বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

কালজয়ী কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ- মনোজিৎ কুমার দাস

গত শতকের চল্লিশ দশকের প্রায় প্রারম্ভিক কাল ঘেঁষা বাংলা সাহিত্যের কাল পর্বের জীবন শিল্পী সুবোধ ঘোষ (১৯০৯-১৯৮০)। বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে একটু বেশি বয়সে যোগদান করেও নিজস্ব মেধা মনন চিন্তা চেতনা আর লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে সুবোধ ঘোষ তার অসাধারণ রচনা সম্ভাবের মাধ্যমে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন।
নানা টানাপোড়েনের মাঝ থেকে উঠে আসা সুবোধ ঘোষ তার লেখা অসাধারণ রচনা সম্ভারের মাধ্যমে নিজেকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে যেভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন তা নিঃসন্দেহে নানা দিক দিয়ে চমকপ্রদ।

সুবোধ ঘোষের লেখক হবার আগের ব্যক্তিগত জীবনের বিচিত্র কাহিনী তুলে ধরার আগে তার প্রথম লেখালেখির উপর আলোকপাত করতে চাই। তবে এখানে বলে রাখা ভাল তার লেখালেখির কালপর্ব ১৯৪০ থেকে ১৯৮০। তার প্রথম মুদ্রিত রচনা সম্বন্ধে সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও যেটুকু জানা যায় তা হচ্ছে সুবোধ ঘোষের লেখা প্রথম ছোট গল্প অযান্ত্রিক, যা আনন্দবাজারের বার্ষিক দোল সংখ্যায় (১৯৪০) ছাপা হয়।
বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সুবোধ ঘোষের আগমন বলতে গেলে অভাবনীয় রূপে। সাধারণ একটা পরিবার থেকে উঠে আসা সুবোধ নিজেকে বাংলা সাহিত্যের আসরে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হন ভাগ্যক্রমেই বলতে হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাশ করে হাজারিবাগ সেন্ট কলম্বাস কলেজে ভর্তি হয়েও অভাব অনটনের জন্য পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে জীবন জীবিকার তাগিদে কর্মক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাকে। হেন কাজ নেই তাকে করতে হয়নি সংসারের ঘানি টানার প্রয়োজনে। পড়াশোনা ছেড়ে কলেরা মহামারি আকার নিলে বস্তিতে টিকা দেবার কাজ নেন। বিহারের আদিবাসী অঞ্চলে বাসের কন্ডাক্টর, সার্কাসের ক্লাউন, বোম্বাই পৌরসভার চতুর্থ শ্রেণীর কাজ, চায়ের ব্যবসা, বেকারির ব্যবসা, মালগুদামের স্টোর কিপার ইত্যাদি কাজে তিনি তার প্রথম জীবনের যতটা অংশ ব্যয় করেন। সনতারিখ মিলিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ জীবনপঞ্জি রচিত হয়নি। বিভিন্ন লেখকের স্মৃতি কথা থেকে তার পোড় খাওয়া জীবনের সংগ্রাম করে গ্রাসাচ্ছাদনের কথা যতটুকু জানতে পারি তা থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না একজন প্রতিভাধরের প্রথম জীবনের প্রতিভা বিকাশের দ্বার রুদ্ধ হয়েছিল।
জীবন সংগ্রামী সুবোধ ঘোষ অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে বিশ শতকের তিনের দশকে কলকাতায় এসে থিতু হবার চেষ্টা করেন। প্রথমে শ্রী গৌরাঙ্গ প্রেসে প্র“ফ দেখার কাজ পান। এক সময় ওখানে ম্যানেজারের দায়িত্বও পান। সুবোধ ঘোষ কলকাতায় এসে এটা ওটা কাজের মাঝে গল্প লিখতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় দফতরে কাজ পেলেন। আর এখান থেকেই তার সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা লাভ। ১৯৪০ সালে সুরেশ মজুমদারের (১৮৮৮-১৯৫৪) ইচ্ছায় আনন্দবাজার পত্রিকায় সাংবাদিক হিসাবে যোগদানই তার লেখক পথ সুগম করে দেয়। একটানা চল্লিশ বছর আনন্দবাজার পত্রিকাতেই কাজ করেছেন, আনন্দ বাজার পত্রিকায় তার কাজ ছিল বহুমুখী। প্রতিবেদক, কলাম লেখকের সাথে সাথে প্রধানত তিনি সম্পাদকীয় লেখার কাজটাই বেশি করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদানের প্রথম কালপর্বে সুবোধ ঘোষ সৃজনশীল গল্প ও প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন এটা সুনিশ্চিত। সুবোধ ঘোষের প্রথম মুদ্রিত রচনা কোনটি তা নিশ্চিতভাবে জানা গবেষণা লব্ধ ব্যাপার। তবে যতদূর তথ্য প্রমাণ পাওয়া যায় তা থেকে প্রতীয়মান হয় তার প্রথম মুদ্রিত ছোটগল্প অযান্ত্রিক যা আনন্দবাজারের বার্ষিক দোল সংখ্যায় (১৯৪০) প্রকাশিত হয়। যে কথা আগেই বলা হয়েছে।
অনামী সঙ্ঘ (বা চক্র) নামে তরুণ সাহিত্যিকদের বৈঠকে বন্ধুদের অনুরোধে সুবোধ ঘোষ পর পর দুটি গল্প অযান্ত্রিক এবং ফসিল লেখেন যা বাংলা সাহিত্যে অসাধারণ আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়।
গল্প লেখার ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে স্বয়ং সুবোধ ঘোষ কী বলেন তা এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। ’- সন্ধ্যা বেলাতে বৈঠক, আমি দুপুর বেলাতে অর্থাৎ বিকেল হবার আগেই মরিয়া হয়ে সাততাড়াতাড়ি গল্প দুটি লিখে ফেলেছিলাম। আশা ছিল, এইবার অনামীদের কেউ আর আমার সম্পর্কে রীতি ভঙ্গের অভিযোগ আনতে পারবেন না। কিন্তু একটুও আশা করিনি যে বন্ধু অনামীরা আমার লেখা ওই দুই গল্প শুনে প্রীত হতে পারেন। অনামী বন্ধুদের আন্তরিক আনন্দের প্রকাশ ও উৎসাহবাণী আমার সাহিত্যিক কৃতার্থতার প্রথম মাঙ্গলিক ধান দূর্বা।’
যতদূর জানা যায় চিন্ময় সেহানবীশ প্রবর্তিত ’অগ্রণী’ পত্রিকায় তার ফসিল গল্প প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। গত শতকের চার দশকে বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে সুবোধ ঘোষের ফসিল গল্প চমক সৃষ্টি করে। অনামী সঙ্ঘের বন্ধুদের অনুরোধে সুবোধ ঘোষ গল্প দুটি প্রথমে লিখলেও তার ভিত যে অনেক আগেই রচিত হয়েছিল তা বুঝতে কষ্ট হয় না অযান্ত্রিক ও ফসিল গল্প দুটি বিশ্লেষণী দৃষ্টি দিয়ে পাঠ করলে। সুবোধ ঘোষ তার জীবনের দীর্ঘকাল কাটিয়েছেন বিহারের রাচি, হাজারিবাগ প্রভৃতি অঞ্চলে। তার বাল্য, কৈশোর ও যৌবনের নানা অভিজ্ঞতা বাংলার বাইরের বিহারকেন্দ্রিক অঞ্চলের নানা স্থান ও কাজের মধ্য থেকে আহরিত। আর একারণেই তার অযান্ত্রিক, ফসিলসহ নানা গল্প উপন্যাসের পটভূমি ওই অঞ্চলকেন্দ্রিক অভিজ্ঞতালব্ধ হওয়া অস্বাভাবিক নয় মোটেই।
সুবোধ ঘোষ তার বিখ্যাত ফসিল গল্পের বিষয়েই শুধু চমক সৃষ্টি করেননি, শুধু গল্পের গঠন নৈপুণ্যই প্রদর্শন করে ক্ষান্ত হননি, তিনি তার শিল্প জীবনের দর্শনকে অনন্য সাধারণ বৈশিষ্ট্যের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। তার গল্পে তিনিও জীবন অভিজ্ঞতার ফসল তুলে ধরেছেন শৈল্পিক রুচি ও মেজাজে। তিনি গল্পের গদ্যে কাব্য স্পন্দিত হিল্লোলিত ভাষা ও ভঙ্গি প্রয়োগে পারঙ্গমতা প্রদর্শন করেছেন সাবলীল রীতিতে।
প্রসঙ্গক্রমে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সুবোধ ঘোষের ফসিল ও অযান্ত্রিক গল্পের ওপর আলোকপাত করা যেতে পারে। অযান্ত্রিক ও ফসিল গল্পের বিষয়বস্তু সম্পর্ণ ভিন্ন। অযান্ত্রিককে সুবোধ ঘোষ প্রাণহীন লক্কড় ঝক্কড় মার্কা একখানা গাড়িকে নিয়ে একটা নিটোল গল্প ফেঁদে বসেছেন যার সাহিত্য মূল্য নিঃসন্দেহে অসাধারণ। শুধু মানুষ ভাঙ্গাচোরা একটা ট্যাক্সি নিয়ে ট্যাক্সি মালিক বিমলের ভাগ্য আবর্তিত হবার কাহিনী অনন্যসাধারণ বাস্তবতার নিরিখে গল্পের আকারে তুলে ধরেছেন বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী গল্পকার সুবোধ ঘোষ।
অন্যদিকে তার লেখা ফসিল অন্য আঙ্গিকের গল্প, যার মধ্যে ত্রিশ চল্লিশ দশকের আগ্রাসী মানুষের আগ্রাসন নির্যাতনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, নির্যাতিত মানুষের মুক্তির আকা´খা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলেছিল। যে সময় ব্রিটিশ ভারত বর্ষে নানামুখী মতবাদের টানাপোড়েন মানুষের মন প্রাণ দ্বিধাদ্বন্দ্বে দোলায় মান। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে গান্ধীর অহিংস আন্দোলন, সশস্ত্র বিপ্লবীদের সহিংস সংগ্রাম, মার্কসীয় সাম্যবাদীদের আলোড়নে সব একাকার হয়ে ওঠে। ফসিল গল্প প্রকাশিত হলে সুবোধ ঘোষ সম্বন্ধে বলা হয়েছিল তিনি সাম্যবাদী আদর্শের প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ গল্প লিখেছেন। আসলে সুবোধ ঘোষের লেখায় ’মতবাদ’ কিছু যদি থাকে প্রকৃতপক্ষে তা ছিল তার নিজস্ব আবিষ্কারের ফসল। তার চিন্তার আর একটি একান্ত নিজস্ব গল্পের ফসল অযান্ত্রিক মেনে নিতেই হবে। সুবোধ ঘোষের ফসিল গল্প বাংলা সাহিত্যে আলোড়ন সৃষ্টি করলো সেকথা আগেই বলা হয়েছে। ফসিল গল্প সম্বন্ধে আরো কিছু বিষয়ের অবতারণা করা যেতে পারে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন ঘটনা প্রবাহের একটা অনুষঙ্গ এ গল্পে উঠে এসেছে। অনামী সঙ্ঘের বৈঠকে ফসিল গল্পটা পড়া হয়। সেই বৈঠকে অরুণ মিত্র, বিনয় ঘোষ, বিজন ভট্টাচার্য, স্বর্ণ কমল ভট্টাচার্য, গোপাল হালদার, সজেন্দ্র নাথ মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ গোস্বামী, হীরেন্দ্র নাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। ফসিল গল্পের গল্পকার সুবোধ ঘোষের সাথে প্রগতিবাদী বুদ্ধিজীবীদের বিচ্ছেদ ঘটে এক পর্যায়ে তার নিজস্ব মতাদর্শের কারণে। সুবোধ ঘোষ ফসিল গল্পে কোন আদর্শ ও মতবাদকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন তা অতি সংক্ষেপে দেয়া যেতে পারে।
লোকজন ফসিল গল্পের পটভূমিকা বিহারের আদিবাসী অঞ্চল এবং সেই অঞ্চলের অধিবাসী। বাংলা মুলুকের বাইরে বিহারের অঞ্জনগড়ের আদিবাসীদের পাশের অদ্র খনির অচেনা লোকের কাহিনী সুবোধ ঘোষ তার এ গল্পের নিজস্ব আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্যে। বাঙালি লেখকদের লেখনীতে বিহার অঞ্চলের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে তার মধ্যে রোমান্স আনন্দ বেদনার সাথে স্বপ্নের বিভোরতা অবশ্যই ছিল, বিহার অঞ্চলে প্রাকৃতিক পরিবেশও তাদের গল্পে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু কালজয়ী গল্পকার সুবোধ ঘোষের গল্পের ঘরানা নিঃসন্দেহে অন্য ধরনের ধাঁচের লেখা। গল্প কথা গাঁথুনিতে স্থানিক পরিবেশের শ্বোসরোধকারী আবহ যার মাঝে জমাট বাধা সংঘাত সংঘর্ষের সাবলীল উপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়। মানুষ কি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ফসিলে পরিণত হয় তারই গল্প শুনিয়েছেন সুবোধ ঘোষ তার ফসিল গল্পে। দেশীয় রাজা মহারাজা পরদেশী সওদাগর দানবীয় সন্ত্রাস করে নিছক দুলাল মাহাজের মৃতদেহ নিক্ষেপ করে খনি গহ্বরে। মহাজনদের অন্যায় অত্যাচারের বলি হয়ে একসময় ফসিল হবার অপেক্ষায় থাকে।
অণ্বেষু কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষের লেখনী সাহসী কল্পনায় ভর করে দুর্গত শ্রমিক স্বজনদের দলিত দেহস্তপের মাঝখান থেকে ফসিল তুলে এনেছেন।
সুবোধ ঘোষের গল্প সৃজনের ব্যতিক্রমী প্রয়াস লক্ষণীয়ভাবে উঠে এসেছে তার অযান্ত্রিক গল্পে। ভাঙ্গা মোটর গাড়ির সাথে মানুষের প্রগাঢ় মানবিক সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে উজ্জ্বল সাক্ষরতার লেখা অযান্ত্রিক গল্প। বিমলের ভাঙা গাড়ির নাম জগদ্দল। লেখক এই গল্পে বলেছেন বিমলের সাথে এই গাড়ির সম্পর্কের কথা।- ব্যস্তত্রস্ত কর্মজীবনে সুদীর্ঘ পনেরোটি বছরের সাথী। এই যন্ত্রপন্ডটি বিমলের সেবক বন্ধু আর সুবোধ ঘোষের মতো শিল্পী নি্র্রাণ একটা ভাঙ্গা গাড়ির মাঝে প্রাণসঞ্চার করতে সচেষ্ট হয়েছেন। গল্পকার বিমলের মুখ দিয়ে কী বলিয়েছেন তা দেখা যেতে পারে।
বিমল ভাবে আমিও যন্ত্র। বেঙ্গলী ক্লাব বলেছে ভাল। বিমল খুশি হয়ে মনে মনে হাসে। কিন্তু জগদ্দলও যে মানুষের মতো বেঙ্গলী ক্লাব তা বোঝে না। এইটেই দুঃখ। মানুষ যন্ত্র, যন্ত্র মানুষ-মানুষ যন্ত্রে এই ওতপ্রোত একান্ত বোধ শিল্পীর অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতাজাত প্রতীতি; অযান্ত্রিক গল্পে সুবোধ ঘোষ যে দুঃসাহস দেখিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে অতুলনীয়।
বিমল যে গাড়িকে প্রাণাধিক ভালবাসে তার শেষ পরিণতি চরম বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে। আমরা সুবোধ ঘোষের অযান্ত্রিক গল্পে যে অসাধারণ মেধা, মনন আর চিন্তার একটা জড় বিষয়কে যেন প্রাণদান করে জীবন্ত করে তুলেছে তার দৃষ্টান্ত পাঠকের সামনে হাজির করার উদ্দেশ্যে এই গল্পের প্রথম এবং শেষ কিছুটা উদ্ধৃতি করা যেতে পারে। গল্পের শুরুটা এভাবে- ’বিমলের একগুঁয়েমি যেমন অজয়, তেমনি অক্ষয় তার এই ট্যাক্সিটার পরমায়ু। সাবেক আমলের একটা কোর্ড, প্রাগৈতিহাসিক গঠন, সর্বাঙ্গে একটা কদর্য-দীনতার ছাপ। যে নেহাত দায়ে পড়েছে বা জীবনে মোটর দেখেনি, সে ছাড়া আর কেউ ভুলেও বিমলের ট্যাক্সির ছায়া মাড়ায় না।
গৃহপালিত পশুর সঙ্গে মানুষের প্রীতির সম্পর্ক গল্পে উপস্থাপন করেছিলেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, শরৎচন্দ্র, তারাশঙ্কর, বনফুল প্রমুখ। একমাত্র সুবোধ ঘোষই অযান্ত্রিক গল্পে দেখিয়েছে বিমলের কাছে যে যন্ত্র ছিল অন্নদাতা, যাকে হারানোর বেদনা বিমলকে যথার্থই মর্মবেদনার কারণ হয়ে দেখা দিয়েছিল।
সুবোধ ঘোষের লেখায় তার সময়ের ঘটনা প্রবাহের অভিজ্ঞতা সিঞ্চিত। তার রচনার সময়কাল প্রধানত চল্লিশ দশকের কলকাতা শহরে পরিশীলিত মধ্যবিত্তের যাপিত জীবনের উৎসরণ থেকে লব্ধ। চল্লিশ দশক নানা সঙ্কট বলয়ে নিরুদ্ধ। চল্লিশ দশক শুরুর এক বছর আগে ১৯৩৯ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ ভারতবর্ষের ওপর তেমনটা না পড়লেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বহ্নিশিখা ভারতবর্ষকেও স্পর্শ করেছিল। ১৯৪২-এর ব্রিটিশের বিরুদ্ধে ’ভারত ছাড়’ আন্দোলন, ১৯৪৩ এ মন¦ন্তর, ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ১৯৪৭-এর দেশভাগের মাঝ দিয়ে চল্লিশ দশক ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। সুবোধ ঘোষ এই বিক্ষুব্ধ দশকের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন তার লেখা গল্প ও উপন্যাসে। তার প্রকাশিত প্রথম গল্প সংকলন ’পরশুরামের কুঠার’ (১৯৪২)। সুবোধ ঘোষের লেখা গল্পে মধ্যবিত্তের পুরনো মূল্যবোধ ভেঙ্গে চৌচির করার গল্প উঠে এসেছে ’গোত্রান্তর’ গল্পে, বলতে হয় গোত্রান্তর পরিবার ভাঙ্গার গল্প। তার লেখা প্রথম দিকের গল্পে সামাজিক অসাম্য সম্বন্ধে ক্ষোভ নিচেয় পড়ে থাকা নির্যাতিত মানুষের প্রতি এক শ্রেণীর তথা কথিত প্রভাবশালী মানুষের জান্তব অবদমনকে কথাশিল্পী সুবোধ ঘোষ হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন। ’পরশুরামের কুঠার’ ছাড়া ’উচলে চড়িনু’, কিংবা ’গরল অমিয় ভেল’ ইত্যাদি গল্পে এই সব অনুষঙ্গ তিনি তুলে ধরেছেন তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে। চল্লিশ দশকে একে একে প্রকাশ করে ছিলেন ফসিল (১৯৪৪), শুক্লাভিসার, শতভিষা (১৯৪৫), একটি নমস্কারে (১৯৪৭) প্রথম জীবনের ’বোহেমিয়ান’ সংগ্রামমুখর কঠিন থেকে আহরিত লড়াকু মানুষটি চল্লিশ দশকের ডামাডোলে নানা ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েও প্রগতি লেখক সংঘের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করেননি। তিনি বিভিন্ন সময়ে নানা বিশ্বাসী হয়ে ১৯৪২-এর আগস্ট বিপ্লবে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সাহসী ভূমিকা রেখেছেন। আগস্ট বিপ্লবে সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে তার ভাগ্যে কারাবাস জুটেছে। তিনি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হতে দ্বিধা করেননি। তার নিজের জীবন বিভিন্ন ভাবাদর্শের দোলাচলে চালিত করেছিল। একান্ত নিজস্ব ভাবনার আলোড়ন থেকে তিনি লিখেছিলেন ’কর্ণফুলীর ডাক’ এর রূপ গল্প। যে গল্পে তিনি চলমান ইতিহাসের দিকভ্রান্ত বিমূঢ়তাকে কটাক্ষ করেছিলেন নির্ভীকভাবে।
অণ্বেষু কথা শিল্পী সুবোধ ঘোষ ১৯৪৪ এ গড়া কংগ্রেস সাহিত্য সংঘ এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। পোড়খাওয়া জীবনের অধিকারী সুবোদ ঘোষ নানা আঙ্গিক থেকে আহরণ করেছিলেন বস্তুনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা। ১৯৪৬ এর ১৬ আগস্ট উত্তর দাঙ্গা বিধ্বস্ত নোয়াখালী থেকে তিনি গান্ধীজির সহচর থেকে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন দাঙ্গা এবং দাঙ্গাউত্তর কালপর্বে সাম্প্রদায়িকতার হিংস্রতাকে। আর সেই সাথে দু’সম্প্রদায়ের একদল ভাল মানুষের সহমর্মিতাকেও।
শুধুমাত্র গল্পকার হিসাবেই সুবোধ ঘোষ অণ্বেষু শিল্পী ছিলেন না। তিনি উপন্যাস রচনাও ঋদ্ধ তার যথার্থ প্রমাণ ’তিলাঞ্জলি’ (১৯৪৪) সুবোধ ঘোষের ঔপন্যাসিক হিসাবে প্রথম প্রভিজ্ঞার স্বাক্ষর ’তিলাঞ্জলি’। এ উপন্যাসে তিনি ’রাজনৈতিক মতাদর্শ’কে উপস্থাপনে প্রয়াসী হয়েছেন। কংগ্রেস সাহিত্য সংঘের মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে এই উপন্যাসে। মন¦ন্তরের পটভূমিকায় রচিত এ উপন্যাসে তৎকালীন কংগ্রেসের প্রতিপক্ষ ’জাগৃতি সংঘ’র জাতীয়তা বিরোধী চরিত্রের মতবিরোধের রূপরেখা অঙ্কনে সচেষ্ট হয়েছেন তিনি এই উপন্যাসে। রাজনৈতিক ভাবাদর্শ রচিত এ উপন্যাস কতটা সার্থকতা লাভ করেছে বিচার্য বিষয়।
সুবোধ ঘোষের অপর উপন্যাস ’গঙ্গোত্রী’ (১৯৪৭)ও রাজনৈতিক পটভূমিকায় রচিত। এ উপন্যাসে রাজনীতির বাইরের কথাও উঠে এসেছে। তিনি রাজনীতির প্রেক্ষাপটে গ্রামীণ জীবনের অন্তরঙ্গ কথামালা তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছেন। এ উপন্যাস কতটা সার্থক তা বিচার্যের গণ্ডিতে আবদ্ধ। তিনি এক সময় কাল পুরুষ ছদ্মনামেও কিছু লেখা প্রকাশ করেছিলেন।
তিনি তার লেখক জীবনের শেষ পর্বে এসে দিক পরিবর্তন করেছেন যা নিঃসন্দেহে তার রচনা শৈলীর স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের উজ্জ্বল স্বাক্ষর বহন করে। শৈল্পিক গুণাবলী তার মধ্যে সতত প্রবহমান তার জ্বলন্ত প্রমাণ রোমান্টিকতায় সিঞ্চিত কাব্যিক গদ্যের উপন্যাস ’ত্রিযামা’ (১৯৫০) এবং মহাভারতের গল্প অবলম্বনে রচিত ’ভারত প্রেম কথা’র গল্পসমূহ। রোমান্টিকতায় অভিসিক্ত মহাভারতীয় প্রেম কাহিনীকে কাব্যিক ভাষায় মোহনীয় অনুষঙ্গে পৌরাণিক কাহিনীর প্রেম ভালবাসার গল্পগুলোকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছেন সুবোধ ঘোষ তার ’ভারত প্রেম’ কথা গল্পমালায়। ক্লাসিকধর্মী কাব্যকে আধুনিক আঙ্গিকে উপস্থাপনের নমুনা বিভিন্ন ভাষায় বিরল নয়। সুবোধ ঘোষের লেখনীতে প্রাচীন মহাকাব্য আধুনিকতায় মন্ময় হয়ে উঠেছে তার দৃষ্টান্ত দেবার পূর্বে হোমারের অডিসি কাব্য এবং টেনিসনের ইউলিসিস কবিতাটি নতুন ভাব ভাষা আর ছন্দময়তায় তারা আধুনিক মনের উপযোগী করে তুলেছেন, যা আমরা সুবোধ ঘোষের ’ভারত প্রেম কথা’তে দেখতে পাই। প্রাচীন মহাকাব্য মহাভারতের নরনারীর প্রেম কাহিনীর মূল কথা থেকে বিচ্যুত না হয়ে সম্পর্ণ স্বাতন্ত্রবোধ উজ্জীবিত করেছেন ’ভারত প্রেম কথা’র গল্পগুলো তা নিঃসন্দেহে অনবদ্য। সুবোধ ঘোষের মনীষার প্রমাণ রেখেছেন প্রাচীন মহাভারতীয় প্রেম কাহিনীতে আধুনিকায়ন করে।
সুবোধ ঘোষ তার ’ভারত প্রেম কথা’র নতুন করে পাব বলে শীর্ষক মুখবন্ধে ’নরনারীর প্রণয় ও অনুরাগ, দাম্পত্যের বন্ধন বাৎসল্য সখ্য-শ্রদ্ধা ভক্তি ক্ষমা আত্মত্যাগ ইত্যাদি যে সব সংস্কারের উপর সামাজিক কল্যাণ ও সৌষ্ঠব নায়ক নায়িকার জীবনে সমস্যার ভিতর দিয়ে বর্ণিত হয়েছে। শত ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্বের যেসব কাহিনী মহাভারতে বিবৃত হয়েছে তার মধ্যে এই বিংশ শতাব্দীর যে কোন মানুষ তার জীবনের এ সমস্যার অথবা আগ্রহের রূপ দেখতে পাবেন। এ কারণে শতেক যুগের কবি দল মহাভারত থেকে তাদের রচনার আখ্যান বস্তু আহরণ করেছেন।’
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, রবীন্দ্রনাথও মহাভারতের কাহিনীকে তার বিভিন্ন কবিতা কাব্যে ব্যবহার করেছেন। ’কচ ও দেবযানী’ সংবরণ তপতী কাহিনী এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সুবোধ ঘোষের ’ভারত প্রেম কথা’ বাংলা গল্প সাহিত্যে তার মাস্টার পিস বললে অত্যুক্তি হয় না। তিনি শুধুমাত্র এ পর্যন্ত লিখেই ক্ষান্ত হননি। তিনি তার নিজস্ব ঘরানায় মানভূম জেলা অন্ত্যবাসী জীবনের গাথা ’শতকিয়া’ (১৯৫৮)তে উপস্থাপন করেছেন আর এক উপাখ্যান।
পরিশেষে বলতে হয়, সুবোধ ঘোষ সংঘাত-সংঘর্ষে ভরা আদিম জীবন প্রবাহকে তার চিন্তা, চেতনা, মেধা, মনন, নিজস্ব বোধ আর প্রতীতির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনের কুশলী রূপকার হিসাবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা তাকে অণ্বেষু কালজয়ী শিল্পীরূপে চির ভাস্বর করে রাখবে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন