বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

গল্পের সেটিং নিয়ে কথা

সাজেদা হক

কথাসাহিত্যে ‘সেটিং’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। এই সেটিং এর কারণেই আপনার অতি সাধারণ গল্পটি অনন্য হয়ে উঠতে পারে। গল্পের প্রত্যেকটি দৃশ্যকে কল্পনা করতে গেলেই আপনাকে ‘সেটিং’ এর বিষয়ে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। প্লেস বা সেটিংটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কথাসাহিত্যের গুরুত্বপুর্ণ এই অংশটি নিয়েই আজকের এই আলোচনা।


সবাই জানি, ফিকশনের ৩টি মূল উপাদান। এগুলো হলো চরিত্র, প্লট এবং সেটিং। যখনই কোন লেখক, পাঠককে পাতার পর পাতাতে আটকে রাখতে চাইবেন, তখনই তাকে সেটিং এ সাহায্য নিতে হবে। দ্বিধা-দ্বন্দ্ব বা চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্রের জন্য জায়গাটা অত্যন্ত আবশ্যকীয় একটি উপাদান। এর সবই হতে পারে, ঘরে, শপিং মলে, রাস্তায় কিংবা স্কুল-কলেজে। হতে পারে চরিত্র্রের সাথে চরিত্রের দ্বন্দ্ব, কিংবা শরীরী কারো সাথে অশরিরী কারোর দ্বন্দ্ব বা সংঘাত। কিন্তু কোথায় এ সংঘাত বা দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হচ্ছে পাঠক সে স্হানটিকেও বেশ গুরুত্বের সাথে নেন। নায়কের সাথে নায়িকার দেখা হলো কোথায়—অনেক পাঠকের কাছে আজো এটাই বড় প্রশ্ন! তাই না, আমার তো তাইই মনে হয়।


সেটিং কি?
সেটিং একটি গল্প বা ঘটনা দ্বারা সঞ্চালিত এবং পরিবেশ দ্বারা নির্ধারিত । সেটিং যেমন অতীতকে যোগ করতে পারে, তেমনি বর্তমান, ভবিষ্যতকেও চিত্রায়িত করতে পারে অনায়াসে। সময় এবং স্থান সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। কখনও কখনও শুধুমাত্র বর্ণনামূলক বিবরণকেও অন্তুর্ভুক্ত করতে পারে (যেমন. একটি অন্ধকার রাতে একটি একাকী খামারবাড়ি)। প্রায়ই একটি উপন্যাস বা অন্যান্য কথা সাহিত্যে ‘একটি সামগ্রিক সেটিং থাকে। যার মধ্যে পর্বের অথবা দৃশ্যের ভিন্নতা সাপেক্ষে সেটিংও পরিবর্তন হয়। যেমন: বিচারালয়, স্কুল, কলেজ, ঘর-বাসা, বারান্দা। ঔতিহাসিক কোনো পটভুমিও সেট করতে হয় গল্পের খাতিরেই।


সেটিং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
সেটিং এর জন্য একটি পরিপ্রেক্ষিত দরকার হয়। প্রকৃত তথ্য, গল্পের মেজাজ এবং মানসিকতার প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সেট। এটি কেবল একটি অপরিহার্য অংশ হিসাবেই না, বরং চরিত্র-চক্রান্তের সঙ্গে মিথষ্ক্রিয়ার মতো কাজ করে গুরুত্বপূর্ণ অর্থও বহন করতে পারে। মনে করেন নায়ক লন্ডন থেকে কথা বলছে। তখন পাঠকের মানসপটে লন্ডনের ছবিই ফুটে উঠবে। আর এর চিত্রায়নে অবশ্যই সেট আপ করতে হবে লন্ডনই। তাহলেই গল্পের ষোলকলা পূর্ণ হবে।


সেটিং এর সময় কি মনে রাখতে হবে?
সেটিং তৈরি করার সময়, স্থান, কাল ও ভাষা ব্যবহার উপযুক্ত হতে হবে। মনে রাখতে হবে এই কয়েকটি বিষয়: .

• কোথায় করছেন?

• কখন করছেন?

• আবহাওয়া কেমন?

• সামাজিক অবস্থা কি?

• পরিবেশ কেমন হবে?

• সেটিং প্রাণবন্ত করে তুলতে কি বিশেষ বিবরণ প্রয়োজন?



সেটিং এর মৌলিক উপাদানগুলো কি, এবার তা নিয়ে আলোচনা। আসুন জেনে নেয়া যাক, সেটিং এর উপাদানগুলোর সংগা, বৈশিষ্ট এবং আনুসাঙ্গিক বিষয়াদি।

১. স্থানীয়

২. বছরের সেরা সময় নির্বাচন

৩. দিনের সেরা সময় নির্বাচন

৪. ব্যয়িত সময়

৫. মুড ও পারিপার্শ্বিকতা

৬. জলবায়ু

৭. ভৌগলিক অবস্থান

৮. মনুষ্য সৃষ্টি ভৌগলিক

৯. ইতিহাসের গুরুত্ব

১০.সামাজিক/রাজনীতিক/ সাংস্কৃতিক পরিবেশ

১১. জনসংখ্যা

১২. অতীতের প্রভাব

এবার আসুন, বিষয়গুলোর গভীরে যাওয়া যাক।



১. স্থানীয়: কাহিনীতে যে দৃশ্যকল্পের কথা চিন্তা করছেন বা ভাবছেন, তাকেই স্থানীয় করে তুলুন। মানে হলো লোকাল কাহিনী বা লোকোকাব্য যেমনটি ব্যবহৃত হয়, ঠিক তেমনটি। বেদের মেয়ে জোসনার কথা মনে আছে আপনাদের কিংবা দস্যু বনহুর, চন্দ্রাবতী অথবা বেহুলা লক্ষিন্দর এর কথা ভাবুন। কত সহজেই লোকোকাহিনীগুলো মানুষের অন্তর ছুয়ে গেছে। এই কথাসাহিত্যগুলো আগেও জনপ্রিয় ছিল, এখনও জনপ্রিয় ভবিষ্যতেও জনপ্রিয়ই থাকবে।

২. বছরের সেরা সময় নির্বাচন: গল্পের সেটিংস হিসেবে বছরের সেরা মৌসুমকে বেছে নিতে পারেন। এতে করে সেট ডিজাইনে সহযোগিতা পাবেন। বিশেষ করে ফুল, পাখি, ফল এবং পোশাক কি হবে তা নিয়ে বেশিক্ষণ মাথা ঘামাতে হবে না।নায়ক-নায়িকার মিলন, বিচ্ছেদ সবই সেট করতে মৌসুমের ব্যবহার করতে পারেন।

৩. দিনের সেরা সময় নির্বাচন: এবার সাহিত্যের দ্বন্দ-সংঘাত, চক্রান্ত, মিলন-বিরহের দৃশ্যায়নের জন্য দিনের সেরা সময়কে বেছে নিন। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত কিংবা ভোর যেকোন সময় আপনার গল্পের ধরণ বুঝে যোগ করে নিন।

৪. ব্যয়িত সময়: যত যাই করেন না কেন, এতসব কিছুর পরও পাঠক বার বার ভাববে, এই যে তারা সময়টা ব্যয় করছে-এটা ঠিক হচ্ছে কিনা। আপনার সাহিত্যের এটিও একটি পাঠ। যোগ করুন। পাঠককে ভাবতে সেখান, কি কারণে সে এই সময়টা ব্যয় করছে।

৫. মুড ও পারিপার্শ্বিকতা: গল্পের জন্য যে প্লটটি বেছে নিয়েছেন, তার সাথে মিল রেখে দৃশ্যকল্প বা দৃশ্যের গাথুনি শুরু করুন। চরিত্রের মুড খেয়াল রাখুন। মাথায় রাখতে হবে পারিপাশ্বিকতাও।

৬. জলবায়ু: গরমকালে তো শীতের গীত গাওয়া যাবে না! যদি আপনার কাহিনী শীতকালকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় তাহলেতা মাথায় রেখেই পরিবেশ-পরিস্থিতির বর্ণনা করতে পারেন। মানে হলো জলবায়ু একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ।

৭. ভৌগলিক অবস্থান: গল্পটির যে প্রেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে গঠিত হচ্ছে, তার উপর নির্ভর করবে সেট এর ভৌগলিক অবস্থান। সূ্ররয ডোবার কোনো দৃশ্য থাকলে, তার সেটিং হবে একরকম, আবার সূর্যোদয়ের কোনো দৃশ্য থাকলে তার সেট হবে অন্যরকম। এটাই স্বাভাবিক, নয় কি?

৮. মনুষ্য সৃষ্টি ভৌগলিক অবস্থান: গল্পের মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার জন্য অনেক সময় ভৌগলিক অবস্থানের পরিবর্তন করতে পারেন ইচ্ছামতো। একটা উদাহরণ: ধরেন কোনো মুনী বা ঋষি একটা বর দিল যে, সে সন্ধ্যার পর কেউ তাকে মারতে পারবে না। তার জন্য সন্ধা পর্যন্ত বেচে থাকাটাই মুখ্য। সন্ধ্যার পর তার আর কোনে মৃত্যু ভয় নাই। এমন ক্ষমতাসমপ্পন্ন মানুষকে বা পশু বা অসুরকে বধ করার জন্য যদি কোনো মায়াজাল রচনা করেন, তবে তা হবে মনুষ্যসৃষ্টি। শুধু বধ করাই নয়, নিয়তি বা ভবিষ্যত দ্রষ্টার চরিত্র যোগের ক্ষেত্রে এই নিয়ামকটি ব্যবহার করা যেতে পারে। চীনের দেয়াল, আইফেল টাওয়ার, সপ্তম আশ্চর্যের সবই তো মনুষ্য সৃষ্টি ভৌগলিক অবস্থান। তাই নয় কি? সেটিং করতে পারেন এ সবেও।

৯. ইতিহাসের গুরুত্ব: ইতিহাস অবশ্যই গুরুত্বপূর্ন। সেটিংও তাই এর গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসে যে ঘটনা যেভাবে ঘটেছে, সেটিং এর সময় সেটিকে ঠিক সেভাবেই ফুটিয়ে তুলতে হবে। নবাব সিরাজুদৌলা সাহিত্যে নবাব সিরাজুদ্দৌলার কন্টকাকীর্ণ সিংহাসন এর কথা উদাহরণ হিসেবে নেয়া যেতে পারে। এছাড়াও ইতিহাস যাতে অক্ষত থাকে, সে হোক বর্ণনায়, হোক দৃশ্যায়নে-সে ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা জরুরী।

১০.সামাজিক/রাজনীতিক/ সাংস্কৃতিক পরিবেশ: গল্প বা কথা সাহিত্য তো কেবলি কল্পনা নির্ভর। আর এই কল্পনার ভিত্তি টা কি? ভিত্তি হলো আমাদের সমাজ, সামাজিক, রাজনীতিক, সাংস্কৃতিক পরিবেশের সমাবেশ। কখনও কখনও আমরা এর বাইরেও কল্পনা করি। কিন্তু গল্পের শেষাবধি সামাজিক রীতি-নীতি, বিধি-নিষেধই আবর্তিত হয় সমস্যা ও তার সমাধানও। এটা কিন্তু খারাপ না, বরং ভালই।

১১. জনসংখ্যা: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। সেটিং এর জন্য জনসংখ্যাও একটি ফ্যাক্টর। আপনার কল্পকাহিনীতে ঠিক কত মানুষের আনাগোনা হবে, সেটিং এর সময় অবশ্যই তার খেয়াল রাখতে হবে। এক বা দুজনের সেট হবে একরকম আবার একাধিক বা শতাধিক মানুষের উপস্থিতির সেট হবে একেবারে ভিন্ন।

১২. অতীতের প্রভাব: গল্পে অতীতের প্রভাব থাকতেই পারে। আর অতীতের চিত্রায়ণের জন্য সেট এর ডিজাইনেও আসবে পরিবর্তন, পরিমার্জন এবং পরিশোধন। কারণ তো জানেনই, একটাই তা হলো অতীত।



লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
ঢাকা। বাংলাদেশ।

অনুবাদক। প্রবন্ধকার। সাংবাদিক।























কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন