বুধবার, ১৩ মে, ২০১৫

গুন্টার গ্রাসের সাথে ডিনার

মূল: লি দানিয়েল ক্রাভেতয্
রূপান্তর: শওকত হোসেন

হারকোর্ট পাবলিশার্সে আমার প্রথম অ্যাসাইনমেন্ট এসেছিল অদ্ভুত অনুরোধ নিয়ে। ‘গুন্টার গ্রাসকে কিছু দিতে যেয়ো না,’ বললেন পাবলিসিটি ডিরেক্টর। এক মাসেরও কম সময়ের ভেতর তাঁর পরের বইটি বেরুতে যাচ্ছিল বলে এমনিতেও পর্যালোচিত হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে নেতৃস্থানীয় গণমাধ্যমের শরণ নেওয়া সম্ভব ছিল না। সাপ্তাহিক পত্রিকায় ফলো-আপ কল আর আমাদের সমালোচকদের তালিকায় নিয়মিত লেখকদের উদ্দেশ্যে কোনও ইমেইল ঝাপটাও থাকার কথা ছিল না। গ্রাসের খবর জানতে চেয়ে কেউ ফোন করলে, বলেছেন তিনি, আমি যেন তার নাম লিখে রেখে প্রকাশের তারিখের পর, আগে নয়, তার নামে আগামী বইটির একটা কপি পাঠিয়ে দিই ।


বিশেষ করে ব্যাপারটা অদ্ভুত ছিল একারণে যে এক সপ্তাহরও কম সময় আগে অন্য একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে হারকোর্ট পাবলিশার্স এর অচেনা লেখকদের গণমাধ্যমের আকর্ষণে পরিণত করার জন্যে প্রলোভন দেখিয়ে আমাকে নিয়ে এসেছিল। উঁচু পদ আর লোভনীয় বাড়তি বেতনসহ হাজির হয়েছিল নতুন চাকরি। তবে আসলে এই মেডিসন স্কয়ার পার্কের এই প্রকাশনা সংস্থার প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিই এখানে নিয়ে এসেছিল আমাকে। দ্য টিন ড্রাম, ডগ ইয়ার্স আর ক্র্যাবওয়াকের লেখক গ্রাসের মতো আমার সবচেয়ে কাঙ্খিত সাহিত্যের দিকপালদের সাথে কাজ করার সুযোগ ছিল এটা।


বছর দুই আগে ১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন গ্রাস, গত ছয় দশক ধরে জার্মানির মহান সাহিত্যিক আইকনের হাত দিয়ে বেরুনো তাঁর দেশকে নাৎসি অতীতের সাথে মোকাবিলায় ঠেলে দেওয়া বিপুল পরিমাণ কাজের বিনিময়ে পাওয়া একটা টোটেম। ব্যাখ্যাতীতভাবেই আমার রোস্টারের একেবারে নিচে হারিয়ে যাওয়া তাঁর পরের বইটি ছিল দীর্ঘ প্রতিক্ষীত পিলিং দ্য অনিয়ন নামের স্মৃতিকথা।

কিন্তু আমাকে যেমন বিশ্বাস করানো হয়েছিল, প্রকাশনা শিল্পের এক গুজব অনুযায়ী বইটির মামুলি ধরনের স্মৃতিকথা হওয়ার কথা ছিল না, বরং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষায় থাকা স্বীকারোক্তি ধরনের কিছু। গ্রাসের একেবারে গোড়ার দিকের বইগুলোর বেলায়ও জার্মানির জনপ্রিয় এই কথাশিল্পী নাৎসী জার্র্মানিতে আদৌ কোনও ভূমিকা পালন করেছিলেন কিনা সেই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। জনপ্রিয় পেশাগত জীবনে নিজের দেশকে নাৎসী অতীতের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া গ্রাস স্বেচ্ছায় নাৎসীদের সাথে জড়িত ছিলেন বলতে যাওয়া স্রেফ হতবুদ্ধিকর ছিল। অর্ধশত বছর ধরে নিজের দিক থেকে এটা অস্বীকার করে এসেছেন গ্রাস।

ষাট বছরের পিচ্ছিল বুলির পর এসব তথাকথিত গুজবে কান দিতে গেলে গুন্টার গ্রাস পরিচ্ছন্ন হয়ে আসছেন বলে মনে হয়েছে। তাঁর প্রজন্মের আরও অনেকের মতো, ‘হিটলার ইয়ূথে’র সদস্য ছিলেন তিনি এবং পরে হিটলারের কুখ্যাত ওয়াফেন এসএস ডিভিশনে কাজ করেছেন। লুকোচুরি খেলা তুঙ্গে ওঠার পর পরবিলিটি ডিরেক্টর আমাকে বললেন গ্রাস মত পাল্টে শেষপর্যন্ত বইয়ের প্রচারণার লক্ষ্যে নিউ ইয়র্কে আসছেন। খুবই সীমিত পর্যায়ে উপস্থিত হতে পাঁচ দিন এখানে থাকবেন তিনি।

প্রকাশনা সংস্থার অন্যতম সবচেয়ে হাই প্রোফাইল বইয়ের জন্যে প্রথমবারের মতো একজন নোবেল বিজয়ী লেখকের সঙ্গী হতে যাচ্ছি আমি।

হলোকাস্টের দীর্ঘ ছায়ার নিচে বেড়ে ওঠা যেকোনও ইহুদির মতো জীবিতদের দেখা পেয়েছি আমি। সাংস্কৃতিক পাঠ্যসূচির অংশ শেখার পাশাপাশি কিছুটা শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক স্তরে এটা ছিল। আরও অনেকের মতো আমার পরিবারের নাৎসী অধিকৃত ইউরোপ থেকে পালাতে না পারার অভিজ্ঞতা রয়েছে: শ্রম আর মৃত্যু শিবিরে যারা হারিয়ে গিয়েছে, বেঁচে ছিল।

যদিও কখনও অপরাধী, খুনী নাৎসীর দেখা পাইনি আমি। হিব্রু স্কুলগুলো ইহুদিদের গুন্টার গ্রাসের মতো লোকজনকে ভয় আর অবিশ্বাস করতে শিখিয়েছে। এখনও তাই করি।

গ্রাস আমার শেষ নামের ইউরোপিয় হিব্রু পরিবর্তনটুকু ধরতে পারবেন কিনা ভাবছিলাম। তাকে যদি বলি কলেজ থেকে বেরুনোর পর নাৎসীদের হাতে ধ্বংস হওয়া পূর্ব ইউরোপিয় ইহুদিদের স্মৃতিচারণের তালিকা সংরক্ষণ করা একটা হলোকাস্ট জাদুঘরে আমার প্রথম কাজ ছিল তাহলে কি বলবেন তিনি।

আমার ম্যানেজার এখন আমাকে এক সাবেক নাৎসীকে নিউ ইয়র্ক ঘোরাতে হবে বলায় ক্ষুব্ধ ও ধাক্কা খেয়ে, নাৎসী সাহিত্যিক গুরু নিউ ইয়র্কে আসছেন নিষ্পাপ হতে... শিরোনাম দিয়ে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি খাড়া করলাম আমি।

কিন্তু উল্টো ঘুরে মুছে ফেললাম সেটা।

মুখোমুখি এই নাৎসী ব্যাপারটার মোকাবিলা করা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তো গ্রাসকে শহরের ইহুদি সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু ৯২ স্ট্রিট, ওয়াইতে সিংহের ডেরায় নিয়ে এলাম আমি।

ওয়াই-এর মেটাল ডিটেক্টরের ভেতর দিয়ে আগে বাড়লাম, এক্স-রে কনভেয়রে পরখ করা হলো আমার ব্যাগ। একজন নিরাপত্তাকর্মী আমার শরীরের চাপড়ে অস্ত্রের খোঁজ করল। অনুষ্ঠান সমন্বয়কারী বললেন, ‘সমস্ত জায়গায় শাদা পোশাকের পুলিস রয়েছে এখানে।’

দ্রুত ভরে উঠতে থাকা মৃদু আলোকিত মিলনায়তনে চলে এলাম আমরা। বেলকনির দিকে ইশারা করলেন অনুষ্ঠান সমন্বয়কারী।

‘এখানে আমরা আকাশের দিকে নজর রাখছি। চারজন আশারদের সবাই সতর্ক, অর্কেস্ট্রার আসনগুলোর দিকে ফিরে বললেন তিনি। ‘স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চেয়ে দ্বিগুন লোক ভাড়া নিয়েছি আমরা।‘ ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হলো। এটাই ছিল আমার যোগ দেওয়া প্রথম বুক রিডিং যেখানে দর্শকদের দিকে অস্ত্র তাক করা হয়েছে। তারপর আবার টিকেটধারীদের ভক্ত, পক্ষাবলম্বনকারী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক আর ধূসর চুল হলোকাস্ট থেকে বেঁচে যাওয়াদের ভাগ করা হচ্ছিল। ব্যাপারটা কদর্য হয়ে উঠতে পারত।

ভালো, ভাবলাম আমি। আজ রাতেই যেন লোকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করে ফেলে তাঁকে।

কামরার আলো ফেলা হলো। অ্যাপল পাইয়ের পিঠের মতো বাদামী চেক স্যুট পরা লম্বা শীর্ণ একজন মানুষ তার বই হাতে মঞ্চের উপর দিয়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর চেহারা স্পষ্ট কয়লার রেখায় তৈরি: ঝুলে পড়া চোখ, উলের মতো গোঁফের বিস্তার আর ছোট ভুরুর বাঁক।

পোডিয়ামে এসে প্রথমদিকের একটা অধ্যায়ের পাতা খুলে পৃষ্ঠার দিকে চশমা তাক করে জার্মান ভাষায় পড়তে শুরু করলেন তিনি। দুঃস্বপ্নের মতো নাৎসী ফিল্মের কঠিন ককর্শ জার্মান নয়, বরং গল্প বলিয়ের কিছুটা কোমল উচ্চারণে। অর্থ বুঝতে পারছিলাম না, তবে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। অবশ্য ইংরেজি তর্জমা এলো তারপর, পড়লেন মহান ইতিহাসবিদ আমোস ইলোন। ইতালি থেকে সরাসরি নিয়ে এসেছিল তাঁকে। এইমাত্র খাওয়া শেষ করা ডিনারের অতিথির যেন বুঝতে পেরেছেন তার খাবারাটা আসলে শিম্পাঞ্জির কানের লতি ছিল, ঠিক তেমনি ইংরেজি-ভাষী দর্শকদের সামনে ইলোন প্রকাশ করলেন যে এসএস অফিসার হিসাবে গ্রাসের প্রথম অস্ত্র প্রশিক্ষণের কথা বলেছে অধ্যায়টি। মিলনায়তন থেকে মঞ্চ পর্যন্ত চমকিত হওয়ার আওয়াজ জেগে উঠল।

এরপর প্রশ্নোত্তর পর্বের জন্যে দুটো ছোট চেয়ারে বসলেন গ্রাস এবং ইলোন। ইলোনের তুলে নেওয়ার অপেক্ষায়, হাতে জড়িয়ে নিয়ে গ্রাসের দিকে বর্শার মতো ছুঁড়ে মারার অপেক্ষায় বাতাসে ঝুলেছিল প্রশ্নের পর প্রশ্ন।

‘ডানযিগ আর অন্যান্য জায়গায় সিনাগগগুলোকে পুড়তে দেখেও কিভাবে হিটলারের প্রতি আনুগত্য ধরে রাখতে পেরেছিলেন আপনি?’ শুরু করলেন তিনি।

‘একটা বদ্ধ সমাজে বাস করতাম আমি, কি জানি জানা ছিল না...’ জবাব দিলেন গ্রাস।

‘কেমন করে রাস্তাঘাটে ইহুদির ভাগ্যে যা ঘটছে আর প্রত্যেকটা বড় শহরে একটা করে নির্যাতন শিবির আছে জানার পরেও নাৎসীদের উপর বিশ্বাস ধরে রাখতে পেরেছিলেন?’

‘বিশ্বাসী ছিলাম আমি...’ তারপর সরে এলেন গ্রাস, কথোপকথনের গতি বদলানোর চেষ্টা করলেন। ‘১৯৫৯ সালে আমি দ্য টিন ড্রাম প্রকাশ করার সময়...’

‘১৯৫৯ সালে সব ইহুদি তো মরে শেষ হয়ে গেছে?’ দর্শকদের ভেতর থেকে চিৎকার করে উঠলেন এক মহিলা। অন্যরা পরিহাস করে তাকে চুপ করিয়ে দিলেও আমার বুকটা লাফিয়ে উঠল।

‘আপনি কি স্বেচ্ছায় ওয়াফেন এসএস-এ যোগ দিয়েছিলেন?’ জানতে চাইলেন ইলোন।

‘আমি স্বেচ্ছায় সাবমেরিন ইউনিটে...’

‘আপনি স্বেচ্ছায় এসএস-এ যোগ দিয়েছিলেন কি দেননি?’

‘অল্প সময়ের জন্যে আমাকে পূর্ব রণাঙ্গনে পাঠানো হয়েছিল...’

অস্থির অসন্তুষ্ট দর্শকদের প্রতিনিধি ইলোন ক্রমাগত আক্রমণ করে চললেন।

‘হ্যাঁ, কিন্তু সত্যি বলার জন্যে ষাট বছর অপেক্ষা কেন?’

প্রশ্ন শুনে যেন বিভ্রান্ত, একটু চুপ থাকলেন গ্রাস। পরাস্তের মতো দীর্ঘশ্বাস ফেলে কোলের উপর হাত রাখলেন।

‘আমি সবসময় এই ধরনের আত্মজৈবনিক স্ব-অনুসন্ধানকে ঘৃণা করে এসেছি, তিরিশ বছর আগে বা ছোট থাকতে তারা কি ভেবেছিলেন সেটা স্পষ্ট মনে করতে পারেন এমন লেখকদের পরিহাস করেছি,’ বললেন তিনি। ‘এই ধরনের একটা বই লিখতে এক বিশেষ বয়স পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় আপনাকে।’

‘কিন্তু কেন?’ তাঁকে রণে টেনে আনার চেষ্টা চালান ইলোন। ‘যত বেশি অপেক্ষা করবেন তত কম মনে করতে পারবেন আপনি।’

আমার তখন মনে হলো হয়তো এটাই ছিল আসল কথা: সত্যি বলতে গিয়ে গুন্টার যত অপেক্ষা করেছিলেন তাতে এমনকি গ্রাসের কাছেও সেটা আরও বেশি করে ঝাপসা হয়ে এসেছে।

সেরাতে আরও পরে পাবলিসিটি ডিরেক্টর আর আমি গ্রাস, গ্রাসের জার্মান ম্যানেজার এবং তার আমেরিকান ভাগ্নির সাথে হেল’স কিচেনের একটা রেস্তরাঁয় দেখা করলাম। রেড ওয়াইন আর গরম লেবু চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু হলো সন্ধ্যাটা। গ্রীষ্মকালে শহরের প্রতি তার দরদের কথা, সোমার দোকানপাটের কথা যেখানে গ্রাসের আমেরিকান ভাগ্নি তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন আর ব্যাখ্যাতীতভাবে সেন্ট্রাল পার্কে ঢুকে পড়া এক শেয়ালের গল্প শোনার কথা বললেন তিনি। মোহময়, আমোদময়, গপ্পি ছিলেন তিনি এবং সত্যিকার অর্থে উদার। গোটা টেবিলকে অনেক হাসিয়েছেন তিনি।

আরও খাবারের ফরমাশ দিলেন তিনি, এবং শেষে পাইপ ধরালেন। মনে আছে রেস্তরাঁর ম্যানেজার ছুটে এসে গ্রাসকে ওটা নিভাতে বলবে ভেবেছিলাম আমি, কিন্তু সেটা ঘটেনি। আগেই ফোন করে মেজবানকে বলে রেখেছিলাম সেরাতে একজন ভিআইপিকে সঙ্গ দেব আমি আর আমাদের একান্ত কোনও জায়গায় বসতে দিতে হবে। আমার কাজ ছিল এমন একজনের দেখাশোনা করা যার আয়েস পাওয়ার কোনও অধিকার ছিল না।

পাইপ টানা শেষ হলে শেফ আমাদের জন্যে প্যাস্ট্রি আর অন্য উপহার পাঠালেন। সবাই খেলেন, কিন্তু আমার পেটে গিঁট পাকিয়ে গিয়েছিল, খিদে মরে গিয়েছিল। নিজের ভেতর বিরোধ বোধ হচ্ছিল, যেন আমার সামনের ভদ্র লেখক অতীতের সেই নাৎসীর বিরুদ্ধে লড়াই করছিলেন আর কোনওভাবে আমার নিজস্ব নৈতিকতা হুমকির মুখে পড়েছিল। আমি এই মানুষটাকে তার অতীতের জন্যে ক্ষমা করতে পারব?

পুরো সময়টা নিজেকে এক অসাধারণ বিরল আর সুবিধাজনক অবস্থানে আবিষ্কার করার ব্যাপারে স্পর্শকাতর ছিলাম। সত্যিকার অর্থে একমাত্র অবস্থা যেখানে আমার মতো কেউ গুন্টার গ্রাসের মতো একজন লেখকের সাথে ডিনার করতে পারবে। এখন তার ব্রনে ভরা দীর্ঘ নাক, ভরে রাখা কাঁচাপাকা রোমগুলো দেখার পক্ষে বিখ্যাত অক্সবো গোঁফের যথেষ্ট কাছে ছিলাম আমি।

আরও শক্তিমান, আরও আত্মবিশ্বাসী কোনও ডিনারের অতিথি হয়তো গ্রাসের সাথে তার বইয়ের অসামঞ্জস্যতা নিয়ে মোকাবিলা করতে পারতেন। হয়তো পাতার পর পাতা তার স্মৃতিচারণকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলতেন, প্রত্যেকটা শব্দ পরখ করে অনুশোচনার দাবি করতেন। আরও শক্তিশালী ডিনারের অতিথি হয়তো গ্রাসের মদটুকু তারই মুখের উপরই ছুঁড়ে মারতেন, গরম চা ফেলে দিতেন কোলে, তার চোখে জল না আসা পর্যন্ত গোঁফের প্রত্যেকটা পশম টেনে ছিঁড়ে ফেলতেন। আরও শক্তিমান কেউ আমার মতো তাঁকে মদ ঢেলে দিয়ে তাঁর কৌতুকে হেসে তোয়াজ করতেন না।

‘আমার প্রচারকারীকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেমন করেছি,’ বিনামূল্যের ডেজার্ট থেকে নজর সরিয়ে শেষে বললেন গ্রাস।

‘আপনি সত্যিই একটা কঠিন সাক্ষাৎকার সামলে নিয়েছেন,’ বললাম আমি।

হাসলেন তিনি। ‘কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

‘আমার মনে হয়েছে ভালোই হয়েছে,’ বললাম।

‘হ্যাঁ, আমিও তাই ভেবেছি। দর্শকরা বিশেষভাবে আন্তরিক ছিলেন।’

স্বাভাবিকভাবেই গুন্টার গ্রাসের সাথে আমার ডিনারের পর একটি দশক কেটে গেছে, এই সময়ে আমার চেয়ে বয়সে চারগুন বড় একজন মানুষের নৈতিক কম্পাসের সাথে সমঝোতার চেষ্টা করে গেছি আমি। আজ সকালে ৮৭ বছর বয়সে গ্রাসের মারা যাওয়ার খবর পড়ার পর আমার মনে হলো যে ক্ষমা হয়তো স্রেফ বয়স্ক মানুষেরই খেলা, কারণ এখন একসময়ে আমার অচেনা আর বহু বছর নিজের অশুভের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো একজন মানুষের প্রতি যে ক্রোধ বোধ করেছিলাম সেটা আমার ভেতর ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। আমি এমনভাবে আমার বাচ্চাদের ভুল আর ঠিকের ভেতর পার্থক্য শিখিয়েছি যেন কালো কালি দিয়ে পরিষ্কার ফারাক চিহ্নিত করা আছে, কিন্তু এই সামান্য বর্ণনা অনিবার্যভাবে আরও প্রাজ্ঞ চোখ দিয়ে জগত দেখার সময় বেশি করে সূ' অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে।

তার একটা অংশকে ক্ষমা করে দিতে পারি আমি, বাকিগুলো ভালোবাসতে পারি।

আমার ডেস্কে এখন স্মৃতিকথাটা দেখতে পাচ্ছি। আজ, কোনও নাৎসীকে দেখছি না, কিংবা পুরস্কার পাওয়া কোনও লেখককেও না। চমৎকার ডিনার শেষে বন্ধু, প্রকাশনা শিল্পের সদস্য আর তার আমেরিকান ভাগ্নির, যার নাম কোনওদিনই ধরতে পারিনি, ঘেরাওয়ে থাকা পাইপ টেনে চলা একজন বয়স্ক মানুষকে দেখছি।


[লি দানিয়েল ক্রাভেতয (ডেভিড বি. ফেল্ডম্যানের সাথে) আন্তর্জাতিক বেস্টসেলিং বই সুপারভাইজরস: দ্য সারপ্রাইজিং লিঙ্ক বিটুইন সাফারিং অ্যান্ড সাকসেস (হারপার কলিন্স)-এর লেখক।]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন