শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৫

সমরেশ বসুকে নিয়ে নিজস্ব ঘোর ও 'চিরসখা'

প্রশান্ত মৃধা

সমরেশ বসুকে নিয়ে আমার এক প্রকার নিজস্ব ঘোর খুব কাজ করে। বিভিন্ন কারণে। কারণগুলো সব সময় যথাযথ অনুধাবন করাও যায় না। তবে যে কয়েকটি কারণ বিভিন্ন প্রসঙ্গে মিলিয়ে ভেবে নিতে পারি সেগুলো :

ক. জীবনের তলানিতে পৌঁছে যাওয়া থেকে অবিশ্বাস্য উত্থান। বিক্রমপুরের বাঙাল। জন্ম ১১ ডিসেম্বর ১৯২৪। ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা। '৪৬ সালের দাঙ্গার পটভূমিতে এ শহরের দুটি ভিন্ন সম্প্রদায়ের চরিত্র নিয়ে লিখেছেন 'আদাব'।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বলতে গেলে নেই। কৈশোর কেটেছে পশ্চিমবঙ্গের নৈহাটিতে। একেবারে তো শূন্য থেকে শুরু। বস্তিতে বাস। খুব ছোট চাকরি, অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে নক্শাকার। মাথায় ঝাঁকা নিয়ে সবজি বিক্রি। উত্তীর্ণ-কৈশোরেই চারটি সন্তানের জনক (সর্বকনিষ্ঠ সন্তান কথাসাহিত্যিক ও ডাক্তার নবকুমার বসু, জন্ম : ১০ ডিসেম্বর ১৯৪৯)। এর ভেতরে ভরসার জায়গা, প্রেমময়ী স্ত্রী! এ অবস্থা থেকে তিনি খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছেন। কলকাতায় মৃত্যু, ১২ মার্চ ১৯৮৮।

খ. একজন লেখকের প্রচুর লেখা দেখলে মনে হয়, সমরেশ বসুও কত লিখেছেন, সব প্রতিকূলতার ভেতর জ্বেলে প্রদীপ!

গ. সব রচনায়ই এক প্রকার আত্ম-অনুসন্ধান। কিন্তু লিখেছেন বিবিধ বিষয় নিয়ে। একই বিষয়ে প্রায় ফিরে আসেনি কখনো। বিচিত্র চরিত্রের সমাবেশ তাঁর রচনায়।

ঘ. বিদ্বেষ জানতেন না। কারো সঙ্গে কোনো অহেতুক তর্কে জড়াননি। সাহিত্যিকদের ভেতরে অজাতশত্রু। কখনো কোনো বিষয় নিয়ে কারো সঙ্গে মনোমালিন্য হয়নি। বিশ্বাসে অটল ছিলেন।


নবকুমার বসুর লেখা ১১০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস 'চিরসখা' সমরেশ বসুকে নিয়েই। লেখক বিভাস চৌধুরী, সমরেশ বসু; অপর্ণা, বিভাসের স্ত্রী; অর্থাৎ গৌরী বসু--নবকুমারের মা। বড় অংশজুড়ে উপন্যাসের মূল চরিত্র আসলে অপর্ণাই। সুমথনাথ বসু থেকে সমরেশ বসু। গাইড অ্যান্ড ফিলোসফার সত্য মাস্টার। জেলখাটা। তখন বিধান রায়ের সঙ্গে গৌরী বসুর দেখা করা ও মাসোহারাপ্রাপ্তি। জেল থেকে ফিরে এসে সিদ্ধান্ত, লেখাই হবে একমাত্র কাজ, অন্যথায় মরে বেঁচে থাকা। প্রথমে অপরিসীম দারিদ্র্য। কোনো প্রকাশকের বঞ্ছনা। ধীরে ধীরে পায়ের নিচে মাটি। অনেক কাহিনী চলচ্চিত্রায়িত। অফিস করার মতো ৯টা-৫টা রুটিন করে লেখা। 'চিরসখা'য় কিছুই লুকাননি নবকুমার। এমনকি নবকুমারের ছোট মাসি টুনিকে (ধরিত্রী বসু) সমরেশ বসু নৈহাটি থেকে কলকাতায় নিয়ে যাওয়ার সময় স্ত্রী গৌরীকে যে চিঠিটি লিখেছেন, সেটিও প্রায় একই রকম। জানি না, আসলে চিঠিটা কেমন ছিল। কিন্তু নবকুমার যে গদ্যের আদলে লিখেছেন, তা পড়লে মনে হয়, চিঠিটি সমরেশ বসুই লিখেছেন। সমরেশ বসুর পারিবারিক গণ্ডির বাইরে এ উপন্যাস--বিশিষ্ট অনেকেই উপস্থিত। আছেন সজনীকান্ত দাস, সাগরময় ঘোষ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, উত্তম কুমার। সমরেশ বসুর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ানো চলচ্চিত্রের অভিনেত্রীদের কেউ কেউ, প্রায়শ বেনামে। এসব সফল সমরেশ বসুর গল্প। এদিকে তাঁর পরের প্রজন্মের লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কলমে সমরেশ বসু সম্পর্কে জানা যায়, সেজেগুজে সন্ধ্যার মুখে বের হতেন। সারা দিনের কর্মক্লান্ত পরিশ্রান্ত এক লেখক, এখন খুব ফুরফুরে। দেবেশ রায় লিখেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি লেখক এবং পেশাদার লেখক।... তিনি আমাদের মতো অফিস-পালানো কেরানি লেখক ছিলেন না, যাঁদের সাহস নেই লেখাকে জীবিকা করার অথচ ষোলো আনার ওপর আঠারো আনা শখ লেখক হওয়ার।... প্রতিটি বইয়ে নতুন নতুন বিষয় ধরার চেষ্টা, সেখানে অক্লান্ত স্বদেশ সন্ধান! সমরেশ বসু নামে 'নয়নপুরের মাটি', 'উত্তরঙ্গ', 'বিটি রোডের ধারে' থেকে যে প্রস্তুতি, 'উত্থান থেকে যুগ যুগ জীয়ে, সুচাঁদের স্বদেশ যাত্রা, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, মহকালের রথের ঘোড়া' আর অসমাপ্ত 'দেখি নাই ফিরে'-- সর্বত্রই আলাদা আলাদা বিষয়ে অভিযাত্রা। নিজের অবস্থান একটু পাশে সরিয়ে যেন নিজেকে জানার চেষ্টার অন্ত নেই। আর কালকূট নামে একেবারে উল্টো। মানুষের ভেতরে বসে মানুষরতন খোঁজা। 'অমৃত কুম্ভের সন্ধানে' থেকে 'কোথায় পাব তারে', যে খোঁজে আপন ঘরে, ধ্যান জ্ঞান প্রেম, হারায়ে খুঁজি সেই মানুষে।' নামকরণেই বোঝা যায় আকাঙ্ক্ষার জায়গাটা। এ ছাড়া লিখেছেন প্রচুর অবিস্মরণীয় ছোটগল্প। আর ছোটদের জন্য গুগলের অ্যাডভেঞ্চারাস জগৎ। ফলে ঘোর কাটার নয়। ঘোরটা তাঁর সফলতা আর ব্যর্থতা নিয়ে নয়। ঘোরটা আজীবন লেখকতায়, সৃষ্টিশীলতায় এমন চুর থাকা একজন লেখকের অঙ্গীকারময় প্রচেষ্টার প্রতি। সেই বিস্ময়ের ঘোর কাটে না!




লেখক পরিচিতি

প্রশান্ত মৃধা

গল্পকার। প্রবন্ধকার। 

জন্ম : কচুয়া, বাগেরহাট, ১৯৭১।

পেশা : শিক্ষকতা। 

প্রকশিত বই : কুহক বিভ্রম, ১৩ ও অবশিষ্ট ৬, বইঠার টান, শারদোৎসব, করুণার 

পরিজন, মিঠে আশার অন্ধকার। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন