সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৫

জাহাঙ্গীর, আপনার জন্য মৃদু কথা

শামীম আজাদ

এবারের বইমেলায় অনেকগুলো বই বেরুচ্ছে বলে আপনি অনেক আনন্দিত ছিলেন। জাগৃতীর দীপেনের আগ্রহে এমন খুশী ছিলেন যে বলেছিলেন, ওর আগ্রহ দেখে বোঝা যাচ্ছে আপনার লেখাও লোকে আগ্রহ করে পড়ে। আমি বলেছিলাম এটা একটা কথার কথা বললেন। কে না জানে আপনার রচনা উচ্চমার্গের?জাহাঙ্গীর...... হা জাহাঙ্গীর
কোথায় গেলেন !

পাখিরা আসে বসে ইচ্ছে হলে উড়ে চলে যায়। মানুষ আসে বসে- ইচ্ছে না হলেও চলে যেতে হয়। কখনো অভিজিতের মত অন্য মানুষের নৃশংসতায়, কখনো অকস্মাৎ শারীরিক কারণে। কাল রাতে ক্ষমতাবান কথা সাহিত্যিক আমার প্রিয়জন কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর চিরকালের জন্য চলে গেলেন। কাল রাত থেকে ছটফট করছি। জানি এক সময় আবার ভাত খাবো, শাড়িতে সেজে বাইরে যাব, বন্ধুদের আড্ডায় তার কথা বলবো... হয়তো একদিন কারণ ছাড়া তাকে আর মনেই পড়বে না। আমার ও এমন হবে। কিন্তু এখন অনেক কষ্ট হচ্ছে।


এবারের বইমেলায় আমার অনেকগুলো বই বেরুচ্ছে বলে আপনি অনেক আনন্দিত ছিলেন। জাগৃতী প্রকাশনীর দীপেনের আগ্রহে বইগুলো প্রকাশিত হচ্ছে জেনে খুব খুশি হয়ে বলেছিলেন, ওর আগ্রহ দেখে বোঝা যাচ্ছে আপনার লেখাও লোকে আগ্রহ করে পড়ে। আমি বলেছিলাম এটা একটা কথার কথা বললেন। কে না জানে আপনার রচনা উচ্চমার্গের?

দেখা হয়েছিল বাতিঘরে আমার পাঠের আগে, কথা ও গল্প হল সবাই মিলে পাঠের পর। সেখানে শিল্পী দম্পতি মনসুর ও কাইয়ুম যুগল-- আমার পুরানো বন্ধুরা ছিলেন। ছিল স্নেহভাজন বাতিঘরের দীপঙ্কর সহ আরো অনেকে। আলম খোরশেদ দম্পতি ও বিস্তারের আরো কজনার সঙ্গে আমরা চা ও খেলাম। কী আশ্চর্য, আমি বলছি বইমেলার আগে জানুয়ারীর শেষের কথা। আর তার ৬০/৭০ দিন পরই ...।

সে সময়ই এতগুলো বই ও কথা নিয়ে কথা বললেন আপনি জাহাঙ্গীর—‘মৃদু কথা’। আপনার সঙ্গে আমার এই প্রথম দেখা। আলাপচারিতায় একদম বোঝা যায় না আপনার লেখার গরম, শোনা যায় না শব্দ। নিজেই খুঁজে নিলাম আপনার বই। বললেন দেখা হবে বইমেলায়। দেখাতো আর হলনা জাহাঙ্গীর।

মুখে কথা না বললেও এত সরব ছিলেন এই এখানে ফেস বুকে। মুক্তবুদ্ধির এক মানুষ যে আপনি তা এখান থেকেই জানা। এখানে আপনার লেখা চিনে আমার অন্যান্য বন্ধুদের বলা, পড়-- কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের লেখা। কমল কুমার নিয়ে তার গবেষণা। গদ্যে দেখিস কি এক নমুণা আনেনঃ করতে আছি, ভাবতে আছি। আর আমাকে আপনি ম্যাডাম সম্বোধন করেছিলেন। আমি বিরক্ত হয়ে বলেছি, ম্যাডাম বললে শিফন পরা চুল ফাঁপানো মহিলার কথা মনে পড়ে যায়। আমিতো সব দেশি পড়ি। আমার ফাঁপানোর মত চুলও নেই। আপনি হাসলেন কিন্তু বদলালেন না।

প্রথম দেখা তাই, একটু সংকোচে বাতঘরে আমার কবিতা শুনতে আসতে বলেছিলাম। আপনি এসেছিলেন। দ্বিতীয় সারিতে বসেছিলেন। কবিতা পরিবেশন কালে দর্শক ও দর্শক সারির বন্ধুদের সঙ্গে একটা যুক্ততা তৈরীতে সক্ষম হয়ে যখনি আপনার দিকে তাকিয়েছি মনে হয়েছে আপনার ভাল লাগছে না। মনে মনে বলছেন এইতো দেখতে আছি কবিতা। ভাল না হইলে মানুষ কত কি না করতে পারে!

আপনি জাগৃতী থেকে বেরুনো আমার বই প্রিয়ংবদার জন্য এক নিবিষ্ট পাঠের সময় দিয়েছিলেন। আমিতো কবি। তাই আপনার কাছে আমার গদ্য ভাললাগায় একটু অবাকই হয়েছিলাম। সেই থেকেই গদ্যানুবাদ নিয়ে কথা। বাদানুবাদ। এক পর্যায়ে বেশ ক্ষূণ্যমনে বললেন, এতদিন ধরে যে অনুবাদ নিয়ে কি সব করি-- তার মধ্যে কেন গদ্যানুবাদ করিনা! সে বাদানুবাদে বোঝাতেই ব্যর্থ হলাম যে তার গদ্য ভাবানুবাদের মত ইংলিশ আমার নেই। সত্যিই নেই। কজনের আছে সেটাও ভাবি। গদ্য নিয়ে ভাবনা ও তার উপাত্ত ব্যবহারে এক মহা পারঙ্গম মানুষ আপনি। আপনি কী সুন্দর এক মুক্ত চিন্তক। তার সবই রয়ে গেল আপনার লেখায় জোখায়। ডাকে আপনার পাঠানো বইও এলো ঠিকঠাক। আপনি নেই সে খবর এই এখানেই কবি মিলটন রহমানের স্ট্যাটাসেই দেখলাম। ঘুমঘোরে ছিলাম। দেখেই ঠাস করে কম্পিউটার কাভার বন্ধ করেছিলাম। কেঁপে কেঁপে ২ মিনিট পরে খুলে দেখি সে অমোঘ তখনো দাঁড়িয়ে।

জাহাঙ্গীর...... হা জাহাঙ্গীর কোথায় গেলেন !

পৃথিবীর পাখিরা যখন আসে-- ইচ্ছে হলে আসে, বসে, উড়ে চলে যায়। মানুষ আসে বসে- ইচ্ছে না হলেও চলে যেতে হয়। কখনো অভিজিতের মত অন্য মানুষের নৃশংসতায়, কখনো অকস্মাৎ শারীরিক কারণে। ক্ষমতাবান কথা সাহিত্যিক আমাদের লেখক ও কবিদের প্রিয়জন আপনি কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর। আপনি চিরকালের জন্য চলে গেলেন। সে শেষ রাতে অনেক ছটফট করছি।

জানি, অল্প সময়েই আবার স্থির হয়ে যাবো। আমরাতো এই এরকমই বিচিত্র জীব। ভাত খাবো। শাড়িতে সেজে বাইরে যাবো। কবিতা লিখ। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবো। বন্ধুদের আড্ডায় আপনার কথা বল। একটু ম্লান হবো । হয়তো একদিন কারণ ছাড়া আর আপনাকে মনেই করবো না। আমি চলে গেলে, আর আপানি থেকে গেলেও ঠিক যেমন এরমই হবে।এমনই হয়। কিন্তু এখন অনেক কষ্ট হচ্ছে।।


লেখক পরিচিতি
শামীম আজাদ
বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখেন। কবিতা,অনুবাদ সংকলন, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা ও নাটক সহ গ্রন্থ সংখ্যা ত্রিশের ওপর। তৃতীয় বাংলা বলে খ্যাত বিলেতে তিনি বাংলা ভাষার প্রধান কবি হিসেবে পরিচিত।
সাপ্তাহিক বিচিত্রা-বাংলাদেশ, ইয়ার অব দা আর্টিস্ট-লন্ডন আর্টস কাউন্সিল, সংহতি সাহিত্য, সংযোজন পুরষ্কার, সিভিক এওর্য়াড, চ্যানেল এস এবং হুস হু এওর্য়াড-লন্ডন পুরষ্কার লাভ করেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন