শনিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৫

স্বকৃত নোমানের নিশিরঙ্গিনীর গোড়ার কথা

এগারোই জুলাই শনিবার সকালে লেখাটি যখন লিখতে বসেছি তার তিন দিন আগে গল্পকার কুলদা রায় বললেন প্রথম গল্পের বই লেখার গল্পটি লিখে দেয়ার জন্য। তিনি গল্পপাঠে প্রকাশ করবেন। কী লিখব, তিন দিন ধরে ভাবলাম। পৃথিবীশ্রেষ্ঠ গল্পকারদের চরণে তো সেই কবে মাথাটা নুইয়ে রেখেছি, মাথাটা তো এখনো সিধা করতে পারিনি। ‘গল্প’বলতে যা বোঝায় তা তো এখনো লিখতে শুরু করিনি। সুতরাং লিখবটা কী?


তাছাড়া আমি সাধারণত লিখি উপন্যাস। ‘লিখি’না বলে ‘লেখার চেষ্টা করি’বলাটাই সম্ভবত যথাযথ। উপন্যাসের নামে যা লিখি সত্যিকারার্থে তা আদৌ উপন্যাস হয়ে ওঠে কিনা সেটা অন্য প্রসঙ্গ। ব্যক্তিগতভাবে আমি উপন্যাস লেখাকেই জীবনের প্রধান কাজ বলে মনে করি। একটা উপন্যাস লিখব বলে বেঁচে থাকি, চাকরি করি, সংসার করি, খাইদাই, হাঁসি, কাঁদি, সঙ্গম করি, মেজাজটাকে ঠাণ্ডা করে রাখি, ঘণ্টার পর ঘণ্টা টেবিলে বসে থাকি, নানা বিষয়ে লিখি, শত শত পৃষ্ঠা পড়ি, ঘুরে বেড়াই এবং সুযোগ পেলে বারে যাই, প্রেম করি, প্রেমিকার সঙ্গে অভিমানও করি। অর্থাৎ উপন্যাসকে কেন্দ্রে রেখেই আমার জীবনের চাকাটা ঘুরছে। প্রথম যে বইটি প্রকাশিত হয় সেটিও উপন্যাস, সর্বশেষ যে বইটি প্রকাশিত হয় সেটিও উপন্যাস। মাঝে ‘দুর্ঘটনাবশত’একটি গল্পের বই বেরিয়ে যায়, ২০১৪ সালে, নিশিরঙ্গিনী। গল্পটা এই ‘নিশিরঙ্গিনী’কে নিয়েই। জনাব রায় নির্দিষ্ট করে বলেননি প্রথম উপন্যাসের বই লেখার গল্প, নাকি প্রথম গল্পের বই লেখার গল্প লিখব। আমি ধরেই নিয়েছি তিনি প্রথম গল্পের বই নিয়েই লিখতে বলেছেন। অতএব ‘নিশিরঙ্গিনী’র গল্পই লিখি।

নিশিরঙ্গিনীর মানে কী? মানেটা খুবই সোজা : বেশ্যা, পতিতা, গণিকা, বারবণিতা, যৌনকর্মী ইত্যাদি। শব্দটা বাংলা অভিধানে নেই, এটি আমারই সৃষ্টি। অভিধানে যৌনকর্মীর আরো অনেক প্রতিশব্দ রয়েছে, চাইলে আমি সেসব শব্দের যে কোনো একটি ব্যবহার করতে পারতাম। করিনি। করলে আমার সৃষ্টিশীলতাটা থাকছে না। আমি একটা নতুন শব্দ সৃষ্টি করতে চেয়েছি। পেরেছি। শব্দটা বাংলা অভিধানে যুক্ত হোক না হোক, আমার লেখায় তো অন্তত থেকে যাবে।

নিশিরঙ্গিনীতে রয়েছে মোট চৌদ্দটি গল্প। গল্পের নামগুলোও উল্লেখ করা যাক : ফণা, ক্যান্সার, আজরাইলের কূপ, চারু হক ঠিক বলেননি, হুজুরিয়ানা, ঘুঙুর, নাগরিক, গাবাল, যমজ, বেলুন, ডিউটি, আদিম আগুন, মহাল ও নিশিরঙ্গিনী। চৌদ্দটি গল্পের দশটিই ২০১৩ সালে লেখা। বাকি চারটির মধ্যে ‘ডিউটি’ ও ‘নিশিরঙ্গিনী’২০১২ সালে, ‘আদিম আগুন’২০০৯ এবং ‘মহাল’২০০৮ সালে লেখা। অর্থাৎ আমি গল্প লিখতে শুরু করেছি আসলে ২০১২ সাল থেকে। আমার প্রথম উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী পাঁচ বছর আমি গল্পের প্রতি মনোযোগী ছিলাম না, সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল উপন্যাস। শিল্পের যত শাখা আছে তন্মধ্যে উপন্যাস এমন একটা খতরনাক বিষয়, লেখককে উপন্যাসটি লেখা ছাড়া আর কোনো কাজ করার সময় দেয় না। তাকে উপন্যাসের চরিত্রগুলো নিয়েই থাকতে হয়। চরিত্রগুলোই তার নিত্যদিনের সঙ্গী হয়ে ওঠে। সেসব চরিত্রকে একপাশে রেখে গল্পের জন্য নতুন কোনো চরিত্র নির্মাণ করতে গেলে উপন্যাসের চরিত্রগুলোর বিদ্রোহ করার সম্ভাবনা তৈরি হয়। বিদ্রোহ করেও। ঔপন্যাসিককে তারা ছেড়ে যায়। কলাকৌশল করে তাদের আবার ফিরিয়ে আনতে হয়। ফলে উপন্যাস লেখার গতি হৃাস পায়। মূলত এই কারণেই আমি ওই পাঁচ বছর গল্পের দিকে যাইনি। তারও আগে, লেখালেখির প্রথম দিকে বেশ কটি গল্প লিখেছিলাম। দৈনিক আজকের কাগজের ‘রবিবারে সাহিত্য’পাতায় এবং অনান্য পত্রপত্রিকায় গল্পগুলো প্রকাশিতও হয়েছিল। কিন্তু সেগুলো আমি সংরক্ষণ করিনি। সংরক্ষণ করার মতো গল্প ছিল না সেগুলো। একেবারেই দুর্বল হাতের লেখা। বেশ কয় বছর ছিল আমার সংরক্ষণে, পরে পুরনো পত্রিকার সঙ্গে বিক্রি করে দিয়েছি।

পাঁচ বছর উপন্যাস লেখার পাশাপাশি গল্প লেখার প্রস্তুতিও কিন্তু চলছিল। পৃথিবীশ্রেষ্ঠ গল্পকারদের গল্প পড়ছি, অসংখ্য বই কিনছি গল্পের। গল্প কী, কী তার ব্যাকরণ ইত্যাদি বোঝার চেষ্টা করছি। এই পাঁচ বছরে গল্প যে একেবারেই লিখিনি তা নয়। লিখেছি। মহাল ও আদিম আগুন। প্রথমটি প্রকাশিত হয়েছিল সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পাদিত ‘নতুন দিগন্ত’পত্রিকায়, দ্বিতীয়টি দৈনিক ভোরের কাগজের সাহিত্য পাতায়। কিন্তু এ দুটি গল্পের শিল্পমান নিয়ে আমার মধ্যে সংশয় ছিল। কখনো বইতে অন্তর্ভূক্ত করব ভাবিনি।

২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সৃষ্ট শাহবাগের গণজাগরণে সক্রিয় অংশগ্রহণ, চাকরি বদলসহ নানা কারণে উপন্যাস লেখার স্থিরতা নষ্ট হয়। এ কারণেই হয়ত বছরব্যাপী দশটি গল্প লিখতে সক্ষম হই। পুরো মনোযোগ গল্পের প্রতি ছিল বলে উপন্যাস লিখতে পারিনি বছরটিতে। এক বছরে দশটি গল্প লেখা আমার জন্য সহজ ছিল না। দেড়-দুই শ পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস লেখার চাইতে দশটা গল্প লেখা কিন্তু অনেক কঠিন। কেননা একটা উপন্যাস শুরু করতে হয় একবার, আর দশটা গল্প শুরু করতে হয় দশবার। আমার এই কথার স্বপক্ষে সাক্ষী মানা যেতে পারে গার্সিয়া মার্কেসকে। ‘দ্য ফ্রাগেন্স অব গোয়াবা’য় মার্কেস প্রায় এমন মন্তব্যই করেছেন। তার মন্তব্য যথার্থ। গল্প-উপন্যাসের শুরুটাই আসল। শুরু করলে শেষ করতে বেশি সময় লাগে না। তা ছাড়া, একটা উপন্যাসের আঙ্গিক থাকে এক রকমের, আর দশটা গল্পের আঙ্গিক থাকে দশ রকমের। উপন্যাসের ভাষা কাহিনি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, আর গল্পের কাহিনি নিয়ন্ত্রিত হয় ভাষা দ্বারা। একজন গল্পকারের পক্ষে বছরে তিনটার বেশি গল্প লেখা প্রায় কঠিন। এর বেশি হলে সেগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকে। আর একজন ঔপন্যাসিকের পক্ষে তো তিনটাও কঠিন। কেন কঠিন সেকথা আগেই বলেছি। অথচ আমি লিখে ফেললাম কিনা দশটা! যদিও সেবছর কোনো উপন্যাস লিখিনি। তারপরও এগুলোর মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠাটা স্বাভাবিক।

জাগৃতি প্রকাশনীর প্রকাশক প্রীতিভাজন ফয়সল আরেফিন দীপন বলেছিলেন তাঁকে যেন উপন্যাসের একটা পাণ্ডুলিপি দেই। আমার উপন্যাস খুব বেশি বিক্রি হয় এই কারণে নয়, আমার প্রতি তাঁর ভালোবাসা আছে বলে তিনি আমার উপন্যাসের প্রকাশক হতে চান। ২০১৩ সালে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত ‘হীরকডানা’উপন্যাসটি তাকে দেয়ার জন্য বলেছিলেন। কিন্তু বিদ্যাপ্রকাশের প্রকাশক শ্রদ্ধাভাজন মজিবর রহমান খোকা ভাইর কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলাম বলে তাঁকেই দিতে হয়। দীপন ভাইকে বললাম ২০১৪ সালে একটা উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি দেব। কিন্তু সে বছরের জন্য তো আমি উপন্যাস লিখিনি, দেব কোত্থেকে!

২০১৩ সাল শেষ হতে চলল। দীপন ভাই পাণ্ডুলিপি কদ্দূর জানতে চাইলেন। আমি আমার অপরাগতার কথা জানালে তিনি বললেন, তাহলে একটা গল্পের পাণ্ডুলিপি গোছান। বিস্মিত হলাম আমি। দীপন ভাই অকারণে টাকা নষ্ট করতে চাচ্ছেন কেন? কে কিনবে আমার গল্পের বই! যে কটি গল্প লিখেছি সেগুলো আদৌ গল্প হয়েছে কিনা তা নিয়েও তো আমি সন্দিহান। কিসের পাণ্ডুলিপি গোছাব! কিন্তু দীপন ভাই তা মানবেন কেন, তিনি গল্পের বইই বের করবেন, টাকাগুলো জলে যাবে জেনেও।

কি আর করা, সব কটি গল্প একত্রিত করে ঝাড়াই-বাছাই করতে গিয়ে দেখা গেল বইতে অন্তর্ভূক্ত করার মতো গল্প আছে সাকুল্যে দশটি। এগুলো দিয়ে বই করলে বইটি হবে নির্ঘাত দুর্ভিক্ষকবলিত। প্রকাশকের বিনিয়োগকৃত টাকাটাও ঠিকমতো উঠবে না। পৃষ্ঠা তো আরো বাড়াতে হবে। কী করি? আগে লেখা গল্প দুটিও বের করলাম। সেগুলোকে পুনর্লিখন করে দাঁড়াল তেরটি। এরই ফাঁকে কোনো এক দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদকের চাপে আরো একটি গল্প লেখা হয়ে গেল। সাকুল্যে এবার গল্পের সংখ্যা দাঁড়াল চৌদ্দটি। তার মধ্যে একটি গল্পের নাম নিশিরঙ্গিনী। গল্পটি লিখিয়েছিলেন গল্পকার মণি হায়দার। তিনি বারবণিতাদের ওপর লেখা গল্প নিয়ে একটি সংকলন করবেন সেজন্য, যদিও সংকলনটি শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। গল্পটি আমি ছাপতে পাঠাই ‘কালি ও কলমে’। ছাপাও হলো। এই গল্পের নামানুসারেই প্রথম গল্পের বইটির নাম রাখলাম। চৌদ্দটি গল্পকে শেষবারের মতো সম্পাদনা করে, একজন প্রফেশনাল প্রুফ রিডারকে দিয়ে একবার প্রুফ দেখিযে, প্রচ্ছদের ব্লার্বে দেয়ার জন্য ছোট্ট একটা ভূমিকা লিখে পাঠিয়ে দিলাম দীপন ভাইর মেইলে। ব্যাস, আমার দায় মুক্তি ঘটে গেল। কদিন পর শিল্পী নিয়াজ চৌধুরী তুলি সুন্দর একটা প্রচ্ছদও করে দিলেন। একুশে বইমেলায় বেরিয়ে গেল প্রথম গল্পের বই ‘নিশিরঙ্গিনী’। বইটি হাতে নিয়ে দেখলাম, কদিন বইটার প্রেমে মজেছিলাম, মেলা শেষ হওয়ার পর বইটার কথা যথারীতি ভুলে গেলাম।

বইটি প্রকাশের পর এক কপি পাঠিয়েছিলাম কবি ও কথাসহিত্যিক আবুবকর সিদ্দিককে। পুরো বইটি তিনি দুদিনেই পড়ে ফেললেন। ফোন করে জানালেন চৌদ্দটি গল্পের মধ্যে এগারোটি গল্প বইতে রাখার মতো, বাকিগুলো না রাখলেই ভালো হতো। ‘যমজ’গল্পটি যে কিচ্ছু হয়নি সেকথাও অকপটে জানালেন। আমার লেখার ভালোমন্দ সবসময়ই তিনি অকপটে জানান। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, অনেক পাঠক ফোন করে আমাকে ‘যমজ’গল্পটির প্রশংসা করলেন। আমি মোটেই পাত্তা দেইনি তাদের কথা। আমি জানি আবুবকর সিদ্দিকের পাঠের গভীরতা। গল্প সম্পর্কে আমার যেটুকু পাঠ তাতে আমিও উপলব্ধি করতে পারি ‘যমজ’টা যে আসলে ঠিকমতো দাঁড়ায়নি।

দাদা কুলদা রায়ের আহ্বানে এই লেখাটি যখন লিখছি তখন ‘নিশিরঙ্গিনী’র বয়স দেড় বছর। বইয়ের আলমিরা থেকে বইটা নামাই। উল্টেপাল্টে দেখি। এখন মনে হচ্ছে, না, চৌদ্দটি গল্পের মধ্যে আটটি রাখলেই ভালো হতো। বাকি ছয়টি গল্প আসলে হয়ে ওঠেনি। আটটি গল্পের মূল্য আমার কাছে এখনো আছে। ভবিষ্যতে হয়ত নাও থাকতে পারে। তবু এখন কেউ যদি আমাকে আটটি থেকে চারটিকে বাছাই করার জন্য বলে, আমি তবে চারটিকেই রাখব। বাকি চারটিকে ফেলে দেব, যেভাবে ফেলে দিয়েছিলাম প্রথম জীবনে লেখা গল্পগুলো।

হয়ত সব গল্পকারই এমন, প্রতিনিয়ত নিজেকে ভাঙেন। ভাঙতে ভাঙতে নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলেন। আজ যে গল্পটি লিখে আমি তৃপ্ত, কয়েক বছর পর সেটির জন্য লজ্জাও লাগতে পারে। এমন দুর্বল গল্প আমি লিখেছি! মূলত আমি এখনো গল্পকে বোঝার চেষ্টার মধ্যে আছি। হয়ত একদিন ঠিক ঠিক বুঝে যাব। সেদিন সত্যিকারের গল্প হয়ত লিখতে পারব।



ঢাকা, ১১.০৭.২০১৫



২টি মন্তব্য: