বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

মুনিয়ার চারদিক

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

লেবুগাছের গোড়া থেকে মুখ তুলল কালো একটা সাপ। মুখ তুলে সে একটা অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য দেখল। শীতের কুয়াশায় আবছা সকাল, রোদ এখনো নিস্তেজ সোনালি। সেই সুন্দর আলোয় ডালিম গাছের ডগায় একটি ছোট্ট ফলের দিকে হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে মুনিয়া। দু পায়ের আঙুলের ওপর ভর, দেহটি টান, উৎকণ্ঠ মুখটি ওপরে তোলা, দু কাঁধে এলো চুল ভেঙে পড়েছে।
তার সোনালি ফ্রক, নীল একটি সালোয়ার, পায়ে চপ্পল, মাথায় ডালিমপাতা খসে পড়েছে, পায়ে শিশির আর কুটোকাটা। বড় সুন্দর সকালটি, মেয়েটি সুন্দর, যেমন সুন্দর আলো—সাপটা দেখল। কিন্তু শীত বাতাশে তার শরীর অসাড় হয়ে আসে। কেঁপে উঠে সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। লেবুগাছের গোড়ায় তার গর্তর দিকে এগোয়। তার শরীর পাকে পাকে খুলে দীর্ঘ হয়ে যেতে থাকে। এত দীর্ঘ হয় যে তা প্রায় ডালিম গাছের গোড়া পর্যন্ত চলে যায়, যেখানে মুনিয়ার গোড়ালি।

বাঁ হাতে একটি ডাল টেনে নামায় মুনিয়া। সে ডালটার টানে গাছটা ঝুঁকে আসে। ডান হাতে বড় ডালটা ধরে মুনিয়া। ক্রমে ছোট্ট ডালিমটা নাগালে আসে। মুনিয়া ছিঁড়ে নেয় ফলটা। দাঁতে ঠোঁট টিপে সুন্দর হাসে। শ্বাস ফেলে। তারপর গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়। হাতে ডালিম ফল, তাতে কয়েকটা লালচে সবুজ পাতা।
তীব্র ব্যথায় কালো সাপ তার মুখখানা ফিরিয়ে দেখে। সেই সুন্দর আলো, সুন্দর মেয়েটি। কালো সাপ মুখ ফিরিয়ে নেয়। শ্বাস ফেলে। শরীর টেনে নিয়ে চলে যেতে চায় উষ্ণ গর্তটিকে। সে ব্যথা ভুলবার চেষ্টা করে, সুন্দর শীতের বেলাটিকে দেখে।
মুনিয়া কিছুই টের পায় না। সুন্দর শিশিরে ভেজা ডালিমটা তার হাতে। সে বড় অন্যমনস্ক। ফুটফুটে চপ্পল-পরা পা বাড়িয়ে সে এক পা এগোয়।
ব্যথায় নীল হয়ে যায় কালো সাপ। তার দীর্ঘ দেহের কোনো উৎস থেকে অন্ধকারের স্রোতের মতো তীব্র রাগ ফুটে আসে, আসে হিংসা, ভয়। শীত ভুলে সে তার শরীর তুলে দোল খায়। তারপর সমস্ত অস্তিত্ব নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। চলে যাওয়ার সময় সে ভিক্ষুকের মতো রিক্ত বোধ করে। মুনিয়ার কাছে, সুন্দর শীতের বেলাটির কাছে।
মুনিয়া প্রথমে ভারি অবাক হয়ে দৃশ্যটা দেখে। এত অপ্রত্যাশিত, এত অদ্ভুত। কালো সাপটা তার পায়ের ওপর দিয়ে ছলকে সরে যায় এক ঝলক ছোট ঢেউয়ের জল যেন। তার ফুটফুটে সাদা পায়ের পাতায় দুটি ছুঁচের মুখের মতো লাল ফোঁটা ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। সমস্ত শরীর ঝিন-ঝিন করে, শরীরের ভিতর বিদ্যুতের মতো চমকায়।
একটু সময় লাগে বুঝতে। তারপর বোঝে মুনিয়া।
—মা—গো—ও—
খুব ভোরবেলায় উঠে পরাগ অনেকটা দৌড়োয়। পায়ে কেডস, গায়ে গরম জামা, পরনে খাটো প্যান্ট। দৌড়ে এসে সে খানিকটা জিরোয়। তারপর খোলা ছাদে উঠে আসে। অনেকগুলো বেন্ডিং করে, পা তুলে লাফায়, হাজার স্কিপিং করে। করতে করতে ন’টা বেজে যায়। শীতের বেলা, তাই বেলা বোঝা যায় না। কুয়াশায় জড়ানো রোদে সোনালি রং লেগে থাকে, ভোরের মতো। এ বছর সে একটা বড় টিমে ফুটবল খেলবে—এই কথা ভাবতে ভাবতে পরাগ তার শরীরে আর মনে এক রকমের উষ্ণ আনন্দ বোধ করে। তার পোষা চন্দনা পাখিটিকে কাঁধে নিয়ে সে ব্যায়ামের শেষে সারা ছাদে ঘুরে বেড়ায়। হাতে মুঠোভর্তি ভেজা ছোলা, আর আদার কুচি। সে খায়, খায় তার পাখিটা একই মুঠো থেকে। পাখিটা তার আঙুল কামড়ে ধরে। পা দিয়ে তার মুঠো খুলবার চেষ্টা করে। পরাগ হাসে, পাখির মোলায়েম গায়ে তার কিশোর গাল ঘষে দেয়। পাখি তার পায়ের থাবায় পরাগের হাতের আঙুল জড়িয়ে দোল খায়।
এ সময়ে প্রতিদিনই ছাদের দক্ষিণের রেলিং দিয়ে ঝুঁকলে সে মুনিয়াদের বাগান দেখতে পায়। মুনিয়াদের বাগানে গাছপালা ঘন, সবুজ। মুনিয়া বাগানে ঘোরে। ফুল তোলে, পেয়ারা পাড়ে, কখনো সখনো পরাগদের ছাদের দিকে তাকায়। পরাগ তার পাখিকে আদর করতে করতে মুনিয়াদের বাগানে রোজ সকালে মুনিয়াকে দেখতে ভালোবাসে।
আজও দেখছিল। সোনালি ফ্রক পরনে, আর নীল সালোয়ার, গলায় নরম সাদা একটা মাফলার—মুনিয়া এই বেশে ডালিমের উঁচু ডাল থেকে ডালিম পাড়ছে।
পাখিটা তার মুঠো খুলবার চেষ্টা করছে, হাতের আঙুল দিয়ে একটা ছোলা ফেলে দিল পরাগ। পাখিটা লাফিয়ে নামল। মুনিয়ার টান শরীরখানা ধীরে ধীরে ডালিমের নাগাল পাচ্ছে—এই দৃশ্য কুয়াশা ভেদ করে আগ্রহভরে দেখছিল পরাগ। দেখছিল, কেমন সুন্দর সাদা হাতে পাতাসুদ্ধ ডালিমটা ছিঁড়ে আনল মুনিয়া। সে ঝুঁকে বলতে যাচ্ছিল—মুনিয়া, কী রে?
ঠিক সে সময়ে কালো বিদ্যুৎ স্পর্শ করল মুনিয়াকে। পরাগ কুয়াশায় কিছু দেখেনি। শুধু দেখল, মুনিয়া উবু হয়ে বসে পা চেপে ধরেছে, ডাকছে—মা গো—
পরাগ তার মুঠো খুলে ভেজা ছোলা ছড়িয়ে দিল, ভুলে গেল তার প্রিয় পাখিটাকে। সে দৌড়ে ছাদের দরজা দিয়ে সিঁড়িতে নামল। পাখিটিও শুনেছিল মুনিয়ার সর্বনাশের ডাক। তবু নির্বিকার লাফিয়ে ঘুরতে লাগল গড়ানো ছোলার ওপর। ঘুরতে লাগল, আর আনন্দে পাখা ঝাপটে চিৎকার করতে লাগল।
দীর্ঘদিন লক-আউটের পর কারখানা খুলছে। খুলবার আশা ছিলই না প্রায়! একবার শোনা গিয়েছিল, মালিক কারখানা তুলে নিয়ে যাচ্ছে গুজরাটে। আর একবার শোনা গেল, কারখানা বিক্রি হয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই সুবিনয় ভোরবেলা এসেছে কারখানায়। দূর থেকে দেখতে পেত কারখানার গেটের সামনে নীরব মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তাদের হাতে পতাকা, ফেস্টুন, বুকে ব্যাজ, কিন্তু মুখে নিরাশা। কারখানার দেয়ালজুড়ে দাবিপত্র। প্রতিদিন একই দৃশ্য নীরবে প্রতিটি ভোরে কারখানার সামনে সেই নৈরাশ্যপীড়িত জমায়েতের মুখোমুখি দাঁড়াত সুবিনয়। মাঝে মাঝে তারও মন কেমন ডুবজলে নেমে যেত। বুকটা গ্রীষ্মের প্রান্তরের মতো শূন্য লাগত, তবু তারই মুখ চেয়ে এতজন শ্রমিক—সে এদের নেতা—এই বোধ সর্বক্ষণ তাকে উসকে রেখেছে। পূর্ব এশিয়ার মুক্তি আনছেন কার্ল মার্কস। আরো কত লড়াই পড়ে আছে। এ তো সামান্য একটা কারখানার কয়েকজন শ্রমিক, আর লড়াইটাও ছোট—যার কথা খবরের কাগজে খুব ছোটো হরফে বেরোয়। এসব ভেবে সুবিনয় মনের জোর ফিরিয়ে আনত।
যদি সত্যিই কারখানা গুজরাটে চলে যেত, কিংবা হতো হাতবদল? সে অবস্থার কথাও ভেবে রেখেছিল সবিনয়। রমলার সেলাই-ফোঁড়াইয়ের হাত ভালো, তাকে একটা সেলাই মেশিন কিনে দিত সে! মুনিয়াকে ইস্কুলে ছাড়িয়ে আনত। আর তার অবশ্য একটু পুরনো এলএমই ডিপ্লোমা আছে—কিন্তু সে মার্কামারা লোক বলে এবং কারখানাগুলোর অবস্থা ভালো না বলে কিছুতেই চাকরি পেত না। ফলে সে হয়ে যেত পার্টির হোলটাইমার। বাড়িটা তার নিজের। পাকিস্তান হওয়ার পর বাবা সেখানকার সম্পত্তির সঙ্গে বদল করে বাড়িটা পেয়েছিলেন। অনেকটা জমি, বাগান। বাড়িটা বরাবরই তাকে পার্টির হোলটাইমার হতে এক ধরনের জোর দিয়েছে।
কিন্তু অতটা কিছু হয়নি। কারখানা খুলেছে। সুবিনয় লড়াইটা জেতেনি। শ্রমিকরা দু’দলে ভাগ হয়ে মারামারি শুরু করে। অবস্থাটা সামাল দেওয়া যায়নি। মালিক সুযোগ বুঝে তাদের ডেকে কয়েকটা এলোমেলো শর্ত মেনে নিল, ‘আপনারাই তো জিতলেন’ এ রকম একখানা ভাব করল। সেই ভাবটা বজায় রাখতে হলো সুবিনয়দেরও।
অবশেষে কারখানা খুলেছে।
ইন্সপেকশন ডিপার্টমেন্টের ঘরটির দুই দিকে কেবল কাচের আবরণ। আলোয় টইটম্বুর ঘর। বাইরে এখনো সকালের কুয়াশার আবছায়া, রোদ রাঙা। সেই রাঙা রোদে ঘরে একটা আনন্দিত উৎসবের আভা। সুবিনয় খুব মন দিয়ে একটা যন্ত্রাংশের মাপ নিচ্ছিল। টেবিলে এক পাশে একটা গরম চায়ের কাপ। হাতের কাজটি নামিয়ে রেখে সে চায়ে চুমুক দেয়। অসম্ভব সুন্দর সকালবেলাটিকে দেখে। এসব সুন্দর দৃশ্য দেখলে তার কেবলই মুক্তি পেতে ইচ্ছে করে। মানুষের জন্যও মস্ত লড়াই পড়ে আছে এশিয়াজুড়ে, আর সে পড়ে আছে কোন কোণে। তার শোয়ার ঘরে মাথার কাছে আছে কার্ল মার্কসের একখানা ছবি। স্মিত মুখ, তৃপ্ত, আত্মবিশ্বাসী। যতবার সেই মুখ মনে পড়ে ততবার সুবিনয় অন্যমনস্ক হয়ে যায়। মনে হয়, এ ঠিক জীবন নয়, অন্যতর এক জীবন অপেক্ষা করছে তার জন্য! পূর্ব এশিয়ার যোজন জুড়ে শকুনের ডানার ছায়া। মুক্তি আনবেন কার্ল মার্কস। কাচের স্বচ্ছ আবরণের ওপাশে কুয়াশায় জড়ানো রোদ, সুন্দর সকাল, সুবিনয় অন্য মনে চেয়ে থাকে, চায়ে চুমুক দেয়।
—সুবিনয় চৌধুরী—ইন্সপেকশনের সুবিনয় চৌধুরী—আপনার ফোন—ওয়ার্কস ম্যানেজারের ঘরে—শিগগির যান—
ডিপার্টমেন্টের ফোনটা খারাপ হয়ে আছে কাল থেকে। ঝামেলা। কথায় কথায় ওয়ার্কস ম্যানেজারের ঘরে যাওয়া সুবিনয় পছন্দ করে না। লোকটা শত্রুপক্ষের। যদিও সুবিনয়ের এই চাকরিটা পাওয়ার পেছনে লোকটার হাত ছিল এক সময়ে। কিন্তু এখন দেখা হলেই ভ্রূ কোঁচকায়, মুখ ফিরিয়ে নেয়। আগে ‘সুবিনয়’ বলে ডাকত, এখন ডাকবার নিতান্ত দরকার পড়লে ‘মিস্টার চৌধুরী’ বলে ডাকে!
ওয়ার্কস ম্যানেজারের মুখে আজ একটু ভাবান্তর ছিল। ভ্রূ কোঁচকানোই ছিল, তবে সেটা বিরক্তিতে নয়, দুশ্চিন্তায়। সুবিনয়কে ফোনটা এগিয়ে দিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বলল—দেখুন।
একটা অনিশ্চিত উৎকণ্ঠা গলা আক্রমণ করে তাকে—কে! সুবিনয় চৌধুরী? আমি—আমি পরাগ বলছি কাকাবাবু—
—পরাগ! ভারি অবাক হয় সুবিনয়—কে পরাগ?
—আমি স্যানালদের বাড়ির পরাগ—আপনাদের পাশের বাড়ি—
—ওঃ। কী ব্যাপার?
—একবার শিগগির আসুন—
কেমন একটু অনিশ্চয় লাগে সুবিনয়ের, পা দুটো কাঁপে, বুক কাঁপে, গলাটা ঠিক নিজের গলার মতো শোনায় না,—ওঃ, কী হয়েছে। অ্যাঁ, কী ব্যাপার?
—তেমন সিরিয়াস কিছু না, ছোটখাটো একটা অ্যাকসিডেন্ট—
—কার?
—মুনিয়ার।
ফোনটা অন্যমনস্ক সুবিনয় ক্র্যাডলে না রেখে টেবিলের ওপর রাখতে যাচ্ছিল, ওয়ার্কস ম্যানেজার হাত বাড়িয়ে নিলেন, বললেন—চলে যান। আমি ছুটির ব্যবস্থা করছি—
বড় অসহায় বোধ করে সুবিনয়, কয়েক পলকের জন্য ওয়ার্কস ম্যানেজারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু লোকটিকে ঠিক চিনতে পারে না।
শীতের বেলা পড়ে এলো। বড় ঝিলের ওপারে সূর্য ডুবছে। সি-সি-আর-এর রেললাইনের পাথরে গাঁইতি চালিয়ে ক্লান্ত দুটি লোক উঁচু রেলপথের ধারে ঘাসের ঢালু জমিতে একটু জিরোতে বসে। বিড়ি ধরায় আকাশে কাচ-স্বচ্ছ কোদালে মেঘের রক্তিম খণ্ডগুলোর দিকে কয়েক পলক তাকিয়ে থাকে। পশ্চিমের দিগন্তজুড়ে এক নিস্তব্ধ বিশাল রক্তারক্তি কাণ্ড। তারা দুজন খোলা প্রকৃতির রোদ কিংবা বর্ষার বিস্তর দৃশ্য দেখেছে। তাই অবাক হয় না, মুগ্ধও না। কেবল কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে চোখ নামিয়ে দেয়। সি-সি-আর-এর উঁচু রেলবাঁধের তলায় নিশ্চিন্দার রাস্তা বেয়ে একটা রিকশা ধীরগতিতে চলে যাচ্ছে। লোক দুটির একজন থুথু ফেলে বলে—ওই দেখ, হামিদ ডাক্তার চলেছে।
—আই। অন্যজন বলে।
—গত বছর খুব বাঁচিয়েছিল মোকে, বুইলে?
যতক্ষণ দেখা যায় ততক্ষণ তারা নীরবে রিকশাটাকে লক্ষ করে। ধীরে ধীরে রিকশাটা দৃষ্টির বাইরে যায়।
তখন একজন অন্যজনকে বলে—বুইলে, গত বছর বোশেখের ঝড়ে মোদের দক্ষিণের আমবাগানে আম পড়েছিল মেলাই। মাঝরাতে উঠে দৌড়ে গেনু। অন্ধকারে ভালো ঠাহর হয় না, হাতড়ে হাতড়ে তুলছি কোঁচড়ে, একটু কামড় বসাতেই জিবটা একটু চিনচিন করল। তেমন কিছু বুইতে পারিনি তখনো। দু-চার কামড় খেতেই পেটে গোঁতলান, মুখে লোত, সারা শরীরে জ্বালা-জ্বালা। ঘণ্টাটেকের মধ্যেই মুখে গাঁজলা উঠে এল। রাত না পোয়াতে জি-টি রোডের এক লরি ধরে মেডিকেল কলেজের হাসপাতাল, না সেখানেও জবাব দিয়ে দিলে, বললে—এ তো বিষক্রিয়া, চিকিচ্ছের বাইরে গেছে। হাসপাতালেই মরি আর কী। এ সময়ে তো আর চৈতন্য ছিল না, পরে শুনেছি। আমার বাপ-ভাই বাইরের ফুটপাতে বসে কাঁদছে, একজন পথ-চলতি লোক দাঁড়িয়ে সব শুনে-টুনে বলল, মরবেই যখন তখন একবার হামিদকে দেখিয়ে মরুক। দূর তো নয়। তাই হলো। আধমরা আমাকে টেনে নিয়ে এলো ও হামিদ ডাক্তারের কাছে। সে বেশি কথা-টথা বলেনি, আমার পা দু’খানা কেবল নেড়ে-চেড়ে দেখে ঠিক দু’পুরিয়া ওষুধ দিলে। বললে, এক পুরিয়া কষে ঢেলে দাও, ভিতরে যাবে না—না যাক্, ওতে যদি কাজ হয়, যদি চোখের পাতা ফেলে কি পা নাড়ে তো কাল সকালে আর এক পুরিয়া…সাত দিন বাদে আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠলুম।
—ধন্বন্তরী। অন্যজন বলে।
—আই। আর একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
পরনে চেক লুঙ্গি, সাদা ঢোলা-হাতা পাঞ্জাবি, মাথায় ফেজ টুপি, শীতকালে কাঁধে একটা তুষের চাদর, খালি পা, গালে রুখু দাড়ি। তীক্ষ্ন নাকখানা, তীব্র একজোড়া চোখ। এই হচ্ছে ডাক্তার হামিদ, জি-টি রোডের বিখ্যাত হোমিওপ্যাথ যার সম্বন্ধে বিস্তর কিংবদন্তি ছড়ানো রয়েছে গ্রামেগঞ্জে, সমবায় পল্লী, ঘোষপাড়ায়। লোকে পথ চলতে চলতে, কিংবা চায়ের দোকানে বসে, সেলুনে চুল ছাঁটতে ছাঁটতে সেইসব কিংবদন্তির কথা বলে, শোনে। আবার যে যার পথে চলে যায়। গ্রামেগঞ্জে, পল্লীতে, পাড়ায় পাড়ায় লোক রোগ-ভোগের ভয় থেকে আত্মরক্ষা করে ডাক্তার হামিদের কথা ভেবে। হামিদ মরা মানুষ বাঁচায়।
হাসপাতাল থেকে মুনিয়াকে ছেড়ে দিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। এখন তাদের বাসার বারান্দায় তাকে শোয়ানো হয়েছে। ঠোঁট দুটি নীল। বেলাশেষের আলোয় সেই ডালিম গাছটার ছায়া এসে একটুখানি স্পর্শ করেছে মুনিয়ার পা।
বহু লোকের ভিড়ের মধ্যে সুবিনয় কিছুই লক্ষ করতে পারছিল না। বহু চেষ্টার পর হাসপাতালে ডাক্তার একবার দাঁতে ঠোঁট চেপে হতাশায় আক্ষেপ করে বলেছিল—ডেড! কিন্তু সে কথা সুবিনয়ের বিশ্বাস হয়নি। ডেড। কথাটা কেমন যেন! একটা ভারী পাথর খুব গভীর কুয়োর মধ্যে পড়ে গেল।
একটু পরেই মুনিয়াকে নিয়ে যাবে সবাই। তবু সবাই অপেক্ষা করছে হামিদ ডাক্তারের জন্য। যদি হামিদ পারে! যদি হামিদ পারে!
সুবিনয় এক কোষ জল-বমি করেছে বারান্দার ধারে বসে। এ শরীর যেন আর তার শরীর নয়, এমনই আলগা শিথিল তার হাত-পা। কেউ একজন তার কাঁধে হাত রেখে বলছে—ভরসা রাখো এখনো হামিদ আছে। সে এলো বলে।
হামিদ! সুবিনয় যেন বা এ নাম আগে শোনেনি! কে হামিদ? কোথা থেকে সে আসবে! সুবিনয় মুখ তুলে পশ্চিমের আকাশে রক্তিম মেঘখণ্ডগুলো দেখে। মেঘ সূর্যকে আড়াল করেছে, আলোর তীব্র ছটা বহুদূর নীলিমায় ব্যাপ্ত। ওই কি হামিদের পথ। সে কি রথে আসবে!
মাথাটা কেমন টলটল করে সুবিনয়ের। রমলাকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করে—কেঁদো না। হামিদ আসছে। হামিদ আসছে। ওই দেখো, চরাচরজুড়ে হামিদের জন্য পাতা হয়েছে পথ। আসছে হামিদ। মুনিয়া অনেক বড় হবে—দেখো।
বুড়ো রিকশাওয়ালা খলিল ঝুঁকে প্যাডল মারে, শরীর কাত করে শরীরের ভর দেয় প্যাডলের ওপর। রিকশা ধীরে ধীরে চলে। বুড়ো খলিল কেবল কাশে আর কাশে। রিকশা ধীরে চলে।
রিকশা এসে দাঁড়ায় মুনিয়াদের বারান্দার ধারে, গোলাপি বোগেনভেলিয়ার ঝাড়ের তলায়। রঙিন পাপড়িগুলো শীতের বাতাসে খসে পড়ছে। পাপড়ি খসে পড়ে হামিদের গায়ে, তুষের চাদরে, রিকশার হুডের ওপর। চাপা গুঞ্জন ওঠে—হামিদ। ওই তো হামিদ।
সুবিনয় মুখ তোলে। শ্যামবর্ণ ছিপছিপে হামিদকে দেখে, দেখে তার বুড়ো রিকশাওয়ালাকে। ডেড—এই কথাটা আবার হঠাৎ ভারী পাথরের মতো গভীর কুয়োর মধ্যে পড়ে যায়।
ডালিম গাছের ছায়া কখন এগিয়ে গেছে অনেকটা। তার রং গাঢ়। সিঁদুরে মেঘের আভার আলোর ভেতর দিয়ে গাঢ় কালো ত্রিশূলের মতো ছায়া বিদ্ধ করেছে মুনিয়ার বুক।
খলিল দেখেছে অনেক। সে জানে, সময়মতো হামিদের হাতে পড়লে মানুষ মরে না। তবু মানুষ যে মরে সে তাদের নিজেদের দোষে। নিজেদের শরীরে রোগের লক্ষণ তারা দীর্ঘকাল বুঝতেই পারে না। বুঝতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। তারপর অ্যালোপ্যাথির বিষ জমায় শরীরে। রোগের লক্ষণ চাপা পড়লে ভাবে—সেরে গেল। অ্যালোপ্যাথ জবাব দিলে তখন অনতিক্রমনীয় মৃত্যুকে ভোজবাজিতে ফাঁকি দেওয়ার জন্য তারা ঈশ্বরের মতো হামিদকে খোঁজে। তাই, মানুষ যে মরে সে তাদের নিজেদের দোষে। মাঝেমধ্যে খলিল তার ছানির গ্রহণলাগা চোখে হামিদের মুখখানা বড় মমতাভরে দেখে। দেখে, হামিদের মুখে নানা চিন্তার দৃশ্য। বাচ্চা লড়ছে রোগের সঙ্গে। মানুষের জটিল দেহযন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে হামিদ। লড়াই জমেছে খুব। খলিল তার বুড়ো শরীর হেলিয়ে প্যাডল মারে আর আপনমনে হাসে। মনে মনে সে আল্লাহর দয়া ভিক্ষা করে। প্রতিটি লড়াই জিতে আসুক হামিদ। মানুষের ঘরে ঘরে তার নামগান হোক।
ফেরার পথে রিকশা আরো ধীরে চলে। খোয়া-ওঠা রাস্তায় কাঁচাপথে রিকশা টাল খায়। শীতের বেলা ফুরিয়ে আসে হঠাৎ। উঁচু রেলবাঁধের ছায়ায় ঝুমকো আঁধার নামে পথে। গ্রহণলাগা চোখে সমুখের দিকটা ঠিক ঠাহর হয় না। খলিল রিকশা থামিয়ে নামে, কাঁপা হাতে কোরোসিনের ছোট বাতিটা জ্বেলে নেয়। একপলক হামিদকে দেখে। মুখটা হুডের তালাকার অন্ধকারে, ঋজু রোগা দেহটি স্থির, কোলের ওপর সেই চামড়ার পুরনো ওষুধের বাঙ্টি। ওই মূর্তি দেখলে খলিলের বুকটা ভয়ে আর সম্ভ্রমে ভরে ওঠে। আল্লার প্রেরিত পুরুষ ওই বসে আছে তার রিকশায়। এ ধন্বন্তরিকে সে-ই নিয়ে যায় গ্রামে, গঞ্জে, পাড়ায়, পল্লীতে। মিঞা হামিদ—এই নামে কত অন্ধকার বুকে আলো জ্বলে ওঠে! তবু যে মানুষ মরে সে তাদের নিজেদের দোষে। খলিল তার বুড়ো শরীর নিয়ে আবার রিকশায় ওঠে। প্যাডল ঠেলতে ঠেলতে বিড়বিড় করে—আল্লা, হামিদকে আরো শক্তি দাও। তার দুই হাত আলোর তলোয়ার হয়ে উঠুক!
যেদিন হামিদের রোগী মরে সেই রাতে খলিল তীব্র আবেগে, গভীর তৃষায় মদ খায়। জ্বালাময় অন্ধকারে তার শরীর ভেসে যায়। তারপর ক্রমে তার মাথার ভেতরে একটি আলোর ফুলঝুরি ফেটে পড়ে। সে হয়ে যায় চুর-চুর এক আনন্দিত মাতাল।
ফেরার পথটা দীর্ঘ চড়াইয়ের মতো কষ্টকর। ফুটফুটে মেয়েটা মারা গেল। বাঁচল না। খলিল বিড়বিড় করে—হামিদ কী করবে! হামিদের কোনো দোষ নিও না তোমরা—
মুনিয়ার শ্মশানবন্ধুরা তৈরি হয়েছে। মুনিয়ার বন্ধুরা সাজিয়ে দিচ্ছে তাকে। কপালে টিপ, চন্দনের ফোঁটা। এলোচুল আঁচড়ে দুটি বেণী ছড়িয়ে দিয়েছে দু ধারে। বড় সুন্দর দেখাচ্ছে মুনিয়াকে। বোগেনভেলিয়ার পাপড়ি ঝরে পড়ছে শীত বাতাসে, উড়ে এসে রঙিন প্রজাপতির মতো বসছে মুনিয়ার খাটে, শরীরে, চুলে।
খাটের পায়া ধরে পড়ে আছে রমলা। যেতে দেবে না। পাড়ার বউ-ঝিরা ছাড়িয়ে নিচ্ছে তাকে। সুবিনয় এসব কিছু দেখছে না। হামিদ নামে একজন অলৌকিক পুরুষের আসার কথা ছিল। আকাশে তৈরি হয়েছিল তার আলোকিত পথ। সেই পথে কেউ আসেনি। এক বিশাল শকুন তার ডানা বিস্তার করেছে, চরাচরজুড়ে তারই ছায়া।
মৃত মুনিয়ার শেষ ভেলা চারজন বাহকের কাঁধে দুলে দুলে ভেসে যায়।
অনেক রাতে মুনিয়ার শ্মশানবন্ধুরা ফিরছিল। তারা শুনল, চৈতলপাড়ার পথে পথে ক্ষুব্ধ এক বুড়ো মাতালের চিৎকার। চুর-চুর মাতাল খলিল চেঁচিয়ে বলছে—তোমরা সাক্ষী আছো! আমি হামিদের এক ফোঁটা ওষুধও কখনো খাইনি। আমি যদি মরি তবে তার দোষ যেন হামিদকে না অর্সায়। হামিদ ধন্বন্তরি—হামিদ মরা মানুষ বাঁচায় বিশ্বাস করো—
অনেক রাতে, ঘুমোবার আগে হামিদ তার সাদা, ছোট, সহজ সরল বিছানাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে, নামাজ পড়ার মতো পবিত্র ভঙ্গিতে। প্রতিদিন ঘুমোবার আগে সে এই কথা বলে—আল্লা, আমি তোমার সমকক্ষ নই। মানুষকে তুমি এই বিশ্বাস দিও যে, একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ তার সমকক্ষ নয়।


মাঘের শেষে এক মাঝরাতে পরাগের ঘুম ভাঙে। ঘুম ভেঙে দেখতে পায় বুকের ওপরে আকাশ। গভীর সমুদ্রের মতো অথৈ। নক্ষত্রের আলো কাঁপছে।
ত্রিপলের একটা কোণ উত্তরের বাতাসে উড়ে গেছে। শীত করছে খুব। কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে উঠে বসে পরাগ। এক প্যাকেট সিগারেট চুরি করে রেখেছিল। বালিশের পাশ থেকে সেই প্যাকেট তুলে অনভ্যাসের একটা সিগারেট ধরায় সে। তারপর মৃদু শব্দে একটু কাশে।
সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত সানাই বেজেছে, বেজেছে উলুধ্বনি, হাসি, নানা শব্দ। সন্দ্যারাতে ছোড়দির বিয়ে হয়ে গেল। এখন রাত গভীর। ছাদের ওপর ঘুম ভেঙে বসে আছে পরাগ। মাথার ওপর ছাদের ত্রিপলের একটা কোণ উড়ে আকাশ দেখা যাচ্ছে। নিচে এঁটো পাতা নিয়ে ঘেয়ো কুকুরদের গম্ভীর ঝগড়ার আওয়াজ।
পরাগ অপলক চোখে অথৈ আকাশটুকু দেখে। এ রকম মধ্যরাত্রির আকাশ এমন বিরলে সে আর কখনো দেখেনি। আজকাল আর হইচই ভালো লাগে না তার, তাই শোওয়ার সময়ে সে একটা চেয়ারের গদি আর কম্বল টেনে নিয়ে এসে ছাদে শুয়েছিল। এখন বুঝতে পারে, এই ভয়ংকর শীতে আর ঘুম আসবে না। সে বসে থেকে সিগারেট খায়, আর অপলক শূন্য চোখে আকাশ দেখতে থাকে।
কোথায় যেন একটা কাশির আওয়াজ হয়, নাল-পরানো জুতোর আওয়াজ, মাটিতে লাঠি ঠুকবার শব্দ। পরাগ উঠে ছাদের আলসের ধারে আসে। অন্ধকারে ঝুঁকে দেখে, মুনিয়াদের বাইরের বারান্দার অন্ধকারে কে যেন বসে আছে। একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বলে ওঠে। লোকটা সিগারেট ধরায়।
পরাগ ডাকে—কাকাবাবু।
—উঁ। সুবিনয় উত্তর দেয়।
—এখনো শোননি। রাত দুটো বেজে গেছে।
সুবিনয় গলার মাফলারটা ভালো করে জড়ায়, পায়ের মোজাটা একটু টেনে তোলে। তারপর বলে ঘুম আসে না।
হাতের টর্চটা জ্বেলে চারদিক একবার দেখে নেয় সুবিনয়, তারপর বলে—তুমি ঘুমোওনি?
—আমি ছাদে শুয়েছিলাম, কিন্তু এখানে বড় শীত। ঘুম আসছে না।
—হুঁ। এবারে শীতটা খুব পড়ল।
বাতাসে ত্রিপলের কোণটা উড়ে ফটাস ফটাস শব্দ করে। তারা কেউ চমকায় না।
পরাগ চাপা গলায় বলে, এই অন্ধকারে কি আর খুঁজে পাবেন? এবার গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
—যাই। উত্তর দেয় সুবিনয়, কিন্তু ওঠে না। বসে থাকে।
মুনিয়া মারা গেছে এক মাস। প্রায় এক মাস ধরে সারা দিন সুবিনয় শাবল আর লাঠি হাতে বাগানে ঘুরছে। খুঁড়েছে গাছের তলা, মাটির ঢিপি, ইঁদুর আর ছুঁচোর গর্ত। প্রথম প্রথম সঙ্গে পরাগ থাকত, থাকত পাড়ার উৎসাহী ছেলেমেয়েরা, যারা ভালোবাসতো মুনিয়াকে। ক্রমে ক্রমে সবাই যে যার কাজে ফিরে গেছে। এখন একা সুবিনয় সারা দিন সাপটাকে খোঁজে। গভীর রাত পর্যন্ত। আজকাল বড় একটা ঘুম আসে না।
পরাগ তার কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে নেমে আসে। বারান্দা থেকে পাখিটা তীব্রস্বরে ডাকে-’পরাগ’। পরাগ নেমে আসে, সদর খুলে বেরোয়।
—কাকাবাবু এই নিন এক প্যাকেট সিগারেট। আপনার জন্য রেখেছিলাম!
খুশি হয় সুবিনয়। হাত বাড়িয়ে নেয়। তারপর হঠাৎ অপ্রত্যাশিত বলে—মুনিয়া বেঁচে থাকলে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতাম, বুঝলে পরাগ! মনে মনে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম।
শীত বাতাস বয়ে যায়।
—এবার গিয়ে শুয়ে পড়ুন কাকাবাবু। শীতকাল—এখন সাপেরা বড় একটা বেরোয় না।
—তাই হবে। সুবিনয় বলে বসে থাকে। তারপর বলে, তুমি যাও। আমি আর একটু দেখে গিয়ে শুয়ে পড়ব। যতক্ষণ এটা আছে ততক্ষণ কিছুতেই শান্তি পাই না।
পরাগ ওঠে। খুব শীত বলেই কি-না কে জানে তার চোখে জল আসতে থাকে।
একা আরো কিছুক্ষণ অন্ধকারে বসে থাকে সুবিনয়। তারপর টর্চবাতিটা জ্বালে। ব্যাটারির জোর কমে গেছে, আলোটা লালচে। টর্চটা ঘুরিয়ে সামনের মাঠটা একটু দেখে, বাগানের বেড়ার ধারে যায়। লেবুগাছ আর ডালিমগাছের গোড়া থেকে আলো সরিয়ে নেয়। দত্তদের বাড়ি উঠছে, তাদের ইটের পাঁজাটা দেখে সুবিনয় পথে নামে। পরাগদের বাড়ির সামনে ঘেয়ো কুকুরদের ভিড়কে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। বন্ধ ডাক্তারখানার চাতালে একজন মাতাল বসে আছে। সুবিনয় এগোয়। পুলিশ-ব্যারাকের পেছনের দেয়ালের সামনে কয়েকটা ছেলে দাঁড়িয়ে। তাদের হাতে মোমবাতি, আলকাতরার টিন, তুলি। কী লিখছে!
টর্চের আলো ফেলে সুবিনয় দাঁড়াতেই ছেলেগুলো রুখে মুখ ফেরায়।
—কে?
এ পাড়ারই ছেলে। তাকে চিনতে পারে। একজন এগিয়ে এসে বলে—আমরা কাকাবাবু। আপনি কী খুঁজছেন—সেই সাপটাকে? ওটাকে কি আর পাবেন? বাড়ি গিয়ে শুয়ে পড়ুন।
সুবিনয় টর্চের আলো ফেলে দেয়ালে, বলে—এসব কী লিখছ?
—তেমন কিছু না। আপনি বাড়ি যান কাকাবাবু। আমরা লিখি।
সুবিনয় লেখাগুলো পড়ে! ঠিকঠাক কিছু বুঝতে পারে না।
লিখছ! আচ্ছা লেখো। বলে সুবিনয় আবার এগোয়। রেলরাস্তা পর্যন্ত চলে যায়। আবার ফিরে আসে। চারদিকেই অন্ধকার, নির্জনতা।
দিন কেটে যায়।
তখনো অন্ধকার ঝুলে আছে চারদিকে, ভোর রাত্রে পরাগের চন্দনা পাখিটা ডাক দেয়—পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
পরাগের আলস্যজড়িত ঘুম ভাঙে। উঠতে ইচ্ছে করে না। পাখিটা ডাকে, ডাকতেই থাকে। বিরক্ত পরাগ পাশ ফিরে ধমক দেয়—এই, চুপ!
পাখিটা ডানা ঝাপটায়, কিন্তু আবার ডাকে, পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
উঠতে ইচ্ছে করে না। সকালের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যটি আর দেখা যায় না। মুনিয়াদের বাগানে মুনিয়া। কী হবে বড় হয়ে আর? পরাগের আর বড় হতে ইচ্ছে করে না। মাঝে মাঝে তার বুকের ভেতরে এক গ্রীষ্মের প্রান্তরে হু-হু করে হাওয়া বয়ে যায়।
পরাগ পাশ ফিরে শোয়। সিগারেটে এখন তার অভ্যাস হয়ে গেছে। বালিশের পাশেই থাকে প্যাকেট। সে শুয়ে শুয়ে সিগারেট খায়। কিন্তু পাখিটা ডাকতেই থাকে—পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো। পরাগ ওঠো।
পরাগ চুপ করে থাকে। একবার ভাবে, উঠব না—খেলোয়াড় হয়ে আমার কী হবে! আর একবার ভাবে, উঠি। ভাবতে ভাবতে তার শীত করে। লেপটা মুড়িসুড়ি দিয়ে শোয়। মুনিয়াদের বাগানে আর মুনিয়াকে দেখা যাবে না। তাই শুয়ে সিগারেট টানে পরাগ। এই অনিয়ম দেখে তার চন্দনা পাখিটা রেগে গিয়ে ডানা ঝাপটায় আর ডাকে। ডানা ঝাপটায় আর ডাকে।
হঠাৎ মাথার ভেতরে একটি ঘন সবুজ মাঠের দৃশ্য ফুটে ওঠে। উঁচুতে একটা সাদা বল। সেই বলের দিকে লাফিয়ে উঠছে কয়েকজন লাল-সোনালি নীল-লাল জার্সি পরা খেলোয়াড়। হঠাৎ উষ্ণ একটা রক্তস্রোতে পরাগের শরীর ভেসে যায়। এ বছর পরাগকে ডেকেছে কলকাতার বড় একটা ফুটবল ক্লাব।
ভাবতে ভাবতে পরাগের শরীর চনমন করে। সে উষ্ণস্রোতে তার শরীরের শীতভাব দূর করে দেয়। সে উঠে তার শর্টস পরে, পরে নেয় কেডস, তার পাখিটা চুপ করে দেখে। খুশি হয়।
মুনিয়াদের বাগানে আর মুনিয়াদের দেখা যাবে না।
পরাগ এ বছর কলকাতার বড় একটা ক্লাবে খেলবে।
ভোরবেলা বহুদূরে এক কারখানার ভোঁ বাজতে থাকে।
সুবিনয় চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। রমলা একটা সেলাই মেশিন কিনবে। দুজনের চলে যাবে কোনোক্রমে। সারা দিন এবং রাত পর্যন্ত সাপটাকে খোঁজে সুবিনয়। ঘুম আসে ভোর রাত্রে।
দাড়িওয়ালা, স্মিতমুখ কার্ল মার্কসের ছবিখানা এখনো তার শিয়রে টাঙানো, মাঝে মাঝে সে ঘুম-জড়ানো চোখে ছবিখানার দিকে চায়। অস্ফুট গলায় বলে—আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতুম আমার মুনিয়াকে। আর কিছুকে নয়, আর কাউকে নয়। আমার এ অপরাধ ক্ষমা করো।
ক্রমে কার্ল মার্কসের ছবিখানায় ধুলো পড়ে। এক দুঃসাহসিক মাকড়সা লাফ দিয়ে উঠে আসে, তারপর স্মিতহাস্যময় সেই মুখের ওপর তার অমোঘ জালখানা বুনতে শুরু করে।



লেখক পরিচিতি
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় 

২ নভেম্বর ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ময়মনসিংহ জেলায় জন্ম। পিতার রেলের চাকরীর জন্য তাঁর শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এ.। তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণপোকা দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৯৭৩ এবং ১৯৮৭-তে পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার। ঘুণপোকা, যাও পাখি, মানবজমিন, শ্রেষ্ঠ গল্প ইত্যাদি বহু গ্রন্থের এই লেখক বিদ্যাসাগর (১৯৭৫), ভুয়ালকা (১৯৮৮) এবং ১৯৮৯ সালে মানবজমিন গ্রন্থের জন্য পেয়েছেন একাদেমি পুরস্কার।

২টি মন্তব্য:

  1. পাঠক ধরা জালের মতো। গল্প পড়ে পালিয়ে যাওয়া আর হয় না। জালের অলি-গলি পথ টানতে থাকে। কখন জালে হুমড়ি খেয়ে জড়িয়ে যায়। গলার কাছে শক্ত কিছু ঠেকে। ঝাপসা চোখে হাত বুলিয়ে দেখি, আবছায়া মার্কস সাহেব।

    উত্তরমুছুন
  2. পাঠক ধরা জালের মতো। গল্প পড়ে পালিয়ে যাওয়া আর হয় না। জালের অলি-গলি পথ টানতে থাকে। কখন জালে হুমড়ি খেয়ে জড়িয়ে যায়। গলার কাছে শক্ত কিছু ঠেকে। ঝাপসা চোখে হাত বুলিয়ে দেখি, আবছায়া মার্কস সাহেব।

    উত্তরমুছুন