বুধবার, ১৭ জুন, ২০১৫

জিভ কাটো লজ্জায়, গুন্টার গ্রাসের প্রায়শ্চিত্ত

দীপেন ভট্টাচার্য

গুন্টার গ্রাসকে নিয়ে লেখার সামর্থ্য আমার একেবারেই নেই, এরকম একজন লেখকের মূল্যায়ণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বহু আগে তাঁর Show Your Tongue পড়েছিলাম। সেই বইটিতে ছিল তাঁর ১৯৮৬/৮৭ সনে কলকাতা বাসের অভিজ্ঞতা। পশ্চিমে এই বইটি খুবই সমাদৃত হয়েছিল। গঠনগতভাবে গদ্য-শব্দ, চিত্র শিল্প ও গর্জে-ওঠা কবিতা এই তিনটি স্টাইলের এক বিশেষ উপস্থাপনা বইটিকে করেছিল অনন্য।

গ্রাস কলকাতা গিয়েছিলেন তাঁর The Plebians Rehearse the Uprising নামে একটি নাটক মঞ্চস্থ করতে, কয়েক মাস সময় নিয়ে। কলকাতার চরম দারিদ্রতা তাকে বিহ্বলিত করেছিলে। ছবি, কবিতায়, গদ্যে ভরা সেই বইটিতে মানুষের চরম দারিদ্রে লজ্জায়, অপমানে, ক্রোধে গ্রাস পৃথিবীকে বলছেন, মা কালীর মত লজ্জায় তোমার জিভ কাটো। মানুষ কেমন করে এই নীচতা সহ্য করে সেই ভেবে আশ্চর্য হয়েছেন। শহরতলী থেকে কলকাতায় নিয়মিত যাতায়াত করতেন ইলেকট্রিক লোকাল ট্রেনে। মানুষের নিঃস্বতা, ঘামের গন্ধ, দৈনন্দিন বাঁচার যুদ্ধ নিজে অনুভব করে লিখেছেন। মনে পড়ে তখন কলকাতায় বসবাসরত রাষ্ট্রহীন মানুষ কবি দাউদ হায়দারকে জার্মানীতে প্রবসনের জন্য ভিসা পেতে সাহায্য করার চেষ্টা করছিলেন সেটাও ঐ বইটিতে ছিল। ১৯৮৬তে গুন্টার ঢাকা গিয়েছিলেন মাত্র কয়েকদিনের জন্য, দাউদ হায়দারের বৃহত্তর পরিবার দেখাও তার একটি উদ্দেশ্য ছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর অত্যাচার তখন তাঁর মাথায় ছিল, সবাইকে এই ব্যাপারে অন্তর্ভূক্ত করতে চাইতেন।

ফিরে যাই 'জিভ কাটো লজ্জাতে'। আমি ভাল পাঠক ছিলাম না, মনে হয়েছিল গুন্টার গ্রাস কলকাতাকে তেমন করে চিনতে পারেন নি, শুধু গরু ও গোবর দেখেছিলেন, তাঁর আন্তরিক মর্মস্পর্ষী আলেখ্য শেষপর্যন্ত হয়তো পশ্চিমে কলকাতার মানুষকে পশুর পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

মাঝে অনেক বছর গেছে, বয়স বাড়ার সাথে আমি হয়তো আজ বইটির মূল্যায়ণ ভিন্নভাবে করব। আজ আমি দেখি গ্রাস শিশুশ্রম দেখে বিচলিত হয়ে চিরাচরিত প্রতিবাদী ক্ষোভ প্রকাশ করেন নি, বরং বলেছেন ছয় বছরের মেয়ে যে গোবরের ঘুটে বানায় তার সাথে বেদীতে রাখা তথাকথিত উঁচু আর্টকে প্রতিযোগিতা করতে বাধ্য করতে হবে। গ্রাসের কাছে সেই ছয় বছরের মেয়েটির বাস্তবতা উচ্চ আর্ট থেকে অনেক মূল্যবান ছিল।

কলকাতার লোকদের নেতাজী সুভাষ বসুর প্রতি অনুরক্তি দেখে গ্রাস প্রথমে বিরক্ত হয়েছিলেন। বাঙালীরা নাকি শক্ত নেতা পছন্দ করে। টিন ড্রামের লেখক হিটলারের ছায়া দেখেন তাতে। আমার এক বাংলা-প্রেমী ইংরেজ বন্ধু নেতাজী সম্পর্কে আমার নরম ভাব দেখে হাসে। আমি তাকে বলি, "শোনো বাঙালীর ভীরু জাতি হিসেবে দুর্নাম আছে। নেতাজীকে দেখ, জার্মানী জাপানকে পটিয়ে ফেলল, আর কারুর এরকম ক্ষমতা আছে?" তারপর ভাবি হিটলারের কুকর্ম নেতাজী সরাসরি না দেখলেও জাপান দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় যে মারণযজ্ঞ করেছিল তিনি কি সেটার ছিঁটেফোটাও দেখেন নি। যাইহোক ফ্যাসীবাদ-বিরোধী গ্রাস বাঙ্গালীর নেতাজী-পূজো পছন্দ করেন নি, তবে বইয়ের শেষে হয়তো কিছুটা সমঝোতা করেছিলেন - ভারতে নেতাজীর একটা ভূমিকা দেখেছিলেন, এমনকি নেতাজীকে নিয়ে একটি নাটক লেখার কথাও ভেবেছিলেন। এখানে বলে রাখি যে নাটকটি করতে তিনি কলকাতা গিয়েছিলেন সেটিতে ১৯৫৩ সনে পূর্ব জার্মানীতে শ্রমিক বিদ্রোহের সময় নাট্যকার বেরটোল্ড ব্রেখটের দোদুল্যমানতা (বলতে গেলে শ্রমিক স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা) চিত্রিত হয়েছিল।

কিন্তু নেতাজীকে নিয়ে গ্রাসের যে বিশেষ প্রতিক্রিয়া তার উৎস খুঁজতে হলে আমাদের একটু অপেক্ষা করতে হবে, আমি সেটা একটু পরে লিখছি।

আমি যখন 'তোমার জিভ কাটো' পড়ি তখনও গুন্টার গ্রাস নোবেল পুরস্কার পান নি (সেটা পান ১৯৯৯ সনে), কিন্তু টিন ড্রাম বইটির দৌলতে তাঁর নাম ইতিমধ্যে বঙ্গদেশের বাম মহলে খুব পরিচিত ছিল। বাম মহলে তিনি সমাদ্রিত ছিলেন কারণ গ্রাস জার্মানীর তখনকার বাম-ঘেঁষা সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টির একজন সক্রিয় সমর্থনকারী ছিলেন, চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের বক্তৃতা লিখে দিতেন, মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির বিরোধী ছিলেন আর ১৯৮৯ সনে সোভিয়েত ব্লক পতনের পর পশ্চিম ও পূর্ব জার্মানীর একত্রীকরণে খুশী হন নি। হয়তো তিনি চেয়েছিলেন কোনো মানবিক কমিউনিস্ট সমাজ, অথচ নিজেই The Plebians Rehearse the Uprising লিখেছেন যেখানে দেখিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র (এই ক্ষেত্রে পূর্ব জার্মানী) কেমন করে শ্রমিক স্বার্থবিরোধী চরিত্রে অবতীর্ণ হয়।

বহু পরে গ্রাসের টিন ড্রাম ছবিটি দেখার সুযোগ হয়। এবং তারপরে মূল বইটি পড়ি রালফ মানহাইমের অনুবাদে। আমি যতদূর জানি এই বইয়ের বাংলা অনুবাদ নেই, এর অনুবাদ বাংলাতে কি আদৌ সম্ভব? গুন্টার গ্রাস তাঁর বইয়ের অনুবাদের ব্যাপারে খুব খুঁতখুঁতে ছিলেন এবং যে সব ভাষায় অনুবাদ হত সেইসব অনুবাদকদের একসাথে করে সম্মেলন করতেন।

টিন ড্রাম একটি কালোজয়ী উপন্যাস। মার্কিন লেখক জন আরভিং লিখেছেন, চার্লস ডিকেনস তাঁকে লেখক হতে অনুপ্রাণিত করেছিলেন, কিন্তু গ্রাস তাঁকে কেমন করে বই লিখতে হিবে সেটা দেখিয়েছেন (আরভিংয়ের সাথে গ্রাসের বিশেষ বন্ধুত্ব ছিল)। বইটি বের হয় ১৯৫৯ সনে আর সিনেমাটি করা হয় ১৯৭৯এ। ছবিটি ১৯৭৯য়ের কান উৎসবের মূল পুরস্কার পায়, এছাড়া ১৯৮০ সনের বিদেশী ভাষার অস্কারও জিতে নেয়। বলতে গেলে এই ছবির মাধ্যমেই মানুষ মূলতঃ গুন্টার গ্রাসকে চেনে। মূল বইটি এত বড় এবং তার মাঝে এত জিনিস আছে যে সেটাকে সহজে গুছিয়ে বলা সম্ভব নয়, তাই ছবিটি করতে গিয়ে পরিচালক ভলকার শ্লোনডরফকে কিছুটা আপস করতে হয়েছে, তাই টিন ড্রাম বইটির দ্বিতীয় অংশ এই সিনেমায় অনুপস্থিত। তবু যেখানে ছবিটি শেষ হয়েছে, মূল চরিত্র অস্কারের ডানজিগ ত্যাগের মাধ্যমে, সেটা যথাযথ হয়েছে।

গ্রাস টিন ড্রাম বইটি লিখেছেন কারুর প্রতি কোনো করুণা না দেখিয়ে, দ্বিতীয় যুদ্ধ-পূর্ব, যুদ্ধ-কালীন ও যুদ্ধ পরবর্তী জার্মান সমাজের চিত্র তুলে ধরেছেন যার মাঝে আছে এক ধরণের জাগতিক বিচ্ছিন্নতা, অবক্ষয়, হিপোক্রিসি, নিষ্ঠুরতা, প্রেম। সব মিলে মিশে এক মহাভারত যার প্রতিটি অধ্যায় হতে পারত একটি বিচ্ছিন্ন বই। তাঁর কাহিনীতে এতগুলো স্তর যে সহজে সেগুলো উন্মোচন করা সম্ভব নয়। টিন ড্রাম হল অস্কারের কাহিনী, পোল্যান্ডের জার্মান অধ্যুষিত ডানজিগ শহরে বা বর্তমানে গ্দানস্কে শহরে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তার বড় হবার কাহিনী, অস্কারের পরিবারের কাহিনী, বিভিন্ন ভালবাসা ও মৃত্যুর কাহিনী, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে এই শহরটির ভূমিকা ও যুদ্ধপরবর্তী সময়ে অস্কারের মূল জার্মানীতে অভিবাসন ও শেষাবধি ৩০ বছর বয়সে একটি মানসিক কারাগারে তার জীবন কাহিনী। বইটির শুরুই হয়েছে এই বাক্যাটি দিয়ে - Granted: I am an inmate of a mental hospital।

অস্কারের কাহিনীকে যাদু বাস্তবতা বলা হয়। এই কাহিনীর শুরুই এক চমকপ্রদ ঘটনা দিয়ে যখন অস্কারের জার্মান মাতামহী এক আন্দোলনকারী কাসুবিয়ান শ্রমিককে জার্মান পুলিশ থেকে রক্ষা করার জন্য তাঁর স্কার্টের নিচে আশ্রয় দেন। কাসুবিয়ানরা পশ্চিম পোল্যান্ডের বাসিন্দা, অনেক সময় তাদের পোলিশ ধরা হয়, বর্তমানে তাদের ভাষাকে পোল্যান্ডে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে, গ্রাসের মা ছিলেন কাসুবিয়ান। যাইহোক টিন ড্রাম কাহিনীতে সেই কাসুবিয়ান শ্রমিকই হলেন পরে অস্কারের মাতামহ। তাঁদের মেয়ে - অস্কারের মা এগনেস - ভালবাসত তার মামাতো ভাই এক পোলিশ তরুণ জান ব্রনস্কিকে, কিন্তু বিয়ে করল এক জার্মান দোকানদার আলফ্রেড মাটজেরাথকে। মাটজেরাথ ছিল নাৎসি পার্টির সদস্য, ভালবাসত রান্না, আর জান ব্রনস্কির সাথে এগনেসের প্রেম (মানসিক ও দৈহিক) দেখেও দেখত না।

ব্রনস্কির সঙ্গে এগনেসের সম্পর্কের কারণে তার পিতা যে কে সেই সম্বন্ধে অস্কার নিশ্চিত ছিল না। কাহিনীটি এখানে প্রথম পুরুষে বলা হচ্ছে। অস্কারের কথামত যখন তার তিন বছর বয়স সে তাদের বাড়ির বেসমেন্ট ঘরের সিঁড়ি থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে লাফ দিয়েছিল। কেন লাফ দিয়েছিল? কেননা সে আর বড় হতে চায় নি। এই ঘটনায় তার মাথায় চোট লাগে এবং মনে কিংবা দেহে কোনোটাতেই অস্কার আর বড় হতে পারে না। অস্কার বড় হতে চায় না, তার সঙ্গী হচ্ছে টিন ড্রাম। কিন্তু অস্কার আবিষ্কার করে তার কাছে রয়েছে এক মোক্ষম অস্ত্র, সে তীক্ষ্ম চিৎকার সমস্ত কাচের জিনিস ভেঙ্গে ফেলতে পারে। এর শুরুই হয় যখন তার থেকে টিনের ড্রামটি নিয়ে নেবার চেষ্টা করা হয়। খেলার সাথীর অভাবে ড্রামটিই তার সঙ্গী, সেই সাথীকে রাখার জন্য সে সবকিছু করতে প্রস্তুত। কিন্তু কারণে-অকারণে তার শব্দ-অস্ত্র প্রয়োগে সে পিছ-পা নয়। আমরা জানি জোরালো শব্দ দিয়ে কাচের জিনিস ভাঙ্গা যায়, কিন্তু সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর দিয়ে তা ভাঙ্গা যায় না। কিন্তু গ্রাস অস্কারকে এই অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছিলেন, অস্কার দূরবর্তী জানালা বা ঝাড়লন্ঠন তার চিৎকারে ভেঙ্গে ফেলতে পারত। এমন কি কোনো কোনো সময় সেই চিৎকার মানুষের শ্রবণক্ষমতার বাইরের কম্পাঙ্কে সংঘঠিত হত। অস্কার যেমন অন্য শিশু-কিশোরদের নিষ্ঠুরতার শিকার হত তার নিজের অপরিপক্ক মন অনেকের ক্ষতি করেছিল। পাঠকের পক্ষে অস্কারকে ভালবাসা সম্ভব নয়।

এর মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হল, জার্মানরা ডানজিগ দখল করল, জান ব্রনস্কি কাকতালীয়ভাবে (কিছুটা অস্কারের দোষেই) পোলিশদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে প্রথমেই নিহত হল। এর মধ্যে এগনেস মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে ও মারা যায়। যুদ্ধের সময় আলফ্রেড তার দোকানের কাজের জন্য মারিয়া নামে একটি তরুণী প্রতিবেশী মেয়েকে নিযুক্ত করে। মারিয়ার সাথে অস্কারের দৈহিক সম্পর্ক হয়। পরবর্তীকালে মারিয়াকে আলফ্রেড বিয়ে করে ও তাদের একটি পুত্রসন্তান হয়। অস্কার ভেবেছিল সেই সন্তানটি তার, কিন্তু দেখা গেল সে অস্কারের মত ছোট দেহে আটকে থাকল না।

ডানজিগের জার্মানদের কাছে যুদ্ধের দামামা অনেক দূরে ছিল যতদিন না রুশরা পূর্ব থেকে পোল্যান্ডকে জার্মানীর হাত থেকে মুক্ত করে। আলফ্রেড এক অ্যাবসার্ড ঘটনায়, হয়তো কিছুটা নিজের দোষে, কিছুটা অস্কারের দোষে, প্রথম দিনই রুশদের হাতে মারা যায়। অস্কারের দায়িত্ব নেয় তার তরুণী স্ত্রী মারিয়া।

এর পর সবাই ট্রেনে করে মূল জার্মানীতে অভিবাসী হয়ে যায়। সেই ট্রেন পড়েছিল যুদ্ধোত্তর প্রতিহিংসাকামী পোলিশ তরুণদের কবলে যারা যাত্রীদের কাছ থেকে সব মালামাল ছিনিয়ে নেয়। কিন্তু সেই জার্মানিগামী ট্রেনেই অস্কার বড় হতে শুরু করে। নতুন জায়গায় ডুসেলডর্ফে অস্কার কবরের পাথরকাটার কাজ করে, তারপর সে একজন ড্রাম বাদক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। সে একজন বিখ্যাত বাদক হয়ে ওঠে, কিন্তু সে একটি খুনের ঘটনায় নিজেকে খুনী হিসেবে সাজিয়ে অপরাধী সাব্যস্ত হয়। তাকে একটি মানসিক আরোগ্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে বসেই সে আমাদের তার কাহিনী বলে।

কিন্তু টিনের ড্রাম যে বাজায় ওস্কার, যাকে কিনা পাঠক কখনই ভালবাসবে না, সে কি বলতে চায়? সে বড় হতে চায় না, তার কারণ কি যে সে ভাবে বড় হলে তাকে দায়িত্ব নিতে হবে, তার দোষ স্বীকার করতে হবে, পাপ স্বীকার করতে হবে? কি সেই দোষ? কি সেই পাপ? নাকি উল্টোটাই সত্যি, কারণ শিশু-সুলভ মন ও দেহ নিয়েই অস্কার পরোক্ষভাবে হলেও একটির পর একটি মৃত্যুর কারণ হয়, তার মা'র, তার কাকা (অথবা পিতা) জান ব্রনস্কির, তার আইনী পিতা আলফ্রেড মাটজেরাথের। নাকি শিশু ও কিশোর অবস্থায় যে দোষ সে করেছে তা খণ্ডাতেই সে কাহিনীর শেষে নিজেকে খুনী হিসেবে সাজালো?

গ্রাসের দ্বিতীয় বই 'বিড়াল ও ইঁদুর'ও ডানজিগের কাহিনী, হয়তো এটাও তাঁর কৈশোর ও তারুণ্যের কাহিনী যেখানে প্রটাগনিস্ট সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন (এবং যে কিছুদিনের জন্য জার্মান সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়, কিন্তু পরে পালিয়ে আসে)। এই বইটি পড়া একটু কঠিন, কারণ গ্রাস এই গল্পে সময়ের ক্রমান্বয়তা অনেক সময়ই ক্ষুন্ন করেছেন, এছাড়া কোনো সময়ে প্রধান চরিত্রের কার্যকলাপ দ্বিতীয় পুরুষে, কখনো তৃতীয় পুরুষে করেছেন। টিন ড্রামেও এরকম দেখা গেছে। এই কাহিনীটির তাৎপর্য গ্রাসের ২০০৬ সালের আত্মজীবনী প্রকাশের পর অনেকটা পরিষ্কার হয়ে যায়।

টিন ড্রামে যুদ্ধোত্তর ডুসেলডর্ফে যখন অস্কার একজন নামকরা বাদক হয়ে ওঠে, সে তার সঙ্গীদের সঙ্গে বাজনা বাজাতো পেঁয়াজের ভাণ্ডার (the Onion Cellar) নামে একটি নৈশক্লাবে যেখানে খদ্দেররা শুধু পয়সা দিয়ে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে আসত। খোসা ছাড়াতে গিয়ে তারা পেঁয়াজের ঝাঁঝে কাঁদত। এই কাঁদার অর্থ কি? এটাও এক ধরণের প্রায়শ্চিত্ত, পুরো জার্মান জাতির, পূর্বতন দোষ স্খালনের জন্য।

একদিকে পাপবোধ বা দোষবোধ, অন্যদিকে প্রায়শ্চিত্ত - পেঁয়াজের খোসা ছাড়িয়ে খোঁজা হয় অন্তর্নিহিত সত্ত্বাকে। অস্কার মেটজারেথ হলেন গুন্টার গ্রাস, জার্মান আত্মা। গ্রাস সমগ্র জার্মান জাতিকে আহ্বান করলেন তার নাৎসী অতীতকে অস্বীকার না করে বিশ্লেষণ করতে। নাৎসী-উত্তর নতুন জগতে গ্রাস হলেন নৈতিক কম্পাস। জার্মানী প্রথমে আতঙ্কিত হল, হয়তো পছন্দ করল না, কিন্তু শেষাবধি সে মানসিক প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রস্তুত হল। গ্রাসকে যখন নোবেল দেয়া হয় নোবেল কমিটি বলেছিল, ভাষাগত ও নৈতিক ধংসের ইতিহাসের পরে গ্রাসের কাজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে।

কিন্তু এদিকে গ্রাসের ব্যাক্তিগত কিছু প্রায়শ্চিত্ত বাকী ছিল।

২০০৬ সনে গ্রাস লিখলেন তাঁর জীবনের প্রথম অংশের কাহিনী, নাম দিলেন "Peeling the Onion" - পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানো। সেই খোসা ছাড়িয়ে কি পাওয়া গেল? দেখা গেল গ্রাস খুব তরুণ বয়সে, সবে ১৭ হয়েছে, যুদ্ধ যখন চলছে, ১৯৪৪ সনে নাৎসী পার্টির ভয়াবহ ভাফেন-এসএস বাহিনীর অংশ ছিলেন। ভাফেন-এসএস অনেকটা হিটলারের ব্যক্তিগত সামরিক বাহিনীর মত ছিল। তাদেরকে এমন চোখে দেখা হত যে যুদ্ধোত্তর জার্মানীতে, যারা যুদ্ধে কোনো অপরাধ করেন নি এমন, জার্মান সেনারা ভাতা (পেনশন) পেয়েছেন, কিন্তু ভাফেন-এসএস বাহিনীর সদস্যদের ভাতা দেয়া হয় নি। আমরা বলতে পারি অল্প বয়েসে না-বুঝে যুদ্ধে অনেকেই অংশ নিতে পারে, তাছাড়া গ্রাস লিখেছেন শেষ মুহূর্তে তিনি জানতে পারেন যে তাকে ভাফেন-এসএস বাহিনীতে ঢোকানো হচ্ছে। আসলে সমস্যাটা সেখানে নয়।

ওপরেই বলেছি যুদ্ধোত্তর জার্মানীতে গুন্টার গ্রাস নিজেকে ধীরে ধীরে নীতি, ঔচিত্য, ইত্যাদির পুরোহিত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করছিলেন। জার্মানরা তাদের ইতিহাসকে নির্মোহভাবে বিচার করতে পারে না - অর্থাৎ নাৎসী অতীতকে জার্মানরা স্বীকার করতে ভয় পায় - এই বলে তাদের সমালোচনা করেছিলেন। এমনকি ১৯৮৫ সনে, যখন জার্মান চ্যানসেলর হেলমুট কোল ও মার্কিন রাষ্ট্রপতি রোনাল্ড রেগান জার্মানীর বিটবার্গে জার্মান সৈনিকদের সমাধিক্ষেত্র দর্শনে যান, গ্রাস তখন সেই দর্শনের তীব্র সমালোচনা করেছিলেন, কারণ সেই সমাধিক্ষেত্রে ভাফেন-এসএসদেরও দেহ সমাহিত ছিল। কিন্তু গ্রাস নিজেই এসএস ছিলেন, কিন্তু ১৯৮৫ সনে সেটা প্রকাশ করেন নি।

অনেকের মতে, এবং আমার মতেও, গ্রাসের হিপোক্রিসি সেখানেই। গ্রাস সবাইকে পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে বলেছিলেন, কিন্তু নিজের খোসা ছাড়াতে দ্বিধান্বিত ছিলেন। কি হত তিনি যদি আগেই নিজের জীবনের কাহিনীটি আগেই জানিয়ে দিতেন। যেটা হত সেটা হল তাঁর ঔচিত্যবোধের পৌরহিত্য অটুট থাকতো। এবার তাঁর এসএস অতীতের স্বীকারোক্তির আলোকে ১৯৮৭/৮৮ সনের গ্রাসের কলকাতা সফরকে দেখা যেতে পারে। কলকাতার লোকদের নেতাজীর প্রতি অনুরক্তি হয়তো তাকে যুদ্ধোত্তর জার্মানীর অতীত-বিশ্লেষণ বিমুখতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বাঙ্গালীর মনে গুন্টার গ্রাসের মানসিক ভার নেই, নেতাজী ফ্যাসিস্ট ছিলেন না, যদিও ফ্যাসিস্টদের নিজের সুবিধায় ব্যবহার করেছেন। গ্রাসের নিজের 'দোষময়' অতীত সময় , তার সময়কাল যতই ছোট হোক, গ্রাসকে তাড়া করে বেড়িয়েছে সারা জীবন, সেটা স্বীকার করতে সাহস হয় নি তার। তবে সেই সংশয়তা, অনিশ্চয়তা ও বেদনা বোধ থেকেই তার রচনা সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর ডানজিগ-ত্রয়ী 'টিন ড্রাম', 'বিড়াল ও ইঁদুর' ও 'কুকুর-বছরগুলি' উপন্যাস স্মৃতির খোসা ছাড়িয়ে স্বীকারোক্তির সাক্ষ্য বহন করে।

গুন্টার গ্রাস মারা গেলেন ২০১৫ সনের ১৩ই এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে। তাঁর স্মৃতিসভায় বন্ধু জন আরভিং মূল ভাষণটি দেন। সভায় ছিলেন গ্দানস্কের (পূর্বতন ডানজিগ) মেয়র। বাঙ্গালীদের জন্য গ্রাসের বিশেষত্ব হল গ্রাস যেমন ডানজিগের কাহিনী লিখে গেছেন, তেমনই কলকাতার একটি কাহিনী তিনি উপহার দিয়ে গেছেন। শত বিতর্কের মধ্যেও তাঁর বস্তুনিষ্ঠ নৈতিক কম্পাসকে অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। আমার আশা ভবিষ্যতের প্রজন্মকে লজ্জায় জিভ কাটতে হবে না।

পুনশ্চ: আমার কাছে 'জিভ কাটো লজ্জায়'এ বইটি আপাততঃ নেই। কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসে এই বইটির একটি রিভিউ থেকে গ্রাসের নিচের কবিতাটির উদ্ধৃতি না দিয়ে পারলাম না। এর বাংলা অনুবাদ আমার দ্বারা সম্ভব নয়। আশা করি পাঠকেরা গুন্টার গ্রাসের কবিতার সোচ্চারতা অনুভব করবেন।

Kali Puja announced, I saw Calcutta
descend on us. Three thousand slums,
usually rapt in themselves, crouched low
by walls or sewer water, now all
ran out, rampant, beneath the new moon,
the night and the goddess on their side.
Saw, in the holes of uncountable mouths,
the lacquered tongue of black Kali
flutter red. Heard her smack her lips:
I, numberless, from all the gutters
and drowned cellars. I,
set free, sickle-sharp I.
I show my tongue, I cross banks,
I abolish borders.
I make
an end.





লেখক পরিচিতি
দীপেন ভট্টাচার্য
জন্ম ১৯৫৯। আদি নিবাস এলেঙ্গা, টাঙ্গাইল।
বিজ্ঞানী। গল্পকার।

মস্কো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিদ্যায় মাস্টার্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞানে পিএইচডি করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট ইন্সটিটিউটের গবেষক ছিলেন। পরে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড ক্যাম্পাসে (ইউসিয়ার) গামা রশ্মি জ্যোতির্বিদ হিসেবে যোগ দেন। এ ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার রিভারসাইড কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক। ১৯৭৫ সালে তিনি বন্ধুদের সহযোগিতায় 'অনুসন্ধিৎসু চক্র' নামে একটি বিজ্ঞান সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।

বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রকাশিত বই : দিতার ঘড়ি, নিওলিথ স্বপ্ন, অভিজিৎ নক্ষত্রের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন