শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

কথাকার ভগীরথ মিশ্রের সঙ্গে কিছুক্ষণঃ

‘গল্পপাঠ’-এর পক্ষে নীহারুল ইসলাম ও বিশ্বজিৎ পাণ্ডা


প্রশ্নঃ আপনি লেখা শুরু করলেন কবে থেকে? পরিবার থেকে লেখার কোনও অনুপ্রেরণা?

ভগীরথ মিশ্র :   খুব ছেলেবেলা থেকে লেখালেখির শুরু। তবে সেসব ছিল কাঁচা হাতের খুবই এলোমেলা লেখা। পাখির ডাক শুনে, ফড়িংয়ের ওড়া দেখে, মেজ জ্যাঠার ধুতির কোঁচা নিয়ে ‘জলে-ঝড়ে/ ফড়িং ওড়ে’ গোছের লাইনের দু’লাইনের কাঁচা ছড়া। ওগুলো কবেই হারিয়ে গিয়েছে। ওইসব রচনার ক্ষেত্রে ঠিক অনুপ্রেরণা না হলেও, বাবা-মায়ের একজাতের প্রশ্রয় তো ছিলই।


প্রশ্নঃ বহুজনের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সাহিত্যচর্চা শুরু হয় কবিতা দিয়ে। পরে গদ্যে। আপনি গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন? নাকি কবিতা? সোজা কথায় আপনার লেখা শুরুর ইতিহাসটা যদি বিস্তারিত বলেন!

ভগীরথ মিশ্র : কবিতা নয়, গল্পও নয়, আমি কিন্তু কৈশরে লেখালেখি শুরু করেছিলাম নাটক দিয়ে। বাড়িতে বেশ কয়েকটি পৌরাণিক নাটকের বই ছিল। অবসর সময়ে সবাইকে লুকিয়ে সেসব পড়ে-টড়ে আমার নাটক লিখবার সখ হল। দিন দশেকের অক্লান্ত প্রয়াসে লিখেও ফেললাম একটি নীতিদীর্ঘ নাটক। যদ্দুর মনে পড়ে যতগুলো নাটক আমাদের বাড়িতে ছিল, আমার লেখা নাটকের কাহিনীর মধ্যে সবগুলো মিলেমিশে গিয়েছিল। ফলে নাটকের যে কাহিনীরূপটি দাঁড়িয়েছিল, সেটা আজ অবধি কোনও পূরাণেই লেখা হয়নি। সম্ভবত তখন আমার ওই বোধটুকুও ছিল না যে, পৌরাণিক কাহিনীগুলোকে এভাবে যথেচ্ছ বদলে দেওয়া বা মিলিয়ে মিশিয়ে দেওয়া যায় না। সেই নাটকটিও কবে কোথায় কীভাবে যে হারিয়ে গিয়েছে, আজ আর মনে নেই। তবে আমি যখন ক্লাস সেভেনের কিংবা এইটের ছাত্র, একটা গল্প লিখেছিলাম। সেটা ছিল একটি ‘পোয়েটিক জাস্টিসের’ গল্প। পুকুরের পাড়স্থ একটি গাছের ডালে একটি পাখি বাসা বেঁধে বাচ্চা ফুটিয়েছিল। গৃহকর্তা সেই বাসাটি ভেঙে দেওয়ায় বাচ্চাশুদ্ধ বাসাটি পড়ে গিয়েছিল পুকুরের জলে। বাচ্চাগুলো মরে গিয়েছিল। আর, পরের বছর নৌকোযোগে কোথাও (সম্ভবত গঙ্গাসাগর) যাবার বেলায় নৌকোডুবি হলে পর সবাই বেঁচে যায়, কিন্তু বাঁচেনি গৃহকর্তার বাচ্চাগুলি। কারণ, তারা সাঁতার জানত না। মনে আছে, সেই গল্পের প্রথম ও একমাত্র শ্রোতা ছিলেন আমার মা। পাখির বাচ্চাগুলোর এবং গৃহকর্তার বাচ্চাগুলোর মরে যাওয়ার জায়গায় পৌঁছে তিনি পৃথক পৃথকভাবে দু’বার হাপুসনয়নে কেঁদেছিলেন। বলা বাহুল্য, ওই গল্পটিও আর নেই।

আর অল্পস্বল্প অক্ষম ছড়া-টড়া লিখলেও কবিতা আমি ছেলেবেলায় লিখিইনি। তবে, যখন ক্লাস টেনের ছাত্র, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর ‘কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল ...’ পদ্যটি ইংরেজীতে অনুবাদ করেছিলাম। এবং সেটা স্কুলের ম্যাগাজিনে প্রকাশিতও হয়েছিল। তবে এতকাল বাদে স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, সেই অনুবাদকর্মটি যত না ছিল আমার, তার চেয়ে ঢের বেশী ছিল স্কুলের ইংরেজীর শিক্ষক সত্যবাবুর। কবিতা-তো-কবিতা, ওই ম্যাগাজিনটাই হারিয়ে গিয়েছে। স্কুলও পরবর্তীকালে আমাকে একটি কপি দিতে পারেনি। তখনই বুঝেছি, এই যে কথায় কথায় সবকিছু হারিয়ে ফেলা, এটা কেবল আমারই একটি ‘মহৎ গুণ’ নয়, স্কুলের মতো একটা গোটা প্রতিষ্ঠানও ওই মহৎ গুণের অধিকারী। সেই কারণে নিজেকে ক্ষমা করে দিয়েছি।

হ্যাঁ, মনে পড়েছে, প্রাক-যৌবনে একটিমাত্র কবিতা লিখেছিলাম। সেটাই সম্ভবত আমার প্রথম কবিতা। সেটা ১৯৬৬ সাল। তখন আমি কলেজে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। যদ্দুর মনে পড়ছে, তার আগে কোনও কবিতা লিখিনি। কী আশ্চর্য, কবিতাটি আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। এবং আশুতোষ কলেজ ম্যাগাজিনে ১৯৬৭ সালের সুবর্ণজয়ন্তী সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সুবাদে আমি কবিগুরুর ‘সঞ্চয়িতা’ উপহার পেয়েছিলাম। সঞ্চয়িতার ওই কপিটি জরাজীর্ণ অবস্থায়ও এখনও অবধি রক্ষা করে চলেছি। এবং এখনও ওটাই নিয়মিত ব্যবহার করি। এবার ওই কবিতার প্রস্নগে আসি। পরিণত বয়েসে পৌঁছে কবিতাটি পড়ে আমি যৎপরোনাস্তি বিভ্রান্ত বোধ করেছি। খুবই গীতিময়তাসম্পন্ন ওই কবিতার প্রথম গুটিকয় স্তবকে প্রেমিকার প্রতি আত্মনিবেদন থাকলেও একেবারে শেষ স্তবকে পৌঁছে ‘হে মোর দেবতা’-টেবতা বলে ব্যাপারটাকে একেবারে গুলিয়ে দিয়েছি। একজন কবিতা বিশেষজ্ঞ অবশ্য শুনে বলেছে, সেটাই তো মহৎ কবিতার লক্ষণ। প্রেমিক ও দেবতা একসূত্রে মিলে যান। প্রেম ও পূজা একাকার হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথে এমনটা ভুরিভুরি। বৈষ্ণব পদাবলীতে তো আদ্যন্ত। ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়রে দেবতা’। শুনতে শুনতে ওই বয়েসে গর্বে ফুলে ফুলে উঠেছে বুক। কিন্তু পরবর্তীকালে কবিতাটিকে সাধ করে কাউকে পড়াইনি।



প্রশ্নঃ প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়েছিল কবে, কোন কাগজে?

ভগীরথ মিশ্র : ক্লাস সেভেনে লেখা’ পোয়েটিক জাস্টিস’ গল্পটিকে ধরলে আমার দ্বিতীয় গল্প ‘তারা নয়, জোনাকি’ প্রকাশিত হয়েছিল আশুতোষ কলেজ ম্যাগাজিনে। ১৯৬৬ সালে। ওই গল্পটিও আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয়েছিল। তবে ম্যাগাজিনের ওই সংখ্যাটিও আমি হারিয়ে ফেলি। মাত্র কয়েক বছর আগে বন্ধু ত্রিদিব বসুর সৌজন্যে গল্পটির একটি ফোটোকপি পেয়েছি। সেটা এখনও অবধি আমার কাছে রয়েছে।


প্রশ্নঃ প্রথম বই?

ভগীরথ মিশ্র :প্রথম বই বলতে গল্পসংকলন। ‘জাইগেনসিয়া ও অন্যান্য গল্প’। ১৯৮৬ নাগাদ বেরিয়েছিল মেদিনীপুরের ‘অমৃতলোক’ থেকে। সম্পাদক সমীরণ মজুমদার। তিনি ‘অমৃতলোক’ পত্রিকার প্রতি সংখ্যায় আমার একটি করে গল্প ছাপিয়ে তার অতিরিক্ত কপি জমিয়ে প্রকাশ করেছিলেন ওই গল্পগ্রন্থটি। ছান্দারখ্যাত উৎপল চক্রবর্তী এঁকে দিয়েছিলে প্রচ্ছদ। আজকের প্রতিষ্ঠিত কথাশিল্পী বন্ধুবর দীপঙ্কর দাস সেই প্রচ্ছদটি নিজব্যয়ে ছাপিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন আমার বিষ্ণুপুরের বাসায়।


প্রশ্নঃ উপন্যাস লেখার কথা কখন ভাবলেন?

ভগীরথ মিশ্র : ভাবনাটা কোথাও ছিল সম্ভবত। কবে থেকে বলতে পারব না। ‘প্রমা’ পত্রিকার সম্পাদক সুরজিৎ ঘোষ উপন্যাস লিখতে বলেন প্রমার পাতায়। তখনই শুরু করি। প্রথম উপন্যাস ‘অন্তর্গত নীলস্রোত’। উপন্যাসটি প্রমার পুজোসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। পরে প্রমা প্রকাশনী থেকে বই হয়ে বেরোয়।


প্রশ্নঃ আপনার অধিকাংশ গল্পের পটভূমি পশ্চিম মেদিনীপুর-বাঁকুড়া-পুরুলিয়া জুড়ে। পরিবেশগত মিলের কারণে অনেক সময় আপনার একটা গল্পের কথা ভাবতে গিয়ে অন্য গল্প প্রসঙ্গ চলে আসে।

ভগীরথ মিশ্র : হতে পারে। শিখ-পাঞ্জাবীদের সনাক্ত করার বেলায়ও নাকি অন্য প্রদেশের বাসিন্দাদের সামনে তেমন সমস্যা দেখা দেয়। পাগড়ি-দাড়ি সম্মিলিত সব শিখকেই একই রকম লাগে। কিন্তু সব শিখই তো আর একই রকম দেখতে নয়। আসলে গল্প বহিরঙ্গে কেউ খোঁজে না। গদ্যে-পটভূমিতে তো গল্পটা থাকে না। গল্পকে খুঁজতে হয় তার গভীরে নেমে। আমার মনে হয়, সেখানে প্রতিটি গল্পই স্বতন্ত্র হয়ে যায়। তাও যদি একই রকম পটভূমিতে লেখা দু’টি গল্পকে কোনও পাঠকের একই রকম বলে মনে হয় তবে আমার মতে তা ওই পাঠকের পাঠ-ক্রিয়ার ত্রুটি।


প্রশ্নঃ আপনার অধিকাংশ লেখায়, বিশেষত উপন্যাসে এক ধরণের গবেষণা আছে। ‘ঐন্দ্রজালিক’ উপন্যাসে অদ্ভূত একটা বিষয়কে বেছে নিলেন। জাদুবিদ্যা। হঠাৎ এই ধরণের বিষয় নিয়ে লিখতে ইচ্ছে হল কেন? আপনি কি ছোটবেলা থেকেই জাদুবিদ্যা সম্পর্কে উৎসাহী ছিলেন? আপনি কিছু গুরু ধরে জাদু শিখেছিলেন, তা কি উপন্যাস লেখার তাগিদে নাকি এমনিতেই?

ভগীরথ মিশ্র : জাদুর প্রতি আমার আশৈশব আসক্তি। খুব ছোটবেলায় এক জাদুকরের সঙ্গে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। ওঁর সঙ্গে ছিলাম প্রায় একমাস। সে এক রোমহর্ষক কাহিনী। ছেলেবেলা থেকে ওঝা-গুনীন, গ্রাম্য জাদুকরদের সাগরেদি করেছি। যেখানেই সুযোগ হয়েছে, জাদুকরদের সঙ্গে ভাব জমিয়েছি। মেলায়-পার্বণে জাদুর সরঞ্জামও কিনতাম অল্পস্বল্প। লেখালেখি যখন পুরোদমে চলছে, তখন থেকে জাদু নিয়ে বড় কাজ করার ইচ্ছেটা মনের গহনে উঁকিঝুকি মারতে শুরু করে। সেই টানে ১৯৯৭ থেকে ২০১০ অবধি জাদুকর এস কুমারের কাছে লাগাতার জাদু শিখি। তাঁর দলের সঙ্গে আপার আসাম এলাকায় মাসাধিককাল জাদু দেখিয়ে বেড়াই। ওঁদের থেকে হাতেনাতে অনেককিছু শিখি। এছাড়া, ইংল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় আমি দু’বার দীর্ঘ সময় ধরে জাদু প্রদর্শন করেছি। ততদিনে জাদু নিয়ে পুরোদমে পড়াশুনোও শুরু করেছি। বিদেশ থেকেও অনেক বই আনিয়েছি। ওইসব পুঁজি নিয়ে ২০০৬ থেকে ২০১০ সালে শেষ করি আমার জাদু-বিষয়ক উপন্যাসের প্রথম খন্ড ‘ঐন্দ্রজালিক’।


প্রশ্নঃ এই জাদুবিদ্যা সম্পর্কে আপনার ধারণা ছোটগল্প লেখার ক্ষেত্রে কতখানি প্রভাব ফেলেছে?

ভগীরথ মিশ্র : না, ছোটগল্পে জাদু তেমন প্রভাব ফেলতে পারেনি। কেন ফেলতে পারেনি, বলতে পারব না।


প্রশ্নঃ আপনি একসময় যাত্রাশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অভিনয় করতেন। সেই সম্পর্কে যদি কিছু বলেন। সেই অভিজ্ঞতা কীভাবে কাজে লাগিয়েছেন?

ভগীরথ মিশ্র : হ্যাঁ, বেশকিছু বছর একেবারে পেশাদার যাত্রাদলে কাজ করেছি। ষাট-সত্তরের দশকে আমার মাইনে ছিল নাইটপিছু আট টাকা। ওই সময়ের মূল্যমানে অঙ্কটা কিন্তু মোটেই কম ছিল না। তখন দলের সঙ্গে আঘাটায়-বেঘাটায় ঘুরতে ঘুরতে কত যে মানুষ-রতন দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে! অনেক মূল্যবান অভিজ্ঞতাও হয়েছে। সেসব পরোক্ষে আমার গল্পে-উপন্যাসে চলে এসেছে। তবে ওই সময়টাকে নিয়ে দু-তিনটির বেশি গল্প লিখিনি। সবকিছু জমিয়ে রেখেছি ওই নিয়ে একটা বড় মাপের উপন্যাস লিখব বলে। ওই উপন্যাসটা অনেকখানি লিখেও ফেলেছি। জাদু-বিষয়ক উপন্যাসের দ্বিতীয় খন্ডটা সবে শেষ করেছি। তৃতীয় খন্ডটা শেষ করেই ওটা পুরোদমে ধরব।


প্রশ্নঃ সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি আপনি জাদু দেখানো, কার্টুন আঁকা, কুটুম-কাটাম করা, বনসাই চর্চা করা ইত্যাদিও নিয়মিত করে থাকেন। একসঙ্গে এতসব কীভাবে করেন? এর মধ্যে কোনও একটা চর্চাকে বেছে নিতে বললে কোন চর্চাটাকে বেছে নেবেন?

ভগীরথ মিশ্র : কেবল কার্টুন, বনসাই, কুটুম-কাটামই নয়, আমি আরও কিছু করি-টরি। আমি একজন সারমেয়-প্রশিক্ষকও বটে। আমার শেষতম যে সঙ্গী-সারমেয়টি আমার তালিমে জাদু দেখাত, ই-টিভি থেকে একবার তা কভার করেছিল। ‘আজকাল’ পত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছিল। এত-এত কীভাবে করি, জানতে চাইছো। আসলে ভালবেসে কিছু করলে সময় ঠিকই জুটে যায়। আমাদের জীবনে অনন্ত সময়। আমরা তার কতটুকুই বা ব্যবহার করি!

ওগুলোর মধ্যে একটাকেও ছাড়তে পারব না।


প্রশ্নঃ চিরকাল সরকারি আমলা ছিলেন। উচ্চপদে বহাল ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতা আপনার বহু গল্পে ছায়া ফেলেছে।

ভগীরথ মিশ্র : তা তো ফেলেছেই। ওই ক্ষেত্রে কাজ করবার সুবাদে কত কত মানুষ দেখলাম। কত কত নতুন নতুন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলাম। সেসব আমার লেখালেখিতে খুবই কাজে লেগেছে। তবে ওইসব পদ আমার অনেকখানি সময় শুষেও নিয়েছে।


প্রশ্নঃ এখন পর্যন্ত আনুমানিক কত গল্প লিখেছেন?

ভগীরথ মিশ্র :তা আড়াইশোর কিছু বেশিই হবে।


প্রশ্নঃ আপনি প্রচুর হাসির গল্প লিখেছেন? সেগুলির জনপ্রিয়তা কম নয়। তা সত্বেও এখন আর ওই ধরণের গল্প লেখেন না কেন? যদি বিস্তারিত বলেন!

ভগীরথ মিশ্র : এই একটা ভাল প্রশ্ন করেছ। কথাটা আমাকেও বেশ কিছুদিন যাবৎ ভাবাচ্ছে। তোমরা ঠিকই বলেছ, হাসির লেখা ইদানিং অনেকটাই কমিয়ে ফেলেছি। কারণটা আমার মতো করে বলি তবে। দ্যাখো- হাসির গল্প লেখা কিন্তু সিরিয়াস গল্প লেখার চেয়ে ঢের কঠিন কম্মো। তাও লিখতাম। লিখতে ভাল লাগত। কিন্তু ধীরে ধীরে কেমন জানি মনে হয়েছে, বাংলা সাহিত্যে হাস্যরস কখনোই প্রাধান্য পায়নি। বাঙালী পাঠকেরা হাসির কথায় হেসেছেন, কিন্তু হাসিকে বড় একটা মর্যাদা দেননি কখনোই। হাস্যরসকে চিরকাল লঘুরস বলে জ্ঞান করা হয়েছে। আগেকার দিনে রাজা-রাজড়াদের দরবারে অতি অবশ্যই এক বা একাধিক বয়স্য থাকত। ভারী ভারী আলোচনার পর কিঞ্চিৎ হাসানোর ব্যবস্থা। কিঞ্চিৎ কমিক রিলিফ। খাটনির পর চাটনি। মোল্লা নাসিরুদ্দিন, বীরবল, গোপালভাঁড়- এইসব হাস্যরসের কারিগরদের তাই বয়স্য, ভাঁড় ইত্যাদি অভিধায় ভূষিত করা হয়েছে। সব যুগের যাত্রায়, নাটকে, সিনেমায়ও একই ব্যবস্থা। অন্তত একজন কমেডিয়ান রাখা হয়ই। হাসির গল্পও বুঝি তেমনই। পড়লাম, খুব হাসলামও, কিন্তু সাহিত্যের মূল্যায়নের প্রশ্নে শ্রদ্ধার সঙ্গে উল্লেখ করতে ভুলেই গেলাম। সাধারণ মানুষকে দোশ দেওয়া কেন, হাস্যরস নিয়ে বিদগ্ধদেরও খুব উচ্চ ধারণা নেই কোনওকালেও। সেই কারণেই আমার বিশ্বাস, বাংলা সাহিত্যে প্রথম শ্রেণীর কোনও গদ্যকার হাস্যরস সৃষ্টির কাজে অধিক কালি খরচ করতে চাইবেন না। কারণ, অতীতে যাঁরা তেমনটা চেয়েছেন, বাঙালী পাঠকের দৃষ্টিতে তাঁদের স্থানটি যে কোথায়, তা তো শিব্রাম চক্রবর্তী আর সৈয়দ মুজতবা আলীদের পরিণতি দেখেই বোঝা যায়। ওই একই কারণে শিব্রাম চক্রবর্তীর মতো লেখকও অবহেলা ও বিস্মৃতির শিকার হন। তাঁর জন্মশতবার্ষিকীটি কেমন নিঃশব্দে চলে যায়, বাঙালী বুঝতেও পারে না। হাস্যরসকে গুরুত্ব দিলে সৈয়দ মুজতবা আলী কবেই জ্ঞানপীঠ পেয়ে যেতেন। আমাদের চোখের সামনেই সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায় রয়েছেন, এককালে বাঙালীকে হাসির ঝর্ণাতলায় কত অবগাহন করিয়েছেন। সেই তিনি এখন হাসির রচনা ছেড়ে মূলত আধ্যাত্মিক রচনায় ডুবে রয়েছেন। বাঙালীর ওপর তীব্র অভিমানেই হাস্যরসের জগৎ থেকে তাঁর এমন বানপ্রস্থ কিনা জানি না।

হাস্যরসাত্মক রচনাকে নিরন্তর হেলাফেলা করবার আর একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ তো আমার সামনেই রয়েছে। একটি প্রথম শ্রেণীর সর্বভারতীয় প্রকাশনা সংস্থা আমার একটি রম্য গল্পের সংকলন প্রকাশ করতে চেয়েছিল। তারা ওই সংকলনের প্রথমে একটি ভূমিকা রাখতে চেয়েছিল। সেই জন্য বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন অতি বিদগ্ধ মানুষকে ভূমিকা লিখে দিতে অনুরোধ করেছিল। তিনি তাতেও রাজী হয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দেড়-দু’বছর হতে চলল, তিনি আর ওটা লিখে উঠতেই পারলেন না। সম্ভবত, এটি একটি হাস্যরসাত্মক গল্পের সংকলন বলেই ওই বিদগ্ধ মানুষটির এত অনীহা। তাই ইদানিং আর হাসির লেখায় বড় একটা উৎসাহ পাইনে।


প্রশ্নঃ কোন গল্প লেখেননি? অথচ ইচ্ছে করে না-লেখা গল্প লিখতে ...

ভগীরথ মিশ্র : তেমন গল্প তো বেশ কয়েকটা রয়েছে। গল্পগুলো লিখতে ভীষণ ইচ্ছে করে। কিন্তু যতবার লিখতে বসেছি, খানিক বাদেই থামতে হয়েছে। মে হয়েছে, যেটা বলতে চাইছি সেটা কিছুতেই আসছে না।


প্রশ্নঃ সাহিত্য ক্ষেত্রে কিছু নিয়ে আক্ষেপ?

ভগীরথ মিশ্র : তেমন আক্ষেপ তো আমার মনে হয় সমস্ত সিরিয়াস লেখকদের মধ্যেই থাকে। বিশেষ করে এই সময়ের বাংলা সাহিত্যের পরিমন্ডলটি দেখতে দেখতে হতাশায় ভরে যায় মন। দেখতে পাও না, ‘কলিকালের ছড়া / রঘুনাথ পণ্ডিত ঘুঁটে দিচ্ছেন, রঘুয়া চড়ে ঘোড়া’ প্রবচনটি কেমন সত্যি হয়ে উঠেছে। অলেখকরা কেমন জাঁকিয়ে বসেছেন আসর। পাঠকের একটা বড় অংশ কেমন মহাভারতের অশ্বত্থামার মতো পিটুলিগোলা জলকেই দুগ্ধজ্ঞানে তৃপ্তিভরে পান করে চলেছে। বেনিয়া কাগজ ও প্রকাশন-সংস্থাগুলি কেমন ওদের ঢাক বাজিয়ে চলেছে জোরে জোরে। তাই শুনে বাঙালী পাঠকের একটা বড় অংশ কেমন গদগদ হয়ে উঠছে। ওসব নিয়ে আক্ষেপ তো হবেই।


প্রশ্নঃ পুরস্কার প্রাপ্তি?

ভগীরথ মিশ্র : কিছু পুরস্কার তো পেয়েছিই। তোমরা জানো ওগুলোর কথা। কিন্তু সবচেয়ে বড় পুরস্কার কখনো-সখনো। যখন রাত এগারোটায় বীরভূমের একটি ওষুধের দোকানের কর্মচারী আমায় ফোন করে জানান যে, তিনি আমার ‘মৃগয়া’ উপন্যাসটি সম্প্রতি শেষ করেছেন, তখন মনে হয়, এর চেয়ে বড় পুরস্কার বুঝি আর হয় না। বাস্তবিক, ওই মাপের পুরস্কার পেলে লেখক-জীবন সার্থক হয়ে যায়। আবার বাংলা সাহিত্যের প্রবীণ অধ্যাপকটি যখন সোল্লাসে বলে ওঠেন, আপনার ‘মৃগয়া’ উপন্যাসটি নিয়েই তো মৃণাল সেন তাঁর ‘মৃগয়া’ ছবিটা করেছিলেন, তখন মনে হয়, এযাবৎ যতগুলো প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার পেয়েছি, সব টান মেরে ফেলে দিই রাস্তায়।


প্রশ্নঃ রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে আপনার ধারণা?

ভগীরথ মিশ্র :অনেক বৈপরীত্য ও পরস্পর বিরোধিতা সত্বেও আমাদের দেশে এক বিরল প্রতিভা তিনি।


প্রশ্নঃ বর্তমান রাজনীতির ময়দানে সংখ্যালঘু একটা বড় ঘুটি। আপনার গল্পে সংখ্যালঘুদের কথা একেবারেই আসেনি। কেন?

ভগীরথ মিশ্র : না না, এসেছে। তবে বেশ কম। আমার ‘ফাঁসবদল’ উপন্যাসটি (‘মিত্র ও ঘোষ’ থেকে প্রকাশিত) তো হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়েই লেখা। ওই উপন্যাসের তলদেশে রয়েছে ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার ধর্মীয় কারণগুলির বিশ্লেষণ। কিন্তু তাও বলি, মুসলমান ভাইবোনদের নিয়ে বেশি কিছু লিখিনি। কারণটা অবশ্যই ব্যক্তিগত। আসলে, আমি যে-জীবনকে নিয়ে বড় একটা গভীরে জানি না, তা নিয়ে লিখতেও চাইনে। সঙ্কোচ হয়। মনে হয়, ফাঁকি দিচ্ছি। বলতে পারো, একই দেশের জনগোষ্ঠীর অংশ ওঁরা। ওঁদের সম্পর্কে জানেন নাই বা কেন? তার জবাবে বলি, আশৈশব মুসলমান সম্প্রদায়ের নিবিড় সান্নিধ্যে বেড়ে উঠিনি। তাও যেটুকু সংস্পর্শে ও সান্নিধ্যে এসেছি, খুব গভীরে ঢুকতে সাহস হয়নি। আমার কেন যেন মনে হয়েছে, মুসলমানভাইয়েরা তাঁদের ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি ও যাপন নিয়ে বড় বেশি স্পর্শকাতর। তাই জীবনের খুল্লামখুল্লা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কোথায় তাঁদের আবেগকে আঘাত করে বশব, ওই সঙ্কোচটাও রয়ে গেছে চিরকাল। যেমন ধরো, আমি অনায়াসেই বলতে পারি হিন্দুদের দেবদেবীগুলোকে মানুষই বানিয়েছে নিজেদের মতো করে। আকারে, অবয়বে, পোশাকে, খাদ্যে, চরিত্রে তারা হরেদরে তাদের সৃষ্টিকর্তাদের মতোই। এর বাইরে তাদের কোনও অস্তিত্বই নেই। অকপটে বলতে পারি, হিন্দুধর্ম কত মানুষকে ঈশ্বর ও মোক্ষ পাইয়েছে, তা আমার জানা নেই। কত পূণাত্মাকে স্বর্গের দ্বারদেশ অবধি পাঠিয়েছে, তাও না, তবে ওই ধর্মটি যুগে যুগে মানুষের মধ্যে যত ঘৃণা, বিদ্বেষ, নিষ্ঠুরতা, জাতপাত, অস্পৃশ্যতা ছড়িয়েছে, তাকে আমি মনেপ্রাণে ঘৃণা করি। নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি, ধর্ম-ভগবান-জন্মান্তরবাদ-অদৃষ্টবাদ এসব মানুষকে নিরঙ্কুশ শোষণ করবার এক-একটি সুচতুর অস্ত্র ছাড়া আর কিছুই নয়। কেবল বলতেই পারি, তা নয়, আমার ‘মৃগয়া’ উপন্যাসে আমি ওগুলো খোলাখুলি লিখেছিও। কিন্তু মুসলমানভাইদের ধর্মীয় জীবনযাপন ও রীতিনীতি নিয়ে তেমন কোনও বিশ্লেষণমূলক বা সমালোচনামূলক মন্তব্য করলে, আমার বিশ্বাস, তাঁরা সহজভাবে নেবেন না। বরং যারপরনাই আহত হবেন। এইসব কারণেই ... বোঝোই তো, সাহিত্য স্রেফ চলমান জীবনের কোনও বোকা বোকা ধারাবিবরণী নয়। মানবজীবনের নিখুঁত বিশ্লেষণও থাকবে তাতে। সেখানে লেখকের জীবনদর্শনও সম্পৃক্ত হয়ে যায়। কাজেই, বাঁকুড়ার একটি চালু প্রবাদের অনুসরণে বলি, কী দরকার ভাই ‘ঢিলিয়ে ক্যাঁগলাশ তোলার’!


প্রশ্নঃ স্বাধীনতার সমান বয়েসি আপনি। তারপর থেকে রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির অনেক পালাবদল দেখেছেন। এব্যাপারে কিছু বলবেন?

ভগীরথ মিশ্র :  এক কথায় বলতে গেলে, নিরক্ষর-দরিদ্র কোটি কোটি মানুষের দেশে মুষ্ঠিমেয় একদল লুঠেরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে গড়ে তুলেছে একটি সুকৌশলী লুণ্ঠনশিল্প। দেশের হতভাগ্য মানুষগুলি ওই শিল্পের কাঁচামাল।


প্রশ্নঃ বর্তমান রাজনীতি সম্পর্কে?

ভগীরথ মিশ্র : কী আর বলব, সবকিছু অতি দ্রুত গতিতে নরকের পানে দৌড়চ্ছে।


প্রশ্নঃ বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের সময় থেকে আপনাদের সময়, অর্থাৎ সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলা কথাসাহিত্যে পালাবদল সম্পর্কে যদি কিছু বলেন?

ভগীরথ মিশ্র : এককথায় বলা খুব কঠিন। কাজেই একটু বিস্তারিত ভাবে বলি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের যাত্রাটি শুরু হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে। তারপর বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় অনেক দিকপাল সাহিত্যিক এসেছেন। অনেক সার্থক সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন তাঁরা। তবে কথাসাহিত্যে বিষয়ের ব্যাপারে তাঁরা একটি অবস্থানেই আটকে থেকেছেন বলে আমার মনে হয়েছে। বিষয়টি হল নর-নারীর সম্পর্ক। তাঁদের রচনায় অনেক বিচিত্র পটভূমি এসেছে। কাহিনীও এসেছে বিচিত্র। কিন্তু শেষ অবধি প্রায় সবগুলি রচনাতেই কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে ওই নর-নারীর সম্পর্ক। অবশ্য সেই সম্পর্কগুলিও অনেক শক্তিশালী কলমে বহুমাত্রিক হয়েছে। কিন্তু কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রমকে বাদ দিলে, বিষয়ের প্রশ্নে তাঁরা অধিকাংশই ওই নর-নারীর সম্পর্কেই আটকে থেকেছেন বলে মনে হয়।

মূলত পঞ্চাশ দশকের দ্বিতীয়ার্ধ ও ষাটের দশকে বাংলা কথাসাহিত্যে অন্তত তিনটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছিল। এক- ওই সময়কালে বাংলা কথাশিল্পের আকাশে উদয় হলেন এমনই এক শ্রেণীর লেখক, যাঁদের কলমে সেই নরনারীর সম্পর্ক সহসা একমাত্রিক হয়ে দেখা দিল, সেটা হল নরনারীর মধ্যে প্রেম। এক-তরফা প্রেম। দ্বিমুখী প্রেম। ত্রিভূজী প্রেম। অসম প্রেম। বিষম প্রেম। তরল প্রেম। গাঢ় প্রেম। স্বর্গীয় প্রেম। নারকীয় প্রেম এবং যাবতীয় অপ্রেম, প্রেমজনিত ঈর্ষা, বিরহ, হতাশা, যন্ত্রণা। বাংলা কথাসাহিত্যের আঙিনা তখন একটি ভরভরন্ত প্রেমের হাট। কেউ কেউ আবার তাতে মেশালেন সূক্ষ্ম-স্থুল, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যৌনতা। মানে, স্থুল অর্থে যৌনতা। শুরু হল ফ্রয়েডীয় পদ্ধতিতে নরনারীর মনোবিশ্লেষণ। রচিত হল মনোবিকলনের ব্যাকরণ। যদিও কে কতখানি ফ্রয়েড পড়েছিলেন, সে বিষয়ে আমার মনে ঘোরতর সংশয় রয়েছে। আমরা ওই রচনাগুলির নাম দিয়েছিলাম ‘প্রেম-কামের গল্প’। ইংরেজীতে বলতাম ‘বেডরূম লিটারেচার’। অথচ তার অব্যবহিত পূর্বেই ঘটে গেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। দেশভাগ। তেতাল্লিসের দুর্ভিক্ষ। স্বাধীনতা। হাজার মানুষের ছিন্নমূল উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া। বাংলা ও বাঙালীর জীবনের ঐতিহাসিক ওই মাইল-ফলকগুলি এবং সবকিছুর অভিঘাতে মানুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতে যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটল, মানুষের মনোজগতে যে ব্যাপক ভাঙচুর হয়ে গেল, ওই সময়ের অধিকাংশ কথাশিল্পীর দৃষ্টি ও বিবেচনার বাইরে থেকে গেল তা। সমাজের হাজারো অনাচার, ভ্রষ্টাচার, যাবতীয় অসঙ্গতি, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জুলুম এবং তার ফলে সমাজ ও মানুষের বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গে তিলতিল বদলে যাওয়া, মানুষের জীবনচর্যায় তুমুল ও জটিল ভাঙচুর, পাশাপাশি বামপন্থী সংস্কৃতির অভিঘাতে মানুষের অন্তর্গত প্রতিবাদী সত্তার বিকাশ, এবং এই সবকিছু মিলেমিশে মানুষ, তার আচার-আচরণ, মূল্যবোধ কিংবা মূল্যবোধহীনতা, তার প্রেম, অপ্রেম, যৌনজীবন, তার ব্যক্তিক, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপন্ন কোডগুলি ব্যক্তির মানসলোককে কীভাবে প্রতিদিন ভাঙছিল, গড়ছিল, কীভাবে তৈরী করছিল অন্য এক মানসলোকের রূপরেখা, দুর্ভাগ্যজনকভাবে পঞ্চাশ-ষাট দশকের সেইসব কথাশিল্পীদের কলমে তার প্রতিফলন সামান্যই। আমরা মজা করে বলি, ওই সময়ের প্রায় অধিকাংশ রচনাই ‘ডালিমতলায় তরঙ্গর দেখা পেলুম’ বলে শুরু হত এবং অবশেষে ‘তরঙ্গই আমায় খেল’ বলে শেষ হত। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই ছিল, তবে ওই সময়ের অধিকাংশ তথাকথিত মেজর রচনাগুলিতে ছিল কেবল ‘প্রজাপতি’দের ওড়াওড়ি। বাংলা কথাসাহিত্যের ‘বিবর’টি মূলত ওই সময়ে খোঁড়া হয়েছিল। বাস্তবিক সে ছিল বাংলা কথাসাহিত্যের এক অন্ধকার রাত, আর সেই রাতে ছিল ‘রাতভোর বৃষ্টি। পঞ্চাশ-ষাটে উদিতদের কলমগুলি কিন্তু ওই দশকেই থেমে রইল না, পরবর্তী দশকগুলিতেও তাঁরা কেবলমাত্র সক্রিয়ই রইলেন না, আরও সুপটু হয়ে উঠলেন। ততদিনে সাহিত্যে পুরোদমে চালু হয়ে গেছে বাণিজ্যিক বিপনন-ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার জাদুতে তাঁদের রচনাকেই বাংলা সাহিত্যের প্রধান ধারা বলে চালিয়ে দেওয়া হল। ফলে পাঠক-সাধারণ হয়ে উঠলেন আধুনিক যুগের এক-একজন অশ্বত্থামা। পিঠুলিগোলা জলকেই খাঁটি দুধ ভেবে তাঁরা আকন্ঠ পান করতে লাগলেন।

দুই- অদ্বৈত মল্লবর্মণ, সতীনাথ, তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে গ্রামীণ পটভূমিভিত্তিক যে একজাতের শক্তিশালী কথাসাহিত্য বলিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল, ষাটের দশকে পৌঁছে সেই গ্রামীণ পটভূমির প্রায় পুরোপুরি নির্বাসন ঘটল।

তিন- সাহিত্যের আঙিনায় বাণিজ্য ও বিপননের রমরমা শুরু হল। এবং অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় সেই বিপননের স্রোতে সত্যিকারের সাহিত্যকর্মগুলি ক্রমশ অপাংক্তেয় হয়ে উঠল। এবং ওই প্রেম-কামের নাগরিক রচনাগুলিই বাংলা কথাশিল্পের প্রধান ধারা হয়ে উঠল। বলাই বাহুল্য, এ আমাদের দুর্ভাগ্য।

পাশাপাশি বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ মদতে ওই সময়কালে গড়ে উঠেছিল আর এক জাতের কথাসাহিত্য। ওই সাহিত্যের রচয়িতাগণ কথাসাহিত্যের শরীরটিকে গড়তে চাইলেন পুরোপুরি রাজনৈতিক কাঠামোয়। প্রতিটি গল্পউপন্যাসে মুখ্য বিষয় হল, ধনী-দরিদ্রের লড়াই ও বিপ্লবের জয়গান। সেই সাহিত্যগুলি একেবারে কলকারাখানা ও ক্ষেত-খামারভিত্তিক হয়ে উঠল। সেইসব সাহিত্যের শরীর থেকে শোবার ঘর, রান্নাঘর, উঠোন, খিড়কি-পুকুরগুলো একেবারে উধাও হয়ে গেল।

কথাসাহিত্যের এমনই এক সন্ধিক্ষণে এল সত্তর দশক। বাস্তবিক, সত্তর দশক বাংলা কথাসাহিত্যের ইতিহাসে একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দশক। এই দশকে পৌঁছে বাংলা কথাসাহিত্য মূলত দু’টি পরিবর্তন ঘটল। এক, এই দশকে এমন একঝাঁক কথাশিল্পী এলেন, যাঁরা তাঁদের অব্যবহিত পূর্বসূরিদের সরাসরি অগ্রাহ্য করলেন। আর দুই, তাঁরা তাঁদের রচনায় নিয়ে এলেন এমনকিছু বৈশিষ্ট্য, যা এতকাল বাংলা কথাসাহিত্যে প্রায় অনুপস্থিত ছিল।


প্রশ্নঃ এবার সত্তরের বৈশিষ্টগুলোর কথা বলুন।

ভগীরথ মিশ্র : বলছি, তবে সত্তর দশকের ওই কথাশিল্পীদের কলমে যে গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরগুলি ঘটে গেল, তা ব্যাখ্যা করে বলবার আগে তার প্রেক্ষাপটটিকে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। সত্তরের ওই লেখকদের অধিকাংশই জন্মেছেন মূলত চল্লিশের দশকে। ষাট দশকের শেষার্ধ ও সত্তর দশকের প্রথমার্ধে তাঁরা প্রায় সবাই কলেজ-ইউনিভার্সিটির ছাত্র। তখন গোটা পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে বামপন্থী আন্দোলনের জোয়ার। সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার বিরুদ্ধে ভিয়েতনাম নখেদাঁতে লড়ছে। তখন বাংলার প্রায় সবগুলি কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে চলছে বাম-সংস্কৃতির উথালপাথাল কর্মসূচি। নকশালবাড়ির আন্দোলন সেই কর্মসূচিতে একটি স্বতন্ত্র মাত্রা যোগ করেছে। সত্তরের খুব কম কথাশিল্পীই তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিঘাত থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। মার্কসীয় দর্শন ও বামপন্থী সংস্কৃতি তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেবার ক্ষেত্রেএকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। ফলত, ওই সময়কালে বাংলা কথাশিল্পে এল এতখানি বিষয়-বৈচিত্র, যা বাংলা কথাশিল্পে এতকাল অনুপস্থিত ছিল। কেবলই নরনারীর হাজার কিসিমের প্রেমে আর বাঁধা থাকতে চাইল না বাংলা কথাসাহিত্য। তার বদলে সাহিত্যের বিষয় হিসেবে উঠে এল সমাজের যাবতীয় অনাচার, ভ্রষ্টাচার, যাবতীয় অসঙ্গতি, রাষ্ট্র-এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ পীড়ন, ভূমিব্যবস্থা, পরিবেশ, সাম্প্রদায়িকতা, বিচ্ছিন্নতা, কুসংস্কারের অভিশাপ, গ্রামীণ সামন্ততন্ত্রের বিবর্তন, প্রযুক্তির আক্রমণে ব্যক্তি ও সমাজের প্রতিক্রিয়া, দুষিত শিক্ষাব্যবস্থা, ধর্ষিত কৈশোর, মানুষের ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও আত্মকেন্দ্রিক দ্বীপবাস, বিকৃত আমলাতন্ত্র, রাজনৈতিক ভ্রষ্টাচার ও দুর্বৃত্তায়ন, মূল্যবোধের ব্যাপক অবক্ষয় ...। এল ডাই, ওঝা, ভূতপ্রেত, মন্ত্রতন্ত্র, তাবিজ-কবচ, ঝাড়ফুঁক, বাবা-অবতারদের কথা। এল মহারাষ্ট্রের ভূমিকম্প, গুজরাটের দাঙ্গা, ভেড়াচরোয়াদের জীবনবৃত্তান্ত, মানুষ-বিপননের পাশাপাশি মানুষের কৌম-সংস্কৃতিরও বিপনন। এল সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ, বিপন্ন পরিবেশ, ভূমিসংস্কার, পঞ্চায়েত, পুলিশ ..., আরো অনেকানেক বিচিত্র বিষয়। এককথায় চলমান দেশ-কালের প্রায় সবকিছুই। সাহিত্যে এই বিষয়-বৈচিত্রই বুঝি সত্তরের কথাশিল্পীদের অন্যতম প্রধান অবদান।

দুই- দৃষ্টিভঙ্গি। সাহিত্যের উপাদান হিসেবে এই বিষয়গুলিকেই নির্বাচন করবার ক্ষেত্রে যেমন কাজ করেছে এক স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি, বিষয়গুলিকে বিশ্লেষণ করবার ক্ষেত্রেও সেই দৃষ্টিভঙ্গিটি ক্রিয়াশীল ছিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে ছিল মুক্তচিন্তা ও সদাজাগ্রত সমাজচেতনা। কেবল কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শের ফ্রেমে কাহিনীকে আটকে দেওয়া হয়নি। সেই কারণে লেখকদের সমাজচেতনার সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মতবিরোধও ঘটেছে।

আর, তিন- ওইসব বিষয়কে একটি বিশেষ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণ করবার জন্য রচিত হতে লাগল এক স্বতন্ত্র জাতের গদ্য, যা মাটির সঙ্গে বেশী বেশী সম্পৃক্ত, যা আরও রক্তমাংসময়, সজীব।


প্রশ্নঃ আর কিছু ...

ভগীরথ মিশ্র : আরও একটি ঘটনা ঘটল। ওই সময়কালে বেশকিছু লেখক এলেন, যাঁদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা গ্রামেই। পাশাপাশি এমনকিছু লেখক লেখক এলেন, যাঁরা নগরে জন্মালেও কর্মসূত্রে গ্রামাঞ্চলে গিয়ে গ্রামের প্রেমে আটকা পড়ে গেলেন। ফলত, এদেশের শাশ্বত গ্রামজীবনটি, যাকে ভারতের আত্মা বললেও ভুল বলা হবে না, যা ষাটের মহারথীদের প্রবল চাপে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল, সত্তর ও তার পরবর্তী বাংলা কথাশিল্পীদের কলমে তা আবার মহা গৌরবে ফিরে এল। সত্তর দশকের বাংলা কথাসাহিত্য মূলত এইসব বাঁকই আমার নজরে পড়েছে বেশী।


প্রশ্নঃ আপনার প্রিয় গল্পকার কে?

ভগীরথ মিশ্র : অনেকেই।


প্রশ্নঃ এখনকার লেখকদের সম্পর্কে কিছু বলবেন?

উত্তরঃ একদল সিরিয়াস লেখক হালে পানি পাচ্ছেন না, অপর পক্ষে একদল নেপো অবাঞ্ছিতভাবেই দইগুলি সাবাড় করে চলেছে।


প্রশ্নঃ বাংলা সাহিত্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত অনেকেই। আপনার কী মত?

ভগীরথ মিশ্র : প্রথমেই বলি, গল্প বলো, উপন্যাস বলো- এগুলো কিন্তু আমাদের দেশজ রচনাশৈলী ছিল না কোনোকালেই। এগুলো ইউরোপ থেকে এককালে আমদানি করেছিল মূলত বেনিয়া ইংরেজ। তারপর থেকেই আমরা ইউরোপীয় মডেলেই বাংলা গল্প-উপন্যাস পড়তে, পড়াতে, লিখতে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। এই অবধি ঠিক ছিল। একটি শক্তিশালী শৈলী আমাদের সাহিত্যের আঙিনাকে উজ্জ্বলই করেছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, আমরা চিরকালই ওই বিদেশী মডেলে দেশীয় সাহিত্যগুলি লিখে যাব, পড়ে যাব।


প্রশ্নঃ বিদেশী মডেল বলছেন কেন? ওগুলো তো বাংলা ভাষাতেই লেখা?

ভগীরথ মিশ্র :তা লেখা। তবে জানোই তো, মাটি-আবহাওয়া-জলবায়ু-মানুষ, তাদের খাদ্য-পোষাক-ভাষা-রীতিনীতি-সভ্যতা-সংস্কৃতি-জীবনযাপন-দর্শন-চরিত্র-বৈশিষ্ট, সবকিছুতেই ভারত ও ইউরোপের মধ্যে দুস্তর ফারাক। কাজেই, দুই ভূখন্ডের সাহিত্যের মধ্যে সেই পার্থক্যগুলির প্রতিফলন অবশ্যই ঘটা উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটছে না। বরং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, স্বাধীনতার এতকাল পরেও আমরা ইউরোপীয় সাহিত্যের বাংলা সংস্করণই লিখে চলেছি। এই বিষয়টি নিয়ে আমার অন্যত্র বিস্তৃত আলোচনা রয়েছে। এখানে সেসব বিতাং বলবার অবকাশ নেই। কেবল এটুকুই বলতে পারি, আমাদের এমন বিশাল, ঐতিহ্যমণ্ডিত ও বৈচিত্রময় দেশ। সেই দেশের মাটি-মানুষ-প্রকৃতিই হওয়া উচিত সব সৃষ্টির ভিত্তি।


প্রশ্নঃ কিন্তু এদেশের পটভূমিতেও তো কত উপন্যাসই লেখা হয়েছে ...

ভগীরথ মিশ্র :তা হয়েছে। তবে কেবল ধুতি-পাঞ্জাবি পরালেই কোনও সাহেব বাঙালী হয়ে যায় না। রেস্তোরার বাঙালী নাম, পদগুলির নামও বাঙালী, কিন্তু রন্ধনশৈলীটা পুরোপুরি ইউরোপীয়। সেই পদগুলো কি স্বাদে গন্ধে বাঙালী হবে? বাইরের থেকে পার্টস এনে, ওই পার্টস জুড়ে মোটরগাড়ি বানিয়ে মেড-ইন-ইন্ডিয়া ছাপ দিয়ে দিলেই ওটা ভারতীয় গাড়ি হয়ে যাবে? তেমনই, এদেশীয় কিছু জায়গার নাম, কিছু চরিত্রের নাম, আর তাদের মুখে কিছু দেশীয় কথা দিয়ে দিলেই কোনও রচনা দেশজ হয়ে ওঠে না। দেখতে হবে, ওই রচনাটি বহিরঙ্গে ও অন্তরেও দেশজ হয়ে উঠল কিনা! সেই রচনার আত্মাটি দেশজ হল কিনা!


প্রশ্নঃ তেমন লেখা কি একেবারেই হচ্ছে না?

ভগীরথ মিশ্র : হচ্ছে, কিছু কিছু হচ্ছে। দেশজ সাহিত্য সৃষ্টির কাজটি বেশ কিছুদিন শুরু হয়েছে। এবং সেটাই আশার কথা। অদ্বৈত মল্লবর্মণ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর, মানিক, সতীনাথরা তার গোড়াপত্তন করে গিয়েছেন। মহাশ্বেতাও করেছেন। আধুনিক কালেও তেমন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। অন্য ভারতীয় ভাষায় তার প্রভাব পড়ছে। প্রসঙ্গত বলা যায় ওড়িয়া কথাশিল্পী গোপীনাথ মহান্তির ‘দাদাবুড়ি’ উপন্যাসটির কথা। কিন্তু এই সাহিত্যগুলি হালে পানি পাচ্ছে কই?


প্রশ্নঃ কেন পাচ্ছে না বলে আপনার মনে হয়?

ভগীরথ মিশ্র :পাচ্ছে না এই কারণে যে, এদেশের সমালোচকদের মনে এগুলো ধরছে না।


প্রশ্নঃ কেন ধরছে না?

ভগীরথ মিশ্র : ধরছে না, কারণ আমরা ইংরেজী কায়দায় হাসি, ফরাসি কায়দায় কাশি, আর ঠ্যাং ফাঁক করে সিগারেট খেতে বড়ই ভালবাসি। দ্যাখো, সর্বত্রই ঔপনিবেশিক প্রভুরা বিজিত দেশে চারটি কাজ করে যায়। এক- ঔপনিবেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে। দুই- ওই জায়গায় নিজ ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করে। তিন- ঔপনিবেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে খাটো প্রতিপন্ন করে। দেশজ বুদ্ধিজীবিদের তেমনটাই ভাবাতে তৎপর হয়। চার- নিজেদের অবয়বে একটি বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠী গড়ে দিয়ে যায়। এর চেয়ে ন্যক্কারজনক প্রতিফলন ঘটেছে ল্যাটিন আমেরিকায়। সেখানে ভাষা ধ্বংস। সংস্কৃতি ধ্বংস। জনগোষ্ঠী ধ্বংস। বর্তমানে সেখানে থাকে দখলদারী স্প্যানিশ / পর্তুগীজদের বংশধর, আদি বাসিন্দা ও স্প্যানিশদের শংকর, সোনাবহনকারী নিগ্রোদের বংশধর, আর আরব মুলুক থেকে সোনার লোভে যাওয়াদের বংশধর। ভারতবর্ষে অবশ্য ততটা পারেনি। ভারতীয়দের ভাষা, সাবেক সাহিত্য ও সংস্কৃতি মোটামুটি অক্ষত রয়েছে। তবে, একটি বুদ্ধিজীবি গোষ্ঠীকে খুব সফলভাবে তৈরী করে যেতে পেরেছে বেনিয়া ইংরেজ। তাদের আনুগত্য এখনও অবধি পূর্বতন প্রভুদের প্রতিই অধিক। তারা দেশজ সাহিত্য, সংস্কৃতির সবকিছুকেই এখনও অবধি খাটো নজরেই দেখতে অভ্যস্ত। আর, একজন বিদগ্ধ সমালোচক তো বলেইছিলেন, বিভূতিভূষণ মানে- কাশফুল ফলোড বাই ঘেঁটুফুল, এগেইন ফলোড বাই কাশফুল। আর একজন বাঙালী বিদগ্ধ মানুষ তো তারাশঙ্করকে অশিক্ষিত বলে কটাক্ষও করেছেন। সেই কারণেই, খেয়াল করলে বুঝতে পারবে, দেশজ সাহিত্যের মূল্যায়ণ করবার উপযোগী সমালোচনার কোনও ভারতীয় মডেলই আজ অবধি তৈরী হয়নি। ধ্রুপদী সংগীতের মূল্যায়ণের নিজস্ব মডেল রয়েছে। কিন্তু কথাসাহিত্যের তেমন কোনও মডেল আজও তৈরী হল না। তার ফলে হ্যাম-বার্গার-পিজা খাওয়া জিহ্বা শুক্তো-পিঠেপুলি-পরমান্নের স্বাদ নিতে পারছে না। তাই আমার মতে, দেশজ সাহিত্য সৃষ্টির পাশাপাশি দেশজ সাহিত্যের সমালোচনার ইউরোপীয় মডেলটির বদলে একটি দেশজ মডেল তৈরী হওয়া উচিত।


প্রশ্নঃ তেমন মডেল তৈরী হচ্ছে না কেন?

ভগীরথ মিশ্র : হচ্ছে না, কারণ- বিদেশী সবকিছুর প্রতি দাসসুলভ আনুগত্যই তার প্রধান বাধা।


প্রশ্নঃ তাহলে এই সমস্যার সমাধান কী?

ভগীরথ মিশ্র :সমাধান একটাই। এসো, আমরা সবাই মিলে আমাদের মৌলিক স্বাধীন সাহিত্য রচনা করি। দ্যাখো- স্রেফ অনুকরণ করে কোনও শিল্পই স্থায়ী মর্যাদার আসন পেতে পারে না। এতদ্বারা আমরা বাংলা কিংবা ভারতীয় ভাষায় আরও কিছু ইউরোপীয় সাহিত্য রচনা করতে পারি মাত্র। সারা পৃথিবী জুড়ে আজ শুরু হয়েছে নিজস্ব স্বকীয় সাহিত্য রচনার জন্য লড়াই। আফ্রিকায় তো এন-গুগি, ওয়া থিয়েঙ্গোদের (মাতৃভাষা- গিকুয়ু) মতো সাহিত্যিকদের উদ্যোগে সেই আন্দোলন অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। এন-গুগি কেনিয়ার লেখক। মাতৃভাষায় দেশজ সাহিত্য রচনার জন্য জেলে গিয়েছিলেন। জেলেই রবীন্দ্রনাথের রচনার সংস্পর্শে আসেন। ‘তুমি যদি অনেক ভাষা জানো তো খুবই ভালো। কিন্তু তুমি যদি নিজের মাতৃভাষাটাই না জানো, তবে তুমি কোনও ভাষাই জানো না।’ রবীন্দ্রনাথের ওই কথাগুলো তাঁকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, তিনি আর কিছুতেই পিছিয়ে আসতে পারেননি। পরিশেষে বলি, যত পিছিয়ে থাকি না কেন, এই উপায়ে আমরা একদিন বিশ্বের দরবারে একটি মর্যাদার আসন পাব, নচেৎ নয়। স্পষ্ট করেই বলি, যতদিন আমরা বিদেশী সাহিত্যের ভারতীয় সংস্করণ লিখতে থাকব, ততদিন এদেশীয় সাহিত্য বিশ্বের দরবারে না-ঘরকা না-ঘাটকা হয়ে থাকবে। তবে ওই সঙ্গে দেশজ সাহিত্য সমালোচনার মডেলটাও অবশ্যই বদলাতে হবে।


প্রশ্নঃ আপনার লেখায় যৌনতা সেভাবে নেই। এ ব্যাপারে অনীহা কেন?

ভগীরথ মিশ্র : সে কী! যৌনতা নেই মানে? যৌনতা ছাড়া সাহিত্য রচনা সম্ভব?


প্রশ্নঃ মানে?

ভগীরথ মিশ্র : মানে এই যে, আমি আমার এত এত গল্প-উপন্যাসে এত এত চরিত্র নির্মাণ করলাম, যৌনতাকে বাদ দিয়ে কোনও চরিত্রকে গড়ে তোলা সম্ভব? দ্যাখো- আমার মতে, কেবল মরা মানুষের মধ্যেই সম্ভবত যৌনতা থাকে না। কিন্তু জীবন্ত মানুষ তো যৌনতা ছাড়া এক পাও চলতে পারবে না।


প্রশ্নঃ আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারলাম না। যদি একটু বিতাং বলেন?

ভগীরথ মিশ্র : (মুচকি হেসে) তোমরা কী জানতে চাইছো, বুঝতে পেরেছি। পনেরো আনা মানুষ যৌনতা বলতে যা বোঝে, তোমরাও সেটার কথা জানতে চাইছো। নারি-পুরুষের সারাক্ষণ ডগোমগো প্রেম। সেই প্রেম যত না মনে, তার শতগুণ শরীরের খাঁজেভাঁজে। তাই তো? তাহলে খুলেই বলি ব্যাপারটা। গল্পে উপন্যাসে চরিত্রগুলোকে, বিশেষ করে নারী চরিত্রগুলোকে যখন-তখন নগ্ন করে দিতে হবে। তাদের কামোদ্দীপক প্রত্যঙ্গগুলিকে অবলীলায় উদোম করে দেখিয়ে দিতে হবে। কথায় কথায় ওই সব প্রত্যঙ্গের এমন রগরগে বর্ণনা দিতে হবে, এবং চুম্বন-স্পর্শ-সংস্পর্শ-মধুর বাক্যালাপ জাতীয় বিষয়গুলিকে ভাষার মাধ্যমে এমনই জীবন্ত করে তুলতে হবে, যাতে করে ওগুলো পড়তে পড়তে পাঠকেরও সমগোত্রীয় প্রত্যঙ্গগুলি নিমেষে উত্তেজিত হয়ে ওঠে। যাতে করে তারাও সমতুল কারোর প্রতি ওই জাতের আচরণ করবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। এবং তৎসহ এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নারী-পুরুষ এখনও অবধি যে-সমস্ত যৌন ক্রিয়াকলাপগুলি শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে করে, নিদেন লোকচক্ষুর অন্তরালে গিয়ে করেন-টরেন, সেগুলোই আমাকে সাহিত্যের পাতায় রগরগে বর্ণনাসহ খুল্লামখুল্লা লিখে ফেলতে বলছো, এই তো? তাহলেই খুব যৌনতা বোঝানো হল! আর তাতে করে সাহিত্যের মান খুব বেড়ে গেল?


প্রশ্নঃ এগুলো কি খারাপ?

ভগীরথ মিশ্র : কে বলেছে খারাপ? খারাপ তো নয়ই, বরং অতি প্রয়োজনীয়।


প্রশ্নঃ যৌনজীবন ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায়?

ভগীরথ মিশ্র : কেবল মানুষের কেন, যৌনজীবন ছাড়া কোনও প্রাণীর অস্তিত্বই টিকে থাকতে পারে না। অন্তত বংশবৃদ্ধির প্রয়োজনে তো যৌনজীবন চাইই-চাই। মানুষের যৌনজীবন থেমে গেলে সভ্যতাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। পশুপ্রাণীদের যৌনজীবন থেমে গেলে ইকোলজিক্যাল ব্যালান্সটাই নষ্ট হয়ে যাবে। সেটাও সভ্যতার বিলুপ্তির অশনি-সংকেত। যাগ্‌গে, আমরা অন্যদিকে চলে যাচ্ছি। আমি যেটা বলতে চাইছি, সেটা হল, নারী-পুরুষের মধ্যেকার যৌন ক্রিয়াকলাপগুলো অবশ্যই যৌনতার পর্যায়ে পড়ে। সেটাও কিছু কম দরকারী নয়। কিন্তু কেবল লিঙ্গভিত্তিক ক্রিয়া-বিক্রিয়াতেই যৌনতা বস্তুটি আটকে নেই। আরও ঢের বড় আঙিনায় তার বিচরণ ও প্রাসঙ্গিকতা। মানবজীবনের যৌনতা আরও ঢের বড় মাপের ভূমিকা পালন করে। সেই ক্ষেত্রগুলিতে যৌনতার ভূমিকা প্রায় অভিভাবকের মতো।


প্রশ্নঃ যেমন!

ভগীরথ মিশ্র : (মুচকি হেসে) ওই নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই বিষয়টি নিয়ে একটি নীতিদীর্ঘ বক্তৃতা দিতে হবে।


প্রশ্নঃ দিন-

ভগীরথ মিশ্র : ঠিক আছে। তোমাদের ধৈর্যের ওপর পীড়ন চালিয়ে সেটাই তবে শুরু করি। আগেই বলেছি, আমরা সাধারণভাবে যৌনতা বলতে যা বুঝি, যৌনতার পরিধি তার চেয়ে অনেক বিস্তৃত। এটা আমার কথা নয়, বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনোবিজ্ঞানিক ফ্রয়েড তো বটেই, দুনিয়ার সব মনোবিজ্ঞানিকের মতও তাই। অর্থাৎ, সাধারণ অর্থে আমরা যৌনতা বলতে যা বুঝি, সেটাই যৌনতা নয়। এবং কেবল যৌনাঙ্গগুলিই মানুষের একমাত্র যৌনস্থল নয়। অর্থাৎ কেবল যৌন উপভোগের মৌলিক স্থানগুলোতেই যৌনতা আটকে থাকে না। মানুষের (হয়ত-বা পশুদেরও) সচেতন কল্পনায়, এমনকী নিরজ্ঞান অবচেতনেও যৌনতার প্রবল বসবাস। আবার, কেবল বিপরীত লিঙ্গেই যৌনতা নিবদ্ধ থাকে না। আমার নিজের শরীরজ যৌনতার প্রতি আমি নিজেই আকৃষ্ট হতে পারি। আবার, মানুষের মধ্যে কিংবা জীবন্ত প্রাণীর মধ্যে যৌনতা তো থাকেই, একজন যৌনতাপ্রাপ্ত মানুষ ‘অনুষঙ্গ পদ্ধতি’তে সাধারণ অযৌন বস্তুটির মধ্যেও যৌনতা আরোপ করতে পারে। তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল?


প্রশ্নঃ কী দাঁড়াল?

ভগীরথ মিশ্র : এটাই দাঁড়াল যে, কেবল প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যৌন সঙ্গম বা সঙ্গমের ইচ্ছাই যৌনতা নয়। যৌনতা হল, মানুষের মনোজগতের এক অতিশয় রহস্যময় সত্ত্বা। ওই রহস্যময় সত্তাটি কেবলমাত্র যৌন-সঙ্গম করেই পূর্ণতা পায় না। আরও ব্যপ্ত ও বিস্তৃত ক্ষেত্রে তার বিচরণ ও ক্রিয়াশীলতা। ওই সত্ত্বা কেবল মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনের সহায়ক নয়, মানুষের প্রধান চালিকাশক্তিও বটে। মানুষ যে শিল্প, কলা, বিজ্ঞান, সংগীত, ইত্যাদির দিকেও মনোযোগী হয়ে ওঠে, আবার প্রবল উদ্যোমে যুদ্ধজয়ে বেরিয়ে পড়ে, এমনকী, আত্মঘাতী কিংবা পরঘাতীও হয়ে ওঠে- এর সবকিছুই হরেদরে তার যৌনতারই প্রকাশ। আরও একটি কথা, যৌনতার সেই বৃহত্তর সংজ্ঞায়, তথাকথিত যৌবনের সঙ্গেও যৌনতার বড় একটা সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ যৌনতাপ্রাপ্তির জন্য যৌবনপ্রাপ্তি একটি আবশ্যকীয় শর্ত নয়। একটি শিশুর মধ্যেও যৌনতা পুরো মাত্রায় থাকতে পারে, এবং থাকেও। তোমরা ভাবতে পারো- কত রকমে মানুষের যৌনতা প্রকাশ পেতে পারে! এমনকী, একটি শিশু যখন স্তন্য পান করে কিংবা মলত্যাগ করে, ওগুলোর মধ্যে দিয়েও তাদের যৌনতার প্রকাশ ঘটে। শিশু ঠোঁট দিয়ে এবং পায়ু দিয়ে সেই যৌনতাকে উপভোগ করে। (একটু থেমে) যৌনতার একটি উপাচারের নাম ‘কাম’। পশ্চিমের মনোবৈজ্ঞানিকরা বারংবার বিভিন্ন অনুষঙ্গে কাম বিষয়টিকে বিশ্লেষণ করেছেন। কেবল ওঁরাই নন, আমাদের শাস্ত্র রচয়িতারাও যখন ষড়রিপু বলতে প্রথমেই কাম রিপুটির উল্লেখ করেন, তাঁরাও কিন্তু কাম বলতে বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে সঙ্গমেচ্ছার মধ্যেই কামকে সীমাবদ্ধ রাখেন না। তাঁদের ব্যাখ্যায় কাম হল কামনা, বাসনা, আকাঙ্ক্ষা, লালসা- যা চরিতার্থ করতে মানুষ জা-কিছু করতে পারে। শুনলে অবাক হবে। কেবল যৌবনপ্রাপ্তদেরই নয়, শিশুদের শরীরেও তার প্রকোপ কম নয়। এমনকী, জন্মের সময়ই সেই কাম শিশুর সর্বশরীরে ছড়িয়ে থাকে।

ফ্রয়েড কামকে মানুষের মনোজগতের নিরজ্ঞান অংশের বাসিন্দা ‘লিবিডো’র সমর্থক বলে ভেবেছেন। আবার, ফ্রয়েড যাকে লিবিডো ভেবেছেন, ইয়ং সেই লিবিডোকে সকল প্রকার প্রচেষ্টার মূল চালিকাশক্তি ভেবেছেন। দার্শনিক বার্গস্‌ একেই বলেছেন প্রাণশক্তিবাদ। ম্যাকডুগাল একেই বলেছেন সজীবতাবাদ। এতদ্বারা যা বলতে চাইছি, তা হল, এঁদের সবাই একটা বিষয়ে একমত। সেটা হল, কাম বা যৌনতা বলতে কেবল যৌন ক্ষুধাই বোঝায় না। অর্থাৎ যৌনতা আর যৌন আকাঙ্ক্ষা মোটেই এক কথা নয়। আমরা যাকে যৌন আকাঙ্ক্ষা বলি, তা কাম কিংবা যৌনতার একটা অংশমাত্র। কেবল যৌনসম্ভোগই নয়, আত্মরক্ষার প্রবৃত্তি, মানবসমাজের প্রতি কর্তব্য ও ভালোবাসা, ব্যক্তিগত বা সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়বার ইচ্ছা, শিল্প, কলা, সাহিত্য, সংগীত ইত্যাদি, এমনকী প্রকৃতি ও প্রকৃতিতে বাস করা জড় পদার্থের প্রতি আকর্ষণ, সৌন্দর্যবোধ, সুন্দরের আরাধনা- সবই মানুষের যৌনতারই নানাবিধ প্রকাশ। কাজেই বুঝতে পারছ, যৌনতা মানুষের (হয়ত-বা সমস্ত প্রাণীরও) একটি মহান ও রহস্যময় সত্ত্বা। সেই অর্থে যৌনতা মানুষের একটা বড়সড় শক্তি, একটা মহার্ঘ সম্পদ। ওই রহস্যময় শক্তিটি দিয়ে মানুষ বিশ্বজয়ও করে, শিল্পকলা করে, আবার খুন করতেও দৌড়য়, আত্মঘাতীও হয়। এবং এর প্রধান বাসস্থান হল মানুষের মনের গোপন কন্দরে। অনেক ভাবেই তার প্রকাশ ঘটে। এতক্ষণ তার কিছু কিছু বললাম, আরও অনেকগুলিই অব্যক্ত থেকে গেল। কিন্তু বাঙালী লেখক ও পাঠকের একটি অংশ যৌনতাকে অতি সঙ্কীর্ণ একটি গণ্ডীর মধ্যেই ভাবতে ভালোবাসেন। তাঁদের সংজ্ঞায় যৌনতা হল নরনারীর লিঙ্গকেন্দ্রিক মিথুন ও আনুষঙ্গিক বিষয়গুলি। ওটাকেই যদি যৌনতা ভেবে থাকো তো বলি, কেবল মানুষই নয়, দুনিয়ার সমস্ত পশুপ্রাণীই ওই কম্মোটি করে থাকে। এবং তারা তা প্রকাশ্যেই করে। তো, যে কম্মোটি একজোড়া সারমেয় প্রকাশ্য রাস্তায় সমাধা করে নির্দ্বিধায়, সেটাকেই যৌনতার একমাত্র প্রকাশ বলতে চাও? এবং সেটাকেই সোচ্চার করতে বলছো সাহিত্যে? তাতে করে সাহিত্য আরও মহিমা পেয়ে যাবে? তাহলে তো আরও যে যে প্রাকৃতিক কাজগুলি আমরা নিত্যদিন সংগোপনে টয়লেটে করে থাকি, সেগুলিও সাহিত্যে খুল্লামখুল্লা দেখাতে হয়। না ভাই- আমি কেবল ওই বস্তুটিকেই যৌনতা বলেই মনেই করি না। কারণ, ওটা কেবল মানুষের নয়, সমস্ত প্রাণীর একটি জৈবিক প্রবৃত্তি। (একটু থেমে) তাও ধরো, যদি ওটাকেই যৌনতা বলে বিশ্বাসও করতাম, তাও অন্য গুটিকয় টয়লেটীয় কম্মের মতো ওটাকে জনচক্ষুর আড়ালেই রাখতে চাইতাম। ওটাকে সারমেয়তুল্য প্রকাশ্য করে সাহসীর তকমা পেতে চাইতাম না। কারণ, একটা সারমেয় নির্দ্বিধায় যা করতে পারে, বা করে থাকে, একজন মানুষ হয়ে আমি তা কেন চাইব বল। তাহলে তো আমি যে পায়খানা করছি, সে ছবিও নিখুঁত করে আঁকতে হয়। এমনকী পশ্চাদ্দেশ থেকে দোদুল্যমান বর্জ্যটির আকার, রঙ, ঘনত্ব ইত্যাদির অনুপুঙ্খও ... বাস্তবতার একটি দিক। এটা গেল বিষয়টির একটা দিক।


প্রশ্নঃ অন্য দিকটি কী তাহলে?

ভগীরথ মিশ্র : অন্যদিকটি হল, আমরা সাহিত্য রচনা করি কেন? দ্যাখো এটা তো মানবে যে, আমরাও এককালে পশুই ছিলাম। পশুবৃত্তি থেকে বিবর্তনের পথ ধরে আমরা ক্রমশ মানুষ হয়ে উঠছি। লক্ষ কর, আমি কিন্তু ‘মানুষ হয়ে উঠেছি’ বলিনি। বলছি, ‘মানুষ হয়ে উঠছি’। অর্থাৎ পশুত্বের ভিতের ওপর চলেছে আমাদের মনুষ্যত্বের সাধনা। এখনও চলছে। তাও আমরা এতদিনেও সমস্ত পাশবিক প্রবৃত্তিগুলোকে ত্যাগ করতে পারিনি। বলা ভালো, পশুত্ব থেকে আমরা যে যতটা মনুষ্যত্বের পথে হাঁটতে পেরেছি, ততটাই মানুষ হয়েছি, বাকিটা পশুই থেকে গিয়েছি। আমার মতে শিল্প, কলা, সাহিত্য, এসবের উদ্দেশ্যই হল, মানুষকে আরও বেশী বেশী মনুষ্যত্বের পথে এগিয়ে দেওয়া। তাদের ভাবনার জগৎটিকে আরও মার্জিত, সংস্কৃত করে তোলা। এক কথায় আয়নাটাকে আরও ঝকঝকে করে তোলা। যা যা কিনা পশুদের প্রধান আরাধ্য, মানুষের মধ্যেও সেই প্রবৃত্তিগুলোকে আরও চাগিয়ে তোলাটা, মানুষকে আরও পশুদের দিকে ঠেলে দেওয়াটা কোনও শিল্পেরই উদ্দেশ্য হতে পারে না। এখন, আমি যদি আমার সাহিত্যে যৌনতার দোহাই দিয়ে এমন একটা ছবি তৈরী করি, যা দেখে মানুষের পশুত্ব আরও চাগিয়ে ওঠে, যদি আমার রচিত সাহিত্য পড়ে মানুষের যৌন-প্রত্যঙ্গগুলি আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠে, তারা যদি যেনতেন প্রকারেণ নারীদেহ ভোগ করবার জন্য পাগল হয়ে ওঠে, কিংবা যদি তাদের নখদাঁত এবং মনের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত ছোরাগুলি ঝলসে ওঠে, তাহলে তো সাহিত্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে।


প্রশ্নঃ কিন্তু আপনি যেসব যৌন ক্রিয়াকর্মকে সাহিত্য পরিত্যাজ্য বলে ভাবছেন, পশ্চিমের দেশগুলোতে সেসব তো খুল্লামখুল্লা চলছেই। ওইসব দেশের সাহিত্যেও ওইসবের ছবি খুল্লামখুল্লা আঁকা চলছে। তাহলে আমাদের সাহিত্যেও সেসব আঁকলে ক্ষতি কী?

ভগীরথ মিশ্র : কেউ কেউ আঁকছেন তো। এঁকে বেশ বাহবাও পাচ্ছেন। লিঙ্গাশ্রয়ী কাম যেহেতু মানুষের আদি-প্রবৃত্তিগুলির একটি, পাঠকের একটা বড় অংশ তো সেসব গোগ্রাসে গিলছেও।


প্রশ্নঃ তবে?

ভগীরথ মিশ্র : সেটাই তো বলেছি দেশজ সাহিত্য সৃষ্টির প্রসঙ্গে। সেই জন্যেই তো বলেছি, এদেশের অনেকেই এখনও অবধি পশ্চিমের সাহিত্যের ভারতীয় সংস্করণগুলি লিখে চলেছেন। আবারও বলছি, ওদেশের জীবনচর্যায় যা ডালভাত, এদেশের মানুষের ধর্মভাবনায়, যৌনভাবনায়, সংস্কারে, আচরণে, সেগুলো এখনও অবধি অন্তরালে, একান্তে করণীয় হয়ে রয়েছে।


প্রশ্নঃ কিন্তু এদেশের আধুনিক অংশটি তো এখন পোশাকে এবং যৌন আচরণে অনেক খোলামেলা!

ভগীরথ মিশ্র : আধুনিক অংশটি মানে? কারা তারা? জনগোষ্ঠীর কত অংশ? সমাজের কোন স্তরের বাসিন্দা তারা? খোলাখুলি বলছি, তারা মূল ভারতীয় সমাজের উপরিস্তরের মুষ্টিমেয় কিছু বিত্তবান নাগরিক মানুষ। সম্প্রতি পশ্চিমী জীবনযাপনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। কিন্তু আমার মতে, তারা আমাদের দেশজ জীবনচর্যার কেউ নয়। ওদের বাইরে পড়ে রয়েছে বিশাল এই দেশটা। বস্তুতপক্ষে, সেটাই আসল ভারতবর্ষ। গ্রামীণ, গ্রাম্য, কৃষিপ্রধান, সামন্ততান্ত্রিক, নিরক্ষর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, ধর্মীয় চেতনাশ্রয়ী...। সেই ভারতবর্ষটা ভালো কি মন্দ, কাম্য কি অকাম্য, এমন প্রশ্ন অবান্তর। রূঢ় বাস্তবটা হল, এই একবিংশ শতাব্দীতেও হরেদরে সেটাই আসল ভারতবর্ষ। যারা পশ্চিমের আদলে খাটো পোশাক পরে যত্রতত্র প্রকাশ্যে লদকা-লদকি করছে, একে অপরকে জড়িয়ে চুমু খাচ্ছে নির্দ্বিধায়, এদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের উপস্থিতি হিমশৈলের উপরিভাগের চেয়েও ঢের কম। তারা আমাদের মূল সমাজ জীবনের একটা সুপার-স্ট্রাকচার বলতে পারো। দেশজ সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে ওদের মডেল ভেবে নেবার কোনও কারণ নেই। যদিও দূরদর্শন, চলচিত্র ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের এবংবিধ ক্রিয়াকলাপ ছোঁয়াচে রোগের মতো সমাজের অন্য স্তরগুলিতেও সংক্রামিত হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। (একটু থেমে) আমি কিন্তু ওই ধরণের আচরণের ভালোমন্দ নিয়ে কিছু বলছি না। বলছি, আমাদের দেশজ জীবনযাপনের সামগ্রিক ছবির সঙ্গে ওগুলো একেবারেই মেলে না। বরং ওই ধরণের আচরণকে এদেশের প্রেক্ষাপটে খুবই অবাঞ্ছিত মনে হয়। খেয়াল করে দ্যাখো, নরনারীর যৌন ক্রিয়া সংক্রান্ত প্রসঙ্গটি খোলাখুলি উত্থাপন করতে গিয়ে তোমরাও একটু আগে বয়োঃজেষ্ঠ্যজ্ঞানে সঙ্কোচবোধ করছিলে। এদেশের চিরচরিত সংস্কারই তোমাকে ওই রকম তোতলাতে বাধ্য করেছিল। এখন অবধি এটাই আসল ভারতবর্ষের আসল চিত্র। বাকিটা পশ্চিম থেকে আমদানি করা এবং পুরোপুরি আরোপিত।


প্রশ্নঃ উদোম শরীরে আপনার এত আপত্তি কেন?

ভগীরথ মিশ্র : (হেসে) কেবল আমারই নয়, মনে হয়, তোমাদেরও মনে মনে আপত্তি রয়েছে। নইলে প্রসঙ্গটা তোলার সময় অমন করে তোতলাতে না। তাছাড়া, কেবল উদোম শরীর বলেই কেন আপত্তি থাকবে আমার? এদেশে কোটি কোটি মহিলার শরীর তো উপযুক্ত বস্ত্রের অভাবে প্রায় অনাবৃত থাকে। আমি কি আপত্তি করেছি? কিন্তু যে খাটো পোশাকের কথা বললাম, ওগুলো তো মানুষের মনে যৌন উন্মাদনা বাড়িয়ে দেবার জন্যই পরা হয়। অথচ দ্যাখো, প্রায় অনাবৃতা দরিদ্র রমণীটির শরীর দেখে মানুষের মনে সেই উন্মাদনা জাগে না। (একটু থেমে) তো সে ওরা করতেই পারে। খাটো পোশাক না পরেও একেবারে উদোম হয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে যত্রতত্র। তাতে করে মানুষজনের যৌন-ইন্দ্রিয়গুলি উত্তেজিত হয়ে উঠতেই পারে। তারা আরও যৌনাশ্রয়ী জীবনের দিকে দৌড় শুরু করতে পারে। কিন্তু আমি ওই নিয়ে সাহিত্য রচনা করব কেন? কিছু মানুষের যে আচরণ দেশের পনেরো আনা মানুষের আচরণের সঙ্গে মেলে না, কিছু মানুষের যে-আচরণ মানুষের অধোঃগতিকে ত্বরান্বিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি, সেই সাহিত্য রচনা করে আমি মানুষের এবং সমাজের কোন উপকারটা করব? এতদ্বারা আয়নাটি তো আরও মলিন হয়ে যাবে।


প্রশ্নঃ তাহলে কি আপনি বলতে চান, যৌনতাহীন সাহিত্যই সৎসাহিত্য?

ভগীরথ মিশ্র : তা কেন? মানুষ থাকলে অন্তর্গত যৌনতাও থাকবেই। আমার সাহিত্যেও তা পুরোপুরি রয়েছে।


প্রশ্নঃ মানে?

ভগীরথ মিশ্র : মানে, আমি যৌনতা বলতে যা বুঝি, তার প্রতিফলন আমার গল্প-উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে। খুঁজে নিতে পারলে নাও, নইলে আঙুল চোষ।


নীহারুল-বিশ্বজিৎঃ আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ভগীরথদা!

ভগীরথ মিশ্র : আমার এতক্ষণ বকবকানি শোনার জন্য তোমাদেরকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ! ভালো থেকো

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন