসিস।

ছাগলের খোঁটা পুঁততে পুঁততে হামিদা একদিন বলেছিল ভালবাসে।

সেদিনও এমনি প্রথম শরতের সকাল ছিল। পিছন থেকে শাদু এসে ডেকেছিল, হামি?

ফিরে তাকিয়ে মুখ নামিয়ে নিয়েছিল হামিদা।

শরতের সেই সকাল সেদিন তাদের জন্য একটি আড়াল রচনা করেছিল।

বুকউঁচু ধানের জমির ভিতরে সারস চরছিল। প্রকৃতি যেন অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল।

তারপর হঠা ৎ করে একবার বাতাস বইল দক্ষিণ দিক থেকে, হলদে পাতা উড়তে উড়তে এসে হামিদার খোঁপায় আটকে গেল।

শাদু ডাকে, হামি!

উঁ।

অ্যাই!

উঁ।

বল।

কি?

বল, ভালবাসি।

ভালবাসি।

আবার বল।

ভালবাসি।

আবার।

বাসি।

আর একবার--

মরণ। খবরদার ছুবি না, ছুবি না খালেভরা।

ওরা পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকে। উজ্জ্বল রোদের মধ্যে ওদের মাথার উপর শরতের এক খণ্ড মেঘ জমে ওঠে, হঠাৎ বর্ষণ শুরু হয়। রূপোর মত সাদা বড় বড় বৃষ্টিবিন্দুগুলি দেখা যায়, ধানের পাতায় পানি জমে থাকে। একটা সোঁদা গন্ধ ওঠে।

সেই যে হামিদা বলেছিল ভালবাসি তখন থেকেই শাদুর মনখারাপের রোগটা দেখা দিল। মেয়েটা রাক কুসী, মেয়েটা শনি--শাদু ভাবে। বললে, ভাববাসে--বলে আবার বিয়ে করলে আর একজনাকে। ওর বুড়িদাদীকে বলতে গ্যালোম, তা সে হারামজাদি তেড়ে এল আমাকে, বিয়ে তো করবি, খেতে দিতে পারবি আমার লাতিনকে? তোর লিজের আজ খেতে কাল জোটে না, তোর আবার বউয়ের সখ ক্যানে? হামিকে বলতে গ্যালোম, তা সে চোখ ঘুরিয়ে বললে, আমাকে বিয়ে করবি তো খেতে দিবি কি?

সি কথাটো সত্যি। সি কথাটো বাপু সত্যি, আমার জমি যা তাতে মায়ের আর আমার তিন মাসের খোরাকি টো কোনরকমে হয়, তা বাদ সারা বছরটা মুনিষ খেটে, অ্যানেক ধান্ধায় চালাটে হয়। আমার লিজের ভাত জোটে না, তা তোকে মহারাণীর মত রাখি ক্যামন করে।

ভেবে কোন সুরাহা হয়নি। হামিদার বিয়ে হয়ে গিয়েছিল ট্যারার সঙ্গে। বাড়ি অন্য গ্রামে। লোকটা ট্যারা, মিশমিশে কালো, ঘাড়ে গর্দানে।

ব্যাপারটা ঘটে যাওয়ার পরেই শাদুর রোগটা শুরু হয়। বুকটা জ্বালা জ্বালা করে, মনটা হু হু করে-- খরার শস্যহীন মাঠে ধূসর সন্ধ্যার মত। ওর ব্যবহারও কেমন অদ্ভুত হয়ে আসে। বুড়ি মা শাদুর চালচলনের অর্থ খুঁজে পায় না-- মাঝে মাঝে কাঁদে, ছেলেটা আমার বেবাগী হচে ক্যানে গো?

অনেক রাত হলে শাদু বাড়ি ফিরে আসে। প্রদীপের নিরানন্দ আলোয় মা একা একা ঢোলে, ছেলের প্রতীক্ষা করে, তারপর এক সময় মেঝেতেই ঘুমিয়ে পড়ে।

শাদু ভাবে মায়ের দুখটো আর এহজনমে ঘুচোইতে পারলোম না, ভাতের কষ্টই গেল না শালোর! অনেকদিন বাড়ি ফিরে দেখে ভাত ঢাকা দিয়ে মা বসে আছে। শাদু জিগগেস করে, তু খেলি মা?

খেয়েচি বাপ, তু খা।

মা তু মিছে কথা বলচিস, তো ভাত নাই লয়?

কপালে চড় মারে মা। চড় মারার তালে তালে বলে, হায়, আমি কি করব! তোর বাপ যে একবিঘে জমি রেখে ড্যাংড্যাংগিয়ে চলে গেল, তা আমি কি করি! বলি বাজেপড়া, লিজে এগু খেয়ে লেয়ে আমাকে শুধুইতে পারিস না!

আধপেটা ভাত খেয়ে অন্ধকার ঘরে ছেঁড়া কাঁথার উপর শাদু শুয়ে পড়ে। খড়ের ফুটো চাল দিয়ে শীতার্ত হিমেল আকাশটা চোখে পড়ে। আকাশের ঠিক সেই অংশেই গোটা কয়েক তারা নিদ্রাহীন স্তিমিত চোখে তার দিকে চেয়ে থাকে। আকাশটা যেন হামিদার সখের শাড়ি, যে শাড়ি সে কোনদিনই পরতে পারেনি, যে শাড়ি সে একদিন পরবে, আকাশটা যেন সেই শাড়ি। তারাগুলি সেই শাড়িরই চুমকি। মাটির দেয়ালের খাঁজে খাঁজে ইঁদুর দৌড়ে বেড়ায়, অন্ধকারের ভিতর থেকে টিকটিকি ডেকে ওঠে-- শাদু এপাশ ওপাশ করে। কত রাত্রে পরিচিত স্পর্শে চোখ মেলে চায়, ফাটা শীর্ণ হাতে কপালে হাত বুলোয় মা--বাঁ হাতে নিভু নিভু প্রদীপ।

হ্যাঁ বাপ তুই ঘুমুইচিস না ক্যানে? তোর কি হয়েচে আমাকে বল।

সি তু জানিস না, মা।

বিয়ে করবি তু?

না।

ক্যানে?

না।

মায়ের জানটোরও তেল শ্যাষ হয়ে আসছে--শাদু ভাবে। মৃদু আলোয় বুড়ির মুখের অসংখ্য বলিরেখা জটিল জিজ্ঞাসা চিহ্নের মত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সি তু জানিস না, মা। তু ঘুমো গা।

মা আস্তে আস্তে উঠে যায়।

ঐঃ, উ হোনেই আমার অ্যামন হোল, উ সব্বনাশি আমার সব্বনাশ করলে। ক্যানে সি আমাকে বলেছিল ভালবাসি--তা লইলে তো অ্যামন হতো না। আমাকে বললে ভালবাসি, কতদিন ডাকলে ওর ঘরে, তা বাদ আবার বিয়ে করলে। বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি গেল না--তাই যা, শ্বশুরবাড়ি যা-- তুঁ শ্বশুরবাড়িও যাবি না, আমার ঘরে আসবি না, তোকে লিয়ে তো ভারি বেপদ হলো।

হামিদার বিয়ের ক'দিন আগে মরিয়া হয়ে ওর কাছে আর একবার গিয়েছিল শাদু। অনুনয় করেছিল, মিনতি করেছিল, তাদের ভালবাসার দোহাই দিয়েছিল।

হারামী মেয়েটো আমাকে আচ্চরযি করলে। উকে বোঝলোম না আমি, উকে বোঝলোম না।

হামিদাকে বুঝে উঠা সত্যিই মুশকিল শাদুর পক্ষে। সে বলেছিল, হামি, আমি একটো উপয় করলোম। বিয়েটো আমরা করেই ফেলি।

তা বাদ?

তা বাদ আবার কি? তুও এক আধটু খাটবি, চলে যাবে যেমন করে হোক।

আহা রে, ওরে আমার গোঁসাই--চোখ ঘুরিয়ে, কোমর দুলিয়ে একটা বিশ্রী ভঙ্গী করে উঠেছিল হামিদা-- যিখানে আমার বিয়ে হচে সেখানে আমাকে কি কি গয়না দিচে জানিস? জানিস কয়টো শাড়ি দিচে? তোর আজ খেতে কাল নাই, হাড়হাবাতে, তোর বাড়ি যেয়ে তোর মায়ের বাঁদি হবো লিকিন?

ভীষণ আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিল শাদু, ন্যাকার মত প্রশ্ন করেছিল, ভালবাসাটো কিছুই নয়?

অত পিরিত আমি বুঝি না--কোমর দুলিয়ে চলে যাচ্ছিল হামিদা। চিৎকার করে উঠল শাদু, দূর হ চোখের সামনে থেকে দূর হ যমের অরুচি, চক্ষের শূল।

মেয়েটিকে শাদু বলে হাড়জ্বালানি। বিয়ে করল সে ট্যারাকে। হ্যাঁ, সে ই বিয়ে করেছে বলা চলে। কারণ তার এক পোষা কালা দাদী ছাড়া আর কেউ ছিল না। কিন্তু সবচাইতে আশ্চর্যের ব্যাপার বিয়ের পর হামিদা শ্বশুরবাড়ি গেল না। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাত স্বামীর সঙ্গে। ট্যারা মাঝে মাঝে আসত, নিয়ে যাবার প্রস্তাব করত, না যেতে চাইলে চিৎকার করত--যাবি না ক্যানে হারামজাদি, তোর বাপ যাবে, চুলের ঝুঁটি ধরে লিয়ে যাব।

মাঝখান থেকে খন খন করে উঠত হামিদার দাদী, অ্যাদা ম্যালা চেল্লাস না, যাবে না আমার লাতিন, কি করতে পারিস তু? তোর বড্ড বাড়, দশকে ডেকে জুতিয়ে তোকে গাঁ থেকে তাড়াব।

ছোকরা আর বেশি গোলমাল করতে সাহস করত না। সেও যেন আস্তে আস্তে কেমন হয়ে গেল--নিজের গ্রামে আর বড় একটা থাকত না। শ্বশুরবাড়িতে জায়গা না থাকলেও এর ওর বৈঠকখানায় শুয়ে থাকত, দিনমজুরি করত, যার তার সঙ্গে মারামারি করত আর মাঝে মাঝে আকণ্ঠ তাড়ি গিলে অন্ধকারে হামিদাদের বাড়ি গিয়ে চিৎকার করত, যাবি না ক্যানে হারামজাদি, ক্যা আচে তোর ইখানে, যেতে হবে তোকে। বল কুন শালো আচে তোর ইখানে, সে শালোর ঘাড় ভাঙব আমি।

ওর চিৎকারের উত্তরে হামিদা তার দাদিকে লেলিয়ে দিত। পাড়া মাথায় করত হামিদার দাদি। মাঝে মাঝে নরম সুরে জিগগেস করে ট্যারা- আমার দোষটো কোতা হ্যাঁ দাদি? বিয়ে করলাম, বউ লয়ে যাব না লিজের বাড়িতে, লিজের বউয়ের সাথে ঘর করব না, ই কতা কুন রাজ্যে ক্যা শুনেচে। ই তো মাহা ফ্যারের কথা বটে!

হামিদার বুড়ি দাদির কথা একটাই, থাকবে না আমার লাতিন তোর সাতে, তু আপনার মানে মানে দূর হ।

নিদারুণ প্রতিহিংসায় যেন ক্ষেপে উঠত ট্যারা, দাঁড়া হারামজাদিরা, একদিন রেতে গলা টিপে যদি লিকেশ না করি, আমার ট্যারা নাম লয়।

এই গোটা ব্যাপারটার কোন হদিস পায় না শাদু। একটা অজুহাত তুলে শাদুকে বিয়ে করল না হামিদা। মাঝে মাঝে একটা অদ্ভুত হাসি চিকচিক করে উঠে হামিদার চোখে, গভীর কালো সেই চোখের রহস্য ছাপিয়ে হাসিটা দুর্বোধ্য একটা ধাঁধার মত হতচকিত করে দেয় শাদুকে। সেই হাসিটুকু সে বুঝতে পারে না। কেমন ভয় ভয় করে তার। ওর মনে হয় হামিদাকে একটুও চেনে না সে। এ সন্দেহও তার মাঝে মাঝে হয় যে হামিদা আসলে ডাইনী কিংবা সাপিনী--তার মত একটা জোয়ান পেয়ে খেলা করছে; ইচ্ছে হলেই মাথাটা চিবিয়ে খাবে, না হলে মোক্ষম ছোবল দেবে। তাই যদি না হবে, সে শাদুকে বিয়ে করল না কেন? আর ট্যারাকে বিয়ে যদি করলই তাহলে তাকে একদিনও আমল দিল না কেন? মেয়েটা ওর চোখের সামনে থেকে ওকে যেন প্রতি মুহূর্তে পুড়িয়ে মারছে, শাদুর মনটা তাই হু হু করে, বুকটা যেন খাক হয়ে যায়। অথচ ওকে ত্যাগ করা যাচ্ছে না। কখন হয়ত সেই দুষ্টুমিভরা তীক্ষ্ণ সূচিমুখ চকচকে হাসিটা প্রেয়সীর পরিচিত কোমল প্রশ্রয়ের অশ্রুতে গলে যায়, চোখের মণি'দুটি ভরপুর অশ্রুর মধ্যে দীপ্ত হয়ে উঠে, ওর ভিতরের ভালবাসাটা যেন চোখে দেখা যায়, ভালবাসার যে পরশমণির স্পর্শে সবকিছু সোনা হয়ে ওঠে, ওর চোখের মণি যেন সেই পরশমণি--দু'হাতে বুকে টেনে ফিসফিস করে বলে, ভালবাসি, তোকেই ভালবাসি। তারপর কেঁদে বলে, আমার যি বিয়ে হয়ে গেচে, একন আমি কি করি। আমি ক্যানে যে বিয়েটা করলোম! কি ঢুকল আমার মাথার ভ্যাতর, তু ক্যানে কেড়ে আনলি না আমাকে?

কথা শুনে শাদু ভীষণ অবাক হয়ে যায়। মেয়েটা বলে কি। দোষটা এখন তারই ঘাড়ে চাপাতে চায়। সে বলে, তাইলে একন তালাক দে ক্যানে।

না তা হয় না।

ওদের গ্রাম্য নীতিবোধে শাদু ভাবে, কাজটো বড্ড খারাপ হচে, উ সোয়ামির কাচেও যেচে না, আমার ঘরেও আসচে না, অথচ আমাকে ফি রেতেই পেরায় ভালবাসচে। ই সাংঘাতিক বেপার।

সেদিন রহমের কোমর ভেঙে এসে একটা হেস্তনেস্ত করার মনোভাব নিয়ে এল শাদু। সে বলল, ভাল না বাসলে স্বামীর কোন মর্যাদা দেবার দরকার নেই।

আবার ওদের অদ্ভুত গ্রাম্য নীতিবোধে নড়েচড়ে হামিদা বলে, ছি, উ কতা বলিস না। সোয়ামি সব সোমায়েই সোয়ামি।

একটু আগের লড়াই-জেতা শাদু যেন বিমুগ্ধ অসহায় একটি পতঙ্গ। কিন্তুক আমি কি করি আমাকে বল। আমার এক টো বেবস্থা কর।

আবার যেন হামিদার ভালবাসাটি শাদু চোখে দেখতে পেল। ওর চোখের মণি যেন ভালবাসার পরশমণি--সে যেন এক গভীর বৃহৎ মমতায় গলে যেতে লাগল। সে বলল, আজ রেতে আসিস আমাদের বাড়িতে, মনের জ্বালা জুড়োব তোর কাচে। সব কতা বলব তোকে। শেতল হব, আমি আর সইতে পারচি না। আসবি তো আজ রেতে? আসিস, আজ নিচ্চয় আসিস।

শাদু তাকে কথা দেয়। ভাবে, জান টো জুড়োতে চায়, শেতল হতে চায় হামি আমার কাচে, আমি না গেলে চলবে ক্যানে! তবে শা লোর আমিও আজ এক টো হেস্তন্যাস্ত করব, হাড়জ্বালানি আমার জানটোকে খেলে।

রাত একটু বেশি হলে শাদু পায়ে পায়ে এগোয়। শাদুদের সময় পরিমাপের রীতি অনুসারে তখন ভাতঘুমের সময়, অন্ধকার ঝেঁপে আছে গ্রামটিকে। রাস্তার উঁচু নীচু, ইট-পাথর শাদুর পরিচিত। বিশেষ করে অন্ধকারে এই রাস্তাটা তার এত বেশি পরিচিত যে চোখ বন্ধ করে যেতে তার অসুবিধা নাই।

হামিদাদের বাড়ির পাঁচিল পড়ে গিয়েছে। মাটির বারান্দায় কাঁথামুড়ি দিয়ে ওরা শুয়ে আছে, দূর থেকে বোঝা যায়। অভ্যস্ত চোখে অন্ধকার পাতলা হয়ে এসেছে। শাদু জানে সে গেলেই দাদির ঘুম ভেঙে যাবে, একটুও ব্যস্ত না হয়ে বুড়ি জিগগেস করবে, ক্যা ও শাদু লিকিন? আমি ভাবলোম আর কেউ। কাল যাব তোর মায়ের কাচে--ও হামি ওঠ টি, শাদু আইচে-- বুড়ি আবার ঘুমিয়ে পড়বে।

উঠোনটুকু পার হয়ে শাদু বারান্দায় উঠে পড়ল। দাদির ঘুম আজ আর ভাঙে না-- হামিদার শিয়রের কাছে গিয়ে মৃদুকণ্ঠে শাদু ডাকল, হামি!

মেয়েটা অঘোরে ঘুমিয়ে। শাদু আবার ডাকে, হামি, এই দ্যাক, আমি এয়েচি, হামি। অ্যাই হামি।

যেন আঁতকে উঠে ঘুম থেকে জেগে উঠল হামিদা। আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠে, ক্যা গো?

চুপ চুপ, আমি শাদু।

হাঁ ওলাউঠো, হাঁ মরণ আমি চুপ করব? ক্যানে? দাদি, দাদি, ওঠ শিগগীর, শাদু আইচে আমার বাড়ি এই রেতে, শাদু আইচে আমার সব্বনাশ করতে।

শাদু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। অন্ধকারে হামিদার মুখটা দেখা যায় না, কিন্তু বোধ হয় আন্দাজ করা যায়, সাপিনীর সেই হিসহিসে হিংস্র হাসিটা ওর চোখে চকচক করে উঠেছে। ফণা তুলে দুলছে মেয়েটা, এক্ষুনি ছোবল দেবে।

দাদি ঘুম ভেঙে উঠে বসে। সেও ব্যাপারটা বুঝতে পারে না। শাদু এসেছে এজন্যে চেঁচামেচি কেন তা তার নিদ্রাস্থূল নির্বোধ মাথায় ঢুকতে চায় না। তারপর সেও যেন হামিদার প্রতিধ্বনি ক'রে ওঠে। আই সব্বনাশ, আই সব্বনাশ, শাদু আইচে এই রেতে আমার বাড়ি, লাতিনের সব্বনাশ করতে। হায়, ই কি কতা গ! চিলের মত তীক্ষ্ণকণ্ঠে চিৎকার করছে তখন হামিদা। ক্যা কোতা আচ গ, দ্যাখোসে, শাদু এসে আমার কাপড় ধরে টানচে।

হতভম্ব শাদু দেখল অন্ধকার ফুঁড়ে তিনটি ছায়ামূর্তি বাড়ি ঢুকল, ওরা কাছে আসতে একজনকে চিনতে পারল-- ঘাড়ে গর্দানে ট্যারা। ট্যারা আসতেই হামিদা আর একবার চিৎকার ক'রে ওঠে, অ্যা দ্যাখো শাদু এই রেতে এসে আমার কাপড় ধরে টানচে, আমি কিচুই জানি না, আমি তোমার বিয়ে করা বউ।

ওরা এসে যখন শাদুকে ধরল, সে ব্যাপারটাকে তখনও মর্মে নিতে পারে না। দারুণ আক্রোশে ট্যারা ওকে যেন খুন করেই ফেলতে চায়, শালো ঘুঘু বারে বারে ধান খাও তুমি, শালো আজ তোমার হালোয়া বার করব আমি।

শাদু স্থির হয়ে বসে থাকে। ওর চোখের সামনে আকাশের তারাগুলি থির থির করে কাঁপতে থাকে। গাছ-কোমর করে কাপড় পরা হামিদার মূর্তি ফিকে অন্ধকারে ভয়ঙ্কর একটা সাপের মত দুলতে থাকে। নিজের রক্তে বিষের ক্রিয়া সে অনুভব করে। ছুরির ফলার মত চকচকে চাপা হাসিটা সে অনুভবে দেখতে পায়।

তারপরের দিন সন্ধ্যায় বিচারসভা বসে! মাতব্বর জিগগেস করে, হামিদার দাদি, শাদু কি কাপড় ধরে টেনেছিল হামিদার?

সি কতা আবার শুধুইচ গ--আমি কি মিছে কতা বলছি?

আচ্ছা হামিদা, ঠিক করে বলত বাপু, শাদু কি রেতে তোমার কাপড় ধরে টেনেছিল?

হ্যাঁ টেনেছিল।

ঠিক বলছ তো?

অয়, আমার কাপড় ধরে টানলে আর আমি বুঝব না, কি কতা বলছ গ?

বাস বাস--আর একটি কতা, ট্যারা এদিকে এসো দিকিন।

ট্যারা মাতব্বরের সামনে দাঁড়ায়।

তুমি তো বাপু হামিদার কাছে থাকো না--উ বাড়ি যাও না তুমি, কি করে তুমি বাপু ঠিক পেলে আজ রেতে শাদু আসবে?

আমি জানতোম।

কি করে জানতে সেইটোই শুধুইচি।

আমি জানতোম।

একটা কতা একশবার বলো না বাপু, জানতে কি করে সেটি তোমাকে বলতে হবে।

বউয়ের সাতে আমার ভাব হইচে, বউ বলেছিল আমাকে।

সভায় একটা গুঞ্জন শোনা যায়, ই তো ভারি মজার কতা বটে!

মাতব্বর এবারে শাদুকে ডাকে। শাদু, তুমি কাল রেতে হামিদার বাড়ি গেইছিলে?

গ্যাসলোম।

আরে শালো, শালো আবার বলে, গ্যাসলোম--কোন নীতিবাগীশ মন্তব্য করে।

ওর কাপড় ধরে টেনেছিলে?

টেনেছেলাম।

মাতব্বর শান্তকণ্ঠে বলে, তাইলে আর কি, সবাই স্বীকার যেচে। মানে কতা হোল কি শাদু অন্যায় করেচে, ওর বিচের দরকার।

শাদুর সমর্থক কেউ চিৎকার করে ওঠে, বিচের আবার কি, হামির বাড়ি শাদু আজ কেন কতদিন ধরে যেচে। বোধ হয় আরও কেউ যায়, সি কতা আমরা জানি। মাতব্বর বলে, বেশ না হয় জানলে, কিন্তুক হামিদা তো কুনদিন বিচের চায় নাই। বিচের চাইলে বিচের হোত তার।

অ, সেটোও তো একটা কতা বটে--সমর্থক যুক্তি পেয়ে আশ্বস্ত হয়। মাতব্বর রায় দেয়, তাহলে অন্যায় একটা শাদু করেচে, ওকে দশজুতো মারা হোক, না কি গ?

নিচ্চয়, সেইটোই লেজ্য হয়।

আমি দশের কাছে দশ জুতো খ্যালোম--অন্ধকারে অশত্থ গাছটার মোটা গুঁড়িটায় ব'সে শাদু ভাবে, উ কি ভালবাসতে আচে, উ পাপ, উ কি কেউ ভালবাসে, উ যে সাপ।

ওর পিছনে একটি ছায়া এসে দাঁড়ায়।

শাদু বিড়বিড় করে, আমার লেজ্য বিচের হয়েচে। দশের কাচে আমি দশ জুতো খ্যালোম। আমার জানটো লিয়ে লিলেনা ক্যানে ওরা!

পিছনের ছায়া মৃদুকণ্ঠে ডাকে, অ্যাহ!

শাদু পিছন ফিরে তাকায়। হামিদা দাঁড়িয়ে আছে। মাথার কাপড় তোলা, জড়সড় হয়ে নববধূর মত দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো হাসছে। অ্যাই শুনতে পেচিস না?

শাদু চুপ করে থাকে।

আর ভালবাসবি না? মন জুড়োতে যাবি না আমার কাচে, শেতল হবি না--ম্লান হাসে হামিদা।

শাদু কথা বলে না।

আমার সাথে কতা বলবি না, লয়? গাল দিচিস আমাকে?

মানুষটা তবু কথা বলে না।

বলিস না, বলিস না, কতা বলিস না। যমের অরুচি, চক্ষের শূল--হু হু করে কেঁদে ভেঙে পড়ে মেয়েটা। ঐ যে ওর ভালবাসাটা ওর চোখে আশ্রয় করে--যেন চোখে দেখা যায়।

আজ যেচি আমি সোয়ামির বাড়ি, তোর ছেলে রইল আমার প্যাটে। খানিকটো শোধ দেলোম।

যেমন এসেছিল তেমনি চলে গেল।

1 টি মন্তব্য:

  1. চিরন্তন নিবৃত্তি... এই ওই অলিগলি বেয়ে সাপের মতো সরু হিলহিলে মনের গতি। ধরা পড়ে কি পড়েনা... কী অসামান্য লেখা।
    শ্রাবণী দাশগুপ্ত।

    উত্তরমুছুন