বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

খামার

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

আজকাল অনেক বড়োলোককে দেখি, একটা বিলাসের পেছনে বেশ টাকা ও সময় ঢালেন, কৃষিবিজ্ঞানী জামিল আহমেদ যার নাম দিয়েছেন ‘খামারবাড়ি বিলাস’।এই নামে তিনি প্রথম আলোতে একটা রম্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তবে জামিল সাহেবের প্রবন্ধ না পড়লেও আমি জানতাম, এই বাগানবাড়ি, এই কৃষিখামার অথবা এই ডেইরি-পোল্ট্রি ফার্ম করাটা বেশকিছু মানুষের জন্য একটাপছন্দের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেমন আমার বন্ধু আলমগীরের সিঙ্গাইরে তার একটা বিশাল খামারবাড়ি আছে। সেটিকে বলা যায় মৎস্য-কাম-সবজি-কাম দুগ্ধখামার। সেই খামারবাড়ি থেকে সে ঢাকার বাজারে লাউ, করলা, কুমড়ো, পালং শাক- এসবের যোগান দেয়। আবার বিদেশেও চালান দেয়। সপ্তাহে-দুই সপ্তাহে একবার সে সিঙ্গাইর যায়। একজন ম্যানেজার আছে তার কাজ দেখাশোনার, তাকে আদেশ-উপদেশ দিয়ে আসে। আমার বন্ধুকে অ্যাবসেন্টি ল্যান্ডলর্ড বলা চলে, নতুন ঘরানার। তবে মোবাইল ফোনের যুগে দূরে থেকেও তো কাছে থাকা যায়। উপস্থিতি-অনুপস্থিতির মধ্যে ফারাকটা অনেকটা মিটিয়ে ফেলা যায়। যাইহোক, আমার বন্ধুর খামারের যে আয়তন, তা প্রায় পুরো কলতাবাজারের সমান! সেই খামারে দু-একবার আমি গিয়েছি এবং খামার বাড়িটা দেখে আমার মাথা ঘোরার জোগাড় হয়েছে। টালির ছাদ দেওয়া দু’তলা দালান, কাঠের মেঝে, সাত শোবার ঘর, চার বাথরুম। ফ্রিজ, টিভি, এসি’ কী নেই সেই বাড়িতে? তিন বাবুর্চি আছে রান্নার জন্য। পাঁচ বেয়ারা আছে রান্না করা খাবার টেবিলজাত করার জন্য। আহা!

তবে আমার এ গল্পটি ওই বন্ধুকে নিয়ে নয়। কাজেই তার খামারবাড়ির বর্ণনা এখানেই শেষ করা যাক। কিন্তু শেষ বললেই কি সব শেষ হয়? নাকি আমার বন্ধুকে এই গল্প থেকে দূরে রাখলেই সে দূরে থেকে যায়? একটা গল্পের সুতো যে আরেক গল্পে ঢুকে যায় যখন-তখন, একটা গল্পের হাওয়া যে ঘূর্ণি তুলে ফেরে আরেক গল্পের মাঠে, তা কি আপনারা খেয়াল করেন নি?

যেমন- আমার এই গল্পের প্রোটাগনিস্ট ইউসুফ হাসান সাহেবের সঙ্গে আমার বন্ধু আলমগীরের কোনো সম্পর্ক নেই। হাসানের বাড়ি ভালুকা। সিঙ্গাইর থেকে অন্তত এক ভূগোল দূরে। হাসান সাহেব বিপত্মীক, আমার বন্ধুর স্ত্রী এবং তিন সন্তান বর্তমান। হাসান সাহেব দীর্ঘদিন আমেরিকায় থেকে অসংখ্য ডলার কামাই করে দেশে ফিরে ভালুকায় চল্লিশ বিঘা জমি কিনে খামার বানিয়েছেন। আর আমার বন্ধু সিঙ্গাইরে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া কুড়ি বিঘা জমির সঙ্গে নানা প্রক্রিয়ায় আরো পঞ্চাশ বিঘা যুক্ত করে তার খামার গড়ে তুলেছে। এম এ পাস করে কিছুদিন মাস্টারি করেছে, তারপর তরকারি রফতানি ব্যবসায়ে নেমেছে। সে ব্যবসায় কিছু পুঁজি হলে খামার ব্যবসায়ে নেমেছে। তবে একটা মিল বা সম্পর্ক তাদের অবশ্য রয়েছে : দুজনেরই আছে শানদার খামারবাড়ি- ওই দুতলা কাঠের মেঝে, তিন বাবুর্চি, চার বাথরুম ও পাঁচ খানসামাঅলা বাড়ি। দুজনই তারা মাঝেমধ্যে বন্ধুবান্ধব ডেকে ভোজের আয়োজন করে। ঢাকা থেকে গানঅলা বাজনাঅলারা যান। গান গল্প আড্ডা-ফূর্তি হয়। হাসান সাহেব অবশ্য আমার বন্ধুর তুলনায় অনেক বেশি উদ্যোগী মানুষ। কাজেই তার খামারে জীব ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বেশি, উৎপাদন বেশি, কাজেই আয়ও বেশি।

হাসান সাহেব বিপত্মীক হয়েছেন ভাগ্যের ফেরে। তার পত্মী যখন কুড়ি বছরের পুরনো, তখন তিনি নিউইয়র্কের উডহ্যাভেন সাবওয়ে স্টেশনে পাতাল ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে মারা যান। মিসেস হাসান কিছুটা অপ্রকৃতিস্থ ছিলেন। সন্তান ধারণে অক্ষম বলে বরাবর ডিপ্রেশনে ভুগতেন। তিনি বলতেন, কুড়ি বছর চেষ্টা করেও সন্তান হলো না, এ জীবন রেখে কী লাভ? তবে তিনি আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন এ রকম কেউ বলতে পারবে না, তার ডাক্তারও জোর দিয়ে বলেছেন, না, ডলি হাসান আত্মহত্যাপ্রবণ ছিলেন না। ডলি মারা গেলে ইউসুফ হাসান ইন্স্যুরেন্সের সাত লাখ ডলার পেয়েছিলেন। পুলিশ এজন্য প্রথমে হাসানকে সন্দেহ করলেও পরে যখন দেখল নয় বছরের পুরনো বীমা, তখন কিছুটা বিব্রত হয়েই সন্দেহের তীর ফিরিয়ে নিল। এ রকম ক্ষেত্রে স্ত্রীর বড়ো অংকের বীমার টাকার পরিকল্পনায় যদি স্বামী বেনেফিশিয়ারি এবং একই সঙ্গে হন্তারক হয়, তাহলে সেই বীমা থাকে কয়েক মাস, বড়োজোর এক বছরের পুরনো। তবুও, স্ত্রী মারা যাবার কয়েক দিন আগে থেকে হাসান সাহেবের আচরণ যে কিছুটা সন্দেহজনক ছিল সে কথা এক প্রতিবেশী বলেছে। তবে প্রতিবেশীকে কি আর সবসময় বিশ্বাস করা যায়, বিশেষ করে যদি সেই প্রতিবেশী হাসান সাহেব থেকে নেওয়া দশ হাজার ডলারের ঋণ ফেরত না দেওয়ার একটা মোক্ষম উপায় হিসেবে তার স্ত্রী-হত্যার দায়ে কারান্তরালে চলে যাওয়াকে বিবেচনা করতে থাকে।

ইউসুফ হাসান একই সঙ্গে বিপত্মীক ও নিঃসন্তান হওয়ায় আমেরিকার সঙ্গে বাড়ির যোগাযোগ ছিল না। কাজেই সতেরো বছরের প্রবাস জীবনের শেকড়সুদ্ধ তুলে নিতে তার কষ্ট হয় নি। বরং ঢাকায় এসে তার ভালোই লেগেছে, শুধু তাপ, ধূলোবালি, পল্যুশন এবং মশা বাদ দিয়ে। অবশ্য ভালুকায় গিয়ে তিনি আরো ভালো বোধ করেছেন সেখানে শুধু তাপ ও মশা থাকল সমস্যা হিসেবে। কিন্তু উন্নতমানের পতঙ্গনাশক ব্যবহার করে তিনি শিগগিরই মশা নির্মূল করলেন, এবং খামারবাড়ি বানিয়ে ঘরে ঘরে এসি লাগিয়ে বছরে সাত মাসব্যাপী তাপ সমস্যারও সমাধান করে ফেললেন। অতঃপর ‘ডলি খামার’-এর জীবন তার জন্য প্রচুর আনন্দময় হয়ে উঠল।

তিনি তার ডায়েরিতে লিখলেন, ‘ডলির স্মৃতি আমার হৃদয়জুড়ে। এই খামারে সে থাকলে কী যে ভালো হতো! কেন যে আগে ভাবি নি। যাহোক, এখন এই মাটি, এই জল-হাওয়া আমার জীবন। এই খামারের কর্মচারী ও তাদের পরিবারের সকলে আমার প্রাণ। তাদের সেবায় আমি জীবন উৎসর্গ করলাম।’ হাসান সাহেবের খামারে আশিজন মানুষ কাজ করে। তিনি তাদের ভালো বেতন দেন। তাদের নানান সুযোগ-সুবিধাও দেন। একটা ছোটো স্কুল করে দিয়েছেন খামারের বাচ্চাদের পড়াশোনার জন্য, দুজন শিক্ষিকাও রেখেছেন। একটা কামরায় একটা লাইব্রেরিও করে দিয়েছেন। একজন আবাসিক ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছেন বেশ বড়ো বেতন দিয়ে। তিন মাস আগে খামারের পুরনো কর্মচারী আতর মিয়া টাইফয়েডে মারা গেলে তার স্কুলপড়–য়া মেয়েটিকে তিনি অনানুষ্ঠানিকভাবে দত্তকও নিয়েছেন।

তিনি ডায়েরিতে লিখলেন: ‘মায়াকে দেখে মনে হয় না আতর মিয়ার মেয়ে। যথেষ্ট স্মার্ট। প্রথমে ঠাহরও হয় নি যে মেয়েটি সুন্দরীও। কিন্তু শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে স্নো পাউডার মাখিয়ে ভালো কাপড়-চোপড় পরিয়ে দিলে তাকে দেখে বারিধারা-গুলশানের যেকোনো বাড়ির ক্লাস টেন পড়ুয়া মেয়ে মনে হয়। মায়াকে পেয়ে আমার তৃষিত পিতৃহৃদয় যেন শান্তিবারিতে সিক্ত হলো।’

ইউসুফ হাসানকে শুধু মায়া নয়, খামারের সকল কর্মচারী পিতৃজ্ঞান করে। মায়া তাকে ডাকে বাপী। সে তার মাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাপী আজ আমাকে দুটো বই দিয়েছে। হুমায়ুন আহমেদের। আমি যে হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের পোকা, বাপী কীভাবে তা আন্দাজ করল, মা?’

মা বললেন, ‘ভালো মানুষেরা মানুষের মনের কথা বুঝতে পারে’। মায়া জিজ্ঞেস করল, ‘ভালো মানুষেরা কি মানুষের মনের ভিতরটাও দেখতে পায়, মা?’

মা মাথা নাড়লেন। ‘পায়।’

মায়া ভাবল, বাবার সঙ্গে জীবনটাতে কোনো সুখ ছিল না। বাবা ঈদে একটা জামাও কিনে দিতে পারত না কখনো দেয়ও নি। যেটুকু তার জামা কাপড়, বড়ো মামা-ই দিয়েছেন। আর শ্যাম্পু স্নো পাউডারের তো প্রশ্নই ওঠে না। অথচ মায়া যখন যা চায়, বাপী কিনে আনে। বাপীর সঙ্গে অনেক কথাও বলা যায়। যা কখনো বাবার সঙ্গে বলা হয় নি তার, হয়ত সম্ভবও ছিল না। আর, তার কথাগুলো কী মন দিয়ে যে শোনেন বাপী!



ইউসুফ হাসান ডায়েরিতে লিখলেন, ‘একই সঙ্গে পিতা এবং শিক্ষক হওয়ার আনন্দটাই আলাদা। মায়া যে কত কিছু জানে না, ভেবে অবাক হই। কাজেই সেসব তাকে শেখাতে হচ্ছে। সামনে তার ম্যাট্রিক পরীক্ষা। পরীক্ষার বিষয়গুলোই আপাতত পড়াব তাকে। তবে ম্যাট্রিকের পর জীবন সম্পর্কে কিছু পাঠ দেব এই সরল কন্যাটিকে।’

শুরুতে বাংলাদেশের নতুন খামার-মালিকদের যে নব্য অ্যাবসেন্টি ল্যান্ডলর্ড বলে বর্ণনা করেছি আমি, যা কিঞ্চিৎ সামান্যকরণ দোষে দুষ্ট, ইউসুফ হাসানের ক্ষেত্রে তার সামান্য সংশোধনী দরকার। গোড়ার দিকে তিনি সপ্তাহে এক-দু দিন ভালুকায় থাকলেও এখন থাকেন প্রায় প্রতিদিন। ঘনিষ্ঠ তদারক করেন কাজকর্মের। ফলে তার খামারের উৎপাদনে জোয়ার এসেছে। আর যত তার আয়, তত কর্মচারীদের লাভ। ছোটোখাটো বোনাস, এটা সেটা-নতুন বেনিফিট।

তুলনায় আমার বন্ধু আলমগীর অনেকটাই অ্যাবসেন্টি। সপ্তায়-দুসপ্তায় চার পাঁচ দিন থাকে সিঙ্গাইরে। তবে যতক্ষণ থাকে, কাজে ডুবে থাকে। আর রাতে খামারবাড়িতে তার অফিসঘরে বসে কাজকর্মের খতিয়ান লিখে রাখে। যেমন- এক রাতে সে লিখল, ‘যৌথ খামারের স্বপ্নটা স্বপ্নই রয়ে গেল। শুরু করেছিলাম একটা আদর্শ দিয়ে, চললও কিছুদিন। কিন্তু এক সিজন খরায় আর পতঙ্গে সব ফলন নষ্ট হলো, গরু মরল, মুরগি মরল রোগে। আর সকলে মিলে এসে ধরনা দিল, সায়েব এই রকম মালিকানা চাই না। বরং মাসে মাসে বেতন দেন। তাতেই খুশি। অবাক ব্যাপার, মানুষ একটা স্বপ্নকে ছোঁয়ার জন্য হাত বাড়াবার কষ্টটাও স্বীকার করতে চায় না।’

ঘটনাটা আমি জানি। সে সময় আলমগীরের খামারে আমি তিন দিনের এক লেখালেখির মিশনে হাজির হয়েছিলাম। খামার ব্যবসার গোড়াতে আলমগীর ব্যবস্থা করেছিল, সকল কর্মচারীর একটা মালিকানাস্বত্ত্বের, ১০ বিঘা জমি ও সকল জীবজন্তু ও ফলনের ওপর। কিন্তু বয়স্ক কর্মচারীরা বোঝাল তরুণ কর্মচারীদের, ‘এর মধ্যেই একটা প্যাঁচ রইয়া গেছে। পরে দেখবা, আমাগো মালিকানা বলতে হাতে আসব যে কয়টা টেকা, সেই কয়টা টেকা অন্যখানের আধা মাসের বেতনের সমানও না।’

এক সন্ধ্যায় খামারবাড়ির দু তলার বারান্দায় বসে গাগরি নদীর স্রোত দেখতে দেখতে আমাকে দুঃখভরা গলায় বলল আলমগীর, ‘দ্যাখ ভাই আমার ড্রিম ওয়ার্কের কী অবস্থা! সবাই সবকিছুতে প্যাঁচ খোঁজে। আমি ছোটো একটা ক্লিনিক করে দিলাম, বললাম, প্রতিবার ডাক্তার দেখাতে এলে এক টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হবে, যাতে একটা ওনারশিপ ডেভেলপ করে তাদের মধ্যে, কিন্তু সবাই খুব যেন দুঃখ পেল এই ব্যবস্থাতে। বলল, সায়েব গরিবের সামান্য অসুখবিসুখ তার ওপর ট্যাক্স বসান কেন? বুঝলি, মানুষ সব ফ্রি চায়। কালেকটিভ ওনারশিপ চায় না। জিনিসটা বোঝেও না, শুধু বোঝে প্রাইভেট ওনারশিপ।’

আলমগীর কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন করত। মণি সিংহের কম্যুনিস্ট পার্টি করত। তার হয়ে আমি কথা দিতে পারি আপনাদের, বছর দু-তিন খামার চালাতে গিয়ে সে আসলেই একটা আদর্শকে লালন করেছে। কিন্তু চরম অকৃতকার্য হয়েছে। এরপর থেকে সে প্রচলিত বাজারের নিয়মে চলেছে। মাসোহারা, বেতন, বোনাস, সুযোগ-সুবিধা। কর্মচারীরা খুশি। একদিন সবচেয়ে চতুর কর্মচারী আলাউদ্দিন- যে শুরুতে তরুণ কর্মচারীদের বলেছিল, সায়েব একটা প্যাঁচ কষতাছে, সাবধান, এসে বলল, ‘সায়েব, এবার ভুট্টা ফলান। বাজারে ভুট্টার চড়া দাম।’ কথাটা সত্যি, কথাটা আমিও জানি। দেশের পোল্ট্রি খামারগুলোর জন্য হাজার হাজার মণ ভুট্টার প্রয়োজন। কিন্তু উৎপাদন কম বলে ভারত থেকে কিনে আনতে হয়। আলমগীর বলল, ‘ভুট্টার জন্য জমি দিতে পারব না। জমি নাই।’ আলাউদ্দিন বলল, ‘জমি আছে। ইসমাইল মিয়াজির জমি।’ আলমগীর বলল, ‘সে বিক্রি করবে না। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম।’ আলাউদ্দিন বলল, ‘দাম পাইলে একশবার বিক্রি করবে।’ ‘মনে হয় না,’ আলমগীর বলল। ‘জমিটা সায়েব, আলাউদ্দিন চোখে কিছুটা চালাক আলো ছড়িয়ে বলল, ‘শুধু মিয়াজির না। তার দুইটা ভাই আছে না? ওদেরগো ও ঠগাইছে না? সেই দুই ভাইরে ডাহেন। কথা কন ওগো লগে।’

আলমগীর বলল, ‘না, অত ভেজালের দরকার নাই।’ এর কিছুদিন পর এক রাতে আলমগীর তার খতিয়ানে লিখল: ‘এ দেশে যেখানে এক কাঠা জমি নিয়ে খুনাখুনি হয়, সেখানে ১৫ বিঘা জমি তো বিরাট ব্যাপার। দুই ভাইকে ঠকিয়ে একাই ভোগ করছিল ইসমাইল মিয়াজি। দুই ভাই বোধহয় এবার শোধ নিল। গাগরি নদীর পোয়ামাইল ভাটিতে তার মৃতদেহ ভেসে উঠেছে। আহা! পুলিশ ধারণা করছে, দু’ভাই মেরেছে। কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। কনফুসিয়াস এজন্যই বলেছিলেন, ‘যে জমিতে পা রাখবে, সে জমিতেই শুয়ে পড়তে হবে। জমি এমনই ক্ষমাহীন এক চুম্বক।’

আলমগীর কনফুসিয়াসের নামে যে কথাগুলো চালিয়ে দিল, সে কথাগুলো আসলে লাইৎসুর। তেরো শতকের চৈনিক দার্শনিক। কিন্তু ভুল উদ্ধৃতি দিলেও আলমগীর একটা সত্য অনুধাবন করেছিল, এবং তা ছিল এই যে, বাংলাদেশের মতো একটা জমি-অভাবী দেশে জমিই হতে পারে জীবন, হতে পারে মৃত্যু।

ইউসুফ হাসানের গল্প থেকে এতদূর চলে আসায় দুঃখিত। তবে হাসানের গল্প অনেকটা সময় নিয়ে তৈরি হচ্ছে। সেজন্য কিছুটা সময় বাইরে ঘোরাঘুরি করতে পারি। এখন তাহলে চলুন। তার গল্পটা একটা মাঝামাঝি পর্যায়ে এসেছে, এখন কোনো একটা দিকে মোড় নেবে। আপনারা নিশ্চয় লক্ষ করেছেন, খামারবাড়িগুলোতে সময় যেন আটকে থাকে। সেখানে সময় চলে রাজউকের (প্রায়ই নষ্ট থাকা) ঘড়ির কাটায় নয়, চলে শস্যের এবং প্রাণিকুলের জৈব ঘড়ির কাঁটায়। সে ঘড়িতে চব্বিশ ঘণ্টা হয় চল্লিশ-আশি ঘণ্টাতে। কিন্তু হাসানের কাছে তবুও এই ঘড়ি বেশ দ্রুত মনে হলো, তিনি তার ডায়েরির পাতায় লিখলেন, ‘মায়া এক অবাক মেয়ে। সে আমাকে, যাকে বলে পয়েন্ট ব্ল্যাংক নানান বিব্রতকর প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে। যেমন সেদিন জিজ্ঞেস করল, বাপী আমি যদি কাউকে ভালোবাসি, ধর একটা ছেলেকে, তাহলে তার সঙ্গে লিভটুগেদার করাটা কি খারাপ? বিয়ে না করে কি একত্রে থাকা কোনো গর্হিত কাজ? বুঝলাম, মায়া বড়ো হচ্ছে। তার নানা জিজ্ঞাসার সঙ্গে চাহিদাও বাড়ছে। সেদিন সে আমার থেকে দু হাজার টাকা চাইল। প্রথমে দিতে চাই নি। কিন্তু এমনভাবে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বাপী বলল, আমি একদম গলে গেলাম।’

আরো দু’মাস পর হাসান লিখলেন, ‘আমি কি আতর আলীর গিন্নির সঙ্গে কথা বলব? বলা নিশ্চয় উচিৎ। মায়া সেদিন অবাক একটা প্রশ্ন করল আমাকে, আচ্ছা বাপী, আমি যদি তোমার সত্যিকার মেয়ে হতাম, তা হলে কত বছর বয়স পর্যন্ত আমাকে গোসল করিয়ে দিতে?’

আমি তাকে বললাম, তুই আমার সত্যিকার মেয়ে না এমন কথাটা বলতে পারলি? এই আমার তোর সঙ্গে সম্পর্ক?

মায়া চোখ বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে থাকল, আমার কথার কোনো উত্তর সে দিল না। বাথরুমে একদিন আমাকে বাথটাবটা ভরতে দেখে সে জিজ্ঞেস করেছিল, ছোট্ট বাচ্চারা এতে ডুবে যেতে পারে কি না। আমি বলেছিলাম, বাবার হাত ফসকে কোনো বাচ্চা টাবে ডুবে যায় না। কথাটা নিয়ে নিশ্চয় মায়া অনেক ভেবেছে।

এই প্রশ্নের কি কোনো উত্তর আমার জানা আছে? মায়ার প্রশ্নে চোখের সামনে কিছু ব্যথা কিছু অনুপস্থিতির নাচন দেখলাম। একটা ছোট টাব, পানি টলটল করছে। সেখানে নামাচ্ছি ছোটো হাত ছোটো পায়ের এক মানব-শিশুকে। তার নরম শরীরে বুলিয়ে দিচ্ছি পানির নাতিউষ্ণ আরাম। আহ্। আমি বুকে কষ্ট ধরে রেখে বললাম, বাবারা কত বছর বয়স পর্যন্ত মেয়েদের গোসল করিয়ে দেয়, এ কথা তুই তোর মাকে বরং জিজ্ঞেস করিস। হাসান সাহেবের জীবনে বেশ জটিলতা শুরু হয়েছে। মায়া কলেজে ভর্তি হয়েছে ঢাকায়। বেশিরভাগ সময় সে ঢাকাতে হোস্টেলে থাকে। হাসান সাহেবও মেয়েকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য ঢাকাতে সপ্তাহে দু-তিন দিন থাকেন। বাবা-মেয়েতে মিলে চায়নিজ খান, সিনেমা দেখেন, শপিং করেন। হাসান সাহেব দেখছেন, শপিংটা একটা আনন্দদায়ক ঘটনা বটে। আমেরিকাতে তিনি শপিং করাকে অপছন্দ করতেন। অথচ এখন নিত্য শপিং করেন। মেয়ের জামা-কাপড়, শাড়ি, গয়না, কসমেটিকস, জুতা, কত কি। বারিধারায় তার ফ্ল্যাটের একটা ঘর ভরে গেছে মায়ার জিনিসপত্রে। মায়া মাঝেমধ্যে রাতে থাকে, বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। তারপর বাবার পাশে একটা বাচ্চার মতো কুঁকড়ে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

সে তুলনায় আমার বন্ধু আলমগীরের জীবনে জটিলতা কম, অথবা, কম না হলেও, ভিন্ন। ইসমাইল মিয়াজির ১৫ বিঘা জমি কেনা হয়ে গেছে, ভুট্টা চাষের আয়োজনও চলছে। কিন্তু এরই মধ্যে আলাউদ্দিন আরো জমির তালাশ নিয়ে এসেছে। তবে আলমগীর কিছু উদ্বেগজনক খবর পেয়েছে, সিঙ্গাইরের দু-তিন গ্রামের মানুষজন নাকি আলাউদ্দিনকে দেখলে ভয়ে পালায়। সে কারো বাড়ি গেলে দরোজা লাগিয়ে দেয়। দু-তিন দিন তাকে থানার হাবিলদারের সঙ্গে ঘুরতেও দেখা গেছে।

এক রাতে হাসান সাহেবের খামারবাড়িতে হৈ হৈ করে খামারের কিছু কর্মচারী এবং গ্রামের মানুষ ঢুকে পড়ল। সকলের সামনে আতর আলীর বিধবা স্ত্রী। হাসান সাহেব হৈ হৈ শুনে বারান্দায় নেমে এসেছিলেন। মানুষগুলোর সামনে দাঁড়াতেই তিনি শুনলেন, আতর আলীর স্ত্রীর ফরিয়াদ, ‘আমার মাইয়াডারে ফিরাইয়া দেন স্যার।’

হাসান সাহেব কিছুই বুঝতে পারলেন না। কাজেই কী বলবেন, আতর আলীর স্ত্রী এবং অন্যান্য মানুষকে? কিন্তু তাকে কিছু বলতে হলো না, মায়া তার পেছনে পেছনে দু তলা থেকে নেমে এসে বলল, ‘না, আমি বাপীর সঙ্গে থাকব। বাপীকে ছেড়ে যাব না।’

মায়াকে একজন শক্তিশালী পুরুষ, তার বড়ো মামা, হাত ধরে টানতে থাকলেন। ‘গরিবের মাইয়া গরিবের ঘরে ফির‌্যা আয়। ধনীর ঘরে বান্দীগিরি করন লাগব না। আয়,’ বলে বড়ো মামা জোর করে মায়াকে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে চলে গেলেন। হাসান সাহেব ভীষণ ক্রদ্ধ হলেন। তিনি লোকগুলোর অভিযোগের মর্মার্থ ধরতে পেরে লজ্জায়-ঘৃণায়-রাগে দিশাহারা হয়ে পড়লেন। তাছাড়া, তারই ক’জন কর্মচারী ঢিল মেরে তার জানালার কাঁচ ভেঙ্গেছে, ফুলের গাছ উপড়ে দিয়েছে, অশ্লীল স্লোগান দিয়েছে। এটা কী করে সহ্য করা যায়?

তিনি পরদিন পুলিশ ডাকলেন। আশ্চর্য, পুলিশ আমার বন্ধু আলমগীরকেও ডাকতে হলো। কারণটা অবশ্য ভিন্ন, খামারের পশ্চিমদিকের যে খালটা কিছুটা দক্ষিণে গিয়ে গাগরি নদীতে পড়েছে, সে খালে একদিন ইজ্জত আলীর মৃতদেহ ভেসে উঠল। ইজ্জত আলী তার আড়াই একর জমি বিক্রি করতে চায় নি। অথচ আলাউদ্দিন বলেছে এবং আলমগীর তার বক্তব্যের যুক্তিটা অস্বীকার করতে পারে নি, যদি অস্ট্রেলিয়ান ৪০ গরু আনতেই হয় এই খামারে, তবে ওই জমিটুকু দরকার। ওই জমির ঘাসগুলো দেখেন স্যার। এই কিসিমের ঘাস বাংলাদেশের কোথাও পাইবেন না।

কিন্তু ইজ্জত আলীর বিধবা স্ত্রী আর শ্যালক মিলে গোটা তিরিশেক মানুষ নিয়ে হামলা করেছে আলমগীরের বাগানবাড়িতে। পুলিশ একে হামলাই বলেছে, যদিও আলমগীর স্বীকার করেছে, তাদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না। ‘কিন্তু ভাই,’ আলমগীর আমাকে বলেছে, ‘চাদরের নিচে যে দু-একটা দা লুকিয়ে আনেনি তারা, সেটা হলপ করে কীভাবে বলতে পারি?’

সত্যিই তো।



ইউসুফ হাসান ডলি খামারের সব কর্মচারীকে ছাঁটাই করে দিয়ে নতুন কর্মচারী নিয়েছেন। আতর আলীর বিধবা স্ত্রীকেও ছাড়িয়ে দিয়েছেন। তাকে তিনি মানবিক কারণে মুরগি ফার্মে একটা ভালো চাকরি দিয়েছিলেন। কিন্তু সে যে তার দয়ার যোগ্য, তা প্রমাণ করতে পারে নি। যারা নতুন এসেছে তারা সব বাইরের। স্থানীয় কেউ নেই। কিছু কম বেতনেই তারা সন্তুষ্ট। আবাসিক ডাক্তারকে বিদেয় করেছেন হাসান সাহেব। ভালুকায় এখন প্রচুর ডাক্তার, দরকার হলে কর্মচারীরা তাদের কাছে যাবে। হাসান সাহেব দুজন সুপারভাইজার রেখেছেন। এখন এদের সঙ্গেই তার একমাত্র যোগাযোগ। তিনি ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘মানুষ শক্তের ভক্ত, নরমের যম, কথাটা প্রথম বোধহয় কনফুসিয়াস বলেছিলেন। এখন এর সত্যতার প্রমাণ পাচ্ছি।’ হাসান অবশ্য মায়ার কথা কিছু লিখেন নি। মায়ার খবর আমরাও জানি না। আপনারা কেউ জানলে আমাদের জানাবেন।

এবং কী আশ্চর্য, আলমগীরও তার খামারের সব কর্মচারী পাল্টেছে। এখন দেখে দেখে সবল শরীরের অস্থানীয় কামলা রেখেছে। আলাউদ্দিনকে অবশ্য ছাঁটাই করতে হয় নি, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে, ইজ্জত আলী হত্যার অভিযোগে। আলমগীর থানার দারোগাকে বলেছে, দুষ্ট মানুষের যথাযথ শাস্তি হওয়া উচিত। দারোগা মাথা নেড়েছে। এজন্য হাবিলদারটিরও চাকরি গেছে।

আলমগীর তার একদিনের খতিয়ানে লিখেছে, ‘যদি মানুষ আফিম খেয়ে শুয়ে থাকতে চায়, তাহলে তাকে জাগাবার, তাকে নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে পথে ফেরাবার ভার কি আমার একার?’

জনাব মাও সে তুং-এর কথাটাকে উল্টো করে লিখেছে আলমগীর। উল্টো করে লিখবে না তো কি, সময়টাই যে উল্টো এখন!

হাসান সাহেব ও আমার বন্ধু আলমগীর তাদের সাত কামরা তিন বাবুর্চি চার বাথরুম পাঁচ খানসামাঅলা বাড়িতে ভোজের ব্যবস্থা করেছে। ঢাকা থেকে গানঅলা বাজনাঅলা এসেছেন। আমোদফূর্তি আর গানবাজনা হবে। দুজনের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই, দুজন দুই ভূগোলের মানুষ। অথচ আশ্চর্য, তাদের খামারবাড়িতে ভোজ ও আনন্দের ব্যবস্থা হয়েছে একই দিনে! এখন সমস্যা হচ্ছে, আমার মতো যারা তাদের দুজনের দাওয়াতই পেয়েছে, তারা কী করবে? কোথায় যাবে? সিঙ্গাইর না ভালুকা?



লেখক পরিচিতি
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

১৯৫১ সালে ১৮ই জানুয়ারী সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে এম এ করেছেন ১৯৭৪ সালে। একই বছর অক্টোবর থেকে একই বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। কিংস্টন ক্যানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করেন ১৯৮১ সালে।
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: নন্দনতত্ত্ব (১৯৮৬), কতিপয় প্রবন্ধ (১৯৮১), থাকা না থাকার গল্প (১৯৯৪) স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠগল্প (১৯৯৫), কাঁচ ভাঙা রাতের গল্প (১৯৯৮), অন্ধকার ও আলো দেখার গল্প (২০০১) প্রেম ও প্রার্থনার গল্প (২০০৫) সুখ দু:খের গল্প (২০১১) আধখানা মানুষ (২০০৬) নিত পর্বের জীবন (২০০৮), কানাগলির মানুষেরা (২০০৯) এবং আজগুবী রাত (২০১০)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন