বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

যে আগুন

স্বকৃত নোমান

শ্রাবণ মাস ছিল তখন। দিনভর বৃষ্টি হয়েছিল। হাট থেকে ফিরে তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছিল সেকান্তরালি। গভীর রাতে প্রাকৃতিক ডাকে ঘর থেকে বেরুলে বাড়ির দক্ষিণ কোণায় প্রাচীন শিরীষ গাছটার তলায়, যেখানে বেলায়েত শাহর কবর, আগুন দেখতে পায়। মশালের মতো অগ্নিশিখাটা মাটি থেকে দু-হাত উপরে সাপের জিবের মতো লিকলিক করছে।


প্রথমে ভেবেছিল সেকান্তর, কোষাভাঙার খালে বুঝি কেউ মশাল জ্বালিয়ে মাছ মারছে। রাত-বিরাতে তো হামেশাই মাছ মারা চলে। কিন্তু মশালের আলো তো এমন হয় না, খটকা লাগে তার। ভালো করে ঠাওর করে দেখে, খালে নয়, আগুন জ্বলছে বাঁশঝাড়ের ভেতর শিরীষতলার ফাঁকা জায়গাটায়।

ভারি তো অবাক কাণ্ড! এতরাতে এমন একটা জঙ্গলা জায়গায় আগুন জ্বলবে কেন? শুকনো লতাপাতায় আগুন ধরে গেল নাকি! হতেও তো পারে। গাছটার পুবে হাটে যাওয়ার রাস্তা। হাটুরেদের ফেলে দেয়া বিড়ির গোড়ালি থেকে হয়ত শুকনো পাতায় আগুন ধরে গেছে।

তা-ই বা কি করে সম্ভব? লোটা হাতে উঠোনে দাঁড়িয়ে ভাবে সেকান্তর। দিনভর ঝুম বৃষ্টি হয়েছে, গাছবিরিক্ষি লতাপাতা সব ভিজে চুপসে আছে, ভেজা পাতায় তো আগুন ধরার কথা নয়। তাহলে?

ভয়ার্ত সেকান্তর ঘরে গিয়ে বড়বেটাকে ডেকে তোলে, উঠ তো বাপ। দেখ তো কী আজগুবি কাণ্ড!

বাপ-বেটা উঠোনে এসে দাঁড়ায়। ভালো করে ঠাওর করে দেখার চেষ্টা করে আগুনটা ঠিক শিরীষতলায় জ্বলছে কিনা। না, মোটেও দেখার ভুল নয়, আগুন জ্বলছে ঠিক শিরীষতলার ফাঁকা জায়গাটাতেই, বেলায়েত শাহর কবরের পাশে কিংবা কবরের ওপর।

খানিক পর সেকান্তরের বউ এসে স্বামীর পাশে দাঁড়াল। তারপর এলো ববেটার বউ। তাদের হাঁকডাকে সেকান্তরের মেজবেটা, ছোটবেটা এবং তাদের বউরাও একে একে হাজির হলো উঠোনে। কারো চোখ আর চোখের জায়গা থাকল না, ভুরু ঠেলে কপালে গিয়ে ঠেকল। গভীর রাতে খোদাতালার এমন কুদরত দেখে তারা দোয়া-দরুদ পড়তে শুরু করল।

নিশ্চয়ই দুষ্টু কোনো জিন-পরীর কাণ্ড, ভয়ার্ত স্বরে বলল সেকান্তরের বউ। তার উক্তি শুনে উঠোনে জড়ো হওয়া বাকিদের মনে দ্বিগুণ ভীতির সঞ্চার হয়। সেকান্তর চুপ করে থাকে। বউয়ের কথাটা উড়িয়ে দিতে পারছে না। হতেও তো পারে। নইলে জঙ্গলের ভেতর প্রাচীন গাছটার তলায়, যে গাছে কিনা বহু বছর ধরে জিন-পরীর বসতি, আগুন জ্বলবে কেন? তবে বউয়ের কথাকে সে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে পারছে না। দিলে তার বউ বা বেটাবউরা ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে।

বেটাদের নিয়ে সেকান্তরালি অকুস্থলে গিয়ে আসল ঘটনা তদন্ত করে আসতে পারে। মেজবেটা টর্চ হাতে একবার রওনাও করেছিল। বাধা দিল সেকান্তর। এত রাতে এমন একটা জঙ্গলা জায়গায় যাওয়া মোটেই নিরাপদ নয়। শ্রাবণ মাসে মনসার সন্তানেরা বনজঙ্গলে ফণা তুলে থাকে। বাঁশঝাড়ে যে তারা এখন বিচরণ করছে না তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তা ছাড়া শিরীষ গাছটা যে জিন-পরীর আস্তানা সে-কথা তো গ্রামের সবার জানা। এক জীবনে সেকান্তর বহুবার গাছটায় তাদের দেখেছে। তার শৈশবে গভীর রাতে গাছটার ডালে কোঁয়াৎ কোঁয়াৎ যে ডাক শোনা যেত, তা তো জিনেরই ছিল। বড় হওয়ার পর অবশ্য সেই ডাক আর কোনোদিন শোনেনি। শুনবে কীভাবে? সে ভয় পেত বলে তার দাদা পাশের গ্রামের এক গুনিন ডেকে জিনটাকে চিরতরে বোতলে বন্দি করে ফেলেছিল। তার মানে এই নয় বাকি জিনরা গাছটা থেকে তাদের আস্তানা গুটিয়ে নিয়েছে। বছর দুয়েক আগে সাদা কাফন পরা একটা জিন এক লাফে গাছতলা থেকে মগডালে উঠে ছরছর করে পেশাব করে দিয়েছিল, নিজ চোখে দেখেছে সেকান্তরের বড়বেটা। বৈশাখ মাসের ঠিক দুপুরবেলা ছিল তখন। কোশাভাঙা খালে জাল মারতে গিয়ে বড়বেটা এখলাস সেই অদ্ভূত দৃশ্য দেখতে পায়।

সেদিনই গাছটা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এখলাস। কিন্তু বাপের বাধায় পারেনি। সেকান্তর কোনোদিন গাছটার একটা ডাল পর্যন্ত কাটেনি। তার মনে আছে, মৃত্যুর আগে তার দাদা তার বাপকে অসিয়ত করেছিল, খবরদার বেটা, গাছটা কোনোদিন কাটবি না।

কেন? দুনিয়ার এত কিছু থাকতে গাছ না কাটার অসিয়ত কেন? কারণ তো একটা আছে বটেই। কী সেই কারণ? সেকান্তরের দাদা ইদ্রিস বলীর পড়ন্ত বয়সে বেলায়েত নামের এক যুবক চট্টগ্রাম থেকে এসে বলীবাড়িতে আস্তানা গাড়ে। ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মতো বয়স। আলাভোলা মানুষ। শীত-গ্রীষ্ম সবসময়ই পরনে একটা মাত্র লুঙ্গি ছাড়া আর কিছু থাকত না। খানাপিনারও ঠিকঠিকানা ছিল না। একবেলা খেত তো দু-বেলা উপোস। মাছ-গোস্ত দিয়ে বাসনভরা ভাত সামনে এনে রাখলেও হাত বাড়াত না। দিনের পর দিন গোসল করত না। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের তীব্র গরমের দিনে মাঝেমধ্যে লুঙ্গিটা মাথায় বেঁধে কোশাভাঙা খালে নেমে পড়ত। শিকড়-বাকড়সুদ্ধ কয়েকটা কচুরিপানা মাথায় বাঁধা লুঙ্গির উপর দিয়ে গলা পর্যন্ত ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকত। ভাসমান কচুরিপানাগুলো তার চারদিক ঘিরে ধরত। ভালো করে খেয়াল না করলে কারোরই বোঝার উপায় থাকত না, খালের জলে জলজ্যান্ত একটা মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।

তার কাণ্ড দেখে লোকজন হাসিঠাট্টা করত, দুষ্টু ছেলেমেয়েরা মাঝেমধ্যে ঢিল ছুঁড়ত, সে মুখে টু-শব্দটি পর্যন্ত করত না। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকত তো থাকতই, রাতের বেলায় শিরীষ গাছটার তলায় যেভাবে দাঁড়িয়ে থাকত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বেলা পশ্চিমে হেলে পড়লে ইদ্রিস বলী ভাত খেতে হাটের গদি থেকে বাড়ি ফিরলে বেলায়েতের ডাক পড়ত। কোথায় বেলায়েত? নাম ধরে সে হাঁক দিতে শুরু করত। সেই হাঁক বেলায়েতের কানে পৌঁছামাত্র খাল থেকে উঠে ভেজা লুঙ্গিটা পরে বাড়ির দিকে দৌড় লাগাত।

এসব পাগলামির জন্যই বাংলার পীর-ফকিরদের মতো ইদ্রিস বলী তার নাম দিয়েছিল বেলায়েত শাহ। সন্তানের মতোই স্নেহ করত তাকে। থাকতে দিয়েছিল বাড়ির কাচারিঘরে। মায়ায় পড়ে আমৃত্যু আর কোথাও যায়নি। এক আষাঢ়ের তুমুল বৃষ্টিতে শিরীষতলায় সারাদিন ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। তারপর টানা পনের দিন জ্বরে ভুগে অকালেই মারা পড়ল। মৃত্যুর পর ইদ্রিস বলী বাড়ির দক্ষিণ কোণায় শিরীষ গাছটার তলাতেই বেলায়েতকে কবর দিয়েছিল।

ইদ্রিস বলী তো সেই কবেই চলে গেছে, তার পুত্র ঈমানালিও গেছে। সেকান্তরালিরও বয়স হয়েছে, যে কোনোদিন চলে যেতে পারে। বেলায়েতের কবরের পাশে শিরীষ গাছটাতে বয়সের ছাপ পড়েছে তো সেই কবে। বাপের অসিয়তের উল্টো কিছু করেনি ঈমানালি। কোনোদিন একটা ডালও কাটেনি। সেকান্তরালিও না। বাপ যে গাছে হাত দেয়নি, বেটা হয়ে সে হাত দিয়ে বাপের রূহে কষ্ট দেবে কেন? গাছটা টিকে গেল। সেকান্তরালির বেটারা না কাটলে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে দানবের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে আরো কয়েক যুগ।


দুই

সেই রাতে কেউ আর ঘুমাতে পারেনি। বাড়িতে এমন একটা আজগুবি কাণ্ড ঘটার পর চোখে তো ঘুম আর আসার কথাও নয়। তাদের হাঁকডাকে পাড়াপ্রতিবেশীরা এলো। তারাও দেখল বলীবাড়ির শিরীষতলার আজগুবি কাণ্ড। সারা রাত তারা উঠোনে দাঁড়িয়ে পাকমওলার লীলাখেলা দেখল। সাপের জিবের মতো লিকলিকে অগ্নিশিখার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ভোর নামল। অন্ধকার মুছে গিয়ে ভোরের আলোয় ভরে উঠল পৃথিবী, নিশাচররা ঢুকে গেল আলোর বিপরীতে। এখন আর অকুস্থলে যেতে ভয় নেই। শিরীষতলায় গিয়ে সবাই দেখল ঠিক কবরের ওপর মাটি ফুঁড়ে আগুন উঠছে। কী আশ্চর্য! এমন ঘটনা কে কবে দেখেছে! খোদার এমন কুদরত দেখে এক বুড়ো গাছতলার পাঁক-কাদায় সেজদায় পড়ে কাঁদতে শুরু করল।

সেজদা থেকে উঠে বুড়ো বলল, এ নিশ্চয়ই দোযখের আগুন। সারা জীবন এক অক্ত নামাজ পড়েনি বেলায়েত, আল্লাখোদার নাম কখনো মুখে আনেনি, কবরে তো সে শান্তিতে থাকার কথা নয়। এখন দোযখের আগুন জ্বলছে তার কবরে। বাড়িতে মিলাদ দাও সেকান্তর। খোদার কাছে বেলায়েতের মাগফিরাত চাও।

কথাটা আমলে না নিয়ে পারল না সেকান্তর। হতেও তো পারে। বান্দাদের হেদায়েতের জন্য খোদা কখনো কখনো তার কুদরত এভাবেই জাহির করেন। বাড়িতে বড়সড় একটা মিলাদ দেয়ার, দরকার হলে জুমার দিনে মসজিদে শিরনি দেয়ার মানত করল সেকান্তর। তার বউ বলল, শুধু মিলাদ নয়, গরু জবাই দিয়ে একটা জেয়াফত দিতে হবে।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খবরটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের ঢল নামল বলীবাড়িতে। সবার মুখে একই কথা, খোদার গজব। বেলায়েতের কবরে দোযখের আগুন জ্বলছে। সেকান্তর লোকের সামনে লজ্জায় মুখ দেখাতে পারে না। তার বাড়িতে খোদা এভাবে গজব নাযিল করল, তার বান্দাদের সামনে মুখ সে দেখায় কেমন করে!

দুপুরের দিকে লজ্জিত সেকান্তরের প্রতি বুঝি মায়া হলো খোদার, হঠাৎ তার রহমত নেমে এলো। দূরের গ্রাম থেকে আগুন দেখতে আসা এক মৌলবি বলল, গজব-টজব কিছু নয়। কবরে দোযখের আগুন জ্বলে কেতাবের কোথাও লেখা আছে? মুর্দা গুনাহগার হলে গজবের ফেরেশতারা তাকে মুগুর মারে, বড় বড় অজদাহারা দংশন করে, কবরের মাটি দুদিক থেকে তাকে চেপে ধরে পিষে মারে। এসব হচ্ছে কবরের শাস্তি। কবরে আগুন কেন জ্বলবে? শোনো ভাইয়েরা, আসল কথা হচ্ছে বেলায়েত শাহ একজন কামেল পীর। বেঁচে থাকতে কেউ তাকে চিনতে পারেনি। অবশ্য পারার কথাও নয়। উঁচু দরজার পীরেরা মজ্জুব সেজে মানুষের কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করে রাখেন। বেলায়েত শাহ মরেননি। আউলিয়ারা কখনো মরেন না। জাহেরে মরলেও বাতেনে তারা জিন্দা থাকেন। জিন্দাপীর বেলায়েত শাহ কবরের পাশে আগুন জ্বালিয়ে তার কেরামতি জাহির করছেন।

সবার চোখের সামনে থেকে যেন একটা কালো পর্দা সরে গেল। ঠিকই তো! এতক্ষণ কারো মাথায় আসল কথাটাই এলো না! সেকান্তরের চোখমুখ এক অলৌকিক রোশনাইয়ে ভরে উঠল। শত শত মানুষ একবাক্যে মৌলবির কথার সমর্থন জানাল। এতক্ষণ তারা বেলায়েত পীরের কেরামতিকে খোদার গজব বলছিল বলে অনুতাপ জাগল তাদের মনে। তারা তওবা-এস্তেগফার পড়ল।

সেদিন বিকেলে আগের দিনের মতো সারা আকাশ মেঘে মেঘে চেয়ে গেল। তুমুল বৃষ্টিতে বুঝি প্রশমিত হলো বেলায়েত শাহর ক্রোধ, নিভে গেল তার কবরের আগুন। পরদিন বলীবাড়িতে আবারও মানুষের ঢল নামল। দূরদূরান্ত থেকে আগতরা কেরামতির আগুন দেখতে না পেয়ে আফসোস করল।

সেকান্তরালি আর দেরি করল না, বেটাদের নিয়ে শিরীষতলার জঙ্গল পরিষ্কারে লেগে গেল। বেলায়েত শাহর কবর থেকে গজানো কাঁটাবেউড়ের ঝাড়টা এবং যত আগাছা আছে সব কেটে সাফ করে দিতে হবে। এতদিন কবরটা এমন অযত্নে-অবহেলায় ছিল, ভাবতেও খারাপ লাগছে তার। যত দ্রুত সম্ভব জঙ্গলা পরিষ্কার করে কবরটাকে পাকা করে দিতে হবে।

এক সপ্তার মধ্যেই জঙ্গল সাফ। প্রতিদিনই লোকজন বেলায়েত শাহর কবর জেয়ারত করতে আসছে। একদিন কেউ একজন শিরীষ গাছের নিচের ডালটায় মানতের একটা রঙিন সুতো বেঁধে দিল। তার দেখাদেখি বাঁধল আরেকজন। অল্পদিনের মধ্যেই গাছটার নিচের ডালগুলো রঙিন সুতোয় ছেয়ে গেল। কবর পাকা করার জন্য টাকারও অভাব হলো না। হাটের এক আড়তদার কবরটা পাকা করে দিতে ইচ্ছুক। পীরের কবর পাকা করে দেয়ার মতো ছওয়াবের কাজ আর কী আছে। তা ছাড়া দর্শনার্থীরা কবরের সিথানে এবং শিরীষ গাছটার তলায় টাকা ফেলছে। রোজ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ থেকে দেড় শ টাকা তো পড়েই। সেকান্তরালি গাছের সঙ্গে কাঠের বড়সড় একটা দানবাক্স পেরেক মেরে টাঙিয়ে দিল।

পৌষ মাসে কবরটা পাকা হয়ে গেল। গ্রামের মোড়ল-মাতবরদের নিয়ে মাজার কমিটিও হলো একটা। টাকাপয়সা সব কমিটির কাছে জমা থাকছে। কবরের পাশে একটা মসজিদ-মক্তব উঠাতে হবে। মানুষ যেভাবে রোজ জেয়ারত করতে আসছে, আজ হোক কাল হোক, কবরের উপর একটা পাকা ঘর তো তুলতেই হবে।

বছর তিনেক পর হঠাৎ একদিন আবার আগুন দেখা গেল। তবে কবরে নয়, আগুন দেখা দিল এবার শিরীষ গাছটার উত্তরে। আষাঢ় মাস ছিল তখন। বেলায়েত শাহর ওফাতের মাস। মাসের একুশ তারিখে তার তাকিয়ায় দুটো গরু এবং চারটা খাসি জবাই দিয়ে প্রথমবারের মতো বড়সড় ওরসের আয়োজন করা হয়েছিল। গাছটার উত্তরে ওরসের খিচুড়ি রান্নার জন্য চুলা খোঁড়া হয়েছিল। চুলায় আগুন ধরাতে বাবুর্চি দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালতেই সারা চুলোয় আগুন ফোঁস করে উঠল। অল্পের জন্য বাবুর্চি বেঁচে গেল। আরেকটু কাছে থাকলে রেহাই পেত না বেচারা।

মাটি ফুঁড়ে ওঠা আগুন আর নিভল না, টানা দুদিন জ্বলতেই থাকল। বৃষ্টি না হলে দিনের পর দিন জ্বলতেই থাকত। বেলায়েত শাহ জিন্দাপীর, মানুষের মনে আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না। এই তবে চেয়েছিলেন তিনি? তিনি চেয়েছিলেন তার কবরটা পাকা হোক, তার ওফাতের দিনে বড়সড় ওরস হোক। এই আগুন নিশ্চয়ই তার কেরামতির আগুন। ওরসের তবররুক রান্নার জন্য তিনি আগুনের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তার কেরামতির আগুনেই তবররুক রান্না হলো।

সেদিন থেকে বলীবাড়ির তাকিয়া তল্লাটের একমাত্র দর্শনীয় স্থান হয়ে উঠল। জিন্দাপীর বেলায়েত শাহ তাকিয়ায় শুয়ে শুয়ে সারা তল্লাট শাসন করতে লাগলেন।


তিন

বহু বছর পর, কুড়ি-একুশ তো হবেই, গ্রামে আরেক আজগুবি কথা শোনা গেল। কোশাভাঙা খালের দক্ষিণের বড় মাঠটায় নাকি গ্যাসফিল্ড হচ্ছে। ওখানে বেশ বড়সড় একটা গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান পেয়েছে সরকার। শীঘ্রই গ্যাস উত্তোলন শুরু হবে। বিঘার পর বিঘা জমি একোয়ার করা হচ্ছে। মাঠের মাঝখানে মাটি ভরাট করে গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানির একটা অফিস তোলা হয়েছে। জেলাশহর থেকে ফিল্ড ইনচার্জ মি. ডেভিড পোলিয়া রোজ গাড়ি হাঁকিয়ে অফিস করতে আসেন। সারা দিন কাজ করে সন্ধ্যার পর আবার ফিরে যান। গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানির গাড়ি যাতায়াতের সুবিধার্থে কোশাভাঙা খালের ওপর ব্রিজ হচ্ছে। রাস্তাটায় বালি ফেলে ইট বসানো হচ্ছে, শীঘ্রই পাকাকরণের কাজ শুরু হবে। শোনা যাচ্ছে, জাতীয় গ্রীডে গ্যাস সরবরাহ করতে ত্রিশ মাইলের পাইপ লাইনও নাকি স্থাপন করা হবে। আপাতত মাঠজুড়ে কোম্পানি দ্বিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ চালাচ্ছে। কোম্পানি ধারণা করছে এই গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় পঞ্চাশ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ থাকতে পারে। বিরাট প্রকল্প। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো উদ্বোধন হয়নি। প্রকল্প উদ্বোধন করতে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকা থেকে বড় একজন মন্ত্রী আসবেন।

কিন্তু সমস্যা বাধল গ্যাসকূপের মুখ খনন নিয়ে। মুখটা ঠিক কোন জায়গায় কিছুতেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মুখ খুঁজে পাওয়া না গেলে তো উত্তোলনকূপ খনন করাটা মুশকিল হয়ে পড়বে। যত্রতত্র খনন করে মুখ তৈরি করতে গেলে গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। বড় বড় গ্যাসফিল্ডে বিস্ফোরণ ঘটার নজির আছে। ডেভিড পোলিয়া অভিজ্ঞ লোক, এসব বিষয়ে তিনি খুব সতর্ক।

টানা তিন মাস জরিপ চলল খালের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ প্রান্তরজুড়ে। একদিন শোনা গেল খালের উত্তরেও নাকি জরিপ চালানো হবে। ডেভিড পোলিয়া বলছেন, খালের দক্ষিণের তুলনায় উত্তরে গ্যাসের মজুদ বেশি। উত্তোলনকূপ খনন করতে হলে উত্তরেই করতে হবে। তার ধারণা, খালের আশপাশে কোথাও একটা মুখ থাকতে পারে।

খালের পাড় থেকে উত্তরে চার মাইল পর্যন্ত জরিপ এলাকা নির্ধারণ করা হলো। যথাসময়ে জরিপ কাজও শুরু হলো। গ্রামবাসী তো রীতিমতো বিরক্ত। সত্যি যদি মাটির নিচে গ্যাস থেকে থাকে তাহলে তো গ্রাম থেকে উচ্ছেদ করা হবে তাদের। ভারি তো বিপদের কথা! পূর্বপুরুষের গ্রাম ছেড়ে তারা কোথায় যাবে? কিন্তু সরকারি কাজ বলে কথা, সরকার উচ্ছেদ করলে কার বাপের সাধ্য বাধা দেয়ার! সব জমির মালিক সরকার, পুরো দেশটাই তো সরকারের। গ্রামের চাষাভুষাদের কী সাধ্য সরকারি হুকুম অমান্য করবে।

তা সেদিন জরিপ চলছিল বলীবাড়ি ও তার আশপাশের এলাকায়। বেলায়েত শাহর তাকিয়াও বাদ গেল না। আষাঢ় মাস। কদিন পরই তাকিয়ায় ওরস। তার আগেই বলীবাড়িতে জরিপের কাজটা শেষ করতে চান ডেভিড পোলিয়া। যন্ত্রপাতি নিয়ে কোম্পানির লোকেরা কাজ করছে, ডেভিড পোলিয়া শিরীষতলার উত্তরে একটা চেয়ারে বসে সিগারেট ফুঁকছেন। পীরের থানে সিগারেট খাওয়াটা ভালো ঠেকল না সেকান্তরের বড়বেটা এখলাসের। বাধা দিতে চেয়েছিল একবার। কিন্তু পোলিয়ার আশপাশে বড় বড় অফিসারদের ভিড়। তার মতো একটা গেঁয়ো হাদাগোবিন্দ গিয়ে পোলিয়ার মতো এত বড় একজন অফিসারকে সিগারেট খেতে বারণ করার মতো সাহস করে উঠতে পারল না।

তখন দুপুর। জোহরের আজানের সময় হয়েছে। তাকিয়ার পেছনে মসজিদের অজুখানায় বসে এখলাস নিজ চোখে দেখল, ডেভিড পোলিয়া সিগারেটে শেষ টান দিয়ে আনমনে গোড়ালিটা দূরে ছুঁড়ে মারলেন। সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে জ্বলে উঠল আগুন, শেষবার যেখানে মশালের মতো অগ্নির উদগিরণ ঘটেছিল ঠিক একই জায়গায়। সাপের জিবের মতো লিকলিক করছে অগ্নিশিখা। এখলাস শোর-চিৎকার করে সারা গ্রাম মাথায় তুলল। নিশ্চয়ই বেলায়েত শাহ আবার খেপেছেন। খেপবেন না? ইহুদি-নাসারা এসে তাকিয়ার পবিত্রতা নষ্ট করলে খেপাটাই স্বাভাবিক। পুড়িয়ে যে মারেননি নাসারাটাকে, তা তো তার সৌভাগ্য।

বেলায়েত শাহর কেরামতির আগুন দেখতে বলীবাড়িতে আবার মানুষের ঢল নামল। দলে দলে মানুষ আসছে আর ডেভিড পোলিয়াকে গালাগালি করছে। পোলিয়া হে হে করে হাসেন। তিনি কি আর ওসব গ্রাম্য গালিগালাজ বোঝেন!

পরদিন সকালে বলীবাড়িতে থানাপুলিশ এলো। গ্রামবাসী তো অবাক। বেলায়েত শাহর তাকিয়ায় আগুন তো নতুন জ্বলছে না। কখনো তো পুলিশ আসেনি!


বেলা বাড়ার পর আরেক আজগুবি কথা শোনা গেল, কোশাভাঙা গ্যাসকূপের বহু কাঙ্খিত মুখ নাকি খুঁজে পাওয়া গেছে। কোথায় মুখটা? বলীবাড়ি ছাড়া কোথায় আবার! ঠিক শিরীষ গাছটার তলায়, যেখানে সাপের জিবের মতো অগ্নিশিখা লিকলিক করছে। কয়েকদিনের মধ্যেই কবর স্থানান্তর করে উত্তোলনকূপ খননের কাজ শুরু হবে।

লেখক পরিচিতি 
স্বকৃত নোমান 

স্বকৃত নোমান বাংলা ভাষার প্রতিশ্রুতিশীল ঔপন্যাসিকদের মধ্যে অন্যতম। জন্ম ১৯৮০ সালের ৮ নভেম্বর―ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বিলোনিয়ায়। বাবা মাওলানা আবদুল জলিল ও মা জাহানারা বেগম। ১১ ভাইবোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। স্ত্রী নাসরিন আক্তার নাজমা ও কন্যা নিশাত আনজুম সাকিকে নিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন, এরপর তিনি স্বউদ্যোগে ধর্মীয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসেন। তাঁর গল্প-উপন্যাসে একাঙ্গ হয়ে থাকে গ্রামবাংলার বিচিত্র মানুষ, প্রকৃতির বিপুল বৈভব, ইতিহাস, সমকাল, পুরাণ, বাস্তবতা ও কল্পনা। এখন পর্যন্ত তার ছয়টি উপন্যাস এবং একটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়া আরও সাতটি অন্যান্য গ্রন্থ আছে তার লেখা। উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে নাভি, বংশীয়াল, জলেস্বর, রাজনটী, বেগানা ও হীরকডানা। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় গল্পগ্রন্থ ‘নিশিরঙ্গিনী’। 

বর্তমানে তিনি সংবাদ ম্যাগাজিন ‘এই সময়’-এর সহকারী সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় কর্মরত। ২০০২ সালে দৈনিক আজকের কাগজের পরশুরাম উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু। ২০০৪ সালে ম্যাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি)-এর ফেলোশীপ লাভ করেন। ২০০৬ সালে প্রয়াত নাট্যকার সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে যোগদান করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে সংবাদ ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’-এর স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে আবার সাংবাদিকতায় যোগ দেন। এছাড়া তিনি ‘সম্প্রীতি’ [সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক মাসিক পত্রিকা]-এর সম্পাদক। ‘রাজনটী’ উপন্যাসের জন্য ২০১২ সালে এইচএসবিসি-কালি ও কলম কথাসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তার ‘বেগানা’ ও ‘হীরকডানা’ উপন্যাস দুটি পাঠকনন্দিত। এবারের একুশে বইমেলায় জাগৃতি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে তার সপ্তম উপন্যাস ‘কালকেউটের সুখ’।

২টি মন্তব্য:

  1. স্বকৃত নোমান গল্প বলার ঢং টি ভালো লাগে। সাবলিল ও সুপাঠ্য। এই গল্পটিতেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি।

    উত্তরমুছুন
  2. গল্পটি সুপাঠ্য তো বটেই। যে কারো মন কারতে সক্ষম। তবে গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হল শেষটা কি হবে সেটা আমি জানি।

    উত্তরমুছুন