বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

গল্পকার রফিকুর রশীদের সাক্ষাৎকার :: ‘এই ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রবাদ আমাদের সাহিত্যকে দৃঢ় ভিত্তিভূমির প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে’

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : অলাত এহ্সান
 
(রফিকুর রশীদ কথা সাহিত্যিক, গীতিকার, শিক্ষাবিদ। জন্ম ১৯৫৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর; মেহেরপুর জেলার গাংনী থানার গাঁড়াডোব। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য স্নাতক সম্মান (১৯৭৯)ও স্নাতকোত্তর (১৯৮০) ডিগ্রী লাভ। 
১৯৮২ সালে সিলেটের এক চা বাগানে সহকারী ম্যানেজার হিসেবে তিনি কর্মজীবন শুরু। ১৯৮৩ সাল থেকে মেহেরপর জেলার গাংনী ডিগ্রী কলেজ বাংলা বিভাগে অধ্যাপনায় রত। বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভূক্ত গীতিকার ও নাট্যকার। গাংনীর মুক্তিযুদ্ধের শহীদ স্মৃতি পাঠাগরের সভাপতি ও বাংলা একাডেমীর সদস্য। এলাকায় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক আন্দোলনে বিশেষ ভূমিকা রেখে চলেছেন।)


অলাত এহ্সান : গল্পকার হিসেবে আপনার প্রস্তুতি ও চর্চা অনেকদিনের। কিশোর গল্পের ১ ডজন বই বাদেই, ইতোমধ্যে দশের অধিক গল্পগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। আমরা যদি শুরু থেকেই শুরু করি, তাহলে বলতে হবে, গল্প লেখা শুরু করলেন কবে?
রফিকুর রশীদ :
সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখের কথা কি বলা যায়! লেখা হবার আগে বরং পড়া শুরু হল কী করে সেই গল্পটি বলি। জানিয়ে রাখি আমার জন্ম, কিশোর বেলা, স্কুলজীবন—সবই ঘটেছে মেহেরপুর জেলার নিভৃত এক পাড়াগ্রামে। প্রাথমিক শেষে মাধ্যমিক পড়তে আসি ৩/৪ মাইল দূরের উপজেলা (তখনকার থানা) শহরে। তখনো আমরা জানা হয়নি যে, স্কুলপাঠ্য বইয়ের বাইরে ছোটদের জন্যও কোনো রকম বইপত্র বা কোনো সাময়িকী-ম্যাগাজিন জাতীয় কিছু থাকতে পারে। আমি যখন সেভেনের ছাত্র, সেই সময় আমার স্বল্প-শিক্ষিতা মা আমাকে প্ররোচিত করেন— ‘দেখিস তোদের স্কুলেও লাইব্রেরি আছে (তার আগে কোনো শিক্ষকের মুখে এ সংবাদ শুনেছি বলে মনে পড়ে না।), সেখানে নানা রকম বই আছে, দু’একটা বই চেয়ে আনিস দেখি! পড়ব।’ সত্যি বলছি—আমার মায়ের পাঠতৃষ্ণা মেটাতে গিয়েই বাইরের বইয়ের সঙ্গে পরিচয় আমার।
শুরুটা ঠাকুরমার ঝুলি দিয়ে, তারপর কত বই মায়ের সঙ্গে ভাগ করে পড়েছি। পরের বছর এলো মুক্তিযুদ্ধ, অখণ্ড অবসর, কিন্তু পর্যাপ্ত বই কই! পাঠ্যসূচির গদ্য-পদ্যই পড়ি, বারবার পড়ি; পড়তে পড়তে একসময় আমারও সাধ জাগে ওই রকম গদ্য (কবিতা!) লেখার। শুরু হয় কাব্যচর্চা। সেটা গল্পচর্চায় মোড় নেয় ১৯৭৭ সালে। ‘দুঃস্বপ্ন’ নামে একটা কিশোরগল্প দিয়ে যাত্রা শুরু। তখন আমি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র, রাজশাহীতে। বড়দের জন্য গল্প লেখার সূচনাও ওই সময় থেকেই, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত দৈনিক বার্তার (অধুনালুপ্ত) সাহিত্যপাতায় গল্প লিখে।

অলাত এহ্সান : লেখার ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর বই মেলাই আপনার গল্প-উপন্যাস-ছড়া-প্রবন্ধ-কিশোর রচনা সহ কোনো না-কোনো বই প্রকাশ হয়। এ বছর বইমেলায় আপনা কী কী বই প্রকাশ হয়েছে, কারা করেছে ?
রফিকুর রশীদ :
বইমেলা যে এবার নানান কারণে তা বিঘ্নিত হয়েছে, সে কথা আপনাদের সবারই জানা। আমার তো দু’টো গল্পগ্রন্থ বেরুনোর একেবারে শেষ পর্যায়ে প্রকাশক হাত গুটিয়ে নেবার কারণে বেরুলোই না। বেরিয়েছে ইত্যাদি গ্রন্থপ্রকাশ থেকে আমার সম্পাদনায় ‘নির্বাচিত একুশের গল্প’ এবং দু’টো কিশোর উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থ। আমার প্রিয় উপন্যাস, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এপিক ধর্মী উপন্যাস ‘দাঁড়াবার সময়’ এর চমৎকার পুনঃমুদ্রণ করেছে চন্দ্রদ্বীপ।

অলাত এহ্সান : আপনার সর্বশেষ প্রকাশিত গল্পগন্থ ‘সাদা মেঘের পালক’ বেরিয়েছে ২০১৩ সালের বইমেলায়। কতদিন ধরে লেখা গল্পগুলো এ বইতে যুক্ত হয়েছে?
রফিকুর রশীদ :
এটা আমার দশম গল্প গ্রন্থ। কিন্তু এই বছরেই যে স্বরবৃত্ত প্রকাশন থেকে আমার গল্পসম্পগ্র-২ বেরিয়েছে, সেটা কি গল্পগ্রন্থের মর্যাদা পাবে? ‘সাদা মেঘের পালকা’ গ্রন্থে গল্প আছে মাত্র নয়টি।
বিভিন্ন সময়ে লেখা এখানো সংকলিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় গল্পদু’টি লিখেছি পরপর, একই টানে; সপ্তম গল্প ‘মানববৃক্ষ’ লেখা হয়েছে অন্তত বছর দশেক আগে, নবম গল্প ‘যোগী’ লেখা হয়েছে ৬/৭ বছর আগে। আসলে গ্রন্থভূক্ত গল্পগুলির ভেতরে যে অন্তর্লীন ঐক্যের সূত্র, সেটাই এদের রচনাকালের দূরত্ব সত্ত্বেও এক মলাটবন্দি হতে প্রাণিত করেছে।

অলাত এহ্সান : আপনি বললেন, গল্পগুলির ভেতর অন্তর্লীন ঐক্যের কারণে এক মলাটবন্দি করেছেন। বইতে অন্তর্ভূক্ত গল্পগুলো কী কী বিষয়বস্তু নিয়ে লেখা হয়েছে?
রফিকুর রশীদ :
বিষয়বস্তু হচ্ছে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ এবং তাদের জীবযাপন। প্রথম ও দ্বিতীয় গল্প দু’টি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ, সেই সময়ের ঢাকা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, দূরের গ্রাম থেকে সন্ত্রস্ত অভিভাবকের ঢাকা পর্যন্ত ছুটে আসা এবং শেষ পর্যন্ত তার মানসভূমিতে পরিবর্তনের ছবি আঁকা হয়েছে। তৃতীয়, চতুর্থ এবং নবম গল্প তিনটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প। মুক্তিযুদ্ধের উপেক্ষিত বিষয়-আশয় এবং লোকচক্ষুর অন্তরালে বিসর্জিত প্রায় মানুষজনকে নিয়ে লেখা এই তিনটি গল্প। অবশিষ্ট চারটি গল্পে সামাজিক শোষণের আক্টোপাশে জড়িয়ে ধরা নিরতিশয় অসহায় মানুষজনের যাপিত জীবনের লাঞ্ছনা, বঞ্চনা, প্রেম ও বিদ্রোহের বাণীরূপ পেয়েছে।

অলাত এহ্সান : প্রতিটি গল্প লেখার পেছনে একটা ঘটনা থাকে, একটা গল্প থাকে। আপনার গল্পগুলোর পেছনেও গল্প আছে, নিশ্চয়। সেই গল্প বলুন।
রফিকুর রশীদ :
সে তো সাতহাকনের গল্প হয়ে যাবে। একটি গল্প লিখতে একদিন দু’দিন তিনদিন বা সাতদিন সময় যা-ই লাগুক, কাগজে প্রকাশ আর মগজে ঘনীভূত হয়ে দানা বেঁধে ওঠা এক কথা নয়। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতিটা গুছিয়ে তুলতে কোনো গল্পে কত সময় লাগে বা লেগেছে তা এখন বলাও মুশকিল। এই প্রস্তুতি সম্পন্ন হবার পর অনিবার্য হয়ে ওঠে তার প্রকাশ। এই প্রকাশ না যটা পর্যন্ত লেখকের স্বস্তি নেই, শান্তি নেই; মুক্তি নেই। আমি সেই মুক্তির আনন্দেই গল্পলিখি। এগুলিও সেভাবেই লেখা হয়েছে।

অলাত এহ্সান : ‘সাদা মেঘের পালক’ গ্রন্থের আগে নয়টি গল্পগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে। তো আগে প্রকাশিত গ্রন্থের সঙ্গে এ বইয়ের গল্পগুলোর বিশেষ কি পার্থক্য আছে?
রফিকুর রশীদ :
পার্থক্য তো অবশ্যই আছে। নইলে আর নতুন গল্প লেখার কী প্রয়োজন? তবে এটাও জানতে হবে—একই গল্পকারের দশ বা বিশ বছরের ব্যবধানে রচিত গল্পের মধ্যে নানান পার্থক্য (বিষয় নির্বাচন, প্রকরণ, প্রকাশ শৈলী, উপস্থাপন ভঙ্গি ইত্যাদি) যেমন থাকতে পারে, থাকাটাই স্বাভাবিক, তেমনি শতেক পার্থক্য সত্ত্বেও গল্পকার যে সেই একজনই, সেটা বোধহয় পুরোপুরি আড়াল করা সম্ভব নয়, আগের বইটিও আমার এবারের বইটিও আমার।

অলাত এহ্সান : গল্পগুলোতে আপনি কি কিছু বলতে চেয়েছেন, মানে কোনো বিষয়কে উপস্থাপন বা ম্যাসেজ দিতে চেয়েছেন কি না?
রফিকুর রশীদ :
কী বলতে চেয়েছি তা এতক্ষণে বলা হয়ে গেছে। বাকিটা আমার গল্পগ্রন্থটি পড়ে জানতে হবে। আমার সব গল্পের ভেতরের ম্যাসেজ একটাই—আমার চারপাশের সব মানুষকে অপার সম্ভাবনাময় মানবসত্ত্বা হিসেবে বিবেচনা করি এবং আর পরিপূর্ণ বিকাশ দেখতে চাই।

অলাত এহ্সান : এই বইতে তো অনেকগুলো গল্প আছে। তার মাঝ থেকে ‘সাদা মেঘের পালক’ গল্পটিকে নামগল্প হিসেবে বেছে নিলেন কেন?
রফিকুর রশীদ :
‘সাদা মেঘের পালক’ গল্প গ্রন্থের নামগল্পটির শেষ দু’টি বাক্য এ রকম : এ নাম অন্ধকারে আলো ছড়ায়। এই নাম দূর আকাশে সাদা মেঘের পালকের মতো নির্ভার। নামটি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখু মুজিবর রহমানের। কাকতালীয় সাদৃশ্য হলেও সত্য এই যে এগল্পের প্রধান চরিত্রের নামও শেখ মো. মুজিবুর রহমান, গ্রাম্য স্কুলের ধর্মীয় শিক্ষক, একমাত্র পুত্র আরবি লাইন ছেড়ে সাধারণ লাইনে গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। একাত্তরের ৭ই মার্চ সেই পুত্রকে ঢাকায় খুঁজতে এসে রেসকোর্স অভিমুখী জনতার স্রোতে ভেসে যেতে যেতে তার ভেতর জগতে বদল ঘটে, মুজিব-নেতৃত্ব প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠেন, দ্বিধা-সংকোচ ঝেড়ে ফেলে তাঁরও ইচ্ছে হয় জয় বাংলা স্লোগান দিতে।
আমার বিবেচনায় এই গল্পটি অন্যান্য গল্পের চেয়ে অধিক প্রতিনিধিত্বশীল, প্রশান্তির সাদা মেঘ অন্যান্য গল্পের জমিনেও ছায়া ফেলেছে যথেষ্ট; সেই জন্যে এই গল্প গ্রন্থের নামকরণ করা হয়েছে এই নাম গল্পটি দিয়ে।

অলাত এহ্সান : আমরা দেখছি আমাদের দেশের গল্পগুলো প্রায় বৈচিত্র্যহীন হয়ে পড়ছে। তো এই সময়ে প্রকাশিত গল্পগুলোর সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য করেন কি ভাবে?
রফিকুর রশীদ :
সে কথা তো ভালো করে বলতে পারবেন সচেতন পাঠক ও ক্রিটিক সমাজ। আমরা লেখকেরা সময় নামক এক নকশিকাঁথার বিভিন্ন প্রান্তে বসে সেলাই দিয়ে চলেছি। নিজের সেলাইয়ের সূক্ষতা, চারুতা বিংবা সুতোর রং নির্বাচন—প্রভৃতি বিষয়ে নিজস্ব রুচি ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটানো চেষ্টা তো সবাই করি; কিন্তু সব মিলিয়ে সেই তো একটা নকশি কাঁথা!
ধরা যাক ২০১৫ সালে আমরা যারা গল্পচর্চা করছি বাংলা ভাষায়, তাদের মধ্যে কেউ কি গল্প বয়ানের মাধ্যম হিসেবে আলাল-হুঁতোম (আলালের ঘরের দুলাল, হুঁতোম প্যাঁচার নকশা) এমন কি বঙ্কিমী গদ্য ব্যবহারে রাজি হবেন? রবীন্দ্রনাথ তাঁর কালে বসে ব্রজবুলি ব্যবহার করেছিলেন অন্য এক মোহে, বৈষ্ণবপদাবলীর নিজস্ব আকর্ষণে; সেটা ব্যাতিক্রমই বটে। হাড়িতে ভাত নেই তবু অতিথি এসে জুটলো দারিদ্রক্লিষ্ট অতিথি পরায়ন বাঙালিকে চিরকালই বিব্রত হতে হয়েছে, তাই বলে এখনকার গল্পকার সেই চর্যাপদের ভাষণ নিশ্চয়ই ব্যবহার করবেন না বর্তমান দারিদ্রের ছবি আঁকতে গিয়ে। শুধু ভাষা বলে তো কথা নয়, প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে গল্পের প্রকাশভঙ্গি ও উপস্থাপন কৌশল। এই সময়ে প্রকাশিত অন্যান্যের গল্পের সঙ্গে আমরা গল্পের পার্থক্য সব কিছু মিলিয়েই। কারণ সবার সঙ্গে পা মিলিয়ে পথ হাঁটলেও যে আমার নিজস্ব পথ আমাকেই রচনা করে নিতে হবে, সে আমি ভালোই জানি।

অলাত এহ্সান : সবসময়ই গল্প লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস। একটি ঘটনা বা অভিজ্ঞতা কি করে আপনি গল্পে রূপান্তর করেন? গল্পগুলোতে আপনার ব্যক্তিগত ছাপ কিভাবে এসেছে?
রফিকুর রশীদ :
যে কোনো লেখকের কাছেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার চেয়ে বড় কিছু নেই। সেই অভিজ্ঞতা অর্জিত হতে পারে নানা উপায়ে। যে-উপায়েই অর্জিত হোক, অভিজ্ঞতাগুলোকে প্রথমে নিজের করে নেয়াটা জরুরি। তারপর গল্প লেখার তাগিদ তৈরি হলে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নির্যাস এসে গল্পের শরীরে রক্তমাংস যোগাবে, গল্পে রূপান্তরিত হবে; আমরা গল্প তো এভাবেই তৈরি হয়।

নাহ, গল্প তো গল্পই। গল্প লেখা হয়ে যাবার পর তার শরীর থেকে লেখকের ব্যক্তিগত ছাপ মুছে ফেলতে পারলেই ভালো।

অলাত এহ্সান : গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায়সই লেখকে মেটাফোর, নিজস্ব শব্দ তৈরি করতে হয়। আপনার ক্ষেত্রে তা কী রকম?
রফিকুর রশীদ :
মেটাফোর কাকে বলে? ও সব ভারী ভারী পাণ্ডিত্যপূর্ণ শব্দ আমি কম বুঝি। নিজে যা বুঝি না, সে পথে হাঁটি না। এই আমার নীতি। নিজস্ব শব্দ তৈরি, তাও আমি করিনি। তবে আমার চারপাশে অসংখ্য নতুন শব্দ তৈরি হতে দেখি, সেগুলি কান পেতে শুনি, নিজের করে নিই, তারপর গল্পে ব্যবহার করি। যেমন ইংরেজি শব্দ ‘ইনকুয়্যারি’ আমি গ্রাম্য উচ্চারণে শুনি ‘ইনকুমারি’, ‘আলট্রাস্যানো’ শুনেছি ‘আলতাছুনু’; আমার গল্পে খুব সাবলীলভাবেই এই নতুন শব্দগুলো ব্যবহার করেছি।

অলাত এহ্সান : প্রত্যেক লেখকই চায় তার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে, তো বর্তমান গল্পকারদের সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য করেন কী ভাবে?
রফিকুর রশীদ :
অন্যের সঙ্গে নিজের পার্থক্য চিহ্নিত করার জন্যে কেউ যদি পরনের কাপড় মাথায় বেঁধে ধেই ধেই করে নাচে, অপরিশীলিত এই স্বাতন্ত্রের জন্যে তাকে নিশ্চয় ধন্যবাদ দেবে না কেউ; লেখক-জীবনেও আমি ওই অসুস্থতার বিপক্ষে। আমি আমার মতো করে নিষ্ঠার সঙ্গে আমার কাজ করে যাই, ওই কাজের মধ্যেই আমার যা কিছু স্বাতন্ত্র্য, বহু পরে পাণ্ডিত্যপূর্ণ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কেউ যদি সমসাময়িক লেখকের সঙ্গে আমার লেখার স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারে সচেষ্ট হন, হবেন।

অলাত এহ্সান : শুধু উস্থাপনের স্টাইল দ্বারা তো আর একজন গল্প মহৎ বা কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠেন না। চিন্তার-দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা দরকার হয়। আপনি গল্পগুলোতে জীবনের তেমন কোনো সত্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
হ্যাঁ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসেছে—চিন্তার দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা, যে কোনো লেখার জন্যই এটাই জরুরি। নিজের জীবন তো বটেই, চারপাশের আর সব মানুষের যাপিত জীবনের আনন্দ-গ্লানি, দুঃখ-ক্লেদ, প্রেম-রিরংসা—গভীর ভাবে অবলোকন ছাড়া কোনো লেখকের অভিজ্ঞতা স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণ হতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমি এ-গুলোর মধ্যে দিয়েই জীবনের সত্যকে গল্পে ফুটাতে চাই। আর স্টাইলটা হচ্ছে উপরিকাঠামো, সেটাও নিজের মতো হওয়া চাই।

অলাত এহ্সান : প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন- আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মেট্রোপলিটন, দার্শনিক ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প তৈরি করেন?
রফিকুর রশীদ :
আমি মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিই গল্পে রূপান্তরের সময়। তবে পূর্ব-পরিকল্পিত বা পূর্ব-আরোপিত ফ্রেমের মধ্যে রেখে পাত্র-পাত্রীর চরিত্র নির্বাচন আমি করি না। যে-কোনো চরিত্রের স্বতষ্ফুর্ত বিকাশটাই আমি গল্পে দেখতে চাই।


অলাত এহ্সান : গল্পের বিষয়বস্তু আপনি কি ভাবে নির্ধারণ করেন? গল্পের বিষয় বস্তুর নির্বাচনের সঙ্গে তো দর্শনের একটা যোগাযোগ আছে। আপনি গল্পে তেমন কি কোনো দর্শনের প্রতিফল বা প্রভাব দেখাতে চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
আমাদের যাপিত জীবনের সবই তো গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে, হয়ও। যখন যে বিষয়কে উদ্দীপ্ত, তাড়িত করে, আমি তাই লিখি। জীবনকে সাদা চোখে দেখাই আমার দর্শন।

অলাত এহ্সান : অনেক সময়ই সাহিত্যকে বিভিন্ন ঘরাণার ধারা বহন করেন। আপনার গল্পগুলোকে কি কোনো বিশেষ ধারা বা ঘরাণার-যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডিয় ইত্যাদি বলে মনে করেন?
রফিকুর রশীদ :
না না, ধারা-ফারার কথা উঠছে কেন? রাজনীতিতে ইজম চলতে পারে, সাহিত্যে ইজম কপচানোর একেবারে বিপক্ষে আমি। তবু যদি বলতেই হয়, তাহলে দ্বিধাহীন কণ্ঠে আমি জানাতে চাই--আমি জীবনবাদী।

অলাত এহ্সান : গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায়সই লেখকে মেটাফোর, নিজস্ব শব্দ তৈরি করতে হয়। আপনার ক্ষেত্রে তা কী রকম?
রফিকুর রশীদ :
মেটাফোর কাকে বলে? ও সব ভারী ভারী পাণ্ডিত্যপূর্ণ শব্দ আমি কম বুঝি। নিজে যা বুঝি না, সে পথে হাঁটি না। এই আমার নীতি। নিজস্ব শব্দ তৈরি, তাও আমি করিনি। তবে আমার চারপাশে অসংখ্য নতুন শব্দ তৈরি হতে দেখি, সেগুলি কান পেতে শুনি, নিজের করে নিই, তারপর গল্পে ব্যবহার করি। যেমন ইংরেজি শব্দ ‘ইনকুয়্যারি’ আমি গ্রাম্য উচ্চারণে শুনি ‘ইনকুমারি’, ‘আলট্রাস্যানো’ শুনেছি ‘আলতাছুনু’; আমার গল্পে খুব সাবলীলভাবেই এই নতুন শব্দগুলো ব্যবহার করেছি।

অলাত এহ্সান : প্রত্যেক লেখকই চায় তার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে, তো বর্তমান গল্পকারদের সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য করেন কী ভাবে?
রফিকুর রশীদ :
অন্যের সঙ্গে নিজের পার্থক্য চিহ্নিত করার জন্যে কেউ যদি পরনের কাপড় মাথায় বেঁধে ধেই ধেই করে নাচে, অপরিশীলিত এই স্বাতন্ত্রের জন্যে তাকে নিশ্চয় ধন্যবাদ দেবে না কেউ; লেখক-জীবনেও আমি ওই অসুস্থতার বিপক্ষে। আমি আমার মতো করে নিষ্ঠার সঙ্গে আমার কাজ করে যাই, ওই কাজের মধ্যেই আমার যা কিছু স্বাতন্ত্র্য, বহু পরে পাণ্ডিত্যপূর্ণ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কেউ যদি সমসাময়িক লেখকের সঙ্গে আমার লেখার স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারে সচেষ্ট হন, হবেন।

অলাত এহ্সান : শুধু উস্থাপনের স্টাইল দ্বারা তো আর একজন গল্প মহৎ বা কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠেন না। চিন্তার-দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা দরকার হয়। আপনি গল্পগুলোতে জীবনের তেমন কোনো সত্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
হ্যাঁ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসেছে—চিন্তার দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা, যে কোনো লেখার জন্যই এটাই জরুরি। নিজের জীবন তো বটেই, চারপাশের আর সব মানুষের যাপিত জীবনের আনন্দ-গ্লানি, দুঃখ-ক্লেদ, প্রেম-রিরংসা—গভীর ভাবে অবলোকন ছাড়া কোনো লেখকের অভিজ্ঞতা স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণ হতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমি এ-গুলোর মধ্যে দিয়েই জীবনের সত্যকে গল্পে ফুটাতে চাই। আর স্টাইলটা হচ্ছে উপরিকাঠামো, সেটাও নিজের মতো হওয়া চাই।

অলাত এহ্সান : প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন- আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মেট্রোপলিটন, দার্শনিক ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প তৈরি করেন?
রফিকুর রশীদ :
আমি মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিই গল্পে রূপান্তরের সময়। তবে পূর্ব-পরিকল্পিত বা পূর্ব-আরোপিত ফ্রেমের মধ্যে রেখে পাত্র-পাত্রীর চরিত্র নির্বাচন আমি করি না। যে-কোনো চরিত্রের স্বতষ্ফুর্ত বিকাশটাই আমি গল্পে দেখতে চাই।

অলাত এহ্সান : গল্পের বিষয়বস্তু আপনি কি ভাবে নির্ধারণ করেন? গল্পের বিষয় বস্তুর নির্বাচনের সঙ্গে তো দর্শনের একটা যোগাযোগ আছে। আপনি গল্পে তেমন কি কোনো দর্শনের প্রতিফল বা প্রভাব দেখাতে চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
আমাদের যাপিত জীবনের সবই তো গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে, হয়ও। যখন যে বিষয়কে উদ্দীপ্ত, তাড়িত করে, আমি তাই লিখি। জীবনকে সাদা চোখে দেখাই আমার দর্শন।

অলাত এহ্সান : অনেক সময়ই সাহিত্যকে বিভিন্ন ঘরাণার ধারা বহন করেন। আপনার গল্পগুলোকে কি কোনো বিশেষ ধারা বা ঘরাণার-যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডিয় ইত্যাদি বলে মনে করেন?
রফিকুর রশীদ :
না না, ধারা-ফারার কথা উঠছে কেন? রাজনীতিতে ইজম চলতে পারে, সাহিত্যে ইজম কপচানোর একেবারে বিপক্ষে আমি। তবু যদি বলতেই হয়, তাহলে দ্বিধাহীন কণ্ঠে আমি জানাতে চাই--আমি জীবনবাদী।

অলাত এহ্সান : গল্প উপস্থাপনের ক্ষেত্রে প্রায়সই লেখকে মেটাফোর, নিজস্ব শব্দ তৈরি করতে হয়। আপনার ক্ষেত্রে তা কী রকম?
রফিকুর রশীদ :
মেটাফোর কাকে বলে? ও সব ভারী ভারী পাণ্ডিত্যপূর্ণ শব্দ আমি কম বুঝি। নিজে যা বুঝি না, সে পথে হাঁটি না। এই আমার নীতি। নিজস্ব শব্দ তৈরি, তাও আমি করিনি। তবে আমার চারপাশে অসংখ্য নতুন শব্দ তৈরি হতে দেখি, সেগুলি কান পেতে শুনি, নিজের করে নিই, তারপর গল্পে ব্যবহার করি। যেমন ইংরেজি শব্দ ‘ইনকুয়্যারি’ আমি গ্রাম্য উচ্চারণে শুনি ‘ইনকুমারি’, ‘আলট্রাস্যানো’ শুনেছি ‘আলতাছুনু’; আমার গল্পে খুব সাবলীলভাবেই এই নতুন শব্দগুলো ব্যবহার করেছি।

অলাত এহ্সান : প্রত্যেক লেখকই চায় তার একটা নিজস্বতা তৈরি করতে, তো বর্তমান গল্পকারদের সঙ্গে আপনার গল্পের পার্থক্য করেন কী ভাবে?
রফিকুর রশীদ :
অন্যের সঙ্গে নিজের পার্থক্য চিহ্নিত করার জন্যে কেউ যদি পরনের কাপড় মাথায় বেঁধে ধেই ধেই করে নাচে, অপরিশীলিত এই স্বাতন্ত্রের জন্যে তাকে নিশ্চয় ধন্যবাদ দেবে না কেউ; লেখক-জীবনেও আমি ওই অসুস্থতার বিপক্ষে। আমি আমার মতো করে নিষ্ঠার সঙ্গে আমার কাজ করে যাই, ওই কাজের মধ্যেই আমার যা কিছু স্বাতন্ত্র্য, বহু পরে পাণ্ডিত্যপূর্ণ চুলচেরা বিশ্লেষণ করে কেউ যদি সমসাময়িক লেখকের সঙ্গে আমার লেখার স্বাতন্ত্র্য আবিষ্কারে সচেষ্ট হন, হবেন।

অলাত এহ্সান : শুধু উস্থাপনের স্টাইল দ্বারা তো আর একজন গল্প মহৎ বা কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠেন না। চিন্তার-দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা দরকার হয়। আপনি গল্পগুলোতে জীবনের তেমন কোনো সত্য আবিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
হ্যাঁ, খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসেছে—চিন্তার দেখার বৈচিত্র্য ও গভীরতা, যে কোনো লেখার জন্যই এটাই জরুরি। নিজের জীবন তো বটেই, চারপাশের আর সব মানুষের যাপিত জীবনের আনন্দ-গ্লানি, দুঃখ-ক্লেদ, প্রেম-রিরংসা—গভীর ভাবে অবলোকন ছাড়া কোনো লেখকের অভিজ্ঞতা স্বচ্ছ এবং পরিপূর্ণ হতে পারে না বলেই আমার বিশ্বাস। আমি এ-গুলোর মধ্যে দিয়েই জীবনের সত্যকে গল্পে ফুটাতে চাই। আর স্টাইলটা হচ্ছে উপরিকাঠামো, সেটাও নিজের মতো হওয়া চাই।

অলাত এহ্সান : প্রায় সব গল্পেই তো কোনো না কোনো অনুসন্ধান থাকে। যেমন- আত্ম, নৃ-তাত্ত্বিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, মেট্রোপলিটন, দার্শনিক ইত্যাদি। আপনি কোন ধরনের অনুসন্ধানে গল্প তৈরি করেন?
রফিকুর রশীদ :
আমি মানুষের সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, দার্শনিক পর্যবেক্ষণ এবং অনুসন্ধানকে প্রাধান্য দিই গল্পে রূপান্তরের সময়। তবে পূর্ব-পরিকল্পিত বা পূর্ব-আরোপিত ফ্রেমের মধ্যে রেখে পাত্র-পাত্রীর চরিত্র নির্বাচন আমি করি না। যে-কোনো চরিত্রের স্বতষ্ফুর্ত বিকাশটাই আমি গল্পে দেখতে চাই।

অলাত এহ্সান : গল্পের বিষয়বস্তু আপনি কি ভাবে নির্ধারণ করেন? গল্পের বিষয় বস্তুর নির্বাচনের সঙ্গে তো দর্শনের একটা যোগাযোগ আছে। আপনি গল্পে তেমন কি কোনো দর্শনের প্রতিফল বা প্রভাব দেখাতে চেষ্টা করেছেন?
রফিকুর রশীদ :
আমাদের যাপিত জীবনের সবই তো গল্পের বিষয়বস্তু হতে পারে, হয়ও। যখন যে বিষয়কে উদ্দীপ্ত, তাড়িত করে, আমি তাই লিখি। জীবনকে সাদা চোখে দেখাই আমার দর্শন।

অলাত এহ্সান : অনেক সময়ই সাহিত্যকে বিভিন্ন ঘরাণার ধারা বহন করেন। আপনার গল্পগুলোকে কি কোনো বিশেষ ধারা বা ঘরাণার-যেমন মার্কসবাদী, জীবনবাদী, নারীবাদী, ফ্রয়েডিয় ইত্যাদি বলে মনে করেন?
রফিকুর রশীদ :
না না, ধারা-ফারার কথা উঠছে কেন? রাজনীতিতে ইজম চলতে পারে, সাহিত্যে ইজম কপচানোর একেবারে বিপক্ষে আমি। তবু যদি বলতেই হয়, তাহলে দ্বিধাহীন কণ্ঠে আমি জানাতে চাই--আমি জীবনবাদী।

অলাত এহ্সান : বলা হয়, সৃষ্টিশীল মানুষ মাত্রই নিঃসঙ্গতা ও অতৃপ্ততায় ভুগে। গল্পলেখার ক্ষেত্রে আপনার কোনো অতৃপ্ততা আছে কি?
রফিকুর রশীদ :
খুব আছে। এ নাগাদ যে গল্পগুলো লিখেছি, তার ভেতরে তৃপ্তিদায়ক গল্প কয়টাই বা আছে! এই অতৃপ্তিই আমার লেখক সত্তার চালিকাশক্তি।

অলাত এহ্সান : আজকের দিনে সবাই যখন উপন্যাসের দিকে ঝুঁকছে, আপনি সেখানে ছোটগল্পকে কিভাবে দেখছেন?
রফিকুর রশীদ :
উপন্যাস আর ছোটগল্পের মধ্যে তফাৎটা কী? তফাৎ ব্যপ্তি এবং মাত্রাতে। আমি এরই মধ্যে গোটা দশেক উপন্যাস লিখেছি। কিন্তু আমার লেখকসত্ত্বার স্ফূরণ ঘটে ছোটগল্পেই। উপন্যাসে অনেক কথা বলা যায় ঠিকই, ছোটগল্পেও অনেক কথার ইঙ্গিত দেয়া সম্ভব। আমরা তো প্রবল বিশ্বাস কালের সাক্ষী হয়ে ছোটগল্প শুধু টিকেই থাকবে না, দিনে দিনে আরো সমৃদ্ধ হবে।

অলাত এহ্সান : লেখক প্রস্তুতি হিসেবে দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন, রাজনীতি, বিশেষত দেশিয় সাহিত্যপাঠ ইত্যাদি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনে অনেক অবশ্য এতো গভীরে যেতে চান না। আপনার কাছে এগুলো কেমন মনে হয়?
রফিকুর রশীদ :
শুধু লেখক প্রস্তুতি বলে কথা নয়, দেশের একজন শিক্ষিত সচেতন নাগরিক হিসেবে সবার জন্যই তো ওগুলো খবু জরুরি। আর লেখককে তো প্রস্তুতি নিতে হয় কঠোর পরিশ্রমের মধ্যদিয়ে। দেশের শুধু নয় সারা বিশ্বের নমাব সভ্যতার ইতিহাস-ঐতিহ্য-দর্শন সবই জানতে হয়। অতো গভীরে যেতে না চাইলে চলবে কেন! বই বেরুবে, লেখকও হওয়া যাবে; সত্যিকারের লেখক হওয়া যাবে না।

অলাত এহ্সান : আমরা দেখি বাংলা সাহিত্যে উত্তারাধিকারের ধারা বহন করেছেন অনেক লেখক। আপনি নিজেকে কোনো সাহিত্যধারার উত্তরাধিকারী মনে করেন?
রফিকুর রশীদ :
এবার তো চরম বিপদে পড়া গেল—বললে কি পাঠক বিশ্বাস করবেন গল্পচর্চার ক্ষেত্রে আমি আমরা উৎস চিনি না, উত্তরাধিকারের ধারা কথা বলব কেমন করে? রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হবার সূত্রে অনায়াসে নাগালের মধ্যেই পেয়ে যাই জীবনশিল্পী হাসান আজিজুল হক, কবি কথাকার আবুবকর সিদ্দিককে। এঁরাই আমরা গুরু। এর বইরে সবিস্ময়ে পড়েছি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শওকত আলী, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, পরে সেলিনা হোসেনও খুব টেনেছেন। এঁদের লেখা পড়তে পড়তেই তো আমার লিখতে শেখা। কী জানি, কোন সাহিত্যধারার উত্তরাধিকারী।

অলাত এহ্সান : বাংলা সাহিত্যে এখন উত্তরাধুনিক সাহিত্যের নামে একধরনের সাহিত্য চর্চা হচ্ছে, এতে ব্যক্তি স্বাতন্ত্রকেই প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। তাই প্রত্যেক গল্পকার তার স্বাতন্ত্র নিয়ে ভাবেন, এটা অবাঞ্চিত কিছু নয়। এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র আমাদের সাহিত্যের কি রূপ দিচ্ছে?
রফিকুর রশীদ :
সাহিত্যের বিচারের এসব বিদেশি কেতা আমি বুঝি কম। গল্পচর্চার ক্ষেত্রে আমি ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের পক্ষে। এই ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রবাদ আমাদের সাহিত্যকে দৃঢ় ভিত্তিভূমির প্রতিষ্ঠা দিচ্ছে।

অলাত এহ্সান : সময়খণ্ডের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে জন্য সাহিত্যের দশক বিচার একটি প্রচলিত পদ্ধতি মাত্র । তো আপনি আপনার দশককে কি ভাবে উপস্থাপন বা চিহ্নিত করছেন?
রফিকুর রশীদ :
সাহিত্যে দশকওয়ারি বিভাজনের পক্ষে আমি নই। লেখককে তার পূর্ণাঙ্গতার প্রেক্ষিতে রেখে বিবেচনা করাই সঙ্গত। হ্যাঁ, মানি বটে, সময়খণ্ডের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকে। ওই সময়কালে লেখালেখির করেও লেখাতে তার প্রভাব পড়বে না—তাই হয়। ধরা যাক—সত্তর দশকের কথা, এ সময়ের লেখকের মুক্তিযুদ্ধের কোনো ছায়া পড়বে না, এ কি ভাবা যায়? ১৯৭৭-৭৮ সালে গল্প লেখা শুরু হলে—আমরা দশক কোনটি? কী তার চরিত্র? সেই চরিত্রের কতটুকু আমার লেখায় প্রভাব ফেলেছে, এ সব আমি ভেবে দেখিনি।

অলাত এহ্সান : গল্প লেখা আর বই প্রকাশ—দু’টোই লেখকের অনুভূতিতে গভীর। একটি বই প্রকাশ করা আর একটা ভালো গল্প লেখা—কোনটি আপনাকে বেশি অনুভূতি দেয়?
রফিকুর রশীদ :
কোনো দ্বিধা নেই বলতে—একটি ভালো গল্প লেখাই আমার কাছে অধিক তৃপ্তিদায়ক এবং গুরুত্বপূর্ণও বটে। বই বেরুনো তো কোনো ব্যাপারই না।

অলাত এহ্সান : আপনার সৃজনউর্বরতার জন্যই প্রায় প্রতিবছর বই মেলায় আমরা আপনার নতুন বই পেয়ে থাকি। এ বছর বই মেলা কিছুটা বিরূপ পরিবেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তারপরও, এবার বই মেলায় আপনার গল্পের বই আসেনি। পরবর্তী বই নিয়ে আপনার কি চিন্তা?
রফিকুর রশীদ :
কিশোরগল্পের বই এসেছে দু’টো। তবু গল্পের বই আসেনি, কথা ঠিক। দু-দু’টো গল্পগ্রন্থ বেরুনোর কথা ছিল, প্রস্তুতিও ছিল শেষের পথে, তবু পাইপলাইনেই আটকে গলে। প্রকাশককেও দোষ দিই না, তারা চেষ্টা করেছেন ঠিকই, এ বছর বইমেলা নিয়ে তবু উৎকণ্ঠা তো ছিলই। এ বছর হয়নি, আগামী বছর হবে। আমার সম্পাদনায় ‘নির্বাচিত একুশের গল্প’ এসেছে ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ থেকে।

অলাত এহ্সান : পরিমাণ বিচারে আপনার গল্পে সংখ্যা কম নয়। তারপরও আপনার না লেখা কোনো গল্প আছে, যা আপনি লিখতে চান?
রফিকুর রশীদ :
অবশ্যই আছে। অভিজ্ঞতার রসে জারিত হয়ে আছে তীব্র এবং প্রখর সংবেদনকাতর গল্প। লেখা হয়নি এই ভয়ে—আমি জানি যতটুকু, তার কতোটুকুই বা প্রকাশ করতে পারব! অনেক আছে না-লেখা গল্প।

অলাত এহ্সান : আমাদের দেশে শুধু লেখালেখি করে জীবন যাপন করেছেন বা সমৃদ্ধ হয়েছেন এমন খুবই কম। অথচ লেখালেখিতে পেশাদারিত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ; একই সঙ্গে লেখালেখির বাণিজ্যমূল্য খুবই কম। তাহলে পেশাদারিত্বের সঙ্গে জীবন মেলাবেন কি ভাবে? কিংবা লেখালেখির বাণিজ্যিক মূল্য থাকাটাই বা কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
রফিকুর রশীদ :
না ভাই, এ প্রসঙ্গে আমি আর মুখ খুলতে চাই না। লেখালেখির বাণিজ্যিকমূল্য অবশ্যই থাকা উচিত। কেবল টাকা উপার্জনের জন্যেই হন্যে হয়ে কেউ লিখতে বসবেন কি না জানি না, কিন্তু লেখালেখি ব্যাপারটা যেন শুধুই ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো না হয়। প্রত্যেকটি লেখার সম্মানজনক অর্থমূল্য থাকা চাই।

অলাত এহ্সান : বলা হচ্ছে একদিন সবকিছু ভার্সুয়াল বা কৃত্রিম জগতের আয়ত্বে চলে আসবে। এর মাঝে বইয়ের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার অভিমত?
রফিকুর রশীদ :
বইয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব উৎকণ্ঠিত নই। বিজ্ঞানের নিত্য নতুন ভার্সন যে বইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাবে, এমন নাও হতে পারে। আমি আশাবাদী।

অলাত এহ্সান : লেখার ধারা সব সময়ই বদলায়। এক এক সময় এক এক ধারা উৎভব হয়, সামনে আসে, জনপ্রিয়তা পায়। এই মুহূর্তে বিশ্বসাহিত্যের যে জনপ্রিয় ধারা, মানে যা বহুল পরিচিত-চর্চিত হচ্ছে, তার সঙ্গে সমসাময়িক বাংলাসাহিত্যের ভেতর মূল পার্থক্যটা কোথায়?
রফিকুর রশীদ :
এইখানে এসে নিজের অক্ষমতা এবং দীনতার কথা অকপটে স্বীকার করতেই হয়। বিশ্বসাহিত্যের বর্তমান ধারার সঙ্গে আমরা পরিচয় অতিসামান্য। বর্তমান বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে তুলনা করবো কোন অধিকারে এবং কোন স্পর্ধায়? বিশ্বসাহিত্যের যে সামান্য অংশ অমসৃন বাংলা গদ্যে অনুদিত হয়ে আমাদের হাতে আসে, সম্বল সেই চর্বিত চর্বণটুকুই। তাতে না পাই মূলের স্বাদ, না মেটে বিশ্বসাহিত্য আস্বাদনের তেষ্টা। নাহ্, সৃজনশীল অনুবাদকের হাত ধরে আমাদের অনুবাদ সাহিত্যের শাখাটি পল্লবিত হতে পারল না। ফলে আমার মতো লেখকরা বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে নিজের প্রতিভা মিলিয়ে দেখার অবকাশই পেল না। কুয়োর ব্যাঙ হয়ে বাইরের দুনিয়া নিয়ে মন্তব্য করা কি আদৌ সাজে?

অলাত এহ্সান : লেখালেখিতে এখানে অল্প হলেও কিছু পুরস্কার দেয়া হয়। সেগুলো অর্থ মূল্য আদৌ সম্মান জনক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তার চেয়ে বড় কথা, পুরস্কারের জন্য সাহিত্যের মান বিচার নিয়ে প্রায়ই গুরুতর অভিযোগ বা যোগসাজোস কিংবা ঘরানা মেইন্টেনের প্রশ্ন ওঠে। এ-নিয়ে আপনার মন্তব্য কি? একজন লেখকের জন্য পুরস্কার কতটুকু গুরুত্বপূর্ণ?
রফিকুর রশীদ :
পুরস্কারও যেহেতু এক প্রকার স্বীকৃতি, তাই লেখকের প্রেরণার জন্য পুরস্কারের গুরুত্ব উপেক্ষা করার নয়। কিন্তু কোনো লেখক নিশ্চয় পুরস্কারের লক্ষ্য সামনে রেখেই লেখালেখি করেন না। পুরস্কার প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিভার মূল্যায়নের ব্যাপারটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু হায় এখানে কে কবে কার মূল্যায়ন! মূল্যায়ন প্রক্রিয়াটি যত স্বচ্ছ হবে পুরস্কার প্রাপ্ত এবং অপ্রাপ্ত—উভয়ের জন্য সম্মানজনক হবে। পুরস্কারের অর্থমূল্য মর্যাদাবহ হওয়া দরকার।

অলাত এহ্সান : আপনি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যে চর্চা করছেন। সময়খণ্ড বিচারের বিভিন্ন পর্ব দেখেছেন, অতিক্রম করেছেন। বাংলাদেশে বর্তমান গল্পের মান নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট, আপনার মন্তব্য কি?
রফিকুর রশীদ :
আমার সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টিতে কার কি বা যায় আসে! তবে দু’চারটি ব্যতিক্রম বাদে বর্তমান তরুণ লেখকদের গল্পে খুব অগভীর জীবনবোধের সাক্ষর দেখে আমি ব্যথিত হই। কিন্তু বিচলিত কিংবা আতঙ্কিত নই। সস্তা জনপ্রিয়তার দুয়ার থেকে হোঁচট খেয়ে এদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের পথ আবিষ্কারে ব্রতী হবেন আশা করি। আরেক সর্বনাশ হয়েছে দৈনিকের সাহিত্যপাতায় গল্পের পরিধি বেঁধে দেয়ার কারণে। ভালো সাহিত্য পত্রিকাই বা কয়টা আছে আমাদের, যারা লেখক তৈরিতে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করতে পারে! সব দায় এখানে লেখকেরই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন