শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০১৫

এক উজান লেখকের অন্তহীন ভাটিযাত্রা!

পাপড়ি রহমান

শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রগুলি বরাবরই রাজনৈতিক কুটকৌশলযুক্ত, প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন, এবং পিচ্ছিলও বটে! ফলে এইসব ক্ষেত্রে কেউ যদি নিজের মতো করে দাঁড়িয়ে থাকতে চান, অর্থাৎ স্বনির্ভর থাকতে চান--অতটা না-হলেও নিদেন পক্ষে নিজের মতকে অন্ততঃ নিজের পথেই চালিত করতে চাওয়া,--এই চাওয়াটাকে বহাল রাখতে যে পরিমাণ সাহস লাগে, শক্তি লাগে, পঠন-পাঠন লাগে, দৃষ্টিকে তীক্ষ্ণ রাখার প্রচেষ্টা লাগে এবং আরও যা লাগে, তাহলো নিজস্ব দর্শন! এতসবের পরে নিজের পথের উপর অটল দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিই কেবল জানেন যে--ওই দাঁড়িয়ে থাকা কতোটা ধৈর্য্য থাকলে সম্ভবপর হয়।সাহস থাকলে সম্ভবপর হয়। যিনি পথিক তিনিই তা জানবেন, এটাই সরল সমীকরণ। তবে ওই পথিকের বাইরে আরও কেউ কেউ তাঁর ওই অটল অবস্থান সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল থাকেন, তাঁরা কারা? তাঁরা হলেন, ওই স্বদর্শনে চলা, স্বনির্ভর মানুষটির শিল্প বা লেখাপত্র নিয়ে যাঁদের অকৃত্রিম ও অখণ্ড আগ্রহ থাকে। ক্রমাগতঃ যে রক্ত ক্ষরণের ভেতর দিয়ে ওই প্রথার বাইরে থাকা মানুষটিকে যেতে হয় সেটা অপর যদি ধরতেও পারে, তা কখনো অ্যাকিউরেট হয়না বা হবে না! কারণ রক্তক্ষরণের জ্বালা, যন্ত্রণা এবং ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে কেবল ভুক্তভোগীই অর্থাৎ সেই ক্ষয়িত শিল্পী বা লেখক!

সর্বদা স্রোতের বিপরীতে চলা, মানে উজানে দাঁড়িয়ে থাকা লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর নিশ্চিতভাবেই জানতেন সেইসব যন্ত্রণা ও ভয়াবহতার অনুভূতি। একজন লেখক যখন তাঁর সুচিন্তা, সৎকার্য, স্বসাহস নিয়ে সাহিত্যের নোংরা রাজনীতি ও দলাদলির বাইরে থাকতে চান, ক্ষরণের ইতিহাস তো তাঁরই বেশি জানবার কথা! ধারণা করি, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরও তা বেশি মাত্রাতেই জানতেন।

তবে আমাদের অবক্ষয়, নৈতিক অধঃপতন, কুচিন্তার প্রভাব এতটাই তীব্র যে অন্যের ক্ষরণ ফরণ দেখবার অবকাশ মোটেই হয়না। এমনকি অভিলাষও! কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের উলটাস্রোতে দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষরণ কেউ দেখতে বা জানতে না চাইলেও তাঁর কর্ম, চিন্তা, আচরণের প্রতি হয়তো আমার মতো অনেকেরই নজরদারি ছিল । আরেকটু খোলাসা করে বললে, আদতে নজরদারি ছিল তাঁর লেখাপত্রের দিকে। অবশ্য এই নজরদারি না থেকে উপায়ও ছিল না! কারণ লেখালেখির শুরুতেই তিনি ঝাঁক বেঁধে চলা থেকে বিরত ছিলেন। ছিলেন একক, অনন্য। স্বরাজ্যে স্বরাট!

একেবারে শুরু থেকেই ভাষা ব্যবহারে তাঁর নিজস্ব স্টাইল, বিষয় নির্বাচনের আলাদা ধরণ, খুব বেশি ডামাডোলের ভেতর না-থাকা, নিজের সুচিন্তা নিয়ে নিজের মতো করেই থাকা, নিজের লেখাপত্র নিয়ে একেবারে চুপ মেরে থাকা, কোনো বিষয়েই কারো কাছে ধর্ণা না-দিয়ে নিজেকে ক্রমাগতঃ শানিত করে তোলা, যোগ্যের কদর করা--এ সমস্তই তাঁকে আলাদা বিভা দিত। এবং তাঁর একান্ত যত কিছু, সব নিয়েই তিনি একেবারে নিজের মতো করেই অন্তর্ধান হলেন! সবকিছুতেই আলাদা হয়ে থাকার প্রবণতাই বুঝি তাঁকে অমন মৃত্যু দিয়েছে! তাঁর অমন মৃত্যুকে আমি এখনো দুঃস্বপ্নই মনে করি, মনে করতে চাই! মনে করতে চাই, ভয়ংকর কোনো দুঃস্বপ্ন আমাকে হঠাৎ ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলেছে! আর জেগে উঠেও আমি হতবিহবল হয়ে বসে আছি! একেবারে স্থানু হয়ে বসে থাকা! এ ছাড়া আর কিইবা করতে পারি আমি? কারণ আমি জানি, ওই দুঃস্বপ্নের ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো কোনো ভাষাই প্রতুল নয়! তাই আমার বোবা হয়ে থাকা! অর্থব, নিস্তেজ হয়ে থাকা! মানুষ যে কত অসহায়, সেটা তার যে কোনো প্রিয়জনের মৃত্যুতেই শুধু টের পাওয়া যায়।মানুষের অক্ষমতার ট্র্যাজেডিতে আবদ্ধ আমি, এর বাইরে আর কিই-বা করতে পারি?


০২

'মৃতের কিংবা রক্তের জগতে আপনাকে স্বাগতম' লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের প্রথম গল্পগ্রন্থের শিরোনাম। প্রকাশকাল-২০০৫, ফেব্রুয়ারি, জাগৃতি প্রকাশনী।

আমার কাছে খুব অদ্ভুত মনে হয়! শুধু অদ্ভুতই নয়, কাকতালীয়ও বটে! আজ আমি বা আপনি যদি এই লোকালয় ছেড়ে অন্তরীণ হই, তাহলে তিনি হয়তো ওভাবেই আমাকে বা আপনাকে অভিবাদন জানাবেন, বা জানানোর মতো সব অস্ত্রই তাঁর হাতে জমা রয়েছে!

লেখক অভিজিৎ রায়ের রক্তের দাগ বইমেলার মাটিতে তাজা থাকতে থাকতেই লেখক কামরুজ্জামান নিজেই মৃতের জগতে স্থায়ী হয়ে গেলেন!
তিনি এতটাই আত্মবিশ্বাসী, আত্মভোলা, অজাতশত্রু (নিজেকে হয়তো তেমনই ভাবতেন!) ছিলেন যে, যখনই যেখানে যেতেন ফেসবুকে সেই স্থান ও নিজের ফোন নাম্বার জানিয়ে দিতেন! সেই রকমই দিয়েছিলেন গত ৪মার্চ! অতঃপর ৭মার্চ! এবং তিনি নাই হয়ে গেলেন! যেন তিনি হঠাৎ পাওয়া কোনো ডানায় ভর করে উড়ে চলে গেলেন! কিছুতেই তাঁর নাগাল পেতে দিলেন না আর!
পরে নানান সূত্রে জানতে পারি যে, শারীরিক তেমন কোনও সমস্যা তাঁর ছিল না!অর্থাৎ সিরিয়াস কোন অসুখ-বিসুখও নয়! এমনকি সিগারেটও নাকি খেতেন না!

তাহলে?

আমরা তো জানিনা এই মরার দেশে কিসে কী হয়? এখানে তো ভোজবাজির আকাল নাই! মায়াজালেরও সংকট নাই! ফলে নিরোগ চিকিৎসক, লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর নিমিষে মৃত্যুডানায় ভর করে বহুদূরে উড়ে চলে যান! এইভাবেই কি হুমায়ূন আজাদ স্যার সেরে উঠবার পরও ঘুমের বেঘোরে মৃত হয়ে যান? আর চারপাশে পুলিশ ও হাজার জনতা থাকা সত্ত্বেও খুন হয়ে যান লেখক অভিজিৎ রায়!

হয়তো সেভাবেই বা অন্যভাবে, বা কোনোভাবেই না থেকে লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর হাওয়া রাক্ষসদের কবলে পড়েন। চিরকাল উজান স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহসী লেখক মুহূর্তে মৃত্যুভাটির অনন্ত স্রোতে ভেসে যান! আর এতসব ভুলভুলাইয়াতে ঢুকে পড়ে আমরা কিনা বিভ্রান্ত হই! আচ্ছন্ন হই। ক্রমে ভীত হতে শুরু করি।নিজেদের অনিরাপদ জীবন দেখে বিপণ্ণ বোধ করি!
আমরা যদি তারস্বরে কেঁদেও নিজেদের এই বিপন্নতার কথা জানান দিতে চাই, কে শুনবে সেকথা? জানি, কেউ না! কেউ শুনবে না!


০৩.

কারো সাথে সখ্যতা তৈরি হলে তাঁকে নিয়ে লেখা বেশ মুশকিল, কারণ নিজের ঢোল-বাদ্যিও তাতে যুক্ত করতে হয়।সুযোগ পেয়ে কেউ কেউ আবার অপ্রাসংগিকভাবে নিজের ঢোল নিজেই জোরেসোরে বাজাতে থাকেন। ফলে আমি চেষ্টা করছিলাম নিজেকে নিয়ে যেন প্রায় কিছুই না-বলতে হয়।কিন্তু নিজেকে বাদ দিয়ে তাঁকে নিয়ে লেখা প্রায় দুরহ হয়ে দাঁড়াল। অবশ্য শিল্পের ক্ষেত্রটি এখানে ভিন্ন। শুধু তাঁর শিল্প নিয়ে কথা বলতে চাইলে তাঁর সাথে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো উত্থাপন না করলেও চলত। কিন্তু আপাততঃ আমি সেটা পারছিনে।
'আমারে ভূতে পাইছিল বিধায়' আমি বাংলা একাডেমীতে আমার সম্পাদিত 'বাংলাদেশের ছোটগল্পঃ নব্বইয়ের দশক' বইটির পাণ্ডুলিপি জমা দেই। তারপরে ইতিহাস তো মোঘলভারতের ইতিহাস! এত ডিটেলিংয়ে আমি আজ যাচ্ছিনে, শুধু বইটির শেষ পরিণতি নিয়ে আলোকপাত করি। তপন বাগচী তখন বাংলা একাডেমীর কর্মকর্তার খন্তাটা সদ্য হাতে পেয়েছেন। কথায় আছে না, যিনি লংকায় যান তিনিই রাবণ হোন। সো রাবণ তপন বাগচী প্রথমেই বললেন যে, সব গল্পের হার্ড কপি তাঁর চাই। প্রায় বছর চারেক আগে জমা দেয়া পাণ্ডুলিপির হার্ড কপি যোগাড় করতে আমার তো প্রাণ যায়যায় দশা!কারণ ওই পাণ্ডুলিপির গল্পগুলির যোগাড় ছিল কোনো পত্রিকা, নানান সংকলন, প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া গ্রন্থাবলি। আমি কষ্টেমষ্টে সেসব পুনরায় যোগাড় করে দিলাম। এরপরে তপন বাগচীর আবদার সব লেখকদের কাছ থেকে অথরাইজেশন লেটার নিয়া আসেন। সেও অনেক ঝক্কির কাজ। কারণ অনেক লেখকই তখন বিদেশে চলে গেছেন। তাদের কাছ থেকে নানা উপায়ে সম্মতিপত্র নিয়া আসলাম। এরপরে তিনি বললেন 'আপনার সম্পাদকীয় তো কিচ্ছু হয় নাই, এটা বদলাতে হবে'। কোন কুক্ষণে আমি বাংলা একাডেমীর দ্বারস্থ!( এসব যে তপন বাগচী করেছিলেন তার প্রমাণ অই পাণ্ডুলিপির নথিপত্রেই আছে, অফিসিয়াল চিঠিগুলো আমার কাছেও আছে)।

আমার আর ধৈর্য্যই ছিল না অই বই নিয়ে নতুন করে কাজ করার।আবার আমি কারো হেল্প নিতেও অপছন্দ করি। ভয়াবহ মন খারাপ নিয়ে একদিন খুব সসংকোচে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে ফোন করলাম। তিনি প্রচণ্ড মমতা ও আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন সব। শুনেটুনে কয়েকটা বইয়ের নাম ম্যানশন করে বললেন-- ওইগুলাতে চোখ বুলিয়ে নিন। আমি ফের ফাঁপড়ে! কই পাই সেইসব গ্রন্থ? যাহোক ফের ওই সম্পাদকীয় বদলে দিলাম। আর পাঠালাম কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের কাছে। তিনি পড়েই উল্লসিত ফোন দিলেন 'আরে খুব ভাল হয়েছে তো!'
তপন বাগচীর তখন সেটাও মনপছন্দ নয়! এইবার তপন নতুন চাল চালনেল, তাঁর হাতে বিশাল এক লিস্টি, তাতে হরেক রকম লেখকদের নাম! এবং আমাকে তা বইয়ে সংযুক্ত করতে হবে! বাংলা একাডেমীর ডিজি শামসুজ্জামান খানের হস্তক্ষেপ না হলে ওই বই এখনো ফাইল বন্দি হয়েই পড়ে থাকত! আমি এজন্য ডিজি শামুজ্জামান খানের কাছে চিরকৃতজ্ঞ।

আর আমি নাকে খত দিয়ে বসে আছি, বাংলা একাডেমী থেকে কোনো গ্রন্থ আর কোনোদিন নয়! ইহজীবনে নয়!
পরে বইটি বেরিয়েছিল ব্যাপক ভুলভালে পূর্ণ হয়ে, কারণ বইটির প্রুফ দেখানোর কথা থাকলেও তপন তা করেননি! একেই বলে এম্পাওয়ারমেন্টের অপচয়!
আমি শুধু ভাবছি, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের সেই বন্ধুসুলভ আচরণের কথা! তিনি যদি আমাকে অভয় না দিতেন, পাশে না দাঁড়াতেন, সাহস না দিতেন, তাহলে আমি হয়তো ওই পাণ্ডুলিপি উইথড্র করে নিতাম। বইটি কিছুতেই বাংলা একাডেমী থেকে প্রকাশিত হতো না।

আজ সে আমার দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেছেন, আমি যদি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না-যাই, সেটাই বোধকরি আমার সবচাইতে বড় অধর্ম হবে।


০৪.

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের প্রথম উপন্যাস 'পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী', প্রথম প্রকাশ ২০০৬, ফেব্রুয়ারি, প্রকাশক মাওলা ব্রাদার্স।

যারা নিজেদের দেহ বিক্রি করে জীবন বহন করে তাদের নিয়ে তাঁর এই নির্মাণ!
এই উপন্যাসটি নিয়ে যে পরিমাণ কথাবার্তা হওয়ার প্রয়োজন ছিল, তেমনটি হয়নি! প্রকৃত শিল্পী তাঁর শিল্প বাজারে ফেরি করার উদ্যেশ্যে নির্মাণ করেন না, কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরও এই বইটি নিয়ে নিজে প্রায় কিছুই বলেননি! তা তিনি নিজে না বললেও অন্যদের বলার দরকার ছিল! কিন্তু তেমনটি দেখা যায় নি! অন্যকে দোষারোপ করার পূর্বে আমি নিজেকেই দোষী সাব্যস্ত করছি, এজন্য যে তাঁর প্রায় গ্রন্থই আমি আমার টেবিলের বিশেষ গ্রন্থগুলির সঙ্গে রেখেছিলাম, একেবারে দৃষ্টির সন্মুখে। সময় করে সেসব নিয়ে কিছু বলব বলে। কিন্তু আমার কিনা তাঁর বেঁচে থাকবার কালটিতে তাঁকে নিয়ে কিছুই বলার সময় হলোনা! এতটাই অকৃতজ্ঞ আমি! এতটাই মূর্খ! এতটাই স্বার্থপর! অথচ তিনি তো ঠিকই আমার প্রতিটা উপন্যাসের লাইন ধরে ধরে কথা বলে গেলেন! আর উন্মুখ হয়ে অপেক্ষারত থাকলেন আমার নতুন উপন্যাসের জন্য!

(তাঁর কথা বলতে গিয়ে, নিজের কথা এত বলতে হচ্ছে বলে আমি শরমিন্দিত। কিন্তু কি করা? কিভাবেই বা নিজেকে বাদ দিয়ে তাঁকে নিয়ে কথা বলা যায়? নিজের কথা না বললে আমি কিভাবেই বা নিজের দোষ স্বীকার করতে পারি?)
'পদ্মাপাড়ের দ্রৌপদী' এক নিঃশ্বাসে বলে যাওয়া উপন্যাস। লেখক প্রায় কোথাও দম ফেলেননি বলতে গেলে! অথচ এমন একটা ভারি বিষয়, এমন সব চরিত্র--যেখানে সামান্য দম নেবার সুযোগ কোনো লেখকই হয়তো হাতছাড়া করতেন না। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, দমের বিষয়টি কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর খুব কৌশলে ট্যাকেল করেছেন!

অন্ধকারের কলুষিত জীবনগুলোতে আলোর প্রক্ষেপে দেখানোর জন্য প্রচণ্ড পরিশ্রম করেছেন তিনি! ফলে বহুজনকেই এক করে দেখতে হয়েছে তাঁকে। বা একজনকেই বহুভাবে নির্মাণ করতে হয়েছে! এবং তাঁর উদারনীতির এই যথাযোগ্য প্রয়োগ বাংলাসাহিত্যের আরেকজন শক্তিশালী লেখকের কথা মনে করিয়ে দেয়, তিনি তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশংকরের কালজয়ী উপন্যাস 'কবি'র কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে।

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর তাঁর এই ধ্রুপদী উপন্যাসে মানুষকে শুধুই মানুষের মর্যাদাতেই অধিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন! তা কর্ম তাদের যা-ই হোক না কেন?
'সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই-!' এই মর্মবাণী তাঁর লেখনীতে এতটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এতটাই পাকাপোক্তভাবে সেই চিরবাণীর অবস্থান যে, তাঁর অন্তরের আলোকচ্ছটা এতে করে তীব্রবেগে বাইরে বেরিয়ে এসেছে! যেখানে কিনা বিন্দুমাত্রও কলুষতার আঁচড় নেই!

এই উপন্যাসের ভাষার ঢংটি যথারীতি তাঁর নিজস্ব। চরিত্রগুলোর নির্মাণ এতটাই বাস্তবানুগ, এতটাই সাবলীলভাবে ফুটিয়ে তোলা--পাঠক অই অন্ধকার কুঠুরিগুলো একেবারে আলোকস্নাতভাবে দেখতে পারবেন। আমি মনে করি এটাই সবচাইতে বড় শিল্প, যেখানে শিল্পীর মুখ অস্পস্ট হয়ে যায়, আর পাঠক কেবল তাঁর নির্মাণেই বা শিল্পেই বুঁদ হয়ে পড়েন। নিজেকে আড়ালে রেখে যে কোনো শিল্পের এইরকম উন্মোচন কিন্তু বড় সহজ কর্ম নয়!

লোকায়ত ভাষার ব্যবহার তাঁর এই উপন্যাসকে অন্যরকম দ্যোতনা দিয়েছে।
দেহজীবিদের নিতিদিনলিপির প্রাঞ্জল চিত্র এ উপন্যাসের প্রাণ। পদ্মাপাড়ের দেহপসারিনীদের প্রায় নিখুঁত আখ্যান নিয়ে কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের এ গ্রন্থ বাংলাসাহিত্যের সিরিয়াস উপন্যাসের ঝাঁপিতে আরেকটি নতুন সংযোজন হয়ে রইল।


০৫.

লেখালেখির শুরু থেকেই আমার কিছু বদস্বভাব প্রায় স্থায়ী হয়ে যায়! যেমন যে কোনো লেখা প্রকাশিত হয়ে যাওয়ার পরে সেটাতে কিছুতেই আর হাত না-দেয়া, মানে রিরাইট না-করা।নিজের লেখা বিষয়ে কারো কোনো উপদেশ গ্রাহ্য না-করা। অপছন্দের বিষয় হলে তা নিয়ে না-লেখা। নিজের কোনো বইয়ের ফ্ল্যাপ বা ব্লার্ব কোনোদিন নিজে না-লেখা। আমি জানি, আমার এতসব বদদোষ খুব ভাল কিছু নয়। কিন্তু কি করা, আমি যে এমনই, নিজেকে কিকরে যে বদলাতে হয় তার কোনো পথ তো আমি জানিনা!

এতসব বদস্বভাব নিয়ে চলতে গেলে ঝামেলা যে পাকে না, তেমনও নয়! যেমন যে বছর আমার নতুনবই প্রকাশিত হয় তার আগেভাগেই কোনো না কোনো লেখকের বা বন্ধুর হাতপায়ে ধরতে হয় ব্লার্বটি লিখে দেবার জন্য! কেউ কেউ খুব খুশি মনে লিখে দেন। কেউবা 'ভাব' ধরে আমাকে ক্রমাগত আশা দিয়ে দিয়ে নিরাশও করেন! কেউ বা পাশ কাটিয়ে যান। কিন্তু আমি নিজের বইয়ের ব্লার্ব কিছুতেই লিখে উঠতে পারিনা। নিজের সম্বন্ধে এত বিশেষণমূলক কথা নিজেই বলতে ভয়ানক লজ্জা করে, অস্বস্তি হয়। যাহোক। আমাকে চাওয়াকে সন্মান জানানোর বা আমাকে সামান্য সাহায্য করার মানুষ এই পৃথিবীতে বড় বেশি নেই! গতবছরের বইমেলার (২০১৪)গল্পবই 'মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ' নিয়ে আমি যথারীতি মহা বিপাকে। কী করি? কাকেই বা লিখতে বলি? যাকে লিখতে বলব তাঁর তো আমার লেখা নিয়ে ধারণা থাকতে হবে, নইলে কীভাবে কী?

অবশেষে আমার যত মুশকিল আসানের মানুষ লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরকে ধরে বসলাম। (যদিও এ জীবনে তাঁর সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে সাকুল্যে দুই কি তিনবার! ফোনে কথা হতো ছয়মাসে কি নয়মাসে! তবুও কি করে মানুষ এতটাই বন্ধু হয় অন্যের? কি করে এত নির্ভর করে একে অন্যের উপর? আমার সতীর্থ হয়েও কি করে তিনি আমার লেখা নিয়ে এতটাই অহিংস থাকেন?)

তিনি তাঁর স্বস্বভাবে স্বহাস্যে রাজি হয়ে গেলেন! আর কয়দিন বাদেই পাঠিয়ে দিলেন ব্লার্বের লেখাটি। আমাকে কোনোরকম না-ঘুরিয়ে, বা কোনো 'ভাব' না-ধরে! আর আমি তা পাঠিয়ে দিলাম প্রকাশকের কাছে, তাঁর নামসহ।
বইটি প্রকাশের পর আমি লজ্জা ও বেদনায় হতবাক হয়ে গেলাম! সব ঠিক আছে, ব্লার্বের নিচে তাঁর নামটি নেই! আমি সাথে সাথে প্রকাশকে ফোন করলাম। তাঁরা জানালেন তাঁদের নিয়ম নেই ফ্ল্যাপের লেখাতে কারো নাম দেয়ার! তাহলে ব্লার্বের লেখায় কে আমাকে নিয়ে ওইসব বললেন? যাঁরা তাঁর লেখার সংগে পরিচিত তাঁরা ঠিকই বুঝতে পারবেন যে, এটা তাঁর লেখা। কিন্তু যাঁরা অপরিচিত তাঁদের জন্য কী?
আমি মর্মাহত হয়ে তাঁকে এই মারাত্মক অপরাধের কথা জানালে তিনি বললেন --আরে ঠিক আছে, ঠিক আছে। এমন হয়। ( আমি কি তাঁকে বলতে পেরেছি কেন এমন হয়? কেন হবে? কেন তিনি সব কিছুতেই এত সহজ! আজ যদি আমি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে আকাশ বিদির্ণ করে দেই,কে শুনবে আমার কান্না? কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন আমার নিয়তী নির্ভর সেই অপরাধের স্বীকারোক্তি?)

আমি কিছুতেই তাঁর হাতে আমার ওই বই পৌঁছাতে পারিনি। লজ্জায়, বেদনায়, অনুতাপে মাটির সংগে মিশে যেতে চেয়েছি।

আজ গল্পপাঠ তাঁকে নিয়ে লেখার সুযোগ দেয়াতে আমি আমার অনিচ্ছাকৃত অপরাধ স্বীকার করে গেলাম।

তিনি আমার 'মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ' গল্পবইয়ের ব্লার্বে যা লিখেছেন--

তিনি, পাপড়ি রহমান, এবং আমরা,- নব্বইয়ের সতীর্থ গল্পকার। তিনি কথাশিল্পে অবিরত লগ্ন হয়ে আছেন। তার গল্পে লোকমানস মুখ্য হয়ে ওঠে; এবং তার সর্বস্বের হাহাকার, ব্যাপক জীবনবিন্যাস, জীবনের মৌলতা প্রাপ্তির তাড়নায় তিনি লিপ্ত থাকেন। তাতে গ্রামের আর শহরের জীবন যেমন আছে, একই জীবনের ভিতর নানামুখী প্রবণতা তিনি নির্ণয় করতে জানেন। লৌকিক জীবনের তীব্র প্রবণতা, স্বর, বলার মৌলিকত্বে তিনি বরাবরই রিয়েলিস্টিক ইমেজের প্রতি জোর দেন। নানান শ্লোক, মিথ, কথকতা তার গল্পে নবতর শব্দপ্রকৌশলে জারিত হয়ে থাকে। তিনি সেসব বিকশিত করতেও তৎপর। মানুষের মৌলিকত্ব তার নিজস্ব ভাষার ধরনে ভাস্বর হয়। নবতর জীবন চেতনার প্রকাশ তার গল্পের অন্যতম দিক। একটা বিষয় অনেক দিন থেকেই লক্ষ্য করছি, তার লেখা সততই মানব আর প্রকৃতিব্যাকুল। তিনি মানুষকে ক্রমাগত পাঠ করেন--নিবিড় জনজীবনই তার গল্পের প্রধান অনুষঙ্গ। তবে সবদিকেই তিনি তাকান, -এবং পাঠককে তাকাতে বাধ্য করেন। সমাজ-ব্যক্তি-বহু কথকতা তাতে নির্মিত হয়। তিনি আলাদা এক জগতের পিপাসাকাতর লেখক। তাকে আরও পাঠ করা দরকার!
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর
কথাশিল্পী, সম্পাদক- কথা


০৬.

চিরটাকাল স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকলেন যে লেখক, তিনি কিনা এমন অনায়াসে, নিতান্তই সহজভাবে, কাউকে সামান্যতম আহাজারি করবার সুযোগ না-দিয়ে মৃত্যুর-অন্তহীন-ভাটিস্রোতে ভেসে গেলেন! ভেসে গেলেন বড় অকালে, দুঃসময়ে, আবিললগ্নে! একেবারেই ভোজবাজির মতো তাঁর এই অন্তরীণ হয়ে যাওয়া! আর তাঁর এই চিরঅনুপস্থিতির দুঃখ, বিষাদ, শোক, বেদনা, অনুতাপ, মনঃস্তাপ--যা-ই বলিনা কেন, সেসবের কিছুই জুড়োবার কোনো উপায় আমার জানা নাই!

বহুদিন পূর্বে 'রুদালী' নামক এক চলচ্চিত্র দেখেছিলাম। ওই সিনেমায় ডিম্পল কাপাডিয়া অসাধারণ এক চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। কালো আলখেল্লা পরিহিত অবস্থায় তাঁর ক্ষিপ্র-ঘূর্ণন-নৃত্য---একে খুব সম্ভবতঃ 'দরবেশনৃত্য' বলা হয়। এ নৃত্যের মাধ্যমে সুফী সাধকেরা পরমাত্মার সংগে মিলিত হতে চান। আমি নিশ্চিত জানিনা অই অসম্ভব কষ্টকর নৃত্যের মাধ্যমে ইস্পিতের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা?

ডিম্পল কাপাডিয়া তাঁর অব্যক্ত মনোবেদনা, জাগতিক কষ্টকে প্রবল ঘূর্ণির মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ধারণা করি, সেই দৃশ্যের কথা সহসা কেউ বিস্মৃত হতে পারবে না। নিজের অসহায় ও বিমূঢ় দশাতে আমার ওই দৃশ্যটির কথা বারংবার স্মরণে আসছে!

আমি সত্যিই জানিনা, এমন শ্বাসরুদ্ধকর মনোবেদনা থেকে মুক্তির উপায় কি?
কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর বেঁচে থাকলে তাঁর সহজাত হাসি হেসে বলতেন---আহা! এত ভাববেন না তো!

আমি আগেই বলেছি সাহিত্যের-পৃথিবী বড়ই শ্বাপদসংকুল। হিংসা আর হানাহানিতে ভরপুর। তীব্র ইর্ষা আর অসূয়ার বিষবাষ্পে চারপাশ অন্ধকারাচ্ছন্ন! এমন অবস্থায় তিনি আমাদের ছেড়ে গেলেন! বাংলাসাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি হল। ক্ষতি হল কিছু সৎ ও যোগ্য লেখকের। সত্যিকারের ভাল লেখকরা তাঁর মতো একজন অকপট ও সাহসী লেখক, সম্পাদকের ছায়াচ্ছন্নতা থেকে বঞ্ছিত হলেন!

তাঁর মৃত্যুর পর কবি সরকার আমিন বড়ই আন্তরিকতা ,ভালবাসা, শ্রদ্ধা মিশিয়ে বলেছিলেন---
'আবার দেখা হবে, হাসব, ভালবাসব!'

তবে আমার এই 'আবার' নিয়ে বেশ সন্দেহ রয়েছে ! কারণ আমি যে চার্বাক দর্শনে বিশ্বাসী---নগদ যা পাও হাত পেতে নাও, বাকীর খাতা শূন্য থাক...

লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের প্রতি কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, ভালবাসা জানানোর কোনো পথ আমি খুঁজে পাইনি। তবুও নিয়তই অন্বেষণ করছি, কিভাবে তাঁর ঋণের বোঝাটা হালকা করা যায়? কিভাবেই বা এই পাথরসম শোকাভার থেকে সামান্যতম পরিত্রাণ পাওয়া যায়? কিন্তু সব অন্বেষণই বৃথা! সব পথই তো রুদ্ধ!

তাঁর শিল্প, তাঁর লেখাপত্র, জীবন দর্শন, তাঁর ছোটকাগজ এসব কিছুর যদি যথাযথ মূল্যায়ন হয় তাহলে হয়তো কিছুটা শান্তি পাওয়া যেতে পারে!

একজন খুব সৎ, সজ্জন, যোগ্য লেখক তাঁর সঠিক মর্যাদা পাক--এ ছাড়া তাঁকে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, ভালবাসা জানানোর আর কোনো উপায় তো আমাদের সন্মুখে নেই!

কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীরের ধ্রুপদীসাহিত্যসম্ভার নিয়ে বাংলাসাহিত্যের পাঠক নতুন করে ভাববে, ভাবতেই হবে--এ আমি নিশ্চিত জানি।

লেখক কামরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, আপনার প্রতি আমার শেষ কৃতাঞ্জলিটুকু গ্রহণ করুন, আর আমার অনিচ্ছাকৃত অপরাধসমূহ ক্ষমা করুন...



রচনাকালঃ ৩০/০৩/২০১৫
একে লতিকা, মিরপুর, ঢাকা ১২১৬




লেখক পরিচিতি
পাপড়ি রহমান

গল্পকার, ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার ও সম্পাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন