বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

পাঠককে আবেগপ্রবণ করার কৌশল


সাজেদা হক

গল্পকে ছুঁয়ে দেখতে চায় পাঠক, গল্পকে অনুভব করতে চায়। বাক্যের প্রতিটি শব্দে নিজেকেই ভাবতে ভালোবাসে। পাঠক গল্পের মতোই সাহসী, রোমাঞ্চে ভরপুর, উত্তেজনাকর, রহস্যেঘেরা, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় জীবনকে ভালোবাসে। বার বার ভাবতে চায় তাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে গল্পের কাহিনী। ভাবতে ভালোবাসে তার জীবনটাও ঠিক গল্পের নায়কের মতো।


গল্প থেকেই পাঠক নতুন কিছু শিখতেও চায়। নতুন ভুবন তৈরি করে সেখানেই বা করতে চায়। চিন্তার নতুন জগতে, নতুন অনুভবে বিচরণ করতে চায় অনবরত। পাঠক মূলত অন্য যাপিত জীবনে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে চায়। তাই লেখকের দায়িত্ব হচ্ছে পাঠককে নতুন একটা ভুবন উপহার দেয়া। নতুন এন একটা ভুবনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া যেখানে সে অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও এক ধরনের টান অনুভব করবে। আপন করে ভাবতে শুরু করবে। এমনটা খুব বেশি কঠিন কি? যাদের কাছে খুব কঠিন মনে হচ্ছে, তাদের জন্য সহায়ক কিছু কৌশল নিয়ে এবারের আলোচনা।

১. দৃশ্যের কল্পনা করতে সাহায্য করুন, পুরোটা বলবেন না।
 ধরেন, আপনার কথা সাহিত্যের কোন একটি চরিত্র লোভী, হিংসুক কিংবা ভীতু। এই চরিত্রগুলো কিভাবে ফুটিয়ে তুলবেন ভাবছেন? ঠিকই ভাবছেন, কাজের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হবে। বর্ণনার মাধ্যমে নয়। এতে পাঠক নিজে থেকেই অনুমান করবে। অনুমান করতে যুক্ত হবে আপনার কথা সাহিত্যে। নিজেকে, নিজের কাজগুলোকে মেলাতে থাকবে। নিজের করা ভুলের সঙ্গে, কিংবা তার পরিচিত আশপাশের লোকের সঙ্গে আপনার কল্পিত চরিত্রগুলোর মিল খোঁজার চেষ্টা করবে। যখন কোথাও গিয়ে মিল খুঁজে পাবে, তখনই পাঠক আপনার কাহিনীকে নিজের কাহিনী ভাবতে শুরু করবে। একজন লেখক হিসেবে এটাই আপনার বড় চ্যালেঞ্জ।

২. সহানুভূতিশীল চরিত্র তৈরি করুন: আপনার কথাসাহিত্যে চরিত্রগুলোর প্রতি সহানুভূতি দেখানোর জায়গা রাখুন। পাঠক যেন আপনার কল্পিত চরিত্রগুলোর প্রতি মায়া-মমতা প্রবণ হয়ে ওঠেন। যখন পাঠক আপনার চরিত্রের কান্নায় কাঁদবে, খুশিতে হাসবে, লেখক হিসেবে তখনই স্বার্থক আপনি।

পাঠকরা তার জীবনের সঙ্গে আপনার কল্পিত চরিত্রকে মিশে যায়, তখন আপনার কথাসাহিত্য প্রাণ পায়। আপনার চরিত্রের বলা, চলা, ভাবনা-চিন্তা-চেতনা এমনকি মানসিক-শারীরিক প্রত্যেকটি অনুভূতি অনুভব করে। আর পাঠককে আপনার চরিত্রের সঙ্গে আবেগপ্রবণ করে তোলার আগে এই ছোট ছোট সংযোগগুলো হওয়া জরুরি। এর ফলে আপনার কল্পিত চরিত্রগুলির দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না, অনুভব-অনুভূতি স্পর্শ করবে পাঠকের হৃদয়। আপনার চরিত্র হয়ে উঠবে কালজয়ী, স্বতন্ত্র।

৩. একটি রোবোটিক চরিত্র তৈরি করুন: পাঠকের সহানুভূতি আদায় করতে এমন একটি রোবোটিক চরিত্র তৈরি করুন, যা আপনার গল্পকে গতি দেবে। সে চরিত্রের কোন দয়া-মায়া থাকবে না। থাকবে না কোনো অনুভূতি। সে কেবল কষ্টই দেবে, ক্ষতিই করবে। নিষ্ঠুর একটি চরিত্র যাকে বলে। এই চরিত্রটি আপনার পাঠককে মূল চরিত্র বাছাইয়ে সহযোগিতা করবে। ভাল-মন্দে, সৎ-অসৎ, নায়ক-খলনায়ক চিনতে সাহায্য করবে। নিজের অনুভূতির শেয়ার করে নেবে। পাঠক নিজেকে আপনার কল্পিত ‘প্রধান চরিত্র’ ভাবতে শুরু করবে। এটাই তো চান, তাই না?

৪. পিছনে ফিরবেন না : গল্পের কাহিনী যাই হোক না কেন, কোনো কারণেই পিছনে ফিরবেন না। কোন দুঃখ-কষ্ট-বেদনাকে পুঁজি করে বার বার আবর্তিত হবেন না। বরং এসবের ওপর ভিত্তি করে কেবলি সম্মুখে এগিয়ে যাবেন। কারণ এগিয়ে যাওয়ার নামই জীবন। তাই অতীত নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ এর দিকেই এগিয়ে যাবে আপনার কল্পিত প্রতিটি চরিত্র। আর এমন একটি চরিত্র থেকেই উৎসাহ-প্রেরণা পাবেন পাঠক। বার বার নিজেকেই খুঁজে পাবেন।

৫. আপন কোনো চরিত্রকে নির্দ্বিধায় হত্যা করুন: এখানে 'হত্যা' রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। খুনও করতে পারেন, শুধু খুন নয়, অন্য কিছুও করতে পারেন। নায়কের কাছের কোনো চরিত্রকে অবিশ্বাসী বানাতে পারেন। এমনকি খুনী কিংবা চরিত্রহীনও বানাতে পারেন। চরিত্রটি হতে পারে প্রতারকও। আপনার কল্পিত প্রধান চরিত্রের সবচেয়ে কাছের মানুষটি তার জীবনের সব দুঃখের কারণ হতে পারে। সুতরাং এমনটা করতে দ্বিধা করবেন না। কারণ বাস্তব জী্বনে এমনটা ঘটে হরহামেশাই। নতুন কিছু নয়। এতে করে পাঠকের কাছে আপনার গল্পের ‘গ্রহণযোগ্যতা’ বেড়ে যাবে।

৬. ইঙ্গিত দিন : কাহিনী কোন দিকে মোড় নিতে পারে, তেমন ইঙ্গিত দিন পাঠককে। কাহিনী তো মোড় নেবেই। ঘটনার পর ঘটনা ঘটতেই থাকবে। পরবর্তীতে কি ঘটতে পারে বা ঘটাতে যাচ্ছেন তার ইঙ্গিত দিন পাঠককে। কারণ পাঠক এতক্ষণে আপনার সঙ্গে সঙ্গে চলা করেছেন। সুতরাং কিছুটা শেয়ারিং হলে দোষের কিছু নেই, বরং লাভ।

৭. নতুন ‘শব্দ’ যোগ করুন: নতুন নতুন ছোট ছোট শব্দ যোগ করুন। কিছু শব্দ পাঠককে আকৃষ্ট করার দারুন হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। আজো যেমন ‘রোমঞ্চকর’ অনুভূতির মায়া থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। যেমন পারিনি ‘রহস্যোপন্যাস’ শব্দ থেকে বের হতে। বার বার এসব শব্দের প্রেমে পড়ি আমরা। এই যে ভালোলাগা দুটি শব্দ ‘রোমাঞ্চ’ আর ‘রহস্য’ দুটোই দারু্ণ টানে মানুষকে, আন্দোলিত করে পাঠকের আবেগও।

এগুলো তো উদাহরণ। শব্দের ভাণ্ডারে যোগ হওয়া নতুন শব্দের প্রতি পাঠকের আগ্রহ চিরকালীন। এটাকে পুঁজি করতে পারেন আপনিও। আপনি কথা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। খেলতে পারেন ভাষা নিয়ে ভাষা-ভাষা খেলা। নতুনের প্রতি আগ্রহটা আসলে চিরন্তন, আসলেই বলে বোঝাবার নয়। এ আগ্রহটা অনেকটাই আত্মিক, আন্তরিক আর কিছুটা জ্ঞানচর্চাভিত্তিকও বটে। একই রকমের শব্দ, বাক্য শুনতে শুনতে মাঝে মধ্যে পাঠকও বিরক্ত হন। নতুন শব্দের কথা সাহিত্যে বা গল্পে আগ্রহটা বেশি। অনেকে লেখার সময় গল্পের আঙ্গিক, কনটেন্ট, ধরন, বৈশিষ্ট্য, প্রাধান্য, মূল বিবেচ্য, থিম, স্থান, কালের বিবেচনা করেন। এসব তো বটেই, কথা সাহিত্যকে সর্বজনকর্তৃক সমাদৃত করতে অবশ্যই যোগ করতে হবে নতুন নতুন শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ।


৮. ‘জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ’-এমন দৃশ্যকল্প যোগ করুন: পাঠক কি চায়? এমন একটি চরিত্র বা ঘটনার বর্ণনা, যা তাকে গল্পে যুক্ত করবে। সেটা হোক আতঙ্কজনক, হোক ভালোবাসা্ময় কিংবা হোক যে ঘৃণার। আপনার চরিত্রগুলোকে নিয়ে যেন চিন্তা করতে হয় পাঠককে। তাই এমন চরিত্র তৈরি করুন যাতে পাঠকের মনে করুণার উদ্রেক হয়। গল্পে বা কথা সাহিত্যের প্রধান চিরত্রের সাথে এমন কিছু অন্যায় ঘটতে দিন, যাতে করে নিজের অজান্তেই প্রতিবাদ করে বসেন পাঠক। হুমা্যূন আহমেদের ‘কোথাও কেউ নেই’ এর উদাহরণ । মনে আছে, বখাটে যুবক বাকেরের ফাঁসি বন্ধে রীতিমত আন্দোলনে নেমেছিল আমজনতা।

৯. নেতিবাচক চরিত্র বাছাইয়ের সুযোগ দিন: আপনার প্রধান চরিত্র যা করছে, সেটা করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় ছিল না--এটা আপনার পাঠককে বোঝাতে হবে। মন্দের মধ্যে ভালো বাছাই করুক আপনার পাঠক। তাকে সুযোগ দিন খারাপের মধ্যে ভালোটাকে বাছাই করার। মন্দের ভালো যাকে বলে। এতে করে আপনার চরিত্রগুলোর প্রতি এক ধরণের সহানুভূতিশীল হয় উঠবেন পাঠক।

১০. বিপদের পর বিপদে ফেলুন: অনবরত আপনার প্রধান চরিত্রকে বিপদে ফেলুন। একের পর এক বিপদ থেকে উদ্ধার হওয়ার কাহিনীই সমৃদ্ধ করুক আপনার কথাসাহিত্য। যাতে করে পাঠক নিজেও চায় যে, কিভাবে আপনার নায়ক এতসব বিড়ম্বনা-দুঃখ-কষ্ট জয় করে শেষ পর্যন্ত বিজয়ের গান গায়। দেখবেন বিপদমুক্ত হওয়ার এ ভ্রমণে এমনিতেই যুক্ত হচ্ছেন পাঠক। কারণ বাস্তবতাও তাই। আমাদের জীবনেও কিন্তু বিপদ লেগেই থাকে। সুতরাং এমন সিচুয়েশনে অবশ্যই পাঠক যুক্ত হতে বাধ্য।

১১. গল্পকে এগিয়ে নিন: গল্পটি যেন একটি ঘটনাতেই স্থির না হয়ে যায়। একই ঘটনাকে কেন্দ্র যেন আবর্তিত না হয়। একই ঘটনার বার বার বর্ণনা করার কারণে পাঠকও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। সুতরাং সাবধান।

১২, বাস্তবসম্মত সমস্যা যোগ করুন: নতুনের নামে উদ্ভট কিছু যোগ করবেন না। সচরাচর যা ঘটে, তাই যোগ করুন। সমস্যা কেবল আর্থিক হতে পারে ...তা নয় কিন্তু। সমস্যা হতে পারে শারীরিক, মানসিক, পারিবারিক, আত্মিক। হতে পারে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, বিদ্বেষ, ভয়, প্রতারণা- এমনকি বিশ্বাসঘাতকতাও।

১৩, অসাধারণ সব সমাধান যোগ করুন: যেভাবে খুবই সাধারণ সমস্যা যোগ করবেন, ঠিক একইভাবে এসব সমস্যার সমাধান করবেন যা হয়ে উঠবে ‘অসাধারন’। একই রকম বিপদে পড়লে পাঠক যে সমাধান করেন আপনার সমাধানও ঠিক এমন হল চলবে কেন? ভাবুন এবং ব্যতিক্রম সমাধান যোগ করুন।
১৪. দৃশ্যে দৃশ্যে দ্বন্দ্ব যোগ: প্রত্যেকটি দৃশ্যে দ্বন্দ্ব যোগ করুন। দ্বন্দ্বে দ্বন্দ্বে এগিয়ে যাক আপনার কথা সাহিত্য। একটা দ্বন্দ্বের পর অসাধারণ সমাধান, আবারো দ্বন্দ্ব। আবারও সমাধান। এটাই তো চক্র। এই চক্র ধরেই এগুতে থাকুক আপনার কথা সাহিত্য।

১৫. ছোট ছোট অনুচ্ছেদের সাহায্য নিন: শর্ট এন্ড সুইট ছোট ছোট বাক্য, অনুচ্ছেদে আবেগের প্রকাশ করুন। যেমন আপনার চরিত্র ভয় পেয়েছে। এর একটা ছোট ব্যাখ্যা দিয়ে দিন। ব্যাখ্যা দিতে ব্যবহার করুন ছোট ছোট অনুচ্ছেদ।

১৬. অতিরিক্ত বিষয় ঝেড়ে ফেলুন: আপনার গল্প লেখা শেষ হলে লেখাটি আবারো পড়ুন। চরিত্রে আবেগ প্রকাশের অংশগুলোতে খেয়াল রাখুন। ভীষণ সতর্ক হোন। প্রেমিক-প্রেমিকার প্রথম সাক্ষাৎ করাবেন, আশপাশের পরিবেশ পরিস্থিতির বেশি বর্ণনার কি দরকার আছে? ভাবুন, বেশি থাকলে ঝেড়ে ফেলুন। পরিবেশের বর্ণনার পরিবর্তে উভয়ের মানসিক স্থিতির হালকা বর্ণনা করুন।

১৭. সেটিং এর ব্যবহার করুন: পাঠককে আকৃষ্ট করতে সেটিং এর ব্যবহার করুন। স্থান-কাল-পাত্রের এর বিবরণ আকৃষ্ট করে পাঠককে। সকাল, নাকি দুপুর-- নাকি সন্ধ্যার ঘটনা, এটা-জানতে চায় পাঠক। এতে করে আপনার চরিত্রের ‘মুড সম্পর্কে সহজেই ধারণা করতে পারবেন পাঠক। তিনি নিজেকে  যুক্ত করে ফেলবেন আপনার লেখার মধ্যে।

১৮. দৃশ্যের যুক্তিসঙ্গত বর্ণনা করুন: দৃশ্যকে বিস্তার ঘটান। পাঠককে বোঝতে সাহায্য করুন, কেন এই দৃশ্যের অবতারণা, কি চাচ্ছেন আপনি। আপনার বলার কারণ ব্যাখ্যা করুন। চরিত্রটি কেন এমন করছে তার যুক্তি যুক্ত করুন। পাঠক এমনিতেই যুক্ত হবে।


লেখক পরিচিতি
সাজেদা হক
ঢাকা। বাংলাদেশ।
অনুবাদক। প্রবন্ধকার। সাংবাদিক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন